Tazriyan Naba

Tazriyan Naba

Share

You Can Inspire Us By Becoming Our Companion, By Being An Learning Buddy. Let's Ponder The Quranic W

06/12/2020
17/08/2020

বুদ্ধিমান ব্যক্তির জিহবা তার হৃদয়ের পেছনে থাকেঃ সে যখন কথা বলতে চায়, প্রথমে সে চিন্তা করে। যদি শব্দগুলো তার জন্য কল্যাণকর হয় তাহলে সে তা বলে। আর যদি কথাগুলো তার জন্য অকল্যাণকর হয় তাহলে সে চুপ থাকে।
একজন মূর্খ ব্যক্তির জিহবা তার হৃদয়ের সামনে থাকেঃ সে কথা বলার সময় খুব কমই চিন্তা করে এবং তার জন্য কল্যাণকর বা অকল্যাণকর যা-ই হোক সে বলে ফেলে।
— প্রখ্যাত তাবিঈ ইমাম আল-হাসান আল-বাসরি (রাহিমাহুল্লাহ)

11/08/2020

So, Have you meet with Dawood Savage!

06/08/2020

#রাসায়নিক_দ্রব্যাদির_ব্যবহারে_আমদের_এখনই_সতর্ক_হওয়া_উচিৎ_নয়কি? 😥

03/08/2020

সূরাহ ফাতিহাহ —আমরা যা শিখিনি

সম্পাদনা: ডঃ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, শাইখ সানাউল্লাহ নজির আহমদ, শরিফ আবু হায়াত অপু

রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام যখন ১৪০০ বছর আগে অমুসলিম আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো—

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠন, শব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণী, এমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউ তো কোনো দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর تعالى বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি – লা ইলাহা ইল্লালাহ…

অথবা,

সর্বনাশ, এটা নিশ্চয়ই যাদু! এই জিনিস মানুষের পক্ষে বানানো সম্ভব না। এটা তো মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কোনো দৈব বাণী। কিন্তু এই জিনিস আমি মেনে নিলে তো আমি আর মদ খেতে পারবো না , জুয়া খেলতে পারবো না, আমার দাসগুলো র সাথে যা খুশি তাই করতে পারবো না। এসব শুরু করলে আমার পরিবার এবং গোত্রের লোকরা আমাকে বের করে দিবে। আমার মান-সন্মান , সম্পত্তি সব পানিতে চলে যাবে। এই জিনিস যেভাবেই হোক আটকাতে হবে। দাঁড়াও , আজকেই আমি আমার দলবল নিয়ে এই লোকটাকে…

কু’রআনের বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে কখনও আপনার এরকম কোনো চরম প্রতিক্রিয়া হয়েছে? হয়নি, কারণ কোনও অনুবাদ আল্লাহর تعالى ভাষণের মর্যাদা, গাম্ভীর্যতা, অলৌকিকতা তুলে ধরতে পারে না। কু’রআন যদি আল্লাহ تعالى বাংলাতে পাঠাতেন, তাহলে আমরা একটা করে বাক্য শুনতাম, আর ধাক্কা খেতাম। রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন কেউ এর ধারে কিছু তৈরি করতে পারতো না। কিন্তু একজন আরব বাংলায় সেই বাণী শুনত, আর হাই তুলতো। ঠিক যে রকম কিনা আমরা করি, যখন আমরা আরবি কু’রআন শুনি। কু’রআন বুঝে পড়া, আর না বুঝে পড়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য আছে।

সুরাহ ফাতিহা’র প্রতিটি আয়াত এবং শব্দের যে কত ব্যাপক অর্থ রয়েছে, আল্লাহর تعالى প্রতিটি শব্দ নির্বাচন যে কত সুক্ষ, আয়াতগুলো যে কত সুন্দর ভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা—তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এগুলো জানার পরে আপনি যখন নামাজে সুরাহ ফাতিহা পড়বেন, তখন সেই পড়া, আর এখন যেভাবে পড়েন, সেটার মধ্যে অনেক পার্থক্য হবে —ইন শাআ আল্লাহ।

fatiha2

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর تعالى নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু
যদিও আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদে বলা হয় “শুরু করছি আল্লাহর নামে…”, কিন্তু বিসমিল্লাহতে “শুরু করছি” সরাসরি বলা নেই। এর সরাসরি অর্থ: “আল্লাহর নামে।” তবে আরবি ব্যাকরণ অনুসারে ‘বিসম’ এর আগে কিছু একটা আসবে। এক শ্রেণীর ব্যাকরণবিদদের মতে এর আগে একটি ক্রিয়াপদ আসবে, যেমন, ‘আমি তিলাওয়াত করছি’, ‘আমি শুরু করছি’ ইত্যাদি প্রেক্ষাপট অনুসারে ‘আমি অমুক করছি’ দিয়ে। আরেক শ্রেণীর ব্যাকরণবিদ অনুসারে এর আগে একটি বিশেষ্য আসবে, যেমন ‘আমার খাওয়া’, ‘আমার পড়া’ ইত্যাদি আল্লাহর নামে। এখানে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সরাসরি ‘শুরু করছি’ না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে আরও ব্যাপক করে দিয়েছেন।[১৯]

আমরা ‘আল্লাহর নামে’ শুধু শুরুই করি না, বরং পুরো কাজটা করি আল্লাহর تعالى নামে এবং শেষ করিও আল্লাহর تعالى নামে। আপনি বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলেন, কিন্তু খাবারটা যদি কেনা হয়ে থাকে হারাম রোজকার থেকে, তখন সেটা আল্লাহ تعالى নামে খাওয়া হল না। আপনি বিসমিল্লাহ বলে একটা ফাইল নিলেন সই করার জন্য এবং সই করার আগে অন্যদিকে তাকিয়ে খুক্‌ খুক্‌ করে কেশে হাত বাড়িয়ে দিলেন ঘুষ নেবার জন্য, তাহলে সেটা আর আল্লাহর নামে সই করা হল না। যতই বিসমিল্লাহ বলা হোক না কেন, খারাপ কাজে আল্লাহর تعالى বরকত থাকে না।

বিসমিল্লাহ কোনো নতুন কিছু নয়। নবী নুহ عليه السلام কে আল্লাহ تعالى তার জাহাজে উঠার সময় বলেছিলেন, ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ “আরোহণ কর আল্লাহর নামে…”(১১:৪১) নবী সুলায়মান عليه السلام যখন রানী শিবাকে বাণী পাঠিয়েছিলেন, তখন তা শুরু হয়েছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে (২৭:৩০)। এই দুটি আয়াত থেকে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: আমরা যখন কোনো যাত্রা শুরু করবো, বা কোনো দলিল বা চিঠি লিখব, তখন আমরা যেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে শুরু করি।[১]



الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ تعالى তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা
এখানে মনে হতে পারে যে, আমরা আল্লাহর تعالى প্রশংসা করছি। যেমন আপনি কাউকে বলেন – “আপনি অনেক ভালো”, তেমন আমরাও আল্লাহকে تعالى বলছি যে, সমস্ত প্রশংসা তাঁর — ব্যাপারটা তা নয়। “আলহামদু লিল্লাহ” কোনো ক্রিয়া বাচক বাক্য নয়, এটি একটি বিশেষ্যবাচক বাক্য। সহজ বাংলায় বললে, এখানে কোনো কিছু করা হচ্ছে না বরং কোনো সত্যের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। যেমন: আমরা যখন বলি সূর্য আলো দেয় —তখন আমরা একটি সত্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমরা কিন্তু প্রশংসা করে বলছি না: আহা! সূর্য, তুমি কত আলো দাও!

সূর্য সবসময়ই আলো দেয় — সেটা আমরা বলি আর না বলি। আমরা সবাই যদি ‘সূর্য আলো দেয়’ বলা বন্ধ করেও দিই, সূর্য ঠিকই আলো দেবে। ঠিক একই ভাবে আলহামদু লিল্লাহ অর্থ “আল্লাহর تعالى সমস্ত প্রশংসা”, সেটা আমরা বলি আর না বলি, সমস্ত প্রশংসা ইতিমধ্যেই আল্লাহর।[১৮] যদি কেউ আল্লাহর تعالى প্রশংসা নাও করে, তারপরেও তিনি স্ব-প্রশংসিত। পৃথিবীতে কোনো মানুষ বা জ্বিন না থাকলেও এবং তারা কেউ আল্লাহর تعالى প্রশংসা না করলেও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর تعالى ছিল, আছে এবং থাকবে। বরং এটা আমাদের জন্যই একটা বিরাট সন্মান যে, আমরা আল্লাহর تعالى প্রশংসা করার সুযোগ পাচ্ছি।

সুরাহ ফাতিহা’র এই আয়াতটির বাক্য গঠন দিয়েই আল্লাহ تعالى আমাদেরকে তাঁর অবস্থান কত উপরে এবং আমাদের অবস্থান কত নিচে—তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই প্রশংসিত; আমাদের ধন্যবাদ এবং প্রশংসা তাঁর দরকার নেই। তাহলে কেন আমাদের আল্লাহর تعالى প্রশংসা করা দরকার? তাতে কী লাভ?

