মজুরের পাঠশালা

মজুরের পাঠশালা

Share

A Page for Consciousness Raising.

15/07/2025

** সুবিধাবাদী ঝোঁকের উদ্ভব ও সুবিধাবাদ প্রসঙ্গে:
কমরেড লেনিন লিখেছিলেন, মার্কসবাদী দলের ভেতরে মধ্যবিত্ত-মনোভাবাপন্ন লেখাপড়া-জানা বলিয়ে-কইয়ে লোকেদের একটা ঝাঁক থাকেই- যাদের 'ইন্টেলিজেনসিয়া' বা বাংলায় সচরাচর 'বুদ্ধিজীবী' বলা হয়ে থাকে। সেই রকম বুদ্ধিজীবী ছাড়া মার্কসবাদী দল গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু বিশেষ বিশেষ সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বুদ্ধিজীবীদের মনোবৃত্তি থেকেই সুবিধাবাদী ঝোঁকের উদ্ভব হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু বিচিত্র রূপে সেই সুবিধাবাদ দেখা দেয় তার বিরুদ্ধে লড়তে হয়।
এই আলোচনায় তিনি আরও বলেছিলেন,
"সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কথা যখন বলি, তখন বর্তমানকালের সুবিধাবাদের একটা বিশিষ্ট লক্ষণ যেন ভুলে না যাই। সে লক্ষণটা হলো সর্বক্ষেত্রেই সুবিধাবাদের চেহারা হয় অস্পষ্ট-আবছা, আকৃতি বিহীন থসথসে, পিছলে- পাশ কাটানো, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে পালানো। সুবিধাবাদির স্বভাবই হলো যে সে কোন একটা স্পষ্ট সিদ্ধান্তমূলক মত প্রকাশের দায়িত্ব সর্বদা এড়িয়ে যাবে; সে সর্বদা একটা মাঝামাঝি রাস্তা খুঁজবে, দুটো পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে সে সর্বদা সাপের মতো আঁকাবাঁকা হেলবে-দুলবে, দুটো মতের সঙ্গেই 'একমত' হওয়ার চেষ্টা করবে এবং তার নিজের পৃথক মতটাকে পরিষ্কার আকারে ধারালোভাবে না রেখে ছোট ছোট সামান্য সংশোধনী-প্রস্তাব, দ্বিধা-সন্দেহ-প্রকাশ, নিরীহ ভালোমানুষী পরামর্শ ইত্যাদি আকারে রাখবে। "

সুবিধাবাদীরা পার্টি শৃঙ্খলা সহ্য করতে পারেনা, সেকথা ব্যাখ্যা করার পর লেনিন লিখেছেন-
"আজকের দিনে সাধারণভাবে সব দেশেরই সুবিধাবাদীদের লেখায়-জোখায়, আর বিশেষ করে আমাদের দেশের মেনশেভিকদের লেখায়-জোখায় অবিরাম একটা ঘ্যানঘ্যানে-প্যান্ পেনে আহত সুর শোনা যায়। শৃংখলার বিরুদ্ধে এঁদের আক্রোশের সঙ্গে এই ঘ্যানঘেনে-প্যানপেনে সুরটার একটা বলিষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ আছে। ওঁদের কথা হল ওঁদের নিপীড়ন করা হচ্ছে, ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, স্থানচ্যূত করে উৎখাত করে দেয়া হচ্ছে, চারদিক থেকে ঘিরে অবরোধ করে রাখা হচ্ছে, চোখ রাঙিয়ে শাসন হচ্ছে।"
(সূত্র: ভি. আই. লেনিন; এক পা আগে দু'পা পিছে। গ্রন্থনা: শামীম ইমাম।)

01/07/2025
16/01/2024

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হইবার পক্ষে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলি যদি সংস্কারের মারফত না হইয়া বিপ্লবের মারফত হয় তাহা হইলে শ্রমিকশ্রেণীর সুবিধা বেশি; কারণ সংস্কারের পথ হইল মন্দগতির পথ দীর্ঘসূত্রতার পথ, জাতির শরীরের বিভিন্ন পচা অংশ তিলে তিলে ক্ষয় হওয়ার যন্ত্রণাদায়ক পথ।
শ্রমিক এবং কৃষকরাই সবচেয়ে আগে আর সবচেয়ে বেশি এই পচন পদ্ধতির জন্য যন্ত্রনা পাইয়া থাকে। তাড়াতাড়ি পচা অংশগুলি কাটিয়া ফেলা হইল বিপ্লবের পথ; সর্বহারার পক্ষে সবচেয়ে কম যন্ত্রণাজনক। পচা, দূষিত অংশগুলি সোজাসুজি বাদ দেওয়ার রাস্তা, রাজতন্ত্র এবং তার আনুষঙ্গিক জঘন্য, ঘৃণ্য, পূতিঘন্ধময় ও সংক্রামক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবচেয়ে কম আমল দেওয়া এবং তাহাদের স্বার্থের দিকে নজর না দেওয়ার রাস্তা হল বিপ্লবের রাস্তা। (লেনিন, "সিলেক্টেড ওয়আর্কস" ইংরাজি সংস্করণ মস্কো, ১৯৪৭ প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৩৬৮-৩৬৯)

