11/12/2025
ভর্তির সিজনে অনেকেই একটা পরামর্শ চেয়ে ফি বছর মেসেজ দিয়ে থাকেন- বাচ্চাকে ইসলামিক স্কুলে পড়াবো, না মাদ্রাসায়??
এটার একটা সহজ উত্তর আমি প্রথম পেয়েছিলাম উস্তাদ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক এর একটা বক্তব্যে। এরপর আরও নানা বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝেছি, তার সামারিটাই বলছি, ইনশাআল্লাহ।
প্যারেন্ট হিসেবে আমাদের প্রথমেই গোল ফিক্স করতে হবে- আমি আমার বাচ্চাকে কী বানাতে চাই?
বাচ্চাকে যদি হাফেয বা আলেম বানাতে চান, তাহলে তাকে মাদ্রাসায়ই পড়াতে হবে৷ এখানে মাদ্রাসার কোন বিকল্প নেই।
বিপরীতে বাচ্চাকে যদি দ্বীনি বুঝওয়ালা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যারিস্টার ইত্যাদি.... অর্থাৎ জেনারেল শিক্ষিত দ্বীনদার বানাতে চান, তাহলে তাকে ইসলামিক স্কুলে দিতে পারেন। দ্বীনের ভালো বুঝ ও চর্চা থাকলে সে দা'ঈও হতে পারবে।
এই হচ্ছে ক্লিয়ারকাট রাস্তা। এমন অনেক গার্ডিয়ান দেখেছি, যারা ইসলামিক স্কুলে কিছুদূর পড়ানোর পর মাঝপথে এসে খেই হারিয়ে ফেলেন, বাচ্চাকে এরপর কোথায় পড়াবেন?
এটা ইসলামিক স্কুলের একটা কমন সমস্যা। এই স্কুলিং সিস্টেমের কিছু নেগেটিভ দিক আছে, যেটা জেনে বুঝেই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এগুলোর সদুত্তর আসলেই নেই, কেউ যদি সদুত্তর দিয়েও থাকে, তাহলে তা ভুজুংভাজুং ছাড়া কিছু নয়। সেগুলো হচ্ছে,
— ইসলামিক স্কুলগুলো সাধারণত ক্লাস ফাইভ বা সর্বোচ্চ এইট পর্যন্ত হয়। তো আপনার বাচ্চাকে ঐ পর্যন্ত তারা সাপোর্ট দিতে পারবে৷ কিন্তু ক্লাস ফাইভ বা এইটের পর আপনি বাচ্চাকে কোথায় পড়াবেন, কী পড়াবেন, এই প্ল্যান আপনাকে আগেই করে রাখতে হবে। তো এই প্ল্যানিংয়ে কোন ইসলামিক ওয়ে নেই। ক্লাস ফাইভ বা এইট পর্যন্ত ইসলামিক স্কুলে পড়ার পর এরপর আপনাকে জেনারেল স্কুলেই দিতে হবে, এটাই একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান। কারণ ইসলামি স্কুলগুলোতে ক্লাস টেন বা SSC দেয়ার সুযোগ খুব কম৷ আর কলেজ? বাংলাদেশে অদ্যাবধি কোন ইসলামি কলেজ নেই৷ সুতরাং আপনাকে জেনারেল কলেজেই দিতে হবে। অর্থাৎ এতদিন সে যেমন একটা ইসলামি পরিবেশে পড়ে এসেছে, হুট করেই তাকে ওখান থেকে একটা সাধারণ পরিবেশে গিয়ে কোপ আপ করে নিতে হবে৷ সেখানে গিয়ে দ্বীন প্র্যাক্টিস ধরে রাখার জন্য সেইভাবে প্ল্যান-প্রোগ্রাম সেট করতে হবে।
— ইসলামিক স্কুলের আরেকটা নেগেটিভ সাইড হচ্ছে, হিফজ সিস্টেম। হিফয মাদ্রাসাগুলোতে যেখানে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা কুরআন পড়ানো হয়; সেই জায়গাতে একটা ইসলামিক স্কুলে হিফযের জন্য স্কুলবিশেষ হিফজের জন্য সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ৩-৪ ঘণ্টা বরাদ্দ থাকে। পাশাপাশি বাচ্চার মাথায় থাকে অনেকগুলো জেনারেল সাবজেক্ট পড়ার লোড। এ কারণে ক্বওমী/হিফজ মাদ্রাসায় যে হিফয শেষ করতে ২-৪ বছর লাগে, সেটাই ইসলামিক স্কুলে লাগে ৮-৯ বছর। এই লম্বা একটা সময় কুরআন হিফজের আগ্রহ ধরে রাখতে গিয়ে অল্পকিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগই মাঝপথে হিফজ ছেড়ে দেয়৷ এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে।
