11/12/2025
নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন অনুমোদন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from BCGD-Bangladesh Center for Governance and Development, DIU, Educational Research Center, House 4, Road 1, Block/F, Banani, Dhaka/1213, Dhaka.
BCGD's foremost objectives are to be a credible platform for sharing ideas to promote excellence in governance and development work for the people of Bangladesh and beyond.
11/12/2025
নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন অনুমোদন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
11/12/2025
BEZA defies SC, clears ni****ne pouch factory
10/12/2025
BEZA defies SC, clears ni****ne pouch factory
Rights activists and to***co control advocates have accused the Bangladesh Economic Zones Authority (BEZA) of defying Supreme Court directives by permitting the establishment of a ni****ne pouch factory in the country.
They made the allegation during a press conference at Dhaka Reporters Unity (DRU) on Tuesday.
The event was jointly organised by the Bangladesh Anti To***co Alliance (BATA), Bangladesh To***co Control Advocates (BTCA), Public Health Lawyers Network, and Bangladesh Center for Governance and Development (BCGD).
Speakers said the government has agreements with 35 ministries to curb NCDs, yet a government agency is allowing a foreign company to produce narcotics linked to these diseases.
They demanded that the approval be revoked and called for disclosure of who authorised BEZA to allow the use of a product not previously used in Bangladesh, falsely approved as less harmful.
BTCA Convener Iqbal Masud presided over the event, where BCGD Member Secretary Md Bazlur Rahman delivered the keynote speech.
BATA Acting Coordinator Helal Ahmed, rights activist AKM Maksud, and to***co control advocates Abu Naser Anik, Shagufta Sultana, and Farhana Zaman Liza also spoke.
09/12/2025
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় উপেক্ষা করে কারখানা স্থাপনের ও নিকোটিন পাউচের নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনে
09/12/2025
নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন বাতিলের দাবি
নিকোটিন পাউচ কারখানা স্থাপনের অনুমোদন বাতিলের দাবি জানিয়েছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। তারা বলেছন, মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে বাংলাদেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এ পরিস্থিতিতে অবিলম্বে অনুমোদন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি), বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাডভোকেটস (বিটিসিএ) এবং পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক।
সংবাদ সম্মেলনে বিটিসিএর আহ্বায়ক ইকবাল মাসুদের সভাপতিত্বে ও ধোঁয়াবিহীন তামাক বিশেষজ্ঞ ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন- কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু নাসের অনিক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল, উন্নয়ন সংস্কারক এ কে এম মাকসুদ, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রফেসর ড. অনুপম হাসান, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি প্রফেসর ডাক্তার গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্য বিসিজিডির সদস্য সচিব বজলুর রহমান বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের যে অনুমোদন বাংলাদেশে দেওয়া হয়েছে, তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন। আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী দেশে নতুন কোনো তামাক কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া যাবে না, বরং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে ধীরে ধীরে অন্য শিল্পে স্থানান্তরের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সেই রায়ের পরিপন্থী সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে বেজার মাধ্যমে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিকোটিন পাউচ বা ওরাল নিকোটিন পাউচ (ওএনপি) আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত সমালোচনার মুখে থাকা এক ধরনের উচ্চমাত্রার নেশা সৃষ্টিকারী তামাকজাত পণ্য। ছোট সাদা প্যাকেটের মতো এই পণ্যটি ঠোঁট ও মাড়ির মাঝখানে রেখে ব্যবহার করা হয় এবং মুখগহ্বরের মাধ্যমে নিকোটিন সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে। গবেষণায় প্রমাণিত-অনেক নিকোটিন পাউচে সিগারেটের তুলনায় বহু গুণ বেশি নিকোটিন থাকে এবং এই উচ্চমাত্রার নিকোটিন দ্রুত আসক্তি তৈরি করে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য এটি ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে।
এতে ব্যবহৃত কৃত্রিম স্বাদ, প্লাস্টিক সদৃশ সেলুলোজ, ফরমালডিহাইড, নিকেল, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মুখগহ্বর, দাঁত, মাড়ি, রক্তচাপ এবং হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই পণ্যকে ধূমপান ত্যাগের উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বরং দীর্ঘমেয়াদে নিকোটিন নির্ভরতা বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
সংগঠনটির নেতারা জানান, বিশ্বজুড়ে বহু দেশ নিকোটিন পাউচকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। বেলজিয়াম, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, ফ্রান্সসহ অন্তত ১১টি দেশে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রায় ৩৪টি দেশ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিকোটিন পাউচকে “তামাকজাত পণ্য” হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর প্রি-মার্কেট অনুমোদন বাধ্যতামূলক করেছে।
যেসব দেশে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল-সেসব দেশে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সুইডেন ও ডেনমার্কে এর ব্যবহার ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩-২৪ সালে ১০ম থেকে ১২তম গ্রেডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যবহার ৩.০ শতাংশ থেকে ৫.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, আর ২১ বছরের নিচে ব্যবহার চারগুণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটি তরুণদের নেশার নতুন মহামারি তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নিকোটিন পাউচের কোনো সক্রিয় বাজার নেই এবং ব্যবহারকারীও নেই।
টিসিআরসির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কোনো সিগারেট দোকান, সুপার শপ বা ফার্মেসিতে এ পণ্য পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ব্যবসায়ী পণ্যটির নামই শোনেননি। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কীসের ভিত্তিতে ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডকে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দিল—সে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। তারা জানান, মাত্র ৬৩ জনের কর্মসংস্থান এবং ৫১ কোটি টাকার বিনিয়োগের যুক্তি দেখিয়ে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অনুমোদনের ফলে ভবিষ্যতে নিকোটিন পাউচ বাজারে ঢোকার সুযোগ পাবে, যা তরুণদের নিকোটিনের দিকে ঠেলে দেবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করবে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, এই অনুমোদন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পাশাপাশি জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি ও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১)-এর লঙ্ঘন। তারা বলেন, একটি স্বাস্থ্য বিধ্বংসী পণ্যের অনুমোদন রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সরকারি অঙ্গীকারের সময়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নেশার বিপদে ঠেলে দিতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়- বিশ্বে নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও কিছু দেশে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যেসব দেশে শুরুতে নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেসব দেশে এর ব্যবহার কয়েক বছরের মধ্যেই উদ্বেগজনক স্তরে পৌঁছেছে। সুইডেনে প্রায় ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এটি ব্যবহার করেন, ডেনমার্কে ব্যবহারকারী সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেটের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত নিকোটিন পণ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশে নিকোটিনের নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক। মুখ বা মাড়ির ক্ষতি, উচ্চ রক্তচাপ, আসক্তি-এসব ঝুঁকিও রয়েছে।
টিসিআরসির গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশে নিকোটিন পাউচের কোনো বাজার উপস্থিতি না থাকলেও তিনটি অনলাইন ই-কমার্স সাইটে সীমিত বিক্রি শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বিপদের ইঙ্গিত দেয়। গবেষণা আরও দেখিয়েছে—ব্যবসায়ীরা পণ্যটি সম্পর্কে জানেন না, তাই এখনই নিষিদ্ধ না করা হলে ভবিষ্যতে তরুণরা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, নিকোটিন পাউচ কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি নতুন প্রজন্মকে আসক্তির এক নীরব স্রোতে ঠেলে দেবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের সময় এমন একটি নীতিবিরোধী অনুমোদন পুরো জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
(প্রকাশিত: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫)
নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন বাতিলের দাবি নিকোটিন পাউচ কারখানা স্থাপনের অনুমোদন বাতিলের দাবি জানিয়েছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। তারা বলেছন, ম....
