Bio pesticides Research Center

Bio pesticides Research Center

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Bio pesticides Research Center, Educational Research Center, Daffodil NFE Department, Dhaka.

24/11/2020

বিদেশনির্ভরতা আর কতদিন?

কৃষিতে টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃষি উপকরণভিত্তিক শিল্প স্থাপনের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রতি যথেষ্ট যত্নবান। বিগত শতকের ষাটের দশকে বিশ্বকৃষিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়, ইতিহাসে যা সবুজ বিপ্লব নামে পরিচিত।

এ সবুজ বিপ্লবের পর পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন বেড়ে হয়েছিল প্রায় দ্বিগুণ। এর পেছনে মুখ্য ভূমিকা ছিল উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার, সেচভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণ। দেশের জনগোষ্ঠীতে প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন মানুষ সংযুক্ত হচ্ছে। ধারণা করা হয়, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ২৩ থেকে ২৫ কোটি। এ বাড়তি জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষি উপকরণভিত্তিক স্থানীয় শিল্পের কোনো বিকল্প নেই।

কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এ কৃষিভিত্তিক শিল্পের মধ্যে পেস্টিসাইড বা বালাইনাশক শিল্প অন্যতম। অন্যদিকে আধুনিক কৃষিতে ফসল উৎপাদন ও সংরক্ষণে বালাইনাশক ব্যবহার অপরিহার্য। দেশে বর্তমানে চার শতাধিক কোম্পানি বালাইনাশক আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় ৪০ হাজার টন বা কিলোলিটার, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ শিল্পের মূল দুর্বলতা হল, এটি প্রায় শতভাগই আমদানিনির্ভর। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো হয় সরাসরি মোড়কজাত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে অথবা আমদানিকৃত বালাইনাশক দেশে মোড়কজাত করে বিক্রি করে। ফলে একদিকে যেমন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, অন্যদিকে অনেক সময় পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

অসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা জটিলতায় দেশে স্থানীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২৩টি দেশীয় কোম্পানি বিদেশ থেকে বালাইনাশকের প্রায় ২০টি সক্রিয় উপাদান আমদানি করে নিজস্ব ফর্মুলেশন প্লান্টে বালাইনাশক উৎপাদন করছে। এতে দেশের কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন বালাইনাশক নিশ্চিত করার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় এর রফতানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান নানাবিধ আইন-কানুনের বেড়াজালে এসব স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদন শিল্প গতিশীল হচ্ছে না।

স্বাধীনতা-উত্তর দেশের বালাইনাশক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স-১৯৭১’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘বালাইনাশক বিধিমালা-১৯৮৫’ প্রণয়ন করা হয়। এসব বিধিমালায় স্থানীয় পর্যায়ে বালাইনাশক উৎপাদন (ফর্মুলেশন) শিল্পসহায়ক কোনো নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত নেই, যা প্রকারান্তরে বিদেশনির্ভর কিংবা আমদানিনির্ভর বালাইনাশক শিল্পের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘বালাইনাশক বিধিমালা-২০১৯’ প্রণয়নের কাজ চলছে। নতুন এ বিধিমালার খসড়াতেও দেশে বালাইনাশক উৎপাদন শিল্পের জন্য কোনো নীতিগত সহায়তা রাখা হয়নি। এ প্রস্তাবিত বিধিমালাকে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালায় পরিণত করে দেশে বিশ্বমানের বালাইনাশক উৎপাদনে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা একান্ত প্রয়োজন।

সাধারণত স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বালাইনাশকের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (সক্রিয় ও সহযোগী উপাদানগুলো) বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। বিদ্যমান আইনে একটি প্রতিষ্ঠান এসব উপাদান শুধু রেজিস্ট্রেশনে উল্লেখিত নির্দিষ্ট সোর্স বা উৎস থেকে আমদানি করতে বাধ্য থাকে। ফলে তারা অনেক সময় নিবন্ধিত উৎস থেকে উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হয়, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যা মোটেও যৌক্তিক কিংবা ব্যবসাবান্ধব নয়। তাই প্রস্তাবিত আইনে কাঁচামালের গুণগতমান ঠিক রেখে আমদানি উৎস উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য বিদ্যমান অনুরূপ একটি আইন অনুসরণ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে উৎস উন্মুক্তকরণের ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দামে ১৫০টিরও অধিক দেশে ওষুধ রফতানিতে সক্ষম হয়েছে।

দেশের বালাইনাশক বিপণনকারী কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে বালাইনাশক আমদানি করলেও তারা আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বালাইনাশক ক্রয় করতে পারে না। এটি স্থানীয় বালাইনাশক শিল্পের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এজন্য দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় প্রস্তুতকারক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ও স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরি; যাতে তারা উৎপাদিত পণ্য অন্যান্য দেশীয় কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারে।

সাধারণত কোনো একটি একক পণ্য অধিক পরিমাণে উৎপাদনের জন্য একটি শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু ওই পণ্য যদি স্থানীয় কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা সম্ভব না হয়, তাহলে এ শিল্পকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। বালাইনাশক উৎপাদন শিল্পের প্রসারের সঙ্গে বাজারজাতকরণের বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি বাজারজাতকরণের বাধাহীন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত সংস্থা তিন বছরের মধ্যে কাঁচামাল আমদানি বা বালাইনাশক উৎপাদন না করলে ওই নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। বিধিমালার এরূপ কঠিন শর্তাবলি শিথিল করা অতীব প্রয়োজন। কারণ নানাবিধ কারণে ওই সময়ের মধ্যে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিবন্ধন নবায়নের সুযোগ রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে আমদানিকৃত সব বালাইনাশকের গুণগতমান যাচাই করার জন্য আমদানি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বালাইনাশকগুলো নিজস্ব পরীক্ষাগারে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এছাড়াও সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সরাসরি মান নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তাই দেশের চাহিদা ও উৎপাদনের নিরিখে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বালাইনাশক গ্রুপগুলো বিদেশ থেকে আমদানিতে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে, যা ক্রমবর্ধমান এ শিল্পের বিকাশে সহায়ক ভূকিকা রাখবে।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে বালাইনাশক উৎপাদন শিল্পের সক্ষমতা ও পরিধি বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। নীতি সহায়তা পেলে মান ও মূল্যের বিচারে দেশে উৎপাদিত বালাইনাশক আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সক্ষম হবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত বালাইনাশক বহির্বিশ্বে রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে ওষুধ শিল্পের মতো বালাইনাশকের রফতানি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য বালাইনাশকের নিরাপদ ব্যবহার অপরিহার্য। দেশের অনেক বালাইনাশক কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত অতি উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১এ), উচ্চমাত্রা (শ্রেণি-১বি) ও মাঝারি মাত্রার (শ্রেণি-২) বিষক্রিয়ার শ্রেণিভুক্ত বালাইনাশক আমদানি করে থাকে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহারে মাটি, পানি, বাতাস ও ফসলে বিষক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ থাকার সুযোগ থাকে। এ ধরনের বালাইনাশকের আমদানি ও ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে জৈব বালাইনাশক কিংবা অপেক্ষাকৃত অধিক নিরাপদ শ্রেণি-৩ ভুক্ত বালাইনাশকের স্থানীয় উৎপাদনে সরকারি নীতিগত সহযোগিতা অপরিহার্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বালাইনাশকের নাম শুনলেই আমরা শহুরে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কিন্তু কোনো দেশেই বালাইনাশক ছাড়া ফসল উৎপাদিত হয় না, বরং অনেক উন্নত দেশে ফসলের জমিতে নিরাপদ পদ্ধতিতে অনেক বেশি পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফসলের জমিতে হেক্টরপ্রতি বালাইনাশক ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। চীনে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে গড়ে বালাইনাশক ব্যবহৃত হয় প্রায় ১৩ কেজি। জাপান, ইসরাইল ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ কেজি এবং নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ কেজি। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর ফসলের জমিতে বালাইনাশকের ব্যবহার হয় প্রায় দুই কেজি। আমাদের দেশে উন্মুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতিতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্রমাগত একই ফসলের চাষাবাদের কারণে বালাইয়ের প্রাচুর্য বেশি। তাই এখানে বালাইনাশক ছাড়া ফসল উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। এটা সত্য, অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারে পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিয়ম মেনে নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহারে এসব ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

