05/02/2017
'প্রশ্নপত্রে ডাক্তারদের অসম্মানঃ আমার কিছু কথা ছিলো'
,গোলাম সারোয়ার, কলাম লেখক
সম্পাদক, দৈনিক সমকাল | প্রকাশিত: 10:53 PM, February 03, 2017
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস মানব ইতিহাসের মতোই প্রাচীন । মানুষ এই নশ্বর জগতে আসার পর রোগ-ব্যাধিরও মুখোমুখি পড়েছেন শুরু থেকে। যখনই মানুষ রোগ ব্যাধির কবলে পড়েছেন তখনই নিরাময়ের জন্যে মানুষ নিজের জ্ঞানের উপর ভর করে যুদ্ধে নেমে পড়েছেন । আর তাই মানব জাতির বিকাশের সাথে সাথেই চিকিৎসাবিদ্যাও বিকশিত হয়েছে।
এ যাবত আবিষ্কৃত মানব জ্ঞানের লিখিত দলিল মতে, মহান গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসই হলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক । প্রাচীন গ্রেকো-লাতিন সংস্কৃতির আরেকজন বিখ্যাত চিকিৎসক আছেন । তাঁর নাম হলেন গ্যালেন।
মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্ঞানের সব শাখাতেই আলো জ্বালিয়ে ছিলেন । মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা হলেন বিস্ময়কর এক প্রতিভা, যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের ভিত্তিটাই রচণা করে দিলেন । বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল যুগ হচ্ছে ঊনবিংশ এবং বিংশ শতক । এই দুই শতকে বিজ্ঞানের অন্যান্য সব শাখার ন্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বিপ্লবাত্মক সব আবিষ্কার হয়েছে ।
বিংশ শতককে যেতে হয়েছে দুটো মহাযুদ্ধের ভিতর দিয়ে । যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি মানব লাঞ্ছনা । লাঞ্ছিত- নিপীড়িত মানবতার পাশে দাঁড়াতে হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে । সে আরেক মহাযুদ্ধ । এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে জগতের সবচেয়ে মেধাবিদের, সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষদের ।
বিংশ শতাব্দীর আরেকটি দর্শন বলতে হয় । এই শতাব্দীতে মানুষের মাঝে অমরত্বের নেশা পেয়ে বসে । মানুষ মৃত্যুকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠে । নিদেন পক্ষে জীবনকে প্রলম্বিত করার নেশা । সেই দায়িত্বও নিতে হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে । তাঁরা বহুলাংশে সফলও । মানব সভ্যতার সর্বযুগে চিকিৎসকদের সম্মান ছিলো অনন্যতায় । বিংশ শতাব্দীর প্রতিটি নাটক সিনেমায় একজন চিকিৎসকে দেখা যায় সম্মানের আসনে । বিশেষ করে উত্তম- সুচিত্রার বেশিরভাগ নাটকে আমরা নায়ক উত্তম কুমারকে দেখি ডাক্তার হিসেবে । মানে হলো তখনকার সমাজের আসল নায়ক হলো ডাক্তারগণ ।
বাস্তবিক পক্ষে সবযুগেই একজন ডাক্তার হলো সমাজের সবচেয়ে ইফেকটিভ নায়ক । পৃথিবীর যত ক্ষমতাবান আর প্রভাবশালী মানবই হোক তাঁকে একসময় নিজের দেহ সঁপে দিতে হয় একজন ডাক্তারের অধীনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসে । সেই ডাক্তাররা আজ আসলে কেমন আছেন !
ডাক্তারিটা ডাক্তারদের কাছে মূলত ধর্ম পালনের মতো পবিত্র। কিন্তু ইদানিং চিকিৎসকরা হলেন নিষ্পেষিত সম্প্রদায় । আমাদের বর্তমান সমাজের মনোভাব ডাক্তারদের অনুকূলে নেই । চিকিৎসাসেবা ও ডাক্তার প্রসঙ্গ উঠলেই এখন তীব্র অভিযোগ। মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে সংবাদ আসে, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ইত্যাদি ।
কোনও হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু হলেই রোগীর আত্মীয়স্বজন অভিযোগ করেন, ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে। মাঝে মাঝে মানুষ হাসপাতাল ভাঙচুর করেন। সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের জীবনশঙ্কা তৈরি হয়। কিছু কিছু গণমাধ্যম কোনও যাচাই-বাছাই না করে ডাক্তার এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে জনতাকে উস্কে দেন । মানুষ বুঝতে চায় না ডাক্তারদের কাছে অমরত্বের পানীয় 'আবে হায়াত' নেই । একজন ডাক্তারের সারাজীবনের সেবা, আত্মত্যাগ আর অধ্যাবসায়ের কোনও মূল্য দেওয়া হয়না তখন ।
আমরা বলছিনা বাংলাদেশের সব ডাক্তার ভালো । অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে কমিশনের বাণিজ্যের ডাক্তারও আছেন । রোগীর পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার ডাক্তারও আছেন । তবে বেশিরভাগ ডাক্তার যে স্বাভাবিক জীবনটা উৎসর্গীকৃত করে মানব কল্যানে জীবনটা কটিয়ে দেন সেই খবর সহজে পাওয়া যায় না। কারণ যা কিছুই মন্দ, তাই খবর ! ইদানিং আমাদের দেশের বেশিরভাগ মিডিয়া এই তত্ত্বে চলে ! তাই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার যে ক্ষমতা, তার চার-পাঁচগুণ বেশি সেবা দিয়েও ডাক্তারদের সম্বন্ধে সমাজে ঋণাত্মক কথায়ই ভাসে !
