09/04/2024
মাদানি নেসাবে কেন ভর্তি হবেন?
কোথায় ভর্তি হবেন?
হিফজ যারা শেষ করে কিতাব বিভাগে ভর্তি হবেন তাদের জন্য এই দুটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরী। বিশেষত যারা মাদানি নেসাবে ভর্তি হবেন তাদের জন্য। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কিছু কথা বলি-
যে কোন কাজের একটা উদ্দেশ্য থাকে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার না থাকলে ঐ কাজে সফলতা আসে না।
হেফজখানায় যদি কেউ ভর্তি হওয়ার সময় ভাবে কোথায় বাংলা-অংক-ইংরেজি ভালো পড়ানো হয় সেখানে আমি ভর্তি হবো তাহলে তার হিফজুল কুরআনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
এর অর্থ কি এই যে জেনারেল বিষয় গুরুত্ব নেই? না, বরং অবশ্যই গুরুত্ব আছে। কিন্তু হিফজ করার সময় হিফজের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি জেনারেল বিষয় যতটুকু না হলেই নয় ততটুকু চলতে পারে।
কারণ হিফজ করাটা সাধারণ ব্যাপার নয়। রাতদিন পাগলের মত পড়েও কুরআন মুখস্থ হয় না, হলেও থাকে না। সেখানে যদি জেনারেল বিষয়ের চাপ থাকে তাহলে কি সম্ভব হিফজ করা?
কিন্তু কিছু অভিভাবক হেফজখানায় ভর্তি করাতে এসে হিফজের মান কেমন? হিফজ কতদিনে করতে পারবে? হিফজের ইয়াদ ভালো থাকবে কীভাবে? হিফজ সংক্রান্ত এমন কত জরুরী বিষয় আছে সেগুলো জিজ্ঞেস না করে সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করবে বাংলা অংক ইংরেজি আপনারা পড়ান কি না? কতক্ষণ পড়ান? কোন ক্লাসের বই পড়ান? বোর্ড বই নাকি অন্য বই? কিছু ইংলিশ স্পোকেন শেখান কি না? ইত্যাদি।
তখন যতই যুক্তি-প্রমাণ আপনি দেন না কেন ঐ অভিভাবকের মনঃপুত হয় না। দৌড় দেন আলিয়ার হেফজখানায়। তারপর কী হয় তা নাই বললাম।
আসলে হেফজখানায় ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য ও হিফজের ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার নয়।
একই ঘটনা দেখা যায় ইদানিং মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে। মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য কী? ইংরেজি শেখা? ইংরেজি তো আরবি শেখার সহায়কও নয়! আরবি শেখার সহায়ক হল বাংলাভাষা।
আজ আট বছর যাবত এসো আরবি শিখি পড়াই। এসো আরবি শিখি পড়ানোর জন্য কয়েকবার আমি প্রশিক্ষণও নিয়েছিলাম। তো আজ থেকে সাত আট বছর আগে -এসো আরবি শিখি কিতাব পড়ানোর প্রাথমিক জীবনে- ইংরেজিও পড়াতাম। নিজেই শীট তৈরি করে প্রথমে দ্বিতীয় বর্ষে, তারপরের বছর তৃতীয় বর্ষে, তারপরে চতুর্থ বর্ষে পড়িয়েছিলাম। তারপর বন্ধ করে দিয়েছিলাম বা যে কোন কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে।
তখন আমার যে উপলব্ধি হল, আরবি শেখার চেয়ে ইংরেজি শেখার প্রতি ছাত্রদের প্রচুর আগ্রহ। আরবির জন্য জোর করে তামরিনে বসাতে হয় আর ইংরেজির জন্য নিজ আগ্রহে তামরিন (অনুশীলন) করতে থাকে, এমনকি অন্যান্য পড়া বাদ দিয়ে। ইন্নালিল্লাহ!
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্ররা যখন আরবি বাক্যের কাঠামো নিয়ে চিন্তা করবে, তারকিব শিখবে, কাওয়ালিব অনুশীলন করবে, আরবি রোজনামচা লিখবে, মাকালা লিখবে, আরবিতে কথা বলবে তখন তারা ইংরেজি নিয়ে ব্যস্ত। কী সর্বনাশ!
কোন কোন ছাত্র এসে বলল, হুজুর ইংরেজি তামরিন করতে গিয়ে আরবি তামরিন ভুলে যাচ্ছি।আরবি বলতে গিয়ে মুখে ইংরেজি চলে আসে। কী ভয়ানক ব্যাপার!
