25/07/2023
অবকাঠামো বিনিয়োগকে আমরা এত ভয় পাই কেন? কি শত্রুতা অবকাঠামোর সাথে?
গত মে মাসে আইএমএফ এর রোড ট্রান্সপোর্ট কোয়ালিটি নিয়ে করা র্যাংকিং নিয়ে লিখব লিখব করে লেখা হয়নি। ভেবেছিলাম আমাদের দেশের মিডিয়াতে আসবে। হয়ত এসেছে। কিন্তু আমার চোখে পড়েনি।
আমার নজরে পড়েছিল শ্রীলংকান একটি নিউজ যেখানে শ্রীলঙ্কার বাজে ট্রান্সপোর্ট কোয়ালিটি নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখেছিলাম। শ্রীলংকায় সড়ক পথের গড় গতিবেগ মাত্র ৫০ কিলোমিটার। বলা হয়েছিল শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে তারা। আক্ষেপের বিষয় হল বাংলাদেশে গড় গতিবেগ মাত্র ৪১ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। খারাপের দিক থেকে আমরা চতুর্থ। পাহাড়ি দেশ ভুটানের গতিবেগ সবথেকে কম। তাও ৩৮ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ভারতে ৫৮ কিমি, পাকিস্তানে ৮৬ কিমি।
এই কথা বলার কারন হল জনবহুল এই দেশে আমাদের সড়ক বলি, রেল বলি বা অন্যান্য অবকাঠামো বলি আমরা সেটা গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের এখানে যে পরিমান বিনিয়োগ দরকার তার অর্ধেক ও করতে পারিনি। একটা উদাহরন দেয়া যাক:
হার্ট পাম্প করে মানবদেহের প্রতিটা কোষে রক্ত পৌছায়। যদি কখনো এমন হয় যে হার্টের শিরা বা ধমনীতে কোলেস্টেরল জমেছে সেক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালনে বাধা পায় এবং বড় রকমের বিপদের সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য সুস্থ হার্ট গুরুত্বপূর্ণ। হার্টের সাথে প্রধান যেসব আর্টারি ও ভেইন রয়েছে সেগুলাতে বাধামুক্ত বা চর্বিমুক্ত রাখাটা সুস্থ দেহের রক্তসঞ্চালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটা দেশের ক্ষেত্রেও অনেকটা এভাবে বিবেচনা করা যায়। বিশাল দেশের অর্থনীতির সঞ্চালক হল এর নদীপথ, রেলপথ ও সড়ক যোগাযোগ। কিন্তু আর্টারি ও ভেইন গুলাতে কোলেস্টেরল জমে যেমন রক্ত সরবরাহে বাধার সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি ট্রাফিক জ্যাম একটা দেশের অর্থনীতির কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ধরুন উত্তরাঞ্চলের কোন এক গ্রামীন অঞ্চলে কোন পণ্য ভাল উৎপাদন হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভাল না থাকবার কারনে সেই পণ্য দেশের অন্য অঞ্চলে আসতে পারেনা। আবার যদি পণ্য আনতে হয় তবে গাজীপুর, সাভারের ভয়ানক জ্যামে আটকে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। পচনশীল দব্য হলে পণ্য নষ্ট হয়। এই জ্যাম হল অনেকটা কোলেস্টেরল এর মত যেটা রক্তসঞ্চালনের বাধা সৃষ্টির মতই অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক হবার ফলে বিশ্বের সবথেকে দুর্বল অবকাঠামোর ভাগিদার আমরা। প্রথমত নদী, খাল, বিল এর কারনে এখানে সড়ক পথ নির্মানে প্রচুর সেতু, কালভার্ট নির্মান করা লাগে। আর নরম নিচু মাটি ভরাট করে পথের বেজ তৈরি করতে হয় যা সময় সাপেক্ষ্য ও আর্থিক দিক থেকেও খরুচে। কিন্তু নদীপথে যে যোগাযোগ ব্যাবস্থা সহজ হবে সেটার সুযোগ ও কম। আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রবাহ সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী মৃত অথবা বছরের অল্প সময়ে জীবিত ও পানিপথে চলাচলের উপযোগী থাকে।
রেল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এখানেও অজস্র নদী, নালা, খাল, বিলের কারনে রেলপথ সব স্থানে পৌছানো সম্ভব হয়নি।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অবকাঠামোতে যে পরিমান বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল সেটা হয়নি। আর এজন্যই অবকাঠামো ঘাটতি আকাশচুম্বী হয়েছে। অপ্রতুল অবকাঠামো চাহিদা সামাল দিতে না পারায় এক অপরিকল্পিত বসবাস অনুপযোগী শহরে পরিনত হচ্ছে দেশ, যেখানে গড় গতিবেক ঢাকায় হেটে যাওয়ার থেকেও কম।