05/08/2025
৩রা আগস্টের স্মৃতিচারণ করেছেন আব্বু ( শ্বশুর সাহেব )
আগষ্ট ,২০২৪।
স্হানঃ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও আমরা।
গত কয়েকদিন ধরে আমার একমাত্র ছেলে ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) খুলনায় বাড়িতে এসে খুলনার শিববাড়ি সহ বিভিন্ন স্হানের মিছিল সমাবেশে অংশ গ্রহণ করতে থাকে।
পুলিশের দাবড়ানি বা মিছিলে অংশ নিয়ে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে যখন বাড়ি ফেরে তখন এই চেহারা কেন বা কোথায় গিয়েছিলো জিজ্ঞেস করলে,সত্য কথা বলতো, মিছিলে বা মিটিংয়ে গিয়েছিলাম বলতো। বাবা হিসাবে টেনশন হতো বকাও দিতাম না জাবার জন্য বলতাম কিন্তু মনে মনে খুশি হতাম তার সত্য কথা বলার জন্য।
৩ আগষ্ট শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন খুলনাতে প্রতিবাদ জমায়েত হবে এমন কর্মসূচি আগে থেকেই ছিলো যার মূল স্হান ছিলো শিববাড়ি মোড়,পরে সেটা ভাগ হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ও শীববাড়ি দুই স্হানেই হবে এমন অঘোষিত সিদ্ধান্ত হয়।
আমার ছেলে ও জামাইকে সারাদিন ফুসুরফুসুর করতে দেখলাম। আমি বা ওদের মা সামনে গেলেই চুপ হয়ে যায়। কিন্তু তাদের চোখমুখ দেখলে বোঝা যায় যেন উৎকন্ঠা আর উত্তেজনার মিশ্রণ...
দুপুরে খাবার টেবিলে একসাথে খাবার সময় ছেলে ও জামাইকে দেখলাম খাবার না খেয়ে নাড়াচাড়া করছে।কারন তারা তো মিছিল সমাবেশে কিভাবে যাবে সেই জন্য উত্তেজিত। আমি নিজেই কথাটা তুললাম, আজ বিকালের কর্মসূচি কি?( জেনেও না জানার ভান করে)
দুজনের চোখমুখ যেন আনন্দে নেচে উঠলো! একসাথে বলে উঠলো, কোথায় কি কর্মসূচি..
এবার আমি বললাম, তোমরা কি যেতে চাও?
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আবার একসাথে বলে উঠলো হ্যা আব্বু... দুজনের চোখেমুখে ভিষণ রকম উত্তেজনা আর উচ্ছাস!
আমি খুব নরম স্বরে বললাম, " আমিও তোমাদের সাথে যাবো"
আমার কথা শুধু ছেলে ও জামাই যেন বিস্ময়ে হতবাক!!
দুজনের মুখই হা হয়ে গেছে, তাদের চেহারাতে যেন আমাকে প্রশ্ন, আমি সত্যি বলছি কিনা? ওদের মা বলে উঠলো তোমার কি মাথা খারাপ? আজ গন্ডগোল হবে (১৯৭১ এর যুদ্ধকে এখনও পুরাতন দিনের মানুষেরা গন্ডগোল বলে) ১৯৭১ দেখি নাই কিন্তু মনে মনে একটা ফিলিংস আসলো জীবনে এই প্রথম!
আমি দুই পক্ষের মাঝে পড়ে গেলাম এবং আবার খুব নিচু স্বরে বললাম হ্যা আমিও যাবো..
ছেলে ও জামাই দ্রুত খাওয়া শেষ করলো।তাদের মা যেন চিন্তায় পড়ে গেল,সে যানে আমি যা বলি তাই করি।
খেয়ে ঘরে গেলে,তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলো তুমি কি সত্যিই ওদের সাথে যাবে?
আমি তাকে আস্বস্ত করলাম,দেখো ওদের যে বয়স কোথায় কি করবে,আমি সাথে থাকলে দৌড়াদৌড়ি বা উত্তেজিত হয়ে কোন অঘটন ঘটাবে না।
আমার কথায় আমার স্ত্রী আস্বস্ত হলেন না।
"তুমি সাথে থাকলে,ওরা আরো বেশি সাহস পাবে.."
যাহোক দুপুর তিনটার পরপরই আমরা বেরিয়ে পড়ি।
রিকসা পায়ে হেটে পৌনে চারটার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পৌছাই।বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে ( এখন যেটা শহীদ মুগ্ধ এর নামে তোরন করা হয়েছে) পারিবেশ তখনও শান্ত, মেয়েরা অবিভাবক সহ এসেছে সবাই মিলে সম্মিলিত ভাবে কখনও স্লোগান কখনও গান করছে।হালকা হালকা বৃষ্টি হচ্ছে।
এরমধ্যেই গুলির শব্দ শুনতে পেলাম জিরো পয়েন্টের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকে। মূহুর্তের মধ্যে খবর এলো পুলিশ ছাত্র জনতার উপর গুলি করেছে
কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে....
