18/06/2026
অঙ্ক নিবেদিত মাসিক চেস টুর্নামেন্ট Ongko Rapid Tournament June '26 এ সকলে আমন্ত্রিত৷
📅 তারিখ: ১৯ জুন ২০২৬, শুক্রবার
🕒 সময়: রাত ৯টা-১১টা (অ্যারেনা)
⏱️ ফরম্যাট: র্যাপিড (১০+০)
🌐 প্ল্যাটফর্ম: চেস ডট কম
♟️ কনটেস্ট লিংক: https://www.chess.com/play/arena/31300393
বোর্ডের লড়াইয়ে বরাবরের মতোই সবাইকে শুভ কামনা।
16/06/2026
শুভ সন্ধ্যা পাঠকগণ!
ক্রনিকলস সিজন ৩ -এর সপ্তম পর্বে সবাইকে জানাই স্বাগত! আজকের আর্টিকেলের শিরোনাম: "Game Theory: সিদ্ধান্তের অদৃশ্য বিজ্ঞান"।
সাফল্য কি শুধু আমাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে ? নাকি প্রতিপক্ষের চালের উপরও? কল্পনা করা যাক তুমি এবং তোমার প্রতিপক্ষ কোম্পানি দুইজনেই বাজারে একটি নতুন প্রোডাক্ট এনেছো। এখন, তুমি কি বেশি লাভের আশায় প্রোডাক্ট এর দাম বাড়িয়ে রাখবে, নাকি বেশি সেলস এর জন্য দাম কমিয়ে রাখবে ? মূলত এই সিদ্ধান্তের শেষ ফলাফল বা লাভ ক্ষতি কেমন হবে তা নির্ভর করছে তোমার প্রতিপক্ষের চালের উপর।
সমাজ, প্রতিপক্ষ কিংবা অন্য বিষয়ের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আচরণকে গণিত আর মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করার তত্ত্বই হচ্ছে “গেম থিওরি”। গেম থিওরির সহজ অর্থ হলো স্বাধীন ও পারস্পরিক নির্ভরশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের তত্ত্ব । যেখানে প্রতিটি পক্ষকে বলা হয় একজন “Player” এবং তাদের সম্ভাব্য লাভ ক্ষতি কে বলা হয় “Pay-off”।
জুয়ার টেবিলে আধিপত্যের জন্যই এই গেম থিওরির বীজ বপন হয় ১৬৫০ সালে গণিতবিদ পাসকালের মাধ্যমে। পরবর্তীতে নিউম্যান এবং মর্গেনস্টার্ন এর যৌথভাবে প্রকাশিত বই Theory of Games and Economic Behavior এই থিওরি কে অর্থনীতির সাথে পরিচিত করায়।
১৯৫০ সালে এ ডব্লিউ টাকার এর “Prisoner’s dilemma” নামে একটি গল্প উঠে আসে।
পুলিশ দুইজন অপরাধী (ক ও খ) কে গ্রেফতার করলো । পুলিশ জানতো তারা ব্যাংক ডাকাতির অপরাধী কিন্তু অকাট্য প্রমাণের অভাবে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তই সাথে অস্ত্র পাওয়ার অপরাধে তাদেরকে গ্রেফতার করে এবং দুইজনকে দুটো আলাদা রুমে রেখে কিছু শর্ত দেয়।
১. দুইজনই যদি তাদের অপরাধ স্বীকার করে নেয় তবে উভয়কে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দিবে।
২. একজন স্বীকার করলে, তাকে মুক্তি এবং যে অপরাধ স্বীকার করেনি তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দিবে।
৩. যদি দুইজনের কেউই স্বীকার না করে তবে উভয়কেই এক বছর করে কারাদণ্ড দিবে।
“ক” এই ভেবে চিন্তায় পড়ে গেল যে “খ” যদি তাকে ধোকা দিয়ে অপরাধ স্বীকার করে ফেলে তবে নিজের পিঠ বাঁচাতে তারও অপরাধ স্বীকার করাই ভালো ( ১০ বছরের চেয়ে পাঁচ বছর ভালো) । আবার “খ” যদি স্বীকার নাও করে তবুও “ক” এর স্বীকার করে নেওয়াই লাভজনক, তাতে সে মুক্তি পাবে।
“খ” ও ঠিক একইভাবে চিন্তা ভাবনা করে উভয়েই উভয়ের দিক থেকে লাভজনক এবং স্বার্থপর সিদ্ধান্ত নিল এবং তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করে নিলো। পুলিশ তাদের উভয়কেই পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিল ।
অথচ তারা একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারলে এবং চুপ করে থাকতে পারলে উভয়েরই মাত্র এক বছর কারাদণ্ড হত।
Prisoner’s Dilemma এর ঘটনায় দুজনেই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান। এই ধরনের পরিস্থিতিকে বলা হয় “Nash Equilibrium”। ১৯৫১ সালে গণিতবিদ জন ন্যাশ এই ধারণা দেন। এই সাম্যবস্থার একটি উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টি আরেকটু পরিস্কার হবে।
মনে করা যাক একটি রাস্তার দু দিক থেকে দুইজন গাড়িচালক অগ্রসর হচ্ছেন। তাদের কাছে কেবল দুইটি অপশন হয় তারা ডান দিকে চলবে নয়তো বামদিকে। ধরে নিচ্ছি নিয়ম অনুযায়ী বামদিকে চলতে হবে। এখন উভয়েই তার প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত (বামদিকে চলার বিষয়ে) । যেহেতু প্রতিপক্ষ তার সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছে না যেকোনো একজন যদি ডানদিকে চালানো সিদ্ধান্ত নেয় তবে মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে। তাই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে উভয়কেই বাম দিকে চলতে হবে। সিদ্ধান্তের এই ধরনের সমতাকেই Nash Equilibrium বলে। জন ন্যাশ তার এই ধারণার জন্য নোবেল পেয়েছিলেন।
তবে এই ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম এরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। Prisoner’s Dilemma তে দুইজনের জন্য লাভজনক সিদ্ধান্ত তাদের দৃষ্টিতে ছিল “স্বীকার করে নেওয়া”। যার জন্য তারা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পায়। কিন্তু তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক ফলাফল হতে পারতো এক বছরের কারাদণ্ড।
তাহলে কি মানুষ সবসময় স্বার্থপর? “না”
গণিতবিদেরা এ বিষয়ে মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য কি পরীক্ষা করে যাকে “Ultimatum Game” বলা হয়।