২০০৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের নভেম্বর সংখ্যায় একটি আর্টিকেল বের হয়েছে কৃতজ্ঞতার উপকারিতার উপরে। সেখানে বলা হয়েছে: ২,৬১৬ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপরে গবেষণা করে দেখা গেছে: যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়-ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে: মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা, ইত্যাদি নানা ধরণের সমস্যা ৭৬% পর্যন্ত দূর করা যায়।

২০০৯ সালে ৪০১ জন মানুষের উপর গবেষণা করা হয়, যাদের মধ্যে ৪০%-এর ক্লিনিকাল স্লিপ ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ জটিল ঘুমের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, তারা একনাগাড়ে বেশি ঘুমাতে পারেন, তাদের ঘুম নিয়মিত হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলা ক্লান্ত-অবসাদ কম থাকেন।

নিউইয়র্কের Hofstra University সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ জেফ্রি ফ্রহ ১০৩৫ জন ১৪-১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন: যারা বেশি কৃতজ্ঞতা দেখায়, তাদের পরীক্ষায় ফলাফল অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো, সামাজিক ভাবে বেশি মেলামেশা করে এবং হিংসা ও মানসিক অবসাদে কম ভোগে।

Wall Street Journal একটি আর্টিকেলে বলা হয়েছেঃ

Adults who frequently feel grateful have more energy, more optimism, more social connections and more happiness than those who do not, according to studies conducted over the past decade. They’re also less likely to be depressed, envious, greedy or alcoholics. They earn more money, sleep more soundly, exercise more regularly and have greater resistance to viral infections.

এক যুগের গবেষণা থেকে দেখা গেছে: প্রাপ্ত বয়স্করা যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন, তাদের কাজের আগ্রহ, শক্তি বেশি থাকে, তাদের সামাজিক সম্পর্ক বেশি হয়, এবং যারা কৃতজ্ঞ নয়, ওদের থেকে তারা বেশি সুখী অনুভব করেন। তারা অপেক্ষাকৃত কম হতাশা, হিংসা, লোভ বা এলকোহল আসক্ত হন। তারা অপেক্ষাকৃত বেশি আয় করেন, ভালভাবে ঘুমান, নিয়মিত ব্যায়াম করেন, এবং ভাইরাল অসুখের প্রতি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।

আমরা সহজেই বুঝতে পারি, প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তে, কমপক্ষে ১৭ বার বুঝে শুনে এটা বলাটা আমাদের জন্য কতখানি জরুরি—

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন
সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু। [ফাতিহা ১:২]

এখন, আরবিতে প্রশংসার জন্য অনেক শব্দ আছে, যেমন মাদহ্‌, ছানাআ, শুকর। কিন্তু আল্লাহ تعالى সেগুলো থাকতে কেন তাঁর জন্য হামদ শব্দটি বেছে নিলেন?

হামদ শব্দটি একটি বিশেষ ধরণের প্রশংসা। আরবিতে সাধারন প্রশংসাকে মাদহ مدح বলা হয়। এছাড়াও সানাআ ثناء অর্থ গুণগান। শুকর شكر অর্থ ধন্যবাদ দেওয়া। কিন্তু হামদ অর্থ একই সাথে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশংসা করা, যখন আপনি কারো গুণে মুগ্ধ। আপনি কারো কোনো বিশেষ গুণকে স্বীকার করে, তার মুল্যায়ন করার জন্য হামদ করেন। হামদ করা হয় ভালবাসা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, নম্রতা থেকে।[১৮] এছাড়াও হামদ করা হয় যখন কারো কোনো গুণ বা কাজের দ্বারা আপনি উপকৃত হয়েছেন।

আল্লাহর تعالى অসংখ্য গুণের জন্য এবং তিনি আমাদেরকে যে এত অসীম নিয়ামত দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়��� ভোগ করি—তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার জন্য হামদ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

যদি আয়াতটি হতো আল-মাদহু লিল্লাহ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর” —তাহলে কী সমস্যা ছিল? মাদহ অর্থ যদিও প্রশংসা, কিন্তু মাদহ একই সাথে বস্তু এবং ব্যক্তির জন্য করা যায়। মাদহ এমন কারও জন্য করা যায়, যে সেই গুণ নিজে অর্জন করেনি। যেমন আপনি বলতে পারেন, “গোলাপ ফুল খুব সুন্দর।” কিন্তু গোলাপ ফুল সুন্দর হওয়ার পেছনে গোলাপের কোনো কৃতিত্ব নেই। কিন্তু হামদ শুধুমাত্র বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্ববান সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য।

যদি আয়াতটি হতো আছ-ছানাউ লিল্লাহ – “সমস্ত গুণগান/মহিমা আল্লাহর”—তাহলে কী সমস্যা ছিল? ছানাআ হচ্ছে শুধুই কারো কোনো গুণের প্রশংসা করা, যা খুবই সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই। আমরা শুধুই আল্লাহর تعالى গুণের প্রশংসা করি না। আমরা তাঁর প্রতি একই সাথে কৃতজ্ঞ।

তাহলে আয়াতটি আশ-শুকরু লিল্লাহ – “সমস্ত ধন্যবাদ আল্লাহর”—হলো না কেন? আমরা কাউকে ধন্যবাদ দেই শুধুই যখন কেউ আমাদের কোনো উপকার করে। আল্লাহর تعالى বেলায় সেটা প্রযোজ্য নয়। আমরা আল্লাহর تعالى হামদ সবসময় করি। হঠাৎ করে কোটিপতি হয়ে গেলেও করি, আবার ক্যানসার ধরা পড়লেও করি। এছাড়াও শুক্‌র করা হয় যখন আপনি কারো কাছ থেকে সরাসরি উপকার পান। কিন্তু হামদ করা হয় যখন উপকারটি শুধু আপানাকে না বরং আরও অনেককে প্রভাবিত করে। যেমন, কেউ আপনাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলো: আপনি থাকে ‘শুকরান’ বলে ধন্যবাদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহ‌ শুধু আপনাকে একগ্লাস পানিই দেননি, বিশাল সমুদ্র দিয়েছেন ৬০০ কোটি মানুষের জন্য পানি ধারণ করার জন্য। সূর্য দিয়েছেন যাতে সূর্যের তাপে সেই পানি বাস্প হয়ে বিশুদ্ধ রূপে মেঘে জমা হয়। তারপর শীতল বায়ু দিয়েছেন যাতে সেই মেঘ ঘন হয়ে একসময় বৃষ্টি হয়। তারপর মাটির ভেতরে পানি জমার ব্যবস্থা করে দি���়েছেন, যাতে সেই পানি বিশুদ্ধ অবস্থাতেই শত বছর জমা থাকে। তারপর সেই বিশুদ্ধ পানি বের হয়ে আসার জন্য ঝর্ণা, নদী, পুকুর দিয়েছেন, যাতে আপনি সহজেই সেই বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারেন। এসবের জন্য আল্লাহকে تعالى শুধু ‘ধন্যবাদ আল্লাহ্‌’ বললে সেটা আল্লাহর অবদানকে অনেক ছোট করে দেখা হবে। সুতরাং শুকর বা ধন্যবাদ ছোট একটা ব্যাপার, এটা আল্লাহর تعالى জন্য উপযুক্ত নয়।

رَبِّ الْعَالَمِين
যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু
‘রব’ শব্দটির যথার্থ অনুবাদ করার মত বাংলা বা ইংরেজি শব্দ নেই, কারণ ‘রব’ অর্থ একই সাথে মালিক, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, সযত্নে পালনকর্তা, অনুগ্রহ দাতা, রক্ষক। রব-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: কোনো কিছুর মঙ্গল-অমঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রেখে ধীরে যত্নের সাথে তাকে অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছে দেওয়া।[১৮] যেমন: আমরা বাচ্চাদের লালন-পালন করি, তাদের জন্য যা ভালো সেটা করি, যা খারাপ তা থেকে দূরে রাখি, যেন তাড়া বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

রব-এর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেন। একজন দাসের তার প্রভুর কাছ থেকে প্রথম যেই জিনিসটা চাওয়ার আছে তা হলো: তাকে কী করতে হবে? প্রভু যদি দাসকে না বলে কী করতে হবে, তাহলে দাস বুঝবে কীভাবে তাকে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না?

তবে প্রভু-দাস এই শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের মনে কোনো ভালো ধারণা নেই। প্রভু শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের কোনোয় এক খান্দানি মোচ ওলা, অত্যাচারী জমিদারের ছবি ভেসে উঠে। আর দাস বলতে আমরা সাধারণত দুর্বল, না খাওয়া, অভাবী, অত্যাচারিত মানুষের কথা ভাবি। আমাদের মনে যেন এধরনের কোনো ধারণা না আসে, সেজন্য পরের আয়াতটি আমাদেরকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে আল্লাহ تعالى কেমন দয়ালু প্রভু।

আল-আ’লামি-ন শব্দটির দু’ধরনের অর্থ হয়: ১)সকল সৃষ্টি জগত, ২)সকল জাতি। আল-আ’লামি-ন শব্দটি আলআ’-লাম العالم এর বহুবচন, যার অর্থ: জগত। এখন আলআ��-লাম العالم এর দুটি বহুবচন আছে: আল আ’লামি-ন العالمين —যার অর্থ সকল চেতন/বুদ্ধিমান জাতি (মানুষ, ফেরেশতা, জ্বিন, এলিয়েন, …), আর আল আ’ওয়া-লিম العوالم —যা আল্লাহ تعالى ছাড়া সকল সৃষ্টি জগত, চেতন বা অচেতন (জড়), দুটোই নির্দেশ করে।[২০][২২]

এখন প্রশ্ন আসে, কেন আল্লাহ تعالى আল আ’ওয়া-লিম ব্যবহার না করে, আল-আ’-লামি-ন ব্যবহার করলেন? তিনি কি সকল চেতন এবং অচেতন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা নন?

