Poem Education

Poem Education সব ধরনের কবিতা,গল্প,গান, নাটক, উপন্যাস ও মনিষীদের বাণী পেতে আমাদের পেইজটিকে Follow করুন।


fb.com/stars
(4)

27/09/2026
"হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ"---- কাজী নজরুল ইসলামমাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণসজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্...
27/09/2026

"হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ"
---- কাজী নজরুল ইসলাম
মাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ
সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান!
ছিল যারা চির-মরণ-আহত,
উঠিয়াছে জাগি’ ব্যথা-জাগ্রত,
’খালেদ’ আবার ধরিয়াছে অসি, ’অর্জুন’ ছোঁড়ে বাণ।
জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান!

মরিছে হিন্দু, মরে মুসলিম এ উহার ঘায়ে আজ,
বেঁচে আছে যারা মরিতেছে তারা, এ-মরণে নাহি লাজ।
জেগেছে শক্তি তাই হানাহানি,
অস্ত্রে অস্ত্রে নব জানাজানি।
আজি পরীক্ষা-কাহার দস্ত হয়েছে কত দারাজ!
কে মরিবে কাল সম্মুখে-রণে, মরিতে কা’রা নারাজ।

মূর্চ্ছাতুরের কন্ঠে শুনে যা জীবনের কোলাহল,
উঠবে অমৃত, দেরি নাই আর, উঠিয়াছে হলাহল।
থামিসনে তোরা, চালা মন্থন!
উঠেছে কাফের, উঠেছে যবন;
উঠিবে এবার সত্য হিন্দু-মুসলিম মহাবল।
জেগেছিস তোরা, জেগেছে বিধাতা, ন’ড়েছে খোদার কল।

আজি ওস্তাদে-শাগরেদে যেন শক্তির পরিচয়।
মেরে মেরে কাল করিতেছে ভীরু ভারতের নির্ভয়।
হেরিতেছে কাল,-কবজি কি মুঠি
ঈষৎ আঘাতে পড়ে কি-না টুটি’,
মারিতে মারিতে কে হ’ল যোগ্য, কে করিবে রণ-জয়!
এ ’মক্ ফাইটে’ কোন্ সেনানীর বুদ্ধি হয়নি লয়!

ক’ ফোঁটা রক্ত দেখিয়া কে বীর টানিতেছে লেপ-কাঁথা!
ফেলে রেখে অসি মাখিয়াছে মসি, বকিছে প্রলাপ যা-তা!
হায়, এই সব দুর্বল-চেতা
হবে অনাগত বিপ্লব-নেতা!
ঝড় সাইক্লোনে কি করিবে এরা! ঘূর্ণিতে ঘোরে মাখা?
রক্ত-সিন্ধু সাঁতরিবে কা’রা-করে পরীক্ষা ধাতা।

তোদেরি আঘাতে টুটেছে তোদের মন্দির মসজিদ,
পরাধীনদের কলুষিত ক’রে উঠেছিল যার ভিত!
খোদা খোদ যেন করিতেছে লয়
পরাধীনদের উপাসনালয়!
স্বাধীন হাতের পূত মাটি দিয়া রচিবে বেদী শহীদ।
টুটিয়াছে চূড়া? ওরে ঐ সাথে টুটিছে তোদের নিঁদ!

কে কাহারে মারে, ঘোচেনি ধন্দ, টুটেনি অন্ধকার,
জানে না আঁধারে শত্রু ভাবিয়া আত্মীয়ে হানে মার!
উদিবে অরুণ,ঘুচিবে ধন্দ,
ফুটিবে দৃষ্টি, টুটিবে বন্ধ,
হেরিবে মেরেছে আপনার ভায়ে বদ্ধ করিয়া দ্বার!
ভারত-ভাগ্য ক’রেছে আহত ত্রিশূল ও তরবার!

যে-লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির-চূড়া,
সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া!
প্রভাতে হবে না ভায়ে-ভায়ে রণ,
চিনিবে শত্রু, চিনিবে স্বজন।
করুক কলহ-জেগেছে তো তবু-বিজয়-কেতন উড়া!
ল্যাজে তোর যদি লেগেছে আগুন, স্বর্ণলঙ্কা পুড়া!

ফণি-মনসা ( কাব্যগ্রন্থ)

"কবর"জসীম উদ্‌দীন (রাখালী কাব্যগ্রন্থ থেকে পুরো কবিতা দেওয়া হলো )এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,তিরিশ বছর ভিজায়ে...
26/09/2026

"কবর"
জসীম উদ্‌দীন
(রাখালী কাব্যগ্রন্থ থেকে পুরো কবিতা দেওয়া হলো )

এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!
সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।
এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে
ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।

বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা
আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু' পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!
হেস না­ হেস না­ শোন দাদু, সেই তামাক মাজন পেয়ে,
দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,
পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখিজলে।
আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়,
আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।

তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।

এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,
বা-জান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।
ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,
সেই শোওয়া তার শেষ শোওয়া হবে তাহা কী জানিত কেউ?
গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?
তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!

তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জঢ়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।

ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,
কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।
তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।
মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,
বড় ব্যথা র’ল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষী আমার ওরে,
কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।
ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন­জলে,
কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ­ব্যথার ছলে।

ক্ষণপরে মোরে ডাকিয়া কহিল­ আমার কবর গায়
স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।
সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু­ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনকি­মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;
ভেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!

এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।
এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,
হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে
দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।
শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে
অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,
কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।
বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ­বীণ!
কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে।

ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,
কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।
আমার বু­জীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।

হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,
রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,
অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!
ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।
বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।

একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।
সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।
কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।
আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,
দাদু! ধর­ধর­ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।
এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,
কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম­ভোলা মোর যাদু।
আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,
দীন দুনিয়ার ভেস্ত আমার ঘুমায় কিসের চলে!
ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুর,
মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূর।
জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।
ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু­ব্যথিত প্রাণ।

#স্টার

fans

26/09/2026

সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে"—

__ নজরুল ইসলাম।

‘‘একটি চেক, একজন কবি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসে এক নীরব মুহূর্ত’’একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি কখনো কখনো একটি দীর্ঘ ইতিহাসকে এমন...
25/09/2026

‘‘একটি চেক, একজন কবি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসে এক নীরব মুহূর্ত’’
একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি কখনো কখনো একটি দীর্ঘ ইতিহাসকে এমনভাবে ধারণ করে, যা বহু পৃষ্ঠার ইতিহাসগ্রন্থও পারে না। ছবির ভেতরে শব্দ নেই, বক্তৃতা নেই, যুদ্ধক্ষেত্র নেই, মিছিল নেই, বন্দুক নেই; আছে একজন অসুস্থ প্রবীণ কবি, তাঁর চারপাশে কয়েকজন মানুষ, আর একটি কাগজ—যার আর্থিক মূল্য ছিল ২,১০০ রুপি। কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে সেই কাগজ কেবল একটি চেক ছিল না। সেটি ছিল এক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার সাংস্কৃতিক স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার একটি ছোট অথচ অর্থবহ অঙ্গভঙ্গি। ১৯৭১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলামের বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কবির বকেয়া মাসিক ভাতার চেক দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরেই এই ছবিটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দিনপঞ্জি এবং সমকালীন ঘটনার পুনর্গঠনকারী বিভিন্ন সূত্রে এই তারিখ, স্থান ও অর্থের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ছবিটির দিকে তাকালে প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা ইতিহাসের চেয়ে বেশি মানবিক। একদিকে বসে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম—বাংলা ভাষার বিদ্রোহী কণ্ঠ, সাম্য ও মানবমুক্তির কবি, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরা মানুষ; অন্যদিকে এমন এক সময়, যখন তাঁর নিজের শরীর প্রায় নিস্তব্ধ, অথচ তাঁর লেখা, তাঁর গান এবং তাঁর উচ্চারণ তখনও একটি জাতির রাজনৈতিক ও নৈতিক চেতনার মধ্যে সক্রিয়। তাঁর শরীরের দুর্বলতা এবং তাঁর কবিতার শক্তির এই বৈপরীত্য ছবিটিকে গভীর করে তোলে। মানুষটি তখন কথা বলার, লেখার কিংবা নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না; কিন্তু ইতিহাস তাঁর হয়ে কথা বলছিল।

নজরুলের জীবনের শেষ পর্বটি বুঝতে হলে এই ছবির পেছনের দীর্ঘ আর্থিক ইতিহাসটিও জানতে হয়। ১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর কবির উপার্জনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার পরিচালনার জন্য তাঁকে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে তাঁর চিকিৎসা ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য একটি নাগরিক উদ্যোগ গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে অবিভক্ত বাংলার সরকারও তাঁকে সাহিত্যিক বৃত্তি প্রদান করে। পরে ভারত ও পাকিস্তান—দুই সরকারের পক্ষ থেকেই বিভিন্ন সময়ে তাঁর জন্য ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাওয়া এই সাহিত্যিক ভাতা পরবর্তী সময়ে মাসিক ৩৫০ রুপিতে উন্নীত হয়েছিল।

এখানেই ছবিটির রাজনৈতিক ইতিহাস শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক অভিযান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নজরুলের পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রব্যবস্থা এতদিন তাঁকে একটি সাহিত্যিক ভাতা দিত, সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে সেই আর্থিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায়। আগস্ট ১৯৭১-এর একটি সমকালীন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কবি মার্চ থেকে আর পাকিস্তান সরকারের ভাতা পাননি। একই সময়ে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছেও সাহায্যের আবেদন করা হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের এক আশ্চর্য বাঁক হলো, যে সময় বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় কাঠামো তখনও যুদ্ধের মধ্যে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, কোটি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, শরণার্থীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে—সেই সময়ও বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার একজন অসুস্থ কবির কথা ভুলে যায়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ আগস্টের মন্ত্রিসভা বৈঠকে কাজী নজরুল ইসলামকে মাসিক ৩৫০ টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমকালীন সূত্রে সিদ্ধান্তটির কারণ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কবির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছিল।

এই জায়গায় একটি দার্শনিক প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—একটি রাষ্ট্রের জন্মের মুহূর্তে একজন কবির জন্য ৩৫০ টাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে?