বাংলাদেশের একজন ডাক্তারকে চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনাপূর্ণ একটি পরিবেশে গিজগিজ করা রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয় হাসি মুখে । বেশির ভাগ ডাক্তারই দেবতুল্য মানুষ । এতো সীমাবদ্ধতার ভিতরেও বাংলাদেশে বদরাগী ডাক্তারের মুখের ছবি এদেশের কম রোগীর অন্তরেই গাঁথা আছে । ঈদেরদিন সন্ধ্যেবেলা মানুষ ছেলে পুলে নিয়ে বেড়াতে বের হলো । একজন ডাক্তার দেখলো একজন মুমূর্ষুরোগী তাঁর চেম্বারে হাজির ! তাঁকে প্রোগ্রাম বানচাল করতে হয় ! একজন ডাক্তারের কর্মঘন্টার হিসেব কেউ রাখেনা । সে মানসিকতায় জাতিকে রাখেনি মিডিয়াগুলো ।
আশ্চর্য ব্যাপার হলো কিছু মিডিয়া ইদানিং চায় মানুষ ডাক্তারদের উপর হামলে পড়ুক । আমি হলফ করে বলতে পারি, মিডিয়াগুলো একটু বস্তুনিষ্ঠ আর চিকিৎসকদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে সদয়ভাবে লিখলে এ জাতি ডাক্তারদের দেবতুল্য শ্রদ্ধা করতো। তখন একজন দেবি শেঠী যেমন ভারতের জাতীয় বীর হয়, আমাদেরও বরেণ চক্রবর্তী, লুৎফর রহমান, জাহাঙ্গীর কবীর, প্রাণ গোপাল দত্ত, সামন্ত লাল সেনরা হতেন আমাদের জাতীয় বীর। এমন আরও অনেক অনেক মানব সেবক জাতীয় বীর আমাদের আছেন। বাংলাদেশের আগুন সন্ত্রাসের সেই মহাসংকটের সময় আমরাতো দেখি একজন ডাক্তার সামন্ত লালের মুখ !
এখন কথা হলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে কি কোন অব্যবস্থাপনা নেই ! অবশ্যই আছে । সেজন্যে ডাক্তাররা কতটুকু দায়ী ভাবতে হবে ! সারাদেশ তো বটেই বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোরও অবস্থা করুনের চেয়েও করুন । হাসপাতালগুলোর নিয়ন্ত্রণ পরিচালকদের হাতে । ডাক্তারদের নিয়োগ অন্যদের হাতে এবং ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিটিও কন্ট্রোল হয় অন্যস্থান থেকে । যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের ভূমিকা থাকে না । আরো আছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম দুর্নীতি, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ।
এগুলো কে দেখবে ! এগুলো দেখতে হবে ডাক্তারদের সংগঠনকে । অনেকে ইদানিং বলে থাকেন ডাক্তাররা রাজনীতি করেন কেন ! ডাক্তাররা রাজনীতি না করলে এগুলো ঠিক করবে কে ! মনে রাখতে হবে ডাক্তারদের থেকে সঠিক নেতৃত্ব আসলেই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সেবাটি জাতির জন্যে নিশ্চিত করা যাবে । কারণ এই সেক্টরের সমস্যা-সম্ভাবনা তাঁরা ছাড়া আর কেউই ভালো জানেন না। আবার রাজনীতি ছাড়া দাবী আদায়ও করা যাবেনা। সেক্ষেত্রে মেডিকেল ছাত্ররাজনীতিতে যাঁদের সোনালী অতীত আছে তাঁদেরকেই নেতৃত্বে বসাতে হবে।
হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা দূর করতে হলে, ডাক্তারদের প্রশাসনিক অবস্থান আর অর্থনৈতিক বিষয়গুলো পুনর্গঠন করতে হলে, বর্তমান কর্পোরেট বণিকদের রূপান্তরিত চিকিৎসা ব্যবসাকে সেবায় পরিণত করতে হলে, মানসম্পন্ন ডাক্তার তৈরি করতে হলে, চিকিৎসা-শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন এক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাতে হলে, সরকারের নিয়ন্ত্রণ, বিএমডিসির নিয়ন্ত্রণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ, মেডিক্যাল কলেজের নিয়ন্ত্রণ-সব কিছুকে সমন্বিত একটি কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হলে বিএমএ-র নেতৃত্বে দক্ষ মেরুদন্ডধারী চিকিৎসক নেতার দরকার । অযোগ্য, অদক্ষ ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসার বিচার করতে হলেও বিএমএ-র নেতৃত্বকে হতে হবে সবল । একজন ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা মানে একটি প্রাণের অকালে মহাঅপচয় । এই ব্যাপারটিও মেনে নেওয়া যাবেনা ।