এরমধ্যে দুইটি মটর সাইকেলে দুজন গুলিবিদ্ধকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে আনা হলো।
কয়েকটা ইজি বাইক নিয়ে ছাত্ররা ছুটলো আরো গুলিবিদ্ধদের উদ্ধার করে আনতে।
মূহুর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো.... গুলিবিদ্ধদের নিয়ে খুলনা মেডিকেলের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বুলেন্স বেড়িয়ে যেতেই ছাত্র জনতা চূড়ান্ত রকম উত্তেজিত হয়ে গেলো মূহুর্তের মধ্যে।
আমরাও তখন উত্তেজিত। তখনই আবার একজন ছাত্রলীগ কর্মী ধরা পড়েছে গেটের সামনে।
একদল তাকে মারবে আরেক দল তাকে সেভ করতেছে। তাদের বক্তব্য একে নিয়ে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লে পুলিশ আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেবে...
ইতিমধ্যে গল্লামারির দিকে থেকে পুলিশ রায়ট কার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোতে থাকে।
তখন দেখলাম সেই বিস্ময়কর দৃশ্য
শহীদ আবু সাইদের মতো খয়েরি রঙের গেন্জি পড়া অকুতোভয় এক যুবক বীরের মতো একাই এগিয়ে গেলো পুলিশের রায়ট গাড়ির দিকে। পুলিশের গাড়ির মাত্র কয়েকগজ দুরে হাত উচু করে দাড়িয়ে গেলো।
আমার জামাই বললো আব্বু আমিও যাই,নইলে ঐ ছেলেকে পুলিশ একা দেখে গুলি করতে পারে...
আমি জামাইয়ের হাত ধরে বললাম তোমার ছেলের বয়স মাত্র দেড়মাস...
যেতে না পেরে জামাই কাঁদো কাঁদো চেহারা করে ফেললো। এদিকে ছেলে এদিকওদিক দৌড়াচ্ছে তাকে বারবার ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এখানে বলে রাখি আমার জামাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকলো।গুলিবিদ্ধ আহত আরো ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়র মেডিকেল সেন্টারে আসতে থাকলো।পর্যাপ্ত এম্বুলেন্স না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাসে গুলিবিদ্ধ আহতদের মেডিকেল কলেজে পাঠানো হতে থাকলো। পুলিশ গল্লামারী ব্রিজ পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের দিকে এগুতে থাকলো অকুতোভয় একজন যখন সামনে হাত উচু করে পুলিশকে ঠেকিয়ে দিলো এর পর আরো অনেক ছাত্র যুবক তারমতো করো পুলিশের সামনে প্রতিরোধ হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলো।এদিকে আরেকদল আশেপাশের বাড়ি থেকে কাঠ বাশ বড় বড় গাছের বল্লি এনে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো।মেইন গেটের বিপরীতের এক দোকানদার তার সব বোতল পানি ফ্রীতে দিতে থাকলে। অনেক অবিভাবক সেখান থেকে নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিলাতে থাকলে মনে হতে হতে থাকলো যেন আরো কত মুগ্ধ পানি পানি বলে চিৎকার করছে। ঠিক তখন অনেক মানুষ আসরের নামাজ জামাতে পড়তে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। এক ছেলে ৫/৬ টা গুলির খোসা নিয়ে এসে সবাইকে দেখাতে লাগলো।
এই পর্যায়ে গল্লামারীর দিকের পুলিশ রায়ট কার সহ পিছু হটে ব্রীজ পার হয়ে চলে গেল। ছাত্রছাত্রীরা বিজয় ধ্বনি দিতে দিতে হঠাৎ দৌড় শুরু করলো গল্লামারীর দিকে অর্থাৎ শিববাড়ি মোড় যাবে আমাদের সামনে ৩০/৪০ জনের একটা দল যাদের বেশির ভাগই স্কুল মাদ্রাসার ছাত্র তারা দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