অর্থের পরিমাণ দিয়ে এই ঘটনাটির অর্থ বোঝা যায় না। ২,১০০ রুপি দিয়ে একটি রাষ্ট্র তৈরি হয় না, যুদ্ধ পরিচালিত হয় না, স্বাধীনতা অর্জিত হয় না। কিন্তু রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইন ও অর্থনীতির সমষ্টি নয়। একটি রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে তার স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও জড়িত থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম কেবল একটি প্রশাসনিক ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। নজরুল সেই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ।

নজরুলকে তাই এখানে শুধু একজন ভাতা-প্রাপক হিসেবে দেখলে ছবিটির গভীরতা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি এমন একজন কবি, যাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে বিদ্রোহ, সাম্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানুষের মর্যাদা এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর “বিদ্রোহী” কাব্যিক সত্তা কোনো একক রাজনৈতিক মুহূর্তের সৃষ্টি নয়; তাঁর সাহিত্যজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তা তৈরি হয়েছিল। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা তাঁকে কারাবরণ করিয়েছে, তাঁর পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছে, তাঁর রচনার ওপর সরকারি নজরদারি হয়েছে। পরে সেই কবিই যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নিজের ভাষাহীন শরীর নিয়ে বসে আছেন, তখন তাঁর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি চেক পৌঁছানো যেন ইতিহাসের এক দীর্ঘ বৃত্তের ছোট্ট সমাপ্তিরেখা।

ছবিটির আরেকটি গভীরতা রয়েছে সময়ের ব্যবধানে। যে নজরুল একসময় লিখেছিলেন—

“চির-উন্নত মম শির”

১৯৭১ সালে তাঁর মাথা হয়তো আর আগের মতো সক্রিয়ভাবে কথা বলছে না, তাঁর কণ্ঠে আর আগের মতো উচ্চারণ নেই; কিন্তু তাঁর কবিতার সেই উচ্চতা তখন একটি জাতির সংগ্রামের ভাষায় ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের গান ও কবিতা মানুষের মধ্যে পরিচিত ছিল, এবং তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক তখন নতুন রাজনৈতিক অর্থ লাভ করে। তাঁর শরীর নিস্তব্ধ হয়ে গেলেও তাঁর শব্দ নিস্তব্ধ হয়নি।

এই কারণেই ৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটিকে কেবল একটি সরকারি অর্থপ্রদানের ঘটনা হিসেবে পড়লে ইতিহাসের একটি স্তর বাদ পড়ে যায়। এটি ছিল রাষ্ট্র ও কবির সম্পর্কের একটি প্রতীকী মুহূর্ত। তবে এখানে “প্রতীক” শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা দরকার। ইতিহাসে প্রতিটি ঘটনাকে অতিরিক্ত প্রতীকে পরিণত করলে বাস্তব মানুষ ও বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, নজরুল তখন অসুস্থ, তাঁর পরিবার আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ছিল, পাকিস্তান সরকার তাঁর ভাতা বন্ধ করেছিল, এবং বাংলাদেশ সরকার মাসিক ৩৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তের ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসের বকেয়া দাঁড়ায় ২,১০০ টাকা। ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের প্রধান এম. হোসেন আলী সেই অর্থের চেক কবি-পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংরক্ষিত দিনপঞ্জিতেও ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ আছে যে পাকিস্তান সরকার নজরুলের পেনশন বন্ধ করার পর বাংলাদেশ সরকার তা পুনরায় চালু করে এবং কলকাতায় কবির বাসভবনে একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ২,১০০ রুপির চেক দেওয়া হয়।

ছবিটির ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। ছবিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের মুখ দেখে প্রত্যেকের পরিচয় নিশ্চিত করা উচিত নয়। তবে ছবিটির সঙ্গে প্রকাশিত ঐতিহাসিক ক্যাপশন ও সমকালীন বিবরণ মিলিয়ে এটিকে ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর ওই চেক প্রদানের ঘটনার ছবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম আলোর ১৯৭১-ভিত্তিক আর্কাইভে ছবিটির ক্যাপশনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের প্রধান এম. হোসেন আলী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বকেয়াসহ মাসিক ভাতার চেক কবি-পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন।