প্রতিবছর প্রায় এক লাখের কাছাকাছি শিক্ষার্থী মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয় । তারমধ্যে চার হাজারের মতো সরকারি মেডিকেলে স্থান পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই মানুষগুলোকেই পেশাগত জীবনে তাঁদের থেকে অযোগ্যদের অধীনে পেশার প্রয়োজন মেনে নিতে হয় । এভাবে একটি দেশে ভালো চিকিৎসাব্যবস্থা আশা করা যায় না। এভাবে শৃঙ্খলার পরিপালনও হয় না। জ্ঞানের অনুবর্তিতাও হয় না।
সেজন্যে বিএমএ-তে যোগ্য নেতৃত্বের আশা ডাক্তারদের সাথে সাথে পুরো জাতিরও । সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের সবচেয়ে মেধাবিদের প্রথম পছন্দ থাকে ডাক্তার হওয়া । আসলে দেশের যোগ্যদের মাঝে যোগ্যরা হলো চিকিৎসক।
আমি আসলে ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত শুরু করলাম। এবার আসি যে কথা বলতে এসেছি সে কথায়। এসএসসি পরীক্ষার ঢাকা বোর্ডের প্রশ্নে ডাক্তারদের অসম্মান করে একটি প্রশ্ন করা হয়েছে।
আমরা মনে করি, ডাক্তারি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মানব স্পর্শী, কল্যাণকর আর মার্জিত পেশা। এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মেধাবিদের প্রথম পছন্দ ডাক্তার হওয়া।
আপনি অসুস্থ, জীবন শঙ্কায় আছেন, আপনার ধন-মান-যশ-ক্ষমতা কিছুই আপনাকে আরাম দিতে পারবেনা। পৃথিবীর সব ডাক্তার যদি তখন একজোট হয়ে বলে, আপনার জীবনের যত অর্জন আছে সবই দেওয়ার পরই চিকিৎসা শুরু হবে, আপনি রাজি হতে হবে । আপনার শিক্ষকত্ব, ক্ষমতাত্ব, মন্ত্রীত্ব কিছুই আপনাকে স্বস্তি দিতে পারবেনা।
কোন ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু একটি মহান পেশাকেই সমূলে আক্রমণ করা মামুলি কোন বিষয় নয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষক এ রকম একটি বার্তা দেয় তিনি হয়তো প্রশ্ন করতে যে যোগ্যতা এবং সামাজিক-রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রাখতে হয়, সে যোগ্যতা রাখেন না ।
কিংবা তিনি হয়তো চান না ভবিষ্যতে মেধাবিরা এই পেশায় আসুক যাতে জাতি হয় চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুর্বল। যেসব দেশ চিকিৎসা বাণিজ্য করে তারা হয়তো লংটার্ম পরিকল্পনা মতো আশেপাশের দেশে অর্থও লগ্নি করে থাকতে পারে, যাতে করে মানুষ তাদের দেশে চিকিৎসার জন্যে যেতে বাধ্য হয়।
ঐ প্রশ্নকর্তা স্বজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে যেভাবেই হোক যে প্রশ্নটি করলেন তা একটি অযোগ্য প্রশ্ন। অযোগ্যদের শিক্ষা সৃজনে রাখা যাবেনা। তাহলে অন্যদেশ আমাদের অজান্তেই সুবিধা পেয়ে যাবে।
কোন কোন দেশের জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসা সেবা বিপনন। তাদের লগ্নি করা কোন দানা পানি ঐ প্রশ্নকর্তার পেটে পড়েছে কিনা, রাষ্ট্রকে সে খবরও বের করতে হবে। আমরা ডাক্তারদের এই প্রতিবাদে সমর্থন জানালাম।
সৌজন্যে:
গোলাম সারোয়ার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট