29/09/2022
হৃদরোগে আক্রান্ত ৪০% শিশুই প্রতিবছর চিকিৎসার অভাবে মারা যায়
দেশে বড়দের হৃদরোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী উন্নতি ঘটলেও পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি একেবারেই অবহেলিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংকট রয়েছে। পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিসিএসবি) জানায়, দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা ৩০ জনের বেশি নয় এবং তাদের প্রায় সকলেই কেবল ঢাকায় চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে ৬ মাস বয়সী শিশু জুবায়ের। রোগ শনাক্তের পরপরই শিশুর পরিবারকে জরুরি ভিত্তিতে হার্টে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে জুবায়েরের কৃষক বাবা আকসার আলী গ্রামের কিছু জমি বিক্রি করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে অপারেশন বা অস্ত্রোপচাররের ৩ লাখ টাকা জোগাড় করেছেন। তবে একমাস ধরে অপেক্ষায় থাকার পরও অপারেশনের জন্য সিরিয়াল পায়নি জুবায়ের।
হার্ট ফাউন্ডেশনে জুবায়েরের মত অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা কয়েকশো শিশু হৃদরোগীর বিপরীতে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন বা শিশু হৃদরোগ চিকিৎসক আছেন মাত্র দুইজন।
শুধু ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনেই নয়, সারাদেশে শিশু হৃদরোগীর জন্য কার্ডিয়াক সার্জন আছেন মাত্র ১২ থেকে ১৫ জন, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩০০ জন।
দেশে বড়দের হৃদরোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী উন্নতি ঘটলেও পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি একেবারেই অবহেলিত।
২০০১ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (এনআইসিভিডি) শিশুদের জন্য একটি কার্ডিওলজি বিভাগ চালু করে। ২০০২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৭৬। গেলো বছর ২০২১ সালে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার।
প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিশু এনআইসিভিডি'র আউটডোর সেবা গ্রহণ করে। তবে এখানে শিশু ও নবজাতকের অস্ত্রোপচারের কোনো সুবিধা নেই।
জুবায়েরের পরিবার দেশের একমাত্র সরকারি হৃদরোগ বিশেষায়িত হাসপাতাল এনআইসিভিডিতেও যোগাযোগ করে। কিন্তু এই হাসপাতালে শিশুদের হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচার করা হয় না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টেরও সংকট রয়েছে। পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিসিএসবি) জানায়, দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা ৩০ জনের বেশি নয় এবং তাদের প্রায় সকলেই কেবল ঢাকায় চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
পিসিএসবির সভাপতি এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেসের শিশু কার্ডিওলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, দেশে শিশু হৃদরোগ চিকিৎসা এখনো তেমন উন্নত হয়নি, কারণ এটি লাভজনক নয়।
অধিকাংশ শিশু হৃদরোগীর পরিবার দরিদ্র। ডাক্তাররা এ লাইনে আসতে চান না, কারণ এখানে আয় কম বলে জানান তিনি।
"বড়দের হার্টের চিকিৎসায় উপার্জন বেশি। আরেকটি কারণ হলো, অবকাঠামোগত সমস্যা। ডাক্তারদের কাজ করতে গেলে কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এগুলো আমাদের দেশে অপ্রতুল। ইনভেস্টররা এদিকে আসতে চায়না, কারণ লাভ কম। ছোট বাচ্চাদের জন্য ডেডিকেটেড দক্ষ নার্স বা অন্যান্য স্টাফ নেই। শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউও নেই," যোগ করেন তিনি।
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের হৃদরোগের কারণ হলো জেনেটিক। জন্মের সময় কোনো ত্রুটি, গর্ভবতী মায়ের সংক্রামক রোগ, যেমন-মা যদি রুবেলার মতো সংক্রামক ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তেজস্ক্রিয়তা এবং পরিবেশ দূষণের মতো যেকোনো কারণে শিশুরা কনজেনিয়াল হার্ট ডিজিজ (সিএইচডি) বা জন্মগতভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারে।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শিশুদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার চিত্র বেশি দেখা যায় দরিদ্র পরিবারে। কারণ দরিদ্র পরিবারের মায়েরা গর্ভকালীন অপুষ্টিতে ভোগেন; সেইসঙ্গে, এ সময়ে যেই যত্নের প্রয়োজন হয় সেটি তারা পান না এবং নানান ধরনের সংক্রামক রোগে ভোগেন। এসব কারণে অনেক সময় গর্ভের শিশুও সিএইচডি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে।
যদিও এ ধরনের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে জটিলতা এড়ানো সম্ভব, কিন্তু বেশিভাগ দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বাড়িতেই জন্ম হয়। ফলে এসব ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগই ডাক্তারের কাছে তখন যান, যখন সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে।
দেশে হৃদরোগের চিকিৎসা দেয় এমন বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে ল্যাবএইড অন্যতম। এখানে হৃদরোগে আক্রান্ত বড়দের ক্ষেত্রে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুযোগ কম। শিশুদের চিকিৎসার জন্য মাত্র ৬টি শয্যা রয়েছে এই হাসপাতালে। এমনকি, অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রতিবন্ধকতা।
ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, মূলত অর্থনৈতিক কারণেই দেশে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসার তেমন উন্নতি হচ্ছে না।
"হৃদরোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর পরিবার দরিদ্র। আমরা এমন পরিবার থেকেও রোগী পাই, যারা শিশুর হৃদরোগ চিকিৎসায় ৯০ হাজার টাকা দিয়ে ডিভাইস কেনার সামর্থ্য রাখে না", বলেন শামীম।
"এছাড়া, শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও ঘাটতি রয়েছে। চিকিত্সা বা অস্ত্রোপচারের সময় কোনো শিশুর মৃত্যু হলে, পিতামাতার কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। এসব ঝামেলা এড়াতে এক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণও কম," যোগ করেন তিনি।
তবে তিনি আরও জানান, ল্যাবেইড সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ আগামী বছর ৪০ শয্যা বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ইউনিট চালু করতে যাচ্ছে।
ডা. এ এম শামীম বলেন, শিশু-হৃদরোগের চিকিৎসায় বেসরকারি-সরকারি অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকির আহ্বান জানিয়ে, ভারতের মহারাষ্ট্রের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। যেখানে সরকারি ভর্তুকিতে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগে ভুগছে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার শিশু জন্মগতভাবে হৃদরোগ নিয়েই জন্ম নেয়।
পিসিএসবি-এর মতে, প্রতি বছর হৃদরোগে আক্রান্ত প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যায়।
এখনও প্রাথমিক ধাপেই আটকে আছে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা
বাংলাদেশে মাত্র সাতটি মেডিকেল ইনস্টিটিউট শিশুদের বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের চিকিৎসা দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এনআইসিভিডি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতালে শিশুদের জন্য কার্ডিওলজি বিভাগ, ইবনে সিনা হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ঢাকা, এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
এরমধ্যে শুধু হার্ট ফাউন্ডেশন ও সিএমএইচেই নবজাতকদের অস্ত্রোপচার হয়। এই দুটি হাসপাতালেই কেবল শিশু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রয়েছে।
পিসিএসবি বর্তমানে শিশু হৃদরোগীদের চিকিৎসায় জনবল উন্নয়নের কাজ করছে। পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিতে এমডি এবং এফসিপিএস কোর্স চালু করা হয়েছে।
ডা. আবদুস সালাম অবশ্য আরও বলেন, সরকারি সেটআপে শিশু সার্জনের আলাদা কোনো পদ না থাকায় সার্জনরা এ বিষয়ে আগ্রহী নন।
তিনি বলেন, দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সরকারের উচিত শিশু হৃদরোগের চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া।
গতবছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) একটি পূর্ণাঙ্গ পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের জুলাই থেকে সেখানে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
ভারতের বিশেষজ্ঞ সার্জনরা বিএসএমএমইউ-তে জটিল পেডিয়াট্রিক হৃদরোগীদের অস্ত্রোপচারও করছেন। সেইসঙ্গে, এই প্রতিষ্ঠান দক্ষ নার্স আনারও উদ্যোগ নিয়েছে। বিএসএমএমইউ'র পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ও পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে শিশু হৃদরোগীদের দুর্ভোগ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হলো, 'ইউজ হার্ট ফর এভ্রি হার্ট'।
30/07/2022
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে স্টার্টআপ হতে পারে ভালো বিজনেস আইডিয়া
07/05/2022
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম: বর্জ্যকেও মূল্যবান করে তুলছে
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম হলো একটি সামাজিক উদ্যোগ যা মার্কেট প্ল্যাটফর্ম দিয়ে থাকে। এ প্ল্যাটফর্মে যে-কেউ তাদের গৃহস্থালি বর্জ্য বিক্রি করতে পারে।
মোহাম্মদপুরে একটি ভাঙারির দোকান চালান জায়েদ আহমেদ। জায়েদ দায়িত্ব নেওয়ার আগে দোকানটি চালাতেন তার বাবা। আমাদের অনেকের ব্যবহৃত বেশিরভাগ জিনিসের শেলফ লাইফই (কার্যকরী স্থায়িত্বকাল) খুব কম। তবে জায়েদের জীবিকাই হলো বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, নতুন কাজে ব্যবহার ও বিক্রি করা।
দোকানের জন্য উপকরণ জোগাড় করতে জায়েদকে বরাবরই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। আর তিনি যে ফেরিওয়ালাদের বর্জ্য খোঁজার জন্য পাঠান, তাদেরকে সাধারণত আশপাশের এলাকায় জঞ্জাল ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়। কিন্তু এসব উৎস থেকে জায়েদ সবসময় উপকরণ পেতেন না, আবার পেলেও উৎসগুলো সবসময় নিরাপদ হতো না।
তবে দু-মাস আগে রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেমের সাথে অংশীদারিত্বে যাবার পর থেকে জায়েদ এ বিষয়ে বিস্তর সহায়তা পেয়েছেন।
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম হলো একটি সামাজিক উদ্যোগ যা মার্কেট প্ল্যাটফর্ম দিয়ে থাকে। এ প্ল্যাটফর্মে যে-কেউ তাদের গৃহস্থালি বর্জ্য বিক্রি করতে পারে। ব্যবহৃত প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকস পণ্য, রান্নার তেল, কাগজ, কার্ডবোর্ড ইত্যাদি যেকোনো কিছু থাকতে পারে বর্জ্যের তালিকায়।
বিক্রেতাদের সঙ্গে স্থানীয় রিসাইক্লারদের—যেমন জায়েদের মতো ভাঙারিওয়ালা—যোগাযোগ করিয়ে দেয় রিসাইকেল জার। রিসাইক্লাররা এসব বর্জ্য কিছুটা কম দামে কিনে নেন। এরপর তারা সেগুলো মেরামত করে লাভ রেখে ফের বিক্রি করেন।
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম মূলত মধ্যস্থতাকারীর কাজ করে। আগ্রহী বিক্রেতাদের সঙ্গে তারা রিসাইক্লারদের যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
জায়েদ এখন দিনে নয়-দশটি অর্ডারের পণ্য পেয়ে যান। যারা রিসাইকেল জারের প্ল্যাটফর্মে জিনিস বিক্রি করে, তাদের বাড়িতে তিনি নিজের ফেরিওয়ালাদের পাঠান। সেখান থেকে তারা দোকানের জন্য উপকরণ কিনে নিয়ে আসে। এতে জায়েদের সময়, জনবল ও অর্থ সাশ্রয় হয়।
এসব সুবিধা ছাড়াও রিসাইকেল জারের দিকনির্দেশনা বর্জ্য সম্পর্কে জায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিয়েছে। বর্জ্য কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে, সে সম্পর্কে তার ধারণাও বদলে দিয়েছে রিসাইকেল জার।
জায়েদ বলেন, 'আগে আমরা ইলেকট্রনিকস পণ্য খুলে, কিনে নিয়ে নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ ফের বিক্রি করতাম। যেমন, ফ্রিজের ভালো তামার তারের জন্য সাধারণত ৬৫০ টাকা পাওয়া যেত। ছোটগুলোর দাম ৩৫০ টাকা। তাই আমরা নষ্ট হয়ে যাওয়া ফ্রিজ ১ হাজার টাকায় কিনে, যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যেতাম। তারপর এসব যন্ত্রাংশ ফের বিক্রি করতাম।
'এরপর রিসাইকেল জার আমাদের দেখিয়ে দিল কীভাবে একটা ইলেকট্রনিক পণ্য [নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও] মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। তাই এখন আমরা কোনো মেরামতযোগ্য যন্ত্র সোর্স করলে সেটিকে ফের দোকানে বিক্রি করে দিই। আমাদের থেকে কিনে নিয়ে তারা সেটিকে মেরামত করে সেকেন্ড-হ্যান্ড পণ্য হিসেবে বিক্রি করে।'
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম কী?
সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তুতি আমাদের নেই।
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেমের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সবসময় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে ভাবতেন। সেই ভাবনাই তাকে এই উদ্যোগ শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে।
২০১৯ সালে তিনি আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে নিজের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আকার বাড়তে থাকে তার প্রতিষ্ঠানের। জিয়াউরের লক্ষ্য ছিল দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং অর্থনৈতিক উপায়ে আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো। তিনি চেয়েছিলেন বর্জ্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে, বর্জ্যের সম্ভাব্য মূল্য মানুষকে জানাতে।
জিয়াউর বলেন, 'বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১ কোটি। কিন্তু তারপরও আমরা আমরা যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। এর কারণ হলো এই সমস্যা থেকে আমরা লাভের সুযোগ দেখি না। আর সত্যিটা হলো, কোনো কিছু থেকে লাভের সম্ভাবনা দেখতে পেলেই কেবল আমরা পদক্ষেপ নিই। তাই আমি এই মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম এবং এভাবেই এই উদ্যোগটি শুরু করি।'
জিয়াউর যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করেছেন। বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তিনি। কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংকের সাথে 'লাইটিং এশিয়া' নামক একটি প্রকল্পেও। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভিন্নতা আনার প্রবল ইচ্ছে ছিল তার। আর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজে দেবে, এমন সমাধান খুঁজে বের করায় মন দেন।
তিনি বলেন, 'বর্জ্যহীন বাংলাদেশের কথা ভাবুন। এই স্বপ্নকে সামনে রেখেই কাজ করছি আমরা। আমরা বিশ্বাস করি যে বর্জ্যেরও মূল্য আছে। তাই আমরা একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি যেখানে যে-কেউ তাদের ব্যবহৃত, নষ্ট পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এবং বর্জ্যের মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে আমরা এই বিক্রেতাদের সাথে ভাঙারিওয়ালা, ফেরিওয়ালার মতো রিসাইক্লারদের যোগাযোগ করিয়ে দিই। তারপর তারা এই বর্জ্য রিসাইকেল করে, মেরামত করে এবং পুনর্ব্যবহার করে।
'মানুষ তাদের উৎপাদিত বর্জ্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারে। এইভাবে তারা যেমন টাকা রোজগার করতে পারে, তেমনি ভূমিকা রাখতে পারে পরিবেশ সংরক্ষণেও।'
রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা ও সহপ্রতিষ্ঠাতারা। বাম থেকে ডানে: মোবাশশিরা নাসিন, ফাহমিদা হোসেন প্রভা, জিয়াউর রহমান, তামান্না আক্তার রিচি ও সৈয়দ জোবায়ের। ছবি: নুর-এ-আলম
বিক্রেতারা রিসাইকেল জারের ওয়েবসাইট গিয়ে তৎক্ষণাৎ তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন। সাইটের নিজস্ব কার্বন ফুটপ্রিন্ট ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে নিজেদের কার্বন আউটপুট গণনা করতে পারেন তারা। এ পর্যন্ত রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেম প্রায় ৬ হাজার পরিবারের আয় বাড়িয়েছে, আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমিয়েছে ৬৬ টন। এখন পর্যন্ত ৬১ হাজারেরও বেশি পণ্য পুনরায় বিক্রি করেছে রিসাইজেল জার।
বর্তমানে জায়েদের মতো মোট ৪৭৮ জন অংশীদার রয়েছে রিসাইকেল জারের। অংশীদারদের মধ্যে আছে ফেরিওয়ালা (১৭৮ জন), ভাঙারিওয়ালা (২১১), রিসাইক্লিং কোম্পানি (৪), স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী (১৩), ই-বর্জ্য সংগ্রহকারী (১৬), মার্চেন্ট বর্জ্য ব্যবসায়ী (১১) ও ব্যবহৃত রান্নার তেল ক্রেতা (১)।
মার্কেটপ্লেস সেবার পাশাপাশি রিসাইকেল জার মেরামত, ভাড়া ও বিনিময় সেবাও দিয়ে থাকে।
রিসাইকেল জারের স্থানীয় মেরামত সেবার মাধ্যমে যে-কেউ নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিস মেরামত করতে পারে। সেলফ-স্টোরেজ বা বা ভাড়া সেবাও দিয়ে থাকে রিসাইকেল জার। এ সেবার মাধ্যমে যেকোনো পরিবার তাদের খালি জায়গা অন্যদের ভাড়া দিতে পারে।
বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে ইনভেন্টরি বিনিময় বা অদলবদল সেবাও দেয় রিসাইকেল জার। এই সেবার মাধ্যমের কোম্পানিগুলো কোনো যন্ত্রপাতি ফেলে না দিয়ে সেগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময় করতে পারে। এছাড়া রিসাইকেল জার কর্পোরেট রিসাইক্লিং সমাধানও দেয়। এ সেবার আওতায় রিসাইক্লিংয়ের উদ্দেশ্যে রিসাইক্লারদের সঙ্গে কর্পোরেশনগুলোকে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া রিসাইকেল জার একটি নতুন কার্বন অপসারণ সেবাও দিচ্ছে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এটাই প্রথম। এই সেবার মাধ্যমে কর্পোরেশনগুলো তাদের কার্বন বর্জ্য ফেলে না দিয়ে সঞ্চয় করতে পারছে।
রিসাইকেল জার এখন ভারতের সঙ্গে যৌথ সুন্দরবন-পুনর্বনায়ন নামক একটি প্রকল্পেও কাজ করছে। সুন্দরবন করিডোর বরাবর ক্ষয়প্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্রের একটি পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও করছে তারা।
এ প্রকল্পে ভারত কাজ করছে ১৫ হাজার হেক্টর, আর বাংলাদেশ কাজ করছে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এনকিং ইন্টারন্যাশনাল ১৫ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি পরিচালনা করছে।
পুনর্বনায়ন প্রক্রিয়া কার্বন অফসেটিং দিয়ে সম্পন্ন করা হবে। বাংলাদেশে এই প্রথম একটি বেসরকারি কোম্পানি কার্বন স্টোরেজ নিয়ে কাজ করবে। জিয়াউর বলেন, 'কার্বন অফসেটিং একটি গতিশীল পদ্ধতি। এদেশে কেউ এই ধারণা নিয়ে কাজ করেনি। ভবিষ্যতে আমরা এটি আরও স্থানীয়ভাবে চালু করার পরিকল্পনা করছি।'
ভবিষ্যতে টেকসই প্যাকেজিং ও প্লাস্টিক দূষণ সমাধান নিয়ে আসার পরিকল্পনাও আছে রিসাইকেল জারের। এ বছর নিজেদের অ্যাপ চালু করার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। এখন তারা শুধু ঢাকার মধ্যেই কাজ করলেও, রহমানের লক্ষ্য ভবিষ্যতে সারা রিসাইকেল জারকে বাংলাদেশে বিস্তৃত করা।
তিনি বলেন, 'বর্তমানে আমরা নিজেদের অর্থায়নে চলচি। তবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল বা অনুদান পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জলবায়ুতে আগ্রহী ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদেরও টানতে চাই আমরা।'
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা না করে একটা প্রভাব তৈরির দিকেই তাদের মনোযোগ বেশি। তাদের মূল লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো।
