25/07/2023
অবকাঠামো বিনিয়োগকে আমরা এত ভয় পাই কেন? কি শত্রুতা অবকাঠামোর সাথে?
গত মে মাসে আইএমএফ এর রোড ট্রান্সপোর্ট কোয়ালিটি নিয়ে করা র্যাংকিং নিয়ে লিখব লিখব করে লেখা হয়নি। ভেবেছিলাম আমাদের দেশের মিডিয়াতে আসবে। হয়ত এসেছে। কিন্তু আমার চোখে পড়েনি।
আমার নজরে পড়েছিল শ্রীলংকান একটি নিউজ যেখানে শ্রীলঙ্কার বাজে ট্রান্সপোর্ট কোয়ালিটি নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখেছিলাম। শ্রীলংকায় সড়ক পথের গড় গতিবেগ মাত্র ৫০ কিলোমিটার। বলা হয়েছিল শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে তারা। আক্ষেপের বিষয় হল বাংলাদেশে গড় গতিবেগ মাত্র ৪১ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। খারাপের দিক থেকে আমরা চতুর্থ। পাহাড়ি দেশ ভুটানের গতিবেগ সবথেকে কম। তাও ৩৮ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ভারতে ৫৮ কিমি, পাকিস্তানে ৮৬ কিমি।
এই কথা বলার কারন হল জনবহুল এই দেশে আমাদের সড়ক বলি, রেল বলি বা অন্যান্য অবকাঠামো বলি আমরা সেটা গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের এখানে যে পরিমান বিনিয়োগ দরকার তার অর্ধেক ও করতে পারিনি। একটা উদাহরন দেয়া যাক:
হার্ট পাম্প করে মানবদেহের প্রতিটা কোষে রক্ত পৌছায়। যদি কখনো এমন হয় যে হার্টের শিরা বা ধমনীতে কোলেস্টেরল জমেছে সেক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালনে বাধা পায় এবং বড় রকমের বিপদের সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য সুস্থ হার্ট গুরুত্বপূর্ণ। হার্টের সাথে প্রধান যেসব আর্টারি ও ভেইন রয়েছে সেগুলাতে বাধামুক্ত বা চর্বিমুক্ত রাখাটা সুস্থ দেহের রক্তসঞ্চালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটা দেশের ক্ষেত্রেও অনেকটা এভাবে বিবেচনা করা যায়। বিশাল দেশের অর্থনীতির সঞ্চালক হল এর নদীপথ, রেলপথ ও সড়ক যোগাযোগ। কিন্তু আর্টারি ও ভেইন গুলাতে কোলেস্টেরল জমে যেমন রক্ত সরবরাহে বাধার সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি ট্রাফিক জ্যাম একটা দেশের অর্থনীতির কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ধরুন উত্তরাঞ্চলের কোন এক গ্রামীন অঞ্চলে কোন পণ্য ভাল উৎপাদন হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভাল না থাকবার কারনে সেই পণ্য দেশের অন্য অঞ্চলে আসতে পারেনা। আবার যদি পণ্য আনতে হয় তবে গাজীপুর, সাভারের ভয়ানক জ্যামে আটকে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। পচনশীল দব্য হলে পণ্য নষ্ট হয়। এই জ্যাম হল অনেকটা কোলেস্টেরল এর মত যেটা রক্তসঞ্চালনের বাধা সৃষ্টির মতই অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক হবার ফলে বিশ্বের সবথেকে দুর্বল অবকাঠামোর ভাগিদার আমরা। প্রথমত নদী, খাল, বিল এর কারনে এখানে সড়ক পথ নির্মানে প্রচুর সেতু, কালভার্ট নির্মান করা লাগে। আর নরম নিচু মাটি ভরাট করে পথের বেজ তৈরি করতে হয় যা সময় সাপেক্ষ্য ও আর্থিক দিক থেকেও খরুচে। কিন্তু নদীপথে যে যোগাযোগ ব্যাবস্থা সহজ হবে সেটার সুযোগ ও কম। আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রবাহ সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী মৃত অথবা বছরের অল্প সময়ে জীবিত ও পানিপথে চলাচলের উপযোগী থাকে।