16/01/2024

"বয়কট হচ্ছে একটা সংগ্রাম, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের বা বিধি-বিধানের কাঠামোর মধ্যেকার নয়, বরং ওই প্রতিষ্ঠান বা বিধি-বিধানের আবির্ভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। যেকোনো উপস্থিত প্রতিষ্ঠান বা বিধি-বিধান কেবলমাত্র ইতিমধ্যে বিদ্যমান অর্থাৎ পুরাতন শাসন ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত হতে পারে। ফলত, বয়কট হচ্ছে সংগ্রামের একটা উপায় পুরাতন শাসনব্যবস্থাকে উচ্ছেদ যার সরাসরি লক্ষ্য, অথবা সবচেয়ে খারাপ হলে অর্থাৎ লড়াইটা উচ্ছেদ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, এতটা পর্যন্ত দুর্বল করার মতো নয় যে এটা ওই প্রতিষ্ঠানকে বা বিধি-বিধানকে দাঁড় করাতে, তাকে ক্রিয়াশীল করতে সক্ষম হবে। ফলস্বরূপ বয়কটকে সফল করতে হলে পুরাতন শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই দরকার, দরকার ওই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা অভুত্থান, দরকার ওই শাসনের বিরুদ্ধে একটা ব্যাপক সংখ্যক ঘটনার মধ্য দিয়ে গণ অবাধ্যতা (একটা অভুত্থানের প্রস্তুতির জন্য এই ধরনের গণ অবাধ্যতা হলো একটা অন্যতম শর্ত)। বয়কট হল পুরাতন শাসন ব্যবস্থাকে স্বীকার করতে প্রত্যাখ্যান করা, অবশ্যই কেবল কথায় নয় কাজে, অর্থাৎ এটা এমন কিছু যা কেবলমাত্র সংগঠনের চিৎকার বা শ্লোগানের মধ্যে তার প্রকাশ দেখেনা, তা দেখে ব্যাপক গণ মানুষের সুনির্দিষ্ট লড়াইয়ের মধ্যে, যারা পুরনো শাসনব্যবস্থার আইন-কানুন পরিকল্পিতভাবে অমান্য করে, পরিকল্পিতভাবে নতুন প্রতিষ্ঠানসমূহ দাঁড় করায়, যেসব যদিও বেআইনি, কিন্তু তা অস্তিত্বশীল হয় ইত্যাদি, ইত্যাদি। এভাবে বয়কট এবং ব্যাপক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের মধ্যেকার সম্পর্কটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে যায় : বয়কট হলো সংগ্রামের সবচেয়ে নিষ্পত্তিমূলক উপায় যা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক রূপকেই নাকচ করে না, বরং তার অস্তিত্বকেই নাকচ করে। বয়কট হচ্ছে পুরনো শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি খোলামেলা যুদ্ধের একটা ঘোষণা, তার ওপর সরাসরি আক্রমণ। একটা ব্যাপক বৈপ্লবিক উত্থান উপস্থিত না থাকলে, পুরনো বৈধতার সীমা, এটা যা ছিল তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এমন একটা গণ অস্থিরতা উপস্থিত না থাকলে সেখানে বয়কট সফল হবার কোন প্রশ্নই আসতে পারে না।"
[ভ. ই. লেনিন, বয়কটের বিরুদ্ধে_ একজন সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেখকের নোট।]

10/10/2023

** রণনীতি- রণকৌশল ও কর্মসূচি:
* রণনীতি(Strategy): রণনীতি হচ্ছে, বিপ্লবের নির্দিষ্ট স্তরে শ্রমিকশ্রেণি কোথায় প্রধান আঘাত হানবে তাই স্থির করা, বিপ্লবের (মুখ্য ও গৌণ মজুত) বাহিনীর বিন্যাস পরিকল্পনা করা এবং বিপ্লবের নির্দিষ্ট স্তরের আগাগোড়া ঐ পরিকল্পনাকে কাজে পরিণত করার জন্য লড়াই চালানো। বিপ্লবের আসল বাহিনী আর মজুত বাহিনী নিয়েই রণনীতির কারবার।আমাদের (সর্বহারাশ্রেণি বা শ্রমিকশ্রেণি) রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে পথ ধরে আমাদের শত্রুর উপর সবচেয়ে সুবিধাজনকভাবে মূল আঘাত হানতে পারি, যাতে আঘাতটি করে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সর্বোচ্চ ফলাফল বয়ে আনতে পারি, যাতে সঠিকভাবে মূল দিক-নির্দেশ নিরূপণ করে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন ও উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারি যা শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে অবশ্য গ্রহণীয় তাকে আমরা রণনীতি বলি বা বলতে পারি।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক শত্রুর অবস্থা, পার্শ্ববর্তী দেশের অবস্থা, আন্তর্জাতিক অবস্থা এগুলোর উপর ভিত্তি করে রণনীতি নির্ধারণ করতে হয়। প্রত্যক্ষ মিত্র, পরোক্ষ মিত্র নির্বাচন, সহায়ক শক্তি নির্ধারণ করা রণনৈতিক নেতৃত্বের কাজ। রণনীতির ক্ষেত্রে নেতৃত্বের কাজ হলো, বিপ্লবের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে বিপ্লবের প্রধান উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য মজুদ বাহিনীগুলিকে ঠিকমতো কাজে লাগানো।
প্রাথমিকভাবে মার্কসবাদ এর তত্ত্ব ও কর্মসূচি দ্বারা যোগানকৃত উপাত্তের উপর নির্ভর করে, মতবাদের আলোকে এক নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক আমলে একটি নির্দিষ্ট দেশে সঠিকভাবে সর্বহারা শ্রেণির আন্দোলনের মূল দিক-নির্দেশ নির্ধারণ করা রাজনৈতিক রণনীতির কাজ।
রাজনৈতিক লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্তরের সহিত সম্পর্কিত। স্তর পরিবর্তিত না হলে রণনীতি মূলত পরিবর্তিত হয় না।

রণনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে- যেমন, স্বৈরতন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ে জয়লাভ করা- বুর্জোয়াদের পরাস্ত করা এবং সরকার আর বুর্জোয়া বিরোধী লড়াইকে চরম পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ বিপ্লব পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।

