Fitnah - الفتنة

Fitnah - الفتنة

Share

আর তোমাদেরকে আমি একে অপরের জন্য 'ফিতনা বানিয়েছি, তোমরা কি ধৈর্য্য ধারণ করবে ?
সূরা ফুরক্বান : ২০

26/08/2025

রাজা-বাদশাহদের স্বার্থে রাসূলের স্মৃতি-ইতিহাস কী মুছে গিয়েছে?

আবান বিন উসমান, হযরত উসমান রা: এর বংশধর ছিলেন। তিনি ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফক্বীহর একজন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তিনি রাসূল সা: এর একটি জীবনী গ্রন্থ লিখেছিলেন। (1) কিন্তু পরবর্তী কোন কিতাবাদিতে আবান ইবনে উসমান থেকে বর্ণিত সীরাতের কোন বর্ণণা দেখা যায় না।

উদাহরণস্বরুপ, বলা যায় বর্তমানে হারিয়ে গেছে এরকম বেশ কিছু সীরাত গ্রন্থ থেকে আমরা আবু বকর বায়হাকীকে (মৃ. ৪৫৮ হি.) উদ্ধৃত করতে দেখি, কিন্তু আবান বিন উসমানের থেকে একরকম কোন উদ্ধৃতি তার কিতাবে নেই। ইবনে হাজারও তার কাছে যেসব সীরাত বই ছিল তার মধ্যে আবানের কোন বইয়ের কথা উল্লেখ করেননাই।

তাহলে তার সেই বইয়ের ভাগ্যে কী হয়েছিল? তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমরা যুবাইর ইবনে বাক্কারের (মৃ. ২৫৬ হি.) লেখা ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত এক বর্ণনায় পাই।(2)

ইবনে বাক্কার বলেন: আমার চাচা মুসআ‘ব বিন আবদুল্লাহ আমাকে বর্ণনা করেছে, আল-ওয়াকিদী থেকে, যিনি বর্ণনা করেছেন, ইবনে আবী সাবরা থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন, আব্দুর রহমান বিন ইয়াজীদ বলেছেন:

যখন সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক রাজপুত্র ছিলেন, তখন তিনি ৬৮২ সালের হজ্জে আমাদের কাছে এসেছিলেন। তিনি মদিনা ভ্রমন কালে মানুষ তাঁর কাছে গেল এবং তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল।

সুলাইমান নবী ﷺ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলো—যেখানে তিনি নামাজ পড়তেন, যেখানে উহূদ যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন— সেগুলো পরিদর্শন করলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবান বিন উসমান, আমর বিন উসমান, এবং আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন আবী আহমদ।

তারা কুবা, মাসজিদ আল-ফাদ্বিখ, উম্ম ইব্রাহিমের জলকূপ এবং উহূদ পরিদর্শন করলেন। প্রতিটি জায়গার ইতিহাসের বিষয়ে সুলাইমান তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন এবং তারা তাঁকে সেসব বিষয়ে সবিস্তারে তথ্য জানাল।

এরপর তিনি আবান বিন উসমানকে নবীর জীবনী এবং যুদ্ধের বর্ণনা (সিরাত ও মাগাযি) লিপিবদ্ধ করার আদেশ দিলেন। আবান বললেন, ‘এ রকম একটি বই ইতিমধ্যেই আমি তৈরী করেছি, এগুলো আমি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করে সংকলণ করেছি।’

সুলাইমান এই বইটির অনুলিপি তৈরীর করার আদেশ দিলেন এবং দশজন লেখককে তার দায়িত্ব দিলেন। তারা চামড়ার উপরে এই বইটি লিপিবদ্ধ করলেন। অনুলিপি তৈরীর করার পর, যখন তার কাছে বইগুলো পৌঁছালো, তিনি লক্ষ্য করলেন এতে আনসারদের ভূমিকা— বিশেষ করে আক্বাবার সময় এবং বদর যুদ্ধে— বিশেষভাবে উল্লেখ আছে। তিনি বললেন, ‘আমি মনে করিনা যে, এই লোকরা এত মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত। হয় আমার পরিবারের লোকেরা তাদেরকে ছোটো করেছে, অথবা তারা সত্যিই এমন মর্যাদার অধিকারী নয়।’

আবান বিন উসমান বললেন, ‘হে আমীর, তারা শহীদকে (উসমান রা:) অবহেলা করেছে বলেই, আমাদের সত্য বলায় বিরত থাকা উচিত নয়। আমাদের সত্যই বর্ণনা করা উচিত। এই বইয়ে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হক্ব।’

সুলা্ইমান বললেন, "যতক্ষণ না আমি খলিফার মতামত নেব, ততক্ষণ আমি এই বই আমার কাছে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি এ ব্যাপারে দ্বিমত করতে পারেন। যদি তিনি একমত হন, তবে পুনরায় কপি করা সহজ হবে।’ এজন্য বইটি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো।

অন্য বর্ণনায় আছে: তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ না আমি খলিফার মতামত জানি, ততক্ষণ এটি রাখা ঠিক নয়।’ পরবর্তীতে সুলাইমান ফিরে এসে তাঁর পিতাকে আবানের কথাগুলো জানালেন।

আব্দুল মালিক বললেন, ‘আমাদের এমন কোন বইয়ের দরকার নেই, যা আমাদের কোনো সুবিধা (ফজিলত) দেয় না, এবং এর ফলে তুমি শামের লোকদের এমন তথ্য জানাবে যা আমরা তাদের জানাতে চাই না।’

সুলাইমান বললেন: যে এজন্যই আমি আপনার মতামত জানার আগ পর্যন্ত বইয়ের অনুলিপিগুলো রাখা ঠিক মনে করিনাই। আব্দুল মালিকের কাছে বই পুড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন মনে হলেও, সুলাইমানের সিদ্ধান্তকেই তিনি সঠিক বলে ঘোষণা দিলেন।

সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক ক্বাবিসা বিন যুওয়াইবকে আবান বিন উসমানের এই ঘটনা বর্ণনা করলেন। ক্বাবিসা বললো: "আমিরুল মু'মিনিন এই বিষয় যদি অপছন্দ না করতেন তা হলে ভাল হতো। এটা একটা ভাগ্যের বিষয় হতো যদি: আপনি এই তথ্যগুলো শিখে নিতে পারতেন এবং তোমার সন্তানদের শিখাতে পারতেন। আর আমিরুল মু'মিনিনের নিজস্ব বংশ এবং হালিফদের মধ্যে থেকেও তো বদর যুদ্ধে ১৬ জন শহীদ আছে।" এরপর তিনি বনু উমাইয়্যাদের ফজিলতও বর্ণনা করলেন।

....