ধরো তোমার এক বন্ধুকে ১০০ টাকা দিয়ে বলা হলো এই টাকাটা অন্য একজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। সে অপরজনকে ৫০, ১০ এমনকি ১ টাকাও দিতে পারে। শর্ত হচ্ছে উভয়পক্ষকেই এই ভাগটি মেনে নিতে হবে। অপরজন যদি সেটা প্রত্যাখ্যান করে তবে দুজনের কেউই কোন টাকা পাবে না।
মানুষ শুধু স্বার্থপর হলে সেই এক টাকা নিতেও রাজি হতো। কিন্তু অনেকের উপর এই পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে তাদের সিংহভাগই এই অফার রিজেক্ট করে দিয়েছে। কারণ মানুষ নিজের ক্ষতি হলেও অন্যায়ের একটা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বা অপর পক্ষকে শাস্তি দিতে চায়। অর্থাৎ, মানুষ সবসময় শতভাগ স্বার্থপর রোবটের মতো চলে না; আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে আত্মসম্মান, আবেগ ও সামাজিক ফেয়ারনেস অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
এই থিওরির ক্ষেত্রে চার ধরনের স্ট্যাটিজি কাজ করে
১) পিওর স্ট্র্যাটেজি: যখন কোন ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ওই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে না তাকে পিওর স্ট্র্যাটেজি বলে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অবগত থাকে।
যেমন একটি কোম্পানি সিদ্ধান্ত নিল তারা তাদের পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে কখনো আপোষ করবে না। প্রতিপক্ষের দাম যেমনই হোক তারা সব সময় প্রিমিয়াম কোয়ালিটি বজায় রাখবে , এটি তাদের পিওর স্ট্র্যাটেজি।
২) মিক্সড স্ট্র্যাটেজি: প্রতিপক্ষের কাছে নিজেকে আনপ্রেডিক্টেবল রাখা এবং সম্ভাব্য সকল সিদ্ধান্তই অদল বদল করে নেওয়া।
যেমন রক পেপার সিজার খেলায় প্রতিবার রক দিলে প্রতিপক্ষ সেটা বুঝে যাবে এবং প্রতিবার পেপার দিয়ে তোমাকে হারিয়ে দিবে। তাই জেতার জন্য তোমাকে মিক্স স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করতে হবে যাতে রক পেপার এবং সিজার তিনটি চালই অদল বদল করে তুমি খেলতে থাকবে।
৩) ডমিন্যান্ট স্ট্র্যাটেজি: অন্যের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব না দিয়ে নিজের দিক থেকে সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়াই ডমিন্যান্ট স্ট্র্যাটেজি
পুলিশ ও কয়দিদের ঘটনায় এ ধরনের স্ট্র্যাটেজি দেখা গিয়েছিল।
৪) ডমিনেটেড স্ট্র্যাটেজি: এক্ষেত্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সব সময় খারাপ, এটি প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না।
ধরা যাক তোমার একটি রেস্টুরেন্ট আছে। তুমি ক্রেতা আকর্ষণের জন্য তোমার রান্নার খরচের চেয়েও দাম কমিয়ে দিলে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ যাই করুক না কেন দিনশেষ তোমাকে দেউলিয়া হতে হবে। এ ধরনের স্ট্র্যাটেজি কখনোই ব্যবহার করা উচিত নয়।
আমাদের প্রায় সকল মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্তই অনেকাংশে এই তত্ত্বের উপর নির্ভর করে।
যেমন ধরো তোমরা দুই বন্ধু পরীক্ষার আগের রাতে একে অপরকে বললে যে তোমরা এখন ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু দুজনেই ভাবলো,”আমি ঘুমিয়ে পড়লে তো অপরজন সারারাত পড়ে পরীক্ষায় ভালো করে ফেলবে” , এই ভাবনা থেকে দুইজনেই সারারাত পড়লো।
Cold war এর ক্ষেত্রেও এই বিষয়ের প্রয়োগ দেখা যায়। ধরা যাক আমেরিকা এবং রাশিয়া একে অপরের প্রতিপক্ষ এবং তারা সিদ্ধান্ত নিল কেউই অস্ত্র প্রস্তুত করবে না। কিন্তু ওই ভাবল ,” অপরজন যদি গোপনে অস্ত্র তৈরি করে” । এবং দুই জনই অনেক অর্থ ব্যয় করে অস্ত্র তৈরি করল।
মনে কর কোন একটি প্রোজেক্ট তোমরা পাঁচ জনের একটি গ্রুপ কাজ করছো।
যদি পাঁচজনই কাজ করে তবে প্রজেক্টটা ভালো হবে। যদি একজন কাজ না করে তবে সে বাকি চারজনের কাজের সুবিধা পাবে। যদি সবাই এভাবে ভাবে তাহলে প্রজেক্টটি খারাপ হবে। Game theory তে এটাকে Free Rider Problem বলা হয়।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল কাজেই আমরা এই Game Theory এর প্রয়োগ করে থাকি। বর্তমান পৃথিবীর অনন্য চমক AI থেকে শুরু করে বিভিন্ন Automated Technology যেমন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি তে এই theory ব্যাবহার হয়।
এই theory আমাদের কে এইটা বুঝতে সাহায্য করে যে আমরা কোন সিদ্ধান্ত একা নিতে পারি না বা পারলেও তার ফলাফল প্রতিপক্ষ বা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। কখন প্রতিযোগিতা , কখন সহযোগিতা আর কখন বিশ্বাস করতে হবে Game theory আমাদেরকে সেই বিষয়গুলোই গাণিতিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিশ্চিত হতে সাহায্য করে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
লেখনীতে: মো সাদিক বিন আজিজ, টিম অঙ্ক
ডিজাইনার: মুনতাসির মাহি, টিম অঙ্ক
15/06/2026
Wishing a very happy birthday to our Senior Advisor, Mohammad Showhal Saad! May this year bring you joy. Thank you for being such an incredible anchor for our team and for guiding us toward success day ❤️
15/06/2026
Happy Birthday to MD Shafiul Hasan, head of IT. May this new year bring you immense happiness and brilliant milestones ahead at Ongko. We deeply appreciate your guidance and dedication at IT ✨
09/06/2026
শুভ সন্ধ্যা পাঠকগণ!