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং দেশের প্রতিটি কোণায় যোগাযোগ গতিময় ও সহজ করতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। ভাবতে অবাক লাগে যে ঢাকা চট্টগ্রাম সড়ককে ৪ লেনে উন্নিত করবার আগে কোন জাতীয় মহাসড়ক ৪ লেনের ছিলনা। আরো অবাক লাগে যে আমরা ঢাকা চট্টগ্রাম ৪ লেন করতে গিয়ে বুঝেছি যে এদেশে এক্সপ্রেসওয়ে করা দরকার। দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে ঢাকা মাওয়া ভাঙ্গা! এর আগে এদেশে এক্সেস কন্ট্রোল সড়ক ছিলনা! আরো প্যাথেটিক বিষয় হল আমরা দেশের প্রধান সড়ককে চার লেনে উন্নিত করার চিন্তা ভাবনা করছি যেখানে সড়কগুলি ১২ লেনে করা দরকার। এক্সপ্রেসওয়ে ৮ লেন এবং দুই পাশে দুই লেনের দুটি সার্ভিস লেন। আমরা হয়ত আবার দেখব যে ৪ লেন করে কাজ হচ্ছে না। তখন প্রকল্প ব্যয় আরো বাড়িয়ে আমাদের ১২ লেনেই যেতে হবে। আমরা দেরিতে বুঝি। এটাই সমস্যা।
ভারতের অবস্থা দিয়ে শুরু করি। দেশটিতে টোটাল এক্সপ্রেসওয়ে আছে ২,০৭৪.৫ কিলোমিটার। বৃহৎ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ভারতের সবথেকে দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে পুরবাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ে যেটার দৈর্ঘ ৩৪০.৮ কিলোমিটার। দিল্লি-মেরুত এক্সপ্রেসওয়ে ১৪ লেনের।
গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের পরিকল্পনা প্রতিটা রাজ্যকে দ্রুতগতির সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করা। আরেকটা বড় প্রকল্প হল ভারতমালা প্রকল্প। এই প্রকল্পে ভারত মোট ৮৩,৬৭৭ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করে সব রাজ্যকে জুড়ে দিবে। চিকেন নেক নিয়ে যে ভয় বা দূর্বলতা সেটাও জয় করার প্রয়াস তারা নিয়েছে। এই প্রকল্পে ৩৪,৮০০ কিলোমিটার নির্মানে তারা বিনিয়োগ করবে ৫.৩৫ লক্ষ কোটি রুপি।
পাকিস্তান সিপিইসির মাধ্যমে তাদের অবকাঠামো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার প্র্যয়াস পেয়েছে।
প্রশ্ন হল কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি প্রয়োজনীয় নয় সেটার ক্ষেত্রে একটু ক্রিটিকাল থিংকিং করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছোট দেশে জনসংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত। আর যত বেশি মানুষ তত বেশি পরিবহন চাহিদা। আর যত বেশি পরিবহন চাহিদা তত বেশি বিনিয়োগ জরুরি যতক্ষণ পর্যন্ত জ্যাম বিষয়টাকে জিরোতে নামিয়ে আনা না যায়। দেশের প্রধান সড়কগুলি এত বছরেও চার লেন ছিল না। এখন এটাকে চার লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নিত করা হচ্ছে। তবে ঢাকা চট্টগ্রাম চার লেনের সময় ও আমাদের মাথায় আসেনি সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়ে করা গেলে লিড টাইম কতটা কমিয়ে আনা যেত। শুরুতে ঢাকা মাওয়ার ৩৫ কিলোমিটার হল বাংলাদেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। এটার দারা বুঝা যায় যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলির সাথে প্রতিযোগিতার বিচারে আমরা কতটা পিছিয়ে। আমাদের সরবরাহ ব্যাবস্থার নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল।
চার লেনের পরিবর্তে ন্যাশনাল হাইওয়ে গুলি ৮ লেনের করা উচিত। আর আঞ্চলিক সড়ক ৪ চার লেনের করা উচিত। এর প্রধান কারন হল এদেশে কিলোমিটার প্রতি মানুষের ঘনত্ব সবথেকে বেশি। আর এত মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে চার লেন বেশিদিন সুফল আনতে পারবে না।
এখন প্রশ্ন থেকেই যায়, আমাদের কি ঋন বেড়ে যাবে? এত বিনিয়োগ করলে কি আমরা দেউলিয়া হব?
কিছু প্রকল্প আছে যেটা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু অপ্রয়জনীয় প্রকল্পের তকমা কোন ধ্রুবক নয়।
একটি উদাহরন দেয়া যেতে পারে। বরিশাল ভোলা সেতু নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘের দেশের বৃহত্তম এই সেতু করতে প্রায় ৯,৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন আসতে পারে একটি দ্বীপ জেলার পেছনে এত টাকা ব্যয় কেন করব? এতে কি আসলেই রিটার্ন আসবে?
আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শরিয়তপুর চাঁদপুর সেতু। আপাত দৃষ্টিতে এই সব সেতু করে কোন লাভ নেই। রিটার্ন আসবে না। কিন্তু চিন্তার পরিধি একটু বড় করি। যদি ভোলা সেতু করতে হয় তবে এটা লাভজনক নয়। তবে যদি সম্পুরক প্রকল্প হাতে নিয়ে সেখানে ইকোনমিক জোন করা যায় তবে কি হবে? অন্য জেলার তুলনায় ভোলায় পতিত জমি বেশি। আবার এখানে গ্যাস ও আছে। তাহলে এই সেতুকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্পায়ন করা যেমন সম্ভব তেমনি ভোলার গ্যাস সেতুর মাধ্যনে জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ সম্ভব। শরিয়তপুর চাঁদপুর সেতু দক্ষিণাঞ্চলের তিন সমুদ্র বন্দরকে কানেক্টিং সেতু হিসাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে এই সেতু ঘিরে অর্থনীতির পাওয়ারহাউজে রুপ দেয়া যাবে এই অবহেলিত অঞ্চলকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সুবিধা কতটুকু পাওয়া যাবে তার চেয়ে সামগ্রিক প্রভাবটা মূখ্য হয়ে উঠে। সরকারি অর্থায়নে শুধু লাভ দেখলেও হয় না। একটা বড় জেলাকে কেন সড়ক সুবিধা দিবেনা রাষ্ট্র সেটিও বিবেচ্য হয়।
অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রধান স্থান হওয়া উচিত দুর্নীতি। অবকাঠামো নয়। আমরা যেভাবে আতকে উঠি আর ভাবি আমরা দেউলিয়া হয়ে যাব মোটেও তেমন নয়। বরং অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রকল্প সবার নজরদারিতে থাকে। আলোচনায় থাকে। কিন্তু অবকাঠামো বাদে অন্য যেসব প্রকল্পে বাংলাদেশ ঋন নেয় সেটা নিয়ে কেউ টু শব্দ করেনা। বিশ্ব ব্যাংকের কথায় ধরুন। এরা আফ্রিকাকে যুগ যুগ ধরে অর্থ ঋন এবং সহায়তা করে আসছে। দূর হয়েছে সেখানের দারিদ্র? না। কেন না? সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ খুজবে না।
আমাদের দেশে অবকাঠামো বিনিয়োগেও পাশ্চাত্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যায়। অথচ বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের ফান্ডিং গুলা দেখলে অবাক হতে হয়। এই ধরুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প টাইপ যেসব প্রকল্প আছে সেখানে বিশ্ব ব্যাংক কোন ভ্যাজাল করেনা। এর থেকে বেনিফিট কি আসে আমরা জানিনা। কি দক্ষতার উন্নয়ন হয় সেটাও জানিনা। আবার ধরুন কোন প্রকল্পের নাম দিবে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। আদতে এর বেনিফিট কতটুকু আসলো সেটা ভাবার সময় না আসলেও ভাল একটা সংখ্যা আসে। যেমন এত লক্ষ মানুষকে ট্রেনিং দিছে। শুনতে ভাল লাগে। কিন্তু এসব ট্রেনিং এ মানুষ আসলেও শিখতে যাচ্ছে কিনা বা কতটুকু শিখছে সেটা বুঝা কঠিন। কিন্তু দিনশেষে দেখবেন বিশ্বব্যাংকের কাছে ঋনের পরিমান বাড়লেও সেই ঋন নিয়ে সমালোচনার কেউ নেই।
আমাদের অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। এখন পিছু ফেরার সময় নয়। আমাদের রেল, নৌপথ ও সড়কের দুর্বলতা কমিয়ে আনতে হবে। দেশকে বিনিয়োগ উপযোগী করতে হবে। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রুডেন্ট ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রিস্ক ফ্যাক্টরগুলি চিহ্নিত করে মিটিগেট করতে হবে। এর বিকল্প নেই আমাদের। আমাদের দেশে ১০০ কিলোমিটার পার হতে যে সময় লাগে সেটা যেন উন্নত বিশ্বের মত হয়। আমাদের কর্মঘন্টা যেন বেকার নষ্ট না হয়। প্রতিটা সময় যেন এদেশের মানুষ কাজে লাগাতে পারে সেই কামনায়।
Collected...
Photo: Road Network in China
15/06/2023
অর্থ পাঠাতে কড়াকড়ি
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কমতে শুরু করেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ
হাছান আদনান
জুন ১৪, ২০২৩
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের যে উল্লম্ফন শুরু হয়েছিল, হঠাৎই সেটি থেমে গেছে। মে মাসে দেশটি থেকে যে রেমিট্যান্স এসেছে, তা চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে গত মার্চে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। কিন্তু মে মাসে সেটি কমে ২২ কোটি ৫১ লাখ ডলারে নেমেছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাম দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছে। ফলে আবারো বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের সবার ওপরে উঠে এসেছে সৌদি আরব।
রেমিট্যান্স হাউজ ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও রেমিট্যান্স হাউজগুলো কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটির ভূমিকা থাকতে পারে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর। মে মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। গত মাসের মতো চলতি জুনেও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে খরা দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসের প্রথম নয়দিন দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। জুনের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদ উপলক্ষে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গত ২৪ মে বাংলাদেশীদের জন্য এক নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করা হয়। সে অনুযায়ী, নির্বাচনে কারচুপি, ভীতি প্রদর্শন এবং নাগরিক ও গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতায় যারা বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার আগে গত ৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়ে ভিসা নীতির বিষয়টি জানানো হয়েছিল। এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দেশটি থেকে হঠাৎ করেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে নতুন ভিসা নীতির কোনো ভূমিকা রয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষের অবশ্য দাবি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি অস্বাভাবিক। এর সঙ্গে নতুন ভিসা নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তিক্ত সম্পর্কের প্রভাব থাকতে পারে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী প্রবাসী ইকবাল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খুবই চাপে আছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে দেশে টাকা পাঠানো কষ্টসাধ্য। গত এপ্রিলে ঈদ উপলক্ষে স্বজনদের কিছু টাকা পাঠিয়েছি। মে মাসে আর পাঠাতে পারিনি। তবে গত মাসে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে পরিচিত অনেককেই ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তাদের বাড়তি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে বলে শুনেছি।’
ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশী মকবুল আহমেদ জানান, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। পরিমাণ বেশি হলে আয়ের নথিপত্রও চাওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃত রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীরাও দেশে টাকা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হবেন।
মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দেশের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হলে সেটির প্রভাব ওই দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়ে বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন সরকার একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব সিদ্ধান্তের প্রভাবে দেশটির সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীদের বিষয়ে সতর্ক থাকবে। এখন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক প্রদক্ষেপ নেয়, সেটিও আশ্চর্যের বিষয় হবে না।’
এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সাধারণ বাংলাদেশীরা খুব অল্প পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। এ ধরনের অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বড় অংকের অর্থ লেনদেন করতে গেলে সেটির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যদি আরো কঠোরতা আরোপ করা হয়, সেটি ভিন্ন কথা। প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে, এমন শঙ্কা থেকেও বাংলাদেশীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো থেকে বিরত থাকতে পারেন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকে হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আসে ৩৪৬ কোটি ১৬ লাখ ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরেও ৩৪৩ কোটি ৮৪ লাখ ডলার প্রবাসী আয় আসে দেশটি থেকে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩২৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব থেকেও প্রায় দেড় কোটি ডলার বেশি।
কাজের উদ্দেশে গত দুই বছরে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী সৌদি আরবে গেছেন। এর পরও অর্থবছরের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে থাকে। বিপরীতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বাড়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের শীর্ষস্থানে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্তও দেশটি থেকে রেমিট্যান্সের উচ্চপ্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। কিন্তু এপ্রিল ও মে মাসে প্রবাহ কমতে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৪৩ কোটি ডলার। আর এপ্রিল ও মে মাসে তা যথাক্রমে ২৪ ও ২২ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
পরপর দুই মাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় আবারো শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে সৌদি আরব। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশটি থেকে প্রবাসী আয় এসেছে মোট ৩৩৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩২৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার এসেছে। আর তৃতীয় স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৬৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার।
হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় এর উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সন্দেহ হলো দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসছে। এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিদেশে লোক যাওয়া ও রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যে একটা অসামঞ্জস্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসছে, যা অস্বাভাবিক। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে পাচার করা অর্থ ফেরত আসছে। যেহেতু রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আনলে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যায়, সে সুযোগটাই কেউ কেউ নিতে পারেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখতে পারে।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যারা যায় তাদের বেশির ভাগই হোয়াইট কালার জব করে। অনেকেই ঘরবাড়ি ও জমিজমা বিক্রি করে দেশ থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। অনেক শিক্ষার্থীও সে দেশে আছে। তারা তো আর টাকা পাঠাতে পারে না। তাহলে বিপুল এ রেমিট্যান্স আসছে কোত্থেকে?’
প্রসঙ্গত, বণিক বার্তায় গত ১৮ মে ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত রেমিট্যান্স কারা পাঠাচ্ছেন?’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের পরিসংখ্যান, তাদের আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর (ইউএসসিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার। এর মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজারের কিছু বেশির। দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের খানাপিছু গড় বার্ষিক আয় ৬৮ হাজার ডলারের কিছু কম।
ইউএস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের (ইউএসবিএলএস) হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ২০২১ সালে খানাপিছু গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৬৭ হাজার ডলার। সে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী খানাগুলোর উপার্জনকারীরা বছরজুড়ে আয় করেছেন দেশটির গড় খানাপিছু ব্যয়ের চেয়ে সামান্য বেশি। এ হিসাব আমলে নিলে বাংলাদেশী পরিবারগুলোর উদ্বৃত্ত বা সঞ্চয়ও খুব বেশি হওয়ার কথা না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এ বাংলাদেশীরাই এখন দেশের রেমিট্যান্সের বড় উৎস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০৪ কোটি ৭৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রত্যেক বাংলাদেশী প্রতি মাসে গড়ে ২ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে। যদিও সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশীদের বক্তব্য হলো প্রতি মাসে জীবনযাপনের ব্যয় বহন করে দেশে ২ হাজার ডলার পাঠানো বেশির ভাগ প্রবাসীর পক্ষেই প্রায় অসম্ভব।
11/06/2023
ইউক্রেনের বাঁধ বিপর্যয়ে গমের বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
যুদ্ধের ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ার কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন শস্য চুক্তির নবায়নকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং এ সময়ের মধ্যে প্রতি বুশেল (২৫ কেজি) গমের দাম ৩.৩২% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের আমদানিকে আরও বেশি ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।
জানা যায়, যুদ্ধের ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ার কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন শস্য চুক্তির নবায়নকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। যুদ্ধের এই খারাপ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বাঁধ ধ্বংস হওয়ায় ঐ অঞ্চলের শস্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য বলছে, ১ থেকে ৯ জুন সময়কালে প্রতি বুশেল গমের দাম ৬.১১ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ৬.৩১ মার্কিন ডলারে উঠেছে।
Video Player is loading.
