Financial Inclusion for Rural Development Study Center

Financial Inclusion for Rural Development Study Center

Share

research center for financial inclusion for rural and agricultural development

25/04/2023

কর্মী হিসেবে ৩০ ট্রান্সজেন্ডারকে নিয়োগ দিলো ফেয়ার গ্রুপ
এর আগে ২০২১ সালে ট্রান্সজেন্ডার ও ভিন্নরকমভাবে সক্ষম ১৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলো ব্র্যাক ব্যাংক।

ছবি-সৌজন্যেপ্রাপ্ত

ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীকে সমাজে আত্মীকরণে এগিয়ে আসার জন্য সবার প্রতি আহবান জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। তিনি বলেন, 'ট্রান্সজেন্ডারদের পরিবার পরিত্যাগ করে। সমাজ বয়কট করে। তারা শিক্ষা ও পরিবার থেকে বঞ্চিত। সমাজের পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে কোম্পানিতে চাকরি সমাজে বসবাসের সুযোগ দিন।'

শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে 'ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ' শীর্ষক এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ৩০ জন ট্রান্সজেন্ডারকে চাকরি দিয়েছে ফেয়ার গ্রুপ।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, 'হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডারদের কাজে নিলে প্রোডাক্টিভিটি কমে যায় বলা হয়ে থাকে। কিন্তু ফেয়ার গ্রুপ প্রমাণ করেছে সেটা সঠিক নয়। সব বাধা পেরিয়ে তারা ৩০ জন হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডারদের চাকরি দিয়েছে। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা গত বাজেটে ঘোষণা দিয়েছিলাম, হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডারদের চাকরি দিলে কর ছাড় দেয়া হবে। সরকার চায় হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার লোকেরা সমাজে স্থান পাক।'

Pause

Unmute

Close PlayerUnibots.in
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবহেলিত বেদে পল্লী ও হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনমান নিয়ে কাজ করা এডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ ও হেড অব ট্যুরিস্ট পুলিশ হাবিবুর রহমান। সামনের দিনগুলোতেও ফেয়ার গ্রপের এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি খাতের সব উদ্যোক্তার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, 'আমরা ফেয়ার গ্রুপ ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে উদ্যোগী রয়েছি। ৩০ জনের বেশি ট্রান্সজেন্ডার কর্মী আমাদের গ্রুপে নিয়মিত কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছি। তারা নিয়মিত বেতন-ভাতাই শুধু পাচ্ছে না, প্রতি মাসে ব্যক্তিগতভাবেও তাদের বিশেষ অনুদান দিচ্ছি। এসবই করছি তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।'

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামীম আরা নিপা, সাদিয়া ইসলাম মৌ ও অমিতাভ রেজা চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তৌহিদা জাহান, বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পরিচালক সালেহ আহমেদ, ট্রান্সএন্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা লামিয়া তানহাও বক্তব্য প্রদান করে।

অনুষ্ঠান শেষে ফেয়ার গ্রুপের পক্ষ থেকে ট্রান্সজেন্ডারদের হাতে ঈদ উপহার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।

হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডারদের কাজে নিয়োগ দিলে সরকারের কর ছাড় দেয়ার ঘোষণার পর তাদের নিয়োগ দিচ্ছে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

এর আগে ২০২১ সালে ট্রান্সজেন্ডার ও ভিন্নরকমভাবে সক্ষম ১৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলো ব্র্যাক ব্যাংক।

25/10/2022

প্রায় শূন্য থেকে উঠে আসা চট্টগ্রামের প্যাকেজিং কোম্পানি এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক

চট্টগ্রামে উৎপাদিত এই প্যাকেজিং আইটেমগুলো এখন রপ্তানি হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, শ্রীলঙ্কা এবং কম্বোডিয়াতেও।

ইনফোগ্রাফ: টিবিএস
১৯৯৮ সালের এক সন্ধ্যা; এনায়েত বাজারে পায়চারি করতে করতে ওসমান গণি দেখলেন, তাদের প্যাকেজিং কারখানার ১২ জন শ্রমিক লুডু খেলছেন। কোনো কাজ নেই তাদের হাতে।

অর্থনীতিতে সম্প্রতি স্নাতকোত্তর শেষ করা ওসমান তার বাবার ঋণে জর্জরিত ব্যবসা পরস্থিতি দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন তখনই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত ফলাফলে অষ্টম স্থান অর্জনকারী ওসমান তাই অন্য কোথাও চাকরি না নিয়ে নিজেদের কারখানাটিই পুনরায় চাঙ্গা করে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কারখানাটির ওপর সেসময় ছিল ৭ লাখ টাকা বকেয়া ব্যাংক ঋণের বোঝা। এই ঋণ পরিশোধ করাই ছিল তখন ওসমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কী করতে চান, তা নির্ধারণ করে ওসমান তার পণ্য বিক্রির জন্য বিভিন্ন কোম্পানিতে ঘুরতে লাগলেন এবং যথেষ্ট অর্ডারও পেতে শুরু করলেন।

ব্যবসায়ে তার প্রথম ভূমিকাটি হয়ে উঠেছিল একজন সেলসম্যান হিসেবে।

ওসমান তার তিন ভাইয়ের সঙ্গে কোম্পানিটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে শুরু করলেন।

তারা হোসেন প্যাকেজিং লিমিটেড ও হোসেন বক্স ইন্ডাস্ট্রিজ নামে দুটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তাদের কারখানা দুটোয় তিন শতাধিক লোক কর্মরত রয়েছেন।

তাদের কোম্পানি ইস্পানি, স্টারশিপ, আবুল খায়ের, সিনজেনটা বাংলাদেশ, কোটস বাংলাদেশ, এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড, ওয়েল ফুড এবং কিসওয়ানসহ অনেক স্থানীয় বিশিষ্ট কোম্পানির জন্য প্যাকিং সামগ্রী উৎপাদন করে।

২০২১ সাল ছিল তাদের কোম্পানির জন্য নতুন একটি মাইলফলক ছোঁয়ার বছর। এ বছর তারা আমেরিকার সুপরিচিত পোশাক কোম্পানি টমি বাহামা গ্রুপ ইনকর্পোরেটেডের কাছে প্যাকেজিং সামগ্রী রপ্তানি শুরু করে।

চট্টগ্রামে উৎপাদিত এই প্যাকেজিং আইটেমগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, শ্রীলঙ্কা এবং কম্বোডিয়াতেও রপ্তানি করা হয়।

তার কোম্পানির উৎপাদিত প্যাকেটগুলো অনেক বাংলাদেশি পণ্য যেমন- শাকসবজি ও খাবারের সঙ্গেও বিদেশে যায়।

চট্টগ্রাম এক্সপোর্ট প্রসেসিং-এর কিছু কোম্পানি, যারা আগে বিদেশ থেকে উচ্চ মানের প্যাকেজিং সামগ্রী আমদানি করতো, তারাও এখন ওসমানের কারখানায় তৈরি প্যাকিং পণ্য ব্যবহার করছে।