রেল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এখানেও অজস্র নদী, নালা, খাল, বিলের কারনে রেলপথ সব স্থানে পৌছানো সম্ভব হয়নি।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অবকাঠামোতে যে পরিমান বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল সেটা হয়নি। আর এজন্যই অবকাঠামো ঘাটতি আকাশচুম্বী হয়েছে। অপ্রতুল অবকাঠামো চাহিদা সামাল দিতে না পারায় এক অপরিকল্পিত বসবাস অনুপযোগী শহরে পরিনত হচ্ছে দেশ, যেখানে গড় গতিবেক ঢাকায় হেটে যাওয়ার থেকেও কম।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং দেশের প্রতিটি কোণায় যোগাযোগ গতিময় ও সহজ করতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। ভাবতে অবাক লাগে যে ঢাকা চট্টগ্রাম সড়ককে ৪ লেনে উন্নিত করবার আগে কোন জাতীয় মহাসড়ক ৪ লেনের ছিলনা। আরো অবাক লাগে যে আমরা ঢাকা চট্টগ্রাম ৪ লেন করতে গিয়ে বুঝেছি যে এদেশে এক্সপ্রেসওয়ে করা দরকার। দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে ঢাকা মাওয়া ভাঙ্গা! এর আগে এদেশে এক্সেস কন্ট্রোল সড়ক ছিলনা! আরো প্যাথেটিক বিষয় হল আমরা দেশের প্রধান সড়ককে চার লেনে উন্নিত করার চিন্তা ভাবনা করছি যেখানে সড়কগুলি ১২ লেনে করা দরকার। এক্সপ্রেসওয়ে ৮ লেন এবং দুই পাশে দুই লেনের দুটি সার্ভিস লেন। আমরা হয়ত আবার দেখব যে ৪ লেন করে কাজ হচ্ছে না। তখন প্রকল্প ব্যয় আরো বাড়িয়ে আমাদের ১২ লেনেই যেতে হবে। আমরা দেরিতে বুঝি। এটাই সমস্যা।
ভারতের অবস্থা দিয়ে শুরু করি। দেশটিতে টোটাল এক্সপ্রেসওয়ে আছে ২,০৭৪.৫ কিলোমিটার। বৃহৎ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ভারতের সবথেকে দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে পুরবাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ে যেটার দৈর্ঘ ৩৪০.৮ কিলোমিটার। দিল্লি-মেরুত এক্সপ্রেসওয়ে ১৪ লেনের।
গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের পরিকল্পনা প্রতিটা রাজ্যকে দ্রুতগতির সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করা। আরেকটা বড় প্রকল্প হল ভারতমালা প্রকল্প। এই প্রকল্পে ভারত মোট ৮৩,৬৭৭ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করে সব রাজ্যকে জুড়ে দিবে। চিকেন নেক নিয়ে যে ভয় বা দূর্বলতা সেটাও জয় করার প্রয়াস তারা নিয়েছে। এই প্রকল্পে ৩৪,৮০০ কিলোমিটার নির্মানে তারা বিনিয়োগ করবে ৫.৩৫ লক্ষ কোটি রুপি।
পাকিস্তান সিপিইসির মাধ্যমে তাদের অবকাঠামো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার প্র্যয়াস পেয়েছে।
প্রশ্ন হল কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি প্রয়োজনীয় নয় সেটার ক্ষেত্রে একটু ক্রিটিকাল থিংকিং করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছোট দেশে জনসংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত। আর যত বেশি মানুষ তত বেশি পরিবহন চাহিদা। আর যত বেশি পরিবহন চাহিদা তত বেশি বিনিয়োগ জরুরি যতক্ষণ পর্যন্ত জ্যাম বিষয়টাকে জিরোতে নামিয়ে আনা না যায়। দেশের প্রধান সড়কগুলি এত বছরেও চার লেন ছিল না। এখন এটাকে চার লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নিত করা হচ্ছে। তবে ঢাকা চট্টগ্রাম চার লেনের সময় ও আমাদের মাথায় আসেনি সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়ে করা গেলে লিড টাইম কতটা কমিয়ে আনা যেত। শুরুতে ঢাকা মাওয়ার ৩৫ কিলোমিটার হল বাংলাদেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। এটার দারা বুঝা যায় যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলির সাথে প্রতিযোগিতার বিচারে আমরা কতটা পিছিয়ে। আমাদের সরবরাহ ব্যাবস্থার নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল।
চার লেনের পরিবর্তে ন্যাশনাল হাইওয়ে গুলি ৮ লেনের করা উচিত। আর আঞ্চলিক সড়ক ৪ চার লেনের করা উচিত। এর প্রধান কারন হল এদেশে কিলোমিটার প্রতি মানুষের ঘনত্ব সবথেকে বেশি। আর এত মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে চার লেন বেশিদিন সুফল আনতে পারবে না।
এখন প্রশ্ন থেকেই যায়, আমাদের কি ঋন বেড়ে যাবে? এত বিনিয়োগ করলে কি আমরা দেউলিয়া হব?