* রণকৌশল(Tacticts): ভ. ই. লেনিনের মতে, "পার্টির রণকৌশল বলতে আমরা বুঝি পার্টির রাজনৈতিক আচরণ, অথবা তার রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের চরিত্র, অভিমূখ এবং পদ্ধতি।"
রণকৌশল রণনীতির অংশ, রণীতির অধীনস্থ, তারই সেবায় নিয়োজিত এটি সমগ্রভাবে যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং স্বতন্ত্র ঘটনা, উপাখ্যান, লড়াই ও মোকাবেলার সাথে সম্পর্কিত।
রণকৌশলের কর্তব্য হলো রণনীতির চাহিদা অনুসারে এবং সমস্ত দেশের শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে হিসাবের মধ্যে নিয়ে প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট ও বিশেষ মুহূর্তে লড়াইয়ের যেসব পথ ও পন্থা, রূপ ও পদ্ধতি, সাফল্যের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উপযোগী ও সুনিশ্চিত তা নির্ধারণ করা।
আন্দোলনের জোয়ার-ভাটার, বিপ্লবের উত্থান-পতনের অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে শ্রমিকশ্রেণি কোন্ পন্থায় নিজেকে পরিচালিত করবে তাই স্থির করা এবং পুরানো ধরনের সংগ্রাম আর সংগঠনের বদলে নতুন ধরনের সংগ্রাম আর সংগঠনের মারফত পুরানো ধরনের আওয়াজের বদলে নতুন ধরনের আওয়াজের মারফত এই পন্থা অনুসরণ করা, বিভিন্ন ধরনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা ইত্যাদির নামই রণকৌশল। রণকৌশলের লক্ষ্য হচ্ছে- একটা বিশেষ খণ্ড যুদ্ধে জয়লাভ করা, কোন বিশেষ অভিযানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, বিপ্লবের উত্থান-পতনের কোন নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিশেষ কোনো খণ্ড যুদ্ধকে জয় লাভের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সমগ্রভাবে যুদ্ধ জয় করা রণকৌশলের লক্ষ্য নয়।
রণকৌশলের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের কাজ হলো- শ্রমিকশ্রেণির সংগঠনের-সংগ্রামের সমস্ত ধরনকেই আয়ত্ত করা এবং একে এমনভাবে কাজে লাগানো যাতে, হাতের কাছে যে নির্দিষ্ট শক্তি আছে তার সাহায্যে রণনীতিকে সফল করার পথে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর হওয়া যায়। শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম ও সংগঠনের ধরন, তার রদবদল এবং সমন্বয়ে নিয়েই রণকৌশলের কারবার।

কৌশল দুই প্রকার: বিপ্লবী কৌশল আর সংস্কারবাদী কৌশল। বিপ্লবীদের কৌশলের আসল কথা হলো- বিপ্লবী কাজকর্ম, সংস্কার হলো বিপ্লবেরই একটি গৌণ ফল মাত্র। আর সংস্কারপন্থীদের কৌশল হলো- সংস্কারটাই হলো সবকিছু, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড নেহাত কথার কথা, লোকের চোখে ধুলো দেবার জিনিষ। বিপ্লবীরাও প্রয়োজনে সংস্কার করে সেই সংস্কার বিপ্লবের লক্ষ্যে, বিপ্লবের পক্ষে। বিপ্লবীরা প্রয়োজনে আপোষও করে, সেটাও একই কারণে। মনে রাখতে হবে, বিপ্লবীরা সংস্কারবাদী নয় বিপ্লববাদী।
"রণনীতি ও রণকৌশল হল শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী লড়াইয়ের নেতৃত্ব বিজ্ঞান।"
মনে রাখতে হবে- কোন কোন সময় রণকৌশলগত সাফল্যসমূহ তাদের আশু কর্মফলের দৃষ্টিকোণ থেকে চমৎকার অথচ রণনীতিগত সম্ভাবনার সাথে সঙ্গতিশীল না থাকার কারণে সামগ্রিক অভিযানের পক্ষে এক সর্বনাশা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বা করতে পারে। এমন সময় আসে যখন একটি রণকৌশলগত সাফল্যকে উপেক্ষা করতে হয় এবং রণকৌশলগত ক্ষয়-ক্ষতি ও বিপর্যয়সমূহকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবশ্যই কাঁধে তুলে নিতে হয় যাতে ভবিষ্যতের রণনীতিগত সাফল্য নিশ্চিত করা যায়।
"নিঃসন্দেহেই, জনগণের মধ্যে বিপ্লবী মেজাজ ছাড়া, আর এই মেজাজের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির পক্ষে সহায়ক পরিস্থিতি ছাড়া, বিপ্লবী রণকৌশল কখনোই বাস্তব সংগ্রামে (action)বিকাশ লাভ করবে না। কিন্তু, রুশদেশে সুদীর্ঘ, বেদনাদায়ক ও রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের এই সত্যটি শিখিয়েছে যে, কেবলমাত্র বিপ্লবী মেজাজের ভিত্তিতেই বিপ্লবী রণকৌশল রচনা করা যায় না। রণকৌশলকে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের (এবং তার চারিপাশের রাষ্ট্রসমূহের, আর বিস্মায়তনের সমস্ত রাষ্ট্রের) সমস্ত শ্রেণি-শক্তি সমূহের আর তার সাথে বিপ্লবী আন্দোলনসমূহের অভিজ্ঞতার একটা পরিমিত ও কঠোরভাবেই বাস্তব মূল্যায়নের (a sober and strictly objective appraisal) উপর।"
[লেনিন; "বামপন্থী" কমিউনিজম, বালসুলভ ব্যাধি।]

* কর্মসূচী প্রসঙ্গে-
" একটি পার্টি যেসবের জন্য চেষ্টা করছে এবং লড়ছে তার সংক্ষিপ্ত, সুস্পষ্ট ও যথাযথ বিবরণ হল কর্মসূচী।" (লেনিন গ্রামের গরিবদের প্রতি।)
"কর্মসূচী হচ্ছে কর্মসাধনের সহায়ক, ... কর্মসূচীতে অতি অবশ্য থাকবে এমন বিষয়, যা একেবারেই অখণ্ডনীয়- যা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। একমাত্র তাহলেই তা মার্কসবাদী কর্মসূচী হবে। (ভ.ই.লেনিন, রচনা সংগ্রহ, খণ্ড ২৯, পৃষ্ঠা ১৬৮)।
কর্মসূচীতে একটি রাজনৈতিক দলের দুটি লক্ষ্যই বর্ণনা করা হয়; আশু লক্ষ্য (সর্বনিম্ন কর্মসূচী) হল, -জারের স্বৈরতন্ত্রের উচ্ছেদসাধন, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দৈনিক ৮ ঘণ্টার কর্মদিবসের প্রবর্তন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন এবং জমিদারি প্রথার উচ্ছেদসাধন; আর শ্রমিকশ্রেণীর ও কমিউনিস্ট পার্টির চূড়ান্ত লক্ষ্য (সর্বোচ্চ কর্মসূচী) হল- সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদন এবং প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। (ভি. আই. লেনিন, প্রলেতারীয় পার্টির সাংগঠনিক নীতিসমূহ সম্পর্কে।)
* বিপ্লবের সাফল্যের জন্য একটা সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি দরকার। - ভ. ই. লেনিন