এখানে “কবি-পরিবারের কাছে” কথাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নজরুল তখন এমন অবস্থায় ছিলেন যে তাঁর দৈনন্দিন আর্থিক ও পারিবারিক বিষয়গুলো পরিবারের ওপর নির্ভর করত। দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৯৭১ সালের ঘটনাপঞ্জি পুনর্মুদ্রণে বলা হয়েছে, হোসেন আলী নজরুলের ছেলেদের কাছে ২,১০০ রুপির চেক তুলে দেন। অর্থাৎ চেকের কাগজটি একজন অসুস্থ কবির ব্যক্তিগত হাতে পৌঁছানোর চেয়ে বেশি ছিল তাঁর পরিবারকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সহায়তা।

এই ছোট্ট পার্থক্যটিও ইতিহাসের জন্য জরুরি। কারণ ইতিহাসকে সুন্দর করে বলার জন্য তথ্যকে রোমান্টিক করে তোলার প্রয়োজন নেই। বাস্তব ঘটনাটিই যথেষ্ট গভীর। একজন কবি, যিনি জীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়ে নিজের কলম দিয়ে শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, জীবনের শেষভাগে এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছিলেন যেখানে তাঁর পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এখানে মানুষের নিয়তি ও প্রতিভার মধ্যে একটি নির্মম দূরত্ব দেখা যায়। যে মানুষ শব্দ দিয়ে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন, তিনিও শরীরের কাছে পরাজিত হন। এই সত্য নজরুলকে ছোট করে না; বরং মানুষ হিসেবে তাঁকে আরও স্পষ্ট করে।

নজরুলের অসুস্থতা তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানকে মুছে দেয়নি। বরং তাঁর জীবনের শেষ পর্ব আমাদের একটি কঠিন দার্শনিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়—মানুষের শরীর ক্ষয় হয়, কিন্তু মানুষের সৃষ্টি সবসময় একই গতিতে ক্ষয় হয় না। একজন মানুষের জীবনীশক্তি যখন নিঃশেষের দিকে যায়, তাঁর সৃষ্টি তখন অন্য মানুষের স্মৃতি, ভাষা, গান ও চিন্তার মধ্যে নতুন জীবন পেতে পারে। নজরুলের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল। তাঁর শরীর ক্রমে নীরব হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর কবিতা ১৯৭১-এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে সক্রিয় ছিল।

আর হোসেন আলীর উপস্থিতিও এই ছবিকে বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার পাকিস্তানি ডেপুটি হাইকমিশনের দায়িত্বে থাকা হোসেন আলী বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন এবং ওই মিশনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতার সেই মিশন পরে স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তাই ৪ সেপ্টেম্বরের এই সাক্ষাৎকে আরও বিস্তৃত সময়ের মধ্যে দেখলে একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক সম্পর্ক দেখা যায়। একই ব্যক্তি—হোসেন আলী—যিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কয়েক মাস পর সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই নজরুলের পরিবারের কাছে ভাতার চেক পৌঁছে দেন। একটি ঘটনা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ঘোষণা, অন্যটি সেই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতি দায়িত্বের প্রকাশ। দুটি ঘটনাই একই মুক্তিযুদ্ধের ভেতর অবস্থান করছে।

এই ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর অনাড়ম্বরতা। এখানে কোনো বিশাল মঞ্চ নেই, রাষ্ট্রীয় পতাকার সারি নেই, বড় কোনো জনসভা নেই। একটি ঘর, কয়েকজন মানুষ, একজন অসুস্থ কবি এবং একটি চেক। অথচ ইতিহাসের অনেক বড় ঘটনা এভাবেই ঘটে—নীরবে, সীমিত মানুষের উপস্থিতিতে, এমন কিছু কাগজ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যার তাৎপর্য পরে বোঝা যায়।

চেকটির পরিমাণ ২,১০০ রুপি। হিসাব করলে খুব সরল—৩৫০ টাকা করে ছয় মাস। মার্চ থেকে আগস্ট। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে সেই বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলো। ইতিহাসের সৌন্দর্য অনেক সময় এই সাধারণ সংখ্যাগুলোর মধ্যেই থাকে। ২,১০০ কোনো অলৌকিক সংখ্যা নয়; এটি ছয় মাসের ৩৫০ টাকার হিসাব। কিন্তু সেই হিসাবের পেছনে ছিল একটি সরকারের সিদ্ধান্ত, একটি যুদ্ধরত জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্মৃতি, একজন অসুস্থ কবির প্রয়োজন এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।

