05/10/2025
মুসলিম বীর সেনাপতিগণ যুদ্ধের ময়দানে যেমন ছিলেন।
মহান আল্লাহর মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলেন-
আত-তাওবাহ ৯:১১১
۞إِنَّ ٱللَّهَ ٱشۡتَرَىٰ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَنفُسَهُمۡ وَأَمۡوَٰلَهُم بِأَنَّ لَهُمُ ٱلۡجَنَّةَۚ يُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَيَقۡتُلُونَ وَيُقۡتَلُونَۖ وَعۡدًا عَلَيۡهِ حَقࣰّا فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِيلِ وَٱلۡقُرۡءَانِۚ وَمَنۡ أَوۡفَىٰ بِعَهۡدِهِۦ مِنَ ٱللَّهِۚ فَٱسۡتَبۡشِرُواْ بِبَيۡعِكُمُ ٱلَّذِي بَايَعۡتُم بِهِۦۚ وَذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ
অর্থাৎ বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ খরিদ করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে-এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে হত্যা করে ও নিহতও হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীলেও নিয়েছেন এবং কুরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা বেশি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য তোমরা আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য।
বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর বাণী-
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، وَمُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالاَ حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ فَقَالَ " إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ". قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ " الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ". قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ " حَجٌّ مَبْرُورٌ
অর্থাৎ আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কোন্ ‘আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।‘ [১] জিজ্ঞেস করা হলো, ‘অতঃপর কোন্টি?’ তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।‘ প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোন্টি?’ তিনি বললেনঃ ‘মাকবূল হাজ্জ সম্পাদন করা।"
ছাহাবীগণ ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য কেমন জিহাদ করেছেন সে ব্যাপারে ইকিহাসে অনেক বর্ণনা রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে -
অষ্টম হিজরীর প্রথম দিকে সিরিয়ার রোমান বাহিনীকে আক্রমণের জন্য বিশ্ব নবী( সাঃ) সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন। এ যুদ্ধটি মূতার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে প্রথমে সেনাপতি নিয়োগ দিলেন যায়েদ ইবনে হারিসাকে। তিনি বললেন: 'যায়িদ ইবনে হারিসা নিহত হলে ২য় সেনাপতি হবে জা'ফর ইবন আবী তালিব। জা'ফর নিহত বা আহত হলে সেনাপতি হবে 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। আর সে নিহত বা আহত হলে মুসলিমরা নিজেদের মধ্য থেকে তাৎক্ষনিক পরবর্তী সেনাপতি নির্বাচন করবে। এভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করবে।
প্রিয় নবী (সাঃ) একটি যুদ্ধে পর পর তিনজন সেনাপতি নিয়োগ দেয়ার অর্থই যে, এ যুদ্ধে সেনাপতি ০৩ জন শহীদ হবেন । এ কথা তিন সেনাপতি তারা যুদ্ধে গমন করার পূর্বেই বুঝতে পেরেছেন। কারন রাসুলের অনুমান ও কথা অসত্য হতে পারেনা। তারা শহীদ হবেন ও ইসলামের জন্য নিজের জীবনের সর্বোচ্চ নাজরানা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে দান করবেন। সে কথা জেনে, বুঝে, নিঃসন্দেহে,শান্ত মনে পৃথিবীর সকল মায়া মমতা ও ভালোবাসা ছেড়ে দিয়েই যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েছেন। তারা যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করতে করতে শহীদী তামান্না পূরণ করে বিনা হিসেবে জান্নাতে চলে যাবেন। আল্লাহ আকবর।