সুলাইমান ক্বাবিসাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন খলিফা এবং তাঁর পরিবার আনসারদের প্রতি বিরক্ত এবং তাদেরকে উপেক্ষা করেন? ক্বাবিসা বললেন, ‘প্রথম এই বিষয়টি সৃষ্টি করেছিলেন মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান, তারপর আপনার পিতার পিতা, তারপর আপনার পিতা।’

সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন এমন হলো?’ ক্বাবিসা বললেন, ‘কারণ তারা (মদীনাবাসী) তাদের নিজেদের লোকদের হত্যা করেছিল, এবং উসমান বিন আফফান رضي الله عنه-কে সমর্থন করেনি। তারা তাঁর প্রতি রাগান্বিত ছিল, যা প্রজন্ম ধরে তাদের মধ্যে চলে এসেছে। তবে আমি চাইতাম খলিফার পরিবার তাদের প্রতি অন্যভাবে আচরণ করুক। সুলাইমান বললেন, ‘আল্লাহর অঙ্গীকার, আমি তা করব।’

কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যখন আব্দুল মালিককে এ বিষয়ে বললেন, আব্দুল মালিক বললেন: ‘আমি এ বিষয়ে আর কিছু করতে পারি না, তাই আমরা বিষয়টি আলোচনা থেকে বিরত থাকি।’ এ জন্য লোকেরা বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকলো।

..

তবে আমার ধারণা আবান বিন উসমানের নিজস্ব কপিটি টিকে ছিল এবং মুসা বিন উক্ববার মাগাযিতে যে বদর যোদ্ধাদের তালিকা আছে, সেই তালিকাটি আবানের কপি থেকেই লেখা। তাবাক্বাতে সা'দে দেখা যায় যে মুগিরাহ বিন আব্দির রহমানের কাছেও আবান বিন উসমানের মাগাযির এক কপি ছিল।(مغازي رسول الله صلى الله عليه وسلم أخذها من أبان بن عثمان فكان كثيرا ما تقرأ عليه ويأمرنا بتعليمها) কিন্তু পরবর্তীতে মদীনার মাগাযি-সীরাতের লেখকরা সম্ভবত আবানের বইয়ের কথা রাষ্ট্রীয় কারণে আর উল্লেখ করেননাই।
.......................
1) فؤاد سزكين, تاريخ التراث العربي (الرياض: جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية, 1411هـ/1991), 2/20.

2) الأخبار الموفقيات للزبير بن بكار (بيروت: عالم الكتب 1996) 124-125
ভাবানুবাদ করা হয়েছে।

12/04/2025

বইয়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ কিছু মুসলিম পন্ডিতেরা:

মুসলিম আলেমদের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের পাঠাভ্যাস নিয়ে আগেও অনেক লিখেছি। কিন্তু আজকে এমন কিছু স্কলারকে নিয়ে লিখবো: যারা তাদের জীবনের এক পর্যায়ে এসে দুনিয়াবী জ্ঞান চর্চার প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন, তাদের কাছে তাদের সমগ্র জীবনই নিরর্থক মনে হতে থাকে। এর ফলে তাদের জীবনের সমস্ত সঞ্চিত বই তারা নষ্ট করে ফেলেন।

এই স্কলারদের নামের বড় একটা সোর্স হলো আবু হাইয়্যান আত-তাওহিদীর (মৃ. ৪১৪ হি.) লেখা একটি চিঠি। তাওহিদী নিজেও তার বই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার বই পোড়ানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালিন কাজি তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেন। তাওহিদী তার বই পোড়ানোর ঘটনাকে জাস্টিফাই করার জন্য একটা চিঠি লেখেন। সেখানেই তিনি নিচের এই স্কলারদের নাম একত্রিত করেছেন। ঐসব স্কলারদের জীবনী আলাদা ভাবে দেখলেও এই সব ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।

তিনি সেখানে তিনি তার বই পুড়ানোর কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য বলেন: আমার পূর্বের এইসব ইমাম গণ বই পুড়িয়ে দিয়েছেন, অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন অথবা সাগরে ফেলে দিয়েছেন। তিনি এখানে শুধুমাত্র তাদের অনুসরণই করেছেন। (1) চলুন দেখে আসা যাক ঐসব স্কলারদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা:

১) আবূ আমর ইবনুল-আলা’ (মৃ. ১৫৪ হি.) ছিলেন সাত ক্বারীর একজন। আরবি ভাষা, কুরআনের (কিরাআত)এবং আরব ইতিহাসের একজন মশহুর আলেম। তিনি আরবি কবিতা থেকে ব্যকরণের দলীল দেয়ার জন্য বিভিন্ন বই ঘেটে নানা উদ্ধৃতি সংকলন করেছিলেন। তার রুমের ছাদ পর্যন্ত ভরা ছিল তার নোটখাতা দিয়ে।

কিন্তু জীবনের এক পর্বে এসে তিনি ক্বেরাত শাস্ত্রের চর্চা শুরু করলেন, তখন দুনিয়াবি জ্ঞানচর্চার বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি তার সমস্ত নোট খাতা পুরিয়ে দেন(تنسك فأحرقها)। পরবর্তীতে তার কোন কবিতা উদ্ধৃত করতে হলে, স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করতে হতো। (2) আবু হাইয়্যানের মতে, তিনি তার অন্যান্য বই গুলো মাটির অনেক গভীরে পুতে ফেলেছিলেন, যাতে করে তার কোন চিহ্নও না থাকে।

২) এই তালিকার আরেকজন হলো ইউসুফ বিন আসবাত। তিনি ছিলেন একজন সুফী মুহাদ্দিছ। তিনি মানুষকে নানা ধরণের ওয়াজ নসীহত করতেন। তিনি মুসলিম খিলাফতের সীমানাতে সীমান্ত পাহাড়ার জন্যও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার অনেক ঈমান এবং আমলের অনেক প্রশংসা থাকার পরেও, হাদীছের রাবী হিসেবে তার গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিছরা প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ তিনি তার সমস্ত বই দাফন করে ফেলেছিলেন, এবং এই কারণে তিনি হাদীছ বর্ণনার হক্ব রক্ষা করে হাদীছ বর্ণনা করতে পারেননাই। ( دفن كتبه ، فكان حديثه لا يجيء كما ينبغي ) (3)