'আমরা কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না, আমরা একটি সামাজিক উদ্যোগ। আমরা এনজিও না, লাভের উদ্দেশ্যে কাজও করি না।'
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অবদান রাখার জন্য রিসাইকেল জার ইকোসিস্টেমকে ইয়ুথ কো:ল্যাব-এর স্প্রিংবোর্ড প্রোগ্রাম ৪-এ বাংলাদেশের সেরা দশ স্টার্টআপের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
11/04/2022
সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের গার্লফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড এর বেস্ট ফ্রেন্ড, খালাত ভাইয়ের নাতি, বউ শ্যালিকার পাড়াতো বোনের ফুফাতো ভাই তাদের জন্য যেন নামমাত্র কোম্পানী খুলে ফান্ড বরাদ্দ না হয় সেজন্য কি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?
খবরটা ভালো যে জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২-এর খসড়া
স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং স্কিম চালু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক । কারন আমলারা এত খায় যে দলীয় কর্মীরাই এখন বঞ্চিত।
#করাপটেডআমলাবাংলাদেশ
30/01/2022
স্যামসাংয়ের হাত ধরে যেভাবে হাই-টেকের পথে হাঁটছে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস
২০১৮ সালের জুনে প্রায় ৫৫ বিঘা জমির ওপর যাত্রা শুরু করে ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের নরসিংদীর কারখানা। এই কারখানায় বর্তমানে কাজ করছেন ২ হাজারের বেশি প্রকৌশলী, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি।
দেশে ইতিমধ্যে প্রায় আধডজন ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন করে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস। প্রতিষ্ঠানটি এবার একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশেই যাত্রীবাহী গাড়ি সংযোজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফেয়ার গ্রুপ একে বলছে 'প্রোগ্রেসিভ ম্যানুফ্যাকচারিং'। এ কৌশলে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে বলে প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি জানার এবং উন্নয়ন ও গবেষণায় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। এতে স্থানীয় ক্রেতারা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনার সুযোগ পাবেন সুলভ দামে।
এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে চীনের মতোই বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে ব্যবসাগোষ্ঠীটি। আর ফেয়ারেরর অতীত ইতিহাসও তাদের এই দাবির সপক্ষেই কথা বলে।
উদাহরণ হিসেবে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২২ আলট্রা ৫জি হ্যান্ডসেটটির কথাই ধরা যাক। কোরিয়ান ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট স্যামসাং এই হ্যান্ডসেটটি ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিকভাবে লঞ্চ করবে। কোরিয়ান প্রযুক্তি সহায়তায় স্থানীয় প্রকৌশলীরা ফেয়ারের নরসিংদীর কারখানায় বাংলাদেশের বাজারের জন্য ফোনটি তৈরি করবেন। এদেশে স্যামসাংয়ের অ্যাসেম্বলি পার্টনার পার্টনার হলো ফেয়ার।
কারখানায় ফেয়ার গ্রুপ এখন অন্যান্য স্যামসাং ফোনও—যেমন জেড ফোল্ড ৩ ৫জি, এস২১, এস২১ প্লাস, আলট্রা ও নোট প্লাস—উৎপাদন করছে।
ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের প্রধান মার্কেটিং অফিসার মেছবাহ উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কোরিয়ান অংশীদারিত্ব আমাদেরকে একটি অত্যাধুনিক ইলৈকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। আমাদের তরুণরা এখন কোরিয়ান ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে প্রোডাকশন লাইনে কাজ করে দক্ষ হচ্ছে।'
২০১৮ সালের জুনে প্রায় ৫৫ বিঘা জমির ওপর যাত্রা শুরু করে ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের নরসিংদীর কারখানা। এই কারখানায় বর্তমানে কাজ করছেন ২ হাজারের বেশি প্রকৌশলী, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি।
বাংলাদেশের বাজারে মোবাইলের প্রায় শতভাগই আসে নরসিংদীর এ কারখানা থেকে। এছাড়া ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেনেরও ৯০ শতাংশই জোগান দিচ্ছে এ কারখানা।
ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের প্রধান মার্কেটিং অফিসার জানান, কোরিয়ানদের কাছ থেকে শিখে দেশীয় প্রকৌশলীরা এখন স্যামসাংয়ের পণ্য রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করছেন।
তিনি বলেন, 'আমাদের প্রকৌশলীদের উৎপাদন জ্ঞান এবং দক্ষতার কারণে বাংলাদেশের কারখানা স্যামসাংয়ের ২৬টি বৈশ্বিক কারখানার মধ্যে ৭ম স্থান অর্জন করেছে।'
কাজ হচ্ছে আরএনডি ট্রান্সফারের মাধ্যমে
ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের এ কারখানার নিজস্ব আরএনডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) না থাকলেও স্যামসাংয়ের মূল আরএনডি ট্রান্সফারের মাধ্যমে স্থানীয় প্রকৌশলীদের দিয়েই প্রায় সব কাজ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মেছবাহ উদ্দিন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানাটি চার লেয়ারের দক্ষ জনবল নিয়ে গঠিত। প্রথম লেয়ারটি সরাসরি স্যামসাংয়ের প্রকৌশলী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা এসেছেন কোরিয়া ও ভারত থেকে।
প্রথমদিকে এই কোরিয়ান ও ভারতীয়রাই ছিলেন কারখানার মূল ভরসা। তবে স্থানীয় দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হওয়ায় এখন মাত্র ৬ জন বিদেশি রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় লেয়ারের প্রকৌশলীরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি। দেশেরই বিভিন্ন প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেছেন তারা। তবে নিয়োগের পর তাদেরকে কোরিয়া থেকে ৪০-৪৫ দিনের প্রশিক্ষণ করিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ স্যামসাংয়ের অন্যান্য কারখানা থেকেও হাতে-কলমে কাজ দেখিয়ে আনা হয়েছে তাদের।
তৃতীয় ও চতুর্থ লেয়ারের লোকবলও দেশেই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা। নিয়োগের পর অন্তত এক মাস তাদের প্রশিক্ষণ পিরিয়ড থাকে। এই সময় তারা শুধু কারখানায় দেখেন এবং খসড়া প্রোডাক্ট তৈরি করেন।
স্যামসাংয়ের অত্যাধুনিক মেশিনারি স্থাপনে নরসিংদীর কারখানায় এখন পর্যন্ত ২০০ মিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে ফেয়ার গ্রুপ। কাঁচামাল ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং মার্কেটিং মিলিয়ে এ বিনিয়াগ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন মেছবাহ উদ্দিন।
