আমাদের পাঠশালা আসলে একদল তরুণের স্বপ্নকে বাস্তব করার তীব্র আকাক্সক্ষার একটা প্রকাশ। তখন ২০০৭ সালের জুলাই মাস। তীব্র গরম পড়ছে, আবার মাঝে মাঝেই বৃষ্টি এসে তাকে সহনীয় করে দিচ্ছে। এরকম সময়েই আজিজ সুপার মার্কেটের বারান্দায় অথবা নতুন পাঠ পত্রিকার অফিসে ছোট ছোট সভা, কিছুটা আড্ডার মত করে বসতাম আমরা। তীব্র বৈষম্যের এই সমাজে বৈষম্যের বিলোপ এক দীর্ঘ লড়াই সেটা আমরা জানতাম। কিন্তু এমন কিছু কি করা যায় যাতে করে এমন পরিসর সৃষ্টি হয় যেখানে এই বৈষম্যের বোধ কাজ করবে না? এমন কিছু যা একটা মানবিক দুনিয়া গঠনের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে? এমন কিছু যা তীব্র দহনে এক পশলা বৃষ্টির মত শান্তির স্পর্শ দিয়ে যাবে? এমন ভাবনা আমাদের পাঠশালা গড়ে তোলার পক্ষে একটা প্রেরণা ছিল সেটা নি:সন্দেহেই বলা যায়। কিন্তু কাজ করতে গিয়েই আসলে আমরা বাস্তবতার সংস্পর্শে আসি, বাস্তবতা থেকে শিখি। দেখে ও ঠেকে। আমাদের ভাবনার অনেক কিছু কাটছাঁটও করতে হয়। কিন্তু মূল আকাঙ্ক্ষার জায়গাটাকে ঠিক রেখেই তাকে বাস্তবতা উপযোগী কিভাবে করা যায় তার সন্ধান করেছি আমরা। সে অনুসারেই আমরা লক্ষ্য ঠিক করি “বঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত মানবিক শিক্ষা”। এর মাধ্যমে দরিদ্র শিশুদের যেনতেন উপায়ে শিক্ষা হলেই চলে এরকম যে ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে তাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছি আমরা। নিশ্চিত করতে চেয়েছি তাদের জন্য সম্ভব সবচেয়ে ভাল মানেরশিক্ষা। আবার এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করতে চেয়েছি এই শিশুদের জন্য যেখানে কোনভাবেই সে যাতে নিজেকে বঞ্চিত না ভাবে, কোনভাবে তাকে অপমানিত হতে না হয়, সকলেই যাতে সমান সুযোগ পায়, তাদের যেন মানুষ হিসাবে পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হয়, তাদের প্রতিটি সমস্যাকে যাতে ভালোবাসা দিয়ে মোকাবেলা করা যায়। আর সেটা করতে গিয়েই পঠন-পাঠনের পদ্ধতি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষার্থীদের আন্ত:সম্পর্ক, সমাজের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত শিখতে হয়েছে। আর যা শিখেছি সেটাই আমরা শেখাতে চেয়েছি।২০০৭ সালের জুলাই মাস থেকে প্রাথমিক কাজ শুরু করে আমরা শিক্ষার্থীদের ভর্তি শুরু করি ডিসেম্বর থেকে। এরপর ক্লাস শুরু হয় ২০০৮ এর জানুয়ারি থেকে। এই পাঠশালার শুরুর সময়ে আমরা কয়েকজন কাজ শুরু করি। কিন্তু শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল এই উদ্যোগকে একটা সামাজিক চরিত্র দেবার। ফলে প্রথম থেকেই আরও অনেককে যুক্ত করার চেষ্টা ছিল এই উদ্যোগে। আর এর সমাজিক চরিত্র নিশ্চিত করতে একেবাওে শুরুতেই একটা ট্রাস্ট গঠন করা হয়। যেখানে উদ্যোক্তাদের সাথে যুক্ত হন সমাজের অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ। প্রথম বছর ‘আমাদের পাঠশালা’র কার্যক্রম শিশু শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। ক্রমে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়। আমাদের পাঠশালার ছাত্র-ছাত্রীরা বেগুনটিলা বস্তি, সিরামিক বস্তি, বিহারী ক্যাম্প ও আশেপাশের এলাকার নানা নিমড়ববিত্ত ও কিছু নিমড়ব-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের পিতা-মাতা/অভিভাবক কেউ গার্মেন্টসে কাজ করেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যেমন চা-দোকানদার, বাজারে বা ভ্রাম্যমাণ সবজি-মাছ-কাপড় বিক্রেতা, কেউবা বাবুর্চি, কেউ রিকশাচালক, বা কেউ কাজের সুযোগ পান না নিয়মিত, অনেকের বাড়িতে কারচুপির কাজ বা ঠোঙ্গা বানানোর কাজ করে সংসার চলে। ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই নিজেরাও কাজ করে, কাউকে বসতে হয় বাবার চায়ের দোকানে, কেউ কেউ করে ঠোঙ্গা বানানোর বা কারচুপির কাজ, কেউ পত্রিকা বিলি করে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বাসার রান্না, পানি আনা, ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনার কাজ তো আছেই।