মুসলিম বাহিনী জর্দানের সিরিয়া সীমান্তে 'মৃতা' নামক স্থানে পৌঁছে দেখতে পেল, এক লাখ রোমান সৈন্য তাদের মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সাহায্যের জন্য লাখম, দুজাম, কুদা'আ ইত্যাদি আরব গোত্রের আরও এক লাখ খ্রিষ্টান সৈন্য পেছনে প্রতীক্ষা করছে। অন্যদিকে মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার। যুদ্ধ শুরু হতেই যায়িদ ইবন ভারিসা (রা) বীরের ন্যায় শাহাদাত বরণ করেন। অতপর জা'ফর ইবন আবী তালিব (রা) তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে-পড়েন এবং শত্রু বাহিনী যাতে সেটি ব্যবহার করতে না তারে সেজন্য নিজের তরবারী দ্বারা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলেন। তারপর তিনি যুদ্ধের ময়দানে ইসলামের পতাকা তুলে ধরে রোমান বাহিনীর অভ্যন্তর ভাগে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে শত্রু নিধন কার্য চালাতে থাকেন। এমতাবস্থায় এ ২য় সেনাপতি জাফর বিন আবি তালেবের তাঁর ডান হাতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি বাম হাতে পতাকা উচু করে ধরনে। কিছুক্ষণের মধ্যে তরবারির অন্য একটি আঘাতে তাঁর বাম হাতটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বাহু দিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে তিনি ইসলামী পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পর তরবারির তৃতীয় একটি আঘাতে তাঁর দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। কারো কারো মতে দেহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মূখের দাত দিয়ে পতাকার দন্ডটি আকড়ে ধরে রাখেন। ইসলামের পতাকাটি যুদ্ধের ময়দানে উড়তে থাকে আর এ দিকে যুদ্ধ চলছেই।
অতঃপর ৩য় সেনাপতি 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা' পতাকাটি তুলে নিলেন।
শত্রু সৈন্যের সাথে বীর বিক্রমে লড়তে লড়তে তিনিও তাঁর দুই সাথীর অনুগামী হয়ে বীরের মত শহীদ হলেন।
তারপর খালিদ বিন ওয়ালিদ পতাকা হাতে নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে উদ্ধার করেন।
এ যুদ্ধে বিখ্যাত ছাহাবী 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রাঃ)ও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
তিনি বলেন: জা'ফরের বিন আবি তালেবের লাশ তালাশ করে দেখা গেল, শুধু তাঁর সামনের দিকেই পঞ্চাশটি ক্ষতচিহ্ন। সারা দেহে তাঁর নব্বইটিরও বেশি ক্ষত ছিল। কিন্তু তার একটি ক্ষত চিহ্ন তার দেহের পেছন দিকে ছিল না। অর্থাৎ কাফেরদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়েছেন। একটুও পিছ পা হননি। এ যুদ্ধে মোসলামানের মাত্র ১২ জন শহীদ হয়। আর কাফের রোমানদের প্রায় তিন থেকে দশ হাজার নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত মোসলমানগণ বিজয় লাভ করেন।
এ তিন সেনাপতির শাহাদাতের খবর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণভাবে ব্যথিত হন। বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাঁর চাচাত ভাই জা'ফরের বাড়িতে যান। তখন তাঁর স্ত্রী আসমা স্বামীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি রুটির জন্য আটা বানিয়ে রেখেছেন, ছেলেমেয়েদের গোসল করিয়ে তেল মাখিয়েছেন এবং তাদেরকে নতুন পোশাক পরিয়েছেন।