যে কোম্পানিটি ১৯৯৮ সালেই ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেই কোম্পানি এখন প্রতিমাসে সরকারকে মূল্য সংযোজন কর হিসেবেই দিচ্ছে ২০ লাখ টাকার বেশি।

২০২০ সালে, তারা কারখানায় একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উচ্চ গতির লক বটম ফোল্ডার গ্লুয়ার, লেজার ডাই এবং অটো বেন্ডিং মেশিন স্থাপন করেছেন। তাদের কোম্পানিটি এখন অন্যান্য শিল্পের আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সেসরিজ) জন্য বৈশ্বিক হাবে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই পণ্যের বাজার ক্রমেই বাড়তে থাকায় ইউরোপের বৃহত্তম প্যাকেজিং এন্টারপ্রাইজ এএলপিএলএ বাংলাদেশে একটি প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি স্থাপনেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

অলঙ্করণ: টিবিএস
হোসাইন প্যাকেজিং লিমিটেড এবং হোসেন বক্স ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও লায়ন ওসমান গণি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে এ পর্যন্ত কোম্পানির যাত্রা, রূপান্তর এবং ভবিষ্যত লক্ষ্যগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।

কোম্পানি পুনরায় চাঙ্গা করে তোলার যাত্রা

"আমার বাবা একটি প্যাকেজিং কারখানায় কাজ করতেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে, তিনি ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে খুচরা প্যাকেজিং বক্স তৈরি শুরু করেন; তার কোম্পানির নাম ছিল এএম প্যাকেজ," বলেন ওসমান।

ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কারখানায় যেতেন ওসমান। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালীন সেই কারখানায় কাজও করেছেন তিনি।

"আমি মেশিনগুলো চালাতাম এবং কারখানার সমস্ত মেশিন চালানোর দক্ষতা তৈরি করেছি তখনই। আমি প্যাকেজিং সেক্টরের খুঁটিনাটি সবকিছু শিখেছি, কারণ এই কাজে আমি আগ্রহ পেতাম," বলেন তিনি।

বিদেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল ওসমানের। তবে বাবার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে, এটি দেখে পরিকল্পনা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নিজের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর একটির ব্যাখ্যায় ওসমান বলেন, "তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার পর আমরা কাজ শুরু করতাম; কিন্তু আমি সরাসরি কোম্পানির কাছ থেকে অর্ডার পেতে মার্কেটিংয়ের কাজ শুরু করি।"

এরপর ১৯৯৮ সালে, তিনি বন্দর নগরীতে হোসেন বক্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং করোগেটেড কার্টন নামে একটি নতুন কারখানা চালু করেন।

"আমরা বাজারে প্যাকেজিং পণ্যের বিশাল চাহিদা দেখলাম এবং ২০০৪ সালে আমরা হোসেন প্যাকেজিং লিমিটেড স্থাপন করি। এই কারখানায় ভিন্ন ধরনের মাল্টিকালার প্রিন্টেড কার্টন তৈরির জন্য আলাদা ইউনিট রাখা হয়," যোগ করেন তিনি।

ওসমানের কাজ তখনও শেষ হয়নি। ২০০৬ সালে, তিনি একটি অফসেট প্রিন্টিং এবং পোস্ট-প্রেস ইউনিট স্থাপন করেন, যা ভোগ্য পণ্যের প্যাকেজিং বাক্স তৈরি করে।

২০১৬ সালে, হোসেন প্রোডাক্টস ইভিটেশন কার্ড (নিমন্ত্রণ পত্র) তৈরি এবং তা পাইকারি বিপণন শুরু করে।

শীঘ্রই শুরু হয় রপ্তানি এবং এরপর কোম্পানিটিকে আর কখনোই পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আরো অনেক কিছু রয়েছে করার

ওসমান তার পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কখনোই আপোস করেন না। এই বিষয়টিই তার সাফল্যের প্রধান হাতিয়ার।

"আমরা আমাদের কারখানায় একটি ওয়ান-স্টপ সলিউশন অফার করি, যা এই সেক্টরে বাজার ধরতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের একটি আধুনিক ল্যাব আছে; সেখানে আমরা পণ্যের মান পরীক্ষা করি। আমরা যা কিছু করি, তা বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে করা হয়," যোগ করেন ওসমান।

তিনি বিশ্বাস করেন, এখনও অনেক কিছু অর্জন করা বাকি এবং সম্ভাবনাগুলোও বেশ লোভনীয়।

"আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করি, তবে অনেক ক্ষেত্রে এর প্যাকেজিং সামগ্রী আমদানি করা হয় অন্য দেশ থেকে; যদিও বাংলাদেশে সম্প্রতি কিছু আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং কারখানার বিকাশ ঘটেছে," বলেন ওসমান।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, চীন, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো দেশ থেকে প্যাকেজিং পণ্য আমদানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে।

"যদি আমরা আমাদের প্যাকেজিং ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারি এবং ক্রেতারা যে মানের পণ্য চান তা তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা এর বাজার ধরতে পারবো এবং আমদানির টাকাও বাঁচবে। এই বাজারের ওপর আমাদের নজর রয়েছে। যেকোনো দেশের প্রয়োজনীয় যেকোনো ধরনের প্যাকেজিং পণ্য তৈরির জন্য আমরা আমাদের অবকাঠামো তৈরি করেছি," যোগ করেন তিনি।

ওসমান জানান, এই খাতটিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

যত বেশি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হবে, বিদেশি কোম্পানিগুলো ততবেশি কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠবে। আর তখন তাদের উচ্চ মানের প্যাকেজিং সামগ্রী আমদানির প্রয়োজন হবে, মূলত এটিই টার্গেট করতে চান ওসমান।

তিনি বলেন, "আমাদের অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খাতটিও প্রসারিত হবে। আমরা কিছু কোরিয়ান ইপিজেড কোম্পানিকে প্যাকেজিং সলিউশন দিচ্ছি; এই কোম্পানিগুলো আগে এসব প্যাকেজিং সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করত, কিন্তু আমরা সেই বাজারদখল করেছি।"

"শুধু তাই নয়, আরও অনেক প্যাকেজিং পণ্য বাংলাদেশে আমদানি করা হয়, এখানেও আমাদের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। উপরন্তু, আমরা আমাদের প্যাকেজিং সামগ্রী সরাসরি এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পোশাক রপ্তানিকারক ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করে থাকি," যোগ করেন ওসমান।

বর্তমানে কোম্পানিটি করোগেটেড কার্টন, ইনার বাক্স এবং ডুপ্লেক্স বোর্ড বক্স, উচ্চ মানের করোগেটেড বক্স, ডুপ্লেক্স করোগেটেড বাক্স, শিট এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন করা বক্স, প্রিন্টিং ফোল্ডার, ফ্লায়ার এবং ক্যালেন্ডার তৈরি করছে।

এছাড়া, খাবার ও পানীয় উৎপাদনকারী কোম্পানি, তামাক কোম্পানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কসমেটিক এবং অ্যাগ্রোকেমিক্যাল উত্পাদকসহ আরও অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্যাকেজিং সলিউশন দিচ্ছে ওসমানের কোম্পানি।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও রয়েছে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা।