-গ্রন্থনা ও পুনঃরচনা: শামীম ইমাম‌। ৪ মে, ২০২৩।

25/02/2023

ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি:
"মানুষের ইতিহাসকে সাধারণত জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের কাহিনী বা দুই একজন রাজা বা সেনাপতির কিংবা রাষ্ট্রনায়কের কীর্তিকথার রূপে চিত্রিত করা হয়। কখনও কখনও এইসব লোকের উদ্দেশ্যকে নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন- কোন ব্যক্তি নেহাতই তাঁর উচ্চাশার দরুন অন্য দেশ জয় করেন অথবা তার নীতি বা দুর্নীতিপরায়নতার দরুন বিশেষ বিশেষ কাজ করেন ইত্যাদি। কখনও-বা ঐসব ব্যক্তির কার্যকলাপকে সদস্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার সংকল্প বা ধর্ম বিশ্বাসের দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে দেখানো হয়।
ইতিহাস সম্পর্কে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গিতে মার্কসবাদ সন্তুষ্ট নয়।
প্রথমত মার্কসবাদ এর মতে জনসাধারণ ই হলো প্রকৃত ইতিহাস বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ব্যক্তি বিশেষ সম্পর্কে সম্বন্ধে আলোচনা করা যেতে পারে শুধু সেই পরিমাণে যে পরিমাণে তার মধ্যে ব্যক্তির চেয়েও ব্যাপকতার কিছু অর্থাৎ জনসাধারণের কোন না কোন আন্দোলন মূর্ত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ক্রমওয়েলের কথা ধরা যেতে পারে। ক্রমওয়েলের গুরুত্বের কারণ তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যক্তিগত কার্যকলাপ নয়। তিনি পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইংরেজ জনসাধারণের একাংশের সংগ্রামে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন সেই জন্যই তাঁর গুরুত্ব। তিনি এবং তার আন্দোলন সমান্তবাদের বাধাগুলিকে ভেঙে ফেলে ব্রিটেনের পুঁজিবাদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
তিনি কতগুলি যুদ্ধ করেন তার তালিকা বা তার ধর্ম বিশ্বাস অথবা তিনি যেসব কোড চক্রান্ত করেছিলেন ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনায় মুখ্য জিনিস নয়। জানার বা বোঝার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, বৃটেনে উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার বিকাশে ক্রমওয়েলের অবদান কতটুকু? আর জানা প্রয়োজন যে কেন সেই যুগে এবং বিশেষভাবে বৃটেনে সামন্ত- প্রথা ও তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রবল হয়ে উঠেছিল। কি কি পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেই যুগে। এইগুলিই ইতিহাস-বিজ্ঞানের গোড়ার কথা বা ভিত্তি। এইভাবে কোন যুগের ও সেই সঙ্গে অন্যান্য যুগ এবং জাতির ইতিহাস অধ্যায়নের দ্বারা অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে সাধারণ তত্ত্ব খাড়া করা যায়। এইভাবে জানা যায় বিকাশের নিয়মগুলিকে। ...
মার্কসবাদ ইতিহাস অধ্যায়নের দ্বারা সমগ্র মানব-ইতিহাসের পশ্চাতে যেসব প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করে সেগুলিকে খুঁজে বের করতে চায়। তাই তার অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু হলো জনসাধারণ, ব্যক্তি বিশেষ নয়।"
[সূত্র: মার্কসবাদ, এমিল বার্নস। পৃঃ ৮, ৯।]

05/08/2022

নৈরাজ্যবাদ, নারদনিক ও 'নারোদবাদ' প্রসঙ্গে:

নৈরাজ্যবাদ: ঊনবিংশ শতাব্দীর ফ্রান্সে, জার্মানিতে, ইতালিতে, স্পেনে, রাশিয়ায় নৈরাজ্যবাদ বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। নৈরাজ্যবাদ (এনার্কিজম)-এর মূল দার্শনিক কথাটা ছিল ব্যক্তির সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র; রাষ্ট্রমাত্রই ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করে, প্রতিষ্ঠানমাত্রেই ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ; অতএব, যথার্থ মুক্তি বা স্বাধীনতা হচ্ছে রাষ্ট্র এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন- নৈরাজ্যবাদের রাজনৈতিক দর্শন এরকম একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। ফলে সমবেতভাবে কাজ কর্মের কোন বন্দোবস্তও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও অত্যাচারের শামিল বলে এই চিন্তাধারায় গণ্য হতো।

নারদনিকদের মধ্যে নৈরাজ্যবাদের প্রভাব ছাড়াও পরবর্তীকালে রাশিয়ায় কয়েকটি নৈরাজ্যবাদী দল উপদল তৈরি হয়েছিল। মার্কসবাদীদের এরা যথেষ্ট বিপ্লবী বলে মনে করতো না। 'মার্কসবাদীরা একনায়কত্ব চায়, স্বাধীনতা চায় না', 'মার্কসবাদীরা ভোটের রাজনীতি করে', 'মার্কসবাদীরা সংস্কার-পন্থী' মার্কসবাদের বিরুদ্ধে এসব সমালোচনা এরা করতো।
গ্রন্থনা: শামীম ইমাম, ২৯ জুন, ২০২২।

[সূত্র: ১. সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস।
২. রুশ বিপ্লবের প্রস্তুতি; প্রথম খন্ড জ্যোতি ভট্টাচার্য,
প্রথম এনবিএ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।]

