Productivity School

Productivity School

Share

স্টাডি টিপস, প্রোডাক্টিভিটি টিপস, ডেইলি রুটিন মেকিং, টাইম ম্যানেজমেন্ট হ্যাকস

22/12/2025

নিজের উপর ইনভেস্ট করবেন যেভাবে!

আমরা প্রায়ই ভাবি ইনভেস্টমেন্ট মানেই টাকা, জমি, ব্যবসা বা সেভিংস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দেয় যে ইনভেস্টমেন্ট, সেটি হলো নিজের ওপর ইনভেস্ট করা। আপনি যতটা নিজের শরীর, মন, দক্ষতা ও সময়ের যত্ন নেবেন; আপনার জীবন ততটাই ব্যালান্সড, শান্ত ও প্রোডাক্টিভ হবে।

চলুন বুঝে নেই নিজের ওপর ইনভেস্ট করা আসলে কীভাবে সম্ভব।

প্রথমেই আসে খাবার।
অর্গানিক বা স্বাস্থ্যকর খাবার কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। আজ আপনি যা খান, সেটাই ভবিষ্যতে আপনার শরীর হয়ে দাঁড়ায়। অল্প টাকা বাঁচাতে অনিয়ন্ত্রিত খাবার খেলে পরে সেই দামটা দিতে হয় শরীর দিয়ে। তাই খাবারে সচেতন হওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

এরপর আছে হবি বা শখ।
শখ মানে সময় নষ্ট নয়। বরং শখ আমাদের মনের অক্সিজেন। কেউ গাছ লাগাতে ভালোবাসেন, কেউ আঁকতে, কেউ পড়তে। নিয়মিত নিজের পছন্দের কাজে সময় দিলে মানসিক ক্লান্তি কমে, জীবনের প্রতি ভালোবাসা বাড়ে।

শরীরচর্চা ও ফিটনেসও নিজের ওপর ইনভেস্টমেন্টের বড় অংশ।
জিম মেম্বারশিপ হোক বা ঘরে ব্যায়াম; শরীর নড়াচড়া না করলে মনও স্থবির হয়ে যায়। নিয়মিত ব্যায়াম শুধু শরীর ঠিক রাখে না, আত্মবিশ্বাস ও ডিসিপ্লিনও তৈরি করে।

অনেকে মনে করেন, বিশ্রাম নেওয়া মানে অলসতা।
এটা বড় ভুল ধারণা। পর্যাপ্ত ডাউনটাইম না থাকলে আপনি কখনোই সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারবেন না। কাজের ফাঁকে থামা, কিছু না করা; এগুলোও দরকার।

নিজেকে এগিয়ে নিতে চাইলে শিক্ষা ও ট্রেনিং খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কোর্স, সার্টিফিকেট, নতুন স্কিল; এসব আপনার ভ্যালু বাড়ায়। আজ আপনি যা শিখছেন, কাল সেটাই আপনার পরিচয় হয়ে উঠবে।

অনেক সময় আমরা শরীরের যত্ন নিই, কিন্তু মনের যত্ন নিতে ভুলে যাই।
থেরাপি বা কাউন্সেলিং মানে আপনি দুর্বল এমন নয়। বরং এটি প্রমাণ করে আপনি নিজের ভেতরের সমস্যাগুলোকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন। মানসিক সুস্থতা ছাড়া কোনো সাফল্যই টেকসই হয় না।

এরপর আসে লক্ষ্য নির্ধারণ।
গোল সেটিং ছাড়া জীবন চলে আন্দাজে। পরিষ্কার লক্ষ্য থাকলে সময়, শক্তি ও সিদ্ধান্ত; সবকিছুই সঠিক জায়গায় যায়। ছোট ছোট লক্ষ্য লিখে রাখাও নিজের ওপর বড় ইনভেস্টমেন্ট।

সবশেষে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ঘুম।
রেস্টফুল স্লিপ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসে না। ভালো ঘুম মানে ভালো মুড, ভালো সিদ্ধান্ত, ভালো জীবন।

সংক্ষেপে বললে,
নিজের ওপর ইনভেস্ট করা মানে একদিনে সব ঠিক করা নয়। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের শরীর, মন, সময় ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া। এই ইনভেস্টমেন্টে কোনো লোকসান নেই; শুধু ধৈর্য আর ধারাবাহিকতা দরকার।

আপনি যতটা নিজের যত্ন নেবেন, জীবন আপনাকে তার চেয়েও বেশি রিটার্ন দেবে।

✒️ হাবিবুন নাহার মিমি

22/12/2025

ঘরটাকে এলোমেলো লাগছে?
জাপানিরা যেভাবে ঘর clutter-free রাখে, সেখান থেকে শিখে নিন কিছু কাজের আইডিয়া।

জাপানিজ হোম অর্গানাইজেশন টিপস:

১️⃣ Vertical চিন্তা করুন:
দেয়াল আর উপরের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করুন। শেলফে হালকা জিনিস রাখলে জায়গা বাঁচে, দেখতেও সুন্দর।

২️⃣ One In, One Out রুল:
নতুন কিছু ঘরে ঢুকলে পুরোনো একটি জিনিস বের করে দিন। না হলে অগোছালো বাড়বেই।

৩️⃣ ফাঁকা জায়গা রাখুন:
সব শেলফে ভর্তি করে জিনিসপত্র রাখবেন না। একটু ফাঁকা জায়গা চোখ ও মন—দুটোকেই শান্ত করে।

4️⃣ Bento Box Method:
ড্রয়ারের ভেতরে ছোট ছোট বক্স ব্যবহার করুন। প্রতিটা জিনিসের আলাদা জায়গা থাকলে খোঁজাখুঁজি কমে।

5️⃣ Fold to See:
কাপড় উল্লম্বভাবে ভাঁজ করুন, যেন সব এক নজরে দেখা যায়। আলমারি থাকবে পরিপাটি।

6️⃣ Hidden Storage ব্যবহার করুন:
বিছানা, বেঞ্চ বা টেবিলের নিচের জায়গা কাজে লাগান—চোখের আড়ালে, কিন্তু দরকারে হাতের কাছে।

7️⃣ Natural Elements যোগ করুন:
কাঠ, বাঁশ বা ছোট গাছ ঘরে এনে দিন—ঘর দেখাবে শান্ত, গুছানো আর প্রাকৃতিক।

8️⃣ সবকিছু Label করুন:
সহজ লেবেল দিলে জিনিস রাখা-নেওয়া দুটোই সহজ হয়, অন্যরাও ঠিক জায়গায় ফেরত রাখতে পারে।

ঘর গুছানো মানে শুধু সৌন্দর্য নয়—
কম বিশৃঙ্খলা = বেশি মানসিক শান্তি

আপনি কোন টিপসটা আজ থেকেই ট্রাই করবেন?

17/12/2025

প্রোডাক্টিভিটি বলতে আসলে কী বোঝায়?

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ বোনেরা! আজ আমরা আলোচনা করব প্রোডাক্টিভিটি সম্পর্কে। জানি, সবারই কম বেশি প্রোডাক্টিভ হওয়ার ইচ্ছে থাকে। কিন্তু কীভাবে প্রোডাক্টিভ হওয়া যায়? প্রোডাক্টিভ ব্যক্তি বলতে আসলে কী বোঝায়?

