10/06/2025
এফসি কোপেনহেগেন দলটা প্রায়ই উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে খেলে।
একটা সময় এই এফসি কোপেনহেগেনের বয়সভিত্তিক দলের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন জামাল ভূঁইয়া।
হ্যাঁ, আমাদের ক্যাপ্টেন জামাল ভূঁইয়া!
এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে কোপেনহেগেনের সিনিয়র দলে ভেড়াতে আলোচনা চলছিলো। এমনকি ডেনমার্ক জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ মিডফিল্ডার হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছিলেন তিনি।
সেটা আর হয়নি। ডেনমার্ক জাতীয় দলে ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের মিডফিল্ড পার্টনার হিসেবে দেখা যায়নি জামাল ভূঁইয়া নামের কাউকে।
একটা ঘটনা পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল জামালের জীবন।
২০০৭ সাল, জামাল ভূঁইয়ার বয়স তখন ১৭ বছর। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কোপেনহেগেনের রাস্তায় দুই স ন্ত্রা সী গোষ্ঠীর গোলাগুলির মধ্যে পড়ে জামাল।
চোখের নিমিষেই শরীরে এসে বিঁধে পরপর চারটি বুলেট। একটা লাগল কনুইয়ে, একটা পেটের নিচের দিকে, দুই শরীরের দুই পাশে।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে সাত মাস পর ফিরলেন ফুটবলে। কিন্তু কোমা পরবর্তী অনেক জটিলতা জামালের ফুটবল ক্যারিয়ারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যে জামালের কয়েক মাস পর এফসি কোপেনহেগেনের মূল দলে অভিষেক হওয়ার কথা, সে তিনিই কিনা ফুটবলটাই ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছিলেন।
কোচের অনুপ্রেরণায় জীবন নিয়ে ভাবতে বসলেন জামাল। জামালের বাবা সবসময় চাইতেন ছেলে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলুক। জামালও ভাবলেন সৃষ্টিকর্তা যখন তাকে কোমা থেকে ফিরিয়ে এনেছে নিশ্চয়ই তারও কোনো পরিকল্পনা আছে।
ডেনমার্কে খেলার আশা ছেড়ে, জামাল সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশ ফুটবল দলে পাড়ি জমানোর। ২০১১ সালে এলেন বাংলাদেশে ট্রায়াল দিতে। তখনও এদেশের ফুটবলে প্রবাসী ফুটবলার কেন্দ্রিক হাইপ তৈরি হয়নি।
ডেনমার্কের ঠাণ্ডা-শীতল আবহাওয়া থেকে বাংলাদেশের এই তপ্ত গরম আবহাওয়ায় কোনোভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না জামাল। ভুগছিলেন পানিশূন্যতায়।
ট্রায়াল ম্যাচে মাঠেই বার কয়েক বমি করলেন। হলেন সতীর্থ, স্থানীয় কোচ এবং গণমাধ্যমের হাসির খোরাক। অভিমান করে জামাল ফেরত গেলেন ডেনমার্কে।
কিন্তু জামাল ভূঁইয়াকে সৃষ্টিকর্তার যে ভিন্ন এক পরিকল্পনা ছিলো! ২০১৩ সালের বাংলাদেশ ফুটবল দলের তৎকালীন ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ পুনরায় জামালকে ঢাকায় ডেকে পাঠালেন।
পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জামালও এবারও তৈরি। আরাধ্য বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তোলার ইচ্ছেটা পূরণ হলো অবশেষে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে প্রথম প্রবাসী ফুটবলার হিসেবে অভিষেক হলো জামাল ভূঁইয়ার।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ এক যুগ। ১২ বছরে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ৮৮টি আন্তজার্তিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড জামাল ভূঁইয়ার দখলে। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ দলের ক্যাপ্টেন্সির আর্মব্যান্ডটাও তার হাতেই।
মেঘে-মেঘে বেলা গড়িয়েছে বেশ। ২৩ বছর বয়সে বাংলাদেশ ফুটবলে অভিষেক হওয়া জামাল ভূঁইয়ার বয়স এখন ৩৫।
স্বভাবতই পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো শারীরিক সামর্থ্য এখন আর নেই। গত এক-দেড় বছর ধরে নিয়মিত বদলি হিসেবেই খেলে যাচ্ছেন।
বহুল আকাঙ্ক্ষিত সিঙ্গাপুর ম্যাচে কোচ হ্যাভিয়ের কাবরেরার একাদশে জামাল জায়গা পাবেন কি না, তা হয়তো সময়ই বলে দিবে। এসব নিয়েও জামালের কখনোই কোনো অভিযোগ নেই।
দলের প্রয়োজনে যতোটুকু সময়ের জন্য যতোক্ষণই জামালকে মাঠে দেখা যাক না কেন, জামাল নিজেকে পুরোটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত সবসময়ই।
বাংলাদেশের ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে এক বাঁক বদলের মুখে। হয়ত হামজা-সমিত-কিউবাদের হাত ধরে দেশের ফুটবল বদলে যাবে। হয়তো এশিয়া থেকে বাংলাদেশও এক সময় বিশ্বকাপে জায়গা করে নিবে।
সে সময়টায় দর্শক সারিতে বসে জামাল ভূঁইয়া ভীষণ গর্ব নিয়ে সবটা উপভোগ করবেন। আর আমরা স্মরণ করবো, আমাদের একজন ক্যাপ্টেন ছিলো। আমাদের একজন জামাল ভূঁইয়া ছিলো।
যখন বাংলাদেশের ফুটবল ডুবে ছিল অন্ধকারে, তখন জামাল ভূঁইয়া আলোর মশাল হাতে দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন।
কিশোর বয়সে জামাল নিজে কোমা থেকে ফিরে এসে নিজে পুনর্জীবন পেয়েছিলেন। পরে মাতৃভূমিতে ফিরে এসে পুনর্জীবন দিয়েছেন বাংলাদেশের ফুটবলকেও।
মূল: সাদিক শাহরিয়ার, সমকাল