সুরা ফাতিহা হচ্ছে চেতন সৃষ্টির জন্য একটি পথ নির্দেশ। এই সূরার মাধ্যমে বুদ্ধিমান সৃষ্টিরা আল্লাহর تعالى কাছে পথ নির্দেশ চায় এবং আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করে। আপনার গাড়িটির সুরা ফাতিহার কোনো দরকার নেই, কারণ তার আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাবার দরকার নেই। বরং আপনার এবং আপনার ড্রাইভারের আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ পাওয়াটা বড়ই দরকার, যাতে করে আপনারা বুঝে শুনে রাস্তায় একজন বিবেকবান মানুষের মত গাড়ি চালান।[১]

এছাড়াও আভিধানিকভাবে আ’লামি-ন শব্দটি এসেছে ع ل م মুল থেকে, যার অর্থ: ‘জ্ঞান’, যা দ্বারা কোনো কিছু জানা যায়, অর্থাৎ সৃষ্টিজগত। কারণ আমরা আল্লাহর تعالى সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি সৃষ্টিজগত থেকে। আর এই সৃষ্টিজগতই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে। একটা মোবাইল ফোন দেখলে আপনি যেমন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন: এটা প্রযুক্তিতে অগ্রসর কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বানিয়েছে, তেমনি আকাশের সূর্য, রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা, বিশাল সমুদ্র, কোটি প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কোটি প্রজাতির গাছ, লক্ষ প্রজাতির মাছ, লক্ষ প্রজাতির পাখি—এই সবকিছু দেখলে আপনি বুঝতে পারেন: এক অকল্পনীয় জ্ঞানী, প্রচন্ত ক্ষমতাবান এবং অত্যন্ত সৃজনশীল একজন সত্ত্বা রয়েছেন, যিনি এত কিছু বানাতে পারেন এবং এত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারেন।

الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু
এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে তিনি কেমন প্রভু, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মাত্র দুটি শব্দের মধ্যে কী ব্যাপক পরিমাণের তথ্য আছে তা অকল্পনীয়। প্রথমত, রাহমা-ন এবং রাহি-ম: এই দুটো শব্দই এসেছে রাহমা থেকে, যার অর্থ: দয়া। আরবিতে রাহমা শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘মায়ের গর্ভ।’ মায়ের গর্ভে শিশু নিরাপদে, নিশ্চিতে থাকে। মায়ের গর্ভ শিশুর জীবনের সব মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করে দেয়, শিশুকে আঘাত থেকে রক্ষা করে, শিশুর বেড়ে উঠার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেয়। শিশুর জন্য সকল দয়ার উৎস হচ্ছে তার মায়ের গর্ভ।

এখন রাহমান এবং রাহিম দুটো শব্দই এসেছে রাহমাহ থেকে, কিন্তু যেহেতু শব্দ দুটোর গঠন দুই ধরনের, তাই তাদের অর্থ দুই ধরণের দয়ার—

আররাহমা-ন
রাহমা-ন এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘আন’, তা প্রচণ্ডতা নির্দেশ করে। রাহমান হচ্ছে পরম দয়ালু, অকল্পনীয় দয়ালু। আল্লাহ تعالى তার একটি গুণ ‘আর-রাহমা-ন’ দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে, তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়ার কথা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারব না। একজন মা যেমন তার শিশুর জন্য সবরকম মৌলিক চাহিদা পূরণ করে, সবরকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে, আল্লাহ تعالى তার থেকেও বেশি দয়ার সাথে তাঁর সকল সৃষ্টিকে পালন করেন, রক্ষা করেন, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করেন। আল্লাহ تعالى তাঁর অসীম দয়া দিয়ে প্রকৃতিতে হাজারো ব্যবস্থা করে রেখেছেন পৃথিবীর সবধরনের প্রাণীর মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য। মানুষ হাজার বছর ধরে নানা ভাবে প্রকৃতির এই ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করেছে, চরম দূষণ করেছে, অবাধে গাছ, পশুপাখি নিধন করেছে। কিন্তু তারপরেও কোটি কোটি প্রাণী প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে বের হয় এবং ঠিকই খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে। শুধু ইউরোপেই প্রতি বছর ৩০০ মিলিয়ন গবাদি পশু এবং ৮ বিলিয়ন মুরগি খাবার জন্য হত্যা করা হয়।[২৩] তারপরেও আমাদের গবাদি পশু, হাস-���ুরগির কোনো অভাব হয় না; কারণ, আল্লাহ تعالى পরম দয়ালু।

দ্বিতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি কোনো কিছু এই মুহূর্তে হচ্ছে—তা নির্দেশ করে। যেমন আপনি যদি বলেন: “মুহম্মদ একজন উদার মানুষ”, তার মানে এই না যে মুহম্মদ এই মুহূর্তে কোনো উদার কাজ করছে, বা কাউকে কিছু দান করছে। কিন্তু রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, তা নির্দেশ করে এই মুহূর্তে আল্লাহ تعالى অকল্পনীয় দয়ালু। তিনি আপনাকে, আমাকে, আমাদের পরিবারকে, সমাজকে, আমাদের দেশকে, আমাদের ছোট গ্রহটাকে, আমাদের ছায়াপথের ১০০ কোটি তারা এবং কোটি কোটি গ্রহকে, পুরো মহাবিশ্বের ১০০ কোটি ছায়াপথকে এবং তাদের প্রত্যেকটির ভিতরে কোটি কোটি তারা এবং গ্রহকে এই মুহূর্তে, একই সময়ে, একই সাথে দয়া করছেন।

তৃতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যাপার নির্দেশ করে। একই ধরণের কিছু শব্দ হল জাওআ’-ন (جوعان) যার অর্থ প্রচণ্ড খুধায় কাতর, আ’তশা-ন (عطشان) প্রচণ্ড পিপাসার্ত। এই ধরণের শব্দগুলোর প্রতিটি একটি অস্থায়ী ধারণা নির্দেশ করে, যা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন, খাবার খুধাকে দূর করে দেয়, পানি পিপাসাকে দূর করে দেয়। ঠিক একইভাবে আমরা যদি আল্লাহর تعالى কথা না শুনি, তাহলে আল্লাহ تعالى তাঁর রহমতকে আমাদের উপর থেকে তুলে নিতে পারেন। আল্লাহর تعالى রহমত যে অস্থায়ী, তা রাহমা-ন শব্দটির গঠন নির্দেশ করে।[১][১৮]

আররাহি-ম
রাহি-ম এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘ইম’ −সেটা ‘সবসময় হচ্ছে’ এমন কিছু নির্দেশ করে। আল্লাহ تعالى নিরন্তর করুণাময় প্রভু। তিনি মানুষের মত অল্প করুণাময়, মাঝে মাঝে করুণাময় নন। আল্লাহ কিন্তু শুধুই বলতে পারতেন “তিনি পরম করুণাময়”, ব্যাস। কিন্তু একজন পরম করুণাময় কিন্তু সবসময় করুণা নাও দেখাতে পারেন। তিনি সকালে করুণা দেখালেন, রাতে আর দেখালেন না। কিন্তু না, তিনি নিরন্তর করুণাময়। তিনি প্রতি মুহূর্তে আ��াদেরকে করুণা করছেন। আপনি যখন সকালে ফজরের এলার্ম বন্ধ করে নামাজ পড়বেন কিনা তা কিছুক্ষন চিন্তা ভাবনা করে আবার ঘুম দেন, তখন আপনার একটা হাত খুলে পড়ে যায় না। আপনি যখন একজন অন্ধ ফকিরের পাশ দিয়ে না দেখার ভান করে হেটে চলে যান, তখন কিন্তু আপনার চোখ দুটা নষ্ট হয়ে যায় না, কারণ আল্লাহ নিরন্তর করুণাময়। আপনি তাঁর এক মামুলি দাস হয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁর আদেশ অমান্য করে, তাঁকে আপনার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা থেকে কম গুরুত্ব দিয়ে, ‘লোকে কী বলবে’ এই ভেবে ক্রমাগত তার আদেশ ভেঙ্গে যাবার পরেও তিনি আপনাকে প্রতিদিন ছেড়ে দেন। কারণ তিনি ‘রাহি-ম’ নিরন্তর করুণাময়।

এখন আল্লাহ تعالى যদি অকল্পনীয় এবং নিরন্তর দয়ালু হন, তাহলে কি আমরা যা খুশি তা-ই করে পার পেয়ে যাবো? কারণ, তাঁর দয়ার তো কোনো শেষ নেই?

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
যিনি বিচার দিনের মালিক
আল্লাহ تعالى এখানে খুব অল্প কিছু শব্দ ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, যদিও তাঁর করুণা অসীম, কিন্তু তারপরেও আমাদেরকে আমাদের কাজের বিচার দিতে হবে এবং বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ تعالى। কেউ আমাদেরকে সেদিন তাঁর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না এবং কেউ কোনো কাজে আসবে না। কারণ আল্লাহ تعالى বিচার দিনের মালিক, যেই বিচার দিনের কোনো শেয়ার হোল্ডার নেই।

আরবি মালিক শব্দটির দুটো উচ্চারন রয়েছে, মালিক এবং মা-লিক। মালিক অর্থ রাজা। মা-লিক অর্থ অধিপতি। এখানে আল্লাহ تعالى লম্বা মা-লিক ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ: আল্লাহ تعالى বিচার দিনের একমাত্র অধিপতি। এই দিন তিনি ছাড়া আর কারও কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তিনি হবেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যেমন: একজন রাজার হয়তো অনেক বড় রাজত্ব আছে এবং প্রতিটি প্রজা তার হুকুম শুনে। কিন্তু একজন প্রজা তার বাড়ির ভিতরে তার আসবাব পত্রের সাথে কী করবে, সেটা পুরোপুরি তার ব্যাপার। এখানে রাজার কিছুই বলার নেই। প্রজা হচ্ছে তার আসবাবপত্রের মা-লিক, সে যা খুশি তাই করতে পারে তার আসবাবপত্র নিয়ে। একই ভাবে আল্লাহ হচ্ছেন বিচার দিনের মা-লিক, সেদিন সব ক্ষমতা থাকবে তাঁর। তাকে কোনো বোর্ড মেম্বারদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না।