আরেক বর্ণনায়: আছে তিনি তার সমস্ত বই পাহাড়ের এক গুহায় নিয়ে গিয়ে তার ভিতরে ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তাকে এই জন্য সমালোচনা করা হলে তিনি বলেন: ইলম আমাদের প্রথমে পথ দেখিয়েছে এই কথা সত্য, কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের পথভ্রষ্ট করার দিকে নিয়ে গিয়েছে। আমরা ইলম প্রচার করেছি আল্লাহর সন্তুষ্টের জন্যই। আর ইলমকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে হাসিলের চেষ্টার জন্য এখন একে আমি অপছন্দ করি।

৩) আরেকজন হলো দাউদ আল-তাই (মৃ. ১৬০ হি. এর দিকে)। তিনিও একজন দুনিয়া বিরাগী আলেম ছিলেন। তাকে তাজুল উম্মাহ বা উম্মতের মুকুট বলা হতো। তিনি ইমাম আবু হানিফার কাছে ফিক্বহ শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। একবার তিনি এক ব্যক্তির সাথে খারাপ আচরণ করেন। তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন অথবা তার প্রতি পাথর ছুড়ে মারেন। এরপর আবু হানিফা তাকে বলেন: তোমার জিহ্বা এবং হাত দুইটাই লম্বা হয়ে গেছেন।

এরপর তিনি ইচ্ছা করেই কথা বলা বন্ধ করে দেন। মানুষজন তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব জিজ্ঞাসা করলেও তিনি উত্তর দিতেন না। তার ছাত্ররা তার কাছে গেলে তাদের তিনি ফিরিয়ে দিতেন। তার সমস্ত বই তিনি ফোরাত নদীতে নিয়ে যেয়ে ফেলে দেন। ফেলে দেয়ার পর তিনি বইকে সম্বোধন করে বলেন:
কত সুন্দর দলীল-প্রমাণই না ছিলে তুমি। তবে সাধনার উচু পর্যায়ে পৌছার পর দলীলের উপর নির্ভর করা কষ্ট, বিপদ, দুর্বলতা আর খামখেয়ালী ছাড়া কিছুইনা।

এরপর দুনিয়াবী কাজ থেকে সম্পূর্ণ অবসর নিয়ে তিনি এক জায়গায় বসে ঝিমাতেন। নির্জনবাস তার কাছে ভাল লাগতে শুরু করে। তিনি একটা লম্বা টুপি পড়তেন। (4)

৪) আরেকজন হলো আবু সুলাইমান আদ-দারানি (মৃ. ২১০ এর দিকে)। ইনিও একজন সুফী যাহেদ ছিলেন। তিনি তার বইগুলো নিয়ে একটা চুলায় ফেলে দেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর তিনি বলেন: আমি তোমাকে ততক্ষন পর্যন্ত পোড়াইনাই যতক্ষন না পর্যন্ত তোমার জন্য আমি জাহান্নামে পোড়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। (والله ما أحرقتك حتى كدت أحترق بك)।(5)

৫) শেষ স্কলার হলেন আবু হাইয়্যান আত-তাওহিদী নিজে, যার কথা আগেই বলেছি। তার নিজের কাযিকে লেখা চিঠিতে বই পোড়ানের পিছনে তার মর্মবেদনা এবং মন:স্তাত্বিক টান-পোড়নের সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। তিনি মূলত: একজন সাহিত্যিক ছিলেন। তার আদি নিবাস ছিল শিরাযে, সেখানের এক দরিদ্র ঘরে তিনি জন্মগ্রহন করেন। পরে বাগদাদে এসে আবাস গাড়েন। তিনি টাকার বিনিময়ে মানুষের বই কপি করে দেয়ার চাকরী নেন। কিন্তু তিনি এই কাজে খুশি ছিলেন না। তিনি বলেন: এরকম কপি করতে করতে চোখ এবং জীবনই চলে যাবে (نسخ مثله يأتي على العمر والبصر)।

এ সময় তিনি বিভিন্ন প্রদেশের আমীর-উমারাদের কাছে যেয়ে তার সাহিত্যিক প্রতিভা দেখিয়ে চাকরী নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতি পদে পদে তিনি ব্যর্থ হন। জীবনের শেষ দিকে এসে আশি বছর বয়সে তিনি তার সমস্ত বই পুড়িয়ে দেয়ার এবং পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

৪০০ হিজরী/১০১০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মাসের দিকে লেখা তার এই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি বহুদিন ধরেই বই পুড়ানোর কথা চিন্তা করছিলেন। শেষে তিনি স্বপ্নে বই পোড়ানোর বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা পান। তিনি কাযিকে লেখেন: যদি এই ঘটনা শুনে তোমার কাঁটা বেঁধার মত কষ্ট লেগে থাকে, তাহলে আমি যে কাজ করেছি সে কাজ করতে গিয়ে আমার রক্তাক্ত হওয়া মত যন্ত্রনা হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি তার কাজের সমর্থনে বিভিন্ন যুক্তি প্রদান করে কাযিকে বুঝিয়েছেন যে, বইগুলো পুড়িয়ে দেয়া বাদে তার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি বলেন:

ক- তার বই জনগনের কাছে তেমন সমাদৃত হয়নাই। যদিও তিনি মানুষের মাঝে সুনাম কামানোর জন্য, নেতৃত্বের পদে সমাসীন হওয়ার জন্যই এই বইগুলো লিখেছিলেন। তিনি নিজের জীবনের ব্যর্থতা, সন্তানের মৃত্যু থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে তার খারাপ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন: এই সব লোক আমি মারা গেলে আমার বই নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করবে। ভুল খুজে বের করবে এবং আমার সম্মান হানি করবে। তারা মোটেও আমার বইয়ের মূল্য দিতে পারবেনা। তার আফসোস ছিল জীবিত থাকতেই যারা তাকে গুরুত্ব দেয়নাই, তারা মৃত্যুর পরে তাকে মোটেও সম্মানের চোখে দেখবেনা। সমাজের প্রতি এই হতাশা বোধ থেকে তিনি বই গুলো পুড়িয়ে দিয়েছেন।

মজার ব্যাপার হলো, আরবী সাহিত্যের পন্ডিত এক মহিলা স্কলার বলেন: Tawhidi, in the final analysis, was wrong: his reputation for writing good literature has survived him; most of his books, which he destroyed, also survived; and we surely are not an audience who is going to make fun of those books. (6)

খ- বই লিখে বা জ্ঞান দিয়ে মোটেও নিজের আখিরাত বাঁচানো সম্ভব না, যদি না সেই জ্ঞানকে আমলে রুপান্তরিত করা হয়। সাথে সাথে যদি সেই বই আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদে অন্য কোন উদ্দেশ্যে লেখা হয়। তিনি বলেন বই জমানো মানুষ এবং সোনা-রুপা জমানো মানুষের মধ্যে আদতে আসলে কোন তফাৎ নাই, (وهل جامع الكتب إلا كجامع الفضة والذهب؟ ) তার মতে এরা উভয়েই আসলেই দুনিয়াবী জিনিসের লোভে পড়ে গিয়েছে। এসব বই আখিরাতে নাজাতের জন্য কোন কাজেই আসবেনা বরং, মানুষকে আল্লাহর রহমতেরই মুখাপেক্ষী হতে হবে। এই ভাবেই অতীতের অনেকে বই না লিখেও/অনেক জ্ঞান অর্জন না করেও আল্লাহ তা’আলার কাছে প্রিয় হয়েছেন। তাহলে বইয়েরই বা এত দরকার কী?

