26/06/2026
কুরআনের সেই মহামূল্যবান নীতিমালা, যা ব্যক্তিত্ব গঠনের অসংখ্য কোর্সের চেয়েও কার্যকর
মানুষ আজ নিজের ব্যক্তিত্ব উন্নয়ন, আত্মশুদ্ধি, নেতৃত্বগুণ, মানসিক প্রশান্তি এবং সফল জীবন গঠনের জন্য অসংখ্য বই পড়ে, সেমিনারে অংশ নেয় এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবুল্লাহ আল-কুরআনে এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা দান করেছেন, যা একজন মানুষকে পরিপূর্ণ চরিত্রবান, বিচক্ষণ, ধৈর্যশীল ও আল্লাহভীরু মানুষে পরিণত করতে যথেষ্ট।
কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং আত্মিক উন্নতির জন্য এতে রয়েছে অনন্য শিক্ষামালা। যে ব্যক্তি কুরআনের নির্দেশনাকে জীবনের কর্মপদ্ধতি বানায়, তার জীবন বদলে যায়; তার অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, চরিত্র সৌন্দর্যমণ্ডিত হয় এবং সে পৃথিবী ও আখিরাতে সফলতার পথে অগ্রসর হয়।
১. জিহ্বার সংযম ও কথার দায়িত্বশীলতা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿مَا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴾
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”
(সূরা কাফ ৫০:১৮)
মানুষের অধিকাংশ গুনাহ জিহ্বার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। গীবত, অপবাদ, মিথ্যা, কটুক্তি, পরনিন্দা, অশ্লীল ভাষা এবং অন্যকে কষ্ট দেওয়া—সবই জিহ্বার অপব্যবহারের ফল।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭)
আরও বলেছেন—
«إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يَتَبَيَّنُ فِيهَا يَزِلُّ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مِمَّا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ»
“বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে, যার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করে না; অথচ সেই কথার কারণে সে পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও দূরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৮)
ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য কথার সৌন্দর্যের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। তাই জিহ্বার সংযম আত্মগঠনের প্রথম ধাপ।
২. অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল ও গুজব থেকে বেঁচে থাকা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬)
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করা খুব সহজ হয়ে গেছে। অথচ ইসলামে এটি গুরুতর অপরাধ।
আল্লাহ বলেন—
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا﴾
“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।”
(সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ»
“মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)
জ্ঞানহীন আলোচনা, গুজব, মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান এবং ভিত্তিহীন মন্তব্য একজন মানুষের মর্যাদা নষ্ট করে দেয়। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় হলো প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে দূরে থাকা।
৩. রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ﴾
“যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
(সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৪)
রাগ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দেয়। মুহূর্তের উত্তেজনায় বলা একটি কথা বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বারবার বলেছিলেন—
«لَا تَغْضَبْ»
“রাগ করো না।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬১১৬)
আরও বলেছেন—
«لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ»
“প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬০৯)
রাগের সময় নীরব থাকা, অজু করা, স্থান পরিবর্তন করা এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া ইসলামের শিক্ষা। এ গুণ অর্জন করতে পারলে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অসংখ্য সমস্যা দূর হয়ে যায়।
৪. অন্তরের পবিত্রতা ও সম্পর্ক রক্ষার মানসিকতা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ﴾
“তোমরা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহ ও সৌজন্যের কথা ভুলে যেও না।”
(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৩৭)
মানবসম্পর্ক টিকে থাকে কৃতজ্ঞতা, সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতার উপর। যারা সাময়িক ভুলের কারণে মানুষের সব ভালো কাজ ভুলে যায়, তারা কখনো সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«لَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا»
“তোমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না, সম্পর্কচ্ছেদ করো না; বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬০৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৯)
হৃদয়ের পবিত্রতা মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। যে অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে মুক্ত, সে-ই প্রকৃত শান্তি লাভ করে।
৫. ধৈর্যকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
(সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৩)
আরও বলেন—
﴿إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ﴾
“ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।”
(সূরা আয-যুমার ৩৯:১০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ»
“ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫৩)
সফল মানুষদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য হারায় না।
৬. আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا﴾
“সফল হয়েছে সে, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে; আর ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।”
(সূরা আশ-শামস ৯১:৯-১০)
উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন—
«حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا»
“তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব নাও।”
আত্মসমালোচনা মানুষকে অহংকার থেকে বাঁচায় এবং উন্নতির পথ খুলে দেয়।
৭. তাকওয়া: চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি
আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।”
(সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ»
“তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো।”
(সুনান আত-তিরমিযি, হাদিস: ১৯৮৭; হাসান)
তাকওয়া মানুষকে একাকী অবস্থায়ও সৎ থাকতে শেখায়। এটি এমন এক অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা মানুষের চরিত্রকে দৃঢ় ও নির্মল করে তোলে।
কুরআনের এসব নীতিমালা শুধু ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের তত্ত্ব নয়; বরং এগুলো এমন বাস্তব জীবনবিধান, যা একজন মানুষকে সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, আত্মনিয়ন্ত্রিত, বিচক্ষণ, ক্ষমাশীল ও আল্লাহভীরু মানুষে পরিণত করে। যে ব্যক্তি এগুলোকে জীবনের অংশ বানাতে পারে, তার চরিত্র, পরিবার, সমাজ ও আখিরাত—সবকিছুই কল্যাণময় হয়ে ওঠে।
: