10/07/2026
#জেনেটিক_ইঞ্জিনিয়ারিং
১ম অধ্যায়
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটি জৈবপ্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো জীবের জিন বা ডিএনএ-তে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন এনে অথবা এক জীবের জিন অন্য জীবের মধ্যে স্থানান্তর করে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব সৃষ্টি করা হয়।
Paul Berg কে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক বলা হয়। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত ট্রান্সজেনিক উন্নত বৈশিষ্ট্যধারী উদ্ভিদ ও প্রাণী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যবহার বা প্রয়োগক্ষেত্র:
বর্তমান যুগ জীবপ্রযুক্তি তথা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যুগ। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ রক্ষা, মানবস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়নসহ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
১. কৃষি উন্নয়নে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের অংশ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বহু চারা উৎপাদন করা যায় এবং সতেজ অবস্থায় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। যেসব উদ্ভিদ বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে না, সেগুলোর বংশবৃদ্ধিও সম্ভব হয়। ঋতুভিত্তিক চারা উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা দূর করা যায় এবং সহজেই রোগমুক্ত, বিশেষ করে ভাইরাসমুক্ত চারা উৎপাদন করা সম্ভব। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও উৎপাদনে টিস্যু কালচার একটি নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া উন্নত বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সমস্যাও অনেকাংশে দূর হয়।
বন্যজাতীয় উদ্ভিদের উপকারী জিন ফসলের মধ্যে স্থানান্তর করে অধিক ফলনশীল ও উন্নত জাতের শস্য উৎপাদন করা যায়। যেমন—ধান, গম, পাট, তেলবীজ ইত্যাদি। কৃষিক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে উৎপাদিত শস্যকে Genetically Modified Crops (GMC) বা Genetically Modified Crops (GM Crops) বলা হয়।
২. ঔষধ শিল্পে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
বর্তমানে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে ব্যাপকহারে ভ্যাকসিন বা টিকা উৎপাদন করা হচ্ছে, যা পোলিও, যক্ষ্মা, হাম, বসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। ভ্যাকসিন দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সাহায্যে বাণিজ্যিকভাবে ইন্টারফেরন উৎপাদন সম্ভব হয়েছে, যা হেপাটাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে ইন্টারফেরন ব্যবহার করে রোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
এছাড়া ডায়াবেটিস রোগের ইনসুলিন, মানবদেহের বৃদ্ধির হরমোন (Growth Hormone) ইত্যাদি উৎপাদনে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিশেষ অবদান রয়েছে। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত হরমোন সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদিত হচ্ছে। যেমন—পেনিসিলিন, টেট্রাসাইক্লিন, পলিমিক্সিন ইত্যাদি।
৩. গৃহপালিত পশু ও মৎস্য উন্নয়নে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
উন্নত জাতের পশু উৎপাদনের লক্ষ্য হলো চর্বিহীন মাংস উৎপাদন, দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি, দ্রুত বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মূল্যবান প্রোটিন উৎপাদন।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে শূকর, মুরগি, খরগোশ, গরু, ভেড়া ও ছাগলসহ বিভিন্ন ট্রান্সজেনিক প্রাণী উদ্ভাবন করা হয়েছে। ট্রান্সজেনিক ভেড়ার দেহে মাংস ও পশমের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা হয়েছে। ট্রান্সজেনিক শূকরের মাধ্যমে চর্বিহীন মাংস উৎপাদন এবং মানুষের প্রয়োজনীয় হরমোন উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রান্সজেনিক গরুর মাধ্যমে মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মাতৃদুগ্ধে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন ল্যাকটোফেরিন (Lactoferrin) উৎপাদনও সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া মাগুর, কৈ, কমন কার্প, লইট্টা ও তেলাপিয়া মাছে স্যামন মাছের বৃদ্ধিজনিত হরমোনের জিন স্থানান্তরের মাধ্যমে এসব মাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।
৪. দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
দুধের সরাসরি ব্যবহার ছাড়াও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সহায়তায় বিভিন্ন দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদন করা হয়। যেমন—মাখন, পনির, দই ইত্যাদি। এসব খাদ্য উৎপাদনে বিভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়।
৫. ফরেনসিক পরীক্ষায় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
রক্ত, বীর্য, মূত্র, অশ্রু, লালা ইত্যাদির ডিএনএ বা অ্যান্টিবডি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফরেনসিক পরীক্ষায় অপরাধী শনাক্ত করা হয়। সেরোলজি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্ত, বীর্য ও লালা শনাক্ত করে পরবর্তীতে ডিএনএ বিশ্লেষণের সাহায্যে অপরাধীকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এছাড়া হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট (Human Genome Project)-এর মাধ্যমে মানবদেহের বিভিন্ন ক্রোমোজোমে অবস্থিত জিনগুলোর অবস্থান ও কার্যাবলি সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিকর জিন অপসারণ করে সুস্থ জিন প্রতিস্থাপন করা যায়। এই পদ্ধতিকে জিন থেরাপি (Gene Therapy) বলা হয়।
৬. পরিবেশ রক্ষায় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
পয়ঃপ্রণালী শোধন, মানুষের বর্জ্য দুর্গন্ধমুক্তকরণ, পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের গুণগত মান সংরক্ষণ এবং শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানির বিষাক্ততা হ্রাসে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ, উদ্ভিদে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমানো, বিভিন্ন রোগের জৈবিক নিয়ন্ত্রণ এবং জিন ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জিন প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্ষতিকর দিক:
১. ডিএনএ (DNA) যদি কোনো কারণে ক্ষতিকর পরিবর্তনের শিকার হয়, তবে এর প্রভাবে জীবজগতে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
২. নিবেশিত (Inserted) জিন যদি ক্ষতিকর বা বিষাক্ত প্রোটিন তৈরি করে, তবে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন নতুন রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
৩. যদি কোষে প্রবেশ করানো অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট জিন কোনো রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়, তবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে সেই জীবাণুকে দমন করা কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
© & Edited