নারদনিক ও 'নারোদবাদ':
রুশ ভাষায় 'নারদ্' শব্দের অর্থ জনসাধারণ। সমাজ পরিবর্তন, বিপ্লব, জনসাধারণের কল্যাণ, কৃষকদের মুক্তি, স্বৈরতন্ত্রের অবসান ইত্যাদি কথাবার্তা যারাই বলতো তাদের সবাইকে একসঙ্গে বলা হতো নারদনিক। নারদনিকরা প্রথমে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিল। এই উদ্দেশ্যে শিক্ষিত তরুণ বিপ্লবীরা চাষীর পোশাক পরে গ্রামে গ্রামে গিয়েছিল। তখনকার ভাষায় বলতে গেলে জনগণের কাছে গেল। 'নারদ্' অর্থ 'জনগণ'; নারদনিক নামকরণ এজন্যই হয়েছে।
১৮৬৯-৭০ সালে নারদনিকদের একটি দল সুইজারল্যান্ড এর জেনেভা শহর থেকে 'নারোদনয়ে নিয়েলো' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতো। এরা আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সংস্পর্শে এসেছিল। মার্কস ও এঙ্গেলস পরিচালিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের রুশ শাখার অংশ হিসেবে ১৮৭০ সালে এই গ্রুপ স্বীকৃতি পায়। প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদে এদের প্রতিনিধি হিসেবে এরা কার্ল মার্কসকে নির্বাচিত করেছিল। মার্কসের সঙ্গে এদের সম্পর্ক ভালো ছিল এবং প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাকুনিনপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এরা মার্কসকে
সমর্থন করেছিল। তথাপি রাশিয়ার পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগ সম্বন্ধে এদের ধারণা ছিল অপরিণত; মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে এক ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ভাবপ্রবণতা এদের তখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। রাশিয়ার গ্রাম জীবনকে এরা আদর্শ বলে মনে করতো এবং গ্রামগোষ্ঠী সংগঠনকেই সমাজতন্ত্রের ভিত্তি বলে মনে করতো‌। রাশিয়ার ভেতরে বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে এই প্রবাসী বিপ্লবীদের কোন সজীব সংযোগ ছিল না। ১৮৭২ সাল নাগাদ এই গ্রুপটি লোপ পায়।
১৮৬৯-৭২ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে 'চাইকোভস্কি সার্কেল' নামে তরুণ বিপ্লবীদের একটা গ্রুপ গড়ে উঠেছিল। ১৮৭৫ সাল নাগাদ এই গ্রুপের নেতা নাতানসন এবং এ. ডি. মিখাইলভ দক্ষিণাঞ্চলের ওডেসা, কিয়েভ্, খারকভ্ প্রভৃতি শহরের তরুণ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই যোগাযোগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এক গোপন সংগঠন- 'জেমলিয়া ই ভোলিয়া' [জমি ও স্বাধীনতা]। কৃষকদের হাতে জমি এবং সকলের জন্য গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকার এ দুটো কথাই বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান কথা ছিল তখন। 'জেমলিয়া ই ভোলিয়া' বিপ্লবী সংগঠনের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ‌ঝেলিয়াবভ্ ও খালতুরিন- এই নামগুলো লেনিন বরাবর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
আবার নারদনিকদেরই আরেকটা অংশ উদারনৈতিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আদর্শের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ১৮০০-১৯০০ সালের দু'টি দশকে দানিয়েলসন, মিখাইলভ্স্কি, ভরোনৎসভ্ প্রভৃতি লেখকরা এই উদারনৈতিক নারোদিজম প্রচার করেন।
নারদনায়া ভোলিয়া দলের আরেকটি অংশ পরবর্তীকালে 'সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি পার্টি' নামে একটি দল গঠন করে। ....

নারদনিকদের রুশ বিপ্লবের গোড়ার ইতিহাসের স্রষ্টা বলা যায়। জার সরকারের সন্ত্রাস ও স্বৈরতন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা; বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার; সমাজ পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি, জারের সন্ত্রাসের পালটা সন্ত্রাসমূলক আক্রমণ ঘটানো; মরণপণ বীরত্ব ও আত্মদান; অকাতরভাবে নিদারুণ দুঃখযন্ত্রণা ভোগে অদম্য উৎসাহ; অসাধারণ শৃঙ্খলাবোধ; আদর্শশানুরাগ এবং বিপ্লবীদের একাত্মবোধ এসবের এক উজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করেছিল প্রথম যুগের নারদনিকরা।

রুশ নারদানিক বিপ্লবীরা অনেকে পত্রালাপের মারফত মার্কস এবং এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন। রুশ বিপ্লবী আন্দোলনের জাগরণ দেখে মার্কস আনন্দিত হয়েছিলেন, নিজে যত্ন করে রুশ ভাষা শিখেছিলেন। দানিয়েলসনের প্রতি এবং ভেরা জাসুলিচের প্রতি মার্কস ও এঙ্গেলসের অনেকগুলো চিঠি পাওয়া যায়- রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে এই চিঠিগুলোতে বহু শিক্ষনীয় আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু মার্কস ও মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটলেও এবং মার্কসবাদী চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হলেও নারদনিকরা মার্কসবাদী হয়ে উঠতে পারেননি। সে সময়ে নানা ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ধারণাই তাদের চিন্তাধারাকে চালিত করতো। বিশেষত, বাকুনিন যে নৈরাজ্যবাদের আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই নৈরাজ্যবাদ নানাভাবে নারদনিকদেরও প্রভাবিত করেছিল।

সাধারণভাবে বলা চলে নারদনিকরা গণ-সংগঠন বিস্তার করা এবং গণ-সংগঠনের রাজনৈতিক চেতনা ও সক্রিয়তা সৃষ্টি করার পরিবর্তে অল্প কয়েকজন উৎসর্গিত-প্রাণ কর্মীর গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক কার্যকলাপের উপরই প্রায় সমস্ত ঝোঁক দিয়েছিলেন। নারদনিকদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, কয়েকজন উদ্যোগী "বীর" থাকবে আর নিষ্ক্রিয় "জনতা" তাদের কার্যকলাপের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ইতিহাস সৃষ্টি করে মাত্র কয়েকজন মহারথী আর জনসাধারণ, শ্রেণী, "জনতা" (নারদনিক লেখকরা অবজ্ঞা করে এদেরকে "ইতর লোকের ভিড়" বলে বর্ণনা করেন) সচেতন সংগঠিত কাজ করতেই অক্ষম, তারা শুধু অন্ধভাবে "বীরদের" পথ অনুসরণ করতে পারে। এই চিন্তার কারণেই নারদনিকেরা চাষীও মজুদদের মধ্যে বিপ্লবী প্রচার কাজ ত্যাগ করে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদের দিকে যায়। উল্লেখ্য, নারদনিকরা প্রথমে যখন জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করে তখন চাষীদের সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান ও উপলব্ধি না থাকার দরুন তারা চাষীদের কাছে কোন সমর্থন পায়নি, তাদের অধিকাংশরাই জারের পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। তখন তারা স্থির করে যে জনগণের সমর্থন ছাড়া তারা একাই জারের শাসনের বিরুদ্ধে লড়বে- যা ছিল আরো মারাত্মক ভুল। নারদনিকদের চিন্তার প্রভাব এতটাই পড়েছিল যে, তখনকার রাশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী স্তেপান্ খালতুরিন্ যিনি বিপ্লবী মজুর ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন, তিনি তা ছেড়ে দিয়ে 'সন্ত্রাসবাদে' সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন।
সংক্ষেপে নারদনিক চিন্তাধারায় প্রধান বক্তব্যগুলো হচ্ছে : রাশিয়ার গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করেনি, করবেও না; রাশিয়ার কৃষকরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, এখানে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের কথা ওঠে না; রাশিয়ার ইতিহাস পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের মতো হবে না, রাশিয়ার ইতিহাসের একটা আলাদা নিয়তি আছে; বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়ার একটি পৃথক বিশিষ্ট ভূমিকা আছে; এখানে মার্কসবাদ থাকবেনা, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র আলাদা ধরনের হবে- ধনতান্ত্রিক শিল্প বিস্তারের মধ্য দিয়ে না গিয়ে, 'মির' নামে পরিচিত পঞ্চায়েত ধরনের গ্রামগোষ্ঠী ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই সরাসরি সমাজতন্ত্র গড়া যাবে।
শ্রমিক আন্দোলন সম্বন্ধে ছিল দু'রকম বিপরীত ধারণা। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সম্পর্কে তাদের অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য ছিল, 'রাজনৈতিক স্বাধীনতা যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ এসব নিরর্থক' ইত্যাদি বুলি। আবার উল্টোদিকে ছিল 'রাজনীতির দরকার নেই, স্বৈরতন্ত্র অবসান করতে তার জায়গায় বুর্জোয়া গণতন্ত্র চালু করে শ্রমিকদের কি স্বার্থ, ওতো সংবিধানবাদী অবৈপ্লবিক উদারনীতিকদের কর্ম বলে শ্রমিকদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।'