— অনেক স্কুল বলে থাকে, ইসলামিক স্কুল থেকে আলেম বানিয়ে দেবে। এটাও আরেক শুভঙ্করের ফাকি। আলেম হওয়ার জন্য যে ধারায় পড়া লাগে, যে কিতাবগুলো পড়াতে হয়, এগুলো ইসলামিক স্কুলে বাংলা, ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞান ইত্যাদি সাবজেক্টের হিউজ লোডের সাথে একই ধারায় পড়ানো খুব কঠিন, এমন সিলেবাস বাংলাদেশের কোন স্কুলে আছে বলেও অদ্যাবধি দেখিনি।
বাচ্চাকে ইসলামিক স্কুলে পড়াতে হলে এই বড় ৩ টি সমস্যার কথা মাথায় রেখেই পড়াতে হবে। এই গোল ফিক্স রেখেই পড়াতে হবে যে, একটা বাচ্চা এভাবে জেনারেল শিক্ষিত দ্বীনদার বা জেনারেল দা'ঈ হতে পারবে, তবে আলেম হতে পারবেনা। হাফেজ হতে পারলেও তার জন্য প্রচুর অধ্যবসায় ও সবর রাখতে হবে, নচেৎ লম্বা একটা সময় হিফযের আগ্রহ ধরে রাখতে পারবেনা। তবে বেসিকে দ্বীনের যে গাথুনি হবে, তা দিয়েও আল্লাহ চাইলে বাকি জীবন দ্বীনের পথে থাকার চেষ্টা করতে পারবে।
এবার আসি মাদ্রাসা সিস্টেমে। আলিয়া মাদ্রাসার লাইনে যাচ্ছিনা, আলিয়া মাদ্রাসাও ইসলামিক স্কুলেরই আরেকটা ভার্শন বলা যায়। বলতে চাচ্ছি, ক্বওমী মাদ্রাসার কথা। বাচ্চাকে ক্বওমী মাদ্রাসায় পড়ানো হলে সে প্রথম ৩-৪ বছরে হিফয শেষ করবে। এরপর কিতাবখানায় ভর্তি হবে। কিতাবখানায় ৭-৮ বছরের মধ্যে দাওরা হাদিস শেষ হবে, অর্থাৎ আলেম হয়ে যাবে। এরপর তাখাসসুস অর্থাৎ স্পেশালাইজেশন করতে চাইলে, যেমন- মুফতি (ফতোয়া বিশারদ), মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) ইত্যাদি হতে চাইলে আরও ১-৩ বছর পড়তে হবে। মোটামুটি ১১-১৫ বছরের একটা চেইন সিস্টেম করা আছে, যেই সিস্টেমে আগানো হলে একটা বাচ্চা হাফেজ, আলেম, মুফতি/মুহাদ্দিস পর্যন্ত যেতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
মাদ্রাসা লাইনের এই চেইন সিস্টেমটা সুন্দর, মাঝপথে গিয়ে ধাক্কা খাওয়ার ভয় নেই, যে এখন বাচ্চাকে কোথায় পড়াবো? তবে, মাদ্রাসা সিস্টেমও সমস্যামুক্ত নয়। সেগুলো এরকম,
— পরিবেশ। আমরা জেনারেল শিক্ষিতরা বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য যেমন সুন্দর একটা পরিবেশ চাই, এমন পরিবেশ ইসলামিক স্কুলে কমন হলেও মাদ্রাসার দৃশ্যটা বিপরীত। যেকোন এলাকার অধিকাংশ মাদ্রাসার পরিবেশই আমাদের পছন্দ হবেনা। আশার বিষয় হচ্ছে, সুন্দর পরিবেশওয়ালা মাদ্রাসা এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে, হয়েছেও। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপ্রতুল। একটা ভালো পরিবেশের মানসম্মত মাদ্রাসা খুজে বের করতে আপনাকে প্রচুর বেগ পোহাতে হবে।
— যেহেতু মাদ্রাসা লাইনের পড়াটাই ইসলামের উপর বিশেষায়িত পড়াশোনা, এ কারণে জেনারেল সাবজেক্টগুলোর উপর স্বাভাবিকভাবেই কম প্রেশার থাকে। ফলে একটা বাচ্চাকে অংক, ইংরেজিতে দক্ষ করতে চাইলে বা বিজ্ঞান শেখাতে চাইলে সেই বিষয়ে আপনাকে পার্সোনাল ইফোর্ট দিতে হবে। আলাদাভাবে বাচ্চাকে অন্য কোথাও বা ঘরে পড়িয়ে ব্যাকাপ দিতে হবে। নচেৎ ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞান এগুলোতে দুর্বল থেকে যাবে। থাকাটাও স্বাভাবিক, যেহেতু তারা আরবি ও ইসলাম বিষয়ে দক্ষ হচ্ছে, অন্য বিষয়ে গ্যাপ থাকাটা অস্বাভাবিক না। যদিও এখন মাদ্রাসাগুলোতে এসব বিষয় মডিফাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তারপরও বাস্তবে সেরকম অগ্রগতির খবর আমরা পাইনা।
সংগৃহীত