Unibots.in
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপকতা বেড়েছে। যুদ্ধে গত ৬ জুন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি ড্যাম (বাঁধ) ধ্বংস হয়েছে। এতে করে কিছু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং এই পানির কারণে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমির চাষাবাদ ব্যাহত হবে বলে জানিয়েছে কিয়েভ। শুধু যে ফসল চাষাবাদ ক্ষতির মুখে পড়বে তাই নয়, এ পরিস্থিতি দেশটির সববরাহ চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই কারণে ক'দিন ধরেই বিশ্ববাজারে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
স্থানীয় আমদানিকারকরা জানান, ডলার সংকটের কারণে দেশে এখনো আমদানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এই পরিস্থিতিতে আবারও যদি ইউক্রেনের সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে সেটার চাপ বিশ্ববাজারে পড়বেই। একদিকে বিশ্ববাজারে গমের সরবরাহ কমবে, অন্যদিকে দাম বেড়ে যাবে। তখন এটা বাংলাদেশের সংগ্রহকারীদের জন্য আরও কষ্টকর হয়ে পড়বে।
বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার রেদওয়ানুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ড্যাম ও যুদ্ধের কারণে আবারও যদি ইউক্রেনের সরবরাহ পরিস্থিতি দুর্বল হয় তাহলে বিশ্ববাজারে গমের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা আমাদেরকে চাপে ফেলবে।"
তিনি বলেন, "ইতোমধ্যেই আমরা ডলার সংকটে গম সরবরাহ নিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছি।"
দেশে সাধারণত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গম আমদানি হয়। সরকারিভাবে খাদ্য অধিদপ্তর গম আমদানি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "আপাতত সরকারের গমের মজুত ভালো রয়েছে, যে কারণে এখনই আমদানির চিন্তা করতে হচ্ছে না। তবে গত বছর জি-টু-জি চুক্তিতে যেভাবে গম আমদানি হয়েছে, আগামী অর্থবছরেও সেভাবে গম আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "বিশ্ববাজারে দাম বেশি হলে সরকারি পর্যায়েও আমদানির খরচটা বাড়বে।"
স্থানীয় আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা জানান, বর্তমান সময়ে দেশের বাজারে গ্রীষ্মকালীন ফলের সরবরাহ প্রচুর। এই সময়ে মানুষ নাস্তার মেন্যুতে ফলমূলই রাখে বেশি। যে কারণে গম ও গম থেকে তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে যায়। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে যেহেতু আমদানি কম, সে কারণে চাহিদা কম থাকলেও সরবরাহ বৃদ্ধির একটা চেষ্টা আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে। কারণ প্রতি বছর ৬৫-৭০ লাখ টন গমের যে চাহিদা রয়েছে, তার বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। যা গত দুই বছর ধরে একেবারেই তলানিতে নেমে গেছে।
এদিকে গত ১৮ মে শেষ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন শস্য চুক্তির মেয়াদ। এই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির কথা শোনা গেলেও এখনো পর্যন্ত চুক্তিটি নবায়নের ঘোষণা আসেনি। এটাও গমের আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতিকে একটা চাপের মধ্যে রেখেছে, কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন গমের বৈশ্বিক বৃহৎ সরবরাহকারী দুটি দেশ।
গত বছরের জুলাইয়ে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় এ শস্য চুক্তি সই হয়েছিল। প্রথমবার ১২০ দিন এবং দ্বিতীয় দফায় এটি ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়। রাশিয়া চুক্তি নবায়নে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও তারা ইউক্রেনে আক্রমনের তীব্রতা বাড়িয়েছে এবং ইউক্রেনও পাল্টা প্রতিরোধ ও আক্রমণ শুরু করেছে। যে কারণে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে।
এসব কারণেই বিশ্ববাজারে বাড়ছে গমের দাম। সম্প্রতি প্রকাশিত ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাঁধ ধ্বংস এবং অ্যামোনিয়া পাইপলাইনের ক্ষতির কারণে ১ জুনের পর থেকে টানা ৫ দিন গমের দাম বৃদ্ধি পায়।
ইউক্রেনের দাবি, বাঁধটি রাশিয়াই উড়িয়েছে। যদিও এর অবস্থান শস্য চুক্তির আওতায় থাকা ইউক্রেনের তিন বন্দর থেকে কিছুটা দূরে, তবু এর ফলে যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা মানুষ, পরিবহন এবং সরবরাহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। তবে রাশিয়া এর কোনো দায় এখনও নেয়নি।
জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউক্রেন থেকে ৮.৭ শতাংশ এবং রাশিয়া থেকে ২.১ শতাংশ গম আমদানি হয়। এ সময়ে ভারত থেকে আমদানি হয় ৬২.৩ শতাংশ গম।
তবে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যখন খাদ্যসংকটের আশংকা করা হয়, তখন ভারত নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তায় গমের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ডলার ও আমদানির উৎস সংকটে বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। ডলার সংকট না কাটলেও বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি আমদানিকারকদের বাধ্য হয়েই নির্ভরতার জায়গা তৈরি হয় রাশিয়া-ইউক্রেনের উপর। এই সরবরাহ চেইনে আবারও সমস্যা তৈরি হলে দেশের আমদানি পরিস্থিতি আবারও ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় আমদানিকারকরা। কারণ ভারত থেকে এখনো গম আমদানি হচ্ছে না।
11/06/2023
বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ৬,২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ৯টি বিদেশি কোম্পানি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ দেশে কৃষি আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।
কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছে প্রস্তাব দিয়ে, সংস্থাটির সম্মতির পর রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিস অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)- এর কাছে শাখা পরিচালনার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছে।
