07/05/2026
স্কুলে যোহরের নামাজের সময় হলে এক অন্যরকম ব্যস্ততা শুরু হয়। আমাদের এখানে জামাত হয় দুটি। প্রথম জামাতটি আমি পড়াই একদম কচি-কাঁচা শিশুদের নিয়ে—যাদের বয়স মাত্র ৫ থেকে ৭ বছর। এই বয়সে তাদের ওপর নামাজের বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু নামাজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। তবে এই অবুঝ শিশুদের সারিবদ্ধ করা আর শান্ত রাখা যে কতটা ধৈর্যের পরীক্ষা, তা কেবল একজন শিক্ষকই জানেন। এখানে মেধা আর কৌশলের লড়াই চলে প্রতিনিয়ত।
গতকালের একটি ঘটনা আমাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলল। নামাজের কাতার ঠিক করছি, এমন সময় একটি বাচ্চা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে রুমে ঢুকল। দেরি করে আসার কোনো সংকোচ নেই তার মধ্যে, বরং এসেই অন্য বাচ্চাদের সাথে চিৎকার করে গল্প জুড়ে দিল। আমি তাকে শান্ত হতে বললাম, ইংরেজিতে বললাম— "Don't shout, please." কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে হয়তো ভেবেছিল এটা ক্লাসরুমের বিরতির সময়।
আমি তাকে কাছে ডাকলাম। পরম মমতায় বোঝাতে লাগলাম, "বাবা, এটা সালাতের জায়গা। এখানে আমরা মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াই। এই পবিত্র জায়গায় দুষ্টুমি করতে হয় না।" সে একটু থমকে দাঁড়াল। আমি যখন সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, "আমরা কার সামনে দাঁড়াচ্ছি?" সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলল— "আল্লাহর সামনে!" আমি তাদের শেখালাম, নামাজে দাঁড়ালে ডানে-বামে বা উপরে তাকাতে হয় না, শুধু সিজদার জায়গায় চোখ রাখতে হয়। এভাবেই আল্লাহর সাথে আমাদের একান্ত আলাপ হয়। কথাগুলো শুনে তারা এতটাই বিমোহিত হলো যে উল্টো আমাকে প্রশ্ন করল— "স্যার, নামাজ না পড়লে শয়তান খুশি হয়, তাই না?" আমি বললাম, "হ্যাঁ। তাহলে আমরা কি আল্লাহকে খুশি করব নাকি শয়তানকে?" সবার উত্তর ছিল— "আল্লাহকে।"
এত কিছুর পরেও সেই চঞ্চল ছেলেটি থামছিল না। নিরুপায় হয়ে হালকা একটু ধমক দিয়ে বললাম, "তুমি কি সেই পচা ছেলেদের মতো হতে চাও, যারা শিক্ষকের কথা শোনে না?" ব্যস, কথাটি তার কচি মনে তীরের মতো বিঁধল। সাথে সাথে তার মুখটা মলিন হয়ে গেল, সে চুপচাপ কাতারে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্য থেকেই একজনকে ইমাম হিসেবে নির্বাচন করে আমি পেছনে দাঁড়িয়ে সব তদারকি করছিলাম।
নামাজ শেষে যখন সবাই লাইনে দাঁড়াল, সেই ছেলেটি আর আসছিল না। অভিমানে দূরে সরে ছিল। আমি তাকে কাছে ডেকে নিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে, আদর করে বললাম— "বাবা, শিক্ষক বকা দেয় তোমাদের ভালোর জন্য। তুমি তো এই স্কুলের সবথেকে সেরা ছেলে।" তার মলিন মুখে হাসির ঝিলিক ফোটাতে আমি তাকে প্রস্তাব দিলাম— "আগামীকাল তুমি আমাদের নামাজের ইমাম হবে এবং নেতৃত্ব দিবে। পারবে না?"
সে তো খুশিতে আত্মহারা! হেসে বলল— "স্যার, আমি ইকামতও দিব আবার ইমামতিও করব!" আমি হেসে ফেললাম। তাকে বুঝিয়ে বললাম যে ইমামের দায়িত্ব হলো নেতৃত্ব দেওয়া, আর আমাদের কাজ হলো তাকে অনুসরণ করা। সে দিন সে এক বুক তৃপ্তি নিয়ে ডিপার্চারে গেল।
আজ সকালে যখন সে স্কুলে এল, তার হাতে ছিল একটি সুন্দর ফুল। কোনো কথা না বলেই ফুলটি আমার হাতে গুঁজে দিল। তার চোখের সেই আনন্দ আর প্রাপ্তির উজ্জ্বলতা দেখে আমি নিশ্চিত হলাম—সে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে এবং আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।
আমার উপলব্ধি হলো শিশুদের মন সত্যিই কাদা মাটির মতো। আমরা শিক্ষকরা যেভাবে তাদের গড়ব, তারা সেভাবেই গড়ে উঠবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় অভাব হলো এই মমতার ছোঁয়া আর সঠিক কৌশলের। শাসনের নামে কঠোরতা শিশুদের বিদ্রোহী করে তোলে, কিন্তু একটু আদর আর দায়িত্ববোধ তাদের আমূল বদলে দিতে পারে।
একজন প্রকৃত শিক্ষক তিনি-ই, যিনি শিক্ষার্থীর গায়ে হাত না তুলেও তার হৃদয় জয় করতে পারেন। মেজাজ হারানো নয়, বরং ভালোবাসা আর নমনীয়তাই হোক আমাদের প্রধান হাতিয়ার। অভিজ্ঞতা আমাদের এটাই শেখায় যে, পেশাদারিত্ব মানে কেবল সিলেবাস / চোডি বই শেষ করা নয়, বরং প্রতিটি শিশুর সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করা।
শিক্ষকতার এই মহান পেশায় থাকতে হলে আমাদের মস্তিষ্ককে প্রতিদিন নতুন নতুন কৌশলে আপডেট করতে হবে। প্রতিটি শিশুই আলাদা, তাই তাদের সামলানোর পদ্ধতিও হতে হবে আলাদা। আমরা শাসনের চেয়ে ভালোবাসায় বেশি বিশ্বাস করি। দিনশেষে আমাদের শিক্ষার্থীদের মুখে ফুটে থাকা ওই অমলিন হাসিটাই আমাদের সবথেকে বড় সার্থকতা।
History
6 May 26
13/11/2025
12/10/2025