25/02/2024
পিল খানা ট্র্যাজেডি -১
মেজর মাহবুব স্মরণে!!
২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০৯
ঠিকানা : মধ্য আকাশ ; নক্ষত্ররাজি।
প্রিয়, সোহেল (মেজর মাহবুবের ডাক নাম)
কেমন আছো মামা ওপারে । খুব জানতে ইচ্ছে করে ।
তুমি যখন মিশন (লাইবেরিয়া) থেকে ফিরলে তোমার সাথে ফোনে কয়েকবার কথা হলো । শেষ দিনের কথায় স্বভাবসুলভ তুমি আর সাহেদ (মেজর মাহবুবের ছোট ভাই) মিলে আমাকে রাগিয়ে দিলে। আমার কিছুটা অভিমান হয়েছিলো । তুমি সেটা বুঝতে পেরেছিলে । পরে আমাকে ফোনে বললে -"মিনা খালা রেডি হয়ে থেকো শুক্রবারে তোমাকে আমি এসে ধামরাই (মেজর মাহবুবের জন্ম স্থান) নিয়ে যাবো ।" আমিও অপেক্ষায় ছিলাম।
তোমার সাথে রবিবার অথবা সোমবার কথা হয়েছিলো । বুধবার থেকে তুমি হারিয়ে গেলে মামা।
কত শত শুক্রবার আসে যায় তুমি আর এলে না মামা।
সেই যে বুধবার থেকে তোমাকে খুঁজতে শুরু করলাম পিলখানা থেকে কামরাঙ্গীরচর লেক , সেনাসদরের লাশ রাখার ফ্রিজ ,ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, পিজি সব জায়গায়। কোথাও তুমি নেই। তোমার লাশ খুঁজে না পেয়ে মনে মনে আশার সঞ্চার হতে থাকে । নিশ্চয়ই তুমি বেঁচে আছো । নিশ্চয়ই তোমাকে জীবিত পাবো । প্রত্যাশার প্রহর যেন শেষ হতে চায় না । ক্ষীণ একটা আশা গুমরে গুমরে কাঁদে এই বুঝি তুমি এসে বলবে আমি বেঁচে আছি। সেই মুহূর্ত গুলোর কথা কিভাবে তোমায় বুঝাবো মামা। পিল খানার সামনে আমরা সবাই বসে আছি আর বড় আপার ( মেজর মাহবুবের মা) মুখটা ভেসে উঠছে । কি প্রবল কনফিডেন্স তার তোমার কিছু হয়নি। সকালে তুমি তোমার মা'র সাথে কথা বলেছো । সকালের নাস্তা খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করেছো, ঔষধ খেয়েছে কিনা খোঁজ নিয়েছি; সম্ভবত সেটাই তোমার জীবনের শেষ কথা । কি জীবন্ত সেই স্মৃতি। বৃহস্পতিবার হঠাৎ নিউজে বললো মেজর মাহবুব কে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার। আমাদের সেকি আনন্দ। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব দের ফোন করে খবর দিতে লাগলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই থমকে গেলাম। এ অন্য এক মেজর মাহবুব। আমাদের সোহেল নয়। হতাশায় দুমরে মুচড়ে গেলো আমাদের বিশ্বাস। ততক্ষণে বিশ্বাস করতে শুরু করে দিলাম হয়তো তুমি আর নেই। তাই প্রচন্ড যন্ত্রনা বুকে চেপে এবার জীবিত তুমি নও বরং কেন তোমার লাশটা যেন অন্তত পাই । ২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। সকাল থেকেই পিল খানায় বসে আছি । আমি, সাহেদ ,ফারুক খালু , তোমার নীলু খালা , তোমার মামারা ,চাচাতো ও খালাতো ফুফাতো ভাই বোনেরা , অনেকেই ছিলাম । এদিকে তোমার মা'র আর তোমার সহধর্মিণী জুলিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে তুমি আর নেই। হঠাৎ একটার দিকে দুই তিন সেনা অফিসার এসে বললো সেনা সদরের তোমাকে পাওয়া যাবে । আমি আর আইভি তোমার চাচাতো বোন গেলাম ছুটে। ততক্ষণে অনেক অফিসারের ফ্যামিলিও সেখানে তাদের প্রিয়জনের লাশ খুঁজতে লাগলো । তোমাকে খুঁজতে যেয়ে অনেককেই খুঁজে পেলাম। ফ্রিজের মধ্যে রাখা মৃত মানুষ গুলো অনেকটাই তামাটে রঙের হয়ে গেছে । শনাক্ত করতে কষ্ট হচ্ছিল ।
