05/08/2022
নৈরাজ্যবাদ, নারদনিক ও 'নারোদবাদ' প্রসঙ্গে:
নৈরাজ্যবাদ: ঊনবিংশ শতাব্দীর ফ্রান্সে, জার্মানিতে, ইতালিতে, স্পেনে, রাশিয়ায় নৈরাজ্যবাদ বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। নৈরাজ্যবাদ (এনার্কিজম)-এর মূল দার্শনিক কথাটা ছিল ব্যক্তির সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র; রাষ্ট্রমাত্রই ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করে, প্রতিষ্ঠানমাত্রেই ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ; অতএব, যথার্থ মুক্তি বা স্বাধীনতা হচ্ছে রাষ্ট্র এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন- নৈরাজ্যবাদের রাজনৈতিক দর্শন এরকম একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। ফলে সমবেতভাবে কাজ কর্মের কোন বন্দোবস্তও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও অত্যাচারের শামিল বলে এই চিন্তাধারায় গণ্য হতো।
নারদনিকদের মধ্যে নৈরাজ্যবাদের প্রভাব ছাড়াও পরবর্তীকালে রাশিয়ায় কয়েকটি নৈরাজ্যবাদী দল উপদল তৈরি হয়েছিল। মার্কসবাদীদের এরা যথেষ্ট বিপ্লবী বলে মনে করতো না। 'মার্কসবাদীরা একনায়কত্ব চায়, স্বাধীনতা চায় না', 'মার্কসবাদীরা ভোটের রাজনীতি করে', 'মার্কসবাদীরা সংস্কার-পন্থী' মার্কসবাদের বিরুদ্ধে এসব সমালোচনা এরা করতো।
গ্রন্থনা: শামীম ইমাম, ২৯ জুন, ২০২২।
[সূত্র: ১. সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস।
২. রুশ বিপ্লবের প্রস্তুতি; প্রথম খন্ড জ্যোতি ভট্টাচার্য,
প্রথম এনবিএ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।]
নারদনিক ও 'নারোদবাদ':
রুশ ভাষায় 'নারদ্' শব্দের অর্থ জনসাধারণ। সমাজ পরিবর্তন, বিপ্লব, জনসাধারণের কল্যাণ, কৃষকদের মুক্তি, স্বৈরতন্ত্রের অবসান ইত্যাদি কথাবার্তা যারাই বলতো তাদের সবাইকে একসঙ্গে বলা হতো নারদনিক। নারদনিকরা প্রথমে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিল। এই উদ্দেশ্যে শিক্ষিত তরুণ বিপ্লবীরা চাষীর পোশাক পরে গ্রামে গ্রামে গিয়েছিল। তখনকার ভাষায় বলতে গেলে জনগণের কাছে গেল। 'নারদ্' অর্থ 'জনগণ'; নারদনিক নামকরণ এজন্যই হয়েছে।
১৮৬৯-৭০ সালে নারদনিকদের একটি দল সুইজারল্যান্ড এর জেনেভা শহর থেকে 'নারোদনয়ে নিয়েলো' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতো। এরা আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সংস্পর্শে এসেছিল। মার্কস ও এঙ্গেলস পরিচালিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের রুশ শাখার অংশ হিসেবে ১৮৭০ সালে এই গ্রুপ স্বীকৃতি পায়। প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদে এদের প্রতিনিধি হিসেবে এরা কার্ল মার্কসকে নির্বাচিত করেছিল। মার্কসের সঙ্গে এদের সম্পর্ক ভালো ছিল এবং প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাকুনিনপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এরা মার্কসকে
সমর্থন করেছিল। তথাপি রাশিয়ার পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগ সম্বন্ধে এদের ধারণা ছিল অপরিণত; মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে এক ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ভাবপ্রবণতা এদের তখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। রাশিয়ার গ্রাম জীবনকে এরা আদর্শ বলে মনে করতো এবং গ্রামগোষ্ঠী সংগঠনকেই সমাজতন্ত্রের ভিত্তি বলে মনে করতো। রাশিয়ার ভেতরে বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে এই প্রবাসী বিপ্লবীদের কোন সজীব সংযোগ ছিল না। ১৮৭২ সাল নাগাদ এই গ্রুপটি লোপ পায়।