09/12/2025
সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন দিয়েছে বেজা : বক্তাদের অভিযোগ।
বিশেষ প্রতিনিধি : ফজলুল হক মুন্না।
09/12/2025
সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে বেজা।
সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে বেজা জাতির সংবাদ ডটকম।। নিকোটিন পাউচের মতো রোগ উৎপাদনকারী নেশাজাত দ্রব্যের কারখানার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈ....
09/12/2025
আপিল বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন - জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে অনুমোদন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
নিকোটিন পাউচ আন্তর্জাতিকভাবে বহুল সমালোচিত এবং নেশা উদ্রেককারী নতুন তামাকজাত পণ্য হিসেবে পরিচিত। এই পণ্যটি গামের মতো যা মুখে রেখে ব্যবহৃত হয়, যা মুখে নেয়ার পর ধীরে ধীরে তামাক রক্তে শোষিত হয়। এটি ই-সিগারেট/ভ্যাপের একটি বিকল্প পণ্য যা বিভিন্ন ফ্লেভারে হয় এবং এতে উচ্চমাত্রার নিকোটিন বিদ্যমান, যা দ্রুত নেশাসৃষ্টিকারী ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে নিকোটিন পাউচ ধোঁয়াবিহীন তামাকের মতোই বিপজ্জনক। এটি মুখগহ্বরের ক্ষত, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরিসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণ।
এমতাবস্থায়, বেজা কর্তৃক অনুমোদিত নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানার ফলে ভবিষ্যতে বাজারে এই মরনপন্যের বিস্তৃতি বৃদ্ধি পাবে যা আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আসক্তির দিকে ধাবিত করবে।
এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধের দাবিতে, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি) সম্মিলিতভাবে আজ ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ (মঙ্গলবার) সকাল ১১:০০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এর সাগর রুনি সম্মেলন কক্ষে “আপিল বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন - জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে অনুমোদন বাতিলের দাবি” শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নিকোটিন পাউচের মতো রোগ উৎপাদনকারী নেশাজাত দ্রব্যের কারখানার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এর মাধ্যমে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকার একদিকে তামাকসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ৩৫ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অন্যদিকে সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানিকে নেশাজাত দ্রব্য উৎপাদনের জন্য দেশে আনতে চাচ্ছে। যে পণ্যের ব্যবহার বাংলাদেশে নেই, সেই পণ্যকে কম ক্ষতিকর বলে অনুমোদন দিয়ে বাংলাদেশে ব্যবহারের সাহস এ প্রতিষ্ঠানকে কে দিয়েছে সেটা উন্মোচন করা জরুরি। অর্থনীতির উন্নয়নের নামে রোগ ও নেশার ক্ষেত্র তৈরি করতে চায় বেজা। একজন উপদেষ্টার পারিবারিকভাবে তামাকের ব্যবসা থাকায় এবং বিদেশি কোম্পানির সাথে পূর্ববর্তী সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি বেজার চেয়ারম্যানের সাবেক কর্মস্থল হওয়ায় মরণব্যাধী এ পণ্য ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বেজা।
তারা আরও বলেন, নিকোটিন পাউচ বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবেও নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের বহু দেশ নিকোটিন পাউচকে হুমকি হিসেবে দেখছে। বেলজিয়াম, জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও কিরগিজস্তানসহ ১১ দেশে এর বিক্রি সম্পূর্ণ বা আংশিক নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র এফডিএ এটিকে ‘নিকোটিন পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে কঠোর প্রি-মার্কেট অনুমোদন বাধ্যতামূলক করেছে। সাম্প্রতি টিসিআরসির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কোনো বাজার, দোকান বা ফার্মেসিতে নিকোটিন পাউচ নেই। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পণ্যটি সম্পর্কে অবগতও নয়। তবুও বেজা একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে নিকোটিন পাউচ কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই ক্ষতিকর পণ্যকে বাজারে প্রবেশ করাবে এবং তরুণদের নেশার দিকে ঠেলে দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটসের আহ্বায়ক ইকবাল মাসুদ। বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলামিস্ট এবং রাজনীতি বিশ্লেষক আবু নাসের অনিক, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল, উন্নয়ন সংস্কারক এ কে এম মাকসুদ, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি) এর সদস্য সচিব সহযোগী অধ্যাপক মোঃ বজলুর রহমান এবং সঞ্চালনা করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ফারহানা জামান লিজা।
তারা আরও বলেন, নিকোটিন পাউচ বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবেও নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের বহু দেশ নিকোটিন পাউচকে হুমকি হিসেবে দেখছে। বেলজিয়াম, জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও কিরগিজস্তানসহ ১১ দেশে এর বিক্রি সম্পূর্ণ বা আংশিক নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র এফডিএ এটিকে ‘নিকোটিন পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে কঠোর প্রি-মার্কেট অনুমোদন বাধ্যতামূলক করেছে। সাম্প্রতি টিসিআরসির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কোনো বাজার, দোকান বা ফার্মেসিতে নিকোটিন পাউচ নেই। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পণ্যটি সম্পর্কে অবগতও নয়। তবুও বেজা একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে নিকোটিন পাউচ কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই ক্ষতিকর পণ্যকে বাজারে প্রবেশ করাবে এবং তরুণদের নেশার দিকে ঠেলে দেবে।
তারা আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের অধীন মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল আপিল নং ২০৪–২০৫/২০০১ মামলায় ০১ মার্চ ২০১৬–এর রায়ে বলা হয়েছে দেশে কোনো নতুন তামাক কোম্পানিকে অনুমোদন বা লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। বরং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে ধীরে ধীরে অন্যান্য শিল্পে স্থানান্তর করতে হবে। ফলে নিকোটিন পাউচের মতো নেশা সৃষ্টিকারী নতুন তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন অনুমোদন করে হাইকোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির বিরোধিতা, এবং জনস্বাস্থ্য ও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১)–এর লঙ্ঘন করেছে বেজা।
সংবাদ সম্মেলনে ৫টি দাবি জানানো হয়। এ দাবিগুলো হলো, নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন তাৎক্ষণিক বাতিল করতে হবে। দেশে নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেটসহ সব নতুন নিকোটিন পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অনলাইন বিক্রি, অবৈধ আমদানি ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বেজা কর্তৃক কারখানা স্থাপনের অনুমতি বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে নেশার দিকে ঠেলে দেওয়ার পথ বন্ধ করতে তাৎক্ষণিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশে বিভিন্ন তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠনের প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
