23/09/2026
University of London থেকে আইন পড়েছেন সাবা ইমা।
বাংলাদেশি আইনের কোনো একটি ধারাও পড়ার সুযোগ হয়নি তাঁর স্নাতক পর্যায়ে। কিন্তু সম্মানজনক জীবিকার প্রত্যাশায় ২০২৪ সালে শূন্য থেকে বাংলাদেশের আইন পড়া শুরু করেন তিনি। এরপর একই সময়ে বিসিএস ও বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক সাফল্যের গল্প।
সাবা ইমা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের ২০১৯ সালের শিক্ষার্থী। এর আগে পড়েছেন The Millennium School এবং The Millennium Stars School and College-এ। পরে University of London থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়লেও বাংলাদেশি আইনের পাঠ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে একেবারে নতুন করে।
২০২৪ সাল থেকে নিজের উদ্যোগে বাংলাদেশের ৩০টির বেশি আইন পড়া শুরু করেন সাবা। তাঁর সামনে তখন শুধু বিজেএস নয়, বিসিএসের পরীক্ষাও ছিল। একই সময়ে একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ পরীক্ষার একটি ব্যস্ত সময়সূচি।
২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। এরপর ১ নভেম্বর দেন ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। ২৭ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা। এরপর ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি, ৮ থেকে ২৩ এপ্রিল ৫০তম বিসিএসের লিখিত এবং ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ১৮তম বিজেএসের টানা দশ দিনের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি।
এই দীর্ঘ পরীক্ষার যাত্রার ফলও আসে একের পর এক। ৪৭তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে মেধাক্রম ১৭ নিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সাবা ইমা। এটি ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস এবং জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষা। এরপর ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে অর্জন করেন দ্বিতীয় স্থান।
বিজেএসের সাফল্যের পেছনের গল্পটিও তাঁর জন্য ছিল অন্যরকম। বাংলাদেশি আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রচলিত ধারার প্রস্তুতি তাঁর ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বাংলাদেশের আইন পড়ার সুযোগ না থাকলেও পরে নিজের চেষ্টায় একে একে দেশের আইনগুলো আয়ত্ত করেন। নিজের ভাষায়, শূন্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশি আইনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার এই যাত্রা তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় অর্জন হয়ে থাকবে।
বিসিএসের ভাইভাতেও নিজের আইনভিত্তিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। ৭ জুন ২০২৬ অনুষ্ঠিত ভাইভায় বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন শাহনাজ সরকার। প্রায় ২৫ মিনিটের সেই ভাইবায় তাঁর কাছে আইন, নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার উন্নয়ন, অর্থনীতি, শ্রম অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
ভাইবার শুরুতেই নিজের ক্যাডার পছন্দের তালিকা জানান সাবা। সেখানে পররাষ্ট্র ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখার বিষয়টি উঠে আসে। আইন বিষয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি তাঁকে প্যারোল, হোয়াইট কলার ও ব্লু কলার অপরাধ, নারীবাদ, সমতা ও ন্যায্যতার পার্থক্য এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
এক পর্যায়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, equality না equity—কোনটি বেশি প্রয়োজন। সাবা তাঁর উত্তরে equity-কে গুরুত্ব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সমাজে সবার প্রারম্ভিক অবস্থান ও সুযোগ সমান নয়। তাই শুধু সবার সঙ্গে একই আচরণ করলেই প্রকৃত সমতা নিশ্চিত হয় না।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র হিসেবে তিনি রাজনীতি, শিক্ষা ও শ্রম অভিবাসনের কথা বলেন। বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ অদক্ষ বা আধা-দক্ষ কর্মী হওয়ায় তাঁদের দক্ষতা, আইনি সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
ভাইবার শেষ পর্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি। বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মতো বিষয় নিয়ে তাঁকে নিজের মতামত দিতে হয়। পাশাপাশি আইন বিষয়ে mens rea এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
নিজের ভাইবা অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সাবা ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থীদের নার্ভ শক্ত রাখার, নিজের ভালো দিকগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরার এবং ইংরেজিতে কথা বলার জড়তা কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
একদিকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পড়াশোনা, অন্যদিকে বাংলাদেশি আইনের প্রস্তুতিতে শূন্য থেকে পথচলা। এর মধ্যেই প্রথম বিসিএসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১৭তম এবং একই বছরে ১৮তম বিজেএসে দ্বিতীয় স্থান—সাবা ইমার এই সাফল্য তৈরি হয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং নতুন একটি বিষয়কে শুরু থেকে আয়ত্ত করার অধ্যবসায়ে।