এতো ভয় ভীতি কোথায় গেলো বুঝিনি তো । দুর্দান্ত সাহসের সঙ্গে একটার পর একটা লাশ হাতরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু না তোমায় পেলাম না। ফিরে এলাম আবার পিলখানার সামনে। আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে তোমারই দুই তিন জন ব্যাচমেট সেনা অফিসার ইশারায় কাছে ডেকে তোমার ছবি দেখিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো মাহবুব কে পাওয়া গেছে আপনারা মিটফোর্ডে চলে যান। অবশেষে মিটফোর্ডে ছুটলাম সবাই । সেখানে যেয়ে দেখি তুমি আর মাহবুব হিসেবে নয় সারিবদ্ধভাবে লাশ হিসেবে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তামাটে রঙের ছেয়ে আছে সবার মুখ। সময় লাগলো না তোমাকে খুঁজে পেতে, চেনা যাচ্ছিল না, সাহেদ , তোমার নীলু খালা আমীর আলী মামা হঠাৎ ই থমকে গেল একটি দেহের সামনে। দেহটি উল্টে পাল্টে দেখে তোমার আইডি, জুলির ছবি তোমার জেরা ব্যাচ, ড্রাইভিং লাইসেন্স পকেটে পাওয়া গেল । শনাক্ত হলো মামা তোমাকে । মাহবুব হয়ে নয় মাহবুবের লাশ পেলাম আমরা। বুকের ভেতরের পাঁজর গুলো যেন কষ্টে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। তোমার বুকে পিঠে বুলেটের ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহটা মামা কতো ভারি হয়েছিলো তা কোন মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কেবল যার হারিয়েছে সেই বুঝবে ।
তুমি আমাদের মধ্য আকাশের নক্ষত্র । ৫৭ জন অফিসার ছিলেন বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তোমাদের এমন বিদায় কাম্য ছিল না। স্বাধীন দেশে এত নগ্ন , নির্মম নৃশংস হত্যাকান্ড আমাদের করেছে হতবম্ব , স্তব্ধ, নির্বাক। তুমি আজ নেই অনেক বছর হয়ে গেল। কিন্তু আজও তুমি কষ্টের ধ্রুব তারা হয়ে মিট মিট করে জ্বলছো আমাদের হৃদয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। তুমি চলে যাওয়ার পর তোমার একমাত্র মেয়ে ফাইজা চলে গেল (চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ)। আচ্ছা তোমার সাথে কি তোমার আদরের মেয়ে ফাইজার দেখা হয়েছে? বড় জানতে ইচ্ছে করে । তোমার ছোট বোন জাকি ও পাড়ি জমিয়েছে ওপারে । তোমাদের তিন জনের কি প্রায়ই দেখা হয় । তুমি ভালো থাকো মামা অনেক ভালো থাকো । মহান আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ জায়গায় রাখুন। তোমার মা, স্ত্রী ,ভাই বোনেরা আজ ও নিরবে নিভৃতে কাঁদে।। আমি ও তোমাকে খুব মিস করি। যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তে ছুটিতে সাভার আসতে তুমি একটা গল্প বলতে । একই গল্প বার বার কখনো শেষ হতো না সেই গল্পটা। তোমার বিয়েতে হলুদের দিন জানতে চাইলাম আসলে গল্পের রহস্য কি । তুমি বললে আসলে তুমি এটুকুই জানতে। আমি হাসলাম। একবার সাপ কে লাথি মেরে এসে বীর দর্পে বললে লাথি মারা স্বত্বেও সাপ কামরায়নি। তোমার বিউটি খালা চেক করে দেখে সাপ অলরেডি তোমায় কামড়ে দিয়েছে। সেকি টেনশন। হাজারো স্মৃতি। কি করে তোমায় ভুলবো মামা বলো । তোমার স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে আমরা সবাই বেঁচে আছি। আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তোমার স্মৃতিগুলো বড় জীবন্ত, বড় দগদগে কষ্টের নীলিমায় আচ্ছাদিত। তুমি ভালো থেকো মামা।। অনেক ভালো থেকো। বিধাতার কাছে যত্নে থেকো । তোমার ফাইজাকে আমাদের আদর পৌঁছে দিও। তুমি ভালো থেকো। ভালো থেকো তুমি।
ইতি,
তোমার মিনা খালা!
Amina begum Mina এর ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বুকের ভিতর থেকে চাপা কষ্টটা যেন বার বার জানান দেয় একটি কালো তারিখ । স্বাধীন দেশে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের একটি কলংকময় দিন । ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০৯। সেনা অফিসারের অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে যে নির্মম পাষন্ডরা তাদের বিচারের ভার বিধাতার কাছে থাকলো ।
হায় রে আমার স্বাধীন দেশ
হায় রে আমার দুঃখিনী মাতৃভূমি।
"আমি চিৎকার করে বলিতে পারিনি
করিতে পারিনি ধিক্কার"
২৫/০২/২০২৪ ইং ।