এই ঘটনাকে আরও একটি দিক থেকে দেখা যায়। স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন চলছিল, তখন রাষ্ট্রের কাছে অর্থ ছিল সীমিত। মুক্তিযুদ্ধের সরকারকে যুদ্ধ পরিচালনা, শরণার্থী সহায়তা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং নানা প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নজরুলের জন্য মাসিক ভাতা নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি ছিল বাস্তব অর্থে একটি ছোট সরকারি ব্যয়। কিন্তু সেই ব্যয়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ ছিল আলাদা। সমকালীন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারের মুখপাত্র এটিকে কবির প্রতি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এখানে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্বের প্রশ্নও আসে। একটি রাষ্ট্র কি কেবল জীবিত মানুষের নিরাপত্তা ও প্রশাসন পরিচালনা করবে, নাকি তার সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারকদের প্রতিও দায়িত্ব থাকবে? ১৯৭১-এর এই ঘটনা সেই প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সত্তা তখনও আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি; যুদ্ধ চলছে; তবু সেই রাষ্ট্র নিজেকে এমন একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল, যার সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক কেবল সাহিত্যিক নয়, সাংস্কৃতিক ও আত্মপরিচয়ের সম্পর্কও।

নজরুলের জীবনের পরবর্তী ইতিহাস এই ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি কলকাতায়। পরের বছর স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে দেশে নিয়ে আসে। ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুল বাংলাদেশে আসেন। তাঁর জন্য সরকারি সহায়তা, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭২ সালেই তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। পরে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর এই ছবিটি এক বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত নয়। এটি নজরুলের জীবন ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের মধ্যে একটি সেতুর মতো। প্রথমে ভাতা বন্ধ হলো। তারপর যুদ্ধরত বাংলাদেশ সরকার ভাতা চালু করল। কলকাতায় সেই বকেয়া অর্থ দেওয়া হলো। কয়েক মাস পর স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে নিজের ভূখণ্ডে নিয়ে এলো। পরে তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হলো। আরও পরে নাগরিকত্ব দেওয়া হলো। এভাবে একজন কবির সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক ধীরে ধীরে একটি নতুন রূপ পেল।

তবে এই ধারাবাহিকতার মধ্যেও ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক সত্য থেকে যায়। যে মানুষটি বাঙালির কণ্ঠকে এত শক্তিশালী করে তুলেছিলেন, জীবনের শেষ দীর্ঘ সময়টি তিনি নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করতে পারেননি। তাঁর কবিতা ছিল উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু তাঁর শরীর ছিল নীরব। তাঁর সাহিত্য ছিল বিদ্রোহী, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন হয়ে উঠেছিল নির্ভরশীল। তাঁর চিন্তায় ছিল মানুষের স্বাধীনতা, অথচ তাঁর শেষ জীবন ছিল অসুস্থতার সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। এই বৈপরীত্যই নজরুলকে কেবল “বিদ্রোহী কবি” নামে স্মরণ করার বাইরে নিয়ে যায়; তিনি হয়ে ওঠেন মানুষের সীমা ও সৃষ্টির সীমাহীনতার একটি জীবন্ত উদাহরণ।

ছবিটির দিকে আবার তাকালে তাই কাগজটি চোখে পড়ে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চোখে পড়ে সময়। একজন তরুণ কবি থেকে একজন অসুস্থ প্রবীণ মানুষে পৌঁছানোর সময়। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক সময় থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সময়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর সেই দীর্ঘ সময়ের শেষে একটি ছোট ঘরে একটি চেক হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। ছবির ফ্রেম যেন ব্যক্তিগত জীবন, রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও সাহিত্যিক স্মৃতিকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

নজরুলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও কেবল ১৯৭১ সালে শুরু হয়নি। ভাষা, সংস্কৃতি, গান, কবিতা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের যে দীর্ঘ প্রবাহে নজরুলের সৃষ্টি প্রবেশ করেছিল, মুক্তিযুদ্ধ তার একটি রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটায়। তাঁর গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান ও মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যবহৃত হয়েছে; তাঁর বিদ্রোহী ও মানবমুক্তির ভাষা নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে। কিন্তু সেই অর্থকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ করলে নজরুলের সাহিত্যকে ছোট করা হয়। তিনি কোনো একমাত্রিক রাজনৈতিক কবি ছিলেন না। তাঁর মধ্যে প্রেম আছে, ধর্মীয় মানবতাবাদ আছে, সাম্য আছে, আধ্যাত্মিকতা আছে, বিদ্রোহ আছে, প্রকৃতি আছে, মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা আছে। তাঁর সাহিত্যিক সত্তা একটি বৃহৎ মানবিক পরিসর তৈরি করে।

এই কারণে ১৯৭১-এর ছবিটিকে নজরুলের সম্পূর্ণ সাহিত্যিক পরিচয়ের জায়গায় বসানোও ঠিক হবে না। বরং ছবিটি তাঁর দীর্ঘ জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তকে ধরে রেখেছে—যে মুহূর্তে তাঁর সৃষ্টির ইতিহাস এসে মিশেছে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে।