ক্রনিকলস সিজন ৩ -এর ষষ্ঠ পর্বে সবাইকে জানাই স্বাগত! আজকের আর্টিকেলের শিরোনাম: "ইউরেনিয়া প্রোপিতিয়া"।
যে মহাজাগতিক জ্ঞান একদা মহাবিশ্বের জটিলতাকে সহজ করে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছিল, ইতিহাস আজ তাকেই করে রেখেছে এক অদৃশ্য নক্ষত্র । অথচ সেই নীরব প্রদীপ্ত মেধার সুফল আজও ধারণ করছে জ্যোতির্বিজ্ঞান।
মহাবিশ্বের রহস্য এবং বৃত্তান্ত যেন এক অতলান্ত মহাসমুদ্র। যেখানে আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষের অদৃশ্য টান (Gravitation) কিংবা আলবার্ট আইনস্টাইনের কালজয়ী আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (The Theory of Relativity), মহাকালের স্তব্ধ বিন্দু ছেড়ে শূন্যতার ক্যানভাসে বুনে দেওয়া নক্ষত্রখচিত অনন্ত সৃষ্টি মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব ( The Theory of Big Bang by Stephen hawking ) বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেখানে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে বহু মহাজাগতিক গল্প। প্রকৃতির অমোঘ সত্য উন্মোচনে কেউ পরমাণুর অন্দরমহলে উঁকি দিয়েছেন, আবার জোহানেস কেপলারের মতো দূরদর্শী প্রবক্তাগণ যখন গ্রহের কক্ষপথের জটিল হিসাব কষে মহাকাশবিজ্ঞানের ভিত গড়েছিলেন, তখন সেই সমীকরণের ধূম্রজালে আটকে ছিল অনেক ভুলত্রুটি। বিজ্ঞানের সেই আদি লগ্ন থেকে আজ অবধি পূর্বসূরিদের গাণিতিক গোলকধাঁধা আর ভুলকে সুধরে দেওয়ার গুরুভার কাঁধে নিয়েছেন অল্প কয়েকজন স্বশিক্ষিত বিজ্ঞানী। অথচ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময়ের উদাসীনতায় , প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে এমন কিছু অনন্য সংশোধন এক প্রকার ভস্মে ঘি ঢালা-র মতোই ইতিহাসের পাতায় ঢাকা পড়ে গেছে। আজকে সেসব গল্পের একটা অংশ জানতে চলেছি।
মারিয়া কুনিৎজ (১৬১০-১৬৬৪) জন্মগ্রহণ করেন রোমান সাম্রাজ্যের সাইলেসিয়ায় যা বর্তমান পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিকের মাঝামাঝি একটি অংশ । তাঁর বাবা পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন । সেসময় ইউরোপে মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গণিত , দর্শন, বিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন মারিয়া । তিনি ছিলেন একজন শৌখিন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী।
পৃথিবীকেন্দ্রিক ভাবনার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের শুরু । দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমি তত্ত্ব দেন যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বের সবকিছু ঘুরছে । ১৪০০ বছর ধরে এই তত্ত্ব সবাই মানলেও পরবর্তীতে ১৫৪৩ সালে নিকোলাস কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল প্রতিষ্ঠা হয় । সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো ঘুরছে। কিন্তু কীভাবে এরা ঘুরছে তা পর্যবেক্ষণ করতে করতে জার্মান বিজ্ঞান জোহানাস কেপলার গ্রহগুলোর কক্ষপথ, কক্ষপথে গ্রহগুলোর গতি , এবং ঘূর্ণনসম্পর্কিত প্রথম দুটি সূত্র ( ১৬০৯ সালে) ও তৃতীয় সূত্র ( ১৬১৯ সালে ) প্রকাশ করেন ।
কেপলারের প্রথম সূত্র :
উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সূত্রানুযায়ী প্রতিটি গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে। বৃত্তের কেন্দ্র থাকে একটি এবং উপবৃত্তের কেন্দ্র থাকে , দুটি যাকে ফোকাস বিন্দু বলে । ফোকাস বিন্দুদয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব শূন্য হলে তারা একসঙ্গে মিলিত হবে । গ্রহ থেকে সূর্যের সবচেয়ে কাছের বিন্দুকে অনুসুর ( perihelion) এবং দূরের বিন্দুকে অপসুর ( aphelion) বলে। এই ধারণাটি বোঝার জন্য খুব সহজ একটি তুলনা ব্যবহার করতে পারি । একটি গোল ডিম এবং বল পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় বলটা সম্পূর্ণ গোল হলেও ডিমটা কিছুটা লম্বাটে বা চ্যাপ্টা । কেপলার গ্রহ চলাচলের এই লম্বাটে পথকে উপবৃত্ত বলেছেন । তবে এখানেই শেষ নয়। যদি কক্ষপথটি গোল হতো, তাহলে সূর্য ঠিক তার কেন্দ্রে অবস্থান করত। কিন্তু যেহেতু কক্ষপথটি উপবৃত্তাকার, তাই সূর্য একদম মাঝখানে থাকে না বরং একটু সরে এক পাশে অবস্থান করে। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। যেমন গ্রহগুলো তাদের কক্ষপথে ঘোরার সময় কখনো সূর্যের কাছাকাছি আসে, আবার কখনো দূরে সরে যায়। অর্থাৎ সূর্য থেকে গ্রহের দূরত্ব সবসময় একরকম থাকে না। এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথটি আমরা একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেরাই আঁকতে পারি। উপকরণ হিসেবে একটি কাগজে দুটি পিন বসিয়ে সেগুলোর চারপাশে একটি সুতো জড়িয়ে পেন্সিল দিয়ে টানটান করে ঘোরালে একটি ডিম্বাকৃতি আকৃতি তৈরি হয়। এই আঁকা রেখাটিই হলো গ্রহের কক্ষপথ আর পিনের একটি অবস্থানকে সূর্যের জায়গা হিসেবে কল্পনা করা যায়। কেপলারের এই আবিষ্কার সঠিক হলেও তাঁর দেওয়া গণনার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুলে পরিপূর্ণ। এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মারিয়া কুনিৎস। তিনি কেপলারের সূত্র পরিবর্তন করেননি বরং তাঁর কাজ ছিল সেই সূত্রকে সহজ, নির্ভুল এবং ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। কেপলারের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Rudolphine Tables’-এ গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য যে জটিল লগারিদমিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। মারিয়া কুনিৎস এই জটিল পদ্ধতিকে সরল জ্যামিতিক নিয়মে রূপান্তর করেন ।
কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র :
কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র সমান ক্ষেত্রফলের সূত্র অনুসারে সূর্য ও গ্রহের মধ্যে একটি সরলরেখা টানলে গ্রহের কক্ষপথে সেই সরলরেখা সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফলের অতিক্রম করে । আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি আরও সহজ হয়ে যায়। যেমন আমরা যখন দৌড়াই বা সাইকেল চালাই তখন সবসময় একই গতিতে চলতে পারি না। কখনো আমরা খুব দ্রুত দৌড়াই আবার কখনো ক্লান্ত হয়ে ধীরে চলি। মহাকাশেও গ্রহগুলো ঠিক এমনই আচরণ করে। কেপলার দেখিয়েছিলেন, যখন কোনো গ্রহ সূর্যের কাছাকাছি আসে, তখন তার গতি অনেক বেড়ে যায় এবং সে দ্রুত এগিয়ে চলে। আবার যখন সে সূর্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার গতি কমে যায় এবং সে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। তবে এই গতি পরিবর্তনের পেছনে একটি গভীর নিয়ম কাজ করে যা কেপলারের দ্বিতীয় সূত্রের মূল কথা। যদি আমরা কল্পনা করি যে সূর্য ও একটি গ্রহের মধ্যে একটি অদৃশ্য সুতো বাঁধা আছে তাহলে গ্রহটি ঘোরার সময় সেই সুতোটিও সাথে সাথে ঘুরে একটি বিশেষ আকৃতি তৈরি করে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সুতো যে অংশটুকু ঘুরে একটি ‘কেকের টুকরো’ বা ‘পিজ্জার স্লাইস’-এর মতো ক্ষেত্র তৈরি করে, তা সবসময় সমান থাকে। অর্থাৎ গ্রহটি সূর্যের কাছাকাছি থাকুক বা দূরে থাকুক সমান সময়ে সে যে ক্ষেত্র অতিক্রম করে তা সবসময় সমান। এই কারণেই গ্রহটি সূর্যের কাছে এলে দ্রুত চলতে বাধ্য হয় কারণ তখন তার পথ ছোট হয়ে যায় এবং সমান ক্ষেত্র তৈরি করতে তাকে দ্রুত এগোতে হয়। অন্যদিকে সূর্য থেকে দূরে গেলে পথ বড় হয়ে যায়, তাই ধীরে চললেই সমান ক্ষেত্র তৈরি সম্ভব হয়। এই ধারণাটি একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমেও বোঝা যায়। একটি সুতোর সাথে একটি ছোট বল বেঁধে সেটিকে বাতাসে ঘোরালে দেখা যায় সুতো যত লম্বা থাকে বলটি তত বড় বৃত্তে এবং তুলনামূলক ধীরে ঘোরে। কিন্তু ধীরে ধীরে সুতো ছোট করলে বলটি কেন্দ্রের কাছে এসে দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। মহাকাশে গ্রহগুলোর আচরণও অনেকটা এর মতোই সূর্যের কাছে এলে তারা দ্রুত চলে এবং দূরে গেলে ধীর হয়ে যায়। যদিও কেপলারের এই সূত্রটি মহাবিশ্বের গতিবিধি বোঝার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটায়, তবে এর গাণিতিক হিসাব ছিল অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে তা নির্ণয় করা ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যাটিই ‘কেপলার সমস্যা’ নামে পরিচিত ছিল।
এই জটিল সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মারিয়া কুনিৎস। তিনি কেপলারের সূত্রে কোনো পরিবর্তন আনেননি বরং তাঁর লক্ষ্য ছিল এই কঠিন হিসাবকে সহজ করা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Urania Propitia’-তে তিনি কেপলারের জটিল পদ্ধতিকে ত্রিকোণমিতিক নিয়মে রূপান্তর করেন। এর ফলে গ্রহের অবস্থান নির্ণয় করা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং কম সময়ে নির্ভুল ফল পাওয়া সম্ভব হয়।
কেপলারের তৃতীয় সূত্র :
পর্যায়কালের সূত্র অনুসারে ( Law of Harmonies), যে গ্রহ সূর্যের যত কাছে থাকে , কক্ষপথে সেই গ্রহ তত দ্রুতবেগে চলে । কক্ষপথে কোনো গ্রহের পর্যায়কাল ( T ) এর বর্গফলে ( T²) সূর্য থেকে ওই গ্রহের গর দূরত্ব ( R) er ঘনফল ( R³) এর সমানুপাতিক । এই ধারণাটি বোঝার জন্য আমরা একটি খুব পরিচিত উদাহরণ নিতে পারি। যেমন স্কুলের মাঠে দৌড় প্রতিযোগিতা। ধরো, একটি ছোট বৃত্তাকার পথ আরেকটি অনেক বড় বৃত্তাকার পথ। যদি দুজন দৌড়বিদ একই গতিতে দৌড়াতে শুরু করে তাহলে যে বড় পথে দৌড়াচ্ছে তার এক চক্কর দিতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় লাগবে। ঠিক তেমনই মহাকাশে সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলোর কক্ষপথও ভিন্ন ভিন্ন আকারের হয়। যে গ্রহ সূর্যের কাছে থাকে তার পথ ছোট তাই সে দ্রুত একটি চক্কর সম্পন্ন করতে পারে। অন্যদিকে যে গ্রহ অনেক দূরে থাকে তার পথ বিশাল বড় হওয়ায় একটি পূর্ণ চক্কর সম্পন্ন করতে অনেক বেশি সময় লাগে। বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আমাদের পৃথিবীর এক বছর ৩৬৫ দিনে সম্পন্ন হয়, কারণ এই সময়ের মধ্যেই পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ মাত্র ৮৮ দিনেই তার এক বছর শেষ করে। আবার সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকা নেপচুন গ্রহের ক্ষেত্রে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ১৬৫ বছর সময় লাগে। অর্থাৎ দূরত্ব যত বাড়ছেবা সময় তার চেয়েও অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এটাই কেপলারের তৃতীয় সূত্রের মূল বক্তব্য।