১৮৬৯-৭২ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে 'চাইকোভস্কি সার্কেল' নামে তরুণ বিপ্লবীদের একটা গ্রুপ গড়ে উঠেছিল। ১৮৭৫ সাল নাগাদ এই গ্রুপের নেতা নাতানসন এবং এ. ডি. মিখাইলভ দক্ষিণাঞ্চলের ওডেসা, কিয়েভ্, খারকভ্ প্রভৃতি শহরের তরুণ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই যোগাযোগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এক গোপন সংগঠন- 'জেমলিয়া ই ভোলিয়া' [জমি ও স্বাধীনতা]। কৃষকদের হাতে জমি এবং সকলের জন্য গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকার এ দুটো কথাই বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান কথা ছিল তখন। 'জেমলিয়া ই ভোলিয়া' বিপ্লবী সংগঠনের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ঝেলিয়াবভ্ ও খালতুরিন- এই নামগুলো লেনিন বরাবর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
আবার নারদনিকদেরই আরেকটা অংশ উদারনৈতিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আদর্শের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ১৮০০-১৯০০ সালের দু'টি দশকে দানিয়েলসন, মিখাইলভ্স্কি, ভরোনৎসভ্ প্রভৃতি লেখকরা এই উদারনৈতিক নারোদিজম প্রচার করেন।
নারদনায়া ভোলিয়া দলের আরেকটি অংশ পরবর্তীকালে 'সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি পার্টি' নামে একটি দল গঠন করে। ....
নারদনিকদের রুশ বিপ্লবের গোড়ার ইতিহাসের স্রষ্টা বলা যায়। জার সরকারের সন্ত্রাস ও স্বৈরতন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা; বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার; সমাজ পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি, জারের সন্ত্রাসের পালটা সন্ত্রাসমূলক আক্রমণ ঘটানো; মরণপণ বীরত্ব ও আত্মদান; অকাতরভাবে নিদারুণ দুঃখযন্ত্রণা ভোগে অদম্য উৎসাহ; অসাধারণ শৃঙ্খলাবোধ; আদর্শশানুরাগ এবং বিপ্লবীদের একাত্মবোধ এসবের এক উজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করেছিল প্রথম যুগের নারদনিকরা।
রুশ নারদানিক বিপ্লবীরা অনেকে পত্রালাপের মারফত মার্কস এবং এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন। রুশ বিপ্লবী আন্দোলনের জাগরণ দেখে মার্কস আনন্দিত হয়েছিলেন, নিজে যত্ন করে রুশ ভাষা শিখেছিলেন। দানিয়েলসনের প্রতি এবং ভেরা জাসুলিচের প্রতি মার্কস ও এঙ্গেলসের অনেকগুলো চিঠি পাওয়া যায়- রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে এই চিঠিগুলোতে বহু শিক্ষনীয় আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু মার্কস ও মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটলেও এবং মার্কসবাদী চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হলেও নারদনিকরা মার্কসবাদী হয়ে উঠতে পারেননি। সে সময়ে নানা ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ধারণাই তাদের চিন্তাধারাকে চালিত করতো। বিশেষত, বাকুনিন যে নৈরাজ্যবাদের আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই নৈরাজ্যবাদ নানাভাবে নারদনিকদেরও প্রভাবিত করেছিল।