ওসমান বলেন, "আমাদের শিল্পাঞ্চলে এ ধরনের কারখানা নির্মাণের জন্য সরকার যদি একটি শিল্প প্লট আকারে সহায়তা দেয়, তাহলে বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে।"

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, নিজের বাবার কারখানাকে চাঙ্গা করে তুলেছিলেন ওসমান; আর এখন ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন দিগন্ত অন্বেষণের পথে হেঁটে চলেছেন তিনি।

Photos from Financial Inclusion for Rural Development Study Center's post 03/01/2022

Team

06/12/2021

ব্যাংক অর্থায়ন

দেশে ফ্যাক্টরিংয়ের সম্ভাবনা কতটুকু
এমএ মাসুম

বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্সিং নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে ফ্যাক্টরিংয়ের ওপর অনেক সভা, সেমিনার ও ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এখন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফ্যাক্টরিং নিয়ে তেমন আগ্রহ বা এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা ‘ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্স’ বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তার বকেয়া বিল কমিশনে দেনাদার ব্যতীত তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে বিক্রি করাকে ফ্যাক্টরিং বলা হয় (আমদানিকারক, রফতানিকারক ও দুই দেশের দুই এজেন্টের গ্যারান্টিতে রফতানি বিল বন্ধক রেখে নেয়া ঋণ)। অন্যভাবে বলতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিল বা ইনভয়েসের বিপরীতে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অগ্রিম ঋণ সুবিধাই ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্স। যেকোনো দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের লেনদেনের বিল বা ইনভয়েসের বিপরীতে টাকা পেতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেই বিল বা ইনভয়েসের বিপরীতে প্রাপক প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, যাতে সে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের টাকা দিয়ে একই সময়ের মধ্যে কয়েক গুণ ব্যবসা করতে পারে।

পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী বিভিন্ন উৎপাদনকারী বা সেবা প্রতিষ্ঠানকে তাদের পণ্য বা সেবা একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য বাকিতে সরবরাহ করতে হয়। এই সময় তাদের চলমান মূলধন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। সেদিক বিবেচনা করেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্স’ সেবা দিয়ে থাকে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুদের হার কম থাকায় এ ঋণের সুদের হারও কম হবে। আন্তর্জাতিকভাবে ফ্যাক্টরিং পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যাক্টরিং চেইন ইন্টারন্যাশনালের (এফসিআই) সদস্য হয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হয়। উল্লেখ্য, ফ্যাক্টরিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিং অব ওপেন অ্যাকাউন্ট ডোমেস্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড রিসিভেবলের বৈশ্বিক প্রতিনিধি সংস্থা হলো এফসিআই। ১৯৬৮ সালে একটি অলাভজনক বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর বর্তমানে বিশ্বের ৯০টি দেশের প্রায় ৪০০ সদস্য কোম্পানির একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছে এটি। এফসিআই ক্রস-বর্ডার ফ্যাক্টরিং মেম্বার কার্য পরিচালনায় সহযোগিতায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সেবা প্রদান করে, যা বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক করেসপনডেন্সের পরিমাণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এফসিআইয়ের আওতায় বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার লেনদেন হয়। এতে রফতানিকারক, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট দুই দেশের একজন করে চারটি প্রতিনিধি যুক্ত থাকেন। এদের এফসিআইয়ের সদস্য হতে হয়।

বাণিজ্য প্রসার ও আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অর্থায়নের বিকল্প মাধ্যম হতে পারে ফ্যাক্টরিং। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফ্যাক্টরিংয়ের বিশাল টার্নওভার রয়েছে। এটি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসার আর্থিক চাহিদার জন্য সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। ফ্যাক্টরিং উন্নয়নশীল ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ব্যবহূত হচ্ছে। আমেরিকা ও ইউরোপের আন্ত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফ্যাক্টরিং পুরোপুরিভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করেন অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ফ্যাক্টরিং’ খুবই জরুরি। বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত রাখতে তা খুব দ্রুতই করা উচিত। অর্থাভাবে ব্যবসায়ীরা তৃতীয় পক্ষের কাছে কমিশনে বিক্রি করে দিতে পারলে অর্থঝুঁকি থেকে বাঁচবেন। কারণ, কখনো কখনো তাদের পথে বসে যাওয়ার অবস্থা হয়।

আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারত ‘ফ্যাক্টরিং’ ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে ‘ফ্যাক্টরিং’ এলসির বিকল্প হতে পারে না। ‘এলসি’ একটি পেমেন্ট পদ্ধতি। ‘ফ্যাক্টরিং’ মূলধন জোগানকারী হচ্ছে তৃতীয় পক্ষ। উন্নত দেশগুলো নিজেদের ব্যবসায়ে খরচ কমানোর লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে ফ্যাক্টরিংয়ের ব্যবহার করে। তাই এ দেশে ফ্যাক্টরিং ব্যবস্থা চালু হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরা। ফ্যাক্টরিং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে একটি নতুন ধারণা হলেও বিনিয়োগে অর্থায়নের উৎস হিসেবে এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে এটি খুবই কার্যকর।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। রফতানি আয়ের ৭৫-৮০ শতাংশ অবদানই এসএমই খাতের। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ ও উৎপাদন খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ এসএমইর অবদান। বেসরকারি খাতের ৯০ শতাংশ এবং অকৃষি খাতের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় এ খাত থেকে। অর্থনীতিতে এ বিশাল অবদানের জন্য তাদের অর্থায়ন সমস্যার বিষয়টিতে বাড়তি নজর দেয়া হলে অর্থনীতি বহুমুখীকরণ ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ফ্যাক্টরিং’ খুবই জরুরি।

প্রশ্ন হচ্ছে ফ্যাক্টরিংয়ের অনেক সুবিধা থাকার পরও বাংলাদেশে কেন এর পরিধি বিস্তার লাভ করছে না। বেশকিছু বিষয়কে ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্সের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করা হয়, যার কয়েকটি নিম্নে আলোচনা করা হলো:

ফ্যাক্টরিংয়ের উদ্ভব হয় ওপেন অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে ওপেন অ্যাকাউন্ট নতুন ধারণা নয়। ওপেন অ্যাকাউন্ট পদ্ধতিতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক দলিলপত্র বা পণ্য প্রাপ্তির পর ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করেন। উন্নত দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোতে বাণিজ্য লেনদেনে এটি একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু বছর ধরেই ওপেন অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশসহ এশিয়ার অনেক দেশেই এ পদ্ধতিতে বাণিজ্য হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্যে ওপেন অ্যাকাউন্ট এখনো জনপ্রিয়তা লাভ করেনি, বরং এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হচ্ছে এলসির ভিত্তিতে। কারণ রফতানিকারকরা রফতানি মূল্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিকে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত গাইডলাইনস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশনস (জিএফইটি), ভলিউম-১, চ্যাপ্টার ৮, সেকশন ১৩(এ) অনুযায়ী রফতানির ক্ষেত্রে মালামাল জাহাজীকরণের ১২০ দিনের মধ্যে রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্স সুবিধা ১৮০ দিন পর্যন্ত দেয়া হয়। এক্ষেত্রে একজন রফতানিকারক যদি রফতানি মূল্যের ৮০ শতাংশ অগ্রিম গ্রহণ করে আবার বাকি ২০ শতাংশ মূল্য ক্রেতার কাছে সংগ্রহ করে মালামাল জাহাজীকরণের ১২০ দিন পর প্রত্যাবাসিত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ইএক্সপি ওভারডিউ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ জিএফইটি অনুসারে জাহাজীকরণের ১২০ দিনের মধ্যে ইএক্সপির পূর্ণ মূল্য প্রত্যাবাসিত না হলে সংশ্লিষ্ট ইএক্সপি ওভারডিউ হিসেবে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকের জন্য ইডিএফ, নগদ সহায়তাসহ অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