আরজেএসসি সূত্রে জানা গেছে, চারটি চীনা কোম্পানি যথাক্রমে ৭০০ কোটি টাকা; ১,২০০ কোটি টাকা; ১,০০০ কোটি টাকা এবং ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক।
Unibots.in
জাপানের দুটি কোম্পানি ৮০০ কোটি টাকা এবং ৩৫০ কোটি টাকা এবং দুই কোরিয়ান কোম্পানি ৫৫০ কোটি ও ৬৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায়। এছাড়া, তাইওয়ানের একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে চায় ৪০০ কোটি টাকা।
আরজেএসসি অফিসের রেজিস্ট্রার শেখ শোয়েবুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এসব বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন পরিচালনার জন্য এ বছরের বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেছে। সেই আবেদনগুলো পর্যালোচনা করছে আরজেএসসি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এসবের অনুমোদন দেওয়া হবে।
11/05/2023
সেকেন্ডারি শেয়ারে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত তুলে নেওয়া হতে পারে
তথ্যচিত্র: টিবিএস
পুঁজিবাজারে সেকেন্ডারি শেয়ারে বিনিয়োগের ওপর বিদ্যমান কর রেয়াত বাতিলের বিষয়ে ভাবছে সরকার। ব্যাংকে সঞ্চয়কারীরা এতে উপকৃত হবেন – এ পদক্ষেপ সরকারের রাজস্বও বাড়াতে পারে; কিন্তু তার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিস্বরূপ পুঁজিবাজার থেকে তহবিল চলে আসতে পারে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়।
বর্তমানে, করদাতারা পুঁজিবাজার, ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস), জীবন বীমা ইত্যাদিতে তাদের করযোগ্য আয়ের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর রেয়াত পান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগের ওপর এই রেয়াত প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত সুবিধাগুলি শুধুমাত্র প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-তে করা বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
Unibots.in
তারা বলেছেন, কর কর্মকর্তাদের পক্ষে সেকেন্ডারি শেয়ারে বিনিয়োগের হিসাব এবং নিরীক্ষণ করা কঠিন হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় প্রাথমিক শেয়ারে বিনিয়োগকে প্রসার করতে চায়।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সাম্প্রতিক এক সভায় এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আগামী ১৪ মে অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হবে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এবিষয়ে তাদের আপত্তি তুলে ধরে জানিয়েছেন, এতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। এটি পুঁজিবাজারের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তারা।
তারা আরো উল্লেখ করেন যে, প্রতি বছর জুন মাসে অর্থবছরের শেষদিকে পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়; প্রস্তাবটি এই নতুন বিনিয়োগ প্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে।
সরকারের এমন পদক্ষেপ দেশে বিনিয়োগ প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছায়েদুর রহমান।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতি বছর আইপিওর সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় করদাতারা তাদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ আইপিওতে বিনিয়োগ করতে পারবেন না।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাথে আলাপকালে- বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং পুঁজিবাজার বিশ্লেষক প্রফেসর আবু আহমেদ সরকারের প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেন বলেন, এটি অন্যায্য এবং অযৌক্তিক।
সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কেন হঠাৎ করে সেকেন্ডারি বাজারে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে - সে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
'এই প্রস্তাব অনুমোদন হলে, মানুষ পুঁজিবাজার থেকে সরে এসে- সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবে। তখন সরকারকে সঞ্চয়পত্রের ওপর আরও সুদ দিতে হবে, আর সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়।'
অধ্যাপক আবু আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, সেকেন্ডারি শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় দুই দশক আগে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী যখন এই কর রেয়াত সুবিধা চালু করেছিলেন, তখন এর উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ঝুঁকি নেওয়া করদাতাদের পুরস্কৃত করা।
তাই এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব করার আগে- কেন নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি বিবেচনা করেননি - সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
যেসব খাতে বর্তমানে বিনিয়োগ করলে কর ছাড় পাওয়া যায়, সেগুলো হচ্ছে- সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ, জীবন বীমার প্রিমিয়াম; সরকারি কর্মকর্তার প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা; স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে নিয়োগকর্তা ও কর্মকর্তার চাঁদা; কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠী বীমা তহবিলে চাঁদা; সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে প্রদত্ত চাঁদা; ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বছরে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা ডিপোজিট করলে; পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি শেয়ার, স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ; এবং সরকার অনুমোদিত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে।
ডিপিএসে বিনিয়োগের সীমা বাড়বে
আগামী বাজেটে ডিপিএসে বিনিয়োগের সীমা বাড়ানো হবে বলেও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।
