12/11/2025
কবিতা নারীর মত। উপযুক্ত অলংকার তার সৌন্দর্য বাড়ায়। আমরা এতদিন ছন্দ, অন্ত্যমিল ইত্যাদি সম্পর্কে জেনেছি- এগুলোই কবিতার অলংকার। এগুলো ছাড়া আরও বেশ কিছু অলংকার আছে।
আজ শেষ পর্বে আলোচনা করবো কবিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু অলংকার নিয়ে..
১. অনুপ্রাস
একই ধ্বনি বারবার ব্যবহারে যে শ্রুতিমাধুর্য্য সৃষ্টি হয়, তার নাম অনুপ্রাস।
অনুপ্রাস বিভিন্নরকম হতে পারে। এসম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য জাগরনে প্রকাশিত তাজরিয়ান আলম আয়াজের 'কবর-বন্দির জবানবন্দি' কবিতাটিই যথেষ্ট। আসুন কবিতাটি শুরু থেকে দেখি:
"ধূমায়িত জুলমাত -
এই ঘোর সিয়া হার মানিয়েছে নিঝুম-নিশুতি রাত!"
বাক্যেদ্বয়ের শেষে অনুপ্রাস (মাত~রাত) বিদ্যমান, যাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। এর আরেক নাম অন্ত্যমিল, যা নিয়ে আগের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
কবিতাটি পড়তে পড়তে একপর্যায়ে আমরা বাক্যের মাঝখানেও অনুপ্রাস দেখতে পাই:
"আলিশান ভোজ, রাত্তিরে রোজ; অসীম মুসাররাত,
হাসি আর গানে, খুব কলতানে তুরন্ত্ কেটেছে রাত।"
এখানে বাক্যের মাঝখানেও অনুপ্রাস (ভোজ~রোজ, গানে~তানে) আছে, এর নাম মধ্যানুপ্রাস। আরও কিছুদূর পড়ার পর আমরা দেখি- দুটি বাক্যের শুরুর শব্দগুলোতেও অনুপ্রাস রয়েছে:
"সময়ের প্রতিশোধ -
কবরের বুকে কী জানি কী হবে জাগেনি কেন সে বোধ!"
এই যে- প্রথম শব্দগুলোর মিল (সময়ের~কবরের), এটাকে আদ্যানুপ্রাস বলে। কবিতাটির পরের দুটি বাক্যে আবার এক ভিন্নরকম অনুপ্রাস বিদ্যমান:
"চারিদিকে ছিল দুনিয়াবি জোশ, আহ্লাদী ওঙ্কার,
হুঁশ ফিরিয়েছে আজরাইলের সংহারী হুংকার।"
লক্ষ্য করুন: ওঙ্কার, সংহারী, হুংকার.. শব্দগুলোতে '-ং' ধ্বনি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, শুনতে ভালো লাগছে।
একই ধ্বনির এরূপ আবর্তনকে সরল অনুপ্রাস বা বৃত্ত্যনুপ্রাস বলে। বিভিন্ন শব্দের শুরুতেও একই ধ্বনি আসতে পারে। যেমন কবিতাটির শেষদিকে দুটি বাক্য:
"জানতে যদি যা জানি!
জিঞ্জিরে বেঁধে রাখতে নিজের কলুষ-হৃদয়খানি!"
এখানে ব্যবহৃত: জানতে, যদি, যা, জানি, জিঞ্জিরে.. শব্দগুলোর শুরুতে 'জ/য' ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। এটাও সরল অনুপ্রাস বা বৃত্ত্যনুপ্রাস।
মোটামুটিভাবে এই হচ্ছে অনুপ্রাসের আদ্যোপান্ত।
২. উপমা
উপমা হল সাদৃশ্য বা তুলনা। কোন কিছুর তুলনা দিয়ে অন্য কিছুকে ব্যাখ্যা করার নাম উপমা। যেমন:
"আতশবাজির মতো যখন
ঝরলো বোমা আকাশ থেকে,
তখন তুমি হাসতে ছিলে
আড়াল থেকে মুখটি ঢেকে!"
(আর্তনাদ: মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ১/২/২১)
এখানে বোমার আধিক্য বোঝাতে আতশবাজির উপমা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বাক্যের 'মতো' শব্দটা দিয়ে আতশবাজি ও বোমার মধ্যে একটা ভাবগত সংযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
তুলনার ক্ষেত্রে আরও কিছু সংযোজক শব্দ (ন্যায়/সম/যেন/যেমন) ব্যবহার করা হয়। আসুন, জাগরণ থেকে এরকম কিছু উদাহরণ দেখি:
"দানবের ন্যায় মরণ সাজে ফিসফিসে বলে, 'থাম্!
ফিরিয়ে দে সব নিযুত সুখের ভুলে যাওয়ার দাম'.."