গ. পূর্ববর্তী অনেক স্কলারই বই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তিনি উপরের স্কলারদের নাম এবং ঘটনা বর্ণনা করে নিজের কাজের সমর্থনে যুক্তি দেন।

শেষ করার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা দরকার। আবু হাইয়্যান সহ উপরের এই স্কলাররা সবাই সুফীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আবু হাইয়্যান মাঝ জীবনে সুফীবাদ ছেড়ে দিলে তার শেষ দিকের বই গুলোতে সুফিবাদের ছাপ স্পষ্ট। ইয়াকূত (মৃ. ৬২৬ হি.) তাকে فهو شيخ في الصوفية বা সুফীদের শায়খ বলেও সম্বোধন করেছেন। (7) এ থেকে প্রশ্ন ওঠে, সুফিবাদ কি তাহলে বই-বিতৃষ্ণার দিকে ঠেলে দেয়?

আমরা আগেও দেখিয়েছি যে ইবনে আরাবীর মাঝে ফক্বীহ এবং উলামাদের প্রতি শত্রুতা স্পষ্ট ছিল। তিনি বই পড়া বিদ্যার চেয়ে অন্তরের বিদ্যায় বিশ্বাস করতেন। এ ছাড়াও দেখা যায়, বিখ্যাত সুফী সাধক আব্দুল ওয়াহাব শা’রানীর সুফি উস্তাদও তাকে সমস্ত বই বিক্রি করে দিতে বলেছিলেন। কারণ এসব বই আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি ইলহামকৃত জ্ঞান আসার জন্য বাধা সৃষ্টি করে।

এ সকল বিশ্লেষণ করে বলা যায়: সুফিবাদের অনেকেই পুথিগত বিদ্যায় বিশ্বাস করেন না। বরং তারা মনে করেন প্রকৃত ইলম – যেই ইলমে আল্লাহকে চেনা যায়- সেই ইলম শূধুমাত্র শায়খ/পীর এর ক্বলব থেকে সরাসরিই আসতে পারে। তাদের মতে, বই বা পুথিগত বিদ্যা অনেক সময় মানুষকে অহংকারী করে তোলে এবং হিদায়াত থেকে দূরে নিয়ে যায়।

কেউ একে জাহেল থাকার অজুহাত বলবেন, বিপক্ষের লোকজন বলবেন আসলেই তো এত ইলমের কী দরকার?? অনেকেই মনে করেন ১৫শ এবং ১৬শ শতাব্দিতে মুসলিমদের জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার বড় একটা কারণ হলো সুফীবাদের উত্থান এবং এই তাদের এই বই বিরোধী অবস্থান।(8) তবে, আমার মতে এই জন্য সরাসরি সুফিবাদকে দায়ী করা যায়না, কারণ সুফিবাদ মুসলিমদের পিছিয়ে পড়ার আগেও ছিল। এমনকি এই পুথিগত বিদ্যা বিরোধী অবস্থান প্লেটো সহ গ্রিক পন্ডিতদের অনেকেও মাঝেও দেখা যায়। মূলত: সুফিবাদের ভিতরে ইবনে আরাবীর মাধ্যমে নিও-প্লেটোনিক যে ধারা তৈরী হয়েছে, তা প্লেটোর সেই বই বিরোধী অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে বলে আমার ধারণা।

………………………………..

1) তাওহিদীর চিঠি: https://ar.wikisource.org/wiki/%D8%B1%D8%B3%D8%A7%D9%84%D8%A9_%D9%84%D8%A3%D8%A8%D9%8A_%D8%AD%D9%8A%D8%A7%D9%86_%D9%8A%D8%B9%D8%AA%D8%B0%D8%B1_%D9%81%D9%8A%D9%87%D8%A7_%D8%B9%D9%86_%D8%AD%D8%B1%D9%82_%D9%83%D8%AA%D8%A8%D9%87

2) ইমাম যাহাবীর সিয়ারু আ’লামি নুবালাতে আবু আমরের জীবনি: https://www.islamweb.net/ar/library/content/60/1098/%D8%A3%D8%A8%D9%88-%D8%B9%D9%85%D8%B1%D9%88-%D8%A8%D9%86-%D8%A7%D9%84%D8%B9%D9%84%D8%A7%D8%A1

3) ইমাম যাহাবীর সিয়ারে ইউসুফ বিন আসবাতের জীবনি: https://www.islamweb.net/ar/library/content/60/1493/%D9%8A%D9%88%D8%B3%D9%81-%D8%A8%D9%86-%D8%A3%D8%B3%D8%A8%D8%A7%D8%B7

4) ইমাম যাহাবীর সিয়ারে দাউদ তা’ই এর জীবনি: https://www.islamweb.net/ar/library/content/60/1272/%D8%AF%D8%A7%D9%88%D8%AF-%D8%A7%D9%84%D8%B7%D8%A7%D8%A6%D9%8A

5) তাওহিদীর চিঠি। ১ নং রেফারেন্স দ্রষ্টব্য।

6) Al-Qāḍī, Wadād. "Scholars and their books: a peculiar Islamic view from the fifth/eleventh century, Journal of the American Oriental Society (2004): 627-640.