এখানে একটা লক্ষ্য করার ব্যাপার রয়েছে: কেন বিচার ‘দিনের’ অধিপতি? কেন বিচারের অধিপতি নয়? আমরা যখন বলি – ওই বাড়িটা আমার, তার মানে সাধারণত দাঁড়ায় ওই বাড়ির ভেতরে যা কিছু আছে তার সবই আমার। এমনটা নয় যে বাড়িটা আমার, কিন্তু বাড়ির ভেতরে সব আসবাবপত্র অন্য কারো। একইভাবে আল্লাহ تعالى যখন বলেন: তিনি বিচার দিনের মালিক, তার অর্থ বিচার দিনে যা কিছু হবে, তার সব কিছুর একমাত্র অধিপতি তিনি। বিচার দিন একটা লম্বা সময় এবং সে দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটবে, যার সবকিছুরই একমাত্র অধিপতি তিনি। তিনি হবেন একমাত্র জজ। তিনি নিজে প্রত্যেকের বিচার করবেন, কোনো উকিল ধরার সুযোগ থাকবে না।

আরবিতে ইয়াওম يَوْم এর বেশ কিছু অর্থ হয় – দিন, যুগ, পর্যায়, লম্বা সময়। যদিও সাধারণত ‘ইয়াওমি দ্দিন’ সবসময় ‘বিচার দিন বা প্রতিদানের দিন’ অনুবাদ করা হয়, কিন্তু আমরা যদি ইয়াওমের অন্য অর্থগুলো দেখি, তাহলে এটা ‘প্রতিদানের পর্যায়’ অনুবাদ করা যেতে পারে। এটা যে আমাদের একটি দিনের সমান নয় বরং একটা লম্বা পর্যায়, তা ইয়াওমের বাকি অর্থগুলো ইঙ্গিত করে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো: কেন আল্লাহ تعالى এর আগের আয়াতে তাঁর দয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে শাস্তির কথা না বলে বিচারের কথা বললেন। এর কারণ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন দুই ধরণের মানুষ থাকবে – ১) যারা আল্লাহর تعالى রহমত পেয়ে জান্নাতে যাবে, আর ২) যারা ন্যায় বিচার পেয়ে জাহান্নামে যাবে।

জাহান্নাম কোনো অন্যায্য শাস্তি নয়, সেটি ন্যায় বিচার। আল্লাহ تعالى কাউকে শাস্তি দেন না, তিনি ন্যায় বিচার করেন। যার�� জান্নাত পায়, তারা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের জন্য জান্নাত পায়, বিচারের জন্য নয়। সত্যিই যদি আল্লাহ تعالى আমাদের ভালো কাজগুলোর শুধুমাত্র বিচার করে আমাদেরকে প্রতিদান দিতেন, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেত। তখন আপনার আমার একটা নামাজও সঠিক নামাজ হতো না, কারণ আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে এমন কিছু নাই যা ভাবি না। আমাদের একটা রোজাও ‘সিয়াম’ হতো না, কারণ আমরা রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি, সুদ খাই, উল্টো পাল্টা জিনিসের দিকে তাকাই, আজে বাজে কথা শুনি ইত্যাদি। আমাদের যাকাত কোনো যাকাত হতো না, কারণ আমাদের অনেকের যাকাত হচ্ছে লোক দেখানো একটা ব্যাপার, যেখানে আমরা আমাদের মোট সম্পত্তির হিসাব যত কম করে করা যায় তা করে, তার ২.৫% যাদেরকে দিলে লোকমুখে অনেক নাম হবে, তাদেরকেই বেশি করে দেই। আমাদের বিরাট সৌভাগ্য যে আল্লাহ تعالى আমাদের কিছু ভালো কাজকে ১০ গুণ, কিছু ভালো কাজকে ১০০ গুণ, ১০০০ গুণ করে হিসাব করবেন। তা না হলে কেউ কোনোদিন জান্নাত পেত না।



আমরা প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহর تعالى সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা পেলাম। এখন আমরা জানি আমাদের প্রভু কে। সুতরাং আমাদের এখন বলা উচিৎ—

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি
এই আয়াত থেকে শুরু হল আমাদের চাওয়া। এতক্ষন পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুর পরিচয় পেয়েছি। এখন দাস হিসেবে আমাদের প্রভুর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার পালা। এই আয়াতেটির অর্থের গভিরতা এবং বাক্য গঠন অসাধারণ। প্রথমে বাক্য গঠন দিয়ে শুরু করি।

আরবিতে যদি আমরা বলতে চাই: আমরা আপনার ইবাদত করি, তাহলে তা হবে “না‘বুদুকা।” কিন্তু আল্লাহ تعالى এখানে শব্দ দুটো উল্টে দিয়েছেন: “ইয়্যা-কা না‘বুদু”। আরবিতে এটা করা হয় যখন কোনো কিছুকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন আমরা যদি বলি, “প��রশংসা আপনার”, তাহলে তার আরবি হবে “হামদুন লাকা।” কিন্তু আমরা যদি বিশেষভাবে বলতে চাই, “প্রশংসা শুধুমাত্র আপনারই” তাহলে আমরা উল্টে দিয়ে বলব, “লাকাল হামদ।” ঠিক একইভাবে “ইয়্যা-কা না’বুদু” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার ইবাদত করি” এবং “ইয়্যা-কা নাসতা’ই-ন” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে সাহায্য চাই।”

এবার আসি শব্দগুলোর অর্থের গভিরতায়। বেশিরভাগ অনুবাদে না‘বুদুকে نعبد ইবাদত বা উপাসনা অনুবাদ করা হয়। সেটি মোটেও না‘বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। না‘বুদু এসেছে আ’বদ عبد থেকে যার অর্থ দাস। আমরা শুধুই আল্লাহর تعالى উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহর تعالى দাসত্ব করি। এমনটি নয় যে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম, রোযা রাখলাম, যাকাত দিলাম—ব্যাস, আল্লাহর تعالى সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ—এরপর আমি যা খুশি তা-ই করতে পারি। বরং আমরা সবসময় আল্লাহর দাস। ঘুমের থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে: আমরা আল্লাহর تعالى দাস এবং আমরা যে কাজটা করছি, যে কথাগুলো বলছি, তাতে আমাদের প্রভু সম্মতি দিবেন কিনা এবং প্রভুর কাছে আমি জবাব দিতে পারবো কি না।

এমন মানুষ আছে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ে, কিন্তু ব্যাংকের একাউন্ট থেকে সুদ খায়, সুদের লোণ নিয়ে বাড়ি কিনে, কাউকে ভিক্ষা দেবার সময় বা মসজিদে দান করার সময় মানিব্যাগে সবচেয়ে ছোট যে নোটটা আছে সেটা খোঁজে? আবার এমন মানুষ আছে যারা হজ্জ করেছে, বিরাট দাড়ি রেখেছে কিন্তু বাসায় তার স্ত্রী, সন্তানদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে। আরেক ধরনের মানুষ আছে যারা ঠিকই নামাজ পড়ে, রোযা রাখে, যাকাত দেয়, কিন্তু ছেলে মেয়ের বিয়ে দেয় হিন্দুদের বিয়ের রীতি অনুসরন করে গায়ে-হলুদ, বউ-ভাত করে। এদের সবার সমস্যা একটি, এরা এখনও আল্লাহকে تعالى প্রভু হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এদের কাছে “লোকে কী বলবে” বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু “আমার প্রভু কী বলবেন” তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা যখন নিজেদেরকে আল্লাহর تعالى দাস হিসেবে ঘোষণা দিব, তখনই আমরা আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে পারবো। যতদিন সেটা করতে না পারছি, ততদিন আমরা “লোকে কী বলবে” এর দাস হয়ে থাকব। ফ্যাশনের দাস হয়ে থাকব। বিনোদন, সংস্কৃতি, সামাজিকতার দাস হয়ে থাকব। একমাত্র আল্লাহর প্রতি একান্তভাবে দাসত্ব করতে পারলেই আমরা এই সব মিথ্যা “প্রভু”দের দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে বের করে আনতে পারবো। যারা সেটা করতে পেরেছেন, তারা জানেন এই পৃথিবীতে সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ কত মধুর!

নাস্তা’ই-ন نَسْتَعِينُ অর্থ যদিও করা হয় “সাহায্য” কিন্তু নাস্তা’ই-ন এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে – আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন, আর আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, এখন আপনি সাহায্য চান। যেমন: রাস্তায় আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি একা ঠেলে পারছেন না। তখন আপনি রাস্তায় কাউকে অনুরোধ করলেন আপনার সাথে ধাক্কা দেবার জন্য। এটা হচ্ছে নাস্তা’ইন। কিন্তু আপনি যদি আরামে গাড়িতে এসি ছেড়ে বসে থেকে রাস্তায় কাউকে বলতেন ধাক্কা দিতে, তাহলে সেটা নাস্তাই’ন হতো না।

আমরা আল্লাহর تعالى কাছে তখনি সাহায্য চাওয়ার মত মুখ করতে পারবো, যখন আমরা নিজেরা যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। জীবনে একবারও কু’রআন পুরোটা বুঝে পড়ে দেখেনি, অথচ আমরা নামাজে আল্লাহর تعالى কাছে চাচ্ছি, “ও আল্লাহ, আমাকে বেহেশত দেন” —এরকম হাস্যকর কাজ নাস্তাই’ন নয়। আমরা নিজেরা অনেক ইসলামের আর্টিকেল পড়ি, বই পড়ি, লেকচার শুনি, অথচ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে ইসলামের কথা বলতে লজ্জা পাই, কিন্তু আল্লাহর কাছে ঠিকই চাই—“ও আল্লাহ, আমাকে একজন আদর্শ মুসলমান বানিয়ে দিন”—এটা নাস্তাই’ন নয়।

এই আয়াতটিতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শুধু তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেই বলেননি, বরং নাস্তা’ইন শব্দটা ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, আমাদেরকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে তারপরে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

এই আয়াতে একটি লক্ষ করার মত ব্যাপার হলো: আল্লাহ تعالى কিন্তু বলেননি, কীসের জন্য সাহায্য চাইতে হবে, শুধুই বলেছেন সাহায্য চাইতে। ধরুন আপনি সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে তিন তলা থেকে গড়িয়ে, নিচ তলায় এসে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন এবং আপনার হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। এই অবস্থায় আপনি কি বলবেন, “ভাই সব, আমি সিঁড়ি হইতে পড়িয়া গিয়া আমার হাত-পা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছি। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে সাবধানে তুলিয়া একটি স্ট্রেচারে করিয়া নিকটবর্তী পঙ্গু হাসপাতালে লইয়া যাইবেন এবং একজন ডাক্তারকে ঘটনা বৃত্তান্ত বলিবেন।” আপনি সেটা করবেন না, বরং আপনি এক কথায় বলবেন – “বাচাও!” এক কথাই যথেষ্ট। ঠিক একইভাবে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলেছেন, আমাদের সব সমস্যার জন্য এক কথায় বলতে, “আমরা সাহায্য চাই!”

