23/11/2025
#এভাবেও_ঘুরে_দাঁড়ানো_যায়?
একটি সচ্ছল পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান, তাই তাকে নিয়ে ছিলো সবার আকাশচুম্বী স্বপ্ন! সবার আদরের সোমো এইচ এস সি পাশ করেই পাড়ি জমান সুদূর চায়নাতে। ভর্তি হোন চায়নার বিখ্যাত "নানচাং হাংকং ইউনিভার্সিটিতে"। আগেই বলেছি, স্বপ্ন ছিলো আকাশচুম্বী তাই তার পড়াশোনার বিষয় ছিলো আকাশের বাহন বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং (এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে। কিন্তু স্বপ্নের পাখি আকাশে ডানা মেলার আগেই হোচট খায়! কারণ, সদ্য কৈশোর পেরোনো সোমো পরিবারে থেকে এত দূরে চলে গিয়ে একাকিত্বে ভুগতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ড্রাগসে আসক্ত হয়ে পড়েন।
ফলাফলস্বরূপ, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে লেখাপড়ার মাঝপথে রেখেই ফিরে আসতে হয় দেশে। উপায়ন্তর না দেখে বাবা-মা নিজ সন্তানকে বাঁচানোর জন্য উন্নত চিকিৎসা করান। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠেন তাদের আদরের সন্তান। এরপর তাকে বুঝিয়ে আবারো চায়না পাঠানো হয়, বাকি লেখাপড়া শেষ করে খুবই ভালো রেজাল্ট নিয়ে দেশে ফেরেন সোমো। দেশে এসে একটি বাংলাদেশী এয়ারলাইন্সে চাকুরী শুরু করেন। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ভাবলেন এখন শুরু হবে শুধু সাফল্যের গল্প। কিন্তু বিধিবাম!
অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ, বান্ধবীর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন, খারাপ সঙ্গ, এবং লেখাপড়ার বিষয়বস্তুর সাথে বাংলাদেশে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকুরির অপ্রতুলতার কারণে আবারো বিপথগামী হয়ে পড়েন সোমো। ফলাফল রিহ্যাবলিটিশন!
সন্তানের এই অধঃপতন মানুষিকভাবে বিধ্বস্ত করে তোলে পুরো পরিবারকে। তবুও তারা আশায় বুক বাঁধেন এই ভেবে যে আগেরবারের মত আবারো তাদের বুকের ধন ফিরে আসবে সুস্থ হয়ে। কিন্তু রিহ্যাব সেন্টার থেকে বের হয়েই বাইক এক্সিডেন্ট করে বাম পা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আবারো জড়িয়ে পড়েন ড্রাগস এ। নিয়তি আবারো তাকে রিহ্যাব সেন্টারে নিয়ে যায়, কিন্তু এত ধকল সইতে না পেরে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবারো!
এরপর, মাকে সাথে নিয়ে চিকিৎসা করতে যেতে হয় দিল্লিতে। দীর্ঘ প্রায় ২ মাসের ব্যয়বহুল চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেন সোমো। কিন্তু তার ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভার সামলে উঠতে আর্থিকভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় তার পরিবার। এদিকে হঠাৎ দেশের পট পরিবর্তন ঘটলে ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারের সদস্যরা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরেন।
এবারের অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা খলনলচে পাল্টে দেয় সোমোর মনোজগত। নিজের ভুল বুঝতে পেরে মনে মনে অনুতপ্ত হয় সে। এই প্রথম সে অনুভব করে পরিবারের প্রতি তার মমত্ববোধ। নিজের জীবন থেকে সারাজীবন পালিয়ে বেড়ানো যুবক অবশেষে বুঝতে পারেন যে নিজের পরিবারের প্রতি তার অনেক দায়িত্ব রয়েছে, এবং তা অবশ্যই পালনীয়।
এরপরই শুরু হয় সোমোর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। সিরাজগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। শুরু হয় IELTS যুদ্ধ! সঙ্গী তার গ্রে-লাইট পরিবার!! রাত দিন এক করে পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে খুব বেশী সময় লাগেনি তার। মাত্র ২ মাসেই IELTS এ প্রত্যাশিত স্কোর তুলে ভর্তি হয়ে যান তার স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্স ল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে। এরপর বাকি প্রক্রিয়া শেষ করে খুব দ্রুতই সোমো পৌঁছে গেছেন তার কাঙ্খিত ঠিকানায়। সে এখন পৃথিবীর অন্যতম আইকনিক শহর মেলবোর্নের বাসিন্দা।
যমুনা পাড়ের ছোট্ট শহর সিরাজগঞ্জের ছেলের রাফসান যানি সোমোর স্বপ্নের পাখিটা এখন অনেক বড়, যা কেবল ডানা মেলেছে আকাশে। মানুষিকভাবে অনেক পরিণত সেই পাখিটা উড়তে উড়তে পৌঁছে যাবে তার কাঙ্খিত গন্তব্যে এই প্রত্যাশা আমাদের।
আমাদের স্টুডেন্ট সোমো চলে গেছেন দেশ ছেড়ে, তবে আমাদের বর্তমান এবং পরবর্তী স্টুডেন্টদের জন্য রেখে গেছে একটি শিক্ষনীয় অধ্যায়। যার ক্যাপশন হতে পারে “এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়?” সোমোর এই সাফল্য আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় বিশ্ববিখ্যাত লেখক Roy T. Bennett এর সেই বিখ্যাত উক্তিঃ
“Never stop dreaming,
never stop believing,
never give up,
never stop trying, and
never stop learning.”,