তিনি বলেন, 'কারখানার পাশাপাশি সারা দেশে কনজিউমার ইলেকট্রন্কিসের জন্য নিজস্ব ৫০টির বেশি শো-রুম, মোবাইলের জন্য ৪০টির বেশি শো-রুম রয়েছে। এছাড়া মোবাইলে ২২৫টির মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি ও কনজিউমার ইলেকট্রনিকসে ১৪০টির মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিতেও রয়েছে ক্যাপিটাল সাপোর্ট।'
মেছবাহ উদ্দিন আরও বলেন, 'মোবাইল ছাড়াও বাংলাদেশের প্রায় রেফ্রিজারেটরও আমরা উৎপাদন করি। এই কারখানায় বানানো ৮টি মডেল দেশে বিক্রিত স্যামসাংয়ের ফ্রিজের ৯৩ শতাংশ কভার করে। আমরা এখন কমপ্রেসার ছাড়া আর কিছু আমদানি করি না।
'গত বছর থেকে আমরা এয়ার কন্ডিশনার বানানো শুরু করেছি। শুধু কমপ্রেসার ছাড়া বাকি সব পার্টসই নিজেরা বানাই। এগুলোতে ৪০ শতাংশের বেশি ভ্যালু অ্যাডিশন হয়।'
স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ফলে দাম আসছে হাতের নাগালে
ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের পণ্য অ্যাসেম্বলিং করায় স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের দাম কম রাখতে পারছেন।
যেমন ইউরোপ-আমেরিকাসহ বৈশ্বিক মার্কেটে স্যামসাংয়ের সর্বশেষ প্রযুক্তির মুঠোফোন জেড ফোল্ড-৩ ৫জি-র দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ১.৭ লাখ টাকা, ভারতে এর দাম ১.৭৪ লাখ টাকায়। কিন্তু ক্যাশব্যাক অফার, লটারি ও গিফটসহ বাংলাদেশের বাজারে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস এই ফোন বিক্রি করছে ১.৫ লাখ টাকায়।
মেছবাহ উদ্দিন বলেন, 'দেশে সংযোজন না হলে আমদানি দামের সঙ্গে ৫৭ শতাংশ ট্যাক্স যোগ হতো। ফলে এই ফোন ২ লাখের নিচে পাওয়া যেত না।'
রি-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সুফল বর্ণনা করে তিনি বলেন, 'আরবি২১ আমাদের সর্বোচ্চ বিক্রিত রেফ্রিজারেটর। আমরা প্রথম যখন এর সিভিইউ আনি, তখন দাম পড়েছে ৪৯ হাজার ৯৯০ টাকা। এরপর আমরা যখন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে গিয়েছি, তখন দাম চলে এসেছে ৩৪ হাজার টাকায়। এখন আমরা এটাকে আবার রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। তা সম্পূর্ণ হলে দাম ৩০ হাজার টাকার এর নিচে চলে আসবে।'
তিনি আরও বলেন, 'একটি ৬৫ ইঞ্চি ইউএসডি টিভির দাম এখন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। আমরা ম্যানুফ্যাকচারিং করার আগে এটি ২ লাখ টাকার ওপরে ছিল। একই অবস্থা ওয়াশিং মেশিন, এসির ক্ষেত্রেও।'
গাড়ি সংযোজন শুরু করছে ফেয়ার
ফেয়ার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফেয়ার টেকনোলজিসের হাত ধরে দেশে আসছে আরেক কোরিয়ান জায়ান্ট, যাত্রীবাহী গাড়ি উৎপাদনকারী হুন্দাই মোটর কোম্পানি।
ফেয়ার টেকনোলজিসের নিজস্ব অর্থায়নে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে প্রায় ৬ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে হুন্দাই গাড়ি যৌথ উদ্যোগের সংযোজনকারী কারখানা। প্রাথমিকভাবে হুন্দাইয়ের সাম্প্রতিক মডেলের সর্বাধিক জনপ্রিয় গাড়ি সেডান, এসইউভি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল) এবং এমপিভি (মাল্টি-পারপাজ ভেজিকেল) উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে ফেয়ার টেকনোলজিস।
ফেয়ার টেকনোলজিসের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, 'হুন্দাইয়ের এ কারখানা আমাদের দেশের জন্য এক নতুন মাইলফলক। এখানে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে। হুন্দাইয়ের গাড়ি উৎপাদনের কারণে ড্যাশবোর্ড, সিট কভার, রাবারসহ অন্তত ১০০টি আনুষঙ্গিক ম্যাটেরিয়াল দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।'
06/12/2021
ব্যবসা ও বিনিয়োগ: বাংলাদেশে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে মার্কিন কোম্পানি জিই
মেহেদী হাসান রাহাত
বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে পদচারণা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই)। প্রথমদিকে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সরবরাহ করত তারা। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটি সেখানেও প্রযুক্তি ও অর্থায়ন করে। বর্তমানে সামিট করপোরেশন, ইউনিক গ্রুপ ও রিলায়েন্সের মতো কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে জিইর। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য, এভিয়েশন, তেল, গ্যাস ও যোগাযোগ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৌশলগত অবস্থান আরো বিস্তৃত করছে মার্কিন কোম্পানি জিই।
২০১৯ সালে জিইর সঙ্গে ২২ বছরের জন্য ৫৮৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য চুক্তি করে সামিট করপোরেশন। রিলায়েন্স বাংলাদেশ এলএনজি অ্যান্ড পাওয়ারের নির্মাণাধীন ৭১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উন্নত প্রযুক্তির গ্যাস টারবাইন সরবরাহের চুক্তি করে জিই। সর্বশেষ এ বছর রিলায়েন্সের এ বিদ্যুকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিজিটাল সমাধান প্রদানে ২২ বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে জিই।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা বলছেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। আরো বাড়বে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী হিসেবে এতদিন শুধু শেভরনের নামই উচ্চারণ হলেও এখন জিইসহ আরো বেশকিছু কোম্পানির নাম উঠে আসছে। শেভরনের কাজের পরিসর নিকটভবিষ্যতে যদি আর না বাড়ে সেক্ষেত্রে অবধারিতভাবেই জিই হবে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী কোম্পানি। বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণেও আগের তুলনায় বর্তমানে জিইর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এ দেশে আরো বেশি বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে জিইর কৌশলগত ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে সামিট করপোরেশন, ডানা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস, ক্লার্ক এনার্জি, মেডিট্রাস্ট, ইউনিহেলথসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। গ্যাসের পাশাপাশি বাষ্পভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও জিই প্রযুক্তি সরবরাহ করে। এছাড়া জিই পাওয়ার সার্ভিস বিজনেসের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন আয়ের সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানো এবং কেন্দ্র সচল রাখার মতো সমাধান দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ভূ-তাপীয়, স্রোত, জৈব ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি সরবরাহ করছে জিই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করছে