দেশে প্রতি বছর বালাইনাশক আমদানির পেছনে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় হয়; স্থানীয় বালাইনাশক উৎপাদনের মাধ্যমে যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এছাড়াও দেশে উৎপাদিত বালাইনাশকগুলোর গুণগতমান সর্বদা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। ফলে কৃষক গুণগত মানসম্পন্ন বালাইনাশক দিয়ে কার্যকরভাবে বালাই দমন করতে পারবে। দেশে উৎপাদনের ফলে ফসলের সুরক্ষায় জরুরি আপৎকালীন বালাইনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। শুল্কমুক্ত রেয়াত সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামালের মাধ্যমে উৎপাদিত বালাইনাশকের উৎপাদন খরচ কম হবে বিধায় কৃষক সাশ্রয়ী মূল্যে বালাইনাশক ক্রয় করতে পারবে। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও দেশীয় বালাইনাশক শিল্পের বিকাশে দেশে নতুন কর্মসস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমাদের বালাইনাশক শিল্প সরাসরি বিদেশনির্ভর, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। কথায় বলে ‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্য নহে ধন হলে প্রয়োজন’। তাই কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে নিজস্ব নির্ভরতা বা নিজেদের সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই। দেশের বালাইনাশক শিল্পের যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে গুণগতমানসম্পন্ন বালাইনাশক উৎপাদন এবং রফতানি সক্ষমতা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এজন্য সরকারি নীতি সহায়তার পাশাপাশি বিদ্যমান বিধি-বিধান পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজনের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী পেস্টিসাইড নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিক উদ্যোগ একান্ত কাম্য।

আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ : অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সুত্রঃ যুগান্তর

13/10/2020

অকৃষির মেরুদণ্ড চালকল ও কৃষি উপকরণের ব্যবসা

প্রাচীনকাল থেকেই কৃষি বাঙালির জীবিকার উৎস। এ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের অবস্থাও প্রায় অভিন্ন। গোটা বাংলা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতসহ তিনটি প্রধান নদ-নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা প্রসারিত পলিগঠিত সমভূমি হওয়ার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে কৃষিকাজ অপেক্ষাকৃত সহজ ও তুলনামূলক কম খরচের ছিল। ফলে এখানকার কৃষি ব্যবস্থাপনায় কখনো রাষ্ট্রীয় মালিকানা, কখনো ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব হয়েছে। মধ্যযুগ কিংবা তার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের কৃষি কখনো রাষ্ট্রীয়, কখনো ব্যক্তি কিংবা দুটোর সংমিশ্রণ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে। ফরিদপুরে প্রাপ্ত তিনটি তাম্রশাসনে এবং অধিকাংশ পাল ও সেন শিলালিপির তথ্য অনুসারে রাষ্ট্র ভূমির মালিক হলেও গ্রামে বসবাসরত কৃষকদের দ্বারাই কৃষি ব্যবস্থা পরিচালিত হতো এবং চাষাবাদ ছিল ব্যক্তিগত খামারভিত্তিক। কৃষিদ্রব্যে রাজার অংশভাগ ছিল রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস। রাজস্ব ও অন্যান্য কর হিসেবে উত্পন্ন দ্রব্যের কতটা রাষ্ট্র আদায় করত, সে বিষয়ে জানা না গেলেও কৃষির একটি নতুন ধারা উন্মোচন হয়।

আবার সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলার কৃষির যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। অনেক স্থানের নামের সঙ্গে ‘আবাদ’ সংযুক্তি (যেমন ফতেহাবাদ ও খালিফাবাদ) সেসব জায়গা চাষাধীনে আসার সাক্ষ্যবহ হতে পারে। তত্কালীন সরকার ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ বীজ ও বলদ বা কৃষি যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ক্রয়ে সহায়তার জন্য সরকার কৃষকদের তাকাবি ঋণ দিত। ১৯২১ সালের মধ্যে বাংলার মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ প্রায় ৭৭.৩ শতাংশ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ে, যা সমগ্র ভারতে ছিল ৬৯.৮ শতাংশ। তবে সেই হার বাংলাদেশে এখন ৪০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে। তাহলে কি কৃষির গুরুত্ব কমছে? নাকি অকৃষি খাত এগিয়ে চলছে। গত কয়েক দশকের বিবর্তনে অকৃষি খাতের উন্মেষ সেই বিশ্লেষণের দাবি রাখছে। কেনই বা বাংলায় অকৃষি খাতের বিকাশ হলো, কীভাবে হলো। তার মূলে রয়েছে কৃষি খাতই। মূলত কৃষিকেন্দ্রিক বা কৃষি উৎপাদনকে ঘিরেই অকৃষি খাতের সম্প্রসারণটা বেশি হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ কিছু সেবা খাত ও পরিবহন খাতের অবদান রয়েছে। তবে এ অকৃষি খাতের উন্মেষের ইতিহাসটাও কিন্তু কম সময়ের নয়।