ছবিটির দার্শনিক পাঠ এখানেই সবচেয়ে গভীর হয়ে ওঠে। মানুষ তার সময়কে অতিক্রম করতে পারে না, কিন্তু তার সৃষ্টি কখনো কখনো সময়ের সীমা অতিক্রম করে। নজরুল ১৯৭১ সালে নিজের শরীর দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দেখেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি, কোনো রাজনৈতিক ভাষণ দেননি। তবু তাঁর বহু দশক আগে উচ্চারিত শব্দ ও সৃষ্ট গান সেই সময়ের মানুষের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অংশ হয়ে ছিল। একজন কবির জীবনের এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাহিত্য সবসময় তার সৃষ্টির মুহূর্তে শেষ হয় না। কবি একটি শব্দ লিখে চলে যান; পরবর্তী প্রজন্ম সেই শব্দের নতুন অর্থ তৈরি করে।

আর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। একটি রাষ্ট্র তার সীমান্ত দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু তার স্মৃতি দিয়ে নিজেকে অর্থপূর্ণ করে। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে নজরুলের অবস্থান সেই সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। তাই ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ দেওয়া ২,১০০ রুপির চেকের আর্থিক মূল্য যতটুকু, ঐতিহাসিক অর্থ তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। তবে সেই বিস্তৃত অর্থ আমাদের অনুমান থেকে নয়; ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা থেকেই আসে—পাকিস্তান সরকারের ভাতা বন্ধ হওয়া, বাংলাদেশ সরকারের মাসিক ৩৫০ টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ছয় মাসের ২,১০০ টাকা বকেয়া পরিশোধ এবং পরে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা।

এই ছবিকে তাই কেবল “নজরুলকে পেনশন চেক প্রদান” বলে পরিচয় করিয়ে দিলে তথ্যগত দিক থেকে ঘটনা বোঝা যায়, কিন্তু ছবির অন্তর্গত ইতিহাস পুরোপুরি ধরা পড়ে না। আরও নির্ভুলভাবে বলা যায়, এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় অসুস্থ কাজী নজরুল ইসলামের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের নির্ধারিত সাহিত্যিক ভাতার বকেয়া অর্থ প্রদানের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ ২,১০০ রুপির যে চেক দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল মাসে ৩৫০ রুপি করে ছয় মাসের বকেয়া। সমকালীন সংবাদ ও পরবর্তী ঐতিহাসিক সংরক্ষণে এই তথ্যের একাধিক সমর্থন পাওয়া যায়।

কিন্তু একটি ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি তার তথ্যের বাইরে। ছবিটি আমাদের থামিয়ে দেয়। সেখানে যুদ্ধ নেই, অথচ যুদ্ধের উপস্থিতি আছে। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা নেই, অথচ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে। সেখানে কবিতা পাঠ নেই, অথচ কবিতার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি আছে। সেখানে কোনো বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নেই, অথচ একটি নতুন রাষ্ট্র তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে স্বীকার করছে। সেখানে একজন মানুষ কথা বলছেন না, অথচ তাঁর জীবনের সমগ্র সাহিত্য যেন নীরবে কথা বলছে।

একজন কবির জীবনের শেষ পর্বে রাষ্ট্রের দেওয়া একটি চেক তাই শেষ পর্যন্ত কেবল অর্থের দলিল নয়; এটি স্মৃতি ও দায়িত্বের দলিল। ১৯৭১-এর রক্তাক্ত ইতিহাসের পাশে এই দৃশ্যটি কোমল, প্রায় ব্যক্তিগত। কিন্তু সেই কোমলতার মধ্যেও ইতিহাসের একটি কঠিন সত্য রয়েছে—স্বাধীনতা কেবল যুদ্ধ করে অর্জিত ভূখণ্ডের নাম নয়; স্বাধীনতা নিজের মানুষ, নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি ও নিজের স্মৃতির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক স্থাপনেরও নাম।

কাজী নজরুল ইসলাম সেই সম্পর্কের এক গভীরতম নাম। তাঁর জীবনের শুরু ঔপনিবেশিক ভারতের অস্থিরতার মধ্যে, তাঁর যৌবন বিদ্রোহ ও সাহিত্যসৃষ্টিতে, তাঁর পরিণত জীবন অসুস্থতার দীর্ঘ অন্ধকারে, আর তাঁর শেষ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এসে দাঁড়াল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে। ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর এই ছবিতে তাই একসঙ্গে দেখা যায় একজন কবির ব্যক্তিগত অসহায়তা এবং তাঁর সৃষ্টির ঐতিহাসিক শক্তি; একটি যুদ্ধরত সরকারের সীমিত সামর্থ্য এবং তার সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা; একটি পুরোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে ছিন্ন সম্পর্ক এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা নতুন সম্পর্ক।

সময়ের কাছে মানুষের শরীর পরাজিত হয়, রাষ্ট্র বদলায়, রাজনৈতিক মানচিত্র বদলায়, অর্থের মূল্য বদলায়, মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কোনো কোনো শব্দ মানুষের মৃত্যুর পরেও চলতে থাকে। নজরুলের জীবন সেই সত্যের একটি বিরল উদাহরণ। ১৯৭১ সালের সেই ঘরের দৃশ্যটিতে তাঁর শরীর ছিল নীরব; কিন্তু তাঁর কবিতা তখনও বাঙালির ইতিহাসের মধ্যে উচ্চারিত হচ্ছিল। আর সেই কারণেই ছবিটির সবচেয়ে গভীর অর্থ হয়তো চেকের অঙ্কে নয়, বরং এই প্রশ্নে—একটি জাতি যখন নিজের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে, তখন সে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের পাশাপাশি অতীতের কোন মানুষদের নিজের বলে গ্রহণ করে?