পেমেন্ট আন্ডারটেকিংয়ের বিপরীতে চার্জ কমিশন লাইবর প্লাস ৩.৫০ শতাংশ, যা রফতানিকারকদের জন্য সন্তোষজনক নাও হতে পারে, কারণ ইডিএফের খরচ এখনো ছয় মাসের লাইবর প্লাস ১ শতাংশ বার্ষিক, যা খুবই কম।

অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি হ্রাসে ফ্যাক্টর রফতানিকারকের খরচে আমদানিকারকদের কাছ থেকে বীমা কভারেজ গ্রহণ করে। ফলে রফতানিকারকের খরচ বাড়ে।

স্থানীয় ব্যাংকগুলো রফতানি ফ্যাক্টর হিসেবে ফ্যাক্টরিং ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নেদারল্যান্ডসের ফ্যাক্টর চেইন ইন্টারন্যাশনালের (এফসিআই) সদস্য হতে হয় এবং সদস্য ফি হিসেবে প্রথম বছর ১১ হাজার ৫০০ ইউরো পরিশোধ করতে হয়। সদস্য নবায়ন ফি হিসেবে প্রথম তিন বছর ৫ হাজার ইউরো এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য খরচ করতে হয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ইউরো। ইউরোর ওই ফির ওপর ২০ শতাংশ হারে ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। ফলে ব্যয়বহুল ফি ও ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে সদস্য হওয়া এবং তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া স্থানীয় প্রতিবন্ধকতার জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।

ফ্যাক্টরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা প্রয়োজন হয় কিন্তু আমাদের দেশের ব্যাংক ও আমদানি/রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রযুক্তিগতভাবে ডকুমেন্টস উপস্থাপনে অভ্যস্ত নয়। এমনকি অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্যে নিয়োজিত পেশাদার ব্যাংকাররাও এই বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়, যা ফ্যাক্টরিংয়ের অন্যতম অন্তরায়। আমাদের দেশের রফতানি বাণিজ্যে অধিকাংশ চুক্তিতে ক্রেতার মনোনীত সরবরাহকারী/কারখানার মাধ্যমে কাঁচামাল সরবরাহের জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার শর্ত যুক্ত থাকে। ফলে রফতানিকারকদের জন্য ওপেন অ্যাকাউন্ট এবং এলসির বিপরীতে রফতানির হিসাব সংরক্ষণ তথা পারফরম্যান্স হিসাব করা জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া, এলসি ও ফ্যাক্টরিংয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে রফতানি বাণিজ্য পরিচালনার ফলে খরচও বেড়ে যেতে পারে। এতে রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হয়। ‘উইথ রিসোর্স’ অথবা বহুল ব্যবহূত ‘উইদাউট রিসোর্স’ ভিত্তিতে ফ্যাক্টরিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহক বা কোম্পানি কর্তৃক মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সংস্কৃতির প্রচলন, খেলাপিদের বিরুদ্ধে যুগোপযোগী ও কঠোর রাষ্ট্রীয় আইন না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ইত্যাদি ফ্যাক্টরিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন পরিশোধের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাজারের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা ওপেন অ্যাকাউন্টের প্রতি ঝুঁকছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিকারকরা ব্যাপকভাবে লেটার অব ক্রেডিটের পরিবর্তে ক্রমেই ওপেন অ্যাকাউন্টের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ার বাজারেও রফতানিকারকদের চাপের কারণে আমদানিকারকরা ওপেন অ্যাকাউন্টে লেনদেন করতে বাধ্য হচ্ছে।

ওপেন অ্যাকাউন্টের আওতায় রফতানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এবং এ চাহিদা মেটানোর জন্য আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুন, ২০২০ এক সার্কুলার ইস্যু করে। যার মাধ্যমে যথাযোগ্য ঝুঁকি লাঘব করে ব্যাংকগুলোকে ওপেন অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে রফতানি সুবিধার অনুমতি প্রদান করে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরিংয়ের ওপর একটি গাইডলাইনও প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বল্প পরিসরে হলেও ফ্যাক্টরিং ফাইন্যান্সের প্রতি আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই মধ্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট, মার্কেন্টাইল, ইস্টার্ন, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংকসহ দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক এফসিআইয়ের সহযোগী সদস্য হিসেবে যোগদান করেছে।

বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয় এলসির মাধ্যমে। কিন্তু এলসি পদ্ধতিতে বাণিজ্য করা সময়সাপেক্ষ ও জটিলতানির্ভর। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য এলসি পাওয়া আরো জটিল। তাছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বৈদেশিক বাণিজ্যের সুদসহ অন্যান্য খরচ অনেক কমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে হারে এখনো কমেনি। এখন কম সুদের বিদেশী ঋণ কাজে লাগাতে পারলে উৎপাদন খরচ কমবে। ফলে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের এক প্রতিবেদনে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় রফতানি খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে ফ্যাক্টরিং প্রক্রিয়াকে দ্রুত কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলেছে, এ পদ্ধতি কাজে লাগানো হলে বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থের প্রবাহ বাড়বে, যা করোনা মহামারীকে মোকাবেলা করতে সহায়ক হবে।



এমএ মাসুম: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

06/12/2021

ব্যবসা ও বিনিয়োগ: বাংলাদেশে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে মার্কিন কোম্পানি জিই
মেহেদী হাসান রাহাত

বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে পদচারণা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই)। প্রথমদিকে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সরবরাহ করত তারা। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটি সেখানেও প্রযুক্তি ও অর্থায়ন করে। বর্তমানে সামিট করপোরেশন, ইউনিক গ্রুপ ও রিলায়েন্সের মতো কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে জিইর। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য, এভিয়েশন, তেল, গ্যাস ও যোগাযোগ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৌশলগত অবস্থান আরো বিস্তৃত করছে মার্কিন কোম্পানি জিই।