১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলার চিনির একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য চালু ছিল মাদ্রাজ, বোম্বে, মালাবার উপকূল, সুরাট, সিন্ধু, মাসকাট, মক্কা ও জেদ্দার সঙ্গে। এমনকি সতেরো শতকের মাঝামাঝিও বিপুল পরিমাণ চিনির রফতানি বাণিজ্যসহ বাংলা ছিল এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। বারবোসা, বারথেমা ও বার্নিয়ার বিবরণী এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজ নথিপত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইক্ষু মধ্যযুগের বাংলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ছিল। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রফতানি বাণিজ্য হ্রাস পায় এবং উত্পন্ন চিনি তখন কেবল প্রদেশের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে পারত। চিনি উৎপাদন এবং এর বিপণন প্রক্রিয়ায় কৃষি ও অকৃষি খাতের একটি বিকাশমান ধারা চলে আসে। এর পাশাপাশি অন্যান্য কৃষিশস্য বিশেষ করে পাট ও অন্যান্য অর্থকরী শস্যকে ঘিরে অকৃষি খাতের একটি ধারা চালু হয়। দুই দশক আগেও গ্রামীণ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল শস্য খাত। মোট আয়ে শস্য খাতের অবদান ছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর পরই অবস্থান ছিল ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোগ। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে গ্রামীণ মানুষের আয়ের বড় রূপান্তর ঘটে গেছে। গ্রামীণ পরিবারের আয়ে শস্য খাত তার অবদান হারিয়েছে। কর্মসংস্থান ও পরিবারের আয়ে বড় অবদান রাখছে অকৃষি খাত। খাত হিসেবে নেতৃত্ব এখন অকৃষিজ সেবা ও রেমিট্যান্স খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের গ্রামীণ পরিবারের বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ৭২৪ টাকা বা মাসে প্রায় ১৬ হাজার ৮৯৩ টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে আয় ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ ও অকৃষি খাত থেকে প্রায় ৬১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

গত কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ২০০০ সালে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের ক্ষেত্রে শস্য খাতের সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল, প্রায় ২৫ শতাংশ। এর পরই শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতের অবদান ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। পাশাপাশি কৃষি মজুরি, ব্যবসা ও বাণিজ্য, সেবা, অকৃষিজ শ্রমিক

ও রেমিট্যান্সের অবদান ছিল। কিন্তু প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সেই চিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। গ্রামীণ মানুষের আয়ের প্রধান উেস পরিণত হয়েছে রেমিট্যান্স। গ্রামীণ মানুষের মোট আয়ে রেমিট্যান্সের অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে শস্যবহির্ভূত কৃষি। এ খাতের মাধ্যমে আয় হচ্ছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিভিন্ন সেবা খাতের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য ও ব্যবসা খাতের মাধ্যমে প্রায় ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে একটি পরিবারের আয়ে। ফলে এ সময়ে গ্রামীণ মানুষের আয়ে অকৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার জন্য আয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নটা হলে সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হবে। অকৃষি মাধ্যমে গ্রামের ব্যাপক আকারে কর্মসংস্থান হওয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ের অকৃষি খাতের শ্রেণিবিন্যাসের কারণে কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে গ্রামীণ অকৃষি খাতকে আরো স্পষ্টীকরণ করা হয়েছে। সেখানে হোটেল ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা দোকানদার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নানান উদ্যোগ, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা ও ট্রেডিং কার্যক্রম, রেমিট্যান্স, পরিবহন বিশেষ করে ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন বা এই জাতীয় বেশকিছু পরিবহন ছাড়াও নানামুখী সেবা খাতের কর্মকাণ্ড।

গ্রামীণ অকৃষি খাতের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কৃষিজ উপকরণের ব্যবসা বিশেষ করে বীজ, বিভিন্ন ধরনের ফিড, সার, জ্বালানি তেল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি, কীটনাশক ও বালাইনাশক এবং কৃষি ওষুধসামগ্রীর ব্যবসা। এছাড়া গত কয়েক দশকের ব্যবধানে চাল উৎপাদনের একটি বড় উল্মম্ফন হয়েছে। সেখানে চালকলগুলোর একটি বড় অবদান রয়েছে। কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে চাল পৌঁছাতে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর মাধ্যমে পরিণত হয়েছে চালকল। দেশের চালকলগুলোর কারণে এখন পর্যন্ত কৃষক তার ধানের দাম পাচ্ছেন, আবার ভোক্তারা সঠিক মূল্যে চাল কিনতে পারছে। তবে এটিও স্বীকার করতে হবে মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চালের দাম কিছুটা বাড়ছে। চালের দাম যদি বাড়ে তাহলে কৃষক পর্যায়ে নির্দিষ্ট অনুপাতে সে দাম পৌঁছাতে সহায়তা করেন মিলাররা। কারণ মিলাররাই কৃষকের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ধান ক্রয় করেন।

দেশে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে বোরো ধানের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। বোরোর আবাদ প্রায় ৫৪-৫৬ লাখ হেক্টর। অন্যদিকে আমন ধানের আবাদ ৪৪-৪৫ লাখ হেক্টর এবং আউশের আবাদ হচ্ছে ৯-১০ লাখ হেক্টরে। সব মিলিয়ে চালের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় পৌনে চার কোটি টন। আউশ, আমন ও বোরো ধান মিলিয়ে এখন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। আর তিন ধরনের ধান উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন এক কোটির বেশি কৃষক। গত ২০১৮ সালে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টন চালের উৎপাদন হয়েছে। সে হিসেবে দেশে গত অর্থবছরে ধান উৎপাদন ছাড়িয়েছে সোয়া পাঁচ কোটি টন। তবে কৃষকের দাম নিশ্চিতের পাশাপাশি চালের অপচয় রোধ করতে মিলাররা ভূমিকা নিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টন। তবে উৎপাদিত চালের ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হচ্ছে। এর মধ্যে হারভেস্টকালীন ক্ষতি ১১ লাখ ২৩ হাজার এবং পোস্ট হারভেস্টকালীন ক্ষতি ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টন। ২০১৮ সালের জরিপ বছরে আউশের ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৮২ টন। অন্যদিকে আমনে ক্ষতি হচ্ছে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৩৯৯ টন। বোরো ধানে ক্ষতি হচ্ছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৬ টন। এর মধ্যে হারভেস্টকালীন ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪২ টন ও পোস্ট হারভেস্টকালীন ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৪ টন। সব মিলিয়ে দেশে হারভেস্ট ও পোস্ট হারভেস্টকালীন ক্ষতি হয়েছে ২৮ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭ টন।

২০১৬ সালে প্রায় ২২ হাজার চালকল ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে চালকলের পরিমাণ প্রায় সমান ছিল। কিন্তু কার্যত বেশকিছু চালকল অকার্যকর থাকে। এর পরের বছরে হাসকিন ও অটোরাইস মিলে চালকলের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল সাড়ে ২২ হাজার। যার মধ্যে অটো রাইস মিল ৬৫০ ও সেমি অটো প্রায় ২ হাজার ৫০০টি। বাকিগুলো হাস্কিং চালকল। ধান ভাঙানোর প্রথাগত পদ্ধতিতে আমরা চাল নষ্ট করছি। রাবার হালার প্রযুক্তির প্রসার না হওয়ায় এখনো প্রথাগত কলেই (হাস্কিং) চাল উৎপাদন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। প্রথাগত এসব চালকলে ১০০ কেজি ধান ভাঙানোর পর চাল পাওয়া যায় ৬৫ কেজির নিচে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব চালের মধ্যে দুই-তিন কেজি সামান্য ভেঙে যায়। অথচ উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে চীন ও জাপানে ধান থেকে চালের রিকভারি রেট ৬৭.৫ শতাংশ। দেশের নতুন জাতগুলোতে রিকভারি রেট একটু কম। তাই নতুন জাত উদ্ভাবনে চালের ভালো রিকভারি রেট যেন ভালো হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। কেননা সার, বীজ, পানি, শ্রম কীটনাশক ও বালাইনাশক দিয়ে কম রিকভারি রেটের কারণে চাল খারাপ পেলাম, সেটি কখনই কাম্য হতে পারে না। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়ে এসব মিলেই এক থেকে দেড় কেজি বেশি চাল পাওয়া সম্ভব। কোনো ধরনের ভাঙা চালও তাতে থাকবে না। প্রথাগত হাস্কিং মিলগুলোতেই তৈরি হচ্ছে দেশের সিংহভাগ চাল। বাংলাদেশের চালকলগুলোর দক্ষতা বাড়াতে কোরিয়ার বা উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। উন্নত দেশের যন্ত্রপাতিতে কম খরচে অধিক ধান ভাঙানো সম্ভব। উন্নত যন্ত্র সম্প্রসারণ করা গেলে বাড়তি চাল পাওয়া যাবে।

অথচ এ ক্ষতি খুব সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। ধান থেকে চাল তৈরিতে এখন সারা বিশ্বেই ব্যবহার হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির চালকল। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে প্রথাগত চালকল। নিম্ন চালকলগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাড়াই চালের দুই-তিন কেজি ভেঙে যাচ্ছে। চালকলে উন্নত প্রযুক্তির অভাবেই অপচয় হচ্ছে চালের বড় একটি অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশকিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান উন্নত মানের চালকল স্থাপন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না এলে দেশের চালের আরো বড় একটি অংশ অপচয় হতো। ফলে সার্বিকভাবে এ ধরনের অপচয় কমাতে হলে চালকলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে অর্থায়ন এবং সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কেননা চালের এ ধরনের অপচয়ের কারণে দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। আর দেশের দরিদ্রতা থেকে মানুষকে উন্নতির বা এসডিজির যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটিও বাধাগ্রস্ত করবে। অপচয় রোধে রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। ফসলোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বিশেষ কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ আরো জোরদার করতে হবে। প্রথাগতভাবে ধান কাটা ও মাড়াই করলে সেই ধানের ১২-১৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেশিনের মাধ্যমে সেই কাজটি করলে ক্ষতির পরিমাণ ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। অপচয়ের বড় একটি অংশই শুধু মেশিনের ব্যবহার করেই কমানো যেতে পারে। আর এসব মেশিন কৃষকের কাছে পৌঁছতে সরকারকে আরো আর্থিক ও নীতিসহায়তা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অ্যানালিটিক্যাল রিপোর্ট অন মেথডোলজিস অব দ্য ক্রপ এস্টিমেশন অ্যান্ড ফোরকাস্ট সার্ভে অ্যান্ড প্রাইভেট স্টক অব ফুড গ্রেইন সার্ভে ২০১৬-১৭’ শীর্ষক জরিপের তথ্যমতে, চালকলগুলোতে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি থেকে বড় এ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের সক্ষমতাকে পরিমাপ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র চালকলগুলোর মজুদক্ষমতা ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ১৭০ টন, ছোট চালকলগুলোর ৩৭ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫১ টন এবং মাঝারি থেকে বড় চালকলগুলোর ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ ৭০ হাজার ৬৬৫ টন। সব মিলিয়ে চালকলগুলো তিনটি মৌসুমের প্রতিটি মৌসুমে গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ ১৫ হাজার টন চাল বিপণন করে। সরকারের খাদ্যশস্য রাখার জন্য নিজস্ব মজুদ ব্যবস্থা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন খাদ্যগুদামে প্রায় ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা সম্ভব। ফলে দেশের প্রধান শস্য চালের মজুদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে চালকলগুলো। যদিও চালকলগুলোতে নানান ধরনের প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেই সরকারের পাশে থেকে কাজ করতে হচ্ছে।

কৃষি উপকরণের ব্যবসা: কৃষিজমি আবাদে মূলত কৃষি উপকরণ হিসেবে বীজ, সেচ উপকরণ, প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক সার, ফিশ ও ক্যাটল ফিড, কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কৃষি উপকরণ বাজারজাত ও ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন কয়েক লাখ ব্যবসায়ী। যারা কিনা ডিলার বা এজেন্ট নামেই পরিচিত। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টন সার বিপণন করা হয়। এছাড়া তিন থেকে পাঁচ লাখ টন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক বীজ বিপণন করা হয়। যদিও বীজের কৃষক পর্যায়ে চাহিদা আরো বেশি। তবে বিপণনযোগ্য বীজের পরিমাণ এখনো বেশ কম। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বীজের বিপণনের পরিমাণ দুই লাখ টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সার ও বীজ বিপণনের জন্য সরকারিভাবেই ডিলার নিযুক্ত করা আছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ডিলারদের বিবেচনায় নিলে এদের পরিমাণ লাখ ছাড়াবে। অন্যদিকে ৩০-৩৫ হাজার টন বালাইনাশক ও কীটনাশক বিপণন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতি দুই বছরে কয়েক লাখ ছোট-বড় কৃষিযন্ত্র বিপণন করা হয়। দেশে মাছ, পোলট্রি ও গো খাদ্যের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। এর মধ্যে পোলট্রি ফিডের চাহিদা বছরে ১৬-১৮ লাখ টন। এছাড়া মাছ ও গো-খাদ্যের চাহিদা ২০ লাখ টনের ওপরে।

কৃষিজ উপকরণ গ্রামে বা কৃষকের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসায়ী ও ডিলাররা যুক্ত আছেন। তারাই মূলত কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছেন এসব উপকরণ। ফলে এক ধরনের দোকানদারি ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে সহায়তা করছে কৃষি উপকরণ। তাদের কাজ শুধু বেচাকেনার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠিত বীজ, সার, বালাইনাশক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, কৃষি উপকরণের সঠিক ব্যবহার ও সচেতনতামূলক পরামর্শও নিয়মিত দিচ্ছেন কৃষকদের। আবার বীজ কিনে রোপণে সমস্যা, সঠিক মাত্রা জানা না থাকা বা বালাইনাশকের ব্যবহার সম্পর্কে যা জানা দরকার সব পরামর্শই দিয়ে থাকেন ডিলার ও ব্যবসায়ীরা। আবার উচ্চফলনশীল শস্যের নতুন জাত ও আবাদের পদ্ধতিসম্পর্কিত সব তথ্য কৃষক পেয়ে থাকেন। প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল, হাইব্রিড শস্যের প্রসার, পানিসাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিতে এক ধরনের সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছেন তারা। ফলে এসব ব্যবসায়ী ও ডিলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বা আয়বর্ধন কাজের পাশাপাশি সরকারের নিয়োজিত সম্প্রসারণ কর্মীদের সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন।

