04/10/2022
বর্তমান সময়ে দ্বীন চর্চা, দ্বীনের লালন, দ্বীনকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও ধারণ করার ক্ষেত্রে যুবকদের করণীয়।
১- যুবকদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। নিজস্ব মাসলাক, মাশরাব, মানহাজের দিকে অন্ধত্বের সহিত চললে হবে না। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করাই হলো আদর্শ মু'মিন যুবকের বৈশিষ্ট্য।
২- অন্তর থেকে দুনিয়ার যশ-খ্যাতি, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ আর আগ্রহের অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।
৩- কর্ম জীবনে হালাল-হারাম পরখ করে চলতে হবে। হারাম ব্যবসায় বা হারাম চাকুরী কিংবা হারাম কর্মসংস্থান বা হারাম কর্মস্থল পরিহার করতে হবে। সর্বদা হালাল রুজিরোজগারের অনুসন্ধানে থাকা ও হালাল রুজির ভেতর দিয়ে চলার মধ্যেই নিজের শান্তি ও স্বার্থ দেখতে হবে।
৪- কুরআন-সুন্নাহ'র সঠিক ইলিম অর্জন করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহের জ্ঞানের পাশাপাশি আবহমানকালের সংস্কৃতি, উপমহাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক জ্ঞান, ইসলামী অর্থনীতির পাশাপাশি পূঁজিবাদী অর্থনীতির অসারতা, ইসলামী দর্শনের পাশাপাশি চলমান অন্যান্য দর্শনের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে অবগতি, শেষ জামানার উত্থান-পতন, আখেরি জামানার ফিতনা সম্পর্কে পূর্ণ জানাশোনা থাকতে হবে।
৫- চলমান সকল ভ্রান্ত ধারণা পোষণকারী বাতিল ফেরকা বা দল সম্পর্কে পড়াশোনা করে পূর্ণ জানাশোনা থাকতে হবে। পাশাপাশি তাদের অসারতা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে ইসলামের আলোকে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক পূর্ণ দালীলিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
৬- 'ফেরাকে বাত্বেলা'র পাশাপাশি 'আদইয়ানে বাত্বেলা' সম্পর্কে জানাশোনা থাকতে হবে, পাশাপাশি তাদের মিশন ও ভিশন সম্পর্কে জেনে তাদের ক্ষতি থেকে জাতিকে সুরক্ষা করতে ইসলামের দাওয়াহ’র ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ কিভাবে গ্রহণ করতে হবে তার পূর্ণ পদ্ধতি সম্পর্কে অবগতি অর্জন করতে হবে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।
৭- কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইলম অর্জন করার পর সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। কারণ ইলম অর্জন করে সে অনুযায়ী আমল করলে ভেতরে নূর পয়দা হয়, আর ভেতরে নূর আসলেই দ্বীনি ময়দানে দায়ী হওয়া যায়, পাশাপাশি দিলের মধ্যে উম্মতের জন্য দরদ তৈরি হয়, আর দিলে দরদ থাকলে দেমাগের মধ্যে ফিকির আসবে, আর ফিকিরযুক্ত মস্তিষ্ক হলে সেই দাওয়াতের মাধ্যমেই উম্মতের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে। তাই প্রকৃত দায়ী হওয়ার জন্য দরদী দিল আর ফিকিরওয়ালা মগজ অবশ্যই দরকার।
৮- ব্যাপকভাবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য দাওয়াতের কাজ করতে হবে জনসাধারণের মধ্যে, আর এই দাওয়াতে ক্ষেত্রে প্রথমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আল্লাহর তাওহীদ, আল্লাহর উলূহিয়্যাত, আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, রাসূলের রেসালাত, রাসূলের শ্রেষ্ঠত্ব, রাসূলের শেষ নবী হওয়ার অকাট্যতা এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে দাওয়াতের ময়দানে অগ্রসর হতে হবে।
৯- দ্বীনি কাজে সহযোগিতা করা, সহমর্মিতা প্রকাশ করা, দ্বীনি কাজে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানো সবকিছুর মধ্যে 'ইখলাস' পূর্ণরূপে থাকতে হবে। মোটকথা দ্বীনি কাজের সবক্ষেত্রে ইখলাস'র চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। কেননা ইখলাসহীন কোন কাজের ই স্থায়িত্বতা নেই। দ্বীনের ক্ষেত্রে ইখলাস ছাড়া যত কাজই হোক না কেন, সব কাজই অবান্তর বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
১০- চর্চা, পরিচর্চার দ্বারা মু'মিন যুবকদের আচার-উচ্চারণে উন্নতি ঘটাতে হবে। উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। আল্লাহর অপর কোন মুমিন বান্দা তো দূরের কথা কোন অমুসলিম কিংবা আল্লাহর অন্য কোন সৃষ্টিও যেন কোন ধরনের কষ্টের সম্মুখীন না হন সে বিষয়ে প্রতিটি মু'মিনকে সতর্ক থাকতে হবে।
১১- লেনদেন, মোয়ামালার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সততা আর নিষ্ঠার সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতে হবে লেনদেনের ক্ষেত্রে। লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ থাকা একজন প্রকৃত মু'মিনের গুণ। তাই কোনভাবেই যেন লেনদেনের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি থাকা চাই।
