আল-কুরআন ও হাদিস / Al-Quran & Hadis

আল-কুরআন ও হাদিস / Al-Quran & Hadis

Share

কোরআন ও হাদিস (Al-Quran & Hadis) হলো ইসলামের সঠিক পথ নির্দেশিকা। কোরআন ও হাদিস আরো জানবো।

15/06/2026
03/06/2026

রাতের অন্ধকারে একটা পুরনো বাড়ির বারান্দায় বসে আছি। চাঁদের আলোয় চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, জীবনটা কেমন ছুটে যায়। আর সেই ছুটে যাওয়া সময়ে কত নামাজ যে কাজা হয়ে গেছে, তার হিসাব কেউ রাখেনি।
একদিন সন্ধ্যায় রহিম চাচা এসে বসলেন। চোখে একটা অপরাধবোধের ছায়া। বললেন, “ভাই, অনেক নামাজ বাদ পড়েছে। এখন কী করব? আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন?” তার গলায় সেই সুর, যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া ছেলে মায়ের কাছে ফিরতে চায়।
আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মানুষের এই ছোট ছোট দুর্বলতা দেখলে হৃদয়টা নরম হয়ে যায়। জীবন তো এমনই। কখনো ঘুম, কখনো ভুল, কখনো শুধু অলসতা। কিন্তু আল্লাহ তো রহমান। তিনি দরজা বন্ধ করে দেননি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাফফারা হলো যখন মনে পড়বে তখনই তা আদায় করা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৪)। এই হাদিসটা শুনলে মনে হয়, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে খুব নরম। কাজা নামাজ মানে শুধু পড়া নয়, এটা ফিরে আসার একটা সুযোগ।
কাজা নামাজের নিয়ম খুব সহজ। যেভাবে সাধারণ নামাজ পড়ি, ঠিক সেভাবেই। শুধু নিয়তটা মনে মনে ঠিক করে নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমার উপর যে ফজরের কাজা নামাজ আছে, তার প্রথমটি আদায় করছি” — এমন নিয়ত। যদি অনেকগুলো থাকে, তাহলে “প্রথম অনাদায়কৃত” বলে নিয়ত করলে সব ঠিক হয়ে যায়। নিয়ত মুখে বলার দরকার নেই, হৃদয়ে থাকলেই চলে।
কোনো নির্দিষ্ট দিনের কথা মনে থাকলে সেটা উল্লেখ করা যায়। আর সময়? যেকোনো সময় পড়া যায়, শুধু নিষিদ্ধ তিন সময় বাদে। ধীরে ধীরে করে যাও। প্রতি ওয়াক্তের পর একটা কাজা মিলিয়ে দাও। এতে বোঝা হালকা হয়।
রহিম চাচার চোখে জল চিকচিক করছিল। বললাম, “চাচা, আল্লাহ তো দেখেন হৃদয়। তুমি যদি সত্যি অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসো, তিনি তোমার হাত ধরবেন।” সুরা তাহা-তে আল্লাহ বলেন, “আমার স্মরণের জন্য নামাজ কায়েম করো।” (সুরা তাহা: ১৪)। এই স্মরণই তো জীবনের আসল আলো।
রাত বাড়ছিল। চাঁদটা একটু উঁকি দিয়ে হাসল যেন। জীবনের ছুটে যাওয়া সময়গুলো ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু আল্লাহর দিকে ফিরে আসা যায়। আর সেই ফেরাটাই সবচেয়ে সুন্দর।