ড. ফা হ আনসারী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা—এসিআই এগ্রিবিজনেসেস

সিন্ডিকেট সদস্য—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সংগৃহীতঃ বর্ণিক বার্তা

09/10/2020

অভিনন্দন আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠান
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডব্লিউএফপি)।
2020 সালের শান্তিতে নোবেল বিজয়ী।

09/10/2020

আজ বিশ্ব ডিম দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। ডিম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য– ‘প্রতিদিনই ডিম খাই, রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়াই’।

প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠন– সর্বোপরি ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৯৬ সাল থেকে এ দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে।

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার প্রথম বিশ্ব ডিম দিবসের আয়োজন করা হয়। ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বর্তমানে বিশ্বের ৪০ দেশে পালিত হয় দিবসটি।

পুষ্টিবিদরা জানান, ডিমে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। পরিবারের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডিমের বিকল্প নেই। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় একটি ডিম রাখা উচিত।

সংগৃহীত

30/09/2020

জৈব কৃষিতেই আগামীর সম্ভাবনা
ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

পৃথিবীব্যাপী ফসল উৎপাদন, ফসল ও তার কৌলিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য পরিবর্তন করে উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল প্রয়োগ করা হয়, সেখানে মাটির খাদ্য বা স্বাস্থ্য উপেক্ষিত। মাটির স্বাস্থ্য হলো মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুণের সর্বাধিক সমন্বয়, তা রক্ষা করা এবং সামগ্রিক মান সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা একটি মূল আন্তর্জাতিক লক্ষ্য। একসময় মাটির উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে এমন গুণগত মানের বৈশিষ্ট্যাবলি রক্ষায় কাজ করা হতো। পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগত মানকে খুব কম বিবেচনা করা হতো। অথচ আজ এটা প্রমাণিত যে মাটি ইকোসিস্টেম পরিষেবাদি সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদন করে। মাটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কাজ যেমন নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করে। জনস্বাস্থ্য মাটি-পানি-বায়ু পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করে, যা মাটিতে প্রক্রিয়াগুলোর দ্বারা দৃঢ়ভাবে সংহত হয়। ফিল্টারিং, বাফারিং ও রূপান্তরকরণের মতো মাটির কাজগুলো ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের বিনষ্টের বিরুদ্ধে মানুষসহ পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। মানুষের কর্মকাণ্ড মাটির বিভিন্ন প্রক্রিয়া যেমন ভূত্বকের ক্ষয়, মাটির কাঠামোর অবনতি, ক্রাস্টিং, পুষ্টি হ্রাস, ভারসাম্যহীনতা, অ্যাসিডিকেশন, লবণাক্তকরণ, জৈব পদার্থের হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিকে প্রভাবিত করে। মাটির অবক্ষয় ফসলের ফলন, পুষ্টির মান এবং উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা কমিয়ে খাদ্য সুরক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। মাটিতে খনিজ পুষ্টি উদ্ভিদ গ্রহণ করে, যা মানবদেহে খনিজ সরবরাহের প্রধান উৎস। মাটি থেকে গাছ যে খনিজগুলো শোষণ করে, মানুষ সরাসরি তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে বা প্রাণীকে খাওয়ানো হয়, পরে মানুষের খাদ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার মানুষের অন্ত্রে নানান ধরনের অণুজীব রয়েছে, অণুজীবগুলো নিদিষ্ট ধরনের অনুপুষ্টিনির্ভর, আর এ অণুজীবগুলো যথাযথ পুষ্টি না পেলে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, দীর্ঘমেয়াদে শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়ে তীব্র ঘাটতি হলে রোগ আকারে প্রকাশ পায়। বিজ্ঞানীরা মাটির স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন, তার উন্নয়নে কাজ করেছেন।

মাটির জৈব-পদার্থ কোনো দেশের মাটির অবস্থা বোঝার নির্দেশক। বিবিএসে প্রকাশিত বাংলাদেশের ফসলি জমির উর্বরতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে ৩০টি AEZ-এর ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমির ৭০ ভাগের জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ ভাগের নিচে (আদর্শমান ২.৫-৩.০, সর্বোচ্চ ৫)। মাটিতে ১৭টি পুষ্টি উপাদান থাকে কিন্তু দেশে তিন ধরনের পুষ্টি উপাদান (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম) কেন্দ্রিক রাসায়নিক সার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন ফসলে ব্যবহারবিধি নির্ধারণ করে তা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেখা গেছে, ছয় দশক আগে ফসলি জমিতে হেক্টরপ্রতি ৮.৮ কেজি রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হতো, বর্তমানে তা ৭৫ গুণ বেড়ে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৬৬০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। কখনো কখনো স্থানীয় সারবিক্রেতার পরামর্শে কৃষকরা রাসায়নিক সার ব্যবহারের সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বহু বেশি ব্যবহার করছেন, ফলে বৃদ্ধির গতি অব্যাহত আছে। আবার সার ব্যবহার নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে সময়ে সময়ে জৈব সারের ব্যবহার কমিয়ে ফসলের জাতভেদে রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থাৎ কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহারে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান অব্যাহত আছে। তাছাড়া গভীরভাবে চাষ, মাটিতে বালাইনাশকের (আগাছানাশক ও দানাদার) ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারও এ মাটির জৈব পদার্থ হ্রাস প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। এতে যদিও আশাতীত খাদ্যোৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু দুঃখজনক যে এর অপপ্রয়োগে আমাদের জমির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা বহু গুণে কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির উৎপাদিকা শক্তি সর্বোচ্চ অবস্থানে আছে। বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। আবার কৃষিজমি হলো গ্রহের বৃহত্তম কার্বনের জমাধারগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বর্ধিত কার্বণ সিকোয়েস্ট্রেশনের (সিএস) সম্ভাবনা রাখে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বর্ধমান বায়ুমণ্ডলীয় ঘনত্বকে প্রশমিত করার একটি সম্ভাব্য উপায় সরবরাহ করে। মাটির জৈব পদার্থ অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় জমির কার্বন সংবন্ধন তো করেনি, অধিকন্তু মাটি কার্বন ঋণাত্মক পর্যায়ে আছে, ফলে দেশের মাটির স্বাস্থ্য আজ বিপন্ন। মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করতে জৈব সারকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া আর কোনো তড়িৎ বিজ্ঞান এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি।