এই বিষয়টি একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমেও অনুভব করা যায়। একটি লাঠি বা স্কেল নিয়ে তার এক প্রান্তে একটি বস্তু এবং অন্য প্রান্তে আরেকটি বস্তু রাখলে দেখা যায় লাঠিটি ঘোরানোর সময় ভেতরের বস্তুটি ছোট একটি বৃত্তে ঘোরে আর বাইরের বস্তুটি অনেক বড় একটি বৃত্ত অতিক্রম করে। একই সময়ে বড় বৃত্ত অতিক্রম করতে বেশি পথ পাড়ি দিতে হয় ফলে সেখানে সময়ের ব্যবধান স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মহাকাশেও গ্রহগুলোর ক্ষেত্রে একই নিয়ম কাজ করে। যদিও কেপলারের এই সূত্রটি মহাবিশ্বের গতিবিধিকে একটি সুন্দর গাণিতিক নিয়মে বেঁধে দেয়, তবে এর প্রয়োগ ছিল অত্যন্ত জটিল। এই সূত্র অনুযায়ী, কোনো গ্রহের আবর্তনকালের বর্গ তার সূর্য থেকে গড় দূরত্বের ঘনফলের সমানুপাতিক (T² ∝ R³)। কিন্তু এই সমীকরণ ব্যবহার করে বাস্তবে হিসাব করতে গেলে বড় বড় সংখ্যার বর্গ, ঘনফল এবং তাদের মূল নির্ণয় করতে হতো, যা সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন কাজ। এই জটিলতাকে সহজ করে তোলার ক্ষেত্রেই অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন মারিয়া কুনিৎস। তিনি টেবিল ও অনুপাতভিত্তিক পদ্ধতি তৈরি করেন, যার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বড় বড় সংখ্যার জটিল হিসাব না করেই সহজে গ্রহের দূরত্ব ও সময়ের সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারতেন।
মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য কেপলার ১৬২৭ সালে একটি সারণী প্রকাশ করেন যেটি ছিল ভীষণ দুর্বোধ্য এবং ত্রুটিপূর্ণ । পরবর্তী ২৩ বছর মারিয়া তত্ত্ব ও সারণীর উপর কাজ করে সেই সারণীর ভুল সংশোধন করে দেন এবং সহজবোধ্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলেন । ১৬৫০ সালে তিনি প্রকাশ করেন ইউরেনিয়া প্রোপিতিয়া যেটি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বই ।
মারিয়া কুনিৎজ কখনও আত্মপ্রচারে অংশ নেন নি । একজন শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন যে জ্যোতির্বিজ্ঞান আসলে খ্যাতির জন্য না বরং পৃথিবীর জন্য নক্ষত্রের ভাষা সহজ করে দেওয়া।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
লেখনীতে: মাহিয়া মৃত্তিকা, টিম অঙ্ক
ডিজাইনার: কে এম তামিম, টিম অঙ্ক
07/06/2026
হ্যালো প্রোগ্রামার বন্ধুরা!
চলে এলাম কোডাঙ্কের ৭ম পর্ব নিয়ে! আজকে একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলবো। সেটা বলতে গিয়েই হয়ে যাবে সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে কিছু আলাপ। আজকের আলোচনার শিরোনাম: "প্যাকম্যানের শেষ সীমানা: যখন ৮-বিটের পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল"।
মেলা বা শপিং মলের কোনো এক কোনায় রাখা নিয়ন আলোয় জকমক করা আর্কেড ক্যাবিনেট। স্ক্রিনে হলুদ রঙের একটা হা করা গোলক—প্যাকম্যান। অবিরত ডট খেয়ে চলেছে আর চার রঙের চার ভূতকে ফাঁকি দিয়ে একটার পর একটা লেভেল পার করছে। ১৯৮০-র দশকে এই খেলায় বুঁদ হয়ে ছিল পুরো বিশ্ব। গেমারদের লক্ষ্য ছিল একটাই—সর্বোচ্চ স্কোরের চূড়ায় পৌঁছানো।
কিন্তু ১৯৯৯ সালে রিক ফদারগিল যখন প্যাকম্যানের ২৫৬তম লেভেলে পা রাখলেন, তখন স্ক্রিনে কোনো বিজয়ের বার্তা ভেসে ওঠেনি। কোনো বোনাস পয়েন্ট মেলেনি। তার বদলে যা ঘটেছিল, তা গেমসের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত ট্র্যাজেডি এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের এক ক্লাসিক পাঠ।
স্ক্রিনের বাম অর্ধেকটা ঠিকঠাক থাকলেও, ডান অর্ধেকটা রূপ নিল এক অদ্ভুত হিজিবিরি, অর্থহীন সংখ্যা, অক্ষর আর ভাঙা গ্রাফিক্সে। প্যাকম্যানের চেনা জগৎটা যেন চোখের পলকে একটা ডিজিটাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। গেমারদের কাছে এটি "The Split-Screen Level" বা প্যাকম্যানের ডেথ স্ক্রিন (Death Screen) নামে পরিচিত।
কিন্তু কেন ঘটেছিল এমন বিপর্যয়? কোনো ভাইরাস? নাকি গেমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অভিশাপ? না, এর পেছনে ছিল কম্পিউটারের একদম মৌলিক সংখ্যা পদ্ধতির এক অমোঘ সীমাবদ্ধতা—যাকে আমরা বলি 'ইন্টিজার ওভারফ্লো' (Integer Overflow)।
শূন্য আর একের জাদুকরী ভাষা: বিট ও বাইট
আমাদের চেনা জগৎ ১০-ভিত্তিক বা ডেসিমাল সংখ্যা পদ্ধতিতে চলে। কারণ খুব সহজ—আমাদের হাতে ১০টি আঙুল আছে। আমরা ০ থেকে ৯ পর্যন্ত গুনে ১০-এ গিয়ে আবার নতুন ঘর শুরু করি। কিন্তু কম্পিউটারের তো আঙুল নেই, তার আছে কোটি কোটি ইলেকট্রনিক সুইচ বা ট্রানজিস্টর। এই সুইচ হয় অন (On) থাকতে পারে, না হয় অফ (Off)।
এই অন এবং অফ-কে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করা হয় ১ এবং ০ দিয়ে। এই একেকটি ১ বা ০-কে বলা হয় একটি বিট (Bit - Binary Digit)। এটিই কম্পিউটারের স্মৃতির ক্ষুদ্রতম একক।
এখন একটা মাত্র বিট দিয়ে কেবল দুটি অবস্থা বোঝানো সম্ভব (০ অথবা ১)। কিন্তু আমাদের তো আরও বড় সংখ্যা দরকার। তাই কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা বিটগুলোকে দলবদ্ধ করলেন। এমন ৮টি বিট মিলে তৈরি হয় একটি বাইট (Byte)।
৮-বিটের পৃথিবী এবং ২৫৫-র দেয়াল
প্যাকম্যান গেমটি যখন তৈরি করা হয়েছিল, তখন কম্পিউটারের মেমোরি বা র্যাম ছিল অত্যন্ত সীমিত। সাশ্রয় করার জন্য প্যাকম্যানের জাপানি প্রোগ্রামার তোশিকাজু ইওয়াতানি গেমের লেভেল বা স্তর গণনার জন্য মাত্র ১ বাইট (৮ বিট) মেমোরি বরাদ্দ করেছিলেন।
একটি ৮-বিটের ঘরে আমরা সর্বোচ্চ কত বড় সংখ্যা রাখতে পারি? চলুন একটু বাইনারি হিসেব দেখা যাক:
-> সবচেয়ে ছোট সংখ্যা: 00000000 (দশমিকে ০)
-> সবচেয়ে বড় সংখ্যা: 11111111 (দশমিকে ২^৮ - ১ = ২৫৫)
তার মানে, প্যাকম্যানের সেই ৮-বিটের কাউন্টারটি ১, ২, ৩ করে করে সর্বোচ্চ ২৫৫ পর্যন্ত গুনতে পারতো। ২৫৫ নম্বর লেভেল পর্যন্ত গেমের ভেতরের কোড একদম নিখুঁতভাবে কাজ করেছিল। সমস্যাটা বাঁধল ঠিক তার পরের লেভেলে।
যখন ১ যোগ ১ সমান শূন্য হয়ে যায়!
