28/09/2021
বুক রিভিউ : আম আঁটির ভেঁপু
লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর কালজয়ী উপন্যাস "পথের পাঁচালী" । পাঠকদের কাছে সর্বাধিক সমাদৃত এই উপন্যাসটি লেখক মূলত বড়দের জন্য লিখেছিলেন। কিন্তু তুমুল জনপ্রিয়তা আর প্রবল চাহিদার জন্য পরবর্তীতে উপন্যাসটির কিশোর সংস্করণ বের করা হয়, আর সরল সংক্ষেপিত এই কিশোর সংস্করণটিই হলো "আম আঁটির ভেঁপু"।
উপন্যাসের মূল চরিত্র হলো অপু। গ্রাম্য বালক, শহর থেকে দূরে নিশ্চিন্দপুর নামক অতি সুন্দর গ্রামে বাবা হরিহর, মা সর্বজয়া আর পৃথিবীতে তার সবচাইতে ভালোবাসার মানুষ দিদি দূর্গার সাথে বাস।দূর্গা বয়সে অপুর থেকে খুব বড় নয়, বয়স ১০-১১ বৎসর হইবে, পাতলা-পাতলা শরীরের গড়ন, গায়ের রঙ একটুখানি চাপা।
উপন্যাসটি শুরুতে আপনাকে নিজের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।মায়ের কঠোর শাসন উপেক্ষা করে অপু আর দূর্গার ঝড়ের মধ্যে আম কুড়ানো, আমের কুসি জরানো, পথ হারিয়ে বৃদ্ধার বাড়িতে পৌছে যাওয়া যাকে তারা আতুরী ডাইনি বলে জানতো, বন্ধুর জন্য জেলে পাড়ার ছেলেদের হাতে মার খাওয়া কিংবা অপুর উদ্ভট চিন্তা শকুনির ডিম শুকাইয়া আকাশে উড়িবার উদ্ভট বিশ্বাস, দুই ভাই বোনের চড়ুইভাতি করা অথবা যাত্রার দলের অজয়ের সাথে হওয়া বন্ধুত্ব সমস্ত কিছু আপনাকে আপনার শৈশবে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট।
চরম দারিদ্রতা উপেক্ষা করেও দুই ভাই বোনের বনে জঙলে ঘুরে বেড়ানো, আমতলা, জামতলায় ভিড় করা, গ্রামের নিতান্ত মূল্যহীন জিনিস, ফল, পাতা কুড়াইয়া দোকান দেয়া এবং নিজেরা নিজেরা সেখান থেকে কেনা সমস্ত কিছু চিরায়ত গ্রাম বাংলার শৈশবকেই তুলে ধরে। তাদের বিশেষ কোনো চাহিদা নাই। দু মুটো ভাত তারা সানন্দে গোগ্রাস করে এবং পরক্ষণেই নিজেদের মতো করে ছুটতে শুরু করে।
দারিদ্রের সংসার থাকায় দূর্গার হাত টানের স্বভাব থাকলেও, গল্পে কখনও দূর্গার উপর আপনার রাগ হবে নাহ, বরং সময়ের সাথে সাথে দূর্গা কখন যে কেন্দ্রিয় চরিত্র হয়ে উঠবে তা হয়তো টেরও পাবেন নাহ।
"সর্বজয়া" কে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্বাশত পল্লী মায়ের চিরায়ত প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন। গল্পের কোনো একটা পর্যায়ে এসে সর্বজয়ার উপর আপনার রাগ হবে, অপুর প্রতি অধিক যত্নশীলতা আর দূর্গার প্রতি শাসন আপনাকে পল্লী মায়ের "ছেলে সন্তানের প্রতি অধিক মমত্ববোধ" এই চিরায়ত প্রথাকেই এক মুহূর্তের জন্য মনে করিয়ে দিবে। কিন্তু অপু আর দূর্গার মধ্যে যে ভালোবাসার সম্পর্ক তা পরক্ষণেই আপনাকে এই সবকিছু ভুলিয়ে দিবে।নিজের অজান্তেই হয়তো দূর্গাকে আপন দিদি বলে মেনে নিবেন। অপুকে দুটো পয়সা দিতে না পারায় দূর্গার আক্ষেপ যেমন আপনাকে নাড়াবে ঠিক তেমনি দূর্গাকে সর্বজয়া মারায় কানের নিচ দিয়ে রক্তক্ষরণ দেখার পর অপুর পিদের তেল লাগিয়ে দিতে চাওয়াও আপনাকে নাড়াবে।