বর্তমানে, ডিপিএস-এর জন্য বছরে ৬০ হাজার টাকা (প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা) পর্যন্ত কর ছাড় পাওয়া যায়। এটি ৭২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫,০০০ টাকা করা হতে পারে।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম স্নেহাশিস, মাহমুদ অ্যান্ড কোং- এর প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ডিপিএস- এ বিনিয়োগের সীমা প্রসারিত করা একটি ভাল উদ্যোগ। এটি ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তারল্য বাড়াতে সাহায্য করবে। আজকাল মাসে ১০,০০০ টাকা জমা করা করদাতাদের জন্য বড় কোনো সমস্যা নয়। এই বিবেচনায়, আমরা ডিপিএস সীমা ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি।
২৯ ধরনের নথি জমা দেওয়ার ঝক্কিমুক্ত হতে পারে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান
সূত্রগুলো আরো জানায়, কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২৯ ধরনের নথি দিতে হতো। আগামী বাজেটে তা কমিয়ে ১২টি করা হতে পারে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর হবে।
02/05/2023
রংপুরের মানুষ কত বিষয়ে কথা বলে কিন্ত নিজের জেলার দারিদ্র নিয়ে কোন পোস্ট বা আলোচনা চোখে পড়লোনা।
আমি নিজে রংপুরের মানুষ । এই পরিচয়ে আমি গর্বিত। কিন্ত রিপোর্টটি হতাশা তৈরি করছে।
টিবিএস রিপোর্ট:
দেশের দরিদ্রতম বিভাগ রংপুর, পরেই রয়েছে ময়মনসিংহ: বিবিএস
পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ধনী লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০.৯৭ শতাংশ ধনী পরিবার বসবাস করে এই বিভাগে।
দেশে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের বসবাস রংপুর বিভাগে। অর্থাৎ, এখনও দেশের দরিদ্রতম বিভাগ উত্তরাঞ্চলের রংপুর। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও দুর্বল শিল্পায়ন এই অঞ্চলের দারিদ্র্যের হারে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুসারে, দেশের ৮ বিভাগের মধ্যে দারিদ্র-প্রবণ উত্তর অঞ্চলের রংপুর বিভাগের মানুষেরা সম্পদের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে। এই বিভাগের ৪৪ শতাংশ পরিবারই দরিদ্র। এরপরেই রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। সম্পদ এবং আর্থ-সামাজিক সূচক বিবেচনায় ময়মনসিংহে ৩৯.৫৭ শতাংশ দরিদ্র পরিবার রয়েছে।
২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপেও দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ (৪৭ শতাংশ) রয়েছে রংপুর বিভাগে। এরপরেই ছিল ময়মনসিংহ বিভাগ। সে সময় এই বিভাগে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ।
Unibots.in
গত ১৭ এপ্রিল পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত 'বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২১' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ধনী লোকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০.৯৭ শতাংশ ধনী পরিবার বসবাস করে এই বিভাগে।
এদিকে, জাতীয় পর্যায়ে খানা হিসাবে দেশে মোট দরিদ্র পরিবার ২৪.১৮ শতাংশ, যেখানে ধনী পরিবারের সংখ্যা ১৩.৬২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঐতিহাসিকভাবে দেশের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলো এখনও দরিদ্রই রয়ে গেছে। এসব অঞ্চলের দারিদ্র্যতা কমাতে বিবিএস কর্মকর্তারা সরকারকে শিল্পায়নের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এসব পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষদের আয় বাড়ানো যায়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন দ্য বিজিনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গত দশকে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নামে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা এসব দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার মানুষদের দারিদ্র্য কমাতে পারেনি।
"যদিও পরিবহন অবকাঠামো বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা এনে দিয়েছে, কিন্তু আয় বাড়াতে এবং দারিদ্র্য কমাতে হলে ব্যণিজ্যিক পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দারিদ্র্যতা কমাতে শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরির কোনো বিকল্প নেই," যোগ করেন তিনি।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, গড় হিসেবে গত দশকে দেশের দারিদ্র্য কমলেও অঞ্চলভিত্তিক তথ্যগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য কতটা বেড়েছে।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহ যখন ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল তখন এ অঞ্চলের দারিদ্র্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। আলাদা বিভাগ হওয়ার ফলে এখন দেখা যাচ্ছে, দেশের দ্বিতীয় দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল ময়মনসিংহ।
এদিকে, স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম প্রকল্পের পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, এই জরিপের ওয়েলথ কুইন্টাইল একটি দেশের রিলেটিভ ওয়েলথ বা আপেক্ষিক সম্পদ এবং ইক্যুইটি বুঝতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে অ্যাবসোলিউট ওয়েলথের ধারণা পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্পদের র্যাঙ্কিংয়ে পরিবারগুলোকে ভাগ করার জন্যই সূচকটি চালু করেছে বিবিএস।
স্যাম্পল ভাইটার স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদন-২০২১ এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো 'ওয়েলথ কুইন্টাইল ইন্ডেক্স' বা সম্পদ সূচক চালু করেছে বিবিএস। এর মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নির্ণয় করা সহজ হবে বলে জানিয়েছেন বিবিএস কর্মকর্তারা।
সূচকটি গৃহস্থালীর নির্মাণ সামগ্রী, পানি, স্যানিটেশনসহ টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটরের মতো বিভিন্ন জিনিসের মালিকানা নথিভুক্তির মাধ্যমে স্কোর তৈরি করে। আর এই স্কোরের ভিত্তিতেই সম্পদ সূচকে পরিবারগুলোর র্যাঙ্কিং নির্ধারিত হয়।