02/06/2026

বিকেলের আলো যখন মসজিদের উঠোনে এসে পড়েছিল, তখন রহিম দাঁড়িয়ে ছিল নামাজে। তার সামনে একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চ। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল আস্তে আস্তে। সে রুকুতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা ছেলে — স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে, হয়তো বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে বলে ছুটছে — হঠাৎ তার সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
রহিমের বুকটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, যেন কেউ তার আর আল্লাহর মাঝখানে একটা হালকা পর্দা টেনে দিল। নামাজ শেষ করে সে উঠে বসল। কিন্তু মনটা শান্ত হলো না। বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছিল — নামাজটা কি ভেঙে গেছে?
সারা সন্ধ্যা সে অস্থির থাকল। খাওয়া-দাওয়া করল, কথা বলল, কিন্তু ভেতরটা যেন একটা ছোট্ট পাথর বয়ে বেড়াচ্ছিল। পরের দিন সকালে মসজিদে গিয়ে সে পুরনো হুজুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হুজুর চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, তারপর হাসলেন।
“কী হয়েছে বাবা?”
রহিম সব খুলে বলল। হুজুর চুপ করে শুনলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, “না রে, নামাজ ভাঙে না। আল্লাহর রহমতে নামাজ ঠিকই থেকে যায়। তবে যে সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, তার জন্য একটা বড় কথা আছে।”
তিনি একটু থেমে বললেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন — যে ব্যক্তি নামাজির সামনে দিয়ে যায়, সে যদি জানত তার উপর কত বড় গুনাহের বোঝা, তাহলে সে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু সামনে দিয়ে যেত না।” (সহীহ বুখারী ৫১০, সহীহ মুসলিম)
রহিম চুপ করে রইল। হুজুর আবার বললেন, “এই হাদীস শুনে মনে হয়, নামাজ আসলে কত নরম, কত পবিত্র একটা জিনিস। আল্লাহর সাথে বান্দার যখন কথা হয়, তখন যেন চারপাশটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়। নবীজি (সা.) চেয়েছিলেন, কেউ যেন সেই মুহূর্তটাকে অসম্মান না করে।”
রহিম জিজ্ঞেস করল, “তাহলে সামনে কিছু রাখার কথা বলা হয় কেন, হুজুর?”
“সেটা সুতরাহ। একটা আড়াল। লাঠি, ব্যাগ, দেওয়াল — যা-ই হোক। যাতে পথচারী বুঝতে পারে, এখানে কেউ আল্লাহর সাথে কথা বলছে। আয়েশা রাধিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, নবীজি নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তিনি সামনে শুয়ে ছিলেন — তবু নামাজ ভাঙেনি। মানে, নামাজ ভাঙার কথা না। তবে অযথা বাধা দেওয়া উচিত না। কুরআনেও বলা হয়েছে, মুমিনরা তাদের নামাজে বিনয়ী হয় (সূরা আল-মুমিনুন ২৩:২)। সেই বিনয়টাকে রক্ষা করাও একটা ইবাদত।”
রহিমের মনটা হালকা হয়ে এল। সে ভাবল, ছেলেটা হয়তো জানতই না। হয়তো তার মা ডেকেছে, অথবা বাস মিস হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ জীবনের তাড়া। কিন্তু এখন থেকে সে নিজেও খেয়াল রাখবে। নামাজের সময় মসজিদের আশেপাশে কাউকে দেখলে অন্য পথে যাবে।
সন্ধ্যা নামিয়ে এল। মসজিদের বারান্দায় বসে রহিম ভাবল — আল্লাহ আমাদের নামাজ দিয়েছেন একটা নির্জন, নরম মুহূর্ত। সেই মুহূর্তটাকে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব। হয়তো এই ছোট্ট সতর্কবাণীগুলোই আমাদের হৃদয়কে একটু বেশি নরম করে দেয়। আরেকজনের আল্লাহর সাথে কথা বলার সময়টাকে সম্মান করতে শেখায়।
আর সেই সম্মানটুকুই হয়তো আসল ইবাদতের অংশ।