প্লেখানভ দেখালেন- নারদনিকরা যদিও নিজেদের 'সমাজতন্ত্রী' বলে মনে করে 'সমাজতন্ত্র' -এর কথা বলে আসলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারে কাছে তারা যায় না, নিজেদের এক উদ্ভট কাল্পনিক 'সমাজতন্ত্র' তারা নিজেদের মনে মনে গড়েছে; এ কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের বুলি কখনো সমাজতন্ত্রে নিয়ে যাবে না, উল্টো শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথ থেকে সরিয়ে দেবে, আলেয়ার আলো দেখিয়ে খালি এলোমেলো ঘুরিয়ে মারবে।
নারদনিকদের 'সমাজতন্ত্র' হচ্ছে নৈরাজ্যবাদ এবং ষড়যন্ত্র দিয়ে ক্ষমতা দখল তত্ত্বের এক জগাখিচুড়ি। এই 'সমাজতন্ত্র' পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীর স্বপ্ন।

প্লেখানভ আরও দেখালেন- রাশিয়ায় ধনতন্ত্র গড়ে উঠবে না বলে নারদনিকরা যেসব কথা তোলে সেগুলো শুরুতেই ভুল, কারণ রাশিয়ায় ধনতন্ত্র গড়ে ওঠা শুরু হয়ে গিয়েছিল। নারদনিকরা যে বলে রাশিয়ার ইতিহাসে ধনতন্ত্র অনিবার্য একটা স্তর নয়, ধনতান্ত্রিক শিল্পের বিকাশ ছাড়াই রাশিয়া সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছতে পারবে- রাশিয়ার জন্য এই বিশেষ ধরনের অ-ধনতান্ত্রিক পথের কথা একেবারেই উঠে না, কারণ ধনতান্ত্রিক শিল্পের বিকাশ রাশিয়ায় ঘটছে। ধনতান্ত্রিক বিকাশকে বাধা দিয়ে ধনতন্ত্রের আগের অবস্থায় রাশিয়াকে আটকে রাখার চেষ্টা করা বিপ্লবীদের কর্তব্য নয়, বিপ্লবীদের কর্তব্য ধণতান্ত্রিক বিকাশের ফলে যে বৈপ্লবিক শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে তাকে সচেতন করে সংগঠিত করে গণ-সংগ্রামের পথে এগোনো।
নারদনিকরা যে বিপ্লবী সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী চরিত্র এবং শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব অস্বীকার করে সেটা ভুল। রাশিয়া পশ্চাৎপদ দেশ হলেও সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিকশ্রেণী কম হলেও বিপুল অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী হলেও বিপ্লবের প্রধান শক্তি এবং প্রধান ভরসা শ্রমিকশ্রেণীই।
কৃষকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, এবং তাদের দুঃখদুর্দশা চরমে পৌঁছালেও তারা সমাজ বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে পারবেনা, অগ্রণী চরিত্র তাদের হয় না; কারণ, ক্ষুদে ক্ষুদে জমির টুকরোয় ক্ষুদে মাত্রার উৎপাদনে তারা নিযুক্ত- এই অর্থনীতি গোটা সমাজটার উন্নতির কোন রাস্তা দেখাতে পারে না, দ্বিতীয়ত কৃষকরা, একটা জমাট ঐক্যবদ্ধ শ্রেণী নয়, তাদের মধ্যে স্তরভেদ বাড়াতে বাড়াতে শ্রেণীভেদ হয়, একদিকে ধনী কৃষক আরেকদিকে খেততমজুর আর মাঝে অন্যান্য ছোট চাষী- এইভাবে এরা ভাগ হয়ে যায়। শ্রমিক আন্দোলনকে অবহেলা করে, তাচ্ছিল্য করে, শুধু কৃষক বিদ্রোহ ঘটিয়ে রাশিয়ায় বিপ্লব আসবেনা।
নারদনিকরা যে বলে বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়ার একটা বিশেষ বাণী দেওয়ার আছে, রাশিয়ার প্রাচীন গ্রাম-পঞ্চায়েতগুলোই আসল সমাজতন্ত্রের বীজ, রাশিয়ার এই গ্রাম-পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে না ভেঙে সমাজতন্ত্রের কাঠামো করে নেওয়া যাবে- এটা ভুল কথা। গ্রাম পঞ্চায়েতগুলো মাতব্বর ধনী কৃষকদের ক্ষমতা ও প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, গরিব চাষী খেতমজুরদের শোষণ করার ও দমন করার ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। গ্রাম-পঞ্চায়েতগুলোকেই আশ্রয় করে গ্রাম অঞ্চলে জারশাহীর শাসন চলছে কম হাঙ্গামায় কম খরচায়; গ্রাম-পঞ্চায়েতের মোড়লরাই জারশাহীর পুলিশের কাজ আর খাজনা আদায়কারী কর্মচারীর কাজ করে দিচ্ছে।
বিপ্লব সম্বন্ধে নারদানিকদের কল্পনাটাই ভুল। নারদনিকরা মনে করতো জনসাধারণ নির্জীব নিষ্ক্রিয় জড়বস্তুর মতো। বিপ্লবী বীর পুরুষরা, নায়করাই ইতিহাস তৈরি করে- তাদের বিদ্যুৎ-স্পর্শে জনসাধারণ সচল হয়ে উঠে অন্ধভাবে বিপ্লব করে ফেলে; গণ-সংগঠন, জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক জ্ঞানবিস্তার, চেতনার প্রসার, আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় জনসাধারণকে পুষ্ট করে শিক্ষিত করা- বিপ্লবের জন্য এইসব দরকার নেই, বিপ্লবী বীর নায়করা একটা দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটাতে পারলে তার ফলে যে আবেগ-উত্তেজনা জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হবে সেটাই বিপ্লব নিয়ে আসবে। প্লেখানভ দেখালেন, বীরপুরুষরা ইতিহাস তৈরি করে এটা একপেশে কথা, ভুল কথা। ইতিহাস বীরপুরুষদের তৈরি করে, জনসাধারণ বীরপুরুষদের সৃষ্টি করে এ কথাটাই বেশি ঠিক। বীরপুরুষরা, মহানায়করা যদি সমাজে ইতিহাসের গতি না বুঝতে পারেন, যদি সমাজের যা প্রয়োজন তার উল্টোপথ দেখান তাহলে তাঁদের কথার সমাজ চলে না, তাঁরাই নিষ্ফল হয়ে যান, উদ্ভট হাস্যাস্পদ হয়ে যান, বিপজ্জনক বাধা হয়ে ওঠেন। [CPSU Hist. 14-17]