আমার মতে, প্রোডাক্টিভ ব্যক্তি হলেন সময়ের সেরা ব্যবহার করতে পারেন এমন মানুষ। শুধু ব্যস্ত থাকলেই প্রোডাক্টিভ হওয়া যায় না। প্রোডাক্টিভ হতে হলে নিজের কাজগুলো দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে করতে হবে। ছোট ছোট লক্ষ্যপূরণ করে বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে প্রতিদিন একটু একটু করে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়াই প্রোডাক্টিভিটি।

তবে সত্যি বলতে, প্রোডাক্টিভ হওয়া সবসময় সহজ হয় না। অনেক সময়ই মনে হবে আপনি একাধিক কাজের ভারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে ডিপ্রেশন আসতে পারে।
কিন্তু মনে রাখবেন, সবারই মাঝে মাঝে প্রোডাক্টিভিটি নিয়ে সমস্যা হয়। কখনো কখনো অলসতাও চলে আসে। তাই নিজেকে দোষ দিবেন না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যান।

তাহলে কীভাবে প্রোডাক্টিভ হওয়া যায়? আমার কয়েকটি টিপস আপনার কাজে আসতে পারে:

১। বাস্তবসম্মত গোল সেট করুন:
গোল বা লক্ষ্য ছাড়া কেউ সফল হতে পারে না৷ রচনা লিখতে গিয়ে তো ঠিকই লিখে এসেছেন “লক্ষহীন জীবন মাঝিবিহীন নৌকার মতো”, কিন্তু আসলে আপনার জীবনে কী কোনো লক্ষ্য আছে? লক্ষ্য নির্ধারণের পর তাকে কিছু স্টেপে ভাগ করুন। যেমন আপনি যদি একজন ডাক্তার হতে চান তাহলে প্রথমে এসএসি ও এইচএসসিতে সাইন্স নিন, ভালো ফলাফল করুন, ভর্তি পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি নিন, মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর মন দিয়ে পড়াশোনা করুন ইত্যাদি। প্রতিটাই কিন্তু একেকটা স্টেপ, মূল লক্ষ্য ভালো ডাক্তার হওয়া।

আবার, আমাদের সবার লক্ষ্যই কিন্তু জান্নাতে যাওয়া, সবাই জন্নাতে যেতে চাই। কিন্তু কীভাবে যেতে হবে? কোন কাজটা বেচি জরুরি? কোনটার পর কোনটা করতে হবে? চলুন জান্নাতকে আল্টিমেট গোল হিসেবে ধরে ছোট ছোট গোল সেট করি, তারপর সেগুলো একটার পর একটা অর্জনে লেগে পড়ি। যেমন প্রথমে ফরজ ইলম শিখি, ফরজ আমলে নিয়মিত হই, তারপর নিজের দৈনন্দিন জীবনকে সুন্নাহ দিয়ে সাজাই, নিজেকে ডেভেলপ করি সেভাবে যেভাবে সাহাবা, সালাফরা চলতেন। নিজের সাথে সাথে নিজের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাইকে মোটিভেট করি, দাওয়াহ দিই, শরীয়াহর গন্ডিতে থেকে নিজের দক্ষতা ও দাওয়াহ ছড়িয়ে দিই, আখিরাতের প্রস্তুতি নিই। তবেই না বলতে পারবো যে আমরা আসলেই জান্নাতে যেতে চাই ও তার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছি।
তাই, একসঙ্গে সব কিছু করার চেষ্টা না করে বড় কাজগুলো ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিন।

২। কাজগুলো অগ্রাধিকার অনুযায়ী করুন:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে করুন। এখন প্রয়োজন নেই বা পরে করলেও চলবে এমন কাজ বাদ দিয়ে এই মুহূর্তে কোন কাজটা আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি আগে করুন।

৩। ডিসট্র্যাকশন কমিয়ে আনুন:
আপনাকে আপনার লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে। আপনি যেন ঠিকঠাক পড়াশোনা বা কাজে মনোযগ দিতে না পারেন তাই হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে সোশ্যাল মিডিয়া সাইট, স্পোর্টস আর বিনোদনমাধ্যমগুলো। প্রতিনিয়ত চোখ ধাঁধানো আকর্ষণীয় সব ফিচার নিয়ে একেকটা জিনিস আপনার সামনে হাজির হয়। একবার তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ফেললেই জীবন থেকে মূল্যবান ঘন্টার পর ঘন্টা সময়গুলো কেটে যায়। তাই মোবাইল বন্ধ করুন, ইমেইল বন্ধ করুন এবং শান্ত পরিবেশে কাজ করার চেষ্টা করুন।
ব্রেক নিন: মনে হতে পারে ব্রেক নেওয়া উচিত নয়, অনেক কাজ জমে আছে, কিন্তু আসলে বিরতি নেওয়া আপনাকে ফোকাস করতে সাহায্য করবে। ব্রেক নিন, তারপর নতুন উদ্যমে আবার শুরু করুন।

৪। নিজেকে পুরস্কৃত করুন:
কোনো লক্ষ্য পূরণ করলে নিজেকে পছন্দের কিছু দিয়ে পুরস্কৃত করুন। ডোপামিন নিঃসরণের কারণে এই ছোট ছোট পুরস্কারগুলো আপনার কাজের আগ্রহ, দক্ষতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিবে ইনশাআল্লাহ।

মনে রাখবেন, প্রোডাক্টিভিটি একটি যাত্রা, কোনো গন্তব্য নয়। পথে উত্থান-পতন থাকবে, কিন্তু একটু চেষ্টা করলে আপনি নিজের সময়ের সেরা ব্যবহার করতে পারবেন।
তাহলে আর কী অপেক্ষা? চলুন প্রোডাক্টিভ হওয়ার পথে এগিয়ে যাই!

©️ হাবিবুন নাহার মিমি

17/12/2025

অলসতা আমাদের জাতীয় রোগ, তাইনা?
কিন্তু প্রোডাক্টিভ হতে হলে অলসতাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে সবার আগে। চলুন জেনে নিই কীভাবে এই কাঁঠালের আঠাকে ছাড়ানো যায়😄

16/12/2025

আপনিও কি Exhausted? 😞

16/12/2025

টাকা বাঁচিয়ে কী করতে চান?

15/12/2025

প্রশ্ন: লেখালেখির মাধ্যমে কিভাবে রোজগার করা যায় সেই বিষয় একটু জানালে ভালো হয়।

উত্তর:
লেখালেখির মাধ্যমে রোজগার করতে হলে আগে একটি বাস্তবতা বুঝতে হয়—শুধু সুন্দর ভাষা জানলেই আয় আসে না। যে লেখা মানুষের কোনো প্রয়োজন পূরণ করে, সমস্যার সমাধান দেয় বা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, সেটাই অর্থমূল্য তৈরি করে। তাই লেখালেখিকে শখ নয়, একটি দক্ষতা ও পেশা হিসেবে নিতে হয়।

বর্তমানে লেখালেখি দিয়ে আয়ের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হলো কনটেন্ট রাইটিং। বিভিন্ন ব্যবসা, অনলাইন শপ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা প্রোডাক্টের জন্য নিয়মিত লেখক খোঁজে। এখানে পোস্ট, আর্টিকেল, প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন বা বিজ্ঞাপনী লেখা লিখে আয় করা যায়। লেখার মান ও ফলাফলের উপর ভিত্তি করে প্রতি লেখার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।

ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মেও লেখালেখির বড় বাজার রয়েছে। Fiverr, Upwork বা Freelancer–এ আর্টিকেল রাইটিং, ব্লগ পোস্ট, SEO কনটেন্ট, ইউটিউব স্ক্রিপ্ট বা ইমেইল লেখার কাজ পাওয়া যায়। তবে এখানে প্রতিযোগিতা বেশি, তাই নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে দক্ষতা তৈরি করা এবং ধৈর্য ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।

ব্লগিং লেখালেখির আরেকটি উপায়, যদিও এতে সময় লাগে। নিয়মিত মানসম্মত লেখা প্রকাশ করে পাঠক তৈরি হলে বিজ্ঞাপন, অ্যাফিলিয়েট লিংক বা স্পনসর কনটেন্টের মাধ্যমে আয় সম্ভব। শুরুতে আয় না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী আয়ের পথ খুলে দিতে পারে।

ই–বুক লেখা বর্তমানে তুলনামূলক সহজ একটি উপায়। কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা বা বিষয়ের উপর ছোট আকারের বই লিখে অনলাইনে বিক্রি করা যায়। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই ই–বুক থেকে নিয়মিত আয় করা সম্ভব।

