02/06/2026
বিকেলের আলো যখন মসজিদের উঠোনে এসে পড়েছিল, তখন রহিম দাঁড়িয়ে ছিল নামাজে। তার সামনে একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চ। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল আস্তে আস্তে। সে রুকুতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা ছেলে — স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে, হয়তো বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে বলে ছুটছে — হঠাৎ তার সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
রহিমের বুকটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, যেন কেউ তার আর আল্লাহর মাঝখানে একটা হালকা পর্দা টেনে দিল। নামাজ শেষ করে সে উঠে বসল। কিন্তু মনটা শান্ত হলো না। বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছিল — নামাজটা কি ভেঙে গেছে?
সারা সন্ধ্যা সে অস্থির থাকল। খাওয়া-দাওয়া করল, কথা বলল, কিন্তু ভেতরটা যেন একটা ছোট্ট পাথর বয়ে বেড়াচ্ছিল। পরের দিন সকালে মসজিদে গিয়ে সে পুরনো হুজুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হুজুর চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, তারপর হাসলেন।
“কী হয়েছে বাবা?”
রহিম সব খুলে বলল। হুজুর চুপ করে শুনলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, “না রে, নামাজ ভাঙে না। আল্লাহর রহমতে নামাজ ঠিকই থেকে যায়। তবে যে সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, তার জন্য একটা বড় কথা আছে।”
তিনি একটু থেমে বললেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন — যে ব্যক্তি নামাজির সামনে দিয়ে যায়, সে যদি জানত তার উপর কত বড় গুনাহের বোঝা, তাহলে সে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু সামনে দিয়ে যেত না।” (সহীহ বুখারী ৫১০, সহীহ মুসলিম)
রহিম চুপ করে রইল। হুজুর আবার বললেন, “এই হাদীস শুনে মনে হয়, নামাজ আসলে কত নরম, কত পবিত্র একটা জিনিস। আল্লাহর সাথে বান্দার যখন কথা হয়, তখন যেন চারপাশটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়। নবীজি (সা.) চেয়েছিলেন, কেউ যেন সেই মুহূর্তটাকে অসম্মান না করে।”
রহিম জিজ্ঞেস করল, “তাহলে সামনে কিছু রাখার কথা বলা হয় কেন, হুজুর?”
“সেটা সুতরাহ। একটা আড়াল। লাঠি, ব্যাগ, দেওয়াল — যা-ই হোক। যাতে পথচারী বুঝতে পারে, এখানে কেউ আল্লাহর সাথে কথা বলছে। আয়েশা রাধিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, নবীজি নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তিনি সামনে শুয়ে ছিলেন — তবু নামাজ ভাঙেনি। মানে, নামাজ ভাঙার কথা না। তবে অযথা বাধা দেওয়া উচিত না। কুরআনেও বলা হয়েছে, মুমিনরা তাদের নামাজে বিনয়ী হয় (সূরা আল-মুমিনুন ২৩:২)। সেই বিনয়টাকে রক্ষা করাও একটা ইবাদত।”
রহিমের মনটা হালকা হয়ে এল। সে ভাবল, ছেলেটা হয়তো জানতই না। হয়তো তার মা ডেকেছে, অথবা বাস মিস হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ জীবনের তাড়া। কিন্তু এখন থেকে সে নিজেও খেয়াল রাখবে। নামাজের সময় মসজিদের আশেপাশে কাউকে দেখলে অন্য পথে যাবে।
সন্ধ্যা নামিয়ে এল। মসজিদের বারান্দায় বসে রহিম ভাবল — আল্লাহ আমাদের নামাজ দিয়েছেন একটা নির্জন, নরম মুহূর্ত। সেই মুহূর্তটাকে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব। হয়তো এই ছোট্ট সতর্কবাণীগুলোই আমাদের হৃদয়কে একটু বেশি নরম করে দেয়। আরেকজনের আল্লাহর সাথে কথা বলার সময়টাকে সম্মান করতে শেখায়।
আর সেই সম্মানটুকুই হয়তো আসল ইবাদতের অংশ।