সে আমলে রাশিয়ার নারদনিক বিপ্লবীরা অসাধারণ বীরত্বের বহু নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। লেনিন সেজন্য তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং অকুন্ঠ প্রশংসা করতে কখনো কার্পণ্য করেননি। বারবার তিনি তাঁদের বিপ্লবী ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সাংগঠনিক প্রতিভা, তাঁদের শৃঙ্খলাবোধ, কমরেডদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও একাত্মবোধ- ইত্যাদি কথা লেনিন বহুবার উল্লেখ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তীকালে নারদনিকদের জনপ্রিয়তা ও মর্যাদার আশ্রয় নিয়ে যেসব ভুল মতবাদ ও ভুল কর্মধারা প্রচারিত হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র তীক্ষ্ণ কশাঘাত করতেও লেনিন কখনো ইতস্তত করেননি। কমরেড লেনিন তাঁর অনেকগুলো লেখাতে তখনকার প্রধান নারদনিক দল "নারদনায়া ভলিয়া" এবং পরে নারদনিকদের উত্তরাধিকারী সোশ্যালিস্ট-রেভল্যুশনারিরা রাজনৈতিক সংগ্রামের যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করতো, সেগুলোর বিশেষ করে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদের পদ্ধতির সমালোচনা করেন। এই ধরনের সংগ্রাম-পদ্ধতিকে আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকর বলে লেনিন অভিমত দেন। কারণ এতে গণসংগ্রামের পরিবর্তে ব্যক্তিগত মহারথীদের সংগ্রামকে স্থান দেওয়া হয়। জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনে বিশ্বাসের অভাব হতেই এইসব পদ্ধতির সূচনা।
গ্রন্থনা: শামীম ইমাম, ২৯ জুন, ২০২২।
[সূত্র: ১. সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস।
২. V.I. Lein, What The "Friends of the People" Are and How they fight the Social Democrats
৩. রুশ বিপ্লবের প্রস্তুতি; প্রথম খন্ড; জ্যোতি ভট্টাচার্য,
প্রথম এনবিএ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।]

17/03/2022

সুবিধাবাদ প্রসঙ্গেঃ
কমরেড লেনিন লিখেছিলেন- মার্কসবাদী দলের ভেতরে মধ্যবিত্ত-মনোভাবাপন্ন লেখাপড়া-জানা বলিয়ে-কইয়ে লোকেদের একটা ঝাঁক থাকেই- যাদের 'ইন্টেলিজেনসিয়া' বা বাংলায় সচরাচর 'বুদ্ধিজীবী' বলা হয়ে থাকে। সেই রকম বুদ্ধিজীবী ছাড়া মার্কসবাদী দল গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু বিশেষ বিশেষ সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বুদ্ধিজীবীদের মনোবৃত্তি থেকেই সুবিধাবাদী ঝোঁকের উদ্ভব হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু বিচিত্র রূপে সেই সুবিধাবাদ দেখা দেয় তার বিরুদ্ধে লড়তে হয়।
এই আলোচনায় তিনি আরও বলেছিলেন,
"সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কথা যখন বলি, তখন বর্তমানকালের সুবিধাবাদের একটা বিশিষ্ট লক্ষণ যেন ভুলে না যাই। সে লক্ষণটা হলো সর্বক্ষেত্রেই সুবিধাবাদের চেহারা হয় অস্পষ্ট-আবছা, আকৃতি বিহীন থসথসে, পিছলে- পাশ কাটানো, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে পালানো। সুবিধাবাদির স্বভাবই হলো যে সে কোন একটা স্পষ্ট সিদ্ধান্তমূলক মত প্রকাশের দায়িত্ব সর্বদা এড়িয়ে যাবে; সে সর্বদা একটা মাঝামাঝি রাস্তা খুঁজবে, দুটো পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে সে সর্বদা সাপের মতো আঁকাবাঁকা হেলবে-দুলবে, দুটো মতের সঙ্গেই 'একমত' হওয়ার চেষ্টা করবে এবং তার নিজের পৃথক মতটাকে পরিষ্কার আকারে ধারালোভাবে না রেখে ছোট ছোট সামান্য সংশোধনী-প্রস্তাব, দ্বিধা-সন্দেহ-প্রকাশ, নিরীহ ভালোমানুষী পরামর্শ ইত্যাদি আকারে রাখবে। "