কারণ কী? কারণ হল ইংরেজির ব্যবহার বেশি হচ্ছে। আরবির অনুশীলন হচ্ছে কম। আরবি কঠিন ও ইংরেজি সহজ। আরবি বললে কেউ ফিরে তাকায় না, মূল্য দেয় না, কিন্তু ইংরেজি বললে সবাই বাহবা দেয়!
ওই বছরই আমি ইংরেজি পড়ানো বন্ধ করে দিলাম। আবার কখনও হয়ত চালু করবো। আমার ঐ ছাত্ররা এখন মেশকাত দাওরায় আছে। এখন প্রতি বছরই নিচের ছাত্ররা অনেকে এসে অনুরোধ করে, হুজুর আবার ইংরেজি শুরু করুন।
আমার ঐ শীট এখন পূর্ণ বই হয়ে পড়ে আছে কম্পিউটারে। ঐ শীট পড়ে এমন ছাত্রও ইংরেজি শিখেছে যে ছাত্র জীবনের প্রথম ইংরেজি পড়া শুরু করেছিল ঐ শীট দিয়েই। কিন্তু কেন জানি ভেতর থেকে আগ্রহ পাই না ইংরেজি পড়াতে। সত্য হল, যখনই ঐ চিত্রটা মনে পড়ে যে ছাত্ররা আলেম হতে এসে আরবি বাদ দিয়ে ইংরেজি তামরিন করছে তখন আমার সামান্যও ইচ্ছা জাগে না। এটা আমি কল্পনাতেও বরদাশত করতে পারি না।
তবে ইচ্ছা আছে ইংরেজি শুরু করবো। কিন্তু মাদানি নেসাবের প্রথম তিন বছর ইংরেজি ভাষা কখনোই না। কারণ এই তিন বছর আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের বছর। ইংলিশ শিখতে ছয় মাসই যথেষ্ট। আমি মনে করি, ইংরেজি শেখার সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে ইংরেজি শিখবে আরবি শেখার সময় সবকিছু ভুলে শুধু আরবি শিখবে। হজরত আবুল হাসান আলী নদভি রহ. এমনই করেছিলেন।
আরবি না শিখে আলেম হওয়া যায় না। সম্ভবও নয়। কিন্তু ইংরেজি না শিখে আলেম হতে অসুবিধা নেই। এখনও বিজ্ঞ ও দেশসেরা অনেক আলেম আছেন যারা হয়ত ইংরেজি জানেন না। অথচ ইংরেজি জানা লোকেরা তাদের মত হওয়ার সাহসও করে না!
আমি ইংরেজি শেখার বিরুদ্ধে বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, আগে আরবি পরিপূর্ণ শেখে তারপর ইংরেজি শিখতে। অন্যথায় জগাখিচুড়ী হবে। ফার্সি আর উর্দুর গেঞ্জামে যেমন আরবি শেখা হয় না। ফলে মাদানি নেসাব সৃষ্টি হয়ে বাংলার মাধ্যমে আরবি শেখার পথ সহজ করেছে।
এখন যদি মাদানি নেসাবেই ডাকঢোল পিটিয়ে ইংরেজি শুরু হয় তাহলে এটা ঐ ফার্সির স্থান দখল করে আরবিকে গুরুত্বহীন করে দেবে, বৈকি। যতদূর জানি, মাদরাসাতুল মাদিনায় এখনও ইংরেজি নেই।
মধ্যম মেধার ছাত্রদের জন্য তো কিছুতেই উচিত নয় প্রথম তিন বছর অন্য কিছু পড়া। কিন্তু ছাত্র ও অভিভাবকরা এটা বুঝতে চায় না।
তারা ভর্তির সময় বলবে, আমার ছেলে যেন অমুক শায়খের মত ইংরেজি বলতে পারে। তমুকের মত যেন ইংরেজিতে ওয়াজ করতে পারে। তখন যতই বুঝানোর চেষ্টা করি যে দেখেন আলেমকে আগে ইলম অর্জনের ভাষা শিখতে হবে, তারপর ইলম বিতরণের ভাষা শিখবে। ইংলিশ দিয়ে ইলম বিতরণ করবে আর আরবি দিয়ে ইলম অর্জন করবে। অর্জন না থাকলে বিতরণ কী করবে? তাই আগে আরবি। আরবি মানে সাধারণ আরবি নয়, সাহিত্য মানের আরবি। এটার জন্য প্রচুর সময়, শ্রম, মেধা ও মনযোগ দরকার। একসঙ্গে সব চাইলে সব হারাতে হবে, কিছুই হবে না।
কিন্তু ছাত্র বলেন আর অভিভাবক বলেন , কেউ এই কথা শুনবে না। ইংলিশ শেখার কি টেবলেট যে খেয়ে আসে আল্লাহই জানেন, এই ধরনের লোকেরা কোন কথাই শুনবে না। ইংলিশ শেখার চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে দৌড় দেবেই। তখন কী হয়???