7) ইয়াকুত হামাওয়ী, মু’জামুল উদাবা, ৫/১৯২৪ লিংক: https://shamela.ws/book/9788/1922

8) দেখুন: আহমেদ আল-শামসী, ইআদাতু ইকতিশাফি তুরাছিল ইসলামী, ২০২২ সালে ইংরেজী থেকে অনূদিত।

07/04/2025

আল-ক্বায়ে+দার দুইজন প্রধান ব্যক্তিই হা}মাসের প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। এর একজন হলো ওসামা বিন লাদে/ন এবং আরেকজন হলো আই/মান আল-জাওয়া/হিরী। এ ছাড়াও আবু মুহাম্মদ মাক্বদিসিও, যার অনুবাদ কৃত বই বাংলাদেশী সেলিব্রেটিরা প্রচার করেন, হামা{সের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সমালোচনা করেন। আর আহ?ম/দ মুসা জিব.রীনের কথা আর কি বলবো: সে তো সিরিয়ার সরকারকেই তাগুত মনে করে। তার ভেরিফাইড টুইটারেই এই বিষয়ে প্রচুর লেখা আছে। যাই হোক OBL আর AAZ এর হামা}স বিরোধী প্রচারণা নিচে তুলে ধরলাম।

১. ওসা{মা বিন লাদে{ন ২০০৭ সালে তার এক বক্তব্যে এবং যার লিখিত রুপও পরবর্তীতে প্রচার করা সেখানে হামা?স নেতৃবৃন্দ তাদের দ্বীনকে নষ্ট করে ফেলেছেন বলে ঘোষণা দেন।এর কারণ ছিল তারা নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছে এবং বিভিন্ন কাফের দেশের চুক্তিকে সম্মান জানিয়েছে। তিনি বলেন:

وللعقلاء أن يعتبروا بما آلت إليه قيادة حماس ، حيث أضاعت دينها ولم تسلم لها دنياها ، عندما أطاعت حاكم الرياض وغيره بالدخول في دولة الوحدة الوطنية واحترام المواثيق الدولية الظالمة ،

অর্থাৎ: বুদ্ধিমানদের উচিত হামা''সের নেতৃত্ব যে পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তারা তাদের দ্বীনও হারিয়ে ফেলেছে, আর তাদের দুনিয়াকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ তারা রিয়াদের শাসক ও অন্যান্যদের অনুসরণ করেছে এবং তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের রাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে এবং জুলুমপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহকে সম্মান দেখিয়েছে।
(ভাব) (1)

এ ছাড়াও পুরো বক্তব্যের অন্যান্য স্থানেও হা;মাসের সমালোচনা রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এখানে যে জাতীয় ঐক্যের সরকারের কথা বলা হয়েছে বর্তমানের সিরিয়ার সরকার ভবিষ্যতে একই ধরণের সরকার গঠনের কথা বলে থাকে। এই ধরণের সমস্ত ধরণের লোক নিয়ে জাতি রাষ্ট্রের ধারণা এবং জাতীয়তাকে মেনে নিয়ে সরকার গঠন করাকে বিন লাদেন এই বক্তব্যে শিরকে আকবার এবং মিল্লাত থেকে বের করে দেয়া শিরক বলেছেন। আর জুলুমপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের যে কথা বলা হচ্ছে সেটা মোটেও Osl/o Acc.ord নয়, কারণ হামা;স Oslo Ac.cor/d কে মেনে নেয়নি। বরং এগুলো হলো আফগান তালিবা;নের মত বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক, যাদেরকে বিন লা/ দেন তাগু'/ত মনে করতো।

২. জাও/য়াহি'রী ১৯৯১ সালে একটা বই লেখেন যার নাম হলো الحصاد المر। এই বই মূলত: ইখওয়ানুল মুসলিমিনের কঠোর সমালোচনায় লেখা এক বই। যারা জানেন না তাদের বলে রাখি আপনারা যদি হামা/ স এর চার্টার বা ঘোষণা পত্র দেখেন তাহলে দেখবেন তারা নিজেদের ইখওয়ানের শাখা বলে দাবি করে এবং এটা সর্বজনবিদিত। এই বইয়ের শেষে গিয়ে তিনি বলেন: (সারানুবাদ, নিচে কমেন্টে আরবী দেয়া আছে) 1948 থেকে ইখওয়ান ফিলি=স্তিনে লড়াইয়ের দাবি করে আসে এবং এ দ্বারা তারা যুবকদের কাছে নিজেদের মু=জাহিদ হিসেবে দাবি করতে পারে। কিন্তু বস্তুত তাদের এইসব কাজ হলো তাদের জাহেলী রাজনীতির জন্য। এগুলো হলো সাময়িক কৌশল এবং নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। .... ফিলিস্তিনী জি>হাদ যেহেতু আরব রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয়, এবং রাষ্ট্রীয় পলিসির সাথে মিলে যায় এজন্যই তারা এই জি>হাদ করে থাকে। এরকম রাষ্ট্রীয় পলিসির সাথে না মিললে ইখ-ওয়ান কোন জি>হাদই করেনাই। রাষ্ট্র অনুমতি দেয়ার আগ পর্যন্ত ইখ+ওয়ান কখন ইস+রাইলি রাষ্ট্রকে কোন টোকাও দেয়নাই। ..... যেহেতু রাসূল সা: হাদীছে বলেছেন: আল্লাহ কখনো কখনো পাপী বান্দাকে দিয়ে দ্বীনের জন্য সাহায্য নিয়ে থাকেন, ফিলিস্তিন জি+ হাদে অংশগ্রহন থেকে ইখওয়ানের সঠিকতা বোঝা যায় না। তবে যদি কেউ সঠিক নিয়তে তাদের সাথে জি/হা;দ করে সে আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবে, এই দলের বিকৃত নীতি তার কোন ক্ষতি করবেনা। .... এরপর তিনি বলেন যে: তিনি মনে করেন: ফিলিস্তিনের ইহু;দীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে মুসলিম দেশের মুর+তাদ শাসকদের বিরুদ্ধে ল/ড়াই বেশী গুরুত্বপূর্ণ।... (2)

তবে চৌদ্দ বছর পর এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে এসে তিনি এইসব কথা বাদ দিয়ে দেন। বর্তমানে ইন্টারনেটে যে সংস্করণ পাওয়া যায় তা দ্বিতীয় সংস্করণ। এই দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাতে তিনি এই কথাগুলো বলার জন্য ওজর খাই করেন। বলেন তিনি আসলে পালানো অবস্থায় মানসিক অস্থিরতার কারণে না বুঝে শুনে অনেক কিছু লিখেছেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। আমার কাছে প্রথম সংস্করণ।

তবে উগ্রবাদীদের এই কথা বদলানোর অভ্যাস নতুন নয়। বর্তমান অনলাইন স্ফেয়ারে বহুত উগ্রবাদীই আছেন যারা তাদের দশ বছর আগের চিন্তা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে এসেছেন। তারা আরো বিবর্তিত হবেন। কিন্তু তারা মনে করেন তাদের আগের রাস্তা ঘাটে বো+মা ফাটানোর চিন্তাও কুরআন-হাদীছ সম্মত, বর্তমানের সেমিনার করে দ্বীন ক্বায়েমের চিন্তাও কুরআন হাদীছ সম্মত। যদিও উভয় চিন্তায় আকাশ পাতাল তফাৎ। কিন্তু শুধু মাত্র তাদের বিপক্ষে যারা তাদের চিন্তা ভাবনাই কুরআন হাদীছের বাইরে।