প্রতিবেদনে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২০.৯৭ শতাংশ পরিবার ধনীর তালিকায় এবং সব বিভাগে অন্তত ১২.৩০ শতাংশ পরিবার দরিদ্রের তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে দেশের গ্রামাঞ্চল, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সম্পদের সূচক নির্দেশ করা হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৭.১৭ শতাংশ পরিবার ধনীর তালিকায় এবং ২৯.২৯ শতাংশ পরিবার দরিদ্রের তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের মাত্র ৩ শতাংশ পরিবার দরিদ্র এবং ৪৭.৮৬ শতাংশ পরিবার ধনীর তালকায় রয়েছে। শহর এলাকায় ধনী পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং দরিদ্রের হার সবচেয়ে কম বলে উঠে এসেছে।
সারাদেশে দুই হাজারেরও বেশি এলাকা থেকে তিন লাখেরও বেশি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ চালানো হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জরিপের তথ্য সংগ্রহ শেষ হয় বলে জানান কর্মকর্তারা।
26/04/2023
বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস সূচক
নম্বর তেমন না বাড়লেও ১২ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
বৈশ্বিক লজিস্টিকস সূচকে ১২ ধাপ এগিয়ে এখন ৮৮তম অবস্থানে বাংলাদেশ। এর আগের সূচকে (২০১৮ সালে) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০তম। ২০১৮ সালের সূচকে শীর্ষস্থানে থাকা জার্মানির অবস্থান এখন তৃতীয়। নতুন সূচকে শীর্ষস্থান দখল করেছে সিঙ্গাপুর, ২০১৮ সালে দেশটি ছিল সপ্তম অবস্থানে।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর গত শনিবার (২২ এপ্রিল) লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচক-২০২৩ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচক (এলপিআই) মূলত বাণিজ্যের ছয়টি মাত্রার ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর র্যাংক নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বব্যাংক জানায়, কাস্টমস কর্মক্ষমতা, অবকাঠামোগত গুণমান এবং শিপমেন্টের সময়োপযোগিতা সহ র্যাংকিংয়ে ব্যবহৃত ডেটা লজিস্টিক পেশাদারদের একটি জরিপ থেকে আসে। মূলত কাস্টমস এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়পত্রের দক্ষতা বা শুল্ক, বাণিজ্য ও পরিবহন পরিকাঠামো বা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের চালানের ব্যবস্থা বা শিপমেন্টের ব্যবস্থা সহজ করা, লজিস্টিক পরিষেবা দক্ষতা এবং গুণমান ট্রাকিং, ফরওয়ার্ডিং এবং কাস্টমস ব্রোকারেজ মান উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করেই এলপিআই র্যাংকিং করা হয়। চালান ট্র্যাক এবং ট্রেস করার ক্ষমতা ও ফ্রিকোয়েন্সি সহ শিপমেন্ট নির্ধারিত বা প্রত্যাশিত ডেলিভারি সময়ের মধ্যে মালামাল পৌঁছানোও নির্ভর করে।
পণ্য ও সেবার উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে সর্বশেষ ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে বাণিজ্যিকভাবে ‘লজিস্টিকস’ বলে। কোন দেশের লজিস্টিকস পরিস্থিতি কেমন, তা জানার জন্য বিশ্বব্যাংক ২০০৭ সাল থেকে লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এলপিআই) প্রকাশ করে আসছে। সর্বশেষ প্রকাশিত এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এবং বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক পাঁচ বছর পর এ সূচক প্রকাশ করলো, যে সময়ের মধ্যে কোভিড মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বিশ্বে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্কোর ২ দশমিক ৬ এবং অবস্থান ১৩৯ দেশের মধ্যে ৮৮তম। এর আগে ২০১৮ সালে এ সূচকের ফলাফল প্রকাশিত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০তম। তবে ওই বছর ১৬০টি দেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২ দশমিক ৫৮। বাংলাদেশের এলপিএল স্কোর ২ দশমিক ৬ হওয়ার সুবাদে র্যাংকিংয়ে ৮৮তম স্থানে রয়েছে। তবে অন্যান্য সূচকে দেখা গেছে, বাংলাদেশের কাস্টম স্কোর ২ দশমিক ৩, অবকাঠামো স্কোর ২ দশমমিক ৩, শিপমেন্ট স্কোর ২ দশমিক ৬, লজিস্টিক কম্পিটেন্স অ্যান্ড কোয়ালিটি স্কোর ২ দশমিক ৭, টাইমলাইন্স স্কোর ৩ এবং ট্র্যাকিং স্কোর ২ দশমিক ৬।
এই সূচকে সর্বাধিক ৪ দশমিক ৩ স্কোর করে লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকে প্রথম স্থান অর্জন করেছে সিঙ্গাপুর। এর পরে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে ফিনল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং সুইজারল্যান্ড। এছাড়া ১০ এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, চীন, হংকং। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। পিছিয়ে আছে ভুটান ও আফগানিস্তান। পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপ তালিকার মধ্যে নেই। ভারতের বৈশ্বিক অবস্থান ৩৮তম এবং শ্রীলঙ্কার ৭৩তম। অন্যদিকে আফগানিস্তান ও ভুটানের অবস্থান যথাক্রমে ১৩৮ এবং ৯৭তম।
অবকাঠামো ও কাস্টম সুবিধাসহ নানা কারণে বৈশ্বিক লজিস্টিকস সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, মূলত যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডিল করে, সরাসরি কাস্টমস শিপমেন্ট ড্রিল করে ওদেরকে নিয়ে সার্ভে করেই লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স নির্ণয় করা হয়। এটা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করা হয়। যেমন বন্দরে মালামাল আসলে জাহাজে খালাসে কতটুকু সময় লাগে, জাহাজ বন্দরে আসলে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করলে কতটুকু সময়ে নিষ্পত্তি হয়, কি ধরনের অবকাঠামো সুবিধা আছে- এইসব বিষয় দেখা হয়।
তিনি বলেন, কয়েকটি সূচকের ভিত্তিতে একটা র্যাংকিং করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানির সেবা সংক্রান্ত বিষয়গুলো এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ পাঁচ বছর রিপোর্ট প্রকাশ করা হলো। বাংলাদেশ অনেক ভালো করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় অবকাঠামো ও কাস্টমসে বাংলাদেশের অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণেই মূলত লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে বাংলাদেশ ভালো করেছে।