আমি ছেলে জামাই সহ যখন ব্রীজের শেষ মাথায় শহরে প্রবেশ করছি ঠিক সেই মূহুর্তে পুলিশ তাদের এ্যাকশন শুরু করলো তিনদিক থেকে আর রাবার বুলেট,টিয়ার সেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের যৌথ আক্রমণ। সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ এর আগে কখনও শুনি নাই। সামনে একটা কি পড়লো জানি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে এসে গল্লামারী বীজ পার হলেই ডানপাশ দিয়ে নদীর পাড় দিয়ে এক রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে গেছে সেইদিকেই বেশি মানুষ ছুটছে, আমরাও সেইদিন ছুটলাম।কিন্তু বন্ধ পথ বা ব্লাইন্ড লেন সেটা আমরা কেউই জানতাম না! হাজার খানেক মানুষ ততক্ষণে ঐ গলিতে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানের বাড়ির মানুষেরা সবাইকে আশ্রয় দিচ্ছে। আমরা তিনজন একটা টিনের বাড়ির মধ্যে আশ্রয় নিলাম। নামাজের সময় চলে যাচ্ছে তাই অজু করে নামাজ আদায় করলাম।আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলাম।ছেলে জামাইয়ের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইলাম। ঠিক তখন জামাই খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিলো তার মাথায় তখন তার সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের চিন্তা।
এক মহিলা এসে বললেন পিছন দিয়ে বেড়িয়ে যাবার পথ আছে বেড়িয়ে যান।পুলিশ এই গলিতে আসলে কি হবে জানি না। একজন এসে একবাড়ির পিছনের গেটের তালা খুলে দিলেন।
আমরা কয়েকশ মানুষ কাঁদা পানি পার হয়ে নদীর পাড় দিয়ে হেটে রাস্তায় উঠলাম।কারো কারো পা কেটে গেছে।
এদিকে যে দল আগে ব্রীজ পার হয়ে গেছে তারা পুলিশের দাঁড়িয়ে থাকে একটা ট্রাকে ভাংচুর করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে আমাদের কয়েক গজ সামনে তখন সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হলে আমরা গলির মধ্যে ঢুকেছিলাম। গলির মধ্যে থাকা অবস্থায় মিনিটে ৫/৬টা সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হচ্ছিলো।বাড়ির মহিলারা কান্নাকাটি করতেছিলেন।
এদিকে আমরা রাস্তায় উঠার পর লোকজন বললো বাদিকে না গিয়ে ডানদিকে যেতে।বায়ে হচ্ছে ট্রাকে আগুন দেয়া হয়েছে সেই স্হান। আমরা ডানদিক দিয়ে হাটা শুরু করলাম কোন যানবাহন নাই।এক কিঃমিঃ হাটার পর একটা রিক্সা পেলাম।সে কিছু দুর এগিয়ে দিয়ে বললো এরপর গ্রামের রাস্তা আর যাবে না।মানুষের কাছে শুনে শুনে হাটছি তো হাটছি পরে জানতে পারলাম আমরা শহর পেরিয়ে গ্রামের দিকে যাচ্ছি। এক ঘন্টার বেশী হাটার পর যেখানে পৌছালাম সেটা শহরের একদিকের শেষ মাথা। একটা রিক্সা পেলাম।রিক্সায় উঠতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। এক রিক্সায় তিনজন।তিনজনই ভিজে গেলাম সেখান থেকে কিছুদুর আসার পর আবার রিক্সা বদলিয়ে বাড়ি আল্লাহর রহমতে ভালো ভাবে পৌঁছাতে পারলাম। রিক্সার এতটুকু পথই হচ্ছে তিন কিলোমিটার। সব মিলিয়ে ঘুরে আসছি প্রায় ৯/১০ কিলোমিটার পথ।
বাড়ি ফিরবার পথে দেখলাম শহর থমথমে। পুলিশের গুলির,টিয়ার সেল বা সাউন্ড গ্রেনেডের কোন আওয়াজ নাই।তখন কয়েকজন বলতে লাগলো পুলিশের গুলি শেষ এবং ছাত্র জনতা পুলিশকে দাবরাচ্ছে।
এই ৩ আগষ্ট খুলনাতে পুলিশ আত্মসমর্পণ করে।তখন দলছুট দুজন পুলিশ জনতার কাছে নিহত হন।
সেইদিন কয়েকঘন্টার স্মৃতি মনে পড়লে এখনও শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায় আর কি বিভীষিকাময় সেই ঘটনা যার সব অনুভূতি প্রকাশ সম্ভব নয়।
বাড়ি ফিরবার পর অনেকক্ষণ আমরা নিস্তেজ হয়ে বসে ছিলাম। অনেকক্ষণ পর জামাই এসে বলে, আপনি না থাকলে আমরা কি সিদ্ধান্ত নিতাম তা জানি না,এখনও বাসায় সুস্থ ভাবে ফিরেছি সেটাও ফিরতে পারতাম কিনা জানি না.....
# ভিডিওটি পুলিশ একশন শুরু করার কয়েক মূহুর্তে আগের....