১২- মু'মিন যুবকের বাহ্যিক আচরণের উন্নতির পাশাপাশি আভ্যন্তরীণ তথা আধ্যাত্মিক উন্নতি একান্তভাবেই প্রয়োজন। তাই অন্তরের কলূষতা দূর করতে, অন্তরের রুগের নিরাময়ের জন্য একজন প্রকৃত আল্লাহওয়ালার সাথে সান্নিধ্য অর্জন, তাঁর সাথে গভীরভাবে সখ্যতা গড়ে তোলার পাশাপাশি সুন্দর ইসলাহী সম্পর্ক মজবুত করতে হবে। যাতে দ্বীনি কাজে কখনো পদস্খলন কিংবা পদচ্যুতি হলে সাথে সাথে যেন এই 'ইসলাহী মোরব্বী' যুবক মু'মিনকে সংশোধন করে সঠিক চিন্তার বিষয়ে সবক দিতে পারেন।
১৩- গোনাহের পথ ও গোনাহের কাজ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে, গোনাহের পথ ও কাজের প্রতি অন্তরে ঘৃণা ও অবজ্ঞা লালন করতে হবে। নেক ও পূণ্য কাজের প্রতি অন্তরে ভালোলাগা ও ভালোবাসা লালন করতে হবে।
১৪- সর্বদা দ্বীনের রাস্তায় চলার জন্য নামাজের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য কামনা করতে হবে। দোয়ার কোন বিকল্প নেই। তাই দোয়ার আমল সবসময় চলমান রাখতে হবে। দ্বীনি যেকোন কাজ করার আগে দোয়ার আমল অবশ্যই দরকার। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া যেন প্রতিটি যুবক মুমিনের একান্ত আবশ্যিক কাজ বলে পরিগনিত হয়।
১৫- ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের জন্য নিজের সকল মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হবে। কারণ ইসলামি সমাজ গঠনের পূর্বশর্তই হলো ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন। তাই বিবেধের যত পথ ও মত আছে সবগুলোকে পেছনে ফেলে একনিষ্ঠতার সহিত অন্যকে সম্মান ও প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সমাজে ঐক্যের কাজ করতে হবে।
১৬- যারা দ্বীনের রাস্তায় সঠিকভাবে সংগ্রাম করতেছেন তাঁদেরকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার একেকজন নাবিক মনে করে তাঁদের উন্নতি ও সফলতার জন্য সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে এবং সাধ্যমতো তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
১৭- আল কুরআনের আলোকে ইহুদি, খ্রিষ্টান, ও মুশরিকদেরকে সবসময়, সকল অবস্থায় নিজেদের প্রকাশ্য শত্রু জ্ঞান করতে হবে। তাদের সাথে সুন্দর আচরণ প্রদর্শন করা মুসলিম হিসেবে অবশ্যই একটা দায়িত্ব তবে মুমিন যুবকের দুনিয়াবী স্বার্থে তাদের সাথে গভীরভাবে সখ্যতা গড়ে না তোলা চাই। বরং দ্বীনে ইসলামের আলোকে কুরআন সুন্নাহভিত্তিক তার সাথে যোগাযোগ ও আলাপ-আলেচনা অব্যাহত রাখা, যাতে করে সে মু'মিন যুবকের আখলাক দেখে বিমুগ্ধ হয়ে দ্বীনে ইসলামে আসতে পারে। মোটকথা; তাদের সাথে সম্পর্ক হবে শুধুমাত্র ইসলামের দাওয়াহ’র স্বার্থে।
১৭- গরীব, অসহায়, বিধবা, সন্তানহীন বৃদ্ধ বাবা-মা, সহায়হীনদের পাশে প্রতিটি যুবক মু'মিনের সাধ্যমতো দান সাদাকার মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানো। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের মধ্যে অধিক পরিমাণে দান করার গুণটি প্রতিটি যুবক মু'মিনের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৮- অর্থনৈতিক সেক্টরে প্রতিটি যুবক মু'মিনের স্বাবলম্বী হতে হবে। কারণ দ্বীনের কাজ করতে হলে আবেগ, উদ্যমের পাশাপাশি অর্থেরও প্রয়োজন। তাই সমাজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও যুবকের দাওয়াতে অন্যরা প্রভাবিত হতে হলে হালাল সম্পদেরও প্রয়োজন। যা পেছন থেকে প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে সহযোগিতা করবে।
১৮- জায়োনিষ্টদের সকল পণ্য বয়কট করে তাদের প্রতি যে ঘৃণা ও অবজ্ঞা পোষণ সেটার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের অর্থনীতির উন্নয়নে আপনি একজন প্রকৃত মুমিন হয়ে পারতপক্ষে যেন কোন ভূমিকা পালন না করেন সেদিকে সবিশেষ নজর রাখতে হবে। কেননা জায়োনিষ্টদের ব্যবসার লভ্যাংশের শতভাগের পাঁচ ভাগ দিয়ে থাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি সংস্কৃতি, ইসলামি মূল্যবোধ ও শক্তিকে খর্ব করার জন্য। সুতরাং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা চাই।
১৯- পারিবারিক ভাবে মহিলাদের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ঘরোয়া তা'লীমের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একজন মা দ্বীনদার হলে অবশ্যই পরবর্তী প্রজন্ম দ্বীনদার হওয়া সহজ হয়ে যায়।
২০- যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমার মোবাইলের মিনিট ও ইন্টারনেটের এমবি যেন আমার কবরের শাস্তির কারণ না হয় সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।