02/06/2026

রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে। শহরের আলো একে একে নিভে যাচ্ছে, আর দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠছে। রহিম বিছানায় শুয়ে ছিল, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম আসছিল না। তার মনের ভিতরে অনেকগুলো ছোট ছোট ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল — আজকের দিনটা কেমন গেল, আগামীকাল কী হবে, জীবনের এই পথটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? হঠাৎ তার বুকের ভিতরটা যেন টানটান হয়ে উঠল। তখন সে উঠে পড়ল। তার পা দুটো যেন নিজেরাই চলে এল অজুর কলের কাছে। ঠান্ডা পানি মুখে লাগতেই মনে হল, সারাদিনের ক্লান্তি, রাগ আর দুশ্চিন্তা সব ধুয়ে যাচ্ছে।
এই রাতের শেষ প্রহরে, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, রহিম একা দাঁড়িয়ে গেল আল্লাহর সামনে। এই নামাজের নাম বিতর। বিজোড়। হাদিস শরিফে এসেছে — “আল্লাহ ওয়িত্র (বিজোড়) এবং তিনি ওয়িত্রকে ভালোবাসেন।” (সহিহ মুসলিম ২৬৭৭)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই নামাজকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং শেষ রাকাত ছাড়া আর কোনো বৈঠক করতেন না। (সুনান আন-নাসায়ী, আল-বায়হাকী — সহিহ সনদ)। আর রাতের নামাজ সম্পর্কে সহিহ বুখারিতে এসেছে, দুই দুই করে পড়তে হয়, শেষে এক রাকাত দিয়ে বিতর করে নিতে হয়।
সাধারণত তিন রাকাতই পড়া হয়। রহিমও তাই করল। অজু করে নিল। কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াল। নিয়ত করল — তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়ব। প্রথম রাকাতে আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধল। সানা পড়ল, তারপর সুরা ফাতিহা। তারপর একটি সুরা — অনেকে সুরা আল-আ’লা পড়েন। রুকু করল, “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” বলল। তারপর দুই সিজদা।
দ্বিতীয় রাকাতেও একইভাবে। এবার সুরা আল-কাফিরুন পড়ল। রুকু-সিজদা শেষে উঠে দাঁড়াল তৃতীয় রাকাতের জন্য। ফাতিহা ও একটি সুরা পড়ার পর হাত দুটো কান বরাবর তুলে কুনুতের দোয়া পড়ল — যে দোয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়ে গেছেন। এই দোয়ায় সে হেদায়েত চাইল, ক্ষমা চাইল, রিজিক চাইল। তারপর রুকু, সিজদা। বসে তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ, দোয়া পড়ে ডানে-বাঁয়ে সালাম ফিরিয়ে দিল।
যখন রহিম সিজদায় মাথা রাখল, তখন মনে হল যেন পৃথিবীর সব ভার তার কাঁধ থেকে নেমে যাচ্ছে। ঘুমের টান যতই আসুক, যখন সে দাঁড়াল, তখন সেই টানটা লজ্জা পেয়ে সরে গেল। তৃতীয় রাকাতে কুনুত পড়ার সময় যখন হাত তুলে দোয়া করল, তখন রাতের নীরবতা যেন কথা বলে উঠল। যেন তারাগুলো সাক্ষী হয়ে দাঁড়াল তার এই ছোট্ট আবেদনের। মানুষের ছোটখাটো দুর্বলতা — শরীরের ক্লান্তি, মনের দুশ্চিন্তা — সব যেন মুছে গেল এই মুহূর্তে।
শেষে যখন সালাম ফিরাল, তখন একটা মায়াময় শান্তি নেমে এল তার বুকে। বাইরের অন্ধকারটা আর তেমন ভয়ের রইল না। মনে হল, আল্লাহর রহমতের আলোয় ভরে গেছে চারপাশ। এই তিন রাকাত বিতর নামাজ শুধু একটা ইবাদত নয় — এটা যেন রাতের বুকে লুকিয়ে থাকা একটা গোপন কথোপকথন। রহিমের আর তার রবের মধ্যে।
প্রতি রাতে এই নামাজ পড়লে তার জীবনটা যেন একটু একটু করে নরম হয়ে উঠছে। কারণ এই নামাজ শেখায় — অন্ধকারের পরেও আলো আছে, আর সেই আলোর নাম আল্লাহ।