(ভুলের মাশুল: জান্নাত মিম, ৩১/১/২১)
মৃত্যুর ভয়াবহতাকে দানবের উপমা দিতে এখানে 'ন্যায়' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
"জাহান্নামের আতশী-রূপে কি হব পুড়ে ছারখার?
রক্ত ঝরাবে পুলসিরাতের তরবারি-সম ধার?"
(কবর-বন্দির জবানবন্দি: তাজরিয়ান আলম আয়াজ, ২৬/৬/২০)
কঠিন পুলসিরাতকে তরবারির ধারের সাথে তুলনা করতে দ্বিতীয় বাক্যে সংযোজক শব্দ হিসেবে 'সম' ব্যবহৃত হয়েছে।
"জীবন তো নয় এ যেন
ইকামতের খানিকটা সময়.."
(জীবন তো নয় এ যেন ইকামতের সময়: রাবেয়া আক্তার রুবি, ১৬/১২/২০)
এখানে 'যেন' শব্দটি দিয়ে ক্ষনস্থায়ী জীবনকে ইকামতের স্বল্প সময়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। একই বিষয়কে বরফ গলার সাথে তুলনা দিতে গিয়ে আরেকটি কবিতায় সংযোজক হিসেবে 'যেমন' শব্দটা এসেছে:
"জীবনতো ভাই এক পলকের খেলা
টুকরো বরফ হচ্ছে যেমন ক্ষয়।"
(তোমরা দু-জন: হান্না রাহমান, ১৩/০২/২১)
তবে উপমা দিতে গিয়ে সংযোজক ব্যবহার করতেই হবে, এমনটা নয়। কখনো কখনো এরকম শব্দ ব্যবহার না করেও সুন্দর উপমা দেওয়া যায়:
"নবীর শানের আতর মেখে
জীবন টাকে গড়ো"
(নবীর শানে পড়ো: রাবেয়া আক্তার রুবি, ২১/১/২১)
এখানে 'নবীর শান' বোঝাতে আতরের উপমা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার আগে-পরে 'মত/ন্যায়/সম/যেন/যেমন..' এ জাতীয় কোন শব্দ লাগে নি।
৩. চিত্রকল্প
কবিতায় চিত্রের সাথে কল্পনা যোগ করাকে চিত্রকল্প বলে।
চিত্রকল্প কবিতার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটাকে রূপকল্প বা বাকপ্রতিমা নামেও ডাকা হয়। জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ..সহ অনেক আধুনিক কবির মতে- 'চিত্রকল্পই কবিতা'।
চিত্রকল্প নিয়ে বিভিন্নজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, একাডেমিক আলোচনা করেছেন। কিন্তু নতুনদের কাছে তা দুর্বোধ্য ঠেকবে। তাই আমি এই স্বল্প পরিসরে সহজে চিত্রকল্প বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করব।
চিত্রকল্পের শর্ত মূলত দুটি: চিত্র এবং কল্প..
প্রথমত, পড়ার সাথে সাথে পাঠকের মনে একটা সুন্দর চিত্র ফুটে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, চিত্রটার সাথে কল্পনায় অন্য একটা চিত্র বা ভাবনা এসে যুক্ত হবে।
কঠিন মনে হচ্ছে? আসুন, সহজ কিছু উদাহরণ দেখি:
'নতুন পথিক' কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যখন বলেন: "খেলার সুখে মাখলি তোরা মাটির করুণা.." তখন একটা চিত্র ফুটে ওঠে যে- বালকেরা মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে খেলছে। এর বাইরে আর কোন ভাবনা আমাদের মনে উকি দেয় না। তাই এটা শুধুই একটি চিত্র। চিত্রকল্প নয়।
কিন্তু একই কবি যখন গানের মধ্যে বলেন: "খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে.." আমাদের মনের পর্দায় প্রথমত ভেসে ওঠে এক চিত্র- একটি শিশু কিছু মার্বেল নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে আপন মনে খেলছে।
পরক্ষনেই মার্বেলগুলো হয়ে যায় গ্রহ-নক্ষত্র। আর শিশুটি হয়ে যায় সর্বশক্তিমান রব্ব, যিনি অদৃশ্য হাতে চালিত করছেন এই সৃষ্টিজগৎ। দারুণ না! (দেহত্ববাদ নিয়ে বিতর্ক আপাতত বাদ রাখি)
জ্বী, এই যে চিত্রের সাথে এক মহাজাগতিক কল্পনা এসে জুড়ে গেছে- এটাই চিত্রকল্প। এরকম হুবুহু আরেকটা চিত্রকল্প আছে নজরুলের 'জিজ্ঞাসা' কবিতায়:
আকাশের প্যাটরাতে কে
এত সব খেলনা রেখে
খেলে ভাই আড়াল থেকে..