এছাড়া স্ক্রিপ্ট রাইটিং ও ঘোস্টরাইটিংও আয়ের ভালো ক্ষেত্র। ইউটিউব ভিডিও, শর্ট ভিডিও বা বক্তৃতার জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা হয়, যেখানে তুলনামূলক কম লেখায় ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। ঘোস্টরাইটিংয়ে অন্যের নামে লেখা প্রকাশিত হলেও লেখক হিসেবে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে, লেখালেখির মাধ্যমে রোজগার করতে হলে নিয়মিত চর্চা, পাঠকের প্রয়োজন বোঝা এবং ধাপে ধাপে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একদিনে ফল না এলেও ধারাবাহিকভাবে কাজ করলে লেখালেখি একটি বাস্তব ও সম্মানজনক আয়ের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

(ইনবক্স থেকে)

15/12/2025

যেভাবে হবেন প্রোডাক্টিভ হাউজওয়াইফ

একজন নারী যখন গৃহিণী হন, তখন অনেক সময় তাঁর পরিচয় শুধু “সংসারের কাজ”–এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে একজন হাউজওয়াইফ একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সিদ্ধান্ত, সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক স্থিরতা পুরো ঘরের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই প্রোডাক্টিভ হাউজওয়াইফ হওয়া মানে অতিরিক্ত কাজের বোঝা নেওয়া নয়; বরং সচেতনভাবে জীবন ও সংসারকে পরিচালনা করা।

প্রথম ধাপ হলো প্রায়োরিটি ঠিক করা। প্রতিদিনের সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন কাজগুলো না করলে সমস্যা হবে, আর কোন কাজগুলো পরে করলেও চলে—এই পার্থক্য বুঝতে পারাই প্রোডাক্টিভিটির শুরু। সকালে বা আগের রাতে পরদিনের ৩–৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নির্ধারণ করলে অকারণ দৌড়ঝাঁপ কমে যায় এবং মনও গুছানো থাকে।

টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রোডাক্টিভ হাউজওয়াইফ হওয়ার একটি বড় চাবিকাঠি। সংসারের কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখা গেলে কাজ এলোমেলো হয়ে পড়ে না। যেমন—রান্না, পরিষ্কার, বাচ্চাদের সময়, নিজের সময়—সবকিছুর আলাদা জায়গা থাকলে ক্লান্তি কমে। একই সঙ্গে সব কাজ নিজে করতে হবে—এই মানসিকতা থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি। পরিবারের সদস্যদের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে দিলে একজন নারীর উপর চাপ অনেকটাই হালকা হয়।

প্রোডাক্টিভ হাউজওয়াইফ মানে নিজের যত্ন উপেক্ষা করা নয়। বরং নিজের শরীর ও মন ভালো রাখাই সংসারের জন্য বিনিয়োগ। পর্যাপ্ত ঘুম, একটু বিশ্রাম, নিজের পছন্দের কোনো কাজ—পড়া, লেখা, শেখা বা নীরব সময়—এসব থাকলে নারী মানসিকভাবে শক্ত থাকেন। মানসিকভাবে ভালো না থাকলে কোনো কাজই প্রোডাক্টিভ হয় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেখার অভ্যাস। একজন হাউজওয়াইফ ঘরে থেকেই নতুন দক্ষতা শিখতে পারেন— হোম ম্যানেজমেন্ট, ফাইন্যান্স প্ল্যানিং, অনলাইন স্কিল, কিংবা ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান। এই শেখা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, পরিবার গঠনের মানও বাড়ায়। অনেক নারী এখান থেকেই ধীরে ধীরে ঘরে বসে আয়ের পথও তৈরি করেন।

সবশেষে, প্রোডাক্টিভিটি মানে নিখুঁত হওয়া নয়। সব কাজ ঠিকঠাক হবে—এমন আশা না রেখে বাস্তবতা মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো দিন কম কাজ হলে নিজেকে দোষারোপ না করে শেখার জায়গা খুঁজে নেওয়াই একজন প্রোডাক্টিভ হাউজওয়াইফের পরিচয়। তিনি জানেন—সংসারও একটি জীবনব্যবস্থা, আর এই ব্যবস্থাকে ধৈর্য, পরিকল্পনা ও সচেতনতার সঙ্গে চালানোই আসল সাফল্য।

Productivity School

12/11/2025

কবিতা নারীর মত। উপযুক্ত অলংকার তার সৌন্দর্য বাড়ায়। আমরা এতদিন ছন্দ, অন্ত্যমিল ইত্যাদি সম্পর্কে জেনেছি- এগুলোই কবিতার অলংকার। এগুলো ছাড়া আরও বেশ কিছু অলংকার আছে।

আজ শেষ পর্বে আলোচনা করবো কবিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু অলংকার নিয়ে..

১. অনুপ্রাস

একই ধ্বনি বারবার ব্যবহারে যে শ্রুতিমাধুর্য্য সৃষ্টি হয়, তার নাম অনুপ্রাস।

অনুপ্রাস বিভিন্নরকম হতে পারে। এসম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য জাগরনে প্রকাশিত তাজরিয়ান আলম আয়াজের 'কবর-বন্দির জবানবন্দি' কবিতাটিই যথেষ্ট। আসুন কবিতাটি শুরু থেকে দেখি:

"ধূমায়িত জুলমাত -
এই ঘোর সিয়া হার মানিয়েছে নিঝুম-নিশুতি রাত!"

বাক্যেদ্বয়ের শেষে অনুপ্রাস (মাত~রাত) বিদ্যমান, যাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। এর আরেক নাম অন্ত্যমিল, যা নিয়ে আগের পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

কবিতাটি পড়তে পড়তে একপর্যায়ে আমরা বাক্যের মাঝখানেও অনুপ্রাস দেখতে পাই:

"আলিশান ভোজ, রাত্তিরে রোজ; অসীম মুসাররাত,
হাসি আর গানে, খুব কলতানে তুরন্ত্ কেটেছে রাত।"

এখানে বাক্যের মাঝখানেও অনুপ্রাস (ভোজ~রোজ, গানে~তানে) আছে, এর নাম মধ্যানুপ্রাস। আরও কিছুদূর পড়ার পর আমরা দেখি- দুটি বাক্যের শুরুর শব্দগুলোতেও অনুপ্রাস রয়েছে:

"সময়ের প্রতিশোধ -
কবরের বুকে কী জানি কী হবে জাগেনি কেন সে বোধ!"

এই যে- প্রথম শব্দগুলোর মিল (সময়ের~কবরের), এটাকে আদ্যানুপ্রাস বলে। কবিতাটির পরের দুটি বাক্যে আবার এক ভিন্নরকম অনুপ্রাস বিদ্যমান:

"চারিদিকে ছিল দুনিয়াবি জোশ, আহ্লাদী ওঙ্কার,
হুঁশ ফিরিয়েছে আজরাইলের সংহারী হুংকার।"

লক্ষ্য করুন: ওঙ্কার, সংহারী, হুংকার.. শব্দগুলোতে '-ং' ধ্বনি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, শুনতে ভালো লাগছে।

একই ধ্বনির এরূপ আবর্তনকে সরল অনুপ্রাস বা বৃত্ত্যনুপ্রাস বলে। বিভিন্ন শব্দের শুরুতেও একই ধ্বনি আসতে পারে। যেমন কবিতাটির শেষদিকে দুটি বাক্য:

"জানতে যদি যা জানি!
জিঞ্জিরে বেঁধে রাখতে নিজের কলুষ-হৃদয়খানি!"

