26/08/2025
রাজা-বাদশাহদের স্বার্থে রাসূলের স্মৃতি-ইতিহাস কী মুছে গিয়েছে?
আবান বিন উসমান, হযরত উসমান রা: এর বংশধর ছিলেন। তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফক্বীহর একজন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তিনি রাসূল সা: এর একটি জীবনী গ্রন্থ লিখেছিলেন। (1) কিন্তু পরবর্তী কোন কিতাবাদিতে আবান ইবনে উসমান থেকে বর্ণিত সীরাতের কোন বর্ণণা দেখা যায় না।
উদাহরণস্বরুপ, বলা যায় বর্তমানে হারিয়ে গেছে এরকম বেশ কিছু সীরাত গ্রন্থ থেকে আমরা আবু বকর বায়হাকীকে (মৃ. ৪৫৮ হি.) উদ্ধৃত করতে দেখি, কিন্তু আবান বিন উসমানের থেকে একরকম কোন উদ্ধৃতি তার কিতাবে নেই। ইবনে হাজারও তার কাছে যেসব সীরাত বই ছিল তার মধ্যে আবানের কোন বইয়ের কথা উল্লেখ করেননাই।
তাহলে তার সেই বইয়ের ভাগ্যে কী হয়েছিল? তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমরা যুবাইর ইবনে বাক্কারের (মৃ. ২৫৬ হি.) লেখা ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত এক বর্ণনায় পাই।(2)
ইবনে বাক্কার বলেন: আমার চাচা মুসআ‘ব বিন আবদুল্লাহ আমাকে বর্ণনা করেছে, আল-ওয়াকিদী থেকে, যিনি বর্ণনা করেছেন, ইবনে আবী সাবরা থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন, আব্দুর রহমান বিন ইয়াজীদ বলেছেন:
যখন সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক রাজপুত্র ছিলেন, তখন তিনি ৬৮২ সালের হজ্জে আমাদের কাছে এসেছিলেন। তিনি মদিনা ভ্রমন কালে মানুষ তাঁর কাছে গেল এবং তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল।
সুলাইমান নবী ﷺ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলো—যেখানে তিনি নামাজ পড়তেন, যেখানে উহূদ যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন— সেগুলো পরিদর্শন করলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবান বিন উসমান, আমর বিন উসমান, এবং আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন আবী আহমদ।
তারা কুবা, মাসজিদ আল-ফাদ্বিখ, উম্ম ইব্রাহিমের জলকূপ এবং উহূদ পরিদর্শন করলেন। প্রতিটি জায়গার ইতিহাসের বিষয়ে সুলাইমান তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন এবং তারা তাঁকে সেসব বিষয়ে সবিস্তারে তথ্য জানাল।
এরপর তিনি আবান বিন উসমানকে নবীর জীবনী এবং যুদ্ধের বর্ণনা (সিরাত ও মাগাযি) লিপিবদ্ধ করার আদেশ দিলেন। আবান বললেন, ‘এ রকম একটি বই ইতিমধ্যেই আমি তৈরী করেছি, এগুলো আমি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করে সংকলণ করেছি।’
সুলাইমান এই বইটির অনুলিপি তৈরীর করার আদেশ দিলেন এবং দশজন লেখককে তার দায়িত্ব দিলেন। তারা চামড়ার উপরে এই বইটি লিপিবদ্ধ করলেন। অনুলিপি তৈরীর করার পর, যখন তার কাছে বইগুলো পৌঁছালো, তিনি লক্ষ্য করলেন এতে আনসারদের ভূমিকা— বিশেষ করে আক্বাবার সময় এবং বদর যুদ্ধে— বিশেষভাবে উল্লেখ আছে। তিনি বললেন, ‘আমি মনে করিনা যে, এই লোকরা এত মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত। হয় আমার পরিবারের লোকেরা তাদেরকে ছোটো করেছে, অথবা তারা সত্যিই এমন মর্যাদার অধিকারী নয়।’
আবান বিন উসমান বললেন, ‘হে আমীর, তারা শহীদকে (উসমান রা:) অবহেলা করেছে বলেই, আমাদের সত্য বলায় বিরত থাকা উচিত নয়। আমাদের সত্যই বর্ণনা করা উচিত। এই বইয়ে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হক্ব।’