জৈব সার হলো খনি থেকে প্রাপ্ত শিলার খনিজ এবং প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ উপকরণ থেকে তৈরি দ্রব্য। এতে রয়েছে পশুর মল, গোয়ানো (পাখির বিষ্ঠা থেকে উৎপান্ন জৈব সার), গুঁড়া করা শুকনো রক্ত, হাড়ের গুঁড়া, সেল চূর্ণ, সূক্ষ্মভাবে গুঁড়া করা মাছ, ফসফেট শিলা এবং কাঠের গুঁড়ার মতো উপাদান। অজৈব বা সিন্থেটিক সারগুলোতে কিছু জৈব উপাদান থাকতে পারে। তবে জৈব সারের সঙ্গে প্রধান পার্থক্য হলো তারা মাটিকে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ না করে কেবল উদ্ভিদকে খাওয়ানোর জন্য দ্রুত কাজ করে এবং অত্যধিক মাত্রায় পরিবেশনের ফলে মাটিতে বিষাক্ত লবণ গঠনে অবদান রাখে। জৈব সার পাউডার, তরল বা কঠিন হতে পারে, যা প্রতিটি আলাদাভাবে প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া একক অণুজীব বা বহু অণুজীবসমৃদ্ধ জৈব-উপাদানের মিশ্রণও জৈব সারের অন্তর্ভুক্ত। এসব সার মাটিতে গাছ লাগানোর আগে কন্ডিশনার হিসেবে, আবার গাছের গোড়ায় সব সময়, কিছু কিছু সার পাতায় প্রয়োগ করা হয়। অণুজীবসমৃদ্ধ জৈব সার প্রয়োগ করা হয় মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করতে বা গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহজলভ্য করতে। অর্থাৎ জৈব উপাদানগুলো ভেঙে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। তাছাড়া জৈব সার মাটির কাঠামো বা ভৌত অবস্থার উন্নতি, মাটির পানি ও পুষ্টি উপাদান ধারণক্ষমতা বাড়ায়। অধিকন্তু সময়ের পরিক্রমায় জৈব সার মাটি, গাছকে স্বাস্থ্যকর ও শক্তিশালী করে।

একটা বিভ্রান্তি সবার মাঝে বিরাজ করে যে জৈব সারে কিছুই নেই, তা ব্যবহার করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। আসলে জৈব সারে মাটি ও গাছের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭টি পুষ্টি উপকরণের সব ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনীয় অণুজীব থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো যাচাই-বাছাই করে ওপরে বর্ণিত কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত প্রতি টন জৈব সারের পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ বিশ্লেষণ (শুষ্ক নমুনা) করে দেখা যায় যে পরিপক্ব গোবর সার, কেঁচো সার, মুরগির বিষ্ঠা আবর্জনা/কিচেন মার্কেট কম্পোস্ট সারে ৩০-৭০ কেজি ইউরিয়া, ১৭-৯০ কেজি টিএসপি, ১০-৪২ কেজি এমওপি, ক্যালসিয়াম সালফেট ৩-১৩ কেজি, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ১.০-১.৬ কেজি, জিপসাম ১১-২০ কেজি পরিমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া, অনুপুষ্টি সার যেমন জিঙ্ক সালফেট ০.০৫-১.৮ কেজি, কপার সালফেট ৪০-৩৬৬ গ্রাম, মাঙ্গানিজ সালফেট ৩৫-৯৫ গ্রাম, বোরিক এসিড ১৪৫-২৪০ গ্রাম, অ্যামোনিয়াম মলিবডেট ২৪-৯৫ গ্রাম পাওয়া যায়। অর্থাৎ ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানের প্রায় সবই আছে। অধিকন্তু প্রতি গ্রাম জৈব সারে মোট ব্যাকটেরিয়া, অ্যাকটিনুমাইসিটিজ, ছত্রাক, এজোটোব্যাক্টর, রাইজোবিয়াম, ফসফেট সলিবুলাইজার, নাইট্রোব্যাক্টর ১০২-১০৬ লগ থাকে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি মতামত প্রদান করেছে যে মাটির হারানো গুণ ফিরে এনে খাদ্যোৎপাদন প্রক্রিয়াকে স্থায়িত্বশীল করতে পরিবেশগত চাষাবাদ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এ চাষবাসের মূল উপকরণ জৈব সার। মাটিতে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে জৈব সার পদ্ধতি যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। জৈব সার পদ্ধতি হলো জৈব সারের উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন, গুণাগুণ নির্ধারণ, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, প্রয়োগ পদ্ধতি ও মাত্রা নির্ধারণ, জমিতে প্রয়োগ, জমি ও ফসলে জৈব সারের প্রভাব।

বাংলাদেশে কী পরিমাণ জৈব সার প্রয়োজন তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সব জমিতে জৈব সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। দেশে উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু মিলে ৭৫ ভাগ কৃষিজমি হয়। তাতে প্রতি হেক্টরে ১০ টন সাদামাটা হিসেবে, ৬০-৬২ মিলিয়ন টন (১০-১২ শতাংশ আর্দ্রতার ভিত্তিতে) চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা শুধু কঠিন বা সলিড জৈব সারের বেলায় প্রযোজ্য। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব সারের উপকরণ কোথায় পাওয়া যাবে। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জৈব সার তৈরির উপকরণের উৎসগুলোর যথার্থতা যাচাই করা হয়। দেখা যায় যে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎ?সের পশুপাখির মল (গরু, মুরগি, হাঁস), শহরাঞ্চলের জৈব বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, কাঁচা বাজারের বর্জ্য, নিটিং শিল্পের বর্জ্য, চিনিকলের পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা জৈব সারের কাঁচামালের পরিমাণ বছরে ১৩০-১৫০ মিলিয়ন টন। সে পরিমাণ কাঁচামাল যথাযথ প্রক্রিয়ায় কম্পোস্ট করলে তা থেকে ৪৫-৫৫ মিলিয়ন টন (১০-১২ শতাংশ আর্দ্রতার ভিত্তিতে) জৈব সার উৎপাদন সম্ভব। দেশে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন প্রবৃদ্ধির মুখে মানুষের আয় বেড়েছে, পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে। ফলে এসব উৎ?স থেকে কাঁচামালের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। আবার এসব কাঁচামালের উপজাতের সঙ্গে সামান্য কিছু প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশ্রিত করে তরল জৈব সার, জীবাণু সার প্রভৃতি মূল্যবান সার উৎপাদন করা সম্ভব।

