23/08/2026
জীবিকার সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটছে। ভালো একটি চাকরি বা ব্যবসার জন্য আমরা কত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করি, নিত্যনতুন স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স করি এবং বিভিন্ন আধুনিক কৌশল আয়ত্ত করার চেষ্টা করি। এই বৈষয়িক চেষ্টা বা মেহনত অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে এটিও এক ধরণের ইবাদত। কিন্তু জাগতিক কৌশলের ভিড়ে আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাই—রিযিকের মূল চাবিকাঠি ও প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।
উপায়-উপকরণের পেছনে দৌড়ানোর পাশাপাশি আমরা যদি রিযিকের মূল উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক না গড়ি, তবে অনেক পরিশ্রমেও জীবনে শান্তি ও বরকত অধরাই থেকে যায়। পবিত্র কুরআন আমাদের এমন কিছু আত্মিক ও বাস্তব আমলের পথ দেখায়, যা মানুষের জীবনে রিযিকের প্রাচুর্য ও বরকত ডেকে আনে।
১. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া
তাকওয়া হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সংকট থেকে) উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
—(সূরা আত-তালাক: ২–৩)
যখন কোনো বান্দা হারাম ইনকাম বা অসৎ পথ ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল পথে টিকে থাকে, তখন আল্লাহ তার পার্থিব সংকট সহজ করে দেন। জাগতিক হিসাব-নিকাশ যেখানে শেষ হয়ে যায়, সেখান থেকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতের অপ্রত্যাশিত দুয়ার উন্মুক্ত হয়।
২. আন্তরিক ইস্তিগফার ও তওবা
গুনাহ ও পাপাচার মানুষের রিযিকের বরকত কেড়ে নেয়। তাই নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা অন্তরকে পরিষ্কার করে এবং আল্লাহর দয়া আকর্ষণ করে। নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ...
“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন...”
—(সূরা নূহ: ১০–১২)
ইস্তিগফার শুধু জিহ্বা দিয়ে কিছু শব্দ উচ্চারণ করার নাম নয়; বরং তা হলো ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হৃদয়ে গুনাহ ত্যাগ করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। বান্দা যখন নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আন্তরিকভাবে তওবা করে, তখন আসমান থেকে রহমতের দুয়ার খুলে যায়।
৩. শোকরগোযারি বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
প্রাপ্ত নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তা আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে ব্যবহার করাই হলো শোকর। আল্লাহ তাআলা অঙ্গীকার করেছেন—
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।”
—(সূরা ইবরাহিম: ৭)
আমাদের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে সবসময় অতৃপ্তির হাহাকার করলে মনের দারিদ্র্য কখনো দূর হয় না। পক্ষান্তরে অল্পতেই আল্লাহর প্রশংসা করলে ও অন্তরে শুকরিয়া পোষণ করলে আল্লাহ বর্তমান নিয়ামতে এমন বরকত দেন, যা বান্দাকে প্রশান্ত ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
৪. আল্লাহর পথে ব্যয় ও দান-সদকা
পার্থিব হিসাবে মনে হতে পারে টাকা দান করলে সম্পদ কমে যায়। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا أَنفَقْتُم مِّن شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ
“তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে (উত্তম কিছু) দান করবেন।”
—(সূরা সাবা: ৩৯)
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ালে ধন-সম্পদে পবিত্রতা আসে। আল্লাহ সেই দানের বিপরীতে কখনো সম্পদে বহুগুণ বরকত দান করেন, কখনো বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন, আবার কখনো হৃদয়ে অপার আত্মতৃপ্তি দান করেন।
রিযিক বৃদ্ধি মানে কেবল ব্যাংক ব্যালেন্সের সংখ্যা বাড়া নয়; রিযিকের প্রকৃত রূপ হলো অন্তরের প্রশান্তি, হালাল আয়ে সন্তুষ্টি এবং যা আছে তাতে আল্লাহর বরকত থাকা। আসুন, বৈষয়িক চেষ্টার পাশাপাশি নিজেদের জীবনকে সাজাই তাকওয়া, ইস্তিগফার, শুকরিয়া এবং দানের আলোয়।
কর্ম করুন দৃঢ়তার সাথে, আর আশা ও ভরসা রাখুন একমাত্র রাব্বুল আলামিনের ওপর—কারণ তিনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।