তারা আবার জাওয়া_+হেরী এবং মাক্ব"দিসীকে ধারণ করার দাবি করেন, কিন্তু জাওয়া"হেরী এবং মাক্বদি'সী উভয়েই মনে করতেন সহিংসতা বাদে ইসলাম ক্বায়েম করা সম্ভব নয়। জাওয়া/হেরীর মূলত এই বইয়ে ইখওয়ানের বড় একটা সমালোচনা করেছেন এটাই যে: ইখওয়ান সহিংসতা এড়িয়ে চাটুকারীতা এবং রাজনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছে। (দেখুন ২১৭ পৃষ্ঠা إن جماعة الاخوان قبلت نبذ العنف......) এই দাওয়াত ছেড়ে সহিংস পন্থা আমরা আনও/ য়ার আল আও/ লাক্বীর মাঝেও দেখতে পাই। তিনি বলেন: আ"মরা পৃথিবীতে তলোয়ারের ডগা দিয়ে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবো, জনসাধারণ এটি পছন্দ করুক বা না করুক।" মোটকথা যারা তাদের ধারণ করার দাবি করেন, তারা নিজেরাই তাদের পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারেন না, বা সুকৌশলে করেন না।

তবে উগ্রবাদী ভাইরা রাগ করবেন না। আমি সবার পক্ষে/বিপক্ষেই লিখি। ফিতনার ডোজ সবারই দরকার আছে।

.......

1) https://archive.org/details/78967678637। এর ৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড থেকে দেখুন। আবার দেখুন ৫০:১৫ থেকে দেখুন। এর লিখিত রুপ দেখুন: https://www.jihadica.com/wp-content/uploads/2021/06/al-sabil-li-ihbat-al-muamarat.pdf এর দুই নং পৃষ্ঠাতে পাবেন। pdf এর ৩ এবং ১৪ পৃষ্ঠাতে হামাস নিয়ে এই আলাপ আছে।

2) জাওয়াহিরীর হাসাদুল মুরর বইয়ের ২১৮-২২০ পৃষ্ঠায়। ১৯৯৯ সালে দারুল বায়ারিক্ব থেকে ছাপানো রিপ্রিন্ট সংস্করণ। প্রথম সংস্করণের কপি আমার কাছে আছে। আরবী কমেন্টে।

05/04/2025

সালাহুদ্দীন আইয়্যুবীর সময়ের সিরিয়াতে ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

ইসলামী রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ছিল হিসবা। হিসবার কাজ ছিল মানুষকে সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দেয়া। সাধারণ জনগন অনেক সময় এসব কাজ করতে গেলে মব জাস্টিসে রুপান্তরিত হতে পারে দেখেই ইসলামী রাষ্ট্রে সরকারী ভাবেই এই কাজ করা হতো। তবে এই বিভাগের বড় একটা কাজ ছিল বাজারে ভেজাল, কারচুপি এগুলো প্রতিহত করা। আব্দুর রহমান শায়যারী নামের এক সিরিয়ান স্কলার (মৃ. -৫৯০ হি.) হিসবা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক কিতাব লিখেছেন। শায়যারী সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল। তিনি তার অন্য একটি রাজনীতি নিয়ে লেখা বই সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীকে উৎসর্গ করেছেন। (১)

যাই হোক হিসবা নিয়ে তার লেখা বইয়ের নাম نهاية الرتبة في طلب الحسبة। এই বইয়ের অধিকাংশ জায়গা জুড়েই তিনি বাজার, মূল্য, ভেজাল এবং রুটি থেকে শুরু করে গোশত এবং পোশাক আশা তুলা সহ বিভিন্ন পণ্যের ভেজাল কিভাবে রোধ করা যায় সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। যা থেকে বোঝা যায়, এইগুলোই ছিলো হিসবা এর প্রধান দায়িত্ব। এজন্য এই বই থেকে মধ্যযুগের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে মজাদার কিছু আলাপ পাওয়া যায়। তবে একেবারে শেষে এসে তিনি নারীদের বিরক্ত করা যুবকদের নিয়ে দুই- এক প্যারা আলোচনা করেছেন।

তিনি এখানে বলেন:

মুহতাসিবের উচিত নারীরা যে সকল জায়গাতে একত্রিত হয় সে সকল জায়গা সজাগ দৃষ্টিতে তদারকি করা। যেমন তুলা ও লিনেনের বাজার, নদীর কূলঘেঁষা পথ, নারীদের স্নানাগারের প্রবেশদ্বার ও অনুরূপ অন্যান্য স্থানে।

যদি তিনি দেখতে পান, কোনো যুবক কোনো নারীর সঙ্গে একা এবং সে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজন ছাড়া অন্য প্রসঙ্গে সেই নারী আলাপ করছে কিংবা যুবকটি নারীর দিকে তাকিয়ে আছে—তবে মুহতাসিবের দায়িত্ব হবে তাকে তা'যির শাস্তি দেওয়া এবং সেই স্থানে অবস্থান থেকে তাকে বিরত করা।

বাস্তবে দেখা যায় বহু বিপথগামী যুবক কোন কাজ বাদেই এসব স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা শুধু নারীদের সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশার উদ্দেশ্যেই সেখানে অবস্থান করে।

এরপর মুহতাসিবের দায়িত্ব হলো, ওয়াজ-নসিহতের জায়গা গুলো তত্ত্বাবধান করা যেন তিনি পুরুষদেরকে নারীদের সঙ্গে মিশতে না দেন এবং তাদের মাঝে পর্দা স্থাপন করেন। যখন মজলিস শেষ হবে, তখন পুরুষদের একপথে চলে যেতে বলা হবে, তারপর নারীরা অন্য পথে বের হবে। কিন্তু যদি কোনো যুবক নারীরা যে পথে যাবেন সে পথে দাড়িয়ে থাকে, অথচ তার কোনো প্রয়োজন নেই—তবে মুহতাসিবের কর্তব্য হবে তাকে শাস্তি দেওয়া ও সেই স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া
(২)

