19/03/2018
ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ এর পরিচয় দাও। ইসলামে এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ কিভাবে পরিস্কার করো।
সেকুলারিজমের বাংলা প্রতিশব্দ হল ধর্মনিরপেক্ষতা। সেকুলার শব্দের অর্থ হচ্ছে ইহলৌকিক, ইহজাগতিক, পার্থিব, পরকালবিমুখ, আখিরাত বিমুখ ইত্যাদি। আভিধানিক দিক দিয়ে সেকুলারিজম হচ্ছে বৈষয়িকতাবাদ, ইহলৌকিকতাবাদ,ইহজাগতিকতাবাদ।এটি এমন একটি সামাজিক বা রাজনৈতিক দর্শন, যা ধর্মবিশ্বাসকে নাকচ করে দেয়। অন্য কথায় যারা কোন ধর্মের অন্তর্গত নয়, কোনও ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত নয়, কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয় এবং পবিত্রতা ও আধ্যাত্বিকতার বিরোধী যারা সেকুলারিজম বা ইহজাগতিকতাকে বিশ্বাস ও লালন করে তারাই সেকু্লার বা ইহজাগতিক। কিন্তু এর পারিভাষিক অর্থ আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। পারিভাষিক অর্থে সেকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে এমন একটি মতবাদ, চিন্তাধারা ও বিশ্বাস, যা পারলৌকিক ধ্যান ধারণা ও ধর্মের সাথে সম্পর্কহীনভাবে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে।ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন যা সকল ধর্ম বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয়। র্যানডম হাউস অব দ্যা ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ এ সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ এর সংগায় বলা হয়েছে, যা ধর্ম বা আধ্যাত্বিকভাবে পবিত্র বলে বিবেচিত নয়যা ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয় যা কোন ধর্ম বিশ্বাসের অন্তর্গত নয় আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি হলো একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক দর্শন যা সকল ধর্ম বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয়এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকার সংজ্ঞাও অনুরুপ, অর্থাৎ যারা কোন ধর্মের অন্তর্গত নয়, কোন ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত নয় কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয় এবং আধ্যাত্বিকতা, জবাবদিহীতা ও পবিত্রতার বিরোধী তাদেরকেই বলা হয় ধর্ম নিরপেক্ষ।
অক্সফোর্ড এডভান্সড লার্নারস ডিকশনারীর মতে, সমাজ, সংগঠন, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে ধর্ম সংশ্লিষ্ট হতে পারে না এমন বিশ্বাসই হল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ।
বাংলাভাষায় Secularism-এর অনুবাদ করা হয়ে থাকে ধর্মনিরপেক্ষতা। এর দ্বার বুঝানো হয়েছে যে, যার ধর্ম তার কাছে, পরধর্ম সহিষ্ঞুতা এর উদ্দেশ্য। আসলে ইসলাম বিদ্বেষীদের দ্বারা মুসলিমরা আজীবন প্রতারিত হয়েছে। এমনকি শুধু বিভিন্ন পরিভাষাকেই পরিবর্তন বা বিকৃত করে তাদেরকে ধোকা দেয়া হয়নি বরং অনেক পরিভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও মুসলিমদেরকে ষড়যন্ত্রে ঘূর্ণিপাকে নিক্ষেপ করে উদ্দেশ্য হাসিলের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। Secularism-এর অনুবাদ ধর্মনিরপেক্ষতা হওয়াটাও মূলত এ ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রামান্য দলিল। এখানে 'নির' প্রত্যয় যোগ করা হয়েছে যার অর্থ 'নেই'। অন্য কথায় অপেক্ষা নেই যার। এখানে 'অপেক্ষা' এর যে অর্থগুলো বাংলা একাডেমীর বাংলা অভিধানে স্থান পেয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় ভরসা বা নির্ভরতা। তাহলে ধর্মের উপরে নির্ভরতা না থাকার নামই হচ্ছে পক্ষপাতশূন্য বা উদাসীন। সুতরাং কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাত না করা ও কোন ধর্মের ব্যাপারে উদাসীনতা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা যা মূলত ধর্মহীনতারই আর এক নাম। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যার ধর্ম তার কাছে একথা মোটেও ঠিক নয়। এর অর্থ ধর্মহীনতা বললে মুসলিমরা এটাকে গ্রহণ না করে বরং এর মুখে থুথু নিক্ষেপ করবে সেজন্য অত্যন্ত চালাকী করে চমকদার মোড়কে এমন একটি শব্দ এর জন্য চয়ন করা হয়েছে যাতে কিছুটা হলেও অর্থগত দিক থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। আর এটি এজন্য যে, যাতে মুসলিমদেরকে অন্ধকারে রেখে বিভ্রান্ত করে তাদের ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক এ ধর্মহীনতাকে গেলানো যায়, এটি তারই একটি সুনিপুণ ষড়যন্ত্র।
ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?
ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে নাস্তিকতাপূর্ণ জীবনযাপনও নয়। তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে কি? ধর্মনিরপেক্ষতা হলো সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি অবলম্বন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের মাঝে ন্যায়পূর্ণ সুশাসন কায়েম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নিরপেক্ষতা অবলম্বন। রাষ্ট্রীয় শাসনকার্য পরিচালনায় সরকারকে ধর্ম বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করতে হয়। ধর্ম বিষয়ে রাষ্ট্র পক্ষপাতিত্বতা না করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে। রাষ্ট্র ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের প্রতি সমান দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার। তাই প্রত্যেক নাগরিকরা যেন মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে ধর্মকর্ম করতে পারে তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। ‘প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে।ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো, রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের যে কোনো ধর্ম গ্রহণ-বর্জন বা লালন পালন- এসব বিষয়ে পূর্ণ নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সবাই হবে এদেশের নাগরিক। আস্তিক-নাস্তিক, মুসলিম-অমুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ অথবা খ্রিস্টান সবার অধিকার এদেশে হবে সমান। পূর্ণ ও খাঁটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে বাংলাদেশের কাজ। একথা পবিত্র কুরআন শরিফে যেভাবে বলা আছে, বঙ্গবন্ধুও ঠিক সেভাবেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে এখন অসাম্প্রদায়িকতা শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার অনুপস্থিতিই অসাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা বলতে বুঝানো হয়, এক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আরেক সম্প্রদায়ের উসকানি প্রদান অথবা আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডকে। আবার একই ধর্মের ভেতরে নানা ধরনের দল-উপদল বিদ্যমান। এদের একদলের বিরুদ্ধে আরেক দলের আক্রমণাত্মক ভূমিকা হলো সাম্প্রদায়িকতা। আজ উগ্রবাদী চরমপন্থীদের চাপে আমরা দিব্যি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলে নিজেদের মূলকে নিজেরাই কেটে ফেলেছি। বলা হচ্ছে, সব ধর্ম ও নানা মত-পথের লোকদের জন্য সমান নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার দিতে পারব কিনা জানি না, তবে কেউ যেন কারো ওপর ধর্মীয় কারণে আক্রমণ না করে সে বিষয়টি আমরা অবশ্যই দেখব। প্রশ্ন হলো, এটাই কি আমাদের স্বাধীনতার চেতনা? পাকিস্তান আমলে সরকারের লোকেরা কি ঠিক এ দাবি করত না? নীতিবাক্য আওড়ানোর ক্ষেত্রে বোধ করি তারা আমাদের চেয়ে একধাপ এগিয়েই ছিল। তাহলে কেন আমরা একাত্তরে নয় মাস মরণপণ লড়াই-সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে আনলাম?