তখন আরবি শেখাটা মাঠে মারা যায়। আরবি শেখার স্বাদ, আরবির প্রতি আগ্রহ, আরবির জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম, আরবির প্রতি ভালোবাসা, কোন কিছুই আর হয় না। এভাবে মাদানি নেসাবে পড়ার উদ্দেশ্যের মৃত্যু হয়। মাদানি নেসাবে পড়েও যদি আরবির প্রতি ভালোবাসা তৈরি না হয় তাহলে তো মাদানি নেসাবে পড়ার উদ্দেশ্যের মৃত্যুই হল।
মনে রাখবেন, মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে আরবি শেখা, ইংরেজি শেখা নয়। আদব-কায়দা, আমল-আখলাক এগুলো তো জরুরিয়্যাতে ইলম বা ইলম অর্জনের অনিবার্য বিষয়। এগুলো তো শিখবেই। এগুলো না থাকলে তো ইলম মূল্যহীন।
সাথে সাথে আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা হল মাদানি নেসাবের প্রধান উদ্দেশ্য। আর এই উদ্দেশ্য অর্জন করার প্রথম ধাপ হল প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় ধাপ দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় ধাপ তৃতীয় বর্ষ। (যদিও আজকাল তিন বছরেও যেন প্রথম ধাপই পার হয় না।) তাই এই সময় অন্য ভাষার অতিরিক্ত চাপ অবশ্যই আরবি ভাষা শেখায় ক্ষতি বয়ে আনবে।
একটা ছাত্র ইংরেজি রিডিং পড়তে পারলে ও বুঝতে পারলে যথেষ্ট। আর এইটুকু যোগ্যতা বেফাকের সাধারণ বই দিয়ে সাধারণ ক্লাস নিলেই হয়ে যায়। অতিরিক্ত দরকার নেই।
পক্ষান্তরে দরকার হল বাংলাভাষা শেখার। অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই আরবির পাশাপাশি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রতি মনোযোগী হওয়া। কারণ ভালো আরবি শিখতে হলে অবশ্যই ভালো বাংলা জানা আবশ্যক। এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। মাতৃভাষায় দুর্বল থেকে কেউ ভালো আরবি শিখতে পারবে না। তাছাড়া বাংলাভাষা না জেনে মাদানি নেসাবের কিতাবাদি থেকে পরিপূর্ণ উপকৃত হওয়াও সম্ভব নয়। গ্রামগঞ্জের এমন অনেক ছাত্র আসে যারা প্রথম বর্ষের আততামরিনুল কিতাবির বাংলা বাক্যগুলো ঠিকভাবে বুঝে না। ফলে ঐ বাক্যগুলোর মত বাক্য নিজ থেকে তৈরি অনুশীলন করতে পারে না।
কিন্তু ছাত্ররা কেউ বাংলা শেখার প্রতি আগ্রহবোধ করে না। মনে করে, আমি বাংলায় কথা বলছি, তার মানে তো আমি বাংলাভাষা জানিই!
অথচ তার জন্য যে বাংলাভাষার বাক্যের কাঠামো, কলাকৌশল, বাকরীতি, উপমা, উদাহরণ, লেখালেখি ইত্যাদি শেখা দরকার যাতে আরবিভাষা শেখার সময় সেগুলো প্রয়োগ করতে পারে, তুলনা করে বুঝতে পারে- এদিকে কোন খেয়াল নেই। সচরাচর মাদানি নেসাবের মাদরাসাগুলোতেও এই বিষয়ে যথাযথ গুরুত্বারোপ করতে দেখা যায় না।
ভালো বাংলা না জানলে আরবি ভাষা যতই শেখা হোক হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে না।
যাইহোক, সবশেষে বলবো, যারা মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা করছো তোমাদেরকে স্বাগতম। তবে তোমরা আরবি শেখার মহান উদ্দেশ্য সামনে রেখেই ভর্তি হও। যেখানে আরবি ভাষা শেখানোর অভিজ্ঞ শিক্ষক আছেন, মমতা দিয়ে আরবি শেখান, আরবির প্রতি তোমার হৃদয়ে ভালোবাসা তৈরি করেন সেখানে ভর্তি হও। তাহলে তোমাদের মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়া সার্থক হবে। ইনশাআল্লাহ।
ইংরেজি তুমি পরেও শিখতে পারবে, কিন্তু আরবি শেখার সময়টা হারিয়ে গেলে আরবি শেখার ধৈর্য আর হবে না। তখন "আলেম হওয়া" উদ্দেশ্যটা ফওত হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।