সুলা্ইমান বললেন, "যতক্ষণ না আমি খলিফার মতামত নেব, ততক্ষণ আমি এই বই আমার কাছে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি এ ব্যাপারে দ্বিমত করতে পারেন। যদি তিনি একমত হন, তবে পুনরায় কপি করা সহজ হবে।’ এজন্য বইটি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো।
অন্য বর্ণনায় আছে: তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ না আমি খলিফার মতামত জানি, ততক্ষণ এটি রাখা ঠিক নয়।’ পরবর্তীতে সুলাইমান ফিরে এসে তাঁর পিতাকে আবানের কথাগুলো জানালেন।
আব্দুল মালিক বললেন, ‘আমাদের এমন কোন বইয়ের দরকার নেই, যা আমাদের কোনো সুবিধা (ফজিলত) দেয় না, এবং এর ফলে তুমি শামের লোকদের এমন তথ্য জানাবে যা আমরা তাদের জানাতে চাই না।’
সুলাইমান বললেন: যে এজন্যই আমি আপনার মতামত জানার আগ পর্যন্ত বইয়ের অনুলিপিগুলো রাখা ঠিক মনে করিনাই। আব্দুল মালিকের কাছে বই পুড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন মনে হলেও, সুলাইমানের সিদ্ধান্তকেই তিনি সঠিক বলে ঘোষণা দিলেন।
সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক ক্বাবিসা বিন যুওয়াইবকে আবান বিন উসমানের এই ঘটনা বর্ণনা করলেন। ক্বাবিসা বললো: "আমিরুল মু'মিনিন এই বিষয় যদি অপছন্দ না করতেন তা হলে ভাল হতো। এটা একটা ভাগ্যের বিষয় হতো যদি: আপনি এই তথ্যগুলো শিখে নিতে পারতেন এবং তোমার সন্তানদের শিখাতে পারতেন। আর আমিরুল মু'মিনিনের নিজস্ব বংশ এবং হালিফদের মধ্যে থেকেও তো বদর যুদ্ধে ১৬ জন শহীদ আছে।" এরপর তিনি বনু উমাইয়্যাদের ফজিলতও বর্ণনা করলেন।
....
সুলাইমান ক্বাবিসাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন খলিফা এবং তাঁর পরিবার আনসারদের প্রতি বিরক্ত এবং তাদেরকে উপেক্ষা করেন? ক্বাবিসা বললেন, ‘প্রথম এই বিষয়টি সৃষ্টি করেছিলেন মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান, তারপর আপনার পিতার পিতা, তারপর আপনার পিতা।’
সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন এমন হলো?’ ক্বাবিসা বললেন, ‘কারণ তারা (মদীনাবাসী) তাদের নিজেদের লোকদের হত্যা করেছিল, এবং উসমান বিন আফফান رضي الله عنه-কে সমর্থন করেনি। তারা তাঁর প্রতি রাগান্বিত ছিল, যা প্রজন্ম ধরে তাদের মধ্যে চলে এসেছে। তবে আমি চাইতাম খলিফার পরিবার তাদের প্রতি অন্যভাবে আচরণ করুক। সুলাইমান বললেন, ‘আল্লাহর অঙ্গীকার, আমি তা করব।’
কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যখন আব্দুল মালিককে এ বিষয়ে বললেন, আব্দুল মালিক বললেন: ‘আমি এ বিষয়ে আর কিছু করতে পারি না, তাই আমরা বিষয়টি আলোচনা থেকে বিরত থাকি।’ এ জন্য লোকেরা বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকলো।
..
তবে আমার ধারণা আবান বিন উসমানের নিজস্ব কপিটি টিকে ছিল এবং মুসা বিন উক্ববার মাগাযিতে যে বদর যোদ্ধাদের তালিকা আছে, সেই তালিকাটি আবানের কপি থেকেই লেখা। তাবাক্বাতে সা'দে দেখা যায় যে মুগিরাহ বিন আব্দির রহমানের কাছেও আবান বিন উসমানের মাগাযির এক কপি ছিল।(مغازي رسول الله صلى الله عليه وسلم أخذها من أبان بن عثمان فكان كثيرا ما تقرأ عليه ويأمرنا بتعليمها) কিন্তু পরবর্তীতে মদীনার মাগাযি-সীরাতের লেখকরা সম্ভবত আবানের বইয়ের কথা রাষ্ট্রীয় কারণে আর উল্লেখ করেননাই।
.......................
1) فؤاد سزكين, تاريخ التراث العربي (الرياض: جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية, 1411هـ/1991), 2/20.
2) الأخبار الموفقيات للزبير بن بكار (بيروت: عالم الكتب 1996) 124-125
ভাবানুবাদ করা হয়েছে।
12/04/2025
07/04/2025
05/04/2025
27/10/2024