এখানে ব্যবহৃত: জানতে, যদি, যা, জানি, জিঞ্জিরে.. শব্দগুলোর শুরুতে 'জ/য' ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। এটাও সরল অনুপ্রাস বা বৃত্ত্যনুপ্রাস।

মোটামুটিভাবে এই হচ্ছে অনুপ্রাসের আদ্যোপান্ত।

২. উপমা

উপমা হল সাদৃশ্য বা তুলনা। কোন কিছুর তুলনা দিয়ে অন্য কিছুকে ব্যাখ্যা করার নাম উপমা। যেমন:

"আতশবাজির মতো যখন
ঝরলো বোমা আকাশ থেকে,
তখন তুমি হাসতে ছিলে
আড়াল থেকে মুখটি ঢেকে!"
(আর্তনাদ: মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ১/২/২১)

এখানে বোমার আধিক্য বোঝাতে আতশবাজির উপমা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বাক্যের 'মতো' শব্দটা দিয়ে আতশবাজি ও বোমার মধ্যে একটা ভাবগত সংযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

তুলনার ক্ষেত্রে আরও কিছু সংযোজক শব্দ (ন্যায়/সম/যেন/যেমন) ব্যবহার করা হয়। আসুন, জাগরণ থেকে এরকম কিছু উদাহরণ দেখি:

"দানবের ন্যায় মরণ সাজে ফিসফিসে বলে, 'থাম্!
ফিরিয়ে দে সব নিযুত সুখের ভুলে যাওয়ার দাম'.."
(ভুলের মাশুল: জান্নাত মিম, ৩১/১/২১)

মৃত্যুর ভয়াবহতাকে দানবের উপমা দিতে এখানে 'ন্যায়' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

"জাহান্নামের আতশী-রূপে কি হব পুড়ে ছারখার?
রক্ত ঝরাবে পুলসিরাতের তরবারি-সম ধার?"
(কবর-বন্দির জবানবন্দি: তাজরিয়ান আলম আয়াজ, ২৬/৬/২০)

কঠিন পুলসিরাতকে তরবারির ধারের সাথে তুলনা করতে দ্বিতীয় বাক্যে সংযোজক শব্দ হিসেবে 'সম' ব্যবহৃত হয়েছে।

"জীবন তো নয় এ যেন
ইকামতের খানিকটা সময়.."
(জীবন তো নয় এ যেন ইকামতের সময়: রাবেয়া আক্তার রুবি, ১৬/১২/২০)

এখানে 'যেন' শব্দটি দিয়ে ক্ষনস্থায়ী জীবনকে ইকামতের স্বল্প সময়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। একই বিষয়কে বরফ গলার সাথে তুলনা দিতে গিয়ে আরেকটি কবিতায় সংযোজক হিসেবে 'যেমন' শব্দটা এসেছে:

"জীবনতো ভাই এক পলকের খেলা
টুকরো বরফ হচ্ছে যেমন ক্ষয়।"
(তোমরা দু-জন: হান্না রাহমান, ১৩/০২/২১)

তবে উপমা দিতে গিয়ে সংযোজক ব্যবহার করতেই হবে, এমনটা নয়। কখনো কখনো এরকম শব্দ ব্যবহার না করেও সুন্দর উপমা দেওয়া যায়:

"নবীর শানের আতর মেখে
জীবন টাকে গড়ো"
(নবীর শানে পড়ো: রাবেয়া আক্তার রুবি, ২১/১/২১)

এখানে 'নবীর শান' বোঝাতে আতরের উপমা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার আগে-পরে 'মত/ন্যায়/সম/যেন/যেমন..' এ জাতীয় কোন শব্দ লাগে নি।

৩. চিত্রকল্প

কবিতায় চিত্রের সাথে কল্পনা যোগ করাকে চিত্রকল্প বলে।

চিত্রকল্প কবিতার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটাকে রূপকল্প বা বাকপ্রতিমা নামেও ডাকা হয়। জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ..সহ অনেক আধুনিক কবির মতে- 'চিত্রকল্পই কবিতা'।

চিত্রকল্প নিয়ে বিভিন্নজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, একাডেমিক আলোচনা করেছেন। কিন্তু নতুনদের কাছে তা দুর্বোধ্য ঠেকবে। তাই আমি এই স্বল্প পরিসরে সহজে চিত্রকল্প বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করব।

চিত্রকল্পের শর্ত মূলত দুটি: চিত্র এবং কল্প..

প্রথমত, পড়ার সাথে সাথে পাঠকের মনে একটা সুন্দর চিত্র ফুটে উঠবে।

দ্বিতীয়ত, চিত্রটার সাথে কল্পনায় অন্য একটা চিত্র বা ভাবনা এসে যুক্ত হবে।

কঠিন মনে হচ্ছে? আসুন, সহজ কিছু উদাহরণ দেখি:

'নতুন পথিক' কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যখন বলেন: "খেলার সুখে মাখলি তোরা মাটির করুণা.." তখন একটা চিত্র ফুটে ওঠে যে- বালকেরা মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে খেলছে। এর বাইরে আর কোন ভাবনা আমাদের মনে উকি দেয় না। তাই এটা শুধুই একটি চিত্র। চিত্রকল্প নয়।

কিন্তু একই কবি যখন গানের মধ্যে বলেন: "খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে.." আমাদের মনের পর্দায় প্রথমত ভেসে ওঠে এক চিত্র- একটি শিশু কিছু মার্বেল নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে আপন মনে খেলছে।

পরক্ষনেই মার্বেলগুলো হয়ে যায় গ্রহ-নক্ষত্র। আর শিশুটি হয়ে যায় সর্বশক্তিমান রব্ব, যিনি অদৃশ্য হাতে চালিত করছেন এই সৃষ্টিজগৎ। দারুণ না! (দেহত্ববাদ নিয়ে বিতর্ক আপাতত বাদ রাখি)

জ্বী, এই যে চিত্রের সাথে এক মহাজাগতিক কল্পনা এসে জুড়ে গেছে- এটাই চিত্রকল্প। এরকম হুবুহু আরেকটা চিত্রকল্প আছে নজরুলের 'জিজ্ঞাসা' কবিতায়:
আকাশের প্যাটরাতে কে
এত সব খেলনা রেখে
খেলে ভাই আড়াল থেকে..

এবার জাগরন থেকে চিত্রকল্পের একটা উদাহরণ দেখি:

মাতৃভূমির মানচিত্রে নখ বসিয়েছে শকুন..
(ফিলিস্তিনীর আত্মকথা: ইমতিয়াজ বোরহান, ১১/২/২১)

পড়ার সাথে সাথে প্রথমেই ভেসে উঠে একটা শকুনের দৃশ্য, যা আকাশ থেকে নিচে নেমে আসছে। তার নখ খামচে ধরতে চায় একটি মানচিত্র, একটি দেশ।

সাথে সাথেই আমরা বুঝতে পারি, এই শকুন আসলে দখলদার বাহিনীর প্রতিচ্ছবি। এই যে- একটা চিত্রের সাথে অন্য একটা কল্পনার সংযোগ, এটাই চিত্রকল্প।

৪. যমক

বাক্যে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে কয়েকবার ব্যবহৃত হলে তাকে যমক বলে৷

একসময় কোন এক কবিতায় আমি লিখেছিলাম- "তোমার নামে বৃষ্টি নামে"। এখানে 'নামে' শব্দটা ভিন্ন ভিন্ন অর্থে দু'বার এসেছে..

তোমার নামে: এখানে 'নামে' অর্থ সম্বোধন (name)।
বৃষ্টি নামে: এখানে 'নামে' অর্থ পতন (falling)।

এবার কাজী নজরুলের একটি বিখ্যাত কাব্য থেকে এর উদাহরণ দেখি:
ওরে ও তরুন ঈশান, বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচী’র প্রাচীর ভেদি..