01/06/2026

রাতের অন্ধকারটা যেন একটা পুরনো চাদরের মতো জড়িয়ে ধরেছে ঘরটাকে। আমি বসে আছি বারান্দায়, একা। বিতরের নামাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। কুনুত পড়ার সময় হঠাৎ মনে হয়েছিল—বিসমিল্লাহ বলব? নাকি সোজা শুরু করব? হাত দুটো যেন কেঁপে উঠল। ছোট্ট একটা সন্দেহ, ঠিক যেমন ছেলেবেলায় ঘুমের মধ্যে কোনো অচেনা শব্দ শুনে চোখ খুলে ফেলতাম।
আমার নাম কামাল। সাধারণ মানুষ। অফিসে চাপ, বাসায় ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, আর রাতে এই একটু নামাজ—এটুকুই আমার শান্তি। কিন্তু আজ কুনুতের সময় মনে হলো, তাশাহুদ, দরূদ শরীফ, দোয়া মাসুরা—এসবের আগেও কি বিসমিল্লাহ বলা উচিত? মনে হলো যেন নামাজের ভেতর একটা ছোট্ট ফাঁক তৈরি হয়েছে। গল্পের মতোই—জীবনটা এমনই, ছোট ছোট প্রশ্ন এসে বসে, আর আমরা হাসি-কান্না মিশিয়ে সেগুলো নিয়ে বসে থাকি।
তারপর মনে পড়ল। কুরআন শরীফে তো স্পষ্ট বলা আছে, কিরাত পড়ার সময় মনোযোগ দিয়ে শোনো আর চুপ থাকো—কিন্তু এই দোয়াগুলোর জন্য আলাদা কোনো নির্দেশ নেই। আর সহীহ হাদীসে? রাসূল (সা.) যেভাবে তাশাহুদ শিখিয়েছেন, সুনান নাসায়ী হাদীস নং ১১৭৫-এ যেমন বলা হয়েছে, সোজা ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়্যিবাতু...’—কোনো বিসমিল্লাহ নয়। কুনুতের কথা তো সহীহ বুখারী হাদীস নং ৯৪৮-এ আনাস (রা.) বলেছেন, রাসূল (সা.) কুনুত পড়তেন, কিন্তু তার আগে বিসমিল্লাহের কোনো উল্লেখ নেই। দরূদ শরীফ আর দোয়া মাসুরা—এগুলোও ঠিক সেভাবেই শেখানো হয়েছে। শুধু সুরা ফাতিহা আর অন্য সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ—এটাই সুন্নাহ। বাকিটা যেন আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, কোনো ফর্মালিটি নয়।
একটু হাসি পেল। আমরা মানুষ তো এমনই—নামাজের মধ্যেও ছোট ছোট জটিলতা তৈরি করে ফেলি। যেন ভয় হয়, একটু ভুল হলে আল্লাহ রাগ করবেন। কিন্তু না। রাসূল (সা.)-এর নামাজটা ছিল এত সহজ, এত মিষ্টি। ঠিক যেমন বৃষ্টির পরের মাটির গন্ধ—কোনো অতিরিক্ত কিছু লাগে না।
নামাজ শেষ করে বাইরে তাকালাম। আকাশটা কালো, কিন্তু তারারা যেন হাসছে। হৃদয়টা হালকা লাগল। জানি, এই ছোট্ট সন্দেহটা আর কখনো কাঁপাবে না। নামাজ তো শুধু শব্দ নয়, সেটা হৃদয়ের খোলা জানালা। আর সেই জানালা দিয়ে যখন আল্লাহর দিকে তাকাই, তখন কোনো ‘বিসমিল্লাহ’ লাগে না—কারণ তিনি তো আগে থেকেই আছেন। শুধু চুপ করে থাকো, আর অনুভব করো। জীবনটা ঠিক এমনই ম্যাজিক—সহজ, সুন্দর, আর একটু অপেক্ষায় ভরা।