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর উত্তরটি ইতিহাস সংরক্ষণ করে রেখেছে। উত্তরটি এসেছিল ২,১০০ রুপির একটি চেকের আকারে, কলকাতার একটি ঘরে, এক অসুস্থ কবির পরিবারের কাছে। সেই ছোট্ট আর্থিক দলিলের মধ্যে ছিল ছয় মাসের বকেয়া, একটি সরকারি সিদ্ধান্ত এবং একটি যুদ্ধরত জাতির শ্রদ্ধা। আর ছবির মধ্যে রয়ে গেল সেই মুহূর্তের নীরব সাক্ষ্য—একজন কবি, যাঁর কণ্ঠ তখন স্তব্ধ, কিন্তু যাঁর শব্দ একটি জন্ম নিতে থাকা দেশের আত্মপরিচয়ের ভেতর তখনও জীবন্ত।

অভিনেতা রিফাত চৌধুরী বলেছেন রাষ্ট্রকে একজন নাগরিককে আগে হোল্ডিং নাম্বার দিতে হবে।। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র।। হোল্ডিং নাম্বার...
25/09/2026

অভিনেতা রিফাত চৌধুরী বলেছেন রাষ্ট্রকে একজন নাগরিককে আগে হোল্ডিং নাম্বার দিতে হবে।। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র।। হোল্ডিং নাম্বার হলো বসবাসের উপযোগী স্হান বা ঘর।। একখন্ড জমি।। রাষ্ট্র তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।। এজন্যই তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেননি।। কারণ রাষ্ট্র তাঁকে মানুষের জীবনযাপনের মৌলিক অধিকারই দিতে পারেনি কিন্তু একটি কাগজ হাতে ধরিয়ে দিতে চেয়েছে।। যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।।

তিনি বলেছেন মিডিয়ার ৮০% শিল্পী অবহেলিত।। এবং তিনি নিজেও সবার কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছেন।। তাঁর এখন না ঠকলেই বরং খারাপ লাগে।। তাঁকে টাকা কম দেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন।। অথচ তিনি অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত কাজ করেছেন।। তাঁর এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়,,বাংলাদেশের নাটক সিনেমার ইন্ড্রাষ্টি বলে কিছু নেই।। আছে অনৈতিক কিছু মানুষের বাণিজ্যিক ব্যবস্হা।। যাকে শিল্প বলা চলে না।। শিল্পের মুখোশে কসাইখানা বলা চলে বড়জোর।। কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতারাও অমানবিক এবং বাণিজ্যিক এ মন্তব্যে স্পষ্টই বোঝা যায়।। কারণ কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতারাই নাটকের বাজেটের ৮০% টাকা নিয়ে যায়।। বাকীদের কথা চিন্তা করেন না।। সুতরাং তারা বাণিজ্যিক কসাই।। শিল্পী নন।।

তিনি বলেছেন টাকা আমি কেন কামাবো,,টাকা আমাকে কামাবে।। কিন্তু সেটা আমি এই দেশে জন্ম নিয়েছি বলে হয়নি।। অর্থাৎ তিনি বুঝিয়েছেন যে তিনি গুণী।। কিন্তু তাঁকে যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারেনি এই দেশ।।

তিনি বলেছেন কালচারাল টেররিজম এর কথা।। অর্থাৎ শিল্পের নামে সংগঠনগুলোকে তিনি কালচারাল টেরোরিস্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।। এই কালচারাল টেরোরিস্টরা শিল্পের সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন করে।। এরা ক্ষমতার লোভেই সংগঠন করে।। কালচারাল সংগঠনের মাধ্যমে মুলত শিল্পীর কোন উপকার হয়না।। তবে নেতা পর্যায়ের কিছু মানুষের আখের গুছিয়ে যায়।। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আমার কাছে এটা মনে হয়েছে।।

হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন প্রতিটি নাগরিক মূল্যবান।। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে মনে হয়েছে হাসপাতালে নাগরিকদের মূল্যবান মনে করা হচ্ছে না।। সাংবাদিক তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বললেও রাষ্ট্রের সরকারি হাসপাতাল তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতো দূরে থাক,,নাগরিক হিসেবেই গণ্য করছেন না।। এভাবেই তিনি হাসপাতালের অব্যবস্হাপনা তুলে ধরেছেন।।

