20/02/2023
ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস :
বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের একটি প্রধান ঘটনা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এই ধরনের আন্দোলন আমাদের দেশে আরো কিছু হয়েছে। চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্ন সালে সামরিক শাসন, বাষট্টি সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মূলত বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে তারই পরিণতি আসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষা বাংলার জন্যে বিক্ষোভ-আন্দোলন ও প্রাণদান পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে ঘটনা ঘটেছিল তা প্রতিটি বাঙালি হৃদয়কেই রক্তাক্ত করে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিক্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তারিখে পাকিস্থান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
পূর্ব বাংলায় মুসলমানরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই পূর্ব বাংলাকে পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি চরম অবজ্ঞা পোষণ করে সেদিন বাঙালির হাতে যে নতুন শিকল পরানো হয় তার পরিণাম হয় মারাত্মক। পাকিস্থানের নব্য উপনিবেশবাদী, ক্ষমতালিপ্সু, উদ্ধত শাসকরা শুরু থেকে এদেশের মানুষের উপর অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার চালাতে থাকে। প্রথমেই তারা ফন্দিআঁটে কিভাবে এদেশের সাধারণ গণ-মানুষের মুখের ভাষাকে কেড়ে নেওয়া যায়। পূর্ব বাংলার মানুষকে তাঁবেদার করে বশে রাখার জন্য তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাঙালিদের ঘাড়ে পাকিস্তানি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার নীল নকশা রচনা করে। পাকিস্থানের রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে এক সমাবেশে ঘোষণা করেন উরদুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা, কিন্তু এদেশের দামাল ছাত্র-যুবকরা সে সমাবেশেই নব.’ধ্বনি তুলে তার সে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণার সমুচিত জবাব দেয়। প্রতিবাদের ভাষা ও এর ব্যাপকতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। পাকিস্তানি সরকার সকল প্রতিবাদকে পাশবিক শক্তি দ্বারা দমনের চেষ্টা চালায়। তাদের একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামে লিপ্ত হয় এদেশের আপামর মানুষ। এদেশের দামাল ছেলেরা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বজ্রকঠিন শপথ গ্রহণ করে। পূর্ব বাংলায় সর্বত্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের। আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়ায় এদেশের ছাত্র ও যুবসমাজ। একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রতিবাদ সভা এবং মিছিল হবে তা আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো। পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জন্যে সরকার একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা আইন জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা গোপন বৈঠক করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যেমন করে হোক তারা ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করবেই। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আহূত হয় ছাত্রদের প্রতিবাদ সমাবেশ। সমাবেশ শেষে তারা মিছিল বের করে। সেদিন ছাত্র সমাজের প্রতিবাদী কণ্ঠে ধ্বনিত হয় স্বাধিকারের দাবি। প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসেছিলো সে সময়। ভাষার দাবিতে সোচ্চার মিছিলটি এগিয়ে যায় প্রাদেশিক ভবনের দিকে। মিছিলটিকে ছত্রভঙ্গ করার জন্যে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের বেপরোয়া গুলিবর্ষণের ফলে রাজপথে লুটিয়ে পড়ে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, সফিউর প্রমুখ দামাল ছেলেরা। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে লিখে যায় এক অনন্য ইতিহাস। তাঁদের নিঃসৃত রক্তে সেদিন লেখা হয়ে যায় পূর্ব বাংলার অমোঘ ভাগ্যলিপি। তাঁদের এ মহান আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা লাভ করে। বাঙালির সংস্কৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকে সেই দিন, সেইদিনের রাজপথ, সেই ফুলার রোড।
এই পথ, পীচ ঢালা এ কাল পথ
লিখে দিল এক ইতিহাস
বুকের রক্ত দিয়ে জীবনের শেষ ক্ষণে
গেয়ে গেল তারা এ গান
আমার মুখের ভাষা,আমার সে প্রাণ।
১৯৫৩ সাল থেকে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি একটি মহান জাতীয় দিবস হিসেবে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) এবং দেশের বাইরে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অন্যত্র যেখানে যথেষ্ট সংখ্যক বাঙালি রয়েছে সেখানে উদযাপিত হয়ে আসছে।
১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর আরেকটি বিজয়ের দিন। ঐদিন প্যারিস বৈঠকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক শাখা ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের ১৮৮ দেশের সদস্য দেশসহ অনাগত দেশ প্রতিবছর এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত করে। এ সিদ্ধান্ত প্রতিটি বাঙালির মুখকে উজ্জ্বল করে তোলে।
সাইফুল ইসলাম
প্রধান শিক্ষক
কৃষ্ণনগর বাছিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়।
জুড়ী, মৌলভীবাজার।