01/06/2026

মসজিদের ভেতরটা যেন একটা ছোট্ট জগৎ, শেষ বিকেলের আলোয় ধুলোকণা উড়ছে। ইমাম সাহেবের গলায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ শুনেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। পেছনে দাঁড়িয়ে আছি, হাত বাঁধা, চোখ বুজে। কিন্তু মনটা একদম উড়ু উড়ু। ফাতিহা পড়ব? নাকি চুপ করে শুনব? এই প্রশ্নটা যেন ছোট্ট একটা পোকা, কানের কাছে গুনগুন করছে।
আমার নাম রহিম। সাধারণ মানুষ। অফিসে চাকরি, বাসায় বউ-ছেলে, আর এই মসজিদটা আমার প্রতিদিনের আশ্রয়। আজও জামাতে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু মনটা একটু অস্থির। ছোটবেলায় শিখেছি, নামাজে ফাতিহা না পড়লে নামাজ হয় না। কিন্তু ইমাম যখন জোরে জোরে পড়ছেন, তখন আমি কি সাথে সাথে পড়ব? নাকি চুপ করে শুনব? এই সন্দেহটা যেন জীবনের অনেক ছোট ছোট দুর্বলতার মতোই—হঠাৎ করে এসে বসে, আর ছেড়ে যায় না।
একদিন বাড়িতে বসে চা খেতে খেতে এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল। তখন মনে পড়ল কুরআনের সেই আয়াত। সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ২০৪—‘আর যখন কুরআন পড়া হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমরা রহমত লাভ করো।’ কথাটা যেন সিনেমার মতো সামনে ভেসে উঠল। ইমাম যখন কিরাত পড়ছেন, তখন পুরো জামাতটা একটা ঐক্যের সুরে বাঁধা। সবাই চুপ, সবাই শুনছে। যেন একটা ম্যাজিক—সবার হৃদয় একসাথে দুলছে।
আবার মনে পড়ল রাসূল (সা.)-এর কথা। সহীহ বুখারীতে হাদীস নং ৭১৪-এ আছে, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার নামাজ হয় না।’ স্পষ্ট কথা। ইমাম তো পড়ছেনই। কিন্তু মুক্তাদি? সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ইমামকে অনুসরণ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে—তাই যখন তিনি তাকবীর বলেন, তোমরাও বলো, আর যখন তিনি কিরাত পড়েন, তখন চুপ থাকো।
এই দুই কথার মাঝে দাঁড়িয়ে আমি যেন একটা ছোট্ট নৌকায়। একদিকে ফাতিহার গুরুত্ব, অন্যদিকে জামাতের শান্তি আর ঐক্য। রহিমের মতো হাজারো মানুষের জীবনে এমন ছোট ছোট প্রশ্ন আসে। কখনো হাসি পায়—আমরা কত সহজে জটিল করে ফেলি! কিন্তু সত্যি কথা হলো, নামাজের মধ্যে যে আত্মসমর্পণ, সেটাই আসল। ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে যখন চুপ করে শুনি, তখন মনে হয় আল্লাহর রহমতটা যেন সবার ওপর ছায়া ফেলছে।
সেদিন ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার পর মসজিদের বাইরে এসে আকাশটা কেমন নীল দেখাল। হৃদয়টা হালকা। জানি না সব প্রশ্নের উত্তর পেলাম কি না, কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম—নামাজ তো শুধু শব্দ নয়, সেটা হৃদয়ের সুর। আর সেই সুরে যদি চুপ করে শোনা যায়, তাহলেই হয়তো আসল শান্তি আসে। জীবনটা যেন এমনই—কখনো পড়ো, কখনো শোনো, আর সবসময় আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকো।