আমতলা, জামতলা কিংবা পালিতদের বাগানের কামরাঙা কুড়ানো সমস্ত কিছু যেমন গ্রামে বেড়ে ওঠা এক কিশোরীর দুরন্তপনাকে মনে করিয়ে দিবে ঠিক একই সাথে মনে হবে এসব কিছুর মধ্যে দূর্গা যেনো কিছু একটা আড়াল করছে, ক্ষনিকের জন্য হয়ত মনে হবে দূর্গা নিজের সব দুঃখ কিংবা অবহেলা এসবের মধ্যে আড়াল করছে। চুড়ির দায়ে সেজ-ঠাকরুনের কাছে দূর্গার মার খাওয়া কিংবা মায়ের কাছে মার খাওয়া সমস্ত কিছু ভুলে থাকার জন্যই যেনো দূর্গা বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।
গল্পের কোথাও যখন আপনি দেখবেন রোজ অপুকে এক গ্লাস দুধ খাওয়ানোর জন্য সর্বজয়ার প্রাণপণ চেষ্টা সেইখানে হয়ত আপনি দূর্গাকেও খোজবেন। দূর্গাকে কোথাও না পাওয়ায় আপনার রাগ হবে, সর্বজয়ার প্রতি খানিকটা ক্ষুদ্ধও হবেন হয়তো।
সময়ের সাথে সাথে দূর্গা বড়ো হয়। কিন্তু দুই ভাইবোনের সম্পর্ক ঠিক শুরু মতোই থাকে।রোজ রাতে দিদির থেকে গল্প শোনে ঘুমানো, দিদির কাছে দুটো পয়সা চাওয়া, রেললাইন দেখতে ভাইবোনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা সবকিছু আপনার অনেক পরিচিত বলে মনে হবে।
উপন্যাসের মধ্যভাগে হরিহর তার বড় অবস্থাপন্ন গৃহস্থ শিষ্য লক্ষ্মণ মহাজনের বাড়িতে যাওয়ার সময় অপুকে নিয়ে যায়, যাত্রা পথে তারা সেই রেলপথ পাড়ি দেয় যেই রেলপথ দেখিতে সে ও তার দিদি কতোই না চেষ্টা করেছে! রেলপথ দেখার বড়োই শখ দিদির। দিদির জন্য অপুর আফসোস হয়। শিষ্যের বাড়িতে অপুর এতো এতো আদর আপ্যায়ন আর যত্ন, ভালো ভালো খাবার সবকিছু আপনাকে যেমন আপ্লুত করবে ঠিক একই সাথে দূর্গার অনুপস্থিতি আপনাকে ব্যথিতও করবে।
এসকল অবহেলা কখন যে দূর্গার প্রতি দুর্বলতা তৈরী করবে তাও হয়তো অনুভবও করতে পারবেন নাহ।
গল্পের শুরুতে অপু আর দূর্গার দুজনের কথা সমান তালে বলা হলেও মধ্যভাগ হতে দূর্গার অনুপস্থিতি কিংবা গল্পে দূর্গাকে কম স্থান দেয়ায় লেখকের প্রতিও হয়তো আপনার ক্ষোভ তৈরী করবে কিংবা এমনটাও আপনার মনে হতেই পারে যে লেখকও হয়তো দূর্গা চরিত্রটিকে অবহেলা করছেন, ঠিক যেমন সর্বজয়া...
মা সর্বজয়ার প্রতি আপনার রাগ বা ক্ষোভ চরম মাত্রায় পৌছাবে যখন জ্বর নিয়ে দূর্গা মানকচু কুড়িয়ে আনবে, এবং এই মানকচু দিয়ে চারটে ভাত রেধে দেয়ার অনুরোধ সর্বজয়া অবহেলার সাথে প্রত্যাখান করবে।দারিদ্রতা কে এক লহমার জন্য ভুলে গিয়ে "অুসখ হয়ে তোর খাই খাই বড্ড বেড়েছে" সর্বজয়ার এই কথাটি আপনার বুকে হয়তো তীরের মতো বিধবে।
মুশল ধারে বৃষ্টি আসে, ঝড় শুরু হয়, দেয়াল ভেঙে পড়ে, চালা দিয়ে বিচানায় বৃষ্টির পানি পড়ে....