সুবিধাবাদীরা পার্টি শৃঙ্খলা সহ্য করতে পারেনা, সেকথা ব্যাখ্যা করার পর লেনিন লিখেছেন-
"আজকের দিনে সাধারণভাবে সব দেশেরই সুবিধাবাদীদের লেখায়-জোখায়, আর বিশেষ করে আমাদের দেশের মেনশেভিকদের লেখায়-জোখায় অবিরাম একটা ঘ্যানঘ্যানে-প্যান্ পেনে আহত সুর শোনা যায়। শৃংখলার বিরুদ্ধে এঁদের আক্রোশের সঙ্গে এই ঘ্যানঘেনে-প্যানপেনে সুরটার একটা বলিষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ আছে। ওঁদের কথা হল ওঁদের নিপীড়ন করা হচ্ছে, ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, স্থানচ্যূত করে উৎখাত করে দেয়া হচ্ছে, চারদিক থেকে ঘিরে অবরোধ করে রাখা হচ্ছে, চোখ রাঙিয়ে শাসন হচ্ছে।"
[সূত্রঃ ভ. ই. লেনিন; এক পা আগে দু'পা পিছে।]

13/05/2021

রক্তে ভেজা ঈদ

নদ-নদীর অববাহিকা, অভিন্ন জীবনধারা- এই নিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। শোষণের রাজধানী ঢাকা। ঈদ আসে প্রতিবছর নদীর অববাহিকায়, অজপাঁড়াগাঁয়ে, মফস্বলে এবং শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের রক্ত-ঘামে ঝলমলে হয়ে ওঠা রাজধানী ঢাকায়। রাজধানী ঢাকা- লোকসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি, যার প্রায় ৭০ শতাংশ মেহনতি মানুষ। এরা দিন আনে-দিন খায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠিন-কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে দু’মুঠো ভাত আর অন্ধকার রাজ্যের গহীন বস্তিতে একটুখানি শান্তিতে (!) ঘুমানোর আশ্রয় যারা পায় তারা এদের মধ্যে ভাগ্যবান। অন্যরা রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, পার্ক আর ফুটপাতে গড়ে তোলে সংসার। এরা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা টের পায়, পায়না ফাগুনের ঘ্রাণ এবং অবশ্যই ঈদের কেনাকাটার মহামারী এদের নাগাল পায়না কোনদিন।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-রূপসা-ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ঈদ আসে ঈদ যায়। একটা লাল জামা, আটপৌরে শাড়ী, লুঙ্গী, নিদেনপক্ষে একটা গেঞ্জী, ওড়নার জন্য স্বপ্নীল প্রতিক্ষা। একটু সিমাই-জর্দা, একবেলা পেটপুরে ভাল-মন্দ খাওয়া, এইটুকুও বিলাসিতা পদ্মা কিংবা যমুনা পাড়ের নিরন্ন শোষণজর্জরিত মেহনতি মানুষগুলোর জন্য।
আর লুটেরা ধনীক শ্রেণীর কয়েক হাজার ধনী-শোষক কারখানার মালিক, কোটিপতি ব্যবসায়ীর ঈদ হচ্ছে অন্যরকম- মিলেনিয়াম ভাইরাসের মতো এরা প্রতিবছর ঈদ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তাই লন্ডন-নিউ ইয়র্ক-বোম্বে-ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর-কলকাতা ও গুলশানের কোন মার্কেটগুলোই এদের লোভের গন্ডির বাহিরে থাকে না। লক্ষ-লক্ষ টাকা ব্যয়ে এরা দেশে-বিদেশের হাইরাইজ শপিং সেন্টারগুলো থেকে কিনে নেয় গরীব শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে তৈরী হরেক রকম জামা, জুতা-বিলাস পণ্য। অথচ যারা তৈরী করেই তারাই হয় শোষিত-বঞ্চিত।

ঈদ আসে ঈদ যায়, সূর্য ওঠে সূর্য ডোবে। গার্মেন্টস কারখানার চার দেয়ালে বন্দী শ্রমিকদের জন্য দিন-রাতের পার্থক্য থাকে না। তাদের প্রতি দিন-রাত শেষ হয় মালিকের রক্তচক্ষু আর অশ্রাব্য খিস্তির স্বপ্নে আর রাত নেমে আসে চাকরী হারানোর আশংকা নিয়ে। এদের জীবনে সারা বছরই কম-বেশী রোজা থাকতে হয়, নেই ঈদ। এরা রকমারী-বাহারী পোশাক তৈরী করবে, আমাদের মতো শোষণমূলক সমাজে যা কোনদিনও তারা নিজের গায়ে পরার সামর্থ্য হবে না। ঈদ একটু ব্যতিক্রম, কয়েকদিন ছুটি, একটু মিষ্টিমুখ- একদিন একটু ভাল খাওয়া, এর বেশী কী আব্দার এদের?
অথচ এই নগর এবং সভ্যতা এদের ঠেলে নিয়ে গেছে নরকের মাঝখানে। তাই ঈদের একটু আলোর ঝলকানী তেমন কোন চমক জাগায় না এদের চোখে। ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় গার্মেন্টস মালিক-মালিকের ভাড়াটিয়া মাস্তান, শিল্পপুলিশ সহ সরকারের পেটোয়া পুলিশ আর শোষকদের দূর্বিসহ পীড়নে।
এই অবস্থার পরিবর্তন আশু জরুরী। তার জন্য দরকার- অর্থনৈতিক দাবী-দাওয়া আদায়ের লড়াইয়ের পথ-পরিক্রমায় লুটেরা ধনীক-ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকারী বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যাভিমুখী বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলন।

শোষকের ঈদ, পেট ভরার ঈদ, রক্ত-মাংস খাওয়ার ঈদ। কে কত বেশী লুটেরা- দেখাতে পারে লুটের মাল তার অবাধ প্রদশর্নী। কালো টাকাকে সাদা করার জন্য তাদের রক্ষক রাষ্ট্র ও সরকারতো আছেই। আর মেহনতি মানুষের জীবনে ঈদ অন্য কোন দিনের মতো, একটু ব্যতিক্রম কি? হয়তো কোথাও, হয়তো না। তাদের এই ঈদও রক্ত আর ঘামে ভিজে একাকার হয়ে থাকে। ‘তাজরীন’ থেকে ‘রানা প্লাজা’ তাদের ফিরে-ফিরে তাড়া করে অবিরাম।

🖊 শামীম ইমাম; ঢাকা।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Website

Address


Dhaka