মজার বিষয় হলো, একজন গতকালকে জানালেন শায়যারী প্রেম এবং যৌনতা নিয়ে আরো দুইটা বই লিখেছেন। একজন আধুনিক এক তার্কিশ গবেষকের মতে এই বইগুলোর ভাষা দেখে মনে হয়, শায়যারী মোটেও মুহতাসিব বা হিসবা পরিচালনার উপযুক্ত ছিলেন না।

১) https://shamela.ws/book/7235/4

2) https://shamela.ws/book/21584/121

27/10/2024

বিজয়ের পরে “দ্বীনে ফেরা” উগ্রবাদীদের যেভাবে ঝেড়ে ফেলতে হয়: ইবনে সাউদ (মৃ. ১৯৫৩ খ্রি) এবং إخوان من أطاع الله এর ঘটনা

মুহাম্মদ বিন আব্দিল ওয়াহহাব (মৃ. ১৭৯২ খ্রি.) তার এক পুস্তিকাতে রাসূল জীবনের ছয়টি ঘটনার উপর তার নিজের পর্যবেক্ষন তুলে ধরতে গিয়ে দাবি করেন: নিজেদের একত্ববাদী দাবি করা বেশীর ভাগ লোকই সিরাতের এই ছয়টি ঘটনার তাৎপর্য বোঝেনা। (১) এর মধ্যে ষষ্ঠ বিষয়ে যেয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে:

উলামা নামধারী কিছু শয়তান মানতে না চাইলেও, তার সময়ের অধিকাংশ বেদুইনরা ইহুদীদের চেয়েও বড় কাফের। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন: মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ মদীনায় হিজরত করেনি। তারা তাদের ঈমান লুকিয়ে রেখেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কাফেরদের সাথে কাফেরদের সাথে বদর যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছিল। যখন মুসলিমরা তাদের তীর মেরে ফেলেছিল, সাহাবাদের কেউ কেউ তখন বলেন: আমরা আমাদের ভাই কে হত্যা করলাম !! তখন যারা হিজরত করেনি, তাদের মেরে ফেলার বৈধতা দিয়ে আয়াত নাজিল হয়।

এর উপর ভিত্তি করে তিনি দাবি করেন: বেদুইনদের মধ্যে যারা নিজেদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করে হিজরত করে কোন গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে নাই, তাদের মধ্যে কেউ ইসলাম মানার দাবি করলেও তাদেরকে বদর যুদ্ধের কাফেরদের মত মেরে ফেলা যাবে।

মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের এই কথা নিয়ে প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশী সময় পর বিংশ শতাব্দির শুরুতে সৌদী আরবের নাজদীদের মাঝে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। যাযাবর বেদুইন বনাম হাদ্বারি (স্থায়ীভাবে বসবাসকারী) ব্যক্তিদের নিয়ে সেই বিতর্কের রেশ আজও সৌদী সামাজিক পরিসরে চালু আছে। অনেকে দাবি করেন: সৌদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতে যাযাবর বেদুইনদের একটি দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের সেই ভূমিকা বর্তমানে স্বীকার করা হয়না। বরং তাদেরকে বিজয়ের পর সমূলে উৎপাটন করা হয়।(২) তাদের সেই অবদান এবং সেই সময়ের বিতর্ক নিয়েই আজকে আলাপ দিবো।

আধুনিক সৌদী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে সাউদ ১৯০২ সালে রিয়াদ (পুন:?)দখল করেন। এবং সেখানে থেকে তিনি উসমানীয় খেলাফত এবং তাদের সমর্থিত গোত্রদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। এই যুদ্ধে সহযোগী হিসেবে তিনি যাযাবর যুদ্ধবাজ বেদুইনদের নিয়ে একটি যোদ্ধা বাহিনী তৈরী করেন।(৩) এদের অধিকাংশই ছিল দ্বীনে-ফিরে আসা বেদুইন। এদেরকে ওয়াহাবী মতাদর্শ অনুসারে পূর্বের জাহেলী শিরকী জীবন ত্যাগ করিয়ে, হিজরত করিয়ে হাদ্বারি (স্থায়ী) বানানো হয়। কিন্তু তারপরে এদের যাযাবর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘূরে হামলার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই বাহিনীর নাম দেয়া হয় ইখওয়ান মান আতা’আ আল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর অনুগত বান্দাদের ভ্রাতৃসংঘ।

অন্যান্য বেদুইনরা লুটতরাজ করলেও ইখওয়ানরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তারা বেদুইনদের জবেহকৃত গোশত খেতে অস্বীকৃতি জানায়। যারা হিজরত করে স্থায়ী আবাস গ্রহন করেনাই এমন বেদুইনদের উপর আক্রমন করাকে বৈধ মনে করে। তারা কাফের তকমা দিয়ে পুরো গ্রাম ধ্বংস করত এবং নারী-শিশুদের হত্যা করত বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের ফতোয়া: বেদুইনরা সবাই কাফের - এই মতামত তারা শক্তভাবে ধারণ করতো। যেহেতু তারা তাদের পূর্বের জাহেলী জীবন ত্যাগ করে “দ্বীনে ফিরেছে,” যেসব বেদুইনরা তাদের মত ফিরে আসেনি তাদেরকে তারা হত্যা করাকে জায়েজ বলে মনে করতো। যেইসব ইখওয়ান হত্যা করাকে জায়েজ মনে করতোনা, তারা মনে করতো তাদের সাথে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখাও গুনাহের কাজ। (৪)

প্রথম পর্যায়ে তাদের এই অবস্থান এবং দ্বীনি গাইরতকে তৎকালীন ওয়াহাবী শায়খরা প্রশংসা চোখে দেখেছেন। তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ ওয়াহাবী চিন্তক সুলাইমান ইবনে সিহমান (মৃ. ১৯৩১ খ্রি) তাদের প্রশংসা করে এক কবিতায় লিখেছেন যা تهنئة للإمام عبد العزيز لما أغار على أركان حائل নামের পান্ডুলিপিতে বাদশা সালমান লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া ইবনু সিহমানের দিওয়ান العقود الجواهر المنضدة তেও ইখওয়ানদের নিয়ে লেখা কবিতা পাওয়া যায়। এই কবিতাগুলোতে তিনি বলেন যে তারা খারেজী নয়, কারণ তারা কবীরা গুনাহ কারীদের তাকফির করে না।(৫) তিনি তাদেরকে হিজরত করার জন্য এবং ইসলামের পক্ষে লড়াইয়ের জন্য সাধুবাদ জানান। তার এই প্রশংসার কারণ হলো, এই সময় ইখওয়ান আলে সৌদের আরব উপদ্বীপ বিজয়ের লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। ইখওয়ানদের অনেকের সাথে ইবনে সাউদের আত্নীয়তার সম্পর্কও ছিল।