হরিহরের খোজ থাকে নাহ, দূর্গার জ্বর বাড়তে থাকে।দূর্গার কথা থেমে যেতে থাকে। বিকেলে জ্বর খানিকটা কমলে অপুর কাছে রেলগাড়ি দেখতে চাওয়ার ঘটনা মানুষের স্বপ্ন নিয়ে আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে...
দূর্গার জ্বর আবারও বাড়তে থাকে, এবং অবশেষে ম্যালেরিয়ার জ্বরের কাছে কাবু হয়ে দূর্গা মারা যায়...
দূর্গার মৃত্যুর পুরো ঘটনা অতি সংক্ষেপ, সহজ আর সাধারন ভাবে প্রকাশ করার মাধ্যমে লেখক হয়তো দূর্গার প্রতি সকল অবহেলাকেই তুলে ধরেছেন।
দূর্গার মৃত্যুর পর বৃষ্টি থেমে আকাশ ঝলমলে হওয়া, হরিহরের বাড়ি ফেরা, কিংবা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পুরো পরিবারের কাশী যাওয়ার সিদ্ধান্ত এ সমস্ত কিছু যেনো হওয়ারই কথা ছিলো, হতেই হতো...
কিন্তু যে একাকীত্বে অপু ডুবে থাকে তা কি হওয়ার কথা ছিলো? দিদির চাইতে আপন কি অপুর কেউ ছিলো বা আছে? কে তাকে দিদির মতো বুঝে? কে তাকে আম কুড়াতে নিয়ে যায়? কে-ই বা তাকে আমের কুসি জরিয়ে খাওয়ায় কিংবা চড়ুইভাতি করে খাওয়ায়??? যে দিদিই ছিলো তার পৃথিবী সেই দিদির শূন্যতা কি কখনও পূরনীয়?
ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যখন শেষমেশ পুরো পরিবার টি কাশী যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন অপুর কেমন মনে হওয়ার কথা? পৃথিবীর সুন্দরতম গ্রাম, এই নিশ্চিন্দপুর, যেখানে বনে জঙলে, আমতলা, জামতলা সব জায়গায় সে চড়ে বেড়িয়েছে , যেখানের সমস্ত কিছু তার দিদির স্মৃতি ধরে আছে সেই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে?
এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া কি দিদিকে ছেড়ে চলে যাওয়া নয়?
যেই রেলে করে তারা কাশী যাবে মৃত্যুর আগে সেই রেলই তো দেখতে চেয়েছিলো দিদি...!
কাশী যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বজয়ার তাড়া যেনো দূর্গার প্রতি অবহেলাকেই আবারও তুলে ধরে। কিন্তু আসলেই কি তা অবহেলা ছিলো? নাকি দারিদ্র্যের ফল?
উপন্যাসটির দারিদ্রকে মোকাবিলা করে একটি পরিবারের টিকে থাকার গল্প যেমন আপনাকে জীবস সংগ্রামে টিকে থাকতে অনুপ্রাণিত করবে ঠিক একই সাথে দারিদ্র্য উপেক্ষা করে দুই ভাই বোনের নিজেদের মতো করে জীবনটাকে উপভোগ করার ঘটনাগুলো কিংবা অল্প কিছুতে সুখ খোজে নেয়ার বিষয়টিও আপনাকে কঠিন বিপর্যয়ের মুখে জীবনকে উপভোগ করতে প্রেরণা জোগাবে। সেই সাথে অপু আর দূর্গার দুরন্তপনা আপনাকে ফেলে আসা শৈশবে ফিরিয়ে নিবে। এরকম একটি সাহিত্য কর্ম নিজেদের করে পাওয়ায় বাঙালি বা বাংলাভাষী হিসেবে আপনার গর্ব হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে হবে নাহ।
পথের পাঁচালী নিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদ একবার বলেছিলেন, "সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী সিনেমা তৈরি না করলেও ক্ষতি ছিল না। কিন্তু বিভূতিভূষণ যদি বইটি না লিখতেন, তাহলে ক্ষতি হতো সভ্যতার। "
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এই উপন্যাসের কিশোর সংস্করণ "আম আঁটির ভেঁপু" সংগ্রহ করতে ইনবক্স করুন "রঙমশাল" পেজে।
ধন্যবাদ।।