09/12/2025
সাল ১৯৭১। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর কাছে খবর আছে, পাকিস্তান বড় কোনো ষড়যন্ত্র করছে, কিন্তু বিস্তারিত কিছুই জানা নেই। ভারতের দরকার এমন একজনকে, যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অন্দরমহলে ঢুকতে পারবে।
দৃশ্যপটে এলেন এক ২০ বছরের কাশ্মীরি তরুণী। নাম সেহমত খান (ছদ্মনাম)। দিল্লির কলেজে পড়া এক সাধারণ মেয়ে, যার জগত ছিল বই, ভায়োলিন আর ক্লাসিক্যাল ড্যান্স নিয়ে। কিন্তু তার বাবা হিদায়েত খান ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের সোর্স। বাবার শেষ ইচ্ছায় এবং দেশের প্রয়োজনে সেহমত রাজি হলেন এক অসম্ভব মিশনে। তিনি নিজের প্রেম, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ—সব বিসর্জন দিয়ে তৈরি হলেন স্পাই হওয়ার জন্য।
তার বিয়ে ঠিক হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসারের (ব্রিগেডিয়ার সাইদ) ছেলের সাথে। সেহমত নববধূ সেজে সীমান্ত পার হলেন। তার নতুন ঠিকানা হলো পাকিস্তানের এক অভিজাত সামরিক পরিবার, যেখানে সকাল-বিকেল জেনারেল এবং ব্রিগেডিয়ারদের আনাগোনা। এমনকি তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নাতি-নাতনিদের গৃহশিক্ষকও ছিলেন। সেহমত জানতেন, এখানে একটি ভুল মানেই নিশ্চিত এবং যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
দিনের বেলা তিনি ছিলেন এক আদর্শ এবং লাজুক পুত্রবধূ। বাড়ির সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন। তার স্বামী ইকবাল তাকে সত্যিই ভালোবাসতেন। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই সেহমত হয়ে উঠতেন ভারতের চোখ ও কান। বাড়ির গোপন সিন্দুক থেকে ফাইল বের করা, বাথরুমে লুকিয়ে ট্রান্সমিটার দিয়ে মোর্স কোডে (Morse Code) দিল্লিতে তথ্য পাঠানো—এটাই ছিল তার রুটিন।
সবচেয়ে বড় তথ্যটি এল কিছুদিন পর। সেহমত জানতে পারলেন, পাকিস্তান তাদের মরণঘাতী সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’ (PNS Ghazi)-কে পাঠাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। লক্ষ্য—ভারতের বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’-কে ডুবিয়ে দেওয়া। বিক্রান্ত ডুবলে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) স্বাধীন করা ভারতের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সেহমত নিজের জীবন বাজি রেখে সেই গোপন নকশা এবং গাজীর রুট ম্যাপ চুরি করলেন। সেই তথ্য তিনি ভারতে পাঠালেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় নৌবাহিনী সতর্ক হয় এবং বিশাখাপত্তনমের কাছে গাজীকে ধ্বংস করে। হাজার হাজার ভারতীয় নাবিকের প্রাণ বাঁচে।
কিন্তু এই স্পাইগিরির চড়া মূল্য তাকে দিতে হয়েছিল। একদিন বাড়ির বিশ্বস্ত চাকর আব্দুল তাকে গোপন কাজ করতে দেখে ফেলে। সেহমত জানতেন, আব্দুল মুখ খুললে তার মিশন শেষ এবং ভারতের ক্ষতি হবে। কান্নাভেজা চোখে, কাঁপাকাঁপা হাতে তিনি আব্দুলকে ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যা করতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, নিজের পরিচয় গোপন রাখতে তাকে তার দেওর মেহবুব সৈয়দকেও হত্যা করার পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।
তিনি কোনো পেশাদার খুনি ছিলেন না, ছিলেন এক সাধারণ মেয়ে। এই হত্যাগুলো তার আত্মাকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল। কিন্তু দেশের স্বার্থে তিনি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন।
মিশন শেষে যখন তার ধরা পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন তিনি গর্ভবতী। ভারতীয় গোয়েন্দারা এক দুঃসাহসিক অপারেশনের মাধ্যমে তাকে পাকিস্তান থেকে উদ্ধার করে আনে। সেহমত ভারতে ফিরে আসেন, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে সেই স্বামীর কাছে, যে তাকে ভালোবেসেছিল, কিন্তু যাকে তিনি ঠকাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ভারতে ফিরে তিনি তার সন্তানকে জন্ম দেন। তার ছেলে পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করেন। সেহমত খান পাঞ্জাবের মালেরকোটলায় এক নিভৃত জীবন বেছে নেন। তিনি আজীবন নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। তিনি বলতেন, "আমি যা করেছি, তা মেডেলের জন্য করিনি, করেছি আমার পতাকার জন্য।"
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে, সিনেমা ‘রাজি’ মুক্তি পাওয়ার আগেই এই বীরাঙ্গনা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তার কফিনে কোনো ফুল ছিল না, ছিল শুধু ভারতের তেরঙ্গা।
সেহমত খান আমাদের শিখিয়েছেন, যুদ্ধের ময়দানে লড়ার জন্য শুধু বন্দুক লাগে না, লাগে কলিজা। তিনি নিজের হাতে নিজের সুখের সংসার ভেঙেছিলেন, যাতে কোটি কোটি ভারতীয় শান্তিতে ঘুমাতে পারে।
স্যালুট সেহমত খান।
Source:
১. Calling Sehmat - হরিন্দর সিক্কার লেখা বই (যেটির ওপর ভিত্তি করে সত্য ঘটনা জানা যায়)।
২. Anandabazar Patrika (আগস্ট ১৪, ২০২০) - "অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরেছিলেন ‘রাজি’-র গুপ্তচর সেহমত খান"।
৩. StarsUnfolded - "Sehmat Khan: Biography & True Story of Alia Bhatt’s Raazi".