২০১৯ সালে জিইর সঙ্গে ২২ বছরের জন্য ৫৮৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য চুক্তি করে সামিট করপোরেশন। রিলায়েন্স বাংলাদেশ এলএনজি অ্যান্ড পাওয়ারের নির্মাণাধীন ৭১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উন্নত প্রযুক্তির গ্যাস টারবাইন সরবরাহের চুক্তি করে জিই। সর্বশেষ এ বছর রিলায়েন্সের এ বিদ্যুকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিজিটাল সমাধান প্রদানে ২২ বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে জিই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা বলছেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। আরো বাড়বে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী হিসেবে এতদিন শুধু শেভরনের নামই উচ্চারণ হলেও এখন জিইসহ আরো বেশকিছু কোম্পানির নাম উঠে আসছে। শেভরনের কাজের পরিসর নিকটভবিষ্যতে যদি আর না বাড়ে সেক্ষেত্রে অবধারিতভাবেই জিই হবে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী কোম্পানি। বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণেও আগের তুলনায় বর্তমানে জিইর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এ দেশে আরো বেশি বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে জিইর কৌশলগত ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে সামিট করপোরেশন, ডানা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস, ক্লার্ক এনার্জি, মেডিট্রাস্ট, ইউনিহেলথসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। গ্যাসের পাশাপাশি বাষ্পভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও জিই প্রযুক্তি সরবরাহ করে। এছাড়া জিই পাওয়ার সার্ভিস বিজনেসের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন আয়ের সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানো এবং কেন্দ্র সচল রাখার মতো সমাধান দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ভূ-তাপীয়, স্রোত, জৈব ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি সরবরাহ করছে জিই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করছে জিই। সমুদ্র ও ভূপৃষ্ঠে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রযুক্তিও সরবরাহ করে কোম্পানিটি। ফলে ভবিষ্যতে এ খাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে জিইর অংশীদারিত্ব আরো বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এভিয়েশন খাতে বাণিজ্যিক ও সামরিক দুই ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহ করে জিই। রেলপথ নির্মাণ, রেলের ইঞ্জিন ও খননকাজে ব্যবহূত প্রযুক্তির অন্যতম বড় সরবরাহকারী জিই। ফলে এসব খাতেও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশে জিইর যাত্রা ১৯৭০ সালে প্রথম গ্যাসভিত্তিক টারবাইন সরবরাহের মাধ্যমে। ১৯৭৬ সালে দেশে প্রথম কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি সরবরাহ করে কোম্পানিটি। ১৯৯৫ সালে জিই প্রথমবারের মতো গ্যাস টারবাইনে কন্ট্রোলস রেট্রোফিট স্থাপন করে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের মেঘনাঘাটে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইকুইটি বিনিয়োগ করে। একই বছর বিবিয়ানা-২ গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো এফ ক্লাস প্রযুক্তি সরবরাহ করে। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি) জিইর কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার ব্লক গ্রহণ করে।

একই বছর বিবিয়ানা-২ গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি সক্ষমতার ট্রান্সমিটার সরবরাহ করে। ওই বছর ফেঞ্চুগঞ্জে ম্যাক্স পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯ই ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পাওয়ার ব্লক সরবরাহ করে। ২০১৬ সালে ঘোড়াশাল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-৩-এর রি-পাওয়ারিং চুক্তি পায় জিই। একই বছর একই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-৪-এর সরঞ্জামাদি সরবরাহের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরই ওরিয়ন পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার ও এসটিজি প্যাকেজের কাজ পায় জিই। ২০১৭ সালে সামিট করপোরেশনের ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইনের কার্যাদেশ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরই জিয়াংশু ইটার্ন কোম্পানির ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন ও ভোলায় শাপুরজি পাল্লোনজি গ্রুপের ২২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামাদি সরবরাহের কার্যাদেশ পায় জিই। একই বছর বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ৬৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পায় মার্কিন এ কোম্পানি।

২০১৮ সালে মেঘনাঘাটে ইউনিক গ্রুপের ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নয়ন ও গ্যাস টারবাইন সরবরাহের দায়িত্ব পায় জিই। ভারতের গদ্দায় আদানি গ্রুপের ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এসটিজি প্যাকেজ সরবরাহে চুক্তি করে জিই। এ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করবে ভারত।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে জিইর অংশীদারিত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, শুরু থেকেই বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে জিই আমাদের সঙ্গে ছিল। গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে গেলে জিইর কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জিইর কাছ থেকে আপনি সব ধরনের সেবাই পাবেন, যা প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় অংশীদারে পরিণত করেছে। এমনকি ভবিষ্যতে ব্যবসাকে কীভাবে টেকসই করা সম্ভব সে বিষয়েও তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া যায়, যা এ খাতের অন্যান্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায় না। ফলে সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের সঙ্গে জিইর একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব থাকবে।

২০০২ সালে দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রথমবারের মতো সিটি ও এমআরআই প্রযুক্তি স্থাপন করে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। ২০০২-০৫ সালের মধ্যে জিই প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা হেলদিম্যাজিনেশন চালু করে। ২০১০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তে প্রথম ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফি সিস্টেম, পিইটি সিটি ইমেজিং সিস্টেম ও মেডিকেল সাইক্লোট্রন সুবিধা স্থাপন করে জিই। ২০১২ সালে জিই হেলথকেয়ার প্রথম ও একমাত্র ১২৮-স্লাইস সিটি অ্যান্ড ১.৫টি এমআরআই সরবরাহ করে। ২০১৪ সালে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ফরটিস হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট সিস্টেম ও এমআরআই সিস্টেম স্থাপন করে জিই।

স্বাস্থ্য খাতে জিইর কার্যক্রম প্রসঙ্গে ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, জিই স্বাস্থ্য খাতে ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে কাজ করে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের ক্ষেত্রে জিইর অবস্থান এখন তৃতীয়।

জিই এভিয়েশনের কাছ থেকে ২০০৯ সালে ইঞ্জিন কিনতে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ বিমান। ২০১১ সালে বিমান বাংলাদেশ জিইর কাছ থেকে আরো ইঞ্জিন কেনার কার্যাদেশ দেয়। এছাড়া ২০১৮ সালে কর্ণফুলী পেপার মিলের সোডা বয়লার সংস্কারের কাজ পায় তারা। মেমব্রেন বায়ো রিঅ্যাক্টর পদ্ধতির ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (ইটিপি) প্রযুক্তিও সরবরাহ করছে জিই।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। আবার বাংলাদেশের পণ্য আমদানির উৎস দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দেশটি। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছে ৯২৪ কোটি ২২ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের। এর মধ্যে রফতানি হয়েছে ৬৯৭ কোটি ৪০ লাখ ৮ হাজার ৬৫৩ ডলারের পণ্য। আমদানি হয়েছে ২২৬ কোটি ৮২ লাখ ডলারের।

এদিকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) সবচেয়ে বড় উৎস দেশও যুক্তরাষ্ট্র। পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টক বিবেচনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এফডিআই স্টকের আকার ছিল ৩৮৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আসা নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ২৪ কোটি ২ লাখ ডলারের।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, শেভরন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আছে শুধু গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে। গভীর সমুদ্রে কাজের সুযোগ পেলে কোম্পানিটির বিনিয়োগ অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে জিইর বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাংলাদেশে অনেক বিস্তৃত। শুধু সামিটের সঙ্গেই কোম্পানিটির ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হওয়ার কথা। স্বাস্থ্য খাতের কারিগরি উপকরণগুলোয় জিই অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা শেভরনের চেয়ে জিইর অনেক বেশি। বলা যায় বহুমুখী সম্ভাবনা আছে জিইর। এ কোম্পানিগুলোসহ বাংলাদেশে এখন মার্কিন অনেক কোম্পানি আছে যারা বিনিয়োগের ব্যাপ্তি ধীরে হলেও বাড়াচ্ছে। যেমন ওরাকল, গুগল, ভিসা, কোকা-কোলা। আবার প্রাণের সঙ্গে প্রডাকশন শেয়ারিংয়ে গিয়েছে প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল। সামগ্রিকভাবে আগে শেভরনের মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত ছিল মূলত জ্বালানি খাতে। এখন জিই ও অন্য বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ আগের চেয়ে অনেক বৈচিত্র্যময়।

১৮৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছিলেন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। পরবর্তী সময়ে এ ল্যাবরেটরিতেই তিনি বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা পৃথিবীর পুরো সভ্যতাকেই বদলে দিয়েছিল। ১৮৯০ সালে তিনি তার বিভিন্ন ব্যবসাকে একত্র করে এডিসন জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি আজকের বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) কোম্পানি। সম্প্রতি জিইর গ্লোবাল হেডকোয়ার্টার থেকে এভিয়েশন, হেলথকেয়ার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল খাতকে বেশি প্রাধান্য দেয়ার ঘোষণা এসেছে। এক্ষেত্রে তিনটি কোম্পানির মাধ্যমে তারা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ২০২০ সালে জিইর বার্ষিক আয় হয়েছে ৭৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ২৫৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার

28/11/2021

দুই চীনের সংঘাত: যুদ্ধ আসন্ন?

প্রায় ৭০ বছর ধরে বৈরী সম্পর্ক দুই চীনের মধ্যে। ২০২১ সালে সেই বৈরিতা চরমে পৌঁছেছে। দুই চীনের মধ্যে যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী?

বিশ্বে এখন দুটি চীন আছে—পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (পিআরসি), যা চীন নামে পরিচিত। এই চীনের শাসনক্ষমতায় আছে কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না (সিপিসি)—প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আর আছে রিপাবলিক অব চায়না (আরওসি), যা তাইওয়ান নামে পরিচিত। তাইওয়ানের শাসনক্ষমতায় আছে ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি—প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন। দুই চীনকে বিভক্ত করেছে তাইওয়ান প্রণালি।

তাইওয়ানকে চীন নিজের অংশ দাবি করে। বেইজিংয়ের শাসন মেনে নেওয়ার জন্য বিপুল চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে তাইওয়ানের ওপর। এ মাসের শুরুর দিকে চীন বলেছে, দ্বীপটির আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতায় যারা সমর্থন দেবে, তাদেরকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। আর তাইওয়ান নিজেকে স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখে। তবে তাইওয়ানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল। দ্বীপটি চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। কারণ তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে তারাই চীন—অন্তত সাংবিধানিকভাবে।

যে কারণে দুই কোরিয়া আছে এবং দুই ভিয়েতনাম ছিল, ঠিক দুই চীন থাকার কারণও সেটাই—স্নায়ুযুদ্ধ ও এর আগে-পরের ইতিহাস। দুই দেশই নিজেকে চীন মনে করে। এবং দুই দেশের মধ্যে দা-কুমড়ায় সম্পর্ক। কমিউনিস্টশাসিত চীনের কাছে তাইওয়ান হলো তাদের দলছুট অংশ। এই দলত্যাগী অংশ চীনের ক্ষমতার জন্য হুমকি।

বেইজিং ইতিমধ্যে বলপূর্বক তাইওয়ান প্রণালির দুই পারকে পুনরায় এক করার জন্য কাজ করছে। কিন্তু তাইওয়ান বলেছে, তারা নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে।

চীনও 'এই দেশ দুই নীতি' নামে একটি ফরমুলা বের করেছে। এ নীতির আওতায় চীনের পুনরেকত্রীকরণ মেনে নিলে তাইওয়ানকে যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। তাইওয়ান এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে চীনে ভ্রমণ ও বিনিয়োগের নিয়মনীতি শিথিল করেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাইওয়ানের ওপর তার দেশের দাবি একটি 'অলঙ্ঘনীয় রেড লাইন'। ২০২১ সালের শুরুর দিকে চীন ও তাইওয়ানের খারাপ সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যায়। এ বছরের অক্টোবরে তাইওয়ানের আকাশসীমায় পরপর চার দিন সামরিক জেট পাঠিয়েছে চীন। খুব কম দেশই তাইওয়ানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি হয়ে গেছে চীনের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্বের যুদ্ধের ছায়া ময়দান।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাইওয়ানের কাছে ফের পুরো দমে অস্ত্র বিক্রি শুরু করেছেন। এছাড়াও বাইডেন প্রশাসন স্বাধীনতা রক্ষায় দ্বীপটিকে সাহায্য করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে। বাইডেন এ বছরের অক্টোবরে বলেছেন, তাইওয়ানের ওপর চীন হামলা চালালে ওয়াশিংটন নাক গলাবে।

প্রণালির দুই পারের গল্প
চীনের মূল ভূখণ্ডের সিংহভাগ মানুষই তাইওয়ানকে চীনের অংশ মনে করে। একই ভাষা ও সংস্কৃতির তাইওয়ানিজদের তারা চীনা হিসেবেই বিবেচনা করে। তবে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাইওয়ানের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাইওয়ানের অধিকাংশ মানুষ নিজেদের তাইওয়ানিজই মনে করে। আর তাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব খুব সামান্যই।

চীন-তাইওয়ানের রেষারেষির মূল প্রোথিত ১৯ শতকের শেষ দিকের ইতিহাসে—যখন চীনকে শাসন করত কিন রাজবংশ। তাইওয়ানের ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও জটিল। এই জটিল ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে তাইওয়ানের আজকের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণ।

একটি সাম্রাজ্যের মৃত্যু ও প্রজাতন্ত্রের জন্ম
১৮৯৪ সালে কিন সাম্রাজ্য ও জাপানি সাম্রাজ্যের মধ্যে শুরু হয় প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ। ওই যুদ্ধ হয়েছিল মূলত তাইওয়ান ও কোরিয়ায়। সে সময় কোরিয়া শাসন করত কিনদের অধীন জোসিয়ন রাজবংশ। প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে জাপান জয়ী হয়। ১৮৯৫ সালে তাইওয়ান দ্বীপ দখল করে নেয় জাপান। এ যুদ্ধে ৫০০ বছরের প্রাচীন জোসিয়ন রাজবংশেরও পতন হয় এবং চীনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে কোরিয়া। জাপান ১৯১০ সালে কোরীয় উপদ্বীপ দখল করে নেয়।