জিই। সমুদ্র ও ভূপৃষ্ঠে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রযুক্তিও সরবরাহ করে কোম্পানিটি। ফলে ভবিষ্যতে এ খাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে জিইর অংশীদারিত্ব আরো বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এভিয়েশন খাতে বাণিজ্যিক ও সামরিক দুই ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহ করে জিই। রেলপথ নির্মাণ, রেলের ইঞ্জিন ও খননকাজে ব্যবহূত প্রযুক্তির অন্যতম বড় সরবরাহকারী জিই। ফলে এসব খাতেও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে জিইর যাত্রা ১৯৭০ সালে প্রথম গ্যাসভিত্তিক টারবাইন সরবরাহের মাধ্যমে। ১৯৭৬ সালে দেশে প্রথম কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি সরবরাহ করে কোম্পানিটি। ১৯৯৫ সালে জিই প্রথমবারের মতো গ্যাস টারবাইনে কন্ট্রোলস রেট্রোফিট স্থাপন করে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের মেঘনাঘাটে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইকুইটি বিনিয়োগ করে। একই বছর বিবিয়ানা-২ গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো এফ ক্লাস প্রযুক্তি সরবরাহ করে। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি) জিইর কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার ব্লক গ্রহণ করে।
একই বছর বিবিয়ানা-২ গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি সক্ষমতার ট্রান্সমিটার সরবরাহ করে। ওই বছর ফেঞ্চুগঞ্জে ম্যাক্স পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯ই ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পাওয়ার ব্লক সরবরাহ করে। ২০১৬ সালে ঘোড়াশাল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-৩-এর রি-পাওয়ারিং চুক্তি পায় জিই। একই বছর একই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-৪-এর সরঞ্জামাদি সরবরাহের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরই ওরিয়ন পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার ও এসটিজি প্যাকেজের কাজ পায় জিই। ২০১৭ সালে সামিট করপোরেশনের ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইনের কার্যাদেশ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরই জিয়াংশু ইটার্ন কোম্পানির ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন ও ভোলায় শাপুরজি পাল্লোনজি গ্রুপের ২২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামাদি সরবরাহের কার্যাদেশ পায় জিই। একই বছর বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ৬৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পায় মার্কিন এ কোম্পানি।
২০১৮ সালে মেঘনাঘাটে ইউনিক গ্রুপের ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নয়ন ও গ্যাস টারবাইন সরবরাহের দায়িত্ব পায় জিই। ভারতের গদ্দায় আদানি গ্রুপের ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এসটিজি প্যাকেজ সরবরাহে চুক্তি করে জিই। এ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করবে ভারত।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে জিইর অংশীদারিত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, শুরু থেকেই বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে জিই আমাদের সঙ্গে ছিল। গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে গেলে জিইর কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জিইর কাছ থেকে আপনি সব ধরনের সেবাই পাবেন, যা প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় অংশীদারে পরিণত করেছে। এমনকি ভবিষ্যতে ব্যবসাকে কীভাবে টেকসই করা সম্ভব সে বিষয়েও তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া যায়, যা এ খাতের অন্যান্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায় না। ফলে সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের সঙ্গে জিইর একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব থাকবে।
২০০২ সালে দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রথমবারের মতো সিটি ও এমআরআই প্রযুক্তি স্থাপন করে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। ২০০২-০৫ সালের মধ্যে জিই প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা হেলদিম্যাজিনেশন চালু করে। ২০১০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তে প্রথম ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফি সিস্টেম, পিইটি সিটি ইমেজিং সিস্টেম ও মেডিকেল সাইক্লোট্রন সুবিধা স্থাপন করে জিই। ২০১২ সালে জিই হেলথকেয়ার প্রথম ও একমাত্র ১২৮-স্লাইস সিটি অ্যান্ড ১.৫টি এমআরআই সরবরাহ করে। ২০১৪ সালে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ফরটিস হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট সিস্টেম ও এমআরআই সিস্টেম স্থাপন করে জিই।
স্বাস্থ্য খাতে জিইর কার্যক্রম প্রসঙ্গে ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, জিই স্বাস্থ্য খাতে ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে কাজ করে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের ক্ষেত্রে জিইর অবস্থান এখন তৃতীয়।
জিই এভিয়েশনের কাছ থেকে ২০০৯ সালে ইঞ্জিন কিনতে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ বিমান। ২০১১ সালে বিমান বাংলাদেশ জিইর কাছ থেকে আরো ইঞ্জিন কেনার কার্যাদেশ দেয়। এছাড়া ২০১৮ সালে কর্ণফুলী পেপার মিলের সোডা বয়লার সংস্কারের কাজ পায় তারা। মেমব্রেন বায়ো রিঅ্যাক্টর পদ্ধতির ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (ইটিপি) প্রযুক্তিও সরবরাহ করছে জিই।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। আবার বাংলাদেশের পণ্য আমদানির উৎস দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দেশটি। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছে ৯২৪ কোটি ২২ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের। এর মধ্যে রফতানি হয়েছে ৬৯৭ কোটি ৪০ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের পণ্য। আমদানি হয়েছে ২২৬ কোটি ৮২ লাখ ডলারের।
এদিকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) সবচেয়ে বড় উৎস দেশও যুক্তরাষ্ট্র। পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টক বিবেচনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এফডিআই স্টকের আকার ছিল ৩৮৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আসা নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ২৪ কোটি ২ লাখ ডলারের।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, শেভরন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আছে শুধু গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে। গভীর সমুদ্রে কাজের সুযোগ পেলে কোম্পানিটির বিনিয়োগ অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে জিইর বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাংলাদেশে অনেক বিস্তৃত। শুধু সামিটের সঙ্গেই কোম্পানিটির ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হওয়ার কথা। স্বাস্থ্য খাতের কারিগরি উপকরণগুলোয় জিই অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা শেভরনের চেয়ে জিইর অনেক বেশি। বলা যায় বহুমুখী সম্ভাবনা আছে জিইর। এ কোম্পানিগুলোসহ বাংলাদেশে এখন মার্কিন অনেক কোম্পানি আছে যারা বিনিয়োগের ব্যাপ্তি ধীরে হলেও বাড়াচ্ছে। যেমন ওরাকল, গুগল, ভিসা, কোকা-কোলা। আবার প্রাণের সঙ্গে প্রডাকশন শেয়ারিংয়ে গিয়েছে প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল। সামগ্রিকভাবে আগে শেভরনের মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত ছিল মূলত জ্বালানি খাতে। এখন জিই ও অন্য বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ আগের চেয়ে অনেক বৈচিত্র্যময়।
১৮৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছিলেন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। পরবর্তী সময়ে এ ল্যাবরেটরিতেই তিনি বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা পৃথিবীর পুরো সভ্যতাকেই বদলে দিয়েছিল। ১৮৯০ সালে তিনি তার বিভিন্ন ব্যবসাকে একত্র করে এডিসন জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি আজকের বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) কোম্পানি। সম্প্রতি জিইর গ্লোবাল হেডকোয়ার্টার থেকে এভিয়েশন, হেলথকেয়ার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল খাতকে বেশি প্রাধান্য দেয়ার ঘোষণা এসেছে। এক্ষেত্রে তিনটি কোম্পানির মাধ্যমে তারা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ২০২০ সালে জিইর বার্ষিক আয় হয়েছে ৭৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ২৫৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার
10/11/2021
বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র কৃষি যন্ত্রের বাজার
কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো দেশে কৃষি যন্ত্রের বড় বাজার তৈরি হয়নি, তবে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সারাদেশেই এসব যন্ত্রের বড় একটি বাজার তৈরি হবে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কিছু কোম্পানি বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
কৃষির আধুনিকায়নের জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে সারাদেশে ৫২ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে সরকার। এই বড় বাজারের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে ভারী কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে এসিআই মটরস, মুন্নু এগ্রোসহ হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি ভারী কৃষিযন্ত্র আমদানি করে। তবে সারাদেশে শতাধিক প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট কৃষিযন্ত্র তৈরি করছে। সরকার ভারী কৃষিযন্ত্র যেমন কম্বাইন্ড হার্ভেষ্টর, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মত যন্ত্রে অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। এজন্য ৩০২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদী কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০২০-২১ সাল থেকে।
কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনো দেশে কৃষি যন্ত্রের বড় বাজার তৈরি হয়নি, তবে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সারাদেশেই এসব যন্ত্রের বড় একটি বাজার তৈরি হবে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কিছু কোম্পানি বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
এসিআই এগ্রি বিজনেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এফ এইচ আনসারি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কৃষি যন্ত্রপাতিতে বাংলাদেশে ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজার আছে। কিন্তু বর্তমানে যে পরিমাণ কৃষিযন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে তার বাজার মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকার।'
তিনি বলেন, 'কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাজার বড় হবে এবং এটি বিনিয়োগের খাত হিসেবে বিবেচিত হবে।'
কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'পর্যায়ক্রমে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরি করতে চাই। বর্তমানে বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তা আমরা কমিয়ে আনতে চাই। ইতোমধ্যে আমরা ইয়ানমার, টাটাসহ অনেক কোম্পানির সাথে কথা বলেছি, তাদেরকে অনুরোধ করেছি যাতে তারা বাংলাদেশে কৃষিযন্ত্র তৈরির কারখানা স্থাপন করে।'
এগ্রিকালচার মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, এসিআই মটরস ও আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ ভারী কৃষিযন্ত্র আমদানি করছে। এর মধ্যে এসিআই জাপানের ইয়ানমার কোম্পানি থেকে কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি করে। তবে জাপানি এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে দেশে ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির পরিকল্পনা করছে এসিআই।
এসিআই সূত্রে জানা যায়, ইয়ানমারে সঙ্গে চুক্তির জন্য এসিআই আলোচনা করছে। কারণ বিশ্বব্যপী ইয়ানমার যে ধরনের কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করে তা বাংলাদেশের ভুমির প্যাটার্নের কারণে সবগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার উপযোগী নয়। কিছুটা পরিবর্তন এনে এ যন্ত্রগুলো তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে যন্ত্রপাতি তৈরির মত যথেষ্ট প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলও বাংলাদেশে নেই।
যন্ত্র তৈরিতে এই কারগরি সহযোগিতাগুলো ইয়ানমারের কাছ থেকে এসিআই নিতে চায়। বাংলাদেশে শ্রমিকের খরচ কম হওয়ায় ইয়ানমার এদেশে কারখানা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা এখানে উৎপাদিত কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশে চাহিদা মিটিয়ে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে সরবরাহ করতে চায় বলে একটি সূত্রে জানা যায়।