কিছু প্রকল্প আছে যেটা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু অপ্রয়জনীয় প্রকল্পের তকমা কোন ধ্রুবক নয়।
একটি উদাহরন দেয়া যেতে পারে। বরিশাল ভোলা সেতু নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘের দেশের বৃহত্তম এই সেতু করতে প্রায় ৯,৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন আসতে পারে একটি দ্বীপ জেলার পেছনে এত টাকা ব্যয় কেন করব? এতে কি আসলেই রিটার্ন আসবে?
আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শরিয়তপুর চাঁদপুর সেতু। আপাত দৃষ্টিতে এই সব সেতু করে কোন লাভ নেই। রিটার্ন আসবে না। কিন্তু চিন্তার পরিধি একটু বড় করি। যদি ভোলা সেতু করতে হয় তবে এটা লাভজনক নয়। তবে যদি সম্পুরক প্রকল্প হাতে নিয়ে সেখানে ইকোনমিক জোন করা যায় তবে কি হবে? অন্য জেলার তুলনায় ভোলায় পতিত জমি বেশি। আবার এখানে গ্যাস ও আছে। তাহলে এই সেতুকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্পায়ন করা যেমন সম্ভব তেমনি ভোলার গ্যাস সেতুর মাধ্যনে জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ সম্ভব। শরিয়তপুর চাঁদপুর সেতু দক্ষিণাঞ্চলের তিন সমুদ্র বন্দরকে কানেক্টিং সেতু হিসাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে এই সেতু ঘিরে অর্থনীতির পাওয়ারহাউজে রুপ দেয়া যাবে এই অবহেলিত অঞ্চলকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সুবিধা কতটুকু পাওয়া যাবে তার চেয়ে সামগ্রিক প্রভাবটা মূখ্য হয়ে উঠে। সরকারি অর্থায়নে শুধু লাভ দেখলেও হয় না। একটা বড় জেলাকে কেন সড়ক সুবিধা দিবেনা রাষ্ট্র সেটিও বিবেচ্য হয়।
অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রধান স্থান হওয়া উচিত দুর্নীতি। অবকাঠামো নয়। আমরা যেভাবে আতকে উঠি আর ভাবি আমরা দেউলিয়া হয়ে যাব মোটেও তেমন নয়। বরং অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রকল্প সবার নজরদারিতে থাকে। আলোচনায় থাকে। কিন্তু অবকাঠামো বাদে অন্য যেসব প্রকল্পে বাংলাদেশ ঋন নেয় সেটা নিয়ে কেউ টু শব্দ করেনা। বিশ্ব ব্যাংকের কথায় ধরুন। এরা আফ্রিকাকে যুগ যুগ ধরে অর্থ ঋন এবং সহায়তা করে আসছে। দূর হয়েছে সেখানের দারিদ্র? না। কেন না? সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ খুজবে না।
আমাদের দেশে অবকাঠামো বিনিয়োগেও পাশ্চাত্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যায়। অথচ বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের ফান্ডিং গুলা দেখলে অবাক হতে হয়। এই ধরুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প, রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প টাইপ যেসব প্রকল্প আছে সেখানে বিশ্ব ব্যাংক কোন ভ্যাজাল করেনা। এর থেকে বেনিফিট কি আসে আমরা জানিনা। কি দক্ষতার উন্নয়ন হয় সেটাও জানিনা। আবার ধরুন কোন প্রকল্পের নাম দিবে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। আদতে এর বেনিফিট কতটুকু আসলো সেটা ভাবার সময় না আসলেও ভাল একটা সংখ্যা আসে। যেমন এত লক্ষ মানুষকে ট্রেনিং দিছে। শুনতে ভাল লাগে। কিন্তু এসব ট্রেনিং এ মানুষ আসলেও শিখতে যাচ্ছে কিনা বা কতটুকু শিখছে সেটা বুঝা কঠিন। কিন্তু দিনশেষে দেখবেন বিশ্বব্যাংকের কাছে ঋনের পরিমান বাড়লেও সেই ঋন নিয়ে সমালোচনার কেউ নেই।
আমাদের অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। এখন পিছু ফেরার সময় নয়। আমাদের রেল, নৌপথ ও সড়কের দুর্বলতা কমিয়ে আনতে হবে। দেশকে বিনিয়োগ উপযোগী করতে হবে। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রুডেন্ট ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রিস্ক ফ্যাক্টরগুলি চিহ্নিত করে মিটিগেট করতে হবে। এর বিকল্প নেই আমাদের। আমাদের দেশে ১০০ কিলোমিটার পার হতে যে সময় লাগে সেটা যেন উন্নত বিশ্বের মত হয়। আমাদের কর্মঘন্টা যেন বেকার নষ্ট না হয়। প্রতিটা সময় যেন এদেশের মানুষ কাজে লাগাতে পারে সেই কামনায়।
Collected...
Photo: Road Network in China