দেশে জৈব সার উৎপাদনের প্রক্রিয়া এখনো সেকেলে, অর্থাৎ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো রকম যত্ন ছাড়াই খোলা জায়গায় স্তূপাকারে ফেলে রেখে এদের কম্পোস্ট করা হয়। এর ফলে জৈব সারের কাঁচামালে থাকা গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট হয়। মিউনিসিপ্যালিটিসের বর্জ্য, অন্য বর্জ্যের সঙ্গে সংগ্রহ করে ফেলে রাখা হয়। দেশের পোলট্রি খামারগুলোর মল বা উপজাত কোনো প্রকার ব্যবহারই হয় না। কাঁচা বাজারের মাছের নাড়িভুঁড়ি পুষ্টির ভাণ্ডার। আবার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পশু (গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া) কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট অংশ যেমন পশুর হাড়, শিং, ভুঁড়ি, পাকস্থলী ও রক্ত ইত্যাদি সব ফেলে দেয়া হয়। এ থেকে নানান ধরনের জৈব উপকরণ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে আশার কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার উৎপাদন করছে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০-৫৫টি। এ খাতে বিনিয়োগ করার জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তাও এগিয়ে আসছে। দেশে কেঁচো সার উৎপাদনে একটা বিপ্লব হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে দেশে এখন ২০-২২ হাজার কেঁচো সার উৎপাদক রয়েছে। এরা বছরে ২৫-৩০ হাজার টন কেঁচো সার উৎপাদন করে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ২০-২৫ কোটি টাকা। তবে বর্তমান ব্যবস্থাটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যাতে উদ্যোগীরা আকর্ষণ অনুভব করে। তার জন্য জৈব সারের বাস্তবভিত্তিক চাহিদা তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য কৃষিজমিতে প্রথমত জৈব সার ব্যবহার প্রয়োজনে আইন করে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটা করতে হবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে। কারণ আমি আগেই দেশের কৃষিজমির বেহাল দশার কথা উল্লেখ করেছি তা সমাধানে জৈব সার ব্যবহারের বিকল্প নেই।

এ অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে স্ব-উদ্যোগী তরুণদের সম্পৃক্ত করা যায়। বাংলাদেশে জনমিতিক পরিস্থিতি চলছে, আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত তরুণ বা যুবা পুরুষ ও মহিলার সংখ্যা বাড়বে, অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়বে। এ জনসংখ্যাকে কাজ দেয়া বা নতুন নতুন কাজের সুযোগ করে দেয়া সরকার বা নীতিনির্ধারকদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এটা ঠিক যে এ দেশে কৃষি পেশা সাংস্কৃতিকগত কারণে কখনো মর্যাদাবান ও আকর্ষণীয় ছিল না। কৃষি ছিল খোরপাশ প্রকৃতির। ফলে কৃষিকাজ ও পদ্ধতিতে তেমন আধুনিকতার ধারা তৈরি হয়নি। এখনো কৃষক তার জমিতে ধান উৎপাদনের জন্য কয়েক ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া জমির বা উৎপাদিকা শক্তি বাড়ানোর জন্য তেমন কোনো বিনিয়োগ করেন না। তবে গত কয়েক দশকে মানুষের জীবনমান ও মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। দেশে অনেক স্ব-উদ্যোগী তরুণ বা যুবা আছেন, যারা কৃষি খাত নিয়ে ব্যাপক স্বপ্ন দেখেন। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে পেশা হিসেবে তা গ্রহণ করতে আগ্রহী। অনেক তরুণ এরই মধ্যে নানা ধরনের ইনোভেশন সম্পাদন করেছেন। এ উদ্যোগী যুবাদের আগ্রহকে শক্তি ধরে জৈব সারের চাহিদা পূরণে এ খাতে বিনিয়োগে সম্পৃক্ত করা এখন সঠিক পদক্ষেপ। সে লক্ষ্যে জৈব সার উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, গুণগত মান বাড়ানো, পরিববহন বিতরণ, প্রয়োগের একটি সংঘবদ্ধ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন এবং তাতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার থাকতে হবে। সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ বাজেট থাকা দরকার। জৈব সারের প্রাপ্যতা বাড়াতে এর উৎপাদনের দিকে নজর দেয়া দরকার। নিম্নে জৈব সার উৎপাদনের একটি রূপরেখা দেয়া হলো:

বৃহৎ শিল্প ও প্রণোদনা: কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ সক্ষম বা বছরে ২০ হাজার টন জৈব সার উৎপাদন করতে সক্ষম এমন বিনিয়োগকারীদের বৃহৎ বিনিয়োগকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। দেশে জৈব সার উৎপাদনের জন্য বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। উৎসাহীদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার নিমিত্ত প্রণোদনা ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি তাদের সক্ষমতা এমন হবে যাতে তারা মোট চাহিদার অন্তত ২০ ভাগ উৎপাদন ও বিপণন করার দক্ষতা থাকে। করপোরেট বিনিয়োগকারীদের বেলায় তাদের সিএসআর ফান্ডের অর্থ এ খাতে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। এদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎপাদন পর্যায়ে, যেমন সিটি করপোরেশন/মিউনিসিপ্যালিটিস কর্তৃক বিনা মূল্যে জৈব বর্জ্য সরবরাহ, ইকুইটি ফান্ড থেকে ঋণ, কর মওকুফ, আধুনিক কম্পোস্ট মেশিন ব্যবহারের জন্য উৎপাদন প্লান্ট তৈরিতে সহজ শর্তে জমি লিজ ও ব্যাংক সাপোর্ট ইত্যাদি ও বিপণনে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।

মাঝারি শিল্প: কমপক্ষে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগে সক্ষম বা বছরে দুই হাজার টন জৈব সার উৎপাদন করতে সক্ষম এমন বিনিয়োগকারীদের মাঝারি বিনিয়োগকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। দেশে অনেক উঠতি বিনিয়োগকারী আছেন, যাদের কিছু কারিগরি ও বিপণন দক্ষতা রয়েছে। এদের এ শ্রেণীভুক্ত করে এ খাতে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। পুঁজির স্বল্পতা হেতু এদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এদের জন্য অন্তত ২০ ভাগ উৎপাদন ও বিপণন করার ব্যবস্থা থাকবে। এদেরও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎপাদন পর্যায়ে যেমন স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটিস কর্তৃক বিনা মূল্যে জৈব বর্জ্য সরবরাহ, ইকুইটি ফান্ড থেকে ঋণ, কর মওকুফ, উৎপাদন প্লান্ট তৈরিতে সহজ শর্তে লিজ ইত্যাদি ও বিপণনে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।