31/05/2026

বিকেলের নরম আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে হলুদ হয়ে। চেয়ারে বসে আছেন আব্বু। পা দুটো আর দাঁড়াতে চায় না। বার্ধক্যের এই নির্মম খেলায় শরীরটা যেন বিদ্রোহ করেছে। কিন্তু তাঁর চোখে সেই একই দৃঢ়তা – যেটা আমি ছোটবেলায় দেখতাম মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে। “নামাজের সময় হয়ে গেছে রে বাবা,” বলে তিনি চেয়ারটা কিবলার দিকে ঘুরিয়ে নিলেন।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছি। তিনি তাকবীর বললেন। হাত বাঁধলেন বসা অবস্থাতেই। তারপর রুকুর সময় সামান্য সামনে ঝুঁকে পড়লেন – মাথাটা নিচু। আর সিজদায় মাথাটা আরেকটু নিচু করে দিলেন। যেন চেয়ারটাই তাঁর ছোট্ট মসজিদ হয়ে উঠেছে। শরীর দুর্বল, কিন্তু আত্মাটা একদম জীবন্ত। বাইরে পাখির ডাক, ভেতরে এক অপার্থিব শান্তি।
চোখ খুলে আব্বু হাসলেন। সেই ছেলেমানুষী হাসি। “অবাক হচ্ছিস কেন? আল্লাহ তো আমাদের জন্য সব সহজ করে দিয়েছেন।” তিনি বললেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেছিলেন – যাঁর বোহাসিরের ব্যথা ছিল – ‘দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো। যদি না পারো তাহলে বসে। আর তাও না পারলে পাশ ফিরে শুয়ে।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর ১১১৭)। চেয়ারে বসে বা বিছানায় শুয়েও একই নিয়ম। যতটুকু পারো শরীর ঝুঁকিয়ে রুকু করবে। সিজদায় তার চেয়ে সামান্য বেশি নিচু করবে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আর যদি একদম না পারি?” আব্বু চোখ বন্ধ করে বললেন, “তাহলে অন্তর দিয়ে নিয়ত করবি। কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস’আহা’ – আল্লাহ কোনো প্রাণকে তার সাধ্যের বেশি বোঝা দেন না। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮৬)।”
হালকা হাস্যরস মিশিয়ে তিনি যোগ করলেন, “শরীর বলছে ‘আর উঠব না রে বুড়ো’, আর আমি বলি ‘চুপ কর, নামাজ পড়বি তো!’” আমরা দুজনে হেসে উঠলাম। কিন্তু সেই হাসির মাঝে এক গভীর আবেগ। যেন ঘরের বাতাসটা নূর হয়ে গেছে।
নামাজ শেষ হলো। আব্বুর মুখে একটা আলোর ছোঁয়া। যেন ফেরেশতারা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে। আমি বুঝলাম, দুর্বলতা কখনো লজ্জার নয়। বরং এটাই আল্লাহর রহমতের দরজা। যারা সুস্থ, তারা দাঁড়িয়ে পড়ুক। আর যারা পারে না, তাদের জন্যও পথ খোলা – চেয়ারে, বিছানায়, ইশারায়। শুধু হৃদয়টা যেন জাগ্রত থাকে।
সেই বিকেলে শিখলাম, নামাজ কখনো থেমে যায় না। শুধু তার রূপ বদলায়। আর সেই সংযোগটাই জীবনের সবচেয়ে মোহময় গল্প। আল্লাহ দেখেন অন্তর। আর অন্তরের সেই ছোট্ট ঝুঁকিটাই তো তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সিজদা।