সাধারণভাবে বলা চলে নারদনিকরা গণ-সংগঠন বিস্তার করা এবং গণ-সংগঠনের রাজনৈতিক চেতনা ও সক্রিয়তা সৃষ্টি করার পরিবর্তে অল্প কয়েকজন উৎসর্গিত-প্রাণ কর্মীর গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক কার্যকলাপের উপরই প্রায় সমস্ত ঝোঁক দিয়েছিলেন। নারদনিকদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, কয়েকজন উদ্যোগী "বীর" থাকবে আর নিষ্ক্রিয় "জনতা" তাদের কার্যকলাপের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ইতিহাস সৃষ্টি করে মাত্র কয়েকজন মহারথী আর জনসাধারণ, শ্রেণী, "জনতা" (নারদনিক লেখকরা অবজ্ঞা করে এদেরকে "ইতর লোকের ভিড়" বলে বর্ণনা করেন) সচেতন সংগঠিত কাজ করতেই অক্ষম, তারা শুধু অন্ধভাবে "বীরদের" পথ অনুসরণ করতে পারে। এই চিন্তার কারণেই নারদনিকেরা চাষীও মজুদদের মধ্যে বিপ্লবী প্রচার কাজ ত্যাগ করে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদের দিকে যায়। উল্লেখ্য, নারদনিকরা প্রথমে যখন জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করে তখন চাষীদের সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান ও উপলব্ধি না থাকার দরুন তারা চাষীদের কাছে কোন সমর্থন পায়নি, তাদের অধিকাংশরাই জারের পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। তখন তারা স্থির করে যে জনগণের সমর্থন ছাড়া তারা একাই জারের শাসনের বিরুদ্ধে লড়বে- যা ছিল আরো মারাত্মক ভুল। নারদনিকদের চিন্তার প্রভাব এতটাই পড়েছিল যে, তখনকার রাশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী স্তেপান্ খালতুরিন্ যিনি বিপ্লবী মজুর ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন, তিনি তা ছেড়ে দিয়ে 'সন্ত্রাসবাদে' সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন।
সংক্ষেপে নারদনিক চিন্তাধারায় প্রধান বক্তব্যগুলো হচ্ছে : রাশিয়ার গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করেনি, করবেও না; রাশিয়ার কৃষকরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, এখানে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের কথা ওঠে না; রাশিয়ার ইতিহাস পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের মতো হবে না, রাশিয়ার ইতিহাসের একটা আলাদা নিয়তি আছে; বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়ার একটি পৃথক বিশিষ্ট ভূমিকা আছে; এখানে মার্কসবাদ থাকবেনা, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র আলাদা ধরনের হবে- ধনতান্ত্রিক শিল্প বিস্তারের মধ্য দিয়ে না গিয়ে, 'মির' নামে পরিচিত পঞ্চায়েত ধরনের গ্রামগোষ্ঠী ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই সরাসরি সমাজতন্ত্র গড়া যাবে।
শ্রমিক আন্দোলন সম্বন্ধে ছিল দু'রকম বিপরীত ধারণা। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সম্পর্কে তাদের অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য ছিল, 'রাজনৈতিক স্বাধীনতা যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ এসব নিরর্থক' ইত্যাদি বুলি। আবার উল্টোদিকে ছিল 'রাজনীতির দরকার নেই, স্বৈরতন্ত্র অবসান করতে তার জায়গায় বুর্জোয়া গণতন্ত্র চালু করে শ্রমিকদের কি স্বার্থ, ওতো সংবিধানবাদী অবৈপ্লবিক উদারনীতিকদের কর্ম বলে শ্রমিকদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।'