তবে কত টাকা বিনিয়োগ করা হবে, কীভাবে জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি তৈরি করা হবে সেগুলো নিয়ে আলোচনা চললেও চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে এসিআই ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় কারখানা তৈরির জমি খুঁজছে বলেও জানা গেছে।
এসিআই মানিকগঞ্জে হালকা কৃষি যন্ত্র তৈরির জন্য একটি অটোমেটেড কারখানা তৈরি করেছে। ডাচ সরকারের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, এফএমও, সিঙ্গাপুর ভিত্তিক এসডিআই প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
এদিকে কৃষিযন্ত্রপাতির সেক্টরে ভালো সম্ভাবনা থাকায় মুন্নু এগ্রো চলতি বছর তাদের একটি পুরনো একটি টুলস ফ্যাক্টরীতে এবছরই ছোট পরিসরে কৃষিযন্ত্র তৈরি করছে। শস্য মাড়াই যন্ত্র, রিপার ও বীজ বপনের জন্য কৃষি যন্ত্র তৈরি করছে। এই যন্ত্রগুলো তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি একটি অত্যাধুনিক কারখানা গড়ে তুলতে চায়। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক অবস্থায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায়।
মুন্নু এগ্রোর কোম্পানি সচিব বিনয় পাল বলেন, 'আমরা কৃষি যন্ত্রের বাজারে ভালো সাড়া পাচ্ছি। যে কারণে টুলসের ব্যবসা ছোট করে এনে কৃষিযন্ত্র তৈরিতে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছি। বড় বিনিয়োগের অর্থায়নের জন্য আমরা ঋণের চেষ্টা করছি।'
এগ্রিকালচার মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আলিম ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলিমুল এহসান চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, 'ছোট কৃষি যন্ত্র তৈরি করছে এমন কোম্পানি রয়েছে কয়েকশো। সরকারের উচিত এদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা। যাতে এর মধ্য থেকেও কিছু কোম্পানি বড় কৃষিযন্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে।'
বর্তমানে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার
চাষের জন্য জমি কর্ষণে প্রায় ৯৫ শতাংশ জমি পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়েনি ফসল লাগানো, কাটা বা মাড়াইয়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক তথ্যে দেখা গেছে, সারাদেশে ফসল লাগানোর জন্য মাত্র ১ শতাংশ জমিতে কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। আর ফসল কাটা এবং মাড়াই করার জন্য ৩ শতাংশের কিছু বেশি জমিতে যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
এফ এইচ আনসারি বলেন, 'কৃষি যন্ত্রের মধ্যে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারেরই চাহিদা বেশি। এসব যন্ত্র বছরে প্রায় ১০ হাজার বিক্রি হয়।'
কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি যন্ত্রের আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে কৃষি যন্ত্রপাতির বার্ষিক বাজার ৩ হাজার কোটি টাকা। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারও এখনো আমদানি নির্ভর। তবে স্থানীয় উৎপাদকারীরা যেসব ছোট যন্ত্র তৈরি করছে তার বাজার মাত্র ৩০০-৩৫০ কোটি টাকার।
২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের অধীনে ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা দেশে ১৭৬২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর, ৩৭৯টি রিপার, ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ প্রায় ২ হাজার ৩০০টি বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৬৮০ কোটি টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি পর্যায়ে জোরেশোরে যান্ত্রীকীকরণের জন্য গুরুত্ব বাড়ানো হয় ২০১০ সালে। এ সময় ১৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার আওতায় যন্ত্র ক্রয়ে কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান করা হয়, যখন কিনা ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের চাহিদা তৈরি হতে থাকে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে 'এনহান্সমেন্ট অব ক্রপ প্রোডাকশন থ্রু ফার্ম মেকানাইজেশন প্রজেক্ট- ফেইজ টু' নামে ৩৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আরও একটি প্রকল্প শুরু করে বাস্তবায়ন করে সরকার।
এরপরও ভারী যন্ত্রের ব্যবহার খুব একটা না বাড়ার কারণ হিসেবে প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক শেখ মো. নাজিম উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'মেশিনগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ লোকের ঘাটতি রয়েছে, একই সঙ্গে ঘাটতি রয়েছে মেশিনারিজ সার্ভিসিং এর জন্য যে ব্যকওয়ার্ড লিংকেজ দরকার তা এখনো ঠিকভাবে গড়ে উঠেনি।'
সব ধরনের ফসল চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ লাগানো বা বোনা, পাকা ফসল মাড়াই-ঝাড়াইয়ের নানা ধাপে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে দেশে তৈরি যন্ত্র যেমন আছে তেমনি আমদানি করা ভারী যন্ত্রপাতিও রয়েছে।
পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের বাইরে ভারি যন্ত্র বলতে মাড়াইয়ের কাজে বিভিন্ন ধরনের থ্রেশারের ব্যবহার বাড়ছে। সারাদেশে প্রায় দেড় হাজারের মত থ্রেশার ব্যবহার হচ্ছে।
ধান কাটার যন্ত্র রিপার নামে পরিচিত। বর্তমানে রিপার ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২২০০টির মত। ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়া ও বস্তাবন্দি করার জন্য ব্যবহার করা হয় কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর। যার ব্যবহার মূলত শুরু হয় ২০১৬-১৭ তে। শুরুর এই বছরে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর বিক্রি হয়েছিল ৭৮টি। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় তিন হাজারের মত কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর ব্যবহার হচ্ছে।
ধান রোপনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার। যার পরিচিতিমূলক ব্যবহার শুরু হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। তবে এই যন্ত্রটির ব্যবহার দ্রুত বাড়েনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসেবে দেখা গেছে মাত্র ১১৪টি রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার বিক্রি হয়েছে সারাদেশে। পরবর্তীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
দেশে যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কম্বোডিয়া থেকে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, বর্তমানে কৃষি খাতের সব ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্মিলিতভাবে হিসাব করা হলে হেক্টরপ্রতি ২ কিলোওয়াট শক্তি ব্যবহার হয়, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে ৪ থেকে ৬ কিলোওয়াট।