02/10/2025
১৯৯২ সালের জুন মাস। সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাদের মদদপুষ্ট সরকারেরও পতন ঘটে। ক্ষমতায় আসেন মুজাহিদীন নেতা বুরহানউদ্দিন রব্বানী। তবে সব মুজাহিদীন গ্রুপ তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে নারাজ ছিল। সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে একত্র হলেও মুজাহিদীনরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত ছিল। তাই সোভিয়েত সেনা চলে যাওয়ার পরও দেশে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। আফগানিস্তানে তখন কার্যত কোনো আইন ছিল না। রাস্তায় রাস্তায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা চেকপোস্ট বসিয়ে দিনের আলোয় চাঁদাবাজি করত। লুটেরা ও ডাকাতদের ভয়ে সাধারণ মানুষের পথে বের হওয়া ছিল দুঃসাধ্য। রব্বানীর সরকারের হাতে এই বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা ছিল না।
এমন শৃঙ্খলাহীন সময়ে এক ঘটনা ঘটে কান্দাহারে। এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাইওয়ে দিয়ে যাওয়া একটি বিয়ের গাড়ি ডাকাতরা আটক করে। গাড়িটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে তারা যাত্রীদের বন্দি করে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। গ্রামে এমন ঘটনা তখন নিত্যদিনের ব্যাপার হলেও এক মাদ্রাসার শিক্ষক আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি নিজের মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে হাতে তুলে নিলেন সোভিয়েত আমলের কিছু পুরোনো অস্ত্র। তারপর আকস্মিক হামলা চালিয়ে ডাকাতদের ঘাঁটি থেকে বন্দিদের মুক্ত করে আনলেন।
এই শিক্ষক ছিলেন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর। তার এই সাহসী পদক্ষেপ স্থানীয় মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনে। খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। মানুষ বুঝতে শুরু করে যে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করা সম্ভব। এরপর মোল্লা ওমর অন্যান্য মাদ্রাসায় যান, ছাত্রদের একত্রিত করেন, উৎসাহ দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে প্রায় ৪০-৫০ জন ছাত্র একত্রিত হয়। তারা ঠিক করে— দুর্নীতি, সন্ত্রাস, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। একে একে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে, ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয় সাবেক মুজাহিদীন, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। এভাবেই ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে জন্ম হয় নতুন এক সংগঠনের। পশতু ভাষায় ‘তালেবান’ অর্থ হলো ছাত্র। সংগঠনের অধিকাংশ সদস্য ছাত্র হওয়ায় তারা পরিচিতি পায় ‘তালেবান’ নামে।
সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে মুজাহিদীনদের উত্থান:
ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর আফগানিস্তানের সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে ১৯৭৩ সালে বাদশাহর পতনের পর দাউদ খান ক্ষমতায় এলে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে দাউদ খানের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে সোভিয়েতপন্থী বামপন্থী সরকার। নূর মোহাম্মদ তারাকি রাষ্ট্রপ্রধান হন। কিন্তু তিনিও নিজের দলের আরেক নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনের হাতে খুন হন। এরপর ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত সেনারা সরাসরি আফগানিস্তানে প্রবেশ করে এবং বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসায়।
ঠিক তখনই ইরানে ঘটে সফল ইসলামিক বিপ্লব, যার প্রভাব আফগানিস্তানেও ছড়ায়। আফগান ইসলামপন্থীরা সোভিয়েত আগ্রাসন এবং কারমালের সরকার মেনে নিতে রাজি হয়নি। তাদের আশঙ্কা ছিল, বামপন্থী শাসনে ধীরে ধীরে নাস্তিকতা, ধর্মহীনতা, অশ্লীলতা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। আমেরিকা এ সুযোগ কাজে লাগায়। পাকিস্তানের সহায়তায় সিআইএ মুজাহিদীনদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়। একসময় দুর্বল ও অস্ত্রশূন্য যোদ্ধাদের হাতে এলো আধুনিক এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল, এন্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইলসহ অসংখ্য সমরাস্ত্র। আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ে সোভিয়েত সেনারা কার্যত ফেঁসে যায়।