প্লেখানভ দেখালেন- নারদনিকরা যদিও নিজেদের 'সমাজতন্ত্রী' বলে মনে করে 'সমাজতন্ত্র' -এর কথা বলে আসলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারে কাছে তারা যায় না, নিজেদের এক উদ্ভট কাল্পনিক 'সমাজতন্ত্র' তারা নিজেদের মনে মনে গড়েছে; এ কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের বুলি কখনো সমাজতন্ত্রে নিয়ে যাবে না, উল্টো শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথ থেকে সরিয়ে দেবে, আলেয়ার আলো দেখিয়ে খালি এলোমেলো ঘুরিয়ে মারবে।
নারদনিকদের 'সমাজতন্ত্র' হচ্ছে নৈরাজ্যবাদ এবং ষড়যন্ত্র দিয়ে ক্ষমতা দখল তত্ত্বের এক জগাখিচুড়ি। এই 'সমাজতন্ত্র' পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীর স্বপ্ন।
প্লেখানভ আরও দেখালেন- রাশিয়ায় ধনতন্ত্র গড়ে উঠবে না বলে নারদনিকরা যেসব কথা তোলে সেগুলো শুরুতেই ভুল, কারণ রাশিয়ায় ধনতন্ত্র গড়ে ওঠা শুরু হয়ে গিয়েছিল। নারদনিকরা যে বলে রাশিয়ার ইতিহাসে ধনতন্ত্র অনিবার্য একটা স্তর নয়, ধনতান্ত্রিক শিল্পের বিকাশ ছাড়াই রাশিয়া সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছতে পারবে- রাশিয়ার জন্য এই বিশেষ ধরনের অ-ধনতান্ত্রিক পথের কথা একেবারেই উঠে না, কারণ ধনতান্ত্রিক শিল্পের বিকাশ রাশিয়ায় ঘটছে। ধনতান্ত্রিক বিকাশকে বাধা দিয়ে ধনতন্ত্রের আগের অবস্থায় রাশিয়াকে আটকে রাখার চেষ্টা করা বিপ্লবীদের কর্তব্য নয়, বিপ্লবীদের কর্তব্য ধণতান্ত্রিক বিকাশের ফলে যে বৈপ্লবিক শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে তাকে সচেতন করে সংগঠিত করে গণ-সংগ্রামের পথে এগোনো।
নারদনিকরা যে বিপ্লবী সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী চরিত্র এবং শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব অস্বীকার করে সেটা ভুল। রাশিয়া পশ্চাৎপদ দেশ হলেও সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিকশ্রেণী কম হলেও বিপুল অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী হলেও বিপ্লবের প্রধান শক্তি এবং প্রধান ভরসা শ্রমিকশ্রেণীই।
কৃষকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, এবং তাদের দুঃখদুর্দশা চরমে পৌঁছালেও তারা সমাজ বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে পারবেনা, অগ্রণী চরিত্র তাদের হয় না; কারণ, ক্ষুদে ক্ষুদে জমির টুকরোয় ক্ষুদে মাত্রার উৎপাদনে তারা নিযুক্ত- এই অর্থনীতি গোটা সমাজটার উন্নতির কোন রাস্তা দেখাতে পারে না, দ্বিতীয়ত কৃষকরা, একটা জমাট ঐক্যবদ্ধ শ্রেণী নয়, তাদের মধ্যে স্তরভেদ বাড়াতে বাড়াতে শ্রেণীভেদ হয়, একদিকে ধনী কৃষক আরেকদিকে খেততমজুর আর মাঝে অন্যান্য ছোট চাষী- এইভাবে এরা ভাগ হয়ে যায়। শ্রমিক আন্দোলনকে অবহেলা করে, তাচ্ছিল্য করে, শুধু কৃষক বিদ্রোহ ঘটিয়ে রাশিয়ায় বিপ্লব আসবেনা।
নারদনিকরা যে বলে বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়ার একটা বিশেষ বাণী দেওয়ার আছে, রাশিয়ার প্রাচীন গ্রাম-পঞ্চায়েতগুলোই আসল সমাজতন্ত্রের বীজ, রাশিয়ার এই গ্রাম-পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে না ভেঙে সমাজতন্ত্রের কাঠামো করে নেওয়া যাবে- এটা ভুল কথা। গ্রাম পঞ্চায়েতগুলো মাতব্বর ধনী কৃষকদের ক্ষমতা ও প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, গরিব চাষী খেতমজুরদের শোষণ করার ও দমন করার ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। গ্রাম-পঞ্চায়েতগুলোকেই আশ্রয় করে গ্রাম অঞ্চলে জারশাহীর শাসন চলছে কম হাঙ্গামায় কম খরচায়; গ্রাম-পঞ্চায়েতের মোড়লরাই জারশাহীর পুলিশের কাজ আর খাজনা আদায়কারী কর্মচারীর কাজ করে দিচ্ছে।