31/05/2026

রাস্তাটা যেন জীবনেরই একটা লম্বা সাপ—পাক খেয়ে খেয়ে চলে গেছে অসীম দিগন্তে। বাসের জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকে পড়ছে রাহাতের চোখে-মুখে, সোনালি ধানের খেতগুলো হেলছে-দুলছে হাওয়ায়, আর তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ফাঁকা ভাব। ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামের পথে। বউ-ছেলে-মেয়েকে ঘরে রেখে অফিসের কাজে বেরিয়েছি, কিন্তু মনটা পিছু টানছে যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয়। হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল—আসরের সময় হয়ে গেছে। আর ঠিক তখনই প্রশ্নটা মাথায় ঝড়ের মতো ঘুরপাক খেতে লাগল: এই লম্বা পথে নামাজটা কি অর্ধেক করে পড়া যায়? নাকি পুরো চার রাকাত?
রাহাতের চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোটবেলার সেই গ্রামের মসজিদ। মৌলভী সাহেবের গলা—“বাবা, আল্লাহ তো আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।” সূরা আন-নিসায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, “যখন তোমরা দেশে-বিদেশে সফর কর, তখন নামাজ কসর করাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।” (সূরা আন-নিসা: ৪:১০১)। কথাটা যেন বুকের ভেতর একটা উষ্ণ আলো জ্বালিয়ে দিল। কিন্তু কত দূর গেলে এই ছাড় পাওয়া যায়? সফর মানে কি শুধু কিলোমিটার, নাকি মনেরও একটা যাত্রা?
বাসটা একটা ছোট গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পাশের সিটে বসা বয়স্ক ভদ্রলোক—চোখে চশমা, মাথায় সাদা টুপি—যেন আমার মনের কথা পড়ে ফেললেন। হাসলেন একটু, বললেন, “বাবা, চিন্তা কোরো না। রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহই তো আমাদের পথ দেখায়।” তিনি বললেন, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসূলুল্লাহ (সা.) তিন মাইল বা তিন ফারসাখ দূরত্বের সফরে বের হলে চার রাকাতের নামাজ দুই রাকাত করে পড়তেন (আবু দাউদ: ১২০১)। আর ইবনে উমর (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) চার বুরুদ—অর্থাৎ প্রায় ৭৮ কিলোমিটার বা ৪৮ মাইল দূরত্বে গেলে নামাজ কসর করতেন এবং রোজা ভাঙতেন (সহীহ বুখারী, অধ্যায়: নামাজ কসর)। বিদ্বানদের মতে এটাই সাধারণত মুসাফিরের সীমা। যদি নিয়ত থাকে যে সেখানে পনেরো দিনের বেশি থাকব না, তাহলে পুরো সফরকালীন সময়টা এই সহজতা পাওয়া যায়।
রাহাতের ঠোঁটে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল। ভাবল, কতবার তো অফিসের কাজে ৫০-৬০ কিলোমিটার গিয়েই ভেবেছি, ‘আজ কসর করব’—কিন্তু মনটা বলেছে, ‘না রে, এটা তো সফরই হয়নি!’ ছোট ছোট দুর্বলতা তো মানুষের। একবার তো ভুলে যোহরের চার রাকাত শুরু করে দিয়েছিলাম, শেষে লজ্জায় মুখ লাল। কিন্তু আল্লাহ তো জানেন আমাদের এই অসহায়তা। এই ছাড়টা যেন তাঁর অসীম দয়ার একটা নরম হাত—পথের ক্লান্তিতে, অজানা ভয়ে মানুষ যেন না ভেঙে পড়ে।
বাসটা থামল একটা ছোট মসজিদের সামনে। রাহাত নেমে পড়ল। আসরের আযান ভেসে আসছে দূর থেকে। সেই বয়স্ক ভদ্রলোকও নামলেন। দুজনে মিলে দাঁড়ালাম জায়নামাজে। দুই রাকাতেই শেষ। কিন্তু মনে হল, এই দুই রাকাত যেন চার রাকাতের চেয়েও অনেক বেশি ভারী—প্রশান্তিতে ভরপুর। সূর্য ডুবছে পশ্চিমে, আকাশ লাল-কমলায় রাঙা। খেতের ওপর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, যেন আল্লাহ নিজে ফিসফিস করে বলছেন, “ভয় নেই বাবা, আমি তোমার সাথে আছি।”
সফর তো শুধু ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম নয়। জীবনটাই একটা অবিরাম যাত্রা। কখনো দূরের পথে, কখনো মনের গভীর অরণ্যে। আর এই ছোট ছোট ছাড়গুলোই যেন মনে করিয়ে দেয়—আমরা দুর্বল, কিন্তু তিনি অসীম করুণাময়। বাসে উঠল রাহাত আবার। এবার মনটা হালকা, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তার কাঁধে হাত রেখে বলছে, “চল, আমি তোমাকে পৌঁছে দেব।” পথ এখনো অনেক দূর, কিন্তু হৃদয়ে একটা ম্যাজিকাল শান্তি—যেন সূর্যাস্তের লাল আলোয় মিশে গেছে সব দুশ্চিন্তা।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Address


Dhaka
1204