২৫৫ নম্বর লেভেল শেষ করার পর, গেমের কোড যখন লেভেল কাউন্টারে আরও ১ যোগ করতে চাইল (অর্থাৎ ২৫৫ + ১ = ২৫৬), তখন কম্পিউটারের সেই ক্ষুদ্র ৮-বিটের ঘরটিতে এক মহাবিপর্যয় ঘটে গেল।
বাইনারিতে 11111111 (২৫৫)-এর সাথে ১ যোগ করলে যোগফল হয় 100000000 (৯টি বিট)। কিন্তু প্যাকম্যানের মেমোরি তো মাত্র ৮টি বিট ধরে রাখতে পারে! ফলে একদম বামের নবম বিটটি (১) জায়গা না পেয়ে হাওয়া হয়ে যায় (যাকে বলে ওভারফ্লো)। কম্পিউটারের কাছে পড়ে থাকে কেবল পরের আটটি শূন্য: 00000000।
গেমের প্রসেসর ২৫৬ নম্বর লেভেলে এসে হিসাব করে দেখল সে দাঁড়িয়ে আছে ০ নম্বর লেভেলে!
এখন, প্যাকম্যান গেমের একটি নিয়ম ছিল—প্রতিটি লেভেল শুরু হওয়ার সময় স্ক্রিনের নিচে ডান কোণায় ফলমূলের (Fruits) ছবি দিয়ে বোঝানো হতো প্লেয়ার কোন লেভেলে আছেন। গেমের প্রোগ্রাম কোডে লেখা ছিল: "লেভেলের সংখ্যা যত, ততটি ফলের ছবি আঁকো।" কিন্তু এবার প্রোগ্রাম দেখলো লেভেলের মান হয়ে গেছে ০। গেমের একটি সাব-রুটিন তখন উল্টো হিসাব করা শুরু করল। সে শূন্য থেকে ১ বিয়োগ করতে গিয়ে (বাইট আন্ডারফ্লোর কারণে) পেয়ে বসল ২৫৬! গেমটি তখন স্ক্রিনে ২৫৬টি ফলের ছবি আঁকার এক অসম্ভব চেষ্টা শুরু করে দিল।
যেহেতু স্ক্রিনে মাত্র ৭টি ফল আঁকার জায়গা ছিল, কোডটি মেমোরির অন্য অংশ থেকে (যেখানে গেমের গ্রাফিক্স ও ম্যাপের ডেটা সংরক্ষিত ছিল) এলোমেলো ডেটা টেনে এনে স্ক্রিনে বসাতে শুরু করল। ফলস্বরূপ, স্ক্রিনের ডানদিকের চেনা গোলকধাঁধা বদলে গিয়ে তৈরি হলো সেই কুখ্যাত, ভাঙা, যান্ত্রিক হিজিবিরি স্ক্রিন। ২৫৬তম লেভেলটি আর জেতা সম্ভব হলো না, কারণ সেখানে খাওয়ার মতো যথেষ্ট ডট-ই অবশিষ্ট ছিল না।
এই ভাঙা স্ক্রিন আমাদের কী শেখায়?
প্যাকম্যানের এই ২৫৬ লেভেলের গ্লিচটি কেবল একটি গেমের সীমাবদ্ধতা নয়, এটি মানব সভ্যতার ডিজিটাল কাঠামোর এক প্রতীকী রূপক।
আজ আমরা ৬৪-বিটের আধুনিক কম্পিউটিংয়ের যুগে বাস করি। যেখানে সর্বোচ্চ সংখ্যাটি হলো ২^{৬৪} - ১, যা প্রায় ১৮ কুইন্টিলিয়ন (১৮-র পরে ১৮টি শূন্য!)। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই সীমা অতিক্রম করা অসম্ভব। কিন্তু মানুষের তৈরি প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, তার একটা শেষ সীমানা বা 'সীাবদ্ধতার দেয়াল' থাকবেই।
২০০০ সালের বহুল আলোচিত Y2K বাগ (যেখানে বছর গণনার জন্য মাত্র দুটি ডিজিট ব্যবহার করায় বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল) কিংবা ২০৩৮ সালের ১৯ জানুয়ারি যা ঘটতে যাচ্ছে (যখন ৩২-বিটের টাইম-স্ট্যাম্প ওভারফ্লো করবে), এই সবকিছুর মূলেই রয়েছে বিট আর বাইটের এই চিরন্তন হিসাব।
প্যাকম্যানের সেই ভাঙা স্ক্রিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কম্পিউটার যতই বুদ্ধিমান বা অতিমানবীয় মনে হোক না কেন, দিনশেষে সে তার নিজের তৈরি গাণিতিক খাঁচার ভেতরেই বন্দি এক সত্তা। আর সেই খাঁচার কোড যদি এক চুলও ভুল করে, তবে চেনা মহাবিশ্ব চোখের পলকে এমন এক অর্থহীন ডিজিটাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে বাধ্য!
দেখা হচ্ছে পরবর্তী পর্বে...
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
লেখনীতে: আহসান হারিস আহমেদ, টিম অঙ্ক
ডিজাইনার: আহসান ইভান, টিম অঙ্ক
06/06/2026
অঙ্কমাত: পর্ব ১৮
সাদার মাত্র ২ চালেই কবজা করা সম্ভব কালোর রাজাকে। কিন্তু কীভাবে? সমাধান করে দ্রুত জানিয়ে দিন কমেন্ট সেকশনে। আর সঠিক উত্তর জানতে চোখ রাখুন আগামী শনিবার ঠিক সন্ধ্যা ৭টায়।
গত পর্বের সমাধান:
White Queen to e6.
Black King to h7/h8.
White rook to h1.