এখানে 'প্রাচীর' শব্দটি যমক। তা পরপর দু'বার ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ: প্রাচী’র (প্রাচ্যের) প্রাচীর (দেয়াল)।

৫. শ্লেষ

কোন শব্দ একই সাথে একাধিক অর্থ ধারণ করলে তাকে শ্লেষ বলে।

শ্লেষের সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ: "করোনায় সব ব্যবসা ধ্বসে গেলেও মাস্কের ব্যবসা ছিলো জমজমাট"।

বাক্যটিতে 'মাস্ক' শব্দটা একটা শ্লেষ, এর দুটি অর্থ হয়:

প্রথমত: 'মাস্ক' বলতে মুখে ব্যবহৃত কাপড়ের আস্তরণ বোঝায়, করোনাতে প্রচুর মাস্ক বিক্রি হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত: 'মাস্ক' বলতে বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ইলন মাস্ককে বোঝানো হয়েছে, যিনি সম্প্রতি বিল গেটসকে টপকে বিশ্বের ২য় শীর্ষ ধনী হয়েছেন।

এখানে দুটি অর্থই কিন্তু প্রাসঙ্গিক। অনুরূপ কবিতায় শ্লেষ অলংকারের একটি বিখ্যাত উদাহরণ হল:
মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি,
রয়েছে সোনার শত ছেলে..
(আমার কৈফিয়ৎ: নজরুল)

এখানে 'রবি' শব্দটা দ্বারা সূর্য এবং রবীন্দ্রনাথ.. উভয়কে বোঝানো হয়েছে।

________________

☞ শেষের কিছু কথাঃ 'কবিতার কলকব্জা' সিরিজটা শুরু করেছিলাম আকস্মিকভাবে, কোনোরকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। উদ্দেশ্য ছিলো মূলত দুটো- যারা কবিতার কৌশল শিখতে আগ্রহী, তাদের কিছু বেসিক বিষয়ে ধারণা দেওয়া।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো- পাঠক যাতে কবিতার ভালোমন্দ সহজে চিনতে পারে। দেখা যায়, অনলাইনে অনেক ভালো কবিতাই আন্ডার-রেটেড থাকে, দুর্বল কবিতা হয় ওভার-রেটেড। এর ফলে দক্ষ কবিরা হতাশায় ভোগেন, লেখার উদ্যম হারিয়ে ফেলেন। আর অদক্ষ কবিরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, পড়ার ও নিজেকে গড়ার উদ্যম হারিয়ে ফেলেন।

কবিতার বিষয় কী হবে.. আকৃতি-প্রকৃতি কেমন হবে.. এসব নিয়েও কিছু লিখার দরকার ছিল। কিন্তু সিরিজটি ছোট রাখার জন্য আপাতত এখানেই শেষ করছি।

আপনি যদি সৌখিন কবি হয়ে থাকেন, এটুকুই যথেষ্ট। তবে আপনি যদি সিরিয়াসলি লেখালেখি করতে চান, তাহলে এই সিরিজটি আপনার জন্য রচনার সূচনা মাত্র.. আরও অনেক পথ পারি দিতে হবে বন্ধু, প্রস্তুত আছেন তো?

________________

শেষ পর্ব: কাব্যালংকার
#কবিতার_কলকব্জা
(সমাপ্ত)

11/11/2025

এই সিরিজের প্রথম পর্বে বলেছিলাম, অনেকেই ভাবে- ছন্দ মানে 'বাক্যের শেষ অক্ষরসমূহের মিল'। এটা আসলে ছন্দ নয়, এটা অন্ত্যমিল। আজ অন্ত্যমিলের কিছু কৌশল আলোচনা করবো।

অন্ত্যমিল সবাই পছন্দ করে। এজন্য আমাদের সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন। যেমন নির্বাচনী প্রচারণায় একটি জনপ্রিয় শ্লোগান:

অমুক ভাইয়ের চরিত্র
ফুলের মত পবিত্র।।

'চরিত্র' এবং 'পবিত্র'.. উভয় শব্দের শেষেই '-ত্র' আছে। এটাই অন্ত্যমিল।

দাবি আদায়ের মিছিলে বিভিন্ন শ্লোগানে অন্ত্যমিল উচ্চারিত হয়, যেমন: পদ্মা মেঘনা যমুনা/ তোমার আমার ঠিকানা। (অন্ত্যমিল: -না)

ইসলামিক মাহফিলেও এর ব্যবহার আছে, যেমন: আল কুরআনের আলো/ ঘরে ঘরে জ্বালো। (অন্ত্যমিল: -লো)

পণ্যের প্রচারেও অন্ত্যমিল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যেমন: স্বদেশী পণ্য/ কিনে হোন ধন্য। (অন্ত্যমিল: -ন্য)

জনসচেনতা সৃষ্টিতেও বিভিন্ন অন্ত্যমিল প্রচারিত হয়, যেমন: গাছ লাগান/ পরিবেশ বাঁচান। (অন্ত্যমিল: -ন)

শুরুতেই বলেছি- অন্ত্যমিল হল 'বাক্যের শেষ অক্ষর সমূহের মিল'। অক্ষর বা সিলেবল কী- সেটা আপনারা জানেন। বাক্যে যদি শুধুমাত্র একটি অক্ষর মিলে যায়, দুর্বল অন্ত্যমিল হয়। আর একাধিক অক্ষর মিলে গেলে সেটা হয় শক্তিশালী অন্ত্যমিল।

একটু ব্যাখ্যা করি। উপরে কিছু প্রচলিত শ্লোগান উল্লেখ করেছি। প্রথম শ্লোগানের শেষ শব্দগুলো ছিল:
চরিত্র= চ-রিত্-র
পবিত্র= প-বিত্-র
এখানে উভয় শব্দে তৃতীয় অক্ষর (র~র), দ্বিতীয় অক্ষর (রিত্~বিত্), এমনকি প্রথম অক্ষরও স্বরধ্বনিতে (চঅ~পঅ) মিলে গেছে। এটা ভালো অন্ত্যমিল।

কিন্তু দ্বিতীয় শ্লোগানের শেষ শব্দগুলো ছিল:
যমুনা= য-মু-না
ঠিকানা= ঠি-কা-না
এখানে শুধুমাত্র তৃতীয় অক্ষর (না~না) মিলেছে। বাকি গুলো মিলে নি। যেমন: প্রথম অক্ষর (য~ঠি), দ্বিতীয় অক্ষর (মু~কা)। এটা দুর্বল অন্ত্যমিল।

এ থেকে আমরা ভালো অন্ত্যমিলের একটি কৌশল পেলাম: 'অন্তত শেষ দুই অক্ষরের মিল, বেশি হলে আরো ভালো'।

প্রচলিত কিছু শব্দ যেমন: পেলে/মেলে, করি/গড়ি, কভু/প্রভু.. ইত্যাদি অন্ত্যমিল বিভিন্ন কবিতায় এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে- পাঠকের মনে নতুন করে আর দাগ কাটে না। তাই মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন কিছু ট্রাই করা দরকার। তাতে বৈচিত্র্য বাড়ে। এরকম পাঁচটি কৌশল নিচে দেওয়া হল..

• প্রথম কৌশল:
'একটি মূল শব্দের সাথে আরেকটি পরিবর্তিত শব্দের অন্ত্যমিল'।

পরিবর্তিত শব্দ মানে শব্দের সাথে ই/ও/কে/রে/রা/এর ইত্যাদি (বিভক্তি/সম্বন্ধ পদ) যোগ করা। যেমন:

হৃদয় খুলে দু'হাত তুলে আর্জি যতো বলো
ঘুচবে তোমার দুঃখ সকল, মুছবে চোখের জলও
(আরিফ আজাদ, ১৩/৬/২০)

এখানে 'জল' শব্দের সাথে 'ও' যোগ করে, 'বলো' শব্দের সাথে মেলানো হয়েছে (বলো~জলও)। এরকম আরো কিছু পংতি:

তুমি খালা পান খাও? পানখেকো গং-রা?
জিভ তাই লাল এত? দাঁত এত নোংরা?
.
নারী যদি হতে চাও, রোজ রাত গভীরে -
গালি দেবে ইসলাম আর তার নবিরে।
(নারীবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং প্রথাবিরোধিতার প্রেতাত্মা: তাজরিয়ান আলম আয়াজ, ১৩/৯/২০)

• দ্বিতীয় কৌশল:
'দুটি যুক্তবর্ন দিয়ে অন্ত্যমিল দেওয়া'।

এক্ষেত্রে যুক্তবর্ণের কারণে অন্ত্যমিলে একটা জোশ আসে, পড়তে ভালো লাগে। যেমন:

পথে গড়িয়েছে কত চেনা মুখ, টকটকে তাজা রক্ত!
তবু ভুলে গেছি নিয়ম করে নামাজের প্রতি অক্ত।
(ভুলের মাশুল: জান্নাত মিম, ৩১/১/২১)

এখানে অন্ত্যমিলটি যুক্তবর্ণ-বিশিষ্ট: রক্ত~অক্ত (যুক্তবর্ণ '-ক্ত')। এরকম আরো কিছু উদাহরণ:

সুদি-কারবার, পুজির ফাঁদে, শোষণ করে এ বিশ্ব,
মোড়লের কাঁধে বন্দুক রেখে মোদের করেছো নিঃস্ব!
(জুলুমবাজ: মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ২৫/১/২১)

চামড়া ছাড়া আর কী দিয়ে করবে মোদের ভিন্ন?
শ্বেত প্রভুদের পা চেটে যাই, ধর্ম ভীষণ ঘৃণ্য।
(নারীবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং প্রথাবিরোধিতার প্রেতাত্মা: তাজরিয়ান আলম আয়াজ, ১৩/৯/২০)

• তৃতীয় কৌশল:
'যুক্তবর্নের সাথে মুক্তবর্ণের অন্ত্যমিল'।

সাধারনত যুক্তবর্ণ একটু দ্রুত উচ্চারিত হয়, মুক্তবর্ণ একটু ধীরে। তাই তাদের মধ্যে অন্ত্যমিল দিলে উচ্চারণে বৈচিত্র্য আসে। যেমন:

সাবজেক্টিভ ওই সো-কল্ড এথিকস ভীষণ প্রসার পাচ্ছে
প্রবৃত্তিকে নাচতে দেখে শয়তানেরা নাচছে
(অপরাধ‌ তো অপরাধই: আবু ইউসুফ সুমন, ১৬/১/২১)

এখানে প্রথম বাক্যে 'পাচ্ছে' যুক্তবর্ন বিশিষ্ট (-চ্ছে), পরের বাক্যে 'নাচছে' মুক্তবর্ণ। অনুরূপ উদাহরণ:

কত ভাবনা অতৃপ্ত থাকে, হৃদয়ের পর্দায়
কত গহীনে ভাজ পড়ে,
বেদনার খরতায়।
(হারানোর উপাখ্যান: সাওদা সিদ্দিকা, ২/২/২১)

তাই বলি আগে জেনে নাও তুমি নিজেদের ইতিহাস,
কুরান-হাদিস পড়ে বের করো ইলমের নির্যাস।
(অস্ত্র ধরার পাঠ: জোবায়ের বিন বায়েজীদ, ১৩/১/২১)

• চতুর্থ কৌশল:
'একটি শব্দের খণ্ডিত অংশের সাথে একটি পূর্ণ-শব্দের অন্ত্যমিল'।

এক্ষেত্রে আবৃত্তির সময় বড় শব্দটি ভেঙে উচ্চারণ করা হয়, শুনতে ভালো লাগে। জাগরণ থেকে একটি কবিতা দেখুন:

মর্ডানিজম গিলে ফেলা মানুষগুলোর রোগ
পর্দা নিয়ে আছে তাদের নানান অভিযোগ
সকাল-সন্ধ্যা নারীর মুক্তি নারীর স্বাধীনতা-
নিয়ে তারা বলবে নানান রংবাহারি কথা
তাদের থেকে একেক সময় একেকরকম বুলি
প্রস্তুতি নাও শুনবো এখন তাদের কথাগুলি
পর্দা করলে অনেক ক্ষতি নেইতো কোনো লাভ
'পর্দা নাকি রক্ষাকবচ' নোংরা মনোভাব!
হিজাব-নিকাব করা নারীর স্বাধীনতা হরণ
পর্দা হলো মধ্যযুগের রিসেন্ট সংস্করণ..
(অভিযোগ: আবু ইউসুফ সুমন, ১৮/১২/২০)

লক্ষ্য করুন, 'রোগ' এর সাথে 'অভিযোগ' শব্দের খণ্ডিত অংশ (রোগ~যোগ) মেলানো হয়েছে। এখানে অন্যান্য অন্ত্যমিলগুলোও একই রকম: স্বাধীনতা/কথা, বুলি/কথাগুলি, লাভ/মনোভাব, হরণ/সংস্করণ।

জাগরণ থেকে আরো কিছু উদাহরণ:

ভুল বুঝে গো আমায় যদি করো তুমি পর
তোমার তরে তবু আমি কাঁদবো নিরন্তর।
যতই যাবে দূরে সরে আসবো কাছে তত
তোমার তরে শিউলি মালা গাঁথবো অবিরত।
ভালোবেসে ভুল ভাঙাবো করলে অপমান
তোমায় আমি মাখিয়ে দেবো বকুল ফুলের ঘ্রান।
(হাসবো সারাক্ষণ: হান্না রাহমান, ২৭/১২/২০)

এ কেমন পাতা,যেথা বাদ নেই,
ছোট বড় কোনো পাপ!
লেখা আছে সব,তাইতো আমার,
আজ বড় অনুতাপ!!
(কাব্যে কুরআন, সুরা কাহফ ৪৯: জোবায়ের বিন বায়েজীদ, ১/৯/২০)

• পঞ্চম কৌশল:
'শেষ শব্দ একই রেখে আগের শব্দগুলোতে অন্ত্যমিল'।

অন্ত্যমিলের এই কৌশলটি মূলত ফার্সি-উর্দু কবিতায়, বিশেষ করে শের ও রুবাইয়্যাতে, বেশ জনপ্রিয়। সার্থকভাবে প্রয়োগ করলে বাংলায়ও এটা ভালো শোনায়। জাগরণ থেকে একটি উদাহরণ:

হাতে যদি টাকা হয়
বুদ্ধিতে পাকা হয়।
কু-কাজে ইতিহাস
টাকা দিয়ে ঢাকা হয়।
(মোঃ মহিনুদ্দিন চৌধুরী সাকিব, ৫/২/২১)

এখানে অন্ত্যমিলসমূহ: টাকা হয়/পাকা হয়/ঢাকা হয়
'হয়' শব্দটি সবখানে আছে, আগের শব্দগুলোতেই মূলত অন্ত্যমিল দেওয়া হয়েছে (টাকা~পাকা~ঢাকা)।

আরো‌ কিছু উদাহরণ:

আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে!
বুকের ভেতর গুমোট বাঁধা
একশো একটা ঢেউয়ের তালে
দিনগুলি মোর নষ্ট হচ্ছে!
কষ্ট হচ্ছে!
(প্রত্যাবর্তন: জান্নাত মিম, ১৭/০৬/২০)

যখন মোরা এক দুজনের আয়না হবো
দুঃখ সুখে মন ভুলানোর বায়না হবো
.
যখন তোমার কান্না - হাসির কারণ হবো
দিবস রাতে অনেক কাজের বারণ হবো
(দাম্পত্য: মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ৭/২/২১)

সবশেষে বলি- অন্ত্যমিল দিতেই হবে, এমনটা নয়। তবে দিলে ভালো ভাবেই দিবেন। অন্ত্যমিলের দুর্বলতায় যেন আপনার ভালো কবিতাও দুর্বল না হয়ে যায়।

যে কবিতার অন্ত্যমিল থাকে না তাকে অমিত্রাক্ষর বলে। অমিত্রাক্ষর অর্থ হল- 'অক্ষরে অক্ষরে নয় মিত্র (বন্ধু)'। তবে অমিত্রাক্ষর কবিতায় ঘনিষ্ঠ মিত্রতা না থাকলেও শত্রুতা থাকে না, কিছু সুসম্পর্ক অন্তত থাকে। এই সুসম্পর্কগুলো হল কাব্যের অলংকার।

পরবর্তী পর্বে সে সব সুসম্পর্ক সম্পর্কে কিছু ধারনা দেব ইনশাআল্লাহ।

_________________

#কবিতার_কলকব্জা
পর্ব ১০: অন্ত্যমিলের কিছু কৌশল



(পরবর্তী পর্ব: কাব্যালংকার)
#জাগরণএক্সক্লুসিভ

10/11/2025

#কবিতার_কলকব্জা
পর্ব ০৯: গদ্য ছন্দ

যে কবিতায় বাহ্যত কোন ছন্দ থাকে না, টানা গদ্যে লেখা হয়.. তাকে গদ্য ছন্দ বা গদ্য কবিতা বলে।

এখানে 'বাহ্যত' শব্দটি লক্ষ্য করুন। এর অর্থ হল- গদ্য ছন্দে আপাতদৃষ্টিতে কোন ছন্দ থাকে না। কিন্তু এর ভেতর এক ধরনের সূক্ষ্ম ছন্দ থাকে- যা কাব্যিকতা সৃষ্টি করে। গদ্যের সাথে গদ্য ছন্দের এটাই পার্থক্য।

এখন প্রশ্ন হল- 'সূক্ষ্ম ছন্দ' বিষয়টা কী?