09/12/2025
সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে বেজা
নিকোটিন পাউচের মতো রোগ উৎপাদনকারী নেশাজাত দ্রব্যের কারখানার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এর মাধ্যমে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকার একদিকে তামাকসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ৩৫ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অন্যদিকে সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানিকে নেশাজাত দ্রব্য উৎপাদনের জন্য দেশে আনতে চাচ্ছে। যে পণ্যের ব্যবহার বাংলাদেশে নেই, সেই পণ্যকে কম ক্ষতিকর বলে অনুমোদন দিয়ে বাংলাদেশে ব্যবহারের সাহস এ প্রতিষ্ঠানকে কে দিয়েছে সেটা উন্মোচন করা জরুরি।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর ) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘আপিল বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিকোটিন পাউচের কারখানা অনুমোদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে অনুমোদন বাতিলের দাবি’তে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি) যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটসের আহ্বায়ক ইকবাল মাসুদ। বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলামিস্ট এবং রাজনীতি বিশ্লেষক আবু নাসের অনিক, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল, উন্নয়ন সংস্কারক এ কে এম মাকসুদ, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি) এর সদস্য সচিব সহযোগী অধ্যাপক মোঃ বজলুর রহমান এবং সঞ্চালনা করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ফারহানা জামান লিজা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, অর্থনীতির উন্নয়নের নামে রোগ ও নেশার ক্ষেত্র তৈরি করতে চায় বেজা। একজন উপদেষ্টার পারিবারিকভাবে তামাকের ব্যবসা থাকায় এবং বিদেশি কোম্পানির সাথে পূর্ববর্তী সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি বেজার চেয়ারম্যানের সাবেক কর্মস্থল হওয়ায় মরণব্যাধী এ পণ্য ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বেজা।
তারা আরও বলেন, নিকোটিন পাউচ বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবেও নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের বহু দেশ নিকোটিন পাউচকে হুমকি হিসেবে দেখছে। বেলজিয়াম, জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও কিরগিজস্তানসহ ১১ দেশে এর বিক্রি সম্পূর্ণ বা আংশিক নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র এফডিএ এটিকে ‘নিকোটিন পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে কঠোর প্রি-মার্কেট অনুমোদন বাধ্যতামূলক করেছে। সাম্প্রতি টিসিআরসির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কোনো বাজার, দোকান বা ফার্মেসিতে নিকোটিন পাউচ নেই। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পণ্যটি সম্পর্কে অবগতও নয়। তবুও বেজা একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে নিকোটিন পাউচ কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই ক্ষতিকর পণ্যকে বাজারে প্রবেশ করাবে এবং তরুণদের নেশার দিকে ঠেলে দেবে।
তারা আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের অধীন মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল আপিল নং ২০৪–২০৫/২০০১ মামলায় ০১ মার্চ ২০১৬–এর রায়ে বলা হয়েছে দেশে কোনো নতুন তামাক কোম্পানিকে অনুমোদন বা লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। বরং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে ধীরে ধীরে অন্যান্য শিল্পে স্থানান্তর করতে হবে। ফলে নিকোটিন পাউচের মতো নেশা সৃষ্টিকারী নতুন তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন অনুমোদন করে হাইকোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির বিরোধিতা, এবং জনস্বাস্থ্য ও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১)–এর লঙ্ঘন করেছে বেজা।
সংবাদ সম্মেলনে ৫টি দাবি জানানো হয়। এ দাবিগুলো হলো, নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন তাৎক্ষণিক বাতিল করতে হবে। দেশে নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেটসহ সব নতুন নিকোটিন পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অনলাইন বিক্রি, অবৈধ আমদানি ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বেজা কর্তৃক কারখানা স্থাপনের অনুমতি বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে নেশার দিকে ঠেলে দেওয়ার পথ বন্ধ করতে তাৎক্ষণিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশে বিভিন্ন তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠনের প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
“সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে বেজা” - প্রজন্মের আলো সংবাদদাতা: নিকোটিন পাউচের মতো রোগ উৎপাদনকারী নেশাজাত দ্রব্যের কারখানার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চ....
08/12/2025
দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদন
সরকার না চাইলে অনুমোদন বাতিল
সরকার না চাইলে অনুমোদন বাতিল দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ফিলিপ মরিসকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তামাক...
08/12/2025
হাইব্রিডের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীর লড়াই
06/12/2025
ঢালচর: নিশ্চিহ্ন হতে চলা ভূখণ্ড!
ঢালচরে বন বিভাগের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। এই দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বন বিভাগ এই কাজ শুরু করেছিল। লক্ষ লক্ষ কেওড়া এবং অন্যান্য ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দ্বীপকে ঘিরে। এই কাজের জন্য বছরের পর বছর স্থানীয় মানুষেরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন বন বিভাগের সাথে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দ্বীপে কাজ বলতে ছিল শুধু এই গাছ লাগানো।
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভোলার দ্বীপ 'ঢালচর'
ভোলার মানচিত্রের দিকে লক্ষ করলে অসংখ্য ছোট ছোট চরের অস্তিত্ব চোখে পড়বে। সবচেয়ে নিচের দিকে মেঘনা নদীর মোহনায় সর্বশেষ দ্বীপটির নাম ঢালচর। বাংলাদেশের ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত এই দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সর্বদক্ষিণের মনুষ্য বসবাসকারী দ্বীপ। এরপর খোলা সাগর। ২০০৩ সালের মাঝামাঝি বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে যাওয়ার লাইনের নৌকা করে আমি এই দ্বীপে প্রথম পা রাখি।
একেবারেই অচেনা অদেখা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আমি ও ক্লাসমেট এন্ড্রু বিরাজ পৌঁছে ভীষণ আশ্চর্য হয়েছি অসংখ্য মানুষের কোলাহলে মুখরিত দ্বীপটিকে দেখে। ঢালচরে নৌকা পৌঁছায় শেষ বিকেলের দিকে। নৌকা থেকে নেমে প্রথমেই পড়বে ঢালচরের বিশাল বাজারটি। অনেক মানুষ আমাদের ঘিরে ধরলেন; বুঝতে পারলাম ঢালচরে দিনে একবারই নৌকা ভিড়লে তাদের দেখতে সবাই জড়ো হন বাজারসংলগ্ন নৌঘাটে। মানুষগুলোর সাথে কথা বলে বুঝলাম এদের অধিকাংশই জেলে-শ্রমিক। সারা দিন মাছ ধরে বাজারে এসেছে কিছুটা অবসর সময় কাটানোর জন্য। এই টাইমপাসই মূলত ঢালচরের মানুষদের একমাত্র বিনোদন। রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের পদচারণে গমগম অবস্থা। বড় তাওয়ায় গরম তেলে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, পুরি, পরোটা, মোগলাই আরও কত কী?
আমরা জানতাম ঢালচরে থাকার হোটেল নেই এবং ফিরে যাওয়ার নৌকাও নেই। কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম চা-নাশতা খেতে। আমাদের অবস্থা দেখে সবাই পরামর্শ দিলেন 'আজহার মাস্টারে'র সাথে দেখা করতে। তিনি ঢালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং এই দ্বীপের অভিভাবকের মতো। সন্ধ্যায় ঢালচর বাজারে তার সাথে আমাদের দেখা হলো এবং তিনি আমাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন সদ্য নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া স্কুল বিল্ডিংয়ের দোতালায়। ঢালচর বাজারের শেষে মসজিদের ডান পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হবে পরীর খালের পাড় ধরে। বেশ খানিকটা হাঁটার পর কেল্লার মতো মাটির একটি উঁচু মাঠ পড়বে।
এটি ১৯৯১ সালের সাইক্লোনের পরে হেলিপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে আমাদের ভাড়া করা হেলিকপ্টারটিও এখানেই ল্যান্ড করেছিল। সে আরেক গল্প; পরবর্তী কোনো লেখায় সেটি নিয়ে আবার কথা হবে। মাঠের ডান দিকে তখনো দাঁড়িয়ে ছিল অবসরে যাওয়া ঢালচর সরকারি প্রাইমারি স্কুলটির সবচেয়ে বড় বিল্ডিংটি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এটি দাঁড়িয়েছিল, মেঘনা খেয়ে ফেলার আগে পর্যন্ত! সরকারি বিল্ডিং হওয়ায় টেন্ডারের মাধ্যমে সেটিকে ভেঙে ফেলতে হয়েছিল।
একটি পাটি ও কাঁথা এবং দুটি বালিশ; পাশে মশা মারার কয়েল জ্বালিয়ে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম নিশ্চিন্তে। পরদিন দীর্ঘ সময় ধরে হেঁটে হেঁটে দেখলাম পুরো দ্বীপটির কেন্দ্রীয় অংশটুকু। মনে পড়ে, একদিন সারা দিন ধরে হাঁটলেও দ্বীপের মূল ভূখণ্ড শেষ হতো না; পা ব্যথা হয়ে যেত। এখন ১৫ মিনিট হাঁটলেই লোকালয় শেষ হয়ে যায়! বর্তমানে ঢালচরের বিদ্যমান অংশের প্রায় পুরোটিই সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল।
ঢালচরে বন বিভাগের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। এই দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বন বিভাগ এই কাজ শুরু করেছিল। লক্ষ লক্ষ কেওড়া এবং অন্যান্য ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দ্বীপকে ঘিরে। এই কাজের জন্য বছরের পর বছর স্থানীয় মানুষেরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন বন বিভাগের সাথে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দ্বীপে কাজ বলতে ছিল শুধু এই গাছ লাগানো।
১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনের পর ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বহারা দরিদ্র মানুষেরা ঢালচরে আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে স্থায়ী বসতি। ২০০৩ সালে দ্বীপের মাঝখানে ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আমি হাতের বায়ে ঘন বন দেখেছি। ঢালচরে ইট বিছানো রাস্তা দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। পরে জেনেছি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড এই রাস্তা নির্মাণ করেছিল দ্বীপের মানুষদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য। সাগরের এত গভীরে গিয়ে ইটের রাস্তা তৈরি করা আসলেই একটি দুঃসাধ্য কাজ ছিল। ২০২৫ সালে এসে দ্বীপের কোথাও সেই রাস্তার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সমগ্র সেই অঞ্চলটিই সাগরে ভেসে গেছে।
ঢালচরে নামার প্রথম দিনেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল আমার জীবনে। প্রথম, একেবারেই অচেনা রুট ধরে ঢাকার সদরঘাট থেকে আমরা দুজন ভোলার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। একজন ভোলাবাসী লঞ্চে বসেই আমাদের জানিয়ে দিলেন, লঞ্চ থেকে নেমে আমরা কীভাবে ঢালচরে যেতে পারি। অনেক ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত আমরা ঢালচরে পৌঁছেছিলাম।
দ্বিতীয়, আজহার স্যারের সাথে পরিচয় হলো আমার। তার মুখ থেকেই জানতে পেরেছিলাম ঢালচরের মানুষদের গল্প এবং তৃতীয়, ঢালচর সরকারি প্রাইমারি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টারে আমাদের নিরাপদ রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হলো। আমি আসলে এই স্কুলের মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। ২০১৪ সালে বিল্ডিংটি ভেঙে ফেলা হলে সেই সংবাদে আমি নীরবে কেঁদেছিলাম।
এই তিনটি বিষয়ের সাথে আমার সম্পর্কের বয়স এখন ২২ বছরের বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে আমি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বোঝার চেষ্টা করেছি দ্বীপের নানা পরিবর্তনকে চোখের সামনে দেখে দেখে। প্রাইমারি স্কুলটি বঙ্গোপসাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ১১ বছর আগে। আজহার স্যার এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। ২০২৫ সালে ঢালচর ছেড়ে যেতে হয়েছে তাকেও অগত্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে। তিনি ও আমি এখনো বেঁচে আছি ঢালচরের অন্তিম যাত্রার সাক্ষী হতে।
ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়ালেখা এবং ছবির ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প বলা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ালেখা শেষ করে ২০০২ সালে শুরু করি দ্বিতীয় গ্র্যাজুয়েশন ফটোগ্রাফি বিষয়ে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফিতে (বর্তমানে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া একাডেমি)। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ফটোগ্রাফির মতো ব্যয়বহুল বিষয় নিয়ে পড়ালেখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করতে পাঁচ বছরে আমার পেছনে যে খরচ হয়েছে, পাঠশালায় প্রথম বর্ষে পড়তে তার সমান ব্যয় করতে হয়েছে। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা করার সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে আমার জীবনে। ঘটনাটি আমার ভিজ্যুয়াল জার্নিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজটির সূচনা ঘটায়। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে জরুরি ভিত্তিতে একটি অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজন ছিল। বেশ বড় অঙ্কের টাকা দরকার; তুলনামূলক টাকার অঙ্কে বলতে পারি, এটি ছিল প্রায় ১০ ভরি সোনার দামের সমান! নতুন বর্ষের ভর্তি ফি, ক্যামেরা ও লেন্স কেনা, দৈনন্দিন পড়ার খরচ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন ছিল এই টাকার। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বাবার কাছ থেকে এটি পাওয়া সম্ভব ছিল না।