আমরা মুখে মুখ যতই আধুনিক ও প্রগতিশীল হওয়ার দাবি করি, তলে তলে আমরা কিন্তু উগ্র-ধর্মান্ধদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েই চলেছি। আমরা ধর্মের মূল উৎস থেকে জ্ঞান আহরণ না করেই উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর হুমকি-ধমকিতে নতি স্বীকার করে ফেলি। ধর্মনিরপেক্ষতার রাষ্ট্রীয় নীতির কথাই ধরা যাক। আজ দেশে ও সমাজের কজন কর্ণধার স্পষ্টভাবে পূর্ণ ও অবিচল আস্থার সঙ্গে এ নীতি বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করে থাকেন? হাতেগোনা কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া অন্যান্য সবাই এ শব্দটি বাদ দিয়ে এখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলে বাহাদুরি করি। আমরা একটু চিন্তা করেও দেখি না কী কারণে এবং উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমাদের নেতারা, মুক্ত বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টারা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করার দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। ধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের শিক্ষানুযায়ী দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত। আল্লাহ বলেন, ওয়ালাও শা’ রাব্বুকালা আমানা মানফিল আরযি কুল্লুহুম জামিয়া আফাআনতা তুকরিহুন নাসাহাত্তা ইয়াকুনু মুমিনিন অর্থাৎ ‘আর তোমার প্রভু প্রতিপালক যদি চাইতেন তাহলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই অবশ্যই এক সাথে ঈমান নিয়ে আসতো। তুমি কি তবে বল প্রয়োগে লোকদেরকে মুমিন হতে বাধ্য করতে পার?’ (সুরা ইউনুস ১০ঃ১০০)মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিয়ে বলছেন। তিনি চাইলে সবাই ঈমান আনতে পারত কিন্তু এমনটি তিনি করেননি বরং সত্য গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষেত্রে সবাইকে স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। যে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং এমন কাজ করেননি সেখানে তাঁর প্রতিনিধি বিশ^ নবী (সা.) কীভাবে মানুষকে ঈমানআনতে বাধ্য করতে পারেন। এই হচ্ছে ধর্ম বিষয়ে ইসলাম প্রদত্ত স্বাধীনতা।পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছেন, ওয়া কুলিল হাক্কুমির রাব্বিকুম ফামান শা’ ফাল ইউমিন ওয়ামান শা’ ফাল ইয়াকফুর অর্থাৎ- ‘আর তুমি বল এ সত্য তোমাদের প্রভু প্রতিপালকের পক্ষ থেকে (প্রেরিত)। সুতরাং যে চায় সে ঈমান আনুক এবং যে চায় সে অস্বীকার করুক।’ (সুরা কাহফ ১৮ঃ৩০)।ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম বিলালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বল প্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। ফার্সিতে বলা হয়, আফতাব আমাদ দালিলে আফতাব। অর্থাৎ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এ নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতণ্ডারও কোনো অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে খোদাতাআলাকে মানল বা মানল না, কে ধর্ম পালন করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোনো শিক্ষা ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল্লাহ নিজে করবেন বলে তাঁর শেষ শরিয়ত গ্রন্থ কুরআন মজিদে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিক থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে, অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে।যদি রাষ্ট্র কোনো ধর্ম পালন না করে থাকে তাহলে রাষ্ট্রধর্ম কেন? কার স্বার্থে? বস্তুত রাষ্ট্রের নাগরিকগণ তাদের পছন্দসই ধর্ম পালন করে থাকে। রাষ্ট্র যেহেতু কোনো ধর্ম পালন করে না। সেহেতু রাষ্ট্রধর্মের আদৌ কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে না। আইনের শাসন কায়েম এবং ন্যায় বিচারের মানদণ্ডকে সমুন্নত করতে হলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা অবলম্বন করেই রাষ্ট্রীয় শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ও চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যতœবান হতে হয়। কোনো ধর্মীয় মতাদর্শের লোকদের প্রাধান্য দেয়া হলে ধর্মীয় কারণে নাগরিকদের মাঝে বিভক্তি রেখা সৃষ্টি হতে পারে। একচোখা নীতি অবলম্বন করা হলে রাষ্ট্র নায়কদের নিরপেক্ষ চরিত্র আর বজায় তাকে না। ধর্মনিরপেক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে একাত্তরের অবিনাশী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে প্রগতির পথে চলা প্রয়োজন। যদি রাষ্ট্র র্মনিরপেক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে তাহলে রাষ্ট্রটি আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এবং মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে পরিচালিত হওয়ার কোনো দাবি করতে পারে না। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসন থেকে মুক্তি লাভের জন্য বীর বাঙালি একাত্তরে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং নয় মাস মরণপণ লড়াই-সংগ্রাম করে দেশকে পাক হানাদার মুক্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জন। অনেক চরম মূল্যে কেনা আমাদের এই স্বাধীনতা। তাই আর ভুলপথে পা বাড়ানোর চেষ্টা করা সঙ্গত হবে না। একাত্তরে সাম্প্রদায়িকতাকে কবর দেয়া হয় বাংলার পলি মাটিতে। এখন কবর খুঁড়ে সাম্প্রদায়িকতার পচা লাশ তুলে দুর্গন্ধ ছড়াবার চেষ্টা করা হলে বাংলার জনগণই তাদের রুখবে। আজ সময় এসেছে সাম্প্রদায়িক উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীকে প্রতিহত করার।