সৌদী আরবে আলে সাউদের শাসন প্রতিষ্ঠায় ইখওয়ানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রিয়াদকে কেন্দ্র করে আশে পাশে বিভিন্ন গোত্রের উপর প্রভাব বিস্তারে তাদের বেদুইনি অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯২৪ সালে তায়েফ থেকে শুরু করে মক্কা বিজয়ে তৎকালীন হিজাযের অধিপতি শরীফ পরিবারের সাথে বীরদর্পে লড়াইয়ের অগ্রগামী সৈনিক ছিল তারাই। উল্লেখ্য এই সময় ইবসে সাউদ রিয়াদে ছিলেন, তিনি মক্কার আশেপাশেও ছিলেন না। তিনি ইখওয়ানকে মক্কা বিজয়ের সরাসরি নির্দেশও দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়না। বরং দেখা যায় আগ বাড়িয়ে ইখওয়ানরাই মক্কায় আক্রমনের জন্য ইবনে সাউদের অনুমতি প্রার্থনা করেন। তৎকালিন উলামাদের সাথে কথা বলে ইবনে সাউদ তাদের অনুমতি দেন।

মক্কা বিজয়ের পর ইখওয়ানরা নিজেদের মধ্যে একজনে মক্কার অন্তবর্তীকালিন আমীরও নিযুক্ত করে। বিজয়ের কিছুদিন পরে যখন ইবনে সাউদ এখানে আসেন, তখন ইখওয়ানদের প্রধান দুই নেতা, সুলতান বিন বিজাদ এবং ফয়সাল আদ-দাওয়িশ, তার কাছে মক্কা, মদীনা এবং তায়েফের ইমারত দাবি করে বসে। কিন্তু ইবনে সাউদ তার নিজস্ব পরিবারের ঐতিহ্য অনুসারে নিজের লোকদেরই এই জায়গাগুলোতে বসান। তখন ইখওয়ান তার বিরুদ্ধে শরীয়াহ লঙ্ঘন করে, জাহেলী যুগের রীতি-নীতি অনুসরণের অভিযোগ আনে। মূলত: এই সময় থেকেই ইখওয়ানের সাথে ইবনে সাউদের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে।

এ ছাড়াও ইখওয়ানের ধর্ম নিয়ে নানা অবস্থানও ইখওয়ান এবং ইবনে সাউদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে বড় ভূমিকা রাখে। মক্কা বিজয়ের পরে শহরের লোকেরা এবং হাজীরা মিলে শোভাযাত্রা বের করে। এতে মিশরীয় হাজীরা বাদ্যযন্ত্র সহকারে যোগ দেয়। ইখওয়ানরা বাদ্যযন্ত্রকে ধর্মবিরোধী বলে মনে করে এতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু মিশরীয়রা ইখওয়ানের আপত্তির প্রতি গুরুত্ব দেয়নাই। ফলত: ইখওয়ানের সদস্যরা ইবন বিজাদের আদেশে মিশরীয় হাজীদের উপর হামলা চালায়, এবং কয়েকজন হতাহত হয়। প্রিন্স ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের মধ্যস্থতার চেষ্টার পরেও সংঘর্ষ থামেনি। এর ফলে মিশর নতুন সৌদী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ইবনে সাউদের তখন নতুন বন্ধু রাষ্ট্রের দরকার ছিল, সেই মুহুর্তে মিশরের সাথে অনাকাঙ্খিত সম্পর্কের এই অবনতি ঘটানোর পিছনে ইখওয়ানের ভূমিকাকে তিনি অত্যন্ত নেতিবাচক ভাবে নেন।

১৯২৭ এর দিকে যখন ইবনে সউদ সৌদী আরবে মোটামুটি তার ক্ষমতা সুসংহত করে এনেছেন, তখন তিনি ইখওয়ানের বিভিন্ন অভিযানে বাধ সাধতে শুরু করেন। কারণ ইখওয়ানের সেই ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং উদ্দীপনা বিজয়ের পর তার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে শুরু করে। বিশেষত: মধ্য আরবের কিছু এলাকার আমীররা সরাসরি ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করে নিরাপত্তা নিয়ে রেখেছিল। ইবনে সউদ তাদের উপর আক্রমনের জন্য ইখওয়ানকে নিষেধ করেন।

কিন্তু ইখওয়ানের নেতৃবর্গ মনে করতেন: ওয়াহাবী বাদে বাকি সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের “ইসলামে” অন্তর্ভূক্ত করা ঈমানী দায়িত্ব। তারা ইবনে সউদের এই সিদ্ধান্তকে গ্রহন করতে পারেনাই। ইবনে সাউদ ব্রিটিশ সরকারের সাথে জেদ্দা চুক্তিতে আন্তর্জাতিক সীমানা মেনে নেন। এই সীমানার বাইরে যুদ্ধ করাতে সেদিক থেকে তার পক্ষে সম্ভবপর ছিলোনা। কিন্তু ইখওয়ান এই চুক্তিকে কাফিরদের সাথে হারাম শর্তে করা চুক্তি বলে গণ্য করে এবং ইসলামের মৌলিক ব্যাপার, জিহাদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রসারণ, এই শর্তের সাথে আপোষ করতে অস্বীকৃতি জানায়। মোটকথা, জিও-পলিটিক্যাল বাস্তবতার কারণে ইসলামী বিজয়াভিযানে বাধ-সাধাকে ইখওয়ান ইসলামী আদর্শের সাথে বড় ধরণের গাদ্দারি মনে করে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ধী-শক্তি সম্পন্ন ইবনে সাউদ তার নিজস্ব সামর্থ্যের আলোকে উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

ইখওয়ান এবং ইবনে সউদের মাঝে এসব বিষয় নিয়ে ক্রমশই সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। আগের যেই ইবনু সিহমান তাদের নিয়ে প্রশংসা মূলক কবিতা লিখেছিলেন, তিনিই তাদের বিরুদ্ধে কিছু রিসালাহ লেখেন। (৬)

এই পুস্তিকাগুলোতে ইখওয়ানের কিছু চিন্তা এবং কর্মকে আমরা দেখতে পাই। ইখওয়ানের লোকেরা মনে করতো আলেমরা দ্বীনের সঠিক বিধান বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের মত বেদুইনদের তাকফির করছেন না। ইখওয়ানের মতে, আলেমরা শাসকের স্বার্থে দ্বীনি বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করছেন এবং মিল্লাতে ইব্রাহীমকে কবর দিয়ে দিয়েছেন (داهنوا في دين الله