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
আমাদেরকে সরল পথ দেখাও
আমরা আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাইতে পারতাম। যেমন আল্লাহ تعالى আমাদেরকে জীবনে সফল করে দিন, খাঁটি মুসলমান বানিয়ে দিন, আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে পথনির্দেশ। এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করার জন্য আমাদের দরকার পথনির্দেশ।

ইহ্‌দিনা এসেছে হুদা هدى থেকে, যার অর্থ পথনির্দেশ। হুদা অর্থ সম্পূর্ণ, বিস্তারিত পথনির্দেশ। এটি শুধুই পথের ইঙ্গিত নয়। স্নেহ-করুণা এবং কল্যাণ কামনা সহ কাউকে মঙ্গলময় পথ দেখিয়ে দেওয়া এবং গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াকে আরবি পরিভাষায় হেদায়েত বলে।[১৮]

যেমন: আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই মতিঝিল কোন দিকে?” সে বলল, “ওই পূর্ব দিকে।” এই ধরণের পথনির্দেশ দিয়ে আপনার কোনো লাভ নেই। কিন্তু সে যদি বলত, “এই রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে প্রথম বায়ে যাবেন, তারপর তিনটা সিগনাল পার হয়ে ডানে গেলে যে শাপলা চত্বর দেখতে পারবেন, সেখান থেকে মতিঝিল শুরু। চলেন আপনাকে আমি কাকরাইল পর্যন্ত আগিয়ে দেই।” এটা হল হুদা – পথনির্দেশ। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে পথের ইঙ্গিত চাচ্ছি না, বিস্তারিত পথ নির্দেশ চাচ্ছি, সেই পথে চলার জন্য সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ تعالى আমাদের চাওয়ার এই উত্তরে সম্পূর্ণ কু’রআন দিয়েছেন, সঠিক পথ দেখিয়ে দিয়েছেন।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, এই আয়াতটি এবং আগেরটিতে “আমাদেরকে”, “আমরা” ব্যবহার করা হয়েছে। কেন “আমি” ব্যবহার করা হলো না?

একা ইসলামের পথে থাকা খুবই কঠিন। আপনারা যারা ইসলাম মেনে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, কিন্তু আপনার পরিবারের বাকি সবাই ইসলামের ধারে কাছেও নেই, আপনারা জানেন আপনাদের পক্ষে ইসল

02/08/2020

তুমি কি জানো সেটা কী? এক বিদীর্ণকারী নক্ষত্র —আত-তারিক

শপথ আকাশের এবং রাতে যা হঠাৎ করে আসে তার। তুমি কি জানো সেটি কী? এক বিদীর্ণকারী নক্ষত্র। এমন কেউ নেই যার জন্য তত্ত্বাবধায়ক নেই। তাই মানুষ ভেবে দেখুক কীসের থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সবেগে বের হওয়া তরল থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্যে থেকে সে বেরিয়ে আসে। অবশ্যই তিনি পারেন তাকে পুনরায় জীবন দিতে। —আত-তারিক ১-৮

শপথ আকাশের এবং রাতে যা হঠাৎ করে আসে তার। তুমি কি জানো সেটা কী? এক বিদীর্ণকারী নক্ষত্র।

এই আয়াতগুলো যুগে যুগে কৌতূহলী মানুষের মধ্যে অনেক চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। কোন সেই নক্ষত্র যা রাতের বেলা হঠাৎ করে আসে? এমন এক কল্পনাতীত উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো মহাবিশ্বে কোটি কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে, সকল বাধা বিদীর্ণ করে রাতের আকাশে জ্বল জ্বল করতে থাকে? তারিক طاِرِق অর্থ রাতের বেলা হঠাৎ করে আসা, অথবা রাতের আধারে খট খট করে দরজায় টোকা দেওয়া। অপ্রত্যাশিত এমন কিছু, যা মানুষকে চিন্তায় ফেলে দেয়। কোন সেই নক্ষত্র যা রাতের বেলা হঠাৎ করে এসে মানুষকে চিন্তায় ফেলে দেয়?[১][৭][৮][১৭][১৮]
একটি নক্ষত্র যখন তার ভেতরের প্রচণ্ড চাপে বিস্ফোরিত হয়ে যায়, অথবা আশপাশ থেকে খুব বেশি পদার্থ ঢুকে গেলে তারপর বিস্ফোরিত হয়ে যায়, তখন সেটি এতই উজ্জ্বল হয় যে, মহাবিশ্বের সুদূর প্রান্ত থেকেও তাকে দেখা যায়। মহাবিশ্বের সব গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতাকে হারিয়ে এটি রাতের আকাশে কয়েক দিন, অনেক সময় কয়েক মাস জ্বল জ্বল করতে থাকে। একে সুপারনোভা বলে। সুপারনোভা অনেক সময় এতই উজ্জ্বল হয় যে, দিনের বেলায়ও তা দেখা যায়। প্রতি হাজার বছরে কয়েকবার এরকম ঘটনা পৃথিবীর আকাশে খালি চোখে দেখা যায়।

একটি নক্ষত্র যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন তা তীব্র শক্তি বিকিরণ করে। ভীষণ বেগে বিপুল পরিমাণের ভারি মৌলিক পদার্থ চারিদিকে ছুড়ে দিয়ে আশেপাশের নীহারিকার ভেতরে জমে থাকা গ্যাসের মধ্যে বিক্রিয়া শুরু করে নতুন নক্ষত্র তৈরির সূচনা করে। একই সাথে আশেপাশের অনেক নক্ষত্রকে প্রবল বেগে আঘাত করে তাদের অংশবিশেষ ছিটকে দিয়ে গ্রহ সৃষ্টির সূচনা করে। তারপর অনেক গ্রহে এটি ভারি মৌলিক পদার্থ ছুড়ে দিয়ে সেখানে প্রাণের সূচনা করে। আমাদের পৃথিবীতে লোহাসহ অনেক ভারি মৌলিক পদার্থ একদিন এসেছিল একটি নক্ষত্রের বিস্ফোরণের ফলে। নক্ষত্র বিস্ফোরণই পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা করে দিয়েছিল। যে অক্সিজেন আমরা নিঃশ্বাসে নেই, যে কার্বন দিয়ে আমাদের দেহ তৈরি, যে লোহা আমাদের রক্তের প্রতিটি লোহিত কণিকায় রয়েছে —এগুলো সবই এসেছে এক বা একাধিক সুপারনোভা থেকে।[৪৩২]
হতে পারে আল্লাহ تعالى হয়ত এই নক্ষত্র বিস্ফোরণ বা সুপারনোভাকে ইঙ্গিত করেছেন এই আয়াতে, কারণ এর সাথে তারিক-এর বৈশিষ্ট্যগুলো মিলে যায়— ১) হঠাৎ করে আসে এবং চলে যায়, ২) এর আলো মহাবিশ্বের সব বাধা অতিক্রম করেও এসে পৌঁছায়, ৩) হঠাৎ এক উজ্জ্বল কিছু আকাশে আসলে তা মানুষকে চিন্তায় ফেলে দেয় যে, সেটা কী? কোনো বিপদ কি আসছে? আকাশে কেউ কী ভেসে আছে?
—নিঃসন্দেহে সুপারনোভা মহাবিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সুপারনোভার মাধ্যমেই আল্লাহ تعالى মহাবিশ্বে বহু সৃষ্টির সূচনা করেন। এর মাধ্যমেই তিনি হঠাৎ করে অনেক গ্রহ ধ্বংস করে দেন।
অথবা হতে পারে, আল্লাহ تعالى সব উজ্জ্বল নক্ষত্রের শপথ করেছেন, কারণ নক্ষত্রের আলো কোটি কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুতগামী যান ব্যবহার করে সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রে পৌঁছুতেও লক্ষ বছর লাগবে। শুধু দূরত্বই নয়, যাত্রা পথে রয়েছে অজস্র বাধা। এই সব বাধা অতিক্রম করে নক্ষত্রের আলো সবসময় পৃথিবীতে এসে পড়ছে। এর মধ্যে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য যথেষ্ট চিন্তার খোরাক রয়েছে।[৭]