ক্ষুদ্র শিল্প: কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগে সক্ষম বা বছরে ২০০ টন জৈব সার উৎপাদন করতে সক্ষম এমন বিনিয়োগকারীদের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। ব্লক পর্যায়ে চাষীর বাড়িতে চাষী নিজে বা গ্রামীণ স্ব-উদ্যোগী তরুণদের জৈব সার উৎপাদন ও বিপণনে সম্পৃক্ত করতে হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ব্যবস্থা। কারণ ব্লক পর্যায়ে চাষীর বাড়িতে বা স্ব-উদ্যোগী তরুণদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈব সার প্লান্ট স্থাপন করে কেঁচো সার, কম্পোস্ট সার তৈরি এবং প্রতি টন সার উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা সহজ ও নিরাপদ। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে, মাঠ পর্যায়ে জৈব সারের কাঁচামালের জন্য ৫-গরুর-খামার কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এ কর্মসূচির একটি সহজ হিসাব যেমন একটি মধ্যম আকৃতির গরু সারা বছর প্রায় ছয় টন গোবর ও দুই টন চেনা দেয়। একজন কৃষক বা একজন তরুণ উদ্যোক্তার যদি পাঁচটি গরু থাকে, তাহলে বছরে ৩০ টন গোবর ও ১০ টন চেনা পাওয়া যাবে। যদি গরু চড়ানোর সময় অপচয় (পদ্ধতিগত) শতকরা ৪০ ভাগ ধরা হয় তবে ১৮ টন গোবর ও ছয় টন চেনা পাওয়া সম্ভব। এ পরিমাণ গোবর থেকে বছরে সহজেই ২০০ কেজি নাইট্রোজেন, ৯০ কেজি ফসফরাস ২০০ কেজি পটাশিয়ামসহ সব ধরনের অনুপুষ্টি ও পর্যাপ্ত পরিমাণে অণুজীবও পাওয়া যাবে। তা থেকে বছরে আড়াই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। তাছাড়া গরুগুলো উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করে সেখানে আরো দেড় লাখ টাকা সর্বমোট ৪ লাখ টাকা আয় সম্ভব। দেশে প্রায় ১৪৫০০টি ব্লক রয়েছে। প্রতি ব্লকে ৮-১০ জন উদ্যোগী তরুণ নিলে এ খাতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এরা মোট চাহিদার ৬০ ভাগ পূরণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য জমিতে অণুজীবের পরিমাণ বাড়াতে হয়। সে অণুজীব আবার স্থান ও ফসলভেদে ভিন্ন হয়। সেজন্য অণুজীব সার তৈরি ও বিপণনে একটু বেশি শিক্ষিত তরুণেরা এগিয়ে আসতে পারে। তার জন্য সরকার স্থানীয় টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছোট ছোট ল্যাব স্থাপনে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দান করতে পারে।

রাসায়নিক সার উৎপাদনের জন্য বড় বড় শিল্প-কারখানা বিশাল বিনিয়োগ করে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু জৈব সার উৎপাদন ও বিপণনের কোনো স্থায়ী কাঠামো নেই। যদিও দেশে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানি এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছে। এরা প্রায় এক লাখ টন জৈব সার জোগান দিতে সক্ষম। জৈব সারের ওজন নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে। যেমন ১ ভাগ আর্দ্রতা বাড়লে প্রতি টনে ১০ কেজি ওজন বেড়ে যায়, সেখানে কৃষকদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকে। সে জন্য জৈব সার ভলিয়ম বা আয়তন আকারে বিক্রি করা যেতে পারে। জৈব সার নিয়ে আরো একটি নেতিবাচক ধারণা আছে যে এর ফলাফল প্রদর্শন বিলম্ব হয়। তবে গবেষণার মাধ্যমে এর উন্নয়ন করা সম্ভব। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রয়োজনের তুলনায় জৈব সারের কাঁচামাল কম। তবে প্রণোদনার আওতায় আনা হলে কাঁচামালের জোগান আরো বেড়ে যাবে। কারণ পশুপালন, মৎস্য চাষ, আগাছা বা সামুদ্রিক আগাছা সংগ্রহে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবে। এটা একটা ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে। রাসায়নিক সার বিশেষ করে ৩-৫টি পুষ্টি উপাদান সহজপ্রাপ্য করার নিমিত্ত ৮০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। হিসাব করে দেখা গেছে একটি পুষ্টি উপাদান সরবরাহকারী এক কেজি রাসায়নিক সারে ১৬০ টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। সে যুক্তিতে ১৭টি উপাদান ও প্রয়োজনীয় অণুজীব মূল্য কষে এক টন জৈব সারের প্রচলিত বাজার দাম ৭০০০ টাকা। সরকার প্রতি টনে ৫০০০ টাকা ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিতে পারে। সেজন্য মোট সারের চাহিদা পূরণে বছরে ৩০০০ কোটি টাকার সংস্থান থাকা প্রয়োজন। এটা রাসায়নিক সারে কৌশলে ভর্তুকি বা অংশীজনদের সরাসরি দেয়া যেতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার: জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার নিমিত্ত সব অংশীজনের (উৎপাদন থেকে ব্যবহারকারী) পর্যন্ত ডাটাবেজ করে এর মাধ্যমে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত করলে কর্মসূচিটির সুফল নিশ্চিত হবে। জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি স্থায়ী কর্মসূচি থাকা দরকার, যার মাধ্যমে জৈব সার ব্যবহার করার জন্য কৃষকদের ব্যাপক উদ্বুদ্ধকরণের কর্মকাণ্ড থাকবে। উদ্যোগী তরুণদের সম্পৃক্তকরণ কার্যক্রম, জৈব সার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ২৫ ভাগ রাসায়নিক সার কম দেয়ার নিমিত্ত রাসায়নিক সার ক্রয়ের বেলায় মূল্য প্রণোদনার সুযোগ কার্যকর করা, পাশাপাশি জমিতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে জমির জিপিএস তথ্য সংগ্রহ করে তা কৃষি তথ্য সার্ভিসের কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করা। তাছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট তালিকাভুক্ত চাষীদের জমির মাটির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াটি প্রণোদনা বা ভর্তুকি খাত থেকে ব্যয় করার ব্যবস্থা থাকবে। তাছাড়া কভিড-১৯-এ অনলাইন মার্কেটিংয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা জৈব সার বিক্রি করতে কাজে লাগানো যেতে পারে। যেমন দেশে এখন ছাদকৃষি ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু সেখানে ব্যবহার করার জন্য কোনো আদর্শ মিডিয়া দেশে নেই। জৈব সার দিয়ে মিডিয়া তৈরি করে তা অনলাইন অর্ডার নিয়ে গ্রামে বসেই সে ব্যবসা করা যেতে পারে। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার সুযোগ তৈরি হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিজমিতে জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য রাসায়নিক সারের ভর্তুকি থেকে ২৫ ভাগ জৈব সারের উৎপাদন ও প্রয়োগ পর্যন্ত প্রদানের নিম্নবর্ণিত প্রস্তাব প্রদান করা হলো: জৈব সার উৎপাদনে বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি ও তাদের কারিগরি-আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি স্থায়ী কর্মসূচি থাকা, স্ব-উদ্যোগী তরুণদের সম্পৃক্ত করে প্রতিটি কৃষি ব্লকে জৈব সারের কারখানা গড়ে তোলা, বিপণন, সকল স্তরে আইসিটি ও জিসিএস ব্যবহার করে জৈব সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা, জৈব সারের মান উন্নয়নে গবেষণা জোরদার করা। সর্বোপরি মাটিতে জৈব সার প্রয়োগকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করার জন্য প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগানো। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে মাটির স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন হবে, শহরের বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় বর্জ্য কমে যাবে ও পরিবেশ দূষণ কমবে। উদ্যমী তরুণদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে, পাশাপাশি পরিবেশের উন্নয়ন হবে। অধিকন্তু জৈব সারের পদ্ধতির মাধ্যমে দেশে জৈব কৃষির অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।



ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, জৈব কৃষি গবেষক, বারি

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Daffodil NFE Department
Dhaka