১৯১২ সালে চীনের রাজতন্ত্রের পতন হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম চীনা প্রজাতন্ত্র, রিপাবলিক অভ চায়না। নানজিংয়ে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট করা হয় সান ইয়াৎ-সেনকে। কিন্তু তৎকালীন চীনের বৃহত্তম সেনাদল বেইয়াং সেনাবাহিনীর সেনাপতি হওয়ার সুবাদে ততক্ষণে বেইজিংয়ের ক্ষমতা দখল করে ফেলেন ইউয়ান শিকাই। সংঘাত এড়ানোর জন্য উয়ানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিতে রাজি হন সান।

ইউয়ান শিকাই ক্ষমতার অপব্যবহার করলে সেই সুযোগ নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন সান। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়, সান পালিয়ে যান জাপানে। ১৯১৫ ইউয়ান চাইনিজ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ভেঙে গিয়ে নিজেকে চীনের নতুন সম্রাট ঘোষণা দেন। এর এক বছর পর মারা যান তিনি। এরপরই চীনে শুরু হয় ওয়ারলর্ডদের যুগ। দেশটি অনেকগুলো ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায়।

১৯১৭ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে এসে প্রজাতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন সান ইয়াৎ-সেন। কুমিনতাং নামে নিজের জাতীয়তাবাদী দল পুনরুজ্জীবিত করেন। চীনের দক্ষিণ অংশে কুমিনতাং সরকার গঠিত হয়, আর উত্তরাঞ্চলে ছিল ওয়ারলর্ড ও বেইয়াং সেনার দাপট।

বামপন্থি ও ডানপন্থিদের রেষারেষি
সান ইয়াৎ-সেন পুরো দেশকে এক সরকারের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওয়ারলর্ডদের বিরুদ্ধে জেতার মতো সামরিক শক্তি তার ছিল না। পশ্চিমা বিশ্বও তাকে সাহায্য করতে অস্বীকার করে। এরপর তিনি সাহায্য পান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে। দুই বছরব্যাপী সামরিক অভিযান শেষে ওয়ারলর্ডদের জমানার অবসান হয়।

কিন্তু এ অভিযান শেষ হওয়ার আগেই, ১৯২৫ সালে সান ইয়াৎ-সেনের মৃত্যুর পর, জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্টদের মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করে। কুমিনতাং দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাই—ডানপন্থি ও বামপন্থি। বামপন্থি অংশটি তাদের রাজধানী উহানে সরিয়ে নেয়। চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি অংশটি রাজধানী হিসেবে বেছে নেয় নানজিংকে।

জাতীয়তাবাদীরা কমিউনিস্টদের সরিয়ে দিতে থাকে। ১৯২৭ সালের এপ্রিলে জাতীয়তাবাদী বাহিনী কয়েক হাজার কমিউনিস্টকে হত্যা করে। কুমিনতাংয়ের বামপন্থি অংসটিও কমিউনিস্টদের হত্যা করতে আরম্ভ করে। শেষ পর্যন্ত দলটি ভেঙে যায়। চীনের সরকার হিসেবে টিকে যায় প্রথম দলটি।

বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই যুদ্ধ
চীনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ১৯২৭ সালের আগস্টে, নানচাং বিদ্রোহ ও কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনী রেড আর্মির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এর চার বছর পর গৃহযুদ্ধ চলমান অবস্থায়ই চীনে আক্রমণ করে জাপান।

কমিউনিস্টদের হত্যার কারণে চীন সরকারের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের মৈত্রী শেষ হয়ে যায়। চীনের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালিয়ে জাপানি বাহিনী মাঞ্চুরিয়া ও আশপাশের অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। দখলকৃত অঞ্চলে জাপান নিজেদের পুতুল সরকার বসায়। তবে ১৯৩৭ সালের আগ পর্যন্ত দুই দেশের সংঘর্ষ কখনও চরম আকার ধারণ করেনি।

জাতীয়তাবাদীরা অনেকবার চিয়াং কাই-শেককে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সমঝোতায় এসে জাপানের বিরুদ্ধে একত্রে লড়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু চিয়াং তাতে রাজি হননি। তবে ১৯৩৬ সালে নিজ দলেরই সেনাপতির হাতে তিনি অপহৃত হন। তার চাপাচাপিতে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে রাজি হন চিয়াং।

চীনের রাজধানী নানজিংয়ে ঢুকে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক ও সৈন্যকে হত্যার পর শুরু হয় দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ। ১৯৪১ সালে জাপান সহসা পার্ল হারবারে হামলা করে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধে যোগ দেয়, দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলে জাপানে। ১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পণ করে জাপান সাম্রাজ্য।

আত্মসমর্পণ চুক্তির একটি অংশে অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, যুদ্ধের মাধ্যমে জাপান যেসব অঞ্চল দখল করেছে, সেগুলোকে সার্বভৌমত্ব দিতে হবে। চুক্তিতে কোরিয়া ও তাইওয়ানের দখলকৃত অঞ্চলের কথাও উল্লেখ ছিল।

চীনা গৃহযুদ্ধ
জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফের ১৯৪৬ সালে চীনে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্টদের সহায়তা দেয়, আমেরিকা মদদ দেয় জাতীয়তাবাদীদের। তখন সবে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদীদের কোণঠাসা করতে করতে আরও দক্ষিণে পাঠিয়ে দেয়। ১৯৪৯ সালে কুমিনতাং সরকার পিছু হটতে হটতে তাইওয়ান দ্বীপে আশ্রয় নেয়।

এর ফলে চীনা গৃহযুদ্ধ কার্যত শেষ হয়, তবে দুই পক্ষের মধ্যে কখনও কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ওই বছরই পিপলস রিপাবলিক অভ চায়নার দখল নেয় কমিউনিস্ট পার্টি অভ চায়না। অন্যদিকে রিপাবলিক অভ চায়নার শাসক কুমিনতাং সরকার তাইওয়ানে নির্বাসনে চলে যায়। এ সরকারের পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ছিল।

তাইওয়ান প্রণালি নিয়ে তাইওয়ানের নিকটবর্তী কিনমেন দ্বীপে দুই পক্ষের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে কমিউনিস্টরা দ্বীপটির দখল নিতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবর্তন
এর পরের দুই দশকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত পিপলস রিপাবলিক অভ চায়নার দিকে ঘুরে যেতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পিআরসিকে চীনের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভেটো দেয়, তবে আরওসির সঙ্গে ১৯৭৯ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

১৯৭৯ সালে 'দ্য থ্রি লিঙ্কস' নামক প্রস্তাবের মাধ্যমে আরওসির সঙ্গে যোগাযোগ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করে পিআরসি। আরওসি এ প্রস্তাবে সাফ না করে দেয়। বলে দেয়, কোনো যোগাযোগ, সমঝোতা বা দরকষাকষি হবে না।

১৯৮৬ সালে আরওসির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না এয়ারলাইন্সের একটি কার্গো বিমান অপহরণ করে পিআরসিতে পালালে আরওসি ও পিআরসি যোগাযোগ স্থাপনে বাধ্য হয়।