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
প্রস্তাবনায়: দেবাংশু মৈত্র, টিম অঙ্ক
ডিজাইনার: আহসান ইভান, টিম অঙ্ক
02/06/2026
Wishing a very happy birthday to our Senior Advisor, Sakal Roy! Thank you for anchoring our team and driving us toward success every single day. Cheers to a great celebration and a better year ahead ❤️
02/06/2026
শুভ সন্ধ্যা পাঠকগণ!
ক্রনিকলস সিজন ৩ -এর পঞ্চম পর্বে সবাইকে জানাই স্বাগত! আজকের আর্টিকেলের শিরোনাম: "টাইম ডাইলেশন"।
চলো একটা মজার বিষয় কল্পনা করি,
তুমি এবং তোমার বন্ধু স্পেসশিপে করে দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে যাচ্ছো, তাও আবার আলোর গতিতে! তোমাদের জীবনযাপন স্বাভাবিকই চলছে। কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে আসার পরে ঘটে গেল দারুণ একটি চমক! সেটা কী?
পৃথিবীর মানুষ এখন তোমাদেরকে অস্বাভাবিক ভাবছে। অবশ্যই প্রশ্ন আসে কেন? কারণ তাদের সাপেক্ষে তোমাদের বয়স বৃদ্ধি পেয়েছে অত্যন্ত ধীরে ধীরে… কিন্তু কেন এমনটা হলো? এর পিছনে লুকিয়ে আছে টাইম ডাইলেশন নামক এক অদ্ভুত বিষয়।
এখন এই টাইম ডাইলেশনটা আসলে কী? চলো এর আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক।
টাইম ডাইলেশন হলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা মূলত "Theory of Relativity" থেকে এসেছে। সহজভাবে বললে, সময় সবার জন্য একই গতিতে চলে না। এটি নির্ভর করে তুমি কত দ্রুত চলছো বা কত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছো।
আমরা সাধারণত মনে করি সময় একটি স্থির নদীর মতো, যা সবার জন্য একই গতিতে বয়ে যায়। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আমাদের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। বাস্তবে সময় এবং স্থান একে অপরের সাথে সম্পর্কিত তারা একসাথে মিলে তৈরি করে "স্পেস-টাইম" নামক একটি চার মাত্রার কাঠামো। এই কাঠামোটি বাঁকতে পারে, প্রসারিত হতে পারে, এবং সংকুচিত হতে পারে আর এই পরিবর্তনের ফলেই ঘটে টাইম ডাইলেশন।
তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আইনস্টাইন বলেছিলেন, কোনো বস্তু যদি আলোর গতির কাছাকাছি চলে, তাহলে সেই বস্তুর জন্য সময় ধীরে চলে স্থির পর্যবেক্ষকের তুলনায়। অর্থাৎ তুমি যদি খুব দ্রুতগতির স্পেসশিপে থাকো, তাহলে তোমার ঘড়িতে কম সময় যাবে কিন্তু পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় কেটে যাবে।
গাণিতিকভাবে এটি প্রকাশ করা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর (γ) দিয়ে। গতি যত বাড়ে, সময় তত ধীর হয়। আলোর গতির ৯০% বেগে চললে পৃথিবীর তুলনায় সময় প্রায় অর্ধেকেরও কম গতিতে চলে। আলোর গতির ৯৯.৯৯% বেগে চললে সময়ের পার্থক্য হয় প্রায় ৭০ গুণ!
বিষয়টি শুনে অবাক লাগছে না? সাইন্স ফিকশনের মতো মনে হলেও এটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত। এমনকি GPS স্যাটেলাইটের ঘড়ি ঠিক রাখতে গেলেও এই প্রভাব হিসাব করতে হয়।
সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, যেখানে মহাকর্ষীয় বল বেশি, সেখানে সময় ধীরে চলে। ধরো তুমি একটি ব্ল্যাক হোলের কাছে চলে গেলে সেখানে মহাকর্ষ এত শক্তিশালী যে সময় প্রায় থেমে যাওয়ার মতো আচরণ করে। দূরে থাকা একজন পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হবে তুমি যেন স্থির হয়ে গেছো!
এই প্রভাব পৃথিবীতেও অল্প পরিমাণে দেখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় থাকা ঘড়ি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা ঘড়ি একই গতিতে চলে না। পাহাড়ের চূড়ায় মহাকর্ষ তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানকার ঘড়ি সামান্য দ্রুত চলে। পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ড কিন্তু অত্যাধুনিক পারমাণবিক ঘড়ি দিয়ে এটি পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।
এর একটি চমকপ্রদ উদাহরণ হলো নিউট্রন তারা। নিউট্রন তারার পৃষ্ঠে মহাকর্ষীয় বল এত তীব্র যে সেখানে প্রতি ঘণ্টা পৃথিবীর তুলনায় কয়েক মিনিট ধীর গতিতে চলে। ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের কাছে এই প্রভাব আরও চরম সেখানে সময় কার্যত থেমে যায়।
এবার চলো কিছু বাস্তব জীবনের উদাহরণ দেখা যাক —
GPS স্যাটেলাইট সিস্টেমঃ
পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা GPS স্যাটেলাইটগুলো প্রায় ১৪,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে চলে। এই গতির কারণে স্যাটেলাইটের ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭ মাইক্রোসেকেন্ড পিছিয়ে পড়ে (গতির কারণে)। আবার পৃথিবীর তুলনায় কম মহাকর্ষে থাকায় স্যাটেলাইটের ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ মাইক্রো সেকেন্ডের পার্থক্য তৈরি হয়।
যদি এই পার্থক্য হিসাব করে ঘড়ি ঠিক না করা হতো, তাহলে প্রতিদিন GPS-এর অবস্থান নির্ণয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভুল হতো! অর্থাৎ তোমার মোবাইলের ম্যাপ অ্যাপ যে নির্ভুলভাবে তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, তার পেছনে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে।
হ্যাফেলে-কিটিং পরীক্ষাঃ
১৯৭১ সালে পদার্থবিদ জোসেফ হ্যাফেলে এবং রিচার্ড কিটিং একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা করেন। তারা অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি নিয়ে বিমানে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল, বিমানের ঘড়ি এবং পৃথিবীতে রাখা ঘড়ির মধ্যে সময়ের পার্থক্য তৈরি হয়েছে এবং সেটা ঠিক আইনস্টাইনের হিসাবের সাথে মিলে গেছে। এই পরীক্ষা টাইম ডাইলেশনকে প্রথমবারের মতো সরাসরি পরিমাপ করে প্রমাণ করে।
মিউয়ন কণার গল্পঃ
মহাজাগতিক রশ্মি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন উপরের স্তরে মিউয়ন নামক উপপারমাণবিক কণা তৈরি হয়। এই কণাগুলো খুবই অস্থিতিশীল মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড স্থায়ী হওয়ার কথা। স্বাভাবিক হিসাবে এদের পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানোর কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে মিউয়নগুলো পৃথিবীতে পৌঁছায়! কারণ তারা আলোর গতির প্রায় ৯৯.৭% বেগে চলে ফলে টাইম ডাইলেশনের কারণে তাদের নিজস্ব সময় পৃথিবীর তুলনায় অনেক ধীরে কাটে, এবং তারা পৃষ্ঠে পৌঁছানোর সময় পায়।
ধরা যাক, দুইজন জমজ ভাই আছে। একজন পৃথিবীতে রয়ে গেলো, আর অন্যজন স্পেসশিপে করে খুব দ্রুতগতিতে ভ্রমণ করে ফিরে এলো। তখন দেখা যাবে, ভ্রমণ করে আসা ভাইটির বয়স কম হয়েছে! অর্থাৎ তার জন্য সময় কম কেটেছে। এটি টাইম ডাইলেশনের বাস্তব ফলাফল।
উদাহরণস্বরূপ, ধরো স্পেসশিপটি আলোর গতির ৯৯% বেগে ভ্রমণ করে। স্পেসশিপে থাকা ভাই অনুভব করবে ১০ বছর কেটেছে। কিন্তু পৃথিবীতে থাকা ভাইয়ের বয়স বেড়ে যাবে প্রায় ৭১ বছর! ফিরে আসার পর স্পেসশিপের ভাই দেখবে তার ভাই অনেক বুড়ো হয়ে গেছে কিন্তু সে নিজে এখনো তরুণ।
এটাকে "প্যারাডক্স" বলার কারণ হলো প্রথমে মনে হয় উভয়েই একে অপরকে "স্লো" দেখবে, তাহলে ফিরে আসলে কার বয়স কম হবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ত্বরণে (acceleration)। স্পেসশিপটিকে ঘুরে আসতে হয়েছে, তাই সে ত্বরণ অনুভব করেছে এবং এই অসামঞ্জস্যতার কারণেই স্পেসশিপের ভাইয়ের বয়স কম হয়।
২০১৪ সালের বিখ্যাত সিনেমা "Interstellar" -এ টাইম ডাইলেশনের একটি অসাধারণ দৃশ্য দেখানো হয়। নভোচারীরা "গারগান্টুয়া" নামক একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলের কাছের গ্রহে নামেন। সেই গ্রহে মাত্র ১ ঘণ্টা কাটান, কিন্তু পৃথিবীতে এই সময়ে কেটে যায় ৭ বছর! পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান পদার্থবিদ কিপ থর্নের পরামর্শে এই দৃশ্য তৈরি করেছিলেন এবং পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে এটি অনেকটাই সঠিক।
আসলে আমাদের আশেপাশেও প্রতিনিয়ত টাইম ডাইলেশন ঘটে চলেছে কিন্তু আমরা সেটা অনুভব করতে পারি না। তার কারণ আমাদের গতি আলোর গতির তুলনায় অত্যন্ত কম এবং আমরা যে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে বাস করি তার তীব্রতাও ব্ল্যাক হোলের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। একটি দ্রুতগামী বিমানেও টাইম ডাইলেশন ঘটে, কিন্তু সেটা এতই সামান্য যে মানুষের অনুভূতিতে ধরা পড়ে না।
তবে টেকনোলজিতে এর প্রভাব অনেক বড়। যদি GPS সিস্টেমে টাইম ডাইলেশন ধরা না হতো, তাহলে প্রতিদিন অবস্থান নির্ণয়ে বড় ধরনের ভুল হতো। ভবিষ্যতে যদি মানুষ আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশ ভ্রমণ করতে পারে, তখন টাইম ডাইলেশন হয়ে উঠবে একটি অতি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভাবো, ভবিষ্যতের কোনো মহাকাশচারী হয়তো মাত্র ৫ বছর মহাকাশে কাটিয়ে ফিরে এসে দেখবে পৃথিবীতে ৫০ বছর কেটে গেছে। তার পরিবার, বন্ধু সবকিছু পালটে গেছে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া কতটা কঠিন হবে, ভাবতেই অবাক লাগে! তাই না?
টাইম ডাইলেশন মূলত ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেলকে সম্ভব করে, তবে তাত্ত্বিকভাবে। তুমি যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করো, তাহলে ফিরে এলে পৃথিবীতে তোমার চেয়ে বেশি সময় কেটে যাবে। অর্থাৎ এক অর্থে তুমি ভবিষ্যতে পৌঁছে যাবে।
তবে অতীতে ফেরা সম্ভব কিনা, সেটা এখনো পদার্থবিজ্ঞানে একটি খোলা প্রশ্ন। বর্তমান তত্ত্ব অনুযায়ী অতীতে ফেরা সম্ভব নয় কারণ তাতে "Cause and Effect" সম্পর্ক ভেঙে যায়, যা প্রকৃতির মূল নিয়মের বিরুদ্ধে।
তবে আশার কথা হলো পদার্থবিজ্ঞানীরা এখনো ওয়ার্মহোল এবং অন্যান্য তাত্ত্বিক সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন। মহাবিশ্বে হয়তো এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে যা এখনো আমাদের অজানা।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সময় সম্পর্কে আমরা সাধারণত যা ভাবি, টাইম ডাইলেশন সেই ধারণাকেই পাল্টে দেয়। আমরা ভাবি সময় স্থির, যা সবার জন্য একই। কিন্তু বাস্তবে মোটেই তা নয়, সময় আপেক্ষিক। তুমি কোথায় আছো এবং কী গতিতে চলছো, তার ওপর নির্ভর করে সময় তোমার ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে আচরণ করে।
টাইম ডাইলেশন শুধু একটি সায়েন্টিফিক কনসেপ্টই নয়, বরং এটি আমাদের মহাবিশ্বের রহস্য সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে শিখায়। মহাবিশ্ব আসলে আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর। সেটার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো টাইম ডাইলেশন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
লেখনীতে: মো: সাকিবুল সহন, টিম অঙ্ক
ডিজাইনার: আহসান ইভান, টিম অঙ্ক
27/05/2026
তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম! 🌙
ত্যাগের আনন্দে মুছে যাক আমাদের জীবনের সকল দুঃখ ও বেদনা। কবুল হোক প্রত্যেকের কোরবানি এবং ইবাদত। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আযহার অনেক অনেক শুভেচ্ছা! ❤️