আসমা বলেনঃ পাতলা ও পরিষ্কার একখানা কাপড় দিয়ে পবিত্র মুখমণ্ডল ঢেকে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের বাড়ির দিকে আসতে দেখে আমার মনে নানারকম ভীতি ও শঙ্কার উদয় হল। কিন্তু খারাপ কিছু শুনতে হয় এ ভয়ে আমি তাঁকে জা'ফর সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। কুশলাদি জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন: 'জা'ফরের ছেলেমেয়েদের আমার কাছে নিয়ে এস।' আমি তাদেরকে ডাকলাম। তারা খুশিতে বাগবাগ হয়ে কে আগে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পৌঁছবে এরূপ একটা প্রতিযোগিতা নিয়ে দৌড় দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জড়িয়ে ধরে চুমা দিতে লাগলেন। তখন প্রিয় নবী (সাঃ) এর দু'চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আমি বললাম: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আপনি কাঁদছেন কেন?' 'জাফর ও তার সংগী দু'জনের কোন দুঃসংবাদ পেয়েছেন কি? তিনি বললেন: হাঁ। আজই তারা শাহাদাত বরণ করেছেন। আর সেই মুহূর্তে ছোট্ট ছেলে-মেয়েদের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল। যখন তারা শুনতে পেল তাদের মা কান্না ও বিলাপ করছে, তারা নিজ নিজ স্থানে পাথরের মত
এমন স্থির হয়ে গেল, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। প্রতিবেশী মহিলারা এসে আসমার পাশে ভিড় করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন। বাড়িতে পৌঁছে আযওয়াজে মুতাহহারাতকে/ তাঁর স্ত্রীদেরকে বললেনঃ 'আজ তোমরা জা'ফরের পরিবারবর্গের প্রতি একটু নজর রেখ। তারা আজ চেতনাহীন।'
জা'ফরের (রা) এর শাহাদাতের পর দীর্ঘদিন ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শোকাভিভূত ও বিমর্ষ ছিলেন।
অবশেষে জিবরীল (আ) তাঁকে সুসংবাদ দান করেন যে, আল্লাহ তা'আলা জা'ফরকে তাঁর দুটি কর্তিত হাতের পরিবর্তে নতুন দু'টি রক্তরাঙা হাত দান করেছেন এবং তিনি জান্নাতে ফিরিশতাদের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়, 'যুল-জানাহাইন' ও 'তাইয়ার'- দু' ডানাওয়ালা ও উড়ন্ত। স কোমার
ইবন সা'দ তাঁর তাবাকাতে বর্ণনা করেনঃ যায়িদ ইবন হারিসা, জা'ফর ইবন আবী তালিব ও 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার শাহাদাতের খবর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে তাদের পরিচয় তুলে ধরে ও প্রশংসা করে এক সংক্ষিপ্ত খুতবা দেন এবং দু'আ করেনঃ 'হে আল্লাহ, আপনি যায়িদকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ, আপনি যায়িদকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আপনি জা'ফর ও 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে মাফ করে দিন।'
ইমাম আহমাদ 'আবদুল্লাহ ইবন আসলাম থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জা'ফরকে বলতেন, 'সিরাত ও সুরাত- চরিত্র ও দৈহিক গঠনে তুমি আমার মত।'
জা'ফর (রা) ছিলেন গরীব-মিসকীনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়। আবূ হুরাইরা (রা) বলেনঃ "আমাদের মিসকীন সম্প্রদায়ের জন্য জা'ফর ইবন আবী তালিব ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদেরকে সংগে করে তাঁর গৃহে নিয়ে যেতেন, যা কিছু তাঁর কাছে থাকতো তা আমাদের খাওয়াতেন। যখন তাঁর খাবার শেষ হয়ে যেত তখন তাঁর ছোট্ট শূন্য ঘি-এর মশকটি বের করে দিতেন। আমরা তা ফেঁড়ে ভেতরে যা কিছু লেগে থাকতো চেটেচুটে খেতাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেনঃ 'আমার আগে যত নাবী এসেছেন তাঁদের মাত্র সাতজন বন্ধু দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার বিশেষ বন্ধুর সংখ্যা চৌদ্দ এবং জা'ফর তার একজন।' (বুখারী, মানাকিবু জা'ফর)।
শিক্ষা ঃ প্রিয় নবী সাঃ তাঁর একনিষ্ঠ ছাহাবীগণ শহীদী তামান্না নিয়ে ইসলামের বিজয়ের জন্য জান ও মাল কোরবানি দিয়েছেন। তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে কখনও পিছ পা হননি। "মরলে শহীদ বাচলে গাজী " এ নিয়াত করেই যুদ্ধ করে ইসলামকে সমুন্নত করেছেন। তাদের আত্বত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সত্য ধর্ম ইসলাম।
আপনাদের খেদমত ও দোয়া কামনায় আমি মোঃ ইব্রাহিম খলিল।
28/12/2024