এমন কেউ নেই যার জন্য তত্ত্বাবধায়ক নেই

আকাশ এবং তারিক-এর শপথ করে আল্লাহ تعالىবলছেন যে, প্রতিটি আত্মার উপর তত্ত্বাবধায়ক আছে। আমাদের প্রতিটি কাজ লক্ষ করা হচ্ছে। আমাদের মাথার উপরে যেমন আকাশ সবসময় রয়েছে, তেমনি এই তত্ত্বাবধায়করা আমাদের উপর সবসময় লক্ষ্য রাখছেন। তারিক যেমন মহাবিশ্বে কল্পনাতীত দূরত্ব অতিক্রম করে, বিশাল সব বাধা বিদীর্ণ করে পৃথিবীর আকাশে এসে জ্বল-জ্বল করে, তেমনি আমরা যেখানেই থাকি না কেন, এই তত্ত্বাবধায়করা সবকিছু ভেদ করে আমাদেরকে ঠিকই দেখতে পান। আমরা যেন কখনো মনে না করি যে, দরজা বন্ধ করে যখন চুপেচাপে কুকর্ম করি, তখন আমাদেরকে কেউ দেখতে পায় না। আমাদের তত্ত্বাবধায়করা সব লক্ষ্য রাখছেন।[৪][৭][১৭][১৮]
সামান্য এক ফোটা তরল থেকে একসময় মানুষের একটি ভ্রূণ তৈরি হয়। এই ভ্রূণটি মায়ের গর্ভের দেয়ালকে পরিবর্তন করে নেয়, যেন সে যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর রক্ত পেতে পারে। তারপর এককোষী ভ্রূণটি কোষ বিভাজনের মাধ্যমে দুটি, দুটি থেকে চারটি, চারটি থেকে আটটি, এভাবে বাড়তে থাকে। এর মধ্যে একটি কোষ যাত্রা শুরু করে চোখ তৈরি করার জন্য। সেই কোষটি বিশেষ একটি জায়গায় পৌঁছে সেখান থেকে চোখ তৈরি করা শুরু করে। কোষটি কীভাবে যেন অন্যান্য কোষের সাথে যোগাযোগ করে বুঝে যায় যে, সে এখন দেহের কোন অবস্থানে আছে এবং এই অবস্থানে তাকে ঠিক কী করতে হবে। তারপর কোষগুলো একসময় কীভাবে যেন বুঝে যায় যে, চোখ তৈরি করার শেষ, এখন নাক তৈরি করতে হবে।
একটি মানবদেহ তৈরির এই যে বিশাল জটিল প্রক্রিয়া, কোটি কোটি কোষকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা, প্রতিটি কোষকে জানিয়ে দেয়া সে কোথায় আছে, কী করতে হবে —এগুলো দেখলে মনে হয়, নিশ্চয়ই কোনো তত্ত্বাবধায়ক রয়েছেন, যে বা যারা কোটি কোটি কোষকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে��

তাই মানুষ ভেবে দেখুক কীসের থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সবেগে বের হওয়া তরল থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্যে থেকে সে বেড়িয়ে আসে।

মানুষ ভেবে দেখুক তার সূচনা হয় কত তুচ্ছ ব্যাপার থেকে। সামান্য কিছু তরল, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই, সেখান থেকেই একটি পুর্ণাঙ্গ প্রাণী সৃষ্টি হয়। কীভাবে সামান্য কিছু তরলের মধ্যে একটি পুরো মানুষ তৈরি করার ডিজাইন সংরক্ষণ করা থাকে? কীভাবে তা বাবা-মা’র বৈশিষ্ট্যগুলো রেকর্ড করে রাখে? কীভাবে সামান্য একটি তরল থেকে হাত, পা, মাথা গজিয়ে, জায়গামতো চোখ, কান, মুখ বসে, নিখুঁত এক মানুষ তৈরি হয়?
এই আয়াতের অর্থ নিয়ে বিপুল বিতর্ক হয়েছে, কারণ এই আয়াতের অর্থ অনেকে করেছেন, “সজোরে বের হওয়া বীর্য থেকে, যা নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্য থেকে বেড়িয়ে আসে”। —এই আয়াত নিয়ে প্রাচীন তাফসিরগুলোতে বিজ্ঞান বিরোধী ব্যক্তিগত মতামত রয়েছে, যা ইসলাম বিদ্বেষীরা কুরআনকে ভুল প্রমাণ করতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ইসলাম বিদ্বেষীরা দাবি করে যে, বীর্য যেহেতু যৌনাঙ্গ থেকে বের হয়, নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্য থেকে নয়, তাই কুরআনে ভুল কথা লেখা আছে। তারা এটাও দাবি করে যে, প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একই ভুল কথা বলে গেছে। কুরআনে আসলে সেটাই কপি করা হয়েছে।
প্রথমত, এই আয়াতে মোটেও বীর্য, যার আরবি মানী, তার উল্লেখ নেই। মানী অন্য সূরাহ্‌য় ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূরাহ্‌য় তরল-এর কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানমনস্কদের আসলে চিকিৎসা-বিজ্ঞান সম্পর্কেও ভালো ধারনা নেই, কারণ থাকলে তারা জানতো যে, যে তরল বের হয়, তার মধ্যে মাত্র চার থেকে সাত শতাংশ থাকে বীর্য। বাকি তরলে নানা ধরনের যৌগ, পিচ্ছিল করার জন্য শ্লেষ্মা, নারী অঙ্গের এসিডিটি কমিয়ে শুক্রাণুর ধ্বংস প্রতিরোধ করার জন্য ক্ষারীয় যৌগ ইত্যাদি অনেক কিছুই থাকে। এগুলোর কোনটাই যৌনাঙ্গ থেকে বের হ��� না। বরং এগুলো সব তৈরি হয় নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মাঝামাঝি থাকা বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গ থেকে।[৪৩৩]
তৃতীয়ত, এই আয়াতের অনুবাদ এটাও হয় যে, “নিতম্ব এবং পাঁজরের হাড়ের মধ্যে থেকে সে বেড়িয়ে আসে।” —এখানে তরলের বের হওয়ার কথা নয়, বরং মানুষের বের হওয়ার কথা বলা আছে। যেভাবে কিনা এর পরের আয়াতেই ‘সে’ বলতে মানুষের কথা বলা হয়েছে। আগের এবং পরের আয়াতের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখলে, এখানে আসলে মানুষের বের হওয়ার কথাই যুক্তিযুক্ত হয়, তরলের বের হওয়া নয়।