১৯৭২ সালের সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে জাতিগত ঐক্য ও সংহতি বজায় রেখে বাঙালি পথ চললে পথ হারাবে না। বরং সঠিক পথের দিশা পাবে। ‘প্রথমে এবং সর্বাগ্রে আমরা হলাম বাঙালি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নিরীশ্বরবাদী সবাই বাঙালি। ধর্মের কারণে আমাদের মাঝে বিভক্তি আসতে দেওয়া যায় না।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই উক্তি যথার্থ ও সঠিক। বরং তা সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন এখানে বহাল থাকবে।’ধর্ম বিচ্যুত হয়ে বল্গাহীন অশে^র ন্যায় যে দিকে খুশি সেদিকে ছুটে চলার কথা রাষ্ট্র যেমন নাগরিকদের বলে না, তেমনি ধর্মও তার মান্যকারীদের বাঁধনহারা জীবনযাপন করতে বলে না। বরং ধর্ম তার অনুসারীদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুশৃঙ্খলভাবে চলতে উপদেশ দেয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মনে করেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যা ইচ্ছা তা করা নয়।’ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলামেরই শিক্ষা। পবিত্র কুরআন মজিদের সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতটি আমাদের অনেকেরই জানা আছে। প্রতি শুক্রবার পবিত্র জুমার দিন খুতবা শেষে খোতবায়ে সানিয়ায় এ আয়াতটি পাঠ করা হয়। এতে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পূর্ণ ন্যায়প্রতিষ্ঠার, অনুগ্রহসুলভ আচরণ করার এবং স্বতঃপ্রণোদিত আত্মীয়সুলভ ব্যবহার করার আদেশ দিচ্ছেন আর বারণ করছেন অশ্লীলতা, কুকর্ম এবং সব ধরনের বিদ্রোহ ঔদ্ধত্য থেকে। তিনি তোমাদের তাগিদপূর্ণ নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পার। এ আয়াতে সবচেয়ে মৌলিক এবং প্রাথমিক যে কাজটি নিশ্চিত করার আদেশ দেয়া হয়েছে তা হলো পূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা। এরপর ধাপে ধাপে আরো উন্নত নৈতিক শিক্ষা অবলম্বন করার পথ খুলে যায়। বলা বাহুল্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেশের নাগরিগদের মাঝে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে পূর্ণ ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসন তথা রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষ হলেই কেবল ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইসলামের শিক্ষা পরিপন্থী বলে মনে করেন তাদের কথা ঠিক নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলামের শিক্ষা। মহানবী (সা.) মদিনায় এ নীতিই অবলম্বন করেছিলেন। গায়ের জোরে নয়, বুদ্ধি খাটিয়ে কথা বলুন। ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে ধর্মব্যবসায়ী ও উগ্রধর্মান্ধরা আমাদের দেশে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ সামান্য একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই কিন্তু বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়। চলুন বিষয়টি নিয়ে একটু ভেবে দেখি। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসলমানদের ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা মানুষের মাঝে শাসন কাজ পরিচালনাকালে পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার করবে। এ বিষয়ে কোনো মৌলবি-হুজুর দ্বিমত করেন না, করতেও পারেন না। করলে, সাব্যস্ত হবে তারা সমাজে ও রাষ্ট্রে অন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চান। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে যদি একজন বিচারককে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হয়, তাহলে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও মতাবলম্বীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্রকে তার সব নাগরিকদের মাঝে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কী নীতি অবলম্বন করতে হবে- নিরপেক্ষতা নাকি পক্ষপাতিত্ব? রাষ্ট্র যদি কোনো ধর্মের বা কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর পক্ষ অবলম্বন করে সেক্ষেত্রে সে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা একটি অলীক কল্পনা মাত্র। তাই ইসলামের শিক্ষানুযায়ী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য ধর্ম বিষয়ে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে। আর রাষ্ট্রের এ নীতিকেই ধর্মনিরপেক্ষতা বলে।