সে জন্য সরাসরি গিয়ে প্রয়োজনের কথা বলি আমার শিক্ষক ও মেন্টর ড. শহিদুল আলমকে। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি ফিক্সারের কাজ দিয়েছিলেন আমাকে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকার সিনিয়র ফটোগ্রাফার পিটার ইসিকের ফটোগ্রাফি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এই ফিক্সিংটি করতে হবে। এটি ছিল আমার জন্য অত্যন্ত জটিল এবং রোমাঞ্চকর একটি সময়। প্রায় তিন মাসের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল সেটি। এই কাজটির মধ্য দিয়ে মূলত আমার বর্তমান ফটো-জার্নির সূত্রপাত ঘটে এবং এখন পর্যন্ত জার্নিটি চলমান আছে।
ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে শুরু করে এই দ্বীপের সাথে আমার বর্তমান সম্পর্ক ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২২ বছরের। বাংলাদেশের উপকূলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সৃষ্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা বৃদ্ধি ইত্যাদির ভয়াবহ তাণ্ডবকে বুঝতে আমার ভিজ্যুয়ালি জার্নিতে ঢালচর একটি আইকন হিসেবে কাজ করে। প্রাথমিকভাবে একজন ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসেবে ৩০ বছর এই কাজটি চলমান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে আমার। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে ন্যূনতম ৩০ বছরের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অভিঘাত নিয়ে কাজের শুরুটি ২০০৩ সালে হলেও ২০১১ সাল পর্যন্ত আমি ছবি তুলেছি দেশের উত্তর ও দক্ষিণের সব অঞ্চলেই কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই। প্রায় সাত বছর পরে ২০১১ সালে পুনরায় ঢালচরের ছবি তুলতে গেলে আমি এর পরিবর্তিত রূপ দেখে হতবিহ্বল হয়ে যাই। এবং তখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি আমার ফটোগ্রাফির কেন্দ্রীয় ভাবনায় থাকবে বাংলাদেশের উপকূলীয় সম্পূর্ণ অঞ্চলটি। সুন্দরবন থেকে শুরু করে টেকনাফ পর্যন্ত আমাদের রয়েছে দীর্ঘ উপকূল। ১৪টি জেলার মানুষ সরাসরি সাগরের পানিকে সামনে রেখে বসবাস করে। তাদের এই সংখ্যাটি মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
মূলত ২০১১ সালে এসে আমি বুঝতে সক্ষম হই, ফটোগ্রাফির মতো ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করতে এর প্রয়োগ হতে হবে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এই ভাষায় কথা বলতে এর অন্তর্নিহিত কাঠামো না বুঝতে পারলে যোগাযোগ সার্থক হবে না। প্রথমেই আসে জনরা নির্ধারণের বিষয়টি। ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির প্রয়োগ ছাড়া এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত ও চর্চা অত্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সচেতনভাবে চর্চার ধারা ও উপাদান নির্বাচন করতে হয়। আমি এই ক্ষেত্রে আমার ফটোগ্রাফি শিক্ষার অন্যতম শিক্ষক ও মেন্টর নরওয়ের আর্ট ফটোগ্রাফির মাস্টার মর্টিন ক্রগভল্ডের গভীর একটি মূল্যায়ন পেয়েছিলাম।
আমার তৎসময়ে করা কাজের ৩০টির মতো ছবি পোর্টফোলিও আকারে তার সামনে হাজির করি। তিনি সেখান থেকে ১৪টি ছবি পৃথক করে আমাকে পরামর্শ দেন 'ল্যান্ডস্কেপ' জনরাটিকে সচেতনভাবে এখানে কাজে লাগাতে। ৩৫ মিমির ক্যামেরায় আমার লেন্সের ফোকাল লেন্থ ২৪ থেকে ২৮ মিমির সাবলীল ব্যবহারের মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশনের প্রশংসা করেছিলেন তিনি।
পাশাপাশি লাইনের ব্যবহার, কালারের ব্যবহারে যত্নবান হতে বলেছিলেন মূল্যায়নের সময়। সাধারণত বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকাংশ কাজ সাদাকালো ফরমেটের হলেও আমি রংকে বেছে নেই। এই কাজে পরবর্তী সময়ে পোর্ট্রেট জনরায় তোলা বেশ কিছু ছবি সংযুক্ত করি আমি। এটি গল্পের প্রয়োজনে অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে একজন মৌল-চর্চাকারী ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসাবে আমি সচেতনভাবে 'ফাজি' ছবির ব্যবহার পরিহার করেছি এই কাজটিতে।
ঢালচর: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সাক্ষী
বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম নদীবিধৌত বদ্বীপগুলোর একটি। শক্তিশালী সব নদীর বয়ে আনা পলিতে এর উদার উপকূল হাজারো বছর ধরে গঠিত হতে হতে আজকের আকার পেয়েছে। প্রধান তিন নদীর বয়ে আনা সুবিপুল পলি প্রতিবছর নদীর অববাহিকাসহ সমুদ্রে এসে জমা হয়, জেগে ওঠে বালুচর। সেইসব বালুচরে প্রথমে বৃক্ষ শেকড় বিস্তার করে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে লড়াকু জনপদ। সেই জনপদ একটা বিবর্তনশীল উপকূলে ভীষণ প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে এবং প্রজন্মান্তরে বয়ে যেতে থাকে তার ধারা। বাংলাদেশের উপকূল বেশ মিহিনভাবে জলসীমায় মিশে গেছে। যাকে বলে উপকূলীয় নতিমাত্রা, তা এখানে বেশ মার্জিত, চড়াই-উতরাইবিহীন।
নদীবিধৌত বদ্বীপ হওয়ায় এই মিহিনতা, সেই সাথে নদীগুলোর এমন সমুদ্রমুখীনতা সম্ভব হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলে বিন্দুরেখার মতো সৃষ্টি হয়েছে অন্তত পঁচাত্তরটি দ্বীপ। পৃথিবীতে যত বদ্বীপ আছে, তাদের ভেতর এমন সৌন্দর্য বিরল। কিন্তু জীবনসংগ্রামের সামনে এই সৌন্দর্যের চেয়েও কিছু বড় শর্ত দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে। প্রকৃতির এমন রূপের ভেতরে মানুষ এই উপকূলে প্রতিনিয়ত সামুদ্রিক ঝঞ্ঝার সঙ্গে লড়ছে। আরও আছে মেঘনার মতো বিপুলা নদীর দাপট।
স্থানীয়দের তিল তিল করে গড়া বসতি সেই দাপটে প্রায়ই মুছে যেতে চায়। বৈশ্বিক উষ্ণতায় সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হয়ে ওঠায় হয়েছে আরেক বিপদ। এখন সাধারণ জোয়ারেও এদের যাপনের অংশ যেটুকু ভূমি, সেটুকুর অনেকাংশ তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণতম জেলা ভোলার বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত ছোট্ট একটি দ্বীপ ঢালচর। বঙ্গোপসাগরের বুকে গত কয়েক শ বছর ধরে জেগে থাকা একটি পাললিক চর এখন পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তার লাগাম যদি টেনে ধরা না হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত আধা মিটার বেড়ে বাংলাদেশের বাসযোগ্য অন্তত ২০০০ বর্গকিলোমিটার চলে যাবে পানির নিচে এবং বাস্তুচ্যুত হবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ।
স্থানীয় অধিবাসীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জানা যায়, ১৯৭০-এর ভয়াবহ সাইক্লোনের পরে মূলত ইলিশ মাছ ধরার মৌসুমে জেলেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন এই ঢালচরে। এটি ছিল মূলত একটি সংরক্ষিত বন; যার পূর্বতন নাম চর সত্যেন। ২০০৩ সালে যখন আমি এই দ্বীপে ছবি তোলা শুরু করি, তখন স্থানীয়দের ভাষ্যানুযায়ী তিন-চার হাজার পরিবার বসবাস ছিল। এখনকার অধিকাংশ মানুষই অগত্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যান্য নিকটবর্তী দ্বীপ ও মূল ভূখণ্ডে চলে গেছেন। তবে ঢালচর এখনো কোনোমতে টিকে আছে এবং কমবেশি ২০০টির মতো পরিবার বসবাস করছে।