অবশ্যই তিনি পারেন তাকে পুনরায় জীবন দিতে

আল্লাহ تعالى যদি মানুষের দেহ তৈরির এত জটিল কাজটি প্রথমবার করতে পারেন, তাহলে তিনি কি আরেকবার সেটা করতে পারবেন না? প্রথম বার কোনো কিছু বানানো বেশি কঠিন, নাকি দ্বিতীয়বার?
অনেকে মনে করে যে, মানুষের অস্তিত্ব শুধুমাত্র তার দেহের মধ্যেই সীমিত। দেহ ধ্বংস হয়ে গেলে আর কোনোভাবেই একটি মানুষকে পুনরায় তৈরি করা সম্ভব নয়। মানুষের দেহের কাঁচামাল ব্যবহার করে হয়ত আরেকটি ভিন্ন কোনো মানুষ তৈরি করা যাবে। কিন্তু কখনোই একজন মানুষকে হুবহু একইভাবে আবার তৈরি করা যাবে না। অর্থাৎ মানুষের পুনরুত্থান হওয়া সম্ভব নয়।
তাদের এই ধারনার ভিত্তি হচ্ছে: একজন মানুষের সারা জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব, চেতনা —এই সব কিছুই আছে তার মস্তিষ্কে। তাই মস্তিষ্ক ধ্বংস হয়ে গেলে, কোনোভাবেই আরেকটি মস্তিষ্কে হুবহু একই অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব এবং চেতনা তৈরি করা সম্ভব নয়। —মানুষের এই ধারনার ভিত্তি হলো, মানুষ মনে করে যে, মহাবিশ্বে বস্তু এবং শক্তি ছাড়া আর মৌলিক কিছুই নেই। সবকিছুই সৃষ্টি হয় বস্তু এবং শক্তির মাধ্যমে। সৃষ্টিজগত চার মাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ — দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, সময়।
তারা ধরে নিয়েছে যে, বস্তু এবং শক্তি নিজেরাই পরিকল্পনা করে একে অন্যকে কোনোভাবে ব্যবহার করে পুরো মহাবিশ্ব তৈরি করেছে। এদের ভেতরে এতই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা থাকে যে, এরা মহাবিশ্বের মত কল্পনাতীত সুশৃঙ্খল বিশাল এক সৃষ্টিজগত নিজে থেকেই সৃষ্টি করতে পারে। —এই ধারনায় বিশ্বাসী মানুষদের দাবি হচ্ছে যে, মানুষের যে চেতনা রয়েছে, সেটা আসলে মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা বস্তু এবং শক্তির সমন্বয়ে তৈরি। তারা জানে না যে, মানুষের চেতনা কী, সেটা কোথায় থাকে, কীভাবে তার সৃষ্টি হয় —এটা বিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন। এর সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি।[৪৩৪][৪৩৫]
বিংশ শতাব্দীর পদার্থ বিজ্ঞানে তিনটি বড় অগ্রগতি হলো কোয়ান্টাম ফিজিক্স, স্ট্রিং-থিওরি এবং ইনফরমেশন থিওরি। পদার্থ বিজ্ঞানের বহু সমস্যা রয়েছে যেগুলোর এখনো কোনো সমাধান নেই। শুধুই বস্তু এবং শক্তি সেই সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে পারে না। সেই ঘটনাগুলোকে ব্যখ্যা করার জন্য মহাবিশ্বে আরেকটি মৌলিক ব্যাপার দরকার এবং আরও কয়েকটি মাত্রা দরকার। ইনফরমেশন থিওরি দাবি করে যে, মহাবিশ্বের মৌলিক ব্যাপার বস্তু এবং শক্তি নয়, বরং সেটি হচ্ছে ‘তথ্য’। এই তথ্য-তত্ত্ব অনুসারে সবকিছু হয়ত বস্তু এবং শক্তি দিয়ে তৈরি, কিন্তু কীভাবে তা তৈরি করতে হবে এবং কীভাবে তা অস্তিত্ব নিয়ে থাকবে —সেটা হচ্ছে তথ্য।
যেমন, ডিএনএ তৈরি বস্তু এবং শক্তি দিয়ে। কিন্তু ডিএনএ-এর মধ্যে যে নির্দেশমালা দেওয়া আছে, তা হচ্ছে তথ্য। এই তথ্য পুরোপুরি নির্বোধ কিছু বস্তু এবং শক্তিকে বলে দেয় কীভাবে একটি প্রাণ তৈরি করতে হবে। আবার, কোষ তৈরি বস্তু এবং শক্তি দিয়ে। কিন্তু কোষের মধ্যে যে জটিল সব প্রোগ্রাম দেওয়া হয়েছে ডিএনএ পড়ে, বুঝে, তারপর সে অনুসারে কাজ করার, এমনকি ডিএনএ-তে ত্রুটি ধরা পড়লে তার অনেকখানি সংশোধন করার—এগুলো হচ্ছে তথ্য। এই তথ্যই বুদ্ধিহীন কোষকে দিয়ে পরিকল্পনা মোতাবেক এমন সব জটিল কাজ করায়, যা বোঝার জন্য উচ্চপর্যায়ের বুদ্ধি দরকার।
পানির অণু শক্তি দিয়ে তৈরি। কিন্তু পানির অণুর যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো রয়েছে, যা প্রকৃতিতে আর কোনো তরলের নেই— বিশেষ হাইড্রোজেন বন্ধন, চার ডিগ্রি তাপমাত্রায় একই সাথে কঠিন, তরল এবং বায়বীয় অবস্থায় থাকার বিশেষ গুণ, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রায় বাষ্প হওয়া, সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠ টান —এগুলোর সবই প্রাণের বিকাশের জন্য বিশেষভাবে পানিতে রয়েছে—এগুলো সবই হচ্ছে তথ্য। পানির অণুকে দেখলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, একে বানানোই হয়েছে প্রাণ সৃষ্টির জন্য।[৪৩৬]
একারণেই অনেক বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন যে, এই মহাবিশ্ব আসলে এক বিশাল যন্ত্র, যা তাকে দেওয়া তথ্য অনুসারে চলে। মহাবিশ্বের সূচনা থেকে শুরু করে, বস্তু, শক্তি সৃষ্টি, নক্ষত্র, গ্রহ, কৃষ্ণগহ্বর ইত্যাদি তৈরি করার পরিকল্পনা এবং প্রাণ সৃষ্টির যাবতীয় পরিকল্পনা এবং ছক—সব কিছুই তথ্য আকারে মহাবিশ্বকে দেওয়া হয়েছে। মহাবিশ্ব এক বিশাল কম্পিউটারের মতো শুধুই সেই তথ্য প্রক্রিয়া করছে।[৪৩৪]
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই তথ্যের উৎস কোথায়? কে বা কী এই বিশাল পরিমাণের তথ্যের সূচনা করলো? এই তথ্য সংরক্ষণ হয় কীভাবে? এই তথ্য শেষ পর্যন্ত যায় কোথায়?
একজন মানুষ শুধুই কিছু বস্তু এবং শক্তির আধার নয়, একই সাথে তথ্যের আধার। দেহের মৃত্যু হলে তার দেহের মধ্যে থাকা বস্তু এবং শক্তি হয়ত মহাবিশ্বে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু তথ্য কোথায় যায়? এই তথ্যকে সংরক্ষণ করে রাখলে একই মানুষ আবারো তৈরি করা সম্ভব। সেই প্রযুক্তি মানুষের নেই। কিন্তু যে এই মহাবিশ্ব তৈরি করেছে, তার কাছে প্রযুক্তির কোনো অভাব নেই। সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে মানুষের যাবতীয় তর্ক শুনলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তারা মনে করে সৃষ্টিকর্তা মানুষের থেকে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে হয়ত হাজার বা লক্ষ বছর এগিয়ে আছে, এর বেশি কিছু না। এই সব মানুষরা তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে কোনোভাবেই কল্পনা করতে পারে না যে, সৃষ্টিকর্তা বলতে আসলে কী পর্যায়ের ক্ষমতার ধারনা বোঝায়।
যাদের মেনে নিতে কষ্ট হয় যে, তার দেহ যখন অণু পরমাণুতে পরিণত হয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে যাবে, তারপর কীভাবে তাকে আবার হুবহু একইভাবে তৈরি করা সম্ভব এবং কীভাবে তার সমস্ত স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? —তাদের সমস্যা হচ্ছে তাদের যাবতীয় চিন্তাভাবনা বস্তু এবং শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাইরে মৌলিক কোনো কিছু মহাবিশ্বে থাকতে পারে, যা তাদের অস্তিত্বকে ধরে রাখতে পারে, তা তাদের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়।

যেদিন সব গোপন কিছুকে প্রকাশ করে দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। তখন মানুষের কোনো শক্তি থাকবে না, কোনো সাহায্যকারীও থাকবে না।
শপথ আকাশের যা ফিরিয়ে দেয়। শপথ মাটির যা ফেটে বের করে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া বাণী। এটা কোনো হাঁসি-ঠাট্টার বিষয় নয়। নিশ্চয়ই তারা এক কৌশল ফাঁদছে। আমিও এক কৌশল ফাঁদছি। থাক, ছেড়ে দাও অবিশ্বাসীদের কিছুটা সময়ের জন্য। —আত-তারিক ৯-১৭

যেদিন সব গোপন কিছুকে প্রকাশ করে দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। তখন মানুষের কোনো শক্তি থাকবে না, কোনো সাহায্যকারীও থাকবে না।

আমাদের পুরো অস্তিত্ব রেকর্ড করা হচ্ছে। একদিন এই রেকর্ড এক অভিনব প্রযুক্তিতে রিপ্লে করে দেখানো হবে। আমাদের প্রতিটি কথা, কাজ সেদিন আমরা অসহায়ের মতো দেখতে থাকবো। সেদিন মানুষের কোনো ক্ষমতা থাকবে না কারচুপি করার, কোনো কিছু ধামাচাপা দেয়ার। সমস্ত গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। ছাত্র সংগঠন, ভাড়াটে মস্তান, টাকা খাইয়ে কিনে রাখা আইনের রক্ষক — কেউ পারবে না কোনো ধরনের সাহায্য করতে। আল্লাহর تعالى আদালতে কারো ক্ষমতা নেই জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়ার।

শপথ আকাশের যা ফিরিয়ে দেয়

প্রতিদিন প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন পানি, অর্থাৎ প্রায় দশ লক্ষ-কোটি টন পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে আকাশে চলে যায়। তারপর প্রায় সেই একই পরিমাণ পানি এক সময় বৃষ্টি হয়ে আকাশ থেকে ফিরে আসে। এভাবে প্রতি বছর প্রায় সমান পরিমাণের পানি আকাশে যায় এবং আকাশ থেকে ফিরে আসে। যদি এই ভারসাম্য বজায় না থাকতো, তাহলে সমুদ্র, নদীনালা থেকে ক্রমাগত পানি কমতে কমতে সেগুলো শুকিয়ে যেত, না হলে বৃষ্টি বেশি হতে হতে একসময় আকাশ মেঘ শুন্য হয়ে যেত। কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে পানির আকাশে উঠে যাওয়া এবং ফিরে আসার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।[৪৩৭]

শপথ মাটির যা ফেটে বের করে দেয়

মাটির ভেতরে অন্ধকারে ডুবে থাকা একটি বীজ থেকে কীভাবে চারা হয়? আমরা জানি গাছ বড় হয় সূর্যের আলোর শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু মাটির ভেতরে থাকা বীজ তো কোনো আলো পাচ্ছে না। তাহলে সেটা থেকে চারা তৈরি হওয়ার শক্তি আসে কোথা থেকে? বীজ থেকে ছোট একটা কাণ্ড মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে পাতা গজিয়ে সূর্যের আলো আহরণ করা পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণের শক্তি দরকার, তা ছোট একটা বীজের মধ্যে গাছ কীভাবে ঢুকিয়ে দেয়?
বীজ থেকে চারা বের হওয়ার সময় সেটাকে মাটির উপরে উঠতে হবে, কীভাবে তা বুঝতে পারে? একটা বীজ কীভাবে বোঝে উপর দিক কোনটা? এছাড়াও কিছু বীজ বিশেষ তাপমাত্রা, আদ্রতা এবং সূর্যের আলোর প্রখরতায় চারা জন্ম দেয়, না হলে দেয় না। তাপমাত্রা, আদ্রতা, আলোর তীব্রতা মাপার যন্ত্র বীজের মধ্যে এলো কী করে?
একটি ছোট বীজের মধ্যেও আল্লাহ تعالى কত জটিল ছক এবং পরিকল্পনা দিয়ে রেখেছেন। সামান্য এক একেকটি বীজ যেন একেকটি ছোট ফ্যাক্টরি, যার নিজস্ব জেনারেটর আছে, কাঁচামাল সংরক্ষণ করার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম আছে এবং আশেপাশের আবহাওয়া পরিমাপ করার জন্য এন্টেনা আছে। নানা ধরনের তথ্য প্রক্রিয়া করে সঠিক সময়ে অঙ্কুরদগম শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ক্ষুদ্র কম্পিউটারও আছে।
একইভাবে, মাটির মধ্যেও বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে। মানুষ এখন পর্যন্ত তার স��মান্যই বের করতে পেরেছে। মাটির গঠন, মাটিতে মিশে থাকা রাসায়নিক যৌগ, পানির প্রবাহের ব্যবস্থা, অণুজীব ধরে রাখার ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে হাজার বছর ধরে গবেষণা হচ্ছে। মৃত্তিকা-বিজ্ঞান নামে বিজ্ঞানের বিশাল শাখা আছে মাটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য। আল্লাহ যখন মাটির বের করে দেওয়া বৈশিষ্ট্যের শপথ নেন, তার মানে মাটির মধ্যে বিরাট সব ব্যাপার রয়েছে। চিন্তাশীল মানুষ যেন চিন্তা করে দেখে।
মাটির বের করে দেওয়ার চরম নিদর্শন আমরা দেখবো কিয়ামতের দিন। সেদিন পৃথিবী তার ভেতরের সব তথ্য বের করে দেবে। সমস্ত মানুষকে সে পুনরায় তৈরি করে ছিটকে বের করে দেবে। সুরাহ যিলযাল-এ আল্লাহ تعالى সেই ভয়ংকর দিনের চিত্র আমাদেরকে বলে দিয়েছেন।