এবার জাগরন থেকে চিত্রকল্পের একটা উদাহরণ দেখি:
মাতৃভূমির মানচিত্রে নখ বসিয়েছে শকুন..
(ফিলিস্তিনীর আত্মকথা: ইমতিয়াজ বোরহান, ১১/২/২১)
পড়ার সাথে সাথে প্রথমেই ভেসে উঠে একটা শকুনের দৃশ্য, যা আকাশ থেকে নিচে নেমে আসছে। তার নখ খামচে ধরতে চায় একটি মানচিত্র, একটি দেশ।
সাথে সাথেই আমরা বুঝতে পারি, এই শকুন আসলে দখলদার বাহিনীর প্রতিচ্ছবি। এই যে- একটা চিত্রের সাথে অন্য একটা কল্পনার সংযোগ, এটাই চিত্রকল্প।
৪. যমক
বাক্যে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে কয়েকবার ব্যবহৃত হলে তাকে যমক বলে৷
একসময় কোন এক কবিতায় আমি লিখেছিলাম- "তোমার নামে বৃষ্টি নামে"। এখানে 'নামে' শব্দটা ভিন্ন ভিন্ন অর্থে দু'বার এসেছে..
তোমার নামে: এখানে 'নামে' অর্থ সম্বোধন (name)।
বৃষ্টি নামে: এখানে 'নামে' অর্থ পতন (falling)।
এবার কাজী নজরুলের একটি বিখ্যাত কাব্য থেকে এর উদাহরণ দেখি:
ওরে ও তরুন ঈশান, বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি..
এখানে 'প্রাচীর' শব্দটি যমক। তা পরপর দু'বার ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ: প্রাচী’র (প্রাচ্যের) প্রাচীর (দেয়াল)।
৫. শ্লেষ
কোন শব্দ একই সাথে একাধিক অর্থ ধারণ করলে তাকে শ্লেষ বলে।
শ্লেষের সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ: "করোনায় সব ব্যবসা ধ্বসে গেলেও মাস্কের ব্যবসা ছিলো জমজমাট"।
বাক্যটিতে 'মাস্ক' শব্দটা একটা শ্লেষ, এর দুটি অর্থ হয়:
প্রথমত: 'মাস্ক' বলতে মুখে ব্যবহৃত কাপড়ের আস্তরণ বোঝায়, করোনাতে প্রচুর মাস্ক বিক্রি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত: 'মাস্ক' বলতে বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ইলন মাস্ককে বোঝানো হয়েছে, যিনি সম্প্রতি বিল গেটসকে টপকে বিশ্বের ২য় শীর্ষ ধনী হয়েছেন।
এখানে দুটি অর্থই কিন্তু প্রাসঙ্গিক। অনুরূপ কবিতায় শ্লেষ অলংকারের একটি বিখ্যাত উদাহরণ হল:
মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি,
রয়েছে সোনার শত ছেলে..
(আমার কৈফিয়ৎ: নজরুল)
এখানে 'রবি' শব্দটা দ্বারা সূর্য এবং রবীন্দ্রনাথ.. উভয়কে বোঝানো হয়েছে।
________________
☞ শেষের কিছু কথাঃ 'কবিতার কলকব্জা' সিরিজটা শুরু করেছিলাম আকস্মিকভাবে, কোনোরকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। উদ্দেশ্য ছিলো মূলত দুটো- যারা কবিতার কৌশল শিখতে আগ্রহী, তাদের কিছু বেসিক বিষয়ে ধারণা দেওয়া।
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো- পাঠক যাতে কবিতার ভালোমন্দ সহজে চিনতে পারে। দেখা যায়, অনলাইনে অনেক ভালো কবিতাই আন্ডার-রেটেড থাকে, দুর্বল কবিতা হয় ওভার-রেটেড। এর ফলে দক্ষ কবিরা হতাশায় ভোগেন, লেখার উদ্যম হারিয়ে ফেলেন। আর অদক্ষ কবিরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, পড়ার ও নিজেকে গড়ার উদ্যম হারিয়ে ফেলেন।
কবিতার বিষয় কী হবে.. আকৃতি-প্রকৃতি কেমন হবে.. এসব নিয়েও কিছু লিখার দরকার ছিল। কিন্তু সিরিজটি ছোট রাখার জন্য আপাতত এখানেই শেষ করছি।
আপনি যদি সৌখিন কবি হয়ে থাকেন, এটুকুই যথেষ্ট। তবে আপনি যদি সিরিয়াসলি লেখালেখি করতে চান, তাহলে এই সিরিজটি আপনার জন্য রচনার সূচনা মাত্র.. আরও অনেক পথ পারি দিতে হবে বন্ধু, প্রস্তুত আছেন তো?
________________
শেষ পর্ব: কাব্যালংকার
#কবিতার_কলকব্জা
(সমাপ্ত)