17/11/2023
শীতকাল এলেই আমার মনে পড়ে ছোটোবেলায় রচনা আসতো 'শীতকালে একটি চড়ুইভাতির বর্ণনা' বা 'একটি বনভোজনের অভিজ্ঞতা'।
আমার মনে পড়ে, প্রথম যখন জানতে পারলাম যে 'চড়ুইভাতি' মানে হলো আসলে 'পিকনিক করা', আমি সেদিন বাবাকে গিয়ে বললাম,
- বাবা বাবা! আমি চড়ুইভাতি করবো!
বাবা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
- কী, কী করবে?
- চড়ুইভাতি বাবা, মানে পিকনিক। পরীক্ষায় প্রশ্ন আসতে পারে একটি চড়ুইভাতির বর্ণনা, এবার যদি আমি জীবনে চড়ুইভাতিই না করে থাকি তো পরীক্ষায় কীভাবে রচনা লিখবো?
এটা শুনে বাবা প্রথমে একটা অদ্ভুত লুক দেয়, তারপর বলে,
- ঘরে ভাই আছে, ওকে নিয়ে বারান্দায় চড়ুইভাতি করো গে যাও!
এইভাবে বাবা আমার চড়ুইভাতির প্রথম স্বপ্ন ভেঙে দেয় বটে কিন্তু কদিন পরে আমি আবার বাবাকে গিয়ে ধরি,
- বাবা বাবা! আমি বনভোজনে যাবো!
- কেন ঘর থাকতে বনে গিয়ে ভোজন করার কী আছে? ঘরে কি জায়গা কম পড়েছে?
তখন আমি আবার বললাম যে, পরীক্ষায় প্রশ্ন আসতে পারে যে শীতকালে একটি বনভোজনের বর্ণনা লেখো, এবার যদি আমি জীবনে বনভোজনই না করে থাকি তো পরীক্ষায় কীভাবে রচনা লিখবো?
বাবা তখন আবার একটা 'বাবাসুলভ- লজিক' দিয়ে বলে ওঠে,
- বনে গেলে বনের পশুই তোমায় ভোজন করবে, তাই বনভোজনে গিয়ে কাম নেই, আর পরীক্ষায় অমন অনেক রচনা আসে, সব কি সত্যি সত্যি লিখতে আছে নাকি! এসব রচনা আসলে বানিয়ে লিখে আসবে।
সেবার সত্যি সত্যিই স্কুল পরীক্ষায় প্রশ্ন এলো
'শীতকালে একটি চড়ুইভাতি বা বনভোজনের অভিজ্ঞতা লেখো'
আমি পরীক্ষার খাতায় রচনা লিখলাম:-
'গত রবিবার খুব শীত পড়েছিলো, তাই বনভোজনে যাওয়ার জন্য ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে পারিনি, ঘুম ভাঙলো দুপুরবেলা। আমি আমার বাবা মা ভাই বনভোজন করতে একটি বনে গেছিলাম, কিন্তু ততখনে খুব সন্ধে হয়ে গেছিলো। বনে এক হাত বড় বড় অনেক মশা ছিলো, বাবা মশার কয়েল আনতে ভুলে গেছিলো বলে মা বারবার বাবাকে গালমন্দ করছিলো, যে কী দরকার ছিলো বনভোজনে আসার, ঘরেই যেখানে এত জায়গা আছে, ঘরে ভোজন করলেই তো হতো! কিন্তু তখনই বাবা অন্ধকারে বনের মধ্যে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো এই বলে, যে 'হায়, বনভোজন করতে এসেছি আর ভোজন করার জিনিষপত্তর মানে খাবার দাবার আনতেই ভুলে গেছি!' খাবার দাবার নেই শুনে বনের মধ্যে ভাই কান্নাকাটি জুড়ে দিলো, মা আবারও বাবাকে গালমন্দ করলো এই বলে যে, তোমাকে বিয়ে করাই আমার ভুল ছিলো, তোমার পরিবারই খারাপ, এই সেই'- এই করতে করতে রাত হয়ে গেলো। বাবা বললো অনেক বনভোজন হয়েছে এবার সবাই বাড়ি চলো। আমরা বাড়ি চলে এলাম। এই হলো শীতকালে বনভোজনের একটি অভিজ্ঞতা...'
এই লেখা পড়ার পর বলা বাহুল্য স্কুল থেকে আমার গার্জেন কল করে, আর বাবা স্কুলে দেখা করতে আসে। তখন স্যার কোনো কথা না বলে আমার লেখা বনভোজনের অভিজ্ঞতার রচনাটি বাবাকে পড়তে দেয়। বাবা লেখাটি পড়ে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে আমি কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা স্যারকে বলি:
- স্যার এখানে আমার কোনো দোষ নেই, আমি বহুবার বাবাকে বলেছি আমাকে চড়ুইভাতি বা বনভোজনে নিয়ে যেতে, উল্টে বাবা কিনা বলেছে যে পরীক্ষায় অমন অনেক প্রশ্ন আসে, বানিয়ে লিখলেই হলো!
এরপর বাবা আর স্যারের মধ্যে আমাকে নিয়ে কী কী কথা হয়, সেই বিশদে আমি যাচ্ছি না, মোটমাট স্কুল থেকেই বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয় যে ইমিডিয়েট বাবা আমাকে একটি বনভোজন বা চড়ুইভাতি করতে নিয়ে যাবে। এমনকি বাবা যদি আমাকে চড়ুইভাতিই বা বনভোজনে না নিয়ে যায় তবে আমাকে পরের ক্লাসে নাকি উঠতেই দেবে না।
এরপর ইচ্ছা না থাকলেও বাবা আমাকে, মাকে আর ভাইকে নিয়ে শীতকালে একটি বনভোজন করতে নিয়ে গিয়েছিলো। আমাদের বনভোজন মোটামুটি ঠিকই চলছিলো, সেখানে ভোজনের সামগ্রীও মজুত ছিলো, তবে বিকাল বাড়তে দেখা গেলো সত্যি সত্যি আমরা মশা আটকাবার জন্য জিনিষপত্র আনতে ভুলে গিয়েছি।
মশার কামড়ে অতিষ্ট হতে হতে আমার মা বনভোজন করতে করতে তখনো বলেছিলো, যে 'কী দরকার ছিলো বনভোজনে আসবার, ঘরেই যেখানে এত জায়গা আছে, ঘরে ভোজন করলেই তো হতো', ইত্যাদি!
কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরের বছর পরীক্ষায় আর বনভোজন বা চড়ুইভাতির রচনা আসে না, বরং এসে যায় - 'একটি চিড়িয়াখানা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা' রচনা।
বলাবাহুল্য চিড়িয়াখানা ভ্রমণের কোনো অভিজ্ঞতাও তখন আমার ছিলো না, ফলে আবারও আমি বানিয়ে বানিয়ে কল্পনায় রচনা লিখি।
তবে সেদিন পরীক্ষার খাতায় কী লিখে এসেছিলাম, তা আজ আর এখানে আলোচ্য বিষয় না।