নিঃসন্দেহে এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া বাণী। এটা কোনো হাঁসি-ঠাট্টার বিষয় নয়।

এরপরও কিছু মানুষের কাছে পুনরুত্থান, কিয়ামতের বিচার, জান্নাত, জাহান্নাম —এগুলো সব রূপকথার গল্প মনে হয়। তারা মনে করে, এগুলো মানুষের বানানো ধারনা, যা তারা উদ্ভাবন করেছে নিজেদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। দুনিয়াতে যেহেতু মানুষ অনেক অন্যায়, অবিচার সহ্য করে একসময় মারা যায়, দুর্বল মানুষ শক্তিশালী মানুষের কাছে অসহায়ের মতো নির্যাতিত হয় —তাই নিজেদেরকে কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মৃত্যুর পরে যে এক জীবন আছে, যেই জীবনে গিয়ে সে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবে, তার সাথে যারা অন্যায় করেছে, তাদের উচিত শাস্তি হবে —এই সব কাল্পনিক ধারনা নিয়ে এসেছে। এগুলো আসলে হতাশাকর এই জীবনে কিছু আশা এবং সান্ত্বনার বুলি ছাড়া আর কিছু নয়। স্বল্পশিক্ষিত, চিন্তার গভীরতা নেই এমন মানুষেরাই এই সব হাস্যকর ধারনায় বিশ্বাস করে।
—যাদের জ্ঞান আছে, প্রজ্ঞা আছে এবং সর্বোপরি বিবেক-বুদ্ধি আছে, তারা কুরআনে দেওয়া তথ্য এবং যুক্তির গভীরতা উপলব্ধি করে ঠিকই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে যে, এটা কোনোভাবেই মানুষের বানানো হতে পারে না। এটা নিঃসন্দেহে মানুষ থেকে উচ্চতর কোনো সত্তার বাণী। সেই উচ্চতর সত্তা যদি নিজেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বলে দাবি করে, তাহলে তা অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নেই। যখন এই সিদ্ধান্তে কেউ পৌঁছাবে, তখন সে মেনে নেবে যে, এই বাণীর উপরে আর কোনো কথা থাকতে পারে না। এটাই চুড়ান্ত মত। এর বিপরীতে আমাদের মতের কোনোই মূল্য নেই।
সুতরাং যারাই ধর্ম নিয়ে সন্দেহে আছে, তাদের কাজ হচ্ছে যাবতীয় ইতিহাস, দলীয় মতামত, মুসলিমরা কী অন্যায় করছে ―এগুলো সব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কুরআনের বাণীকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দেখা। যদি কুরআনের বাণী তার কাছে প্রমাণিত হয় যে, এটা মানুষের বুদ্ধিমত্তার ঊর্ধ্বে বাণী, তাহলে সেই বাণীকে উপেক্ষা করার পেছনে আর কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

নিশ্চয়ই তারা এক কৌশল ফাঁদছে। আমিও এক কৌশল ফাঁদছি। থাক, ছেড়ে দাও অবিশ্বাসীদের কয়েকটা দিনের জন্য।

“ভাই, ইসরাইলীরা ব্যবসা বাণিজ্য, মিডিয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা সব দখল করে ফেলছে। সব জায়গায় তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। ইলিউমিনাটি সংগঠন আজকে পৃথিবীর সব বড় শক্তিগুলোর কলকব্জা নাড়ছে। তাদের পরিকল্পনা থেকেই সিরিয়া, গাজা, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, কাশ্মীরসহ সব জায়গায় মুসলিমদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ইলিউমিনাটি ব্যাংকাররা বিশ্বের সকল দেশের ঋণ ব্যবস্থাকে দখলে নিয়েছে। কাফিররা আমাদের অগোচরে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম সব কিছু ধ্বংস করে দেয়ার জন্য বিপুল লোকবল এবং পুঁজি নিয়ে কাজ করছে।”
—করুক। আল্লাহও تعالى তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করে রেখেছেন। সময় আসলেই আমরা আল্লাহর تعالى পরিকল্পনা দেখতে পারবো। তাদের বহু চক্রান্ত আল্লাহ تعالى আগেও ধ্বংস করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও দেবেন। আমাদের অগোচরে প্রতিনিয়ত তাদের কত মতলব, উদ্যোগ বিফল হয়ে যাচ্ছে, সেটা হয়ত আমরা জানিও না। যে বিশাল পরিমাণের লোকবল এবং পুঁজি ��িয়ে তারা কাজ করছে, তাতে মুসলিমদের এতদিনে সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত হওয়ার কথা। সেটা তো হচ্ছেই না, বরং পাশ্চাত্যে সবচেয়ে দ্রুত যে ধর্মের প্রসার হচ্ছে, তা হলো ইসলাম। নিশ্চয়ই সেটা আল্লাহরই تعالى পরিকল্পনার ফসল।
তাই, অমূলক দুশ্চিন্তা না করে আমাদের এই আয়াত থেকে শিক্ষা নিতে হবে যে, কাফিররা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ইসলামের ক্ষতি করার জন্য সব সময়ই চেষ্টা করেছে। আমাদেরকেও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী হওয়ার জন্য সবসময় চেষ্টা করতে হবে। আমাদের মধ্যে যত বিরোধ, দলাদলি, বিভক্তি হবে, আমরা তত দুর্বল হয়ে যাবো। নিজেদের মধ্যে পার্থক্যগুলো দূরে রেখে শত্রুদের মোকাবেলায় আমাদের এক হতে হবে।
তবে, এই ভেবে বসে থাকলে হবে না যে, আল্লাহ تعالى তো কৌশল করছেনই। আমার আর কী করার আছে? আমি বসে বসে দেখি কীভাবে সব কাফিরদের আল্লাহ تعالى একে একে ধ্বংস করে দেন। —না, বরং আমাদেরকে কুরআন পড়ে দেখতে হবে— কীভাবে আগের প্রজন্মের মুসলিমরা কাফিরদের বিরুদ্ধে এক হয়ে সংগ্রাম করে গেছে মুসলিম জাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। তখন আল্লাহর تعالى পরিকল্পনা, কৌশল সবই ছিল। কিন্তু সেগুলোর কিছুটা বাস্তবায়ন হয়েছে মুসলিমদের ত্যাগ, উদ্যোগ এবং নিরলস সংগ্রামের মধ্য দিয়েই। তাই, আল্লাহর تعالى পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা যে যতভাবে পারি নিজেদেরকে উৎসর্গ করবো। কিয়ামতের দিন গিয়ে যেন বলতে পারি, মুসলিমদের রক্ষায় এবং ইসলামের প্রসারে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। শুধুই অন্যের অর্জনের সুফল ভোগ করছিলাম না।
[১] বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর। [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ। [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি। [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী। [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি। [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী। [৯] বায়��ন আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ। [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ। [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস। [১৪] তাফসির আল কুরতুবি। [১৫] তাফসির আল জালালাইন। [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ। [১৭] তাফসীর আহসানুল বায়ান — ইসলামিক সেন্টার, আল-মাজমাআহ, সউদি আরব [১৮] কু’রআনুল কারীম – বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর — বাদশাহ ফাহাদ কু’রআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স। [১৯] তাফসির আল-কাবির। [২০] তাফসির আল-কাশ্‌শাফ। [৪৩২] What Is a Supernova?. (2018). Retrieved from https://www.nasa.gov/audience/forstudents/5-8/features/nasa-knows/what-is-a-supernova.htm [৪৩৩] Commentary on the verse “He is created from a water gushing forth, P. (2018). Commentary on the verse “He is created from a water gushing forth, Proceeding from between the back-bone and the ribs” [at-Taariq 86:6-7] – Islam Question & Answer. Retrieved from https://islamqa.info/en/answers/118879/commentary-on-the-verse-he-is-created-from-a-water-gushing-forth%C2%A0proceeding-from-between-the-back-bone-and-the-ribs-at-taariq-866-7 [৪৩৪] Koch, C. (2018, June 01). What Is Consciousness? Retrieved from https://www.scientificamerican.com/article/what-is-consciousness/ [৪৩৫] Azarian, Bobby. “Neuroscience’s New Consciousness Theory Is Spiritual.” The Huffington Post, TheHuffingtonPost.com, 7 Dec. 2017, www.huffingtonpost.com/bobby-azarian/post_10079_b_8160914.html. [৪৩৬] Libretexts. “Unusual Properties of Water.” Chemistry LibreTexts, National Science Foundation, 26 Nov. 2018, chem.libretexts.org/Textbook_Maps/Physical_and_Theoretical_Chemistry_Textbook_Maps/Supplemental_Modules_(Physical_and_Theoretical_Chemistry)/Physical_Properties_of_Matter/States_of_Matter/Properties_of_Liquids/Unusual_Properties_of_Water. [৪৩৭] 100 Amazing Water Facts You Should Know. (n.d.). Retrieved from https://www.seametrics.com/blog/water-facts/
[ ]

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Dhaka