ঢালচরে বন বিভাগের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। এই দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বন বিভাগ এই কাজ শুরু করেছিল। লক্ষ লক্ষ কেওড়া এবং অন্যান্য ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দ্বীপকে ঘিরে। এই কাজের জন্য বছরের পর বছর স্থানীয় মানুষেরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন বন বিভাগের সাথে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দ্বীপে কাজ বলতে ছিল শুধু এই গাছ লাগানো।
ঢালচর তলিয়ে যাচ্ছে সাগরে: বঙ্গোপসাগরের বুকে গত একশ বছর ধরে জেগে থাকা এই পাললিক চর এখন পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তার লাগাম যদি টেনে ধরা না হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত আধা মিটার বেড়ে বাংলাদেশের বাসযোগ্য অন্তত ২০০০ বর্গকিলোমিটার চলে যাবে পানির নিচে এবং বাস্তুচ্যুত হবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। ঢালচর, চর ফ্যাশন, ভোলা। জুন ৩, ২০২৪।
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভোলার দ্বীপ 'ঢালচর'
ভোলার মানচিত্রের দিকে লক্ষ করলে অসংখ্য ছোট ছোট চরের অস্তিত্ব চোখে পড়বে। সবচেয়ে নিচের দিকে মেঘনা নদীর মোহনায় সর্বশেষ দ্বীপটির নাম ঢালচর। বাংলাদেশের ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত এই দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সর্বদক্ষিণের মনুষ্য বসবাসকারী দ্বীপ। এরপর খোলা সাগর। ২০০৩ সালের মাঝামাঝি বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে যাওয়ার লাইনের নৌকা করে আমি এই দ্বীপে প্রথম পা রাখি।
একেবারেই অচেনা অদেখা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আমি ও ক্লাসমেট এন্ড্রু বিরাজ পৌঁছে ভীষণ আশ্চর্য হয়েছি অসংখ্য মানুষের কোলাহলে মুখরিত দ্বীপটিকে দেখে। ঢালচরে নৌকা পৌঁছায় শেষ বিকেলের দিকে। নৌকা থেকে নেমে প্রথমেই পড়বে ঢালচরের বিশাল বাজারটি। অনেক মানুষ আমাদের ঘিরে ধরলেন; বুঝতে পারলাম ঢালচরে দিনে একবারই নৌকা ভিড়লে তাদের দেখতে সবাই জড়ো হন বাজারসংলগ্ন নৌঘাটে। মানুষগুলোর সাথে কথা বলে বুঝলাম এদের অধিকাংশই জেলে-শ্রমিক। সারা দিন মাছ ধরে বাজারে এসেছে কিছুটা অবসর সময় কাটানোর জন্য। এই টাইমপাসই মূলত ঢালচরের মানুষদের একমাত্র বিনোদন। রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের পদচারণে গমগম অবস্থা। বড় তাওয়ায় গরম তেলে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, পুরি, পরোটা, মোগলাই আরও কত কী?
আমরা জানতাম ঢালচরে থাকার হোটেল নেই এবং ফিরে যাওয়ার নৌকাও নেই। কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম চা-নাশতা খেতে। আমাদের অবস্থা দেখে সবাই পরামর্শ দিলেন 'আজহার মাস্টারে'র সাথে দেখা করতে। তিনি ঢালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং এই দ্বীপের অভিভাবকের মতো। সন্ধ্যায় ঢালচর বাজারে তার সাথে আমাদের দেখা হলো এবং তিনি আমাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন সদ্য নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া স্কুল বিল্ডিংয়ের দোতালায়। ঢালচর বাজারের শেষে মসজিদের ডান পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হবে পরীর খালের পাড় ধরে। বেশ খানিকটা হাঁটার পর কেল্লার মতো মাটির একটি উঁচু মাঠ পড়বে।
এটি ১৯৯১ সালের সাইক্লোনের পরে হেলিপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে আমাদের ভাড়া করা হেলিকপ্টারটিও এখানেই ল্যান্ড করেছিল। সে আরেক গল্প; পরবর্তী কোনো লেখায় সেটি নিয়ে আবার কথা হবে। মাঠের ডান দিকে তখনো দাঁড়িয়ে ছিল অবসরে যাওয়া ঢালচর সরকারি প্রাইমারি স্কুলটির সবচেয়ে বড় বিল্ডিংটি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এটি দাঁড়িয়েছিল, মেঘনা খেয়ে ফেলার আগে পর্যন্ত! সরকারি বিল্ডিং হওয়ায় টেন্ডারের মাধ্যমে সেটিকে ভেঙে ফেলতে হয়েছিল।
একটি পাটি ও কাঁথা এবং দুটি বালিশ; পাশে মশা মারার কয়েল জ্বালিয়ে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম নিশ্চিন্তে। পরদিন দীর্ঘ সময় ধরে হেঁটে হেঁটে দেখলাম পুরো দ্বীপটির কেন্দ্রীয় অংশটুকু। মনে পড়ে, একদিন সারা দিন ধরে হাঁটলেও দ্বীপের মূল ভূখণ্ড শেষ হতো না; পা ব্যথা হয়ে যেত। এখন ১৫ মিনিট হাঁটলেই লোকালয় শেষ হয়ে যায়! বর্তমানে ঢালচরের বিদ্যমান অংশের প্রায় পুরোটিই সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল।
গোধূলিলগ্নে পারাপারের নৌকা: ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শেষাংশ চর কচ্ছোপিয়া ঘাট থেকে প্রতিদিন একটি নৌকা বিকাল তিনটায় ঢালচরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মূল ভূখণ্ড থেকে যাত্রা শুরু করে দিনের শেষভাগে এসে ঢালচরে পৌঁছে পারাপারের একমাত্র নৌকাটি। মানুষ সব নেমে গেলে শ্রমিকরা একে একে নামাতে শুরু করে মালামালসমূহ। ঢালচর, চর ফ্যাশন, ভোলা। ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৪।
ঢালচরে বন বিভাগের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। এই দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বন বিভাগ এই কাজ শুরু করেছিল। লক্ষ লক্ষ কেওড়া এবং অন্যান্য ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দ্বীপকে ঘিরে। এই কাজের জন্য বছরের পর বছর স্থানীয় মানুষেরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন বন বিভাগের সাথে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দ্বীপে কাজ বলতে ছিল শুধু এই গাছ লাগানো।
১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনের পর ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে সর্বহারা দরিদ্র মানুষেরা ঢালচরে আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে স্থায়ী বসতি। ২০০৩ সালে দ্বীপের মাঝখানে ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আমি হাতের বায়ে ঘন বন দেখেছি। ঢালচরে ইট বিছানো রাস্তা দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। পরে জেনেছি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড এই রাস্তা নির্মাণ করেছিল দ্বীপের মানুষদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য। সাগরের এত গভীরে গিয়ে ইটের রাস্তা তৈরি করা আসলেই একটি দুঃসাধ্য কাজ ছিল। ২০২৫ সালে এসে দ্বীপের কোথাও সেই রাস্তার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সমগ্র সেই অঞ্চলটিই সাগরে ভেসে গেছে।