তিনি বলেছেন একজন অভিনেতা তাঁর চেয়ে কম সময় অভিনয় করে লাখ লাখ টাকা নিচ্ছেন।। কিন্তু তিনি বেশি সময় স্ক্রিনে থেকেও কম টাকা পাচ্ছেন।। তাঁকে পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা বলে ঠকানো হচ্ছে।। তিনি আর কোনদিন অভিনয় করতে চাননা।। এ কথায় স্পষ্ট বোঝা যায় কেন্দ্রীয় চরিত্রের শিল্পীদের যে মূল্যায়ন করা হয় সেই মূল্যায়ন আর কাউকে করা হয়না।। অথচ প্রতিটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ।। গুরুত্বপূর্ণ বলেই ডিরেক্টর চরিত্রগুলো গল্পে রাখেন।। কোন মানুষের জীবন তো একা একা চলে না।। সকল চরিত্র কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।। আর শিল্পী তো শিল্পীই।। সেখানে শ্রেণী বৈষম্য কেন হবে?? সবমিলিয়ে তথাকথিত ইন্ড্রাষ্টির নোংরা চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন।।

তিনি কবি।। কিন্তু কবি হয়ে এই দেশ থেকে তিনি কিছু পাননি।। একটি হোল্ডিং নাম্বারও তিনি পাননি।। তিনি টাকার জন্য,,জীবনযাপনের জন্য অভিনয় করতেন।। সেখানেও তিনি বাজে ভাবে ঠকেছেন।। তাই তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন ফ্রান্সে জন্ম হলে আমার মূল্য থাকতো।। এই মন্তব্যে স্পষ্টই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কবি সাহিত্যিকদের অবহেলার নিদারুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।।

তিনি বলেছেন তিনি রক্তের সম্পর্কে বিশ্বাসী নয়।। সবাই তাঁর পরিবার।। একাকীত্ব তাঁর দূর্বলতা নয়।। তিনি এটা অর্জন করেছেন।।
মানুষ মূলত একাই।। আবার একাই চলে যায়।। সুতরাং তিনি বলতে চেয়েছেন তিনি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা করেই জীবনকে বোঝেন এবং সেভাবেই যাপন করেন।। এবং এটাই তাঁর পছন্দ।।

তিনি বলেছেন সরকারের সহযোগিতা তিনি নিবেন না।। কারণ সরকার নিজেই জনগণের টাকায় চলে ।। তাঁকে কোন মানুষ ভালোবেসে কিছু দিলে তিনি তা গ্রহণ করবেন।। অর্থাৎ তিনি সরকারকে দায়মুক্ত করেছেন।।

একজন রিফাত চৌধুরী এই দেশে সচারাচর জন্মায় না।। অথচ এই তথাকথিত শিল্পী সমাজ তাঁকে ঠকিয়েছে।। রাষ্ট্রও তাঁকে মূল্যায়ন করেনি।। কি দূর্ভাগা জাতি আমরা!! আহা!!

"অন্যায় যে করে আর, অন্যায় যে সহে, উভয়কেই সমান অপরাধী বলা চলে। কিন্তু সমাজের নাম করিয়া যে নির্যাতন চালানো হয়, তাহার ...
25/09/2026

"অন্যায় যে করে আর, অন্যায় যে সহে, উভয়কেই সমান অপরাধী বলা চলে। কিন্তু সমাজের নাম করিয়া যে নির্যাতন চালানো হয়, তাহার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই
প্রকৃত মনুষ্যত্ব।"

— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (পথের দাবী উপন্যাস )

25/09/2026

আরতির থালা আর তসবির মালা আসিবেনা কোন কাজে, মানুষের সেবা মানুষ করিবে, আর সবকিছু বাজে।

কাজী নজরুল ইসলাম

25/09/2026

"যে জাতি মেধার মূল্য দিতে জানে না,
সে জাতি কখনোই উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারেনা”

-কাজী নজরুল ইসলাম

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব----- কাজী নজরুল ইসলাম" আমি চিরতরে দূরে চলে যাবোতবু আমারে দিবোনা ভুলিতে,আমি বাতাস হইয়া, জড়াইবো কে...
25/09/2026

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব
----- কাজী নজরুল ইসলাম

" আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো
তবু আমারে দিবোনা ভুলিতে,
আমি বাতাস হইয়া, জড়াইবো কেশ
বেনী যাবে যবে খুলিতে।

" তোমার সুরের নেশায় যখন
ঝিমাবে আকাশ, কাঁদিবে পবন,
রোদন হইয়া আসিব তখন
তোমারো বক্ষে দুলিতে।

" আসিবে তোমার পরম উৎসব
কত প্রিয়জন, কে জানে
মনে পড়ে যাবে কোন সেই ভিখারী
পাইনি ভিক্ষা এখানে।

"তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়
চমকে থামিয়া যাবে বেদনায়
দেখিব কে যেন মরে পড়ে আছে
তোমার পথের ধূলিতে।

Address

Savar
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Poem Education posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category