সেটা বোঝার জন্য আগে ছন্দের উদ্দেশ্য বুঝতে হবে, কবিতা কী- সেটা জানতে হবে।

কবিতা বা Poetry শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ποίησις (Poiesis>Poetic) থেকে, এর অর্থ নির্মাণ বা সৃষ্টি করা। কবিতায় দুটি জিনিস নির্মিত হয়- ভাব এবং ভাষা। ছন্দের কাজ মূলত 'ভাষা' নিয়ে।

দেখবেন- কিছু কিছু কথা কর্ণ ভেদ করে আমাদের কলিজায় গিয়ে লাগে। একটা ভালো লাগা অনুভূতি সৃষ্টি করে। একবার শোনার পর শব্দগুলো মাথার মধ্যে বাজতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে অনুরণন (resonance)।

শব্দ কিংবা ভাবের এই অনুরণনই কবিতার অন্তর্নিহিত রহস্য। এর কারণে লোকে কবিতায় প্রশান্তি খুঁজে পায়। বারবার কবিতার কাছে ফিরে যায়।

এজন্য আমি বলি- "একবার পড়ার পর বারবার পড়বার ইচ্ছা জাগে, সেটাই ভালো কবিতা"।

প্রচলিত 'ছন্দ' সাধারণত শব্দের অনুরণন সৃষ্টি করে। তাই ছন্দোবদ্ধ শব্দ সবার ভালো লাগে। তবে ছন্দ না থাকলেও কখনো কখনো শব্দগুলো আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায়, অনুরণিত হয় এবং বারবার পড়তে ভালো লাগে। সেটাই হল সূক্ষ্ম ছন্দ।

উদাহরন স্বরূপ জাগরণে প্রকাশিত আরিফ আজাদ ভাইয়ের কবিতাটিই দেখুন:

এই গোধূলি এবং / ঝরা-পাতার মর্মর শব্দ
একদিন ফুরিয়ে যাবে জেনে /
আমি কখনো দাঁড়াইনি গিয়ে / আমনের ক্ষেতে
একা একা বসিনি / কখনো কোন নির্জন / পুকুর ঘাটে।

এই আলো-রাঙা ভোর, / কড়কড়ে রোদ /
একদিন নিঃশেষ হবে জানি /
আমি তাই, / কখনো মাড়াইনি / তেপান্তরের মাঠ
কখনো বাজাইনি / নারকোল পাতার বাঁশি।

আমি জানি / এই কোলাহল / মিলিয়ে যাবে
এই অরণ্য, / এই বটবৃক্ষ, / এই দূর্বিনীত নীলাকাশ
কোনোকিছুই আমাকে / আগলে রাখবে না..
(আরিফ আজাদ, ৯/৬/২০)

যেসব স্থানে Slash চিহ্ন (/) দিয়েছি, সেগুলোতে থেমে থেমে ধীরলয়ে কবিতাটি আবৃত্তি করে দেখুন। একটি বারের জন্যও মনে হবে না যে- ছন্দ নেই। এটাই সূক্ষ্ম ছন্দ। এই সূক্ষ্ম ছন্দের কারণে গদ্যেও এক ধরনের কাব্যিকতা চলে এসেছে।

লক্ষ্য করুন, কবিতাটিতে ভাষার প্রাঞ্জলতার পাশাপাশি একটা ভাবগত অর্থব্যক্তি আছে। 'আমাদেরকে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে'- এই নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে কবিতায়। একই রকম জীবনবোধের আরেকটি কবিতা:

একদিন / আমিও যাবো চলে, / দূর থেকে বহুদুরে, /
ধুলোবালির শহর ছেড়ে, / একা পথে তব নীরবে; /
থাকবে না কোলাহল, / রবে না কোন /
মিছে মায়া বন্ধন /
নিয়ে যাবো সাথে করে / শুধুই, পূন্য / আছে যত ভার।
(তানভির আহমেদ চৌধুরি, ২৫/০১/২১)

এখানেও কি সূক্ষ্ম ছন্দের ফিলিংস পাচ্ছেন না? জ্বী, এটাই গদ্য ছন্দ।

তাহলে আমরা জেনেছি, গদ্য ছন্দের মূল উপাদান দুটি:
১. ভাষাগত প্রাঞ্জলতা
২. ভাবগত অর্থব্যক্তি

'রচনার শিল্পগুণ' প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রও এই দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছিলেন: "রচনার দুটি প্রধান গুন- অর্থব্যক্তি ও প্রাঞ্জলতা.."

গদ্য ছন্দ বহুমাত্রিক। এটা কখনো বর্ণনাধর্মী। নিচের কবিতাটিতে দেখুন- সন্ধ্যা নামার এক সুনিপুণ বর্ণনা:

এইসব সন্ধ্যেতে- /
শেষ বিকেলী / আলোক যখন / নিবু নিবু/
বাতাসেরা ঝাঁক বেধে / জাগতিক নিঃশ্বাস ফেলে /
লুকোয় আঁধারে, / মৌন শোক নিয়ে!

তখন- /
মুগ্ধ আঁখিজল নিয়ে / তাকিয়ে থাকা /
কোন তরুনীর / পশ্চিমা আকাশ জুড়ে নামে, /
অরুনের রক্তিম / আলোকধারা!
(সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে: সায়মা সাজ্জাদ মৌসি, ১৬/১২/২০)

কখনো কখনো বর্ননা নয়, কবিতা শুধু কিছু চমৎকার প্রশ্ন ছুড়ে দেয়:

ধরো, /
আজ আমি / খুব রাত করে / বাসায় ফিরবো, / বেশকিছু কাজ / জমে আছে বলে।
তুমি কি খাবার খেয়ে / ঘুমিয়ে যাবে, / নাকি আমার হাতে খাবে বলে / দরজার কাছে কান পেতে / আমার অপেক্ষায় / বসে থাকবে?

ধরো, /
আজ আমি / সকালে উঠতে পারিনি। / বেশি রাত করে ঘুমিয়েছি বলে / এলার্ম দিতে ভুলে গেছি। /
তুমি কি তখন / মিষ্টি ডাকে / ঘুম ভাঙাবে / নাকি / পানির ছিটা দিয়ে আমায় / চমকে দিবে?
('মেঘাচ্ছন্ন মন' থেকে: সাইফ আবরার, ৫/২/২১)

কখনো গদ্য ছন্দ মনের একান্ত অনুভূতি প্রকাশ করে শব্দে শব্দে:

ইচ্ছেরাও আর / উচ্ছ্বাসিত হয়না, /
বোবা আর্তনাদে / ক্ষয়ে যায় ভিতরে ভিতরে। /
অভিমানও আর / আসেনা সই পাতাতে, /
বিষাদে বিভেদ / বেড়ে যায়। /
নিঃশব্দে এসে বেলা /
ফিরে যায় নিভৃতে।
(ধূসরে ধূসরিত: মেহেজাবীন শারমিন প্রিয়া, ২২/১২/২০)

আবার কখনো বা দেয় উপদেশ:

বাধা নয়, / উপেক্ষা নয়; /
মনের গহীনের / সে বেদনাগুলো / বরণ করে নাও–/ পরম আদরে, /
তাদের আলিঙ্গন করো, / অন্তরের গহীন হতে, /
তুমি বৃষ্টি হতে দাও, / তোমার আকাশে, /
যে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা / তুমি অনুভব করবে; /
ছাতার নিচে লুকিয়ে / নিজেকে আড়াল করবে না।
(বৃষ্টি হতে দাও: তাহসিন কামাল, ২৪/০১/২১)

যেভাবেই লিখা হোক না কেন, তাতে অবশ্যই অর্থব্যক্তি এবং প্রাঞ্জলতা থাকতে হবে। পাঠক যেন সহজে কম্যুনিকেট করতে পারে আপনার ভাবনার সঙ্গে। যেন কবিতা পড়ার সময় তার ভেতরেও অনুরণন হয়- শব্দের কিংবা ভাবের অনুরণন।

গদ্য ছন্দ অনেকটা পাল তোলা নৌকার মত। শব্দের ঢেউ আর ভাবের বাতাস তাকে চালিয়ে নিয়ে যায়। আপনার কাজ শুধু নৌকার পাল ঠিক মত বাঁধা। মাঝে মাঝে দিক পাল্টে দেয়া..