১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত সেনারা পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয়। তবে মুজাহিদীনদের হাতে আমেরিকার সহায়তা অব্যাহত থাকে। ফলে সোভিয়েত সমর্থিত নজিবুল্লাহ সরকার টিকতে পারেনি। ১৯৯২ সালে তাকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেন বুরহানউদ্দিন রব্বানী। কিন্তু দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সন্ত্রাস ও ডাকাতির রাজত্ব চলতে থাকে।
তালেবানের উত্থান ও বিস্তার:
এই অরাজকতার মধ্যেই মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবান সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৪ সালে কান্দাহার থেকেই তারা কার্যক্রম শুরু করে। ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানে সফলতা পেয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো কান্দাহার তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এরপর ১৯৯৬ সালে তারা কাবুল দখল করে প্রতিষ্ঠা করে ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান। মোল্লা মোহাম্মদ ওমর হন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।
তালেবান সরকার কঠোর নিয়মনীতি প্রয়োগ করে। দেশে আইনশৃঙ্খলা ফিরে আসে, এমনকি স্বর্ণভর্তি ট্রাকও নির্ভয়ে এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে যাতায়াত করতে পারত। তবে তাদের কিছু পদক্ষেপ পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক সমালোচিত হয়— যেমন গান-বাজনা, সিনেমা নিষিদ্ধ করা; নারীদের জন্য বোরকা বাধ্যতামূলক করা; ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করা ইত্যাদি। সাবেক প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহকে হত্যাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
আমেরিকার আগ্রাসন:
তালেবানদের উত্থানকালেই নর্দান অ্যালায়েন্সের নেতা আহমেদ শাহ মাসুদ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে তিনি ২০০১ সালে নিহত হন। একই বছর ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা। এর জন্য দায় স্বীকার করে আল-কায়েদা। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন আফগানিস্তানে তালেবানদের আশ্রয়ে ছিলেন। আমেরিকা তাকে হস্তান্তরের দাবি জানালে তালেবান অস্বীকৃতি জানায়। এরপর মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানে প্রবেশ করে ভয়াবহ বোমা বর্ষণ শুরু করে। নর্দান অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় দ্রুত কাবুলের নিয়ন্ত্রণ হারায় তালেবান। ক্ষমতায় আসে আমেরিকার মদদপুষ্ট হামিদ কারজাই।
তবে তালেবানরা পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। আমেরিকার হামলা যত বাড়ে, ততই সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগ দেয়। ফলে ধীরে ধীরে তালেবানরা আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
নতুন যুগ : আমেরিকার বিদায় ও তালেবানের প্রত্যাবর্তন:
২০১১ সালে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। অথচ আমেরিকা তখনো আফগানিস্তান ছাড়েনি। মোল্লা ওমর ২০১৩ সালে মারা গেলেও তালেবান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাতারের মধ্যস্থতায় তালেবানদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। পরে জো বাইডেনও সে পথ অনুসরণ করেন। অবশেষে ২০২১ সালে আমেরিকা ও ন্যাটো সেনারা সম্পূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায়।
বাইডেন বিশ্বাস করেছিলেন ৩.৫ লাখ সেনাসমৃদ্ধ আফগান সেনাবাহিনী মাত্র ৭৫ হাজার তালেবানকে রুখে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়নি। তাই প্রায় বিনা প্রতিরোধেই তালেবান কাবুল দখল করে এবং পুনরায় ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান গঠন করে।
#তালেবান #আফগানিস্তান #মোল্লা_ওমর #মুজাহিদীন #সোভিয়েত_আক্রমণ #গৃহযুদ্ধ #আলকায়েদা #মানবাধিকার #নারীর_অধিকার #কাবুল #কান্দাহার #শান্তি ৃঙ্খলা
17/03/2025
30/12/2024