১৯৯২ সালে দুই সরকার এক চীন নীতিতে সমঝোতা আনে। এ নীতি অনুসারে, একটি চীন থাকবে এবং তাইওয়ান হবে চীনের অংশ। তবে তাইওয়ান প্রণালির দুপাশে পক্ষই নিজেকে বৈধ চীন সরকার মনে করত। তবে দুই পক্ষই একমত হয় যে, চীনের মিলনই চূড়ান্ত লক্ষ্য।

১৯৯০-এর দশকের আগে কুমিনতাং সরকারশাসিত তাইওয়ান ছিল একদলীয় রাষ্ট্র। চীনও তা-ই। কিন্তু ২০০০ সালে তাইওয়ানের ক্ষমতায় আসে ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি)। এই মুহূর্তে তারাই সেখানকার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। ডিপিপি 'এক চীন নীতি'তে বিশ্বাসী নয়। ১৯৯২ সালের সমঝোতাও তারা মানে না। সমর্থন করে না দুই চীনের মিলনেও। ডিপিপি তাইওয়ানিজ পরিচয়ের কট্টর সমর্থক। দলটির বিশ্বাস, তাইওয়ান ইতিমধ্যেই স্বাধীন দেশ।

তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয়। খুব কম দেশই তাদের স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে অনেক দেশেরই তাইওয়ানের রাজধানীতে তাইপেতে অনানুষ্ঠানিক দূতাবাস রয়েছে। তাইওয়ানের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী, পাসপোর্ট আছে। ফুটবল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক গেমসের মতো আন্তর্জাতিক স্পোর্টস টুর্নামেন্টগুলোতেও অংশ নেয় তাইওয়ান, তবে সেটি করে 'চাইনিজ তাইপে' নামে।

ব্যবসা এবং ব্যবসাই আসল
ইতিহাস ছাড়াও বিনিয়োগ, ব্যবসা ও প্রযুক্তি দুই দেশকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। দুই দেশই ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে ডব্লিউটিও-তে ঢুকেছে।

তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলো চীনে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এছাড়াও প্রায় দশ লাখ তাইওয়ানিজ চীনে থাকে, সেখানে তাইওয়ানিজ কারখানা চালায়। তাইওয়ানের প্রযুক্তি ও চীনের নিম্ন শ্রমখরচের পরস্পরের পরিপূরক। ফক্সকন টেকনোলজির মতো উৎপাদকরা অ্যাপল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহের জন্য চীনের মূল ভূখণ্ডে লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। হুয়াওয়ে, শাওমির মতো চীনা টেলিকম সরবরাহকারীদের চিপ সরবরাহ করে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর (টিএসএম)। হাইটেক শিল্পে চীনের অগ্রগতি অনেকাংশেই তাইওয়ানের কাছ থেকে পাওয়া সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল।

তাইওয়ানের অর্থনীতি এখন চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে, এ নিয়ে কিছু তাইওয়ানিজ এখন চিন্তিত। ২০১৪ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব উঠলে তার বিরুদ্ধে ভোট দেয় তাইওয়ানিজ ভোটাররা। 'সানফ্লাওয়ার আন্দোলনের' জেরে এর দু-বছর পর তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সাই ইং-ওয়েন। দুই চীনের পুনরেকত্রীকরণের সব আশায় তিনি পানি ঢেলে দিয়েছেন। সাই এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিনিয়োগে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন।

গত বছর চীনের সঙ্গে রেকর্ড বাণিজ্য হয় তাইওয়ানের। তাইওয়ানের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৫ শতাংশে অবদান রাখে চীনে রপ্তানি। এর বদৌলতে হাতে এক নতুন অর্থনৈতিক অস্ত্র পেয়ে গেছে চীন।

চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে সামরিক যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেইজিং সম্ভবত তাইওয়ানকে অর্থনৈতিক চাপে রাখবে। হংকংকে যেভাবে বশ করেছে, তা-ই প্রমাণ করে দিয়েছে সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করেই ছোট দ্বীপ শক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম চীন।

দুই চীনের রেষারেষি: যুদ্ধ হবে কি?
চীন হুমকি দিয়েছে, তাইওয়ান যদি স্বাধীনতালাভের চেষ্টা করে, তবে জোর খাটিয়ে হলেও দুই চীনকে এক করবে।

জাতিসংঘে পিআরসির রাষ্ট্রদূত ওয়াং ইংফ্যান বলেছেন, 'তাইওয়ান প্রাচীনকাল থেকেই চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।' তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন বলেছেন, চীন আক্রমণ করলে নিজেকে রক্ষার জন্য তাইওয়ান 'শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করবে'।

তাইওয়ান সতর্ক করে দিয়েছে, চীন যদি তাদের আকাশসীমায় বিমান পাঠায়, তাহলে তাইওয়ান গুলি চালাতে পারে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চিউ কু-চেং বলেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে তাইওয়ানে হামলা চালাতে পারে চীন।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে পিপলস রিপাবলিক অভ চায়নার সঙ্গে যুক্ত করাকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।

মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বলেছেন, তাইওয়ান দখলের ইচ্ছা থাকলেও চীন অন্তত বছর দশেকের মধ্যে দ্বীপটির ওপর হামলা চালাবে না বলে আশা করেন তিনি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি দুর্বল। এছাড়াও তাইওয়ানিজ সেনাবাহিনীর নৈতিক জোরও কম। তাছাড়া 'তাইওয়ানের প্রাপ্তবয়স্ক লোকেরা বস্তুত লড়াই করতে চায় না'। আর চীনের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তাইওয়ানের নেই বলেই অনুমান করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

চীনের কমিউনিস্ট নেতারা আসলেই তাইওয়ানে আক্রমণ চালাতে চান কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে জোর বিতর্ক উঠেছে। আর চীনা নেতারা চাইলেও দেশটির সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে কিংবা নিকট-ভবিষ্যতে এমন হামলা চালানোর মতো শক্তিশালী কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরাসরি বড় আকারের হামলা চালানোর জন্য চীন তার সামরিক বাহিনীর আকার বাড়াচ্ছে, এমন কোনো 'লক্ষণ নেই'।

চীনের সামরিক কৌশল হলো বিদেশি সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে মার্কিন বাহিনীকে চীনা অঞ্চল থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা। চীন এই কাজ করেছে খানিকটা দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি এবং ওইসব দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরির মাধ্যমে।

গেল কয়েক বছরে কৌশলের অংশ হিসেবে ওয়ারশিপ, অ্যান্টি-শিপ মিসাইলের সংখ্যা বাড়িয়েছে চীন। একে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা কৌশল—কিংবা উপসাগর থেকে মার্কিন বাহিনীকে দূরে রাখার উপায়—হিসেবে দেখা যায়। এর ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে চীনের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেইসঙ্গে তাইওয়ানকে বশে রাখার আকাঙ্ক্ষাও চরিতার্থ করেছে।

সমর কৌশলবিদ সান জু 'দি আর্ট অভ ওয়ার'-এ লিখেছেন: 'যে জানে কখন যুদ্ধ করতে হবে আর কখন চুপ থাকতে হবে, সে-ই জিতবে।' কে জানে, চীন ও তাইওয়ান দুই পক্ষই হয়তো এই শিক্ষা মাথায় রেখেছে!

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Dhaka