বাতাসেরও যে একটা ছন্দ আছে- তা দেখা যায় না। দেখা যায় শুধু কবিতার নৌকাখানা চলছে আপন গতিতে।

(পরবর্তী পর্ব: অন্ত্যমিলের কিছু কৌশল)
#জাগরণএক্সক্লুসিভ

09/11/2025

#কবিতার_কলকব্জা
পর্ব ০৮: মুক্তক ছন্দ

প্রথম পর্বে বলেছিলাম- ছন্দ মানে 'মাত্রার সমতা'। এর মানে হল, বাক্যগুলোতে মাত্রাসংখ্যা একই নিয়মে আবর্তিত হবে। যেমন: আমাদের প্রিয় আরিফ আজাদ ভাইয়ের জাগরণে প্রকাশিত একটি কবিতা-

বৃষ্টি এলে || সুযোগ আসে || মিস করো না || কভু
বাদল দিনে || মনের দুয়া || কবুল করেন || প্রভু
হৃদয় খুলে || দুহাত তুলে || আর্জি যতো || বলো
ঘুচবে তোমার || দুঃখ সকল || মুছবে চোখের || জলও
(আরিফ আজাদ, ১৩/৬/২০)

স্বরবৃত্ত কবিতাটির মাত্রাবিন্যাসঃ
৪+৪+৪+২
৪+৪+৪+২
৪+৪+৪+২
৪+৪+৪+২

অর্থাৎ প্রতি বাক্যে (৪+৪+৪+২) মাত্রা আবর্তিত হচ্ছে। এটাই মাত্রার সমতা। মাত্রাগুলো যদি এরকম একই নিয়মে আবর্তিত (sequence) না হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে (randomly) আসে, তাকে মুক্তক ছন্দ বলে।

আসুন, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাটির মাত্রাবিন্যাস করিঃ

বল বীর (৪)
বল উন্নত || মম শির (৬+৪)
শির || নেহারি’ আমারি || নতশির ওই (২+৬+৬)
শিখর হিমাদ্- || রির (৬+২)
বল বীর (২)
বল || মহাবিশ্বের || মহাকাশ ফাড়ি (২+৬+৬)
চন্দ্র সূর্য || গ্রহ তারা ছাড়ি (৬+৬)
ভূলোক দ্যুলোক || গোলক ভেদিয়া (৬+৬)
খোদার আসন || আরশ ছেদিয়া (৬+৬)
উঠিয়াছি চির || বিস্ময় আমি (৬+৬)
বিশ্ববিধাত্- || ত্রির (৬+২)
মম || ললাটে রুদ্র || ভগবান জ্বলে (২+৬+৬)
রাজ-রাজটীকা || দীপ্ত জয়স্- || শ্রীর‌ (৬+৬+২)
বল বীর (৪)
আমি চির উন্- || নত শির! (৬+৪)
(বিদ্রোহী: কাজী নজরুল ইসলাম)

কোনো সিকোয়েন্স পাচ্ছেন কি? নাকি মাত্রাগুলো রেনডমলি একটার পর একটা আসছে?

লক্ষ্য করুন- 'বিদ্রোহী' কবিতার ছন্দের মধ্যেও এক ধরনের বিদ্রোহ আছে। কবিতায় ২,৪,৬.. মাত্রাগুলো মুক্তভাবে (randomly) আসছে। কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মের অনুসরণ করছে না। এটাই মুক্তক ছন্দ। আমি এটাকে বলি 'বিদ্রোহী' ছন্দ।

এই ছন্দের একটা সুবিধা আছে। একঘেঁয়েমি আসেনা। অনেকটা রোলার কোস্টারের মত। চলতে চলতে হঠাৎ ছন্দের ঝাঁকুনি, কণ্ঠের আকস্মিক উত্থান-পতন। একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগে। পড়তে ভালো লাগে।

মাত্রাবৃত্তে মুক্তক ছন্দের উদাহরণ উপরে দেখিয়েছি। এটা স্বরবৃত্তে কিংবা অক্ষরবৃত্তেও হতে পারে। এবার আমরা জাগরণ থেকে স্বরবৃত্তে মুক্তক ছন্দের একটি দৃষ্টান্ত দেখবোঃ

সেই মেয়েটার || গায়ের রঙ || কালো (৪+৪+২)
দ্বীনের নূরে || রাখতো করে (৪+৪)
ঘরখানি তার || আলো (৪+২)
বলতো লোকে || ঘর হবে না || বর হবে না (৪+৪+৪)
কালো মেয়ের || সুখ হবে না (৪+৪)
দেখলো কেবল || রব্ব (৪+১)
মিলিয়ে দিলো || টুকটুকে বর (৪+৪)
মিলিয়ে দিলো || সব (৪+১)
(রূপ: জান্নাত মিম, ৯/৯/২০)

যদিও এটা ৪ মাত্রার স্বরবৃত্তে রচিত (অপূর্ণমাত্রা ১/২), মাত্রাগুলো এখানে কোন সুনির্দিষ্ট সিক্যুয়েন্স অনুসরণ করে নি। তাই এটি মুক্তক-স্বরবৃত্ত ছন্দ।

অক্ষরবৃত্তেই মুক্তক ছন্দের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এরকম অসংখ্য কবিতার মধ্য থেকে আমার প্রিয় একটি কবিতাংশ উপস্থাপন করছিঃ

শোনা গেল || লাশকাটা ঘরে (৪+৬)
নিয়ে গেছে তারে (৬)
কাল রাতে– ফাল্গুনের || রাতের আঁধারে (৮+৬)
যখন গিয়েছে ডুবে || পঞ্চমীর চাঁদ (৮+৬)
মরিবার হল তার সাধ (১০)
বধু শূয়েছিল পাশে || শিশুটিও ছিল (৮+৬)
প্রেম ছিল, আশা ছিল || জোছনায় তবু সে দেখিল (৮+১০)
কোন ভূত? ঘুম কেন || ভেংগে গেল তার? (৮+৬)
অথবা হয়নি ঘুম || বহুকাল (৮+৪)
লাশ কাটা ঘরে শুয়ে || ঘুমায় এবার। (৮+৬)
(আট বছর আগে একদিন: জীবনানন্দ দাশ)

এখানে ৪,৬,৮,১০.. মাত্রাগুলো ইচ্ছেমতো আসছে যাচ্ছে। কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। আছে কবির অপার স্বাধীনতা..

মুক্তক ছন্দে এই স্বাধীনতার মজা কবি থেকে ট্রান্সমিট হয় কবিতায়.. কবিতা থেকে আবৃত্তিতে.. আবৃত্তি থেকে শ্রোতার হৃদয়ে.. তাই মুক্তক ছন্দ এত জনপ্রিয়।

(পরবর্তী পর্ব: গদ্য ছন্দ)
#জাগরণএক্সক্লুসিভ

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Address


Dhaka