বিপ্লব সম্বন্ধে নারদানিকদের কল্পনাটাই ভুল। নারদনিকরা মনে করতো জনসাধারণ নির্জীব নিষ্ক্রিয় জড়বস্তুর মতো। বিপ্লবী বীর পুরুষরা, নায়করাই ইতিহাস তৈরি করে- তাদের বিদ্যুৎ-স্পর্শে জনসাধারণ সচল হয়ে উঠে অন্ধভাবে বিপ্লব করে ফেলে; গণ-সংগঠন, জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক জ্ঞানবিস্তার, চেতনার প্রসার, আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় জনসাধারণকে পুষ্ট করে শিক্ষিত করা- বিপ্লবের জন্য এইসব দরকার নেই, বিপ্লবী বীর নায়করা একটা দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটাতে পারলে তার ফলে যে আবেগ-উত্তেজনা জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হবে সেটাই বিপ্লব নিয়ে আসবে। প্লেখানভ দেখালেন, বীরপুরুষরা ইতিহাস তৈরি করে এটা একপেশে কথা, ভুল কথা। ইতিহাস বীরপুরুষদের তৈরি করে, জনসাধারণ বীরপুরুষদের সৃষ্টি করে এ কথাটাই বেশি ঠিক। বীরপুরুষরা, মহানায়করা যদি সমাজে ইতিহাসের গতি না বুঝতে পারেন, যদি সমাজের যা প্রয়োজন তার উল্টোপথ দেখান তাহলে তাঁদের কথার সমাজ চলে না, তাঁরাই নিষ্ফল হয়ে যান, উদ্ভট হাস্যাস্পদ হয়ে যান, বিপজ্জনক বাধা হয়ে ওঠেন। [CPSU Hist. 14-17]
সে আমলে রাশিয়ার নারদনিক বিপ্লবীরা অসাধারণ বীরত্বের বহু নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। লেনিন সেজন্য তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং অকুন্ঠ প্রশংসা করতে কখনো কার্পণ্য করেননি। বারবার তিনি তাঁদের বিপ্লবী ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সাংগঠনিক প্রতিভা, তাঁদের শৃঙ্খলাবোধ, কমরেডদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও একাত্মবোধ- ইত্যাদি কথা লেনিন বহুবার উল্লেখ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তীকালে নারদনিকদের জনপ্রিয়তা ও মর্যাদার আশ্রয় নিয়ে যেসব ভুল মতবাদ ও ভুল কর্মধারা প্রচারিত হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র তীক্ষ্ণ কশাঘাত করতেও লেনিন কখনো ইতস্তত করেননি। কমরেড লেনিন তাঁর অনেকগুলো লেখাতে তখনকার প্রধান নারদনিক দল "নারদনায়া ভলিয়া" এবং পরে নারদনিকদের উত্তরাধিকারী সোশ্যালিস্ট-রেভল্যুশনারিরা রাজনৈতিক সংগ্রামের যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করতো, সেগুলোর বিশেষ করে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদের পদ্ধতির সমালোচনা করেন। এই ধরনের সংগ্রাম-পদ্ধতিকে আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকর বলে লেনিন অভিমত দেন। কারণ এতে গণসংগ্রামের পরিবর্তে ব্যক্তিগত মহারথীদের সংগ্রামকে স্থান দেওয়া হয়। জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনে বিশ্বাসের অভাব হতেই এইসব পদ্ধতির সূচনা।
গ্রন্থনা: শামীম ইমাম, ২৯ জুন, ২০২২।
[সূত্র: ১. সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস।
২. V.I. Lein, What The "Friends of the People" Are and How they fight the Social Democrats
৩. রুশ বিপ্লবের প্রস্তুতি; প্রথম খন্ড; জ্যোতি ভট্টাচার্য,
প্রথম এনবিএ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।]