ঢালচরে নামার প্রথম দিনেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল আমার জীবনে। প্রথম, একেবারেই অচেনা রুট ধরে ঢাকার সদরঘাট থেকে আমরা দুজন ভোলার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। একজন ভোলাবাসী লঞ্চে বসেই আমাদের জানিয়ে দিলেন, লঞ্চ থেকে নেমে আমরা কীভাবে ঢালচরে যেতে পারি। অনেক ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত আমরা ঢালচরে পৌঁছেছিলাম।
দ্বিতীয়, আজহার স্যারের সাথে পরিচয় হলো আমার। তার মুখ থেকেই জানতে পেরেছিলাম ঢালচরের মানুষদের গল্প এবং তৃতীয়, ঢালচর সরকারি প্রাইমারি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টারে আমাদের নিরাপদ রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হলো। আমি আসলে এই স্কুলের মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। ২০১৪ সালে বিল্ডিংটি ভেঙে ফেলা হলে সেই সংবাদে আমি নীরবে কেঁদেছিলাম।
এই তিনটি বিষয়ের সাথে আমার সম্পর্কের বয়স এখন ২২ বছরের বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে আমি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বোঝার চেষ্টা করেছি দ্বীপের নানা পরিবর্তনকে চোখের সামনে দেখে দেখে। প্রাইমারি স্কুলটি বঙ্গোপসাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ১১ বছর আগে। আজহার স্যার এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। ২০২৫ সালে ঢালচর ছেড়ে যেতে হয়েছে তাকেও অগত্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে। তিনি ও আমি এখনো বেঁচে আছি ঢালচরের অন্তিম যাত্রার সাক্ষী হতে।
দ্বীপের নতুন সদস্য: ঢালচরে নতুন সদস্যের আগমন। নৌকার সহকারী যত্ন ও মমতায় নৌকা থেকে নামিয়ে নিয়ে এলেন বাচ্চাটিকে। এখানে সবাই সবাইকে চেনেন। সাগরের বুকে বৈরী আবহাওয়ায় টিকে থাকতে তাদেরকে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে হয়। ঢালচর, চর ফ্যাশন, ভোলা। ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৪
ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়ালেখা এবং ছবির ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প বলা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ালেখা শেষ করে ২০০২ সালে শুরু করি দ্বিতীয় গ্র্যাজুয়েশন ফটোগ্রাফি বিষয়ে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফিতে (বর্তমানে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া একাডেমি)। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ফটোগ্রাফির মতো ব্যয়বহুল বিষয় নিয়ে পড়ালেখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করতে পাঁচ বছরে আমার পেছনে যে খরচ হয়েছে, পাঠশালায় প্রথম বর্ষে পড়তে তার সমান ব্যয় করতে হয়েছে। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা করার সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে আমার জীবনে। ঘটনাটি আমার ভিজ্যুয়াল জার্নিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজটির সূচনা ঘটায়। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে জরুরি ভিত্তিতে একটি অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজন ছিল। বেশ বড় অঙ্কের টাকা দরকার; তুলনামূলক টাকার অঙ্কে বলতে পারি, এটি ছিল প্রায় ১০ ভরি সোনার দামের সমান! নতুন বর্ষের ভর্তি ফি, ক্যামেরা ও লেন্স কেনা, দৈনন্দিন পড়ার খরচ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন ছিল এই টাকার। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বাবার কাছ থেকে এটি পাওয়া সম্ভব ছিল না।
সে জন্য সরাসরি গিয়ে প্রয়োজনের কথা বলি আমার শিক্ষক ও মেন্টর ড. শহিদুল আলমকে। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি ফিক্সারের কাজ দিয়েছিলেন আমাকে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকার সিনিয়র ফটোগ্রাফার পিটার ইসিকের ফটোগ্রাফি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এই ফিক্সিংটি করতে হবে। এটি ছিল আমার জন্য অত্যন্ত জটিল এবং রোমাঞ্চকর একটি সময়। প্রায় তিন মাসের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল সেটি। এই কাজটির মধ্য দিয়ে মূলত আমার বর্তমান ফটো-জার্নির সূত্রপাত ঘটে এবং এখন পর্যন্ত জার্নিটি চলমান আছে।
ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে শুরু করে এই দ্বীপের সাথে আমার বর্তমান সম্পর্ক ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২২ বছরের। বাংলাদেশের উপকূলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সৃষ্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা বৃদ্ধি ইত্যাদির ভয়াবহ তাণ্ডবকে বুঝতে আমার ভিজ্যুয়ালি জার্নিতে ঢালচর একটি আইকন হিসেবে কাজ করে। প্রাথমিকভাবে একজন ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসেবে ৩০ বছর এই কাজটি চলমান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে আমার। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে ন্যূনতম ৩০ বছরের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
ঢালচর বাজার আর নেই: ঢালচরে ২০০৩ সালেও বিশাল একটি বাজার ছিল এবং ইলিশ বাণিজ্যের জন্য আলাদা বাজার ও ঘাট ছিল। শত শত ইলিশের ট্রলার ও হাজারো জেলের পদচারণায় মুখরিত ছিল পুরো ঢালচর বাজার। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র নদী ভাঙ্গনের মতো বিধ্বংসী নানান কারণে দ্বীপটির অধিকাংশই সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। ঢালচর বাজার এখন আর মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢালচর বাজার, ঢালচর, ভোলা। জানুয়ারি ২১, ২০১৪
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অভিঘাত নিয়ে কাজের শুরুটি ২০০৩ সালে হলেও ২০১১ সাল পর্যন্ত আমি ছবি তুলেছি দেশের উত্তর ও দক্ষিণের সব অঞ্চলেই কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই। প্রায় সাত বছর পরে ২০১১ সালে পুনরায় ঢালচরের ছবি তুলতে গেলে আমি এর পরিবর্তিত রূপ দেখে হতবিহ্বল হয়ে যাই। এবং তখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি আমার ফটোগ্রাফির কেন্দ্রীয় ভাবনায় থাকবে বাংলাদেশের উপকূলীয় সম্পূর্ণ অঞ্চলটি। সুন্দরবন থেকে শুরু করে টেকনাফ পর্যন্ত আমাদের রয়েছে দীর্ঘ উপকূল। ১৪টি জেলার মানুষ সরাসরি সাগরের পানিকে সামনে রেখে বসবাস করে। তাদের এই সংখ্যাটি মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
মূলত ২০১১ সালে এসে আমি বুঝতে সক্ষম হই, ফটোগ্রাফির মতো ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করতে এর প্রয়োগ হতে হবে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এই ভাষায় কথা বলতে এর অন্তর্নিহিত কাঠামো না বুঝতে পারলে যোগাযোগ সার্থক হবে না। প্রথমেই আসে জনরা নির্ধারণের বিষয়টি। ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির প্রয়োগ ছাড়া এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত ও চর্চা অত্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সচেতনভাবে চর্চার ধারা ও উপাদান নির্বাচন করতে হয়। আমি এই ক্ষেত্রে আমার ফটোগ্রাফি শিক্ষার অন্যতম শিক্ষক ও মেন্টর নরওয়ের আর্ট ফটোগ্রাফির মাস্টার মর্টিন ক্রগভল্ডের গভীর একটি মূল্যায়ন পেয়েছিলাম।
আমার তৎসময়ে করা কাজের ৩০টির মতো ছবি পোর্টফোলিও আকারে তার সামনে হাজির করি। তিনি সেখান থেকে ১৪টি ছবি পৃথক করে আমাকে পরামর্শ দেন 'ল্যান্ডস্কেপ' জনরাটিকে সচেতনভাবে এখানে কাজে লাগাতে। ৩৫ মিমির ক্যামেরায় আমার লেন্সের ফোকাল লেন্থ ২৪ থেকে ২৮ মিমির সাবলীল ব্যবহারের মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশনের প্রশংসা করেছিলেন তিনি।
পাশাপাশি লাইনের ব্যবহার, কালারের ব্যবহারে যত্নবান হতে বলেছিলেন মূল্যায়নের সময়। সাধারণত বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকাংশ কাজ সাদাকালো ফরমেটের হলেও আমি রংকে বেছে নেই। এই কাজে পরবর্তী সময়ে পোর্ট্রেট জনরায় তোলা বেশ কিছু ছবি সংযুক্ত করি আমি। এটি গল্পের প্রয়োজনে অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে একজন মৌল-চর্চাকারী ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসাবে আমি সচেতনভাবে 'ফাজি' ছবির ব্যবহার পরিহার করেছি এই কাজটিতে।
নদীভাঙ্গনে বাস্তুচ্যুত: নদী ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের তুলনা চলে নাড়িছেঁড়া শিশুর সঙ্গে। যেন এক নতুন পৃথিবীতে এতোদিনের স্বাচ্ছন্দ ভেঙে ওরা হঠাৎ নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন। অসহায়, বিপর্যস্ত। মানুষের শেকড় কিন্তু গাছের মতোই মাটির গভীরে প্রোত্থিত। শেকড় কাটলে গাছকে বাঁচানো যেমন দুঃসাধ্য, শেকড়কাটা মানুষকেও তাই। একটা নতুন জায়গায় আবার জীবন শুরু করাটা কঠিন। তবু আশা নিরাশায় দোদুল্যমান তাদের নৌকা একসময় নতুন ভূখণ্ডে ভিড়ে, হয়ত নতুন কোনো চরে। এবার সেই ভূখণ্ডে ওরা ওদের মতোই একদল মানুষকে আবিষ্কার করে। যারা তাদের মতোই একই পরিণতির শিকার, হয়ত একই দুর্ভাগ্যের সমভোগী। আগে আসা মানুষগুলো কিন্তু বণ্য প্রাণীর স্বভাবমতো এরইমাঝে এলাকায় একটা দাপট প্রতিষ্ঠা করেছে। হয়ত অনেকখানি সংস্কারও করেছে। অতএব জায়গা, খাবারের ভাগীদার নতুন কোনো পরিবারকে ওরা চট করে গ্রহণ করবে কেন? সময়টা পরীক্ষার; কখনো নিষ্ঠুরতারও। তবু পেছন ফেরার উপায় নেই। একবার নৌকা ভাসিয়েছেন মানে পেছনে ফেরার পথ চিররুদ্ধ।
ঢালচর: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সাক্ষী
বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম নদীবিধৌত বদ্বীপগুলোর একটি। শক্তিশালী সব নদীর বয়ে আনা পলিতে এর উদার উপকূল হাজারো বছর ধরে গঠিত হতে হতে আজকের আকার পেয়েছে। প্রধান তিন নদীর বয়ে আনা সুবিপুল পলি প্রতিবছর নদীর অববাহিকাসহ সমুদ্রে এসে জমা হয়, জেগে ওঠে বালুচর। সেইসব বালুচরে প্রথমে বৃক্ষ শেকড় বিস্তার করে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে লড়াকু জনপদ। সেই জনপদ একটা বিবর্তনশীল উপকূলে ভীষণ প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে এবং প্রজন্মান্তরে বয়ে যেতে থাকে তার ধারা। বাংলাদেশের উপকূল বেশ মিহিনভাবে জলসীমায় মিশে গেছে। যাকে বলে উপকূলীয় নতিমাত্রা, তা এখানে বেশ মার্জিত, চড়াই-উতরাইবিহীন।
নদীবিধৌত বদ্বীপ হওয়ায় এই মিহিনতা, সেই সাথে নদীগুলোর এমন সমুদ্রমুখীনতা সম্ভব হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলে বিন্দুরেখার মতো সৃষ্টি হয়েছে অন্তত পঁচাত্তরটি দ্বীপ। পৃথিবীতে যত বদ্বীপ আছে, তাদের ভেতর এমন সৌন্দর্য বিরল। কিন্তু জীবনসংগ্রামের সামনে এই সৌন্দর্যের চেয়েও কিছু বড় শর্ত দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে। প্রকৃতির এমন রূপের ভেতরে মানুষ এই উপকূলে প্রতিনিয়ত সামুদ্রিক ঝঞ্ঝার সঙ্গে লড়ছে। আরও আছে মেঘনার মতো বিপুলা নদীর দাপট।
স্থানীয়দের তিল তিল করে গড়া বসতি সেই দাপটে প্রায়ই মুছে যেতে চায়। বৈশ্বিক উষ্ণতায় সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হয়ে ওঠায় হয়েছে আরেক বিপদ। এখন সাধারণ জোয়ারেও এদের যাপনের অংশ যেটুকু ভূমি, সেটুকুর অনেকাংশ তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণতম জেলা ভোলার বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত ছোট্ট একটি দ্বীপ ঢালচর। বঙ্গোপসাগরের বুকে গত কয়েক শ বছর ধরে জেগে থাকা একটি পাললিক চর এখন পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তার লাগাম যদি টেনে ধরা না হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত আধা মিটার বেড়ে বাংলাদেশের বাসযোগ্য অন্তত ২০০০ বর্গকিলোমিটার চলে যাবে পানির নিচে এবং বাস্তুচ্যুত হবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ।
স্থানীয় অধিবাসীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জানা যায়, ১৯৭০-এর ভয়াবহ সাইক্লোনের পরে মূলত ইলিশ মাছ ধরার মৌসুমে জেলেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন এই ঢালচরে। এটি ছিল মূলত একটি সংরক্ষিত বন; যার পূর্বতন নাম চর সত্যেন। ২০০৩ সালে যখন আমি এই দ্বীপে ছবি তোলা শুরু করি, তখন স্থানীয়দের ভাষ্যানুযায়ী তিন-চার হাজার পরিবার বসবাস ছিল। এখনকার অধিকাংশ মানুষই অগত্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যান্য নিকটবর্তী দ্বীপ ও মূল ভূখণ্ডে চলে গেছেন। তবে ঢালচর এখনো কোনোমতে টিকে আছে এবং কমবেশি ২০০টির মতো পরিবার বসবাস করছে।
ঢালচর তলিয়ে যাচ্ছে সাগরে: বঙ্গোপসাগরের বুকে গত একশ বছর ধরে জেগে থাকা এই পাললিক চর এখন পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তার লাগাম যদি টেনে ধরা না হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত আধা মিটার বেড়ে বাংলাদেশের বাসযোগ্য অন্তত ২০০০ বর্গকিলোমিটার চলে যাবে পানির নিচে এবং বাস্তুচ্যুত হবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। ঢালচর, চর ফ্যাশন, ভোলা। জুন ৩, ২০২৪
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সামাজিক ঝুঁকি মানচিত্র অনুযায়ী ২০১৪ সালে ঢালচরের খানার সংখ্যা ছিল ৪১৮টি। তথ্যানুযায়ী ঢালচরের সেই সময়ের মোট জনসংখ্যা ছিল ২১৯১ জন। ২০০৩ সালে প্রথম ছবি তোলার পর ২০১১ সালে প্রায় আট বছর পর আবার ঢালচরে গেলে আমি দ্বীপের অনেক অঞ্চলকেই আর খুঁজে পাইনি। দ্বীপের পূর্ব দিকের বিস্তৃত অঞ্চলের জনবসতি ভেঙে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে তত দিনে। পশ্চিম প্রান্তের নতুন জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ জমিন ছিল, সেগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
ঢালচর ২০২৫ সালে এসে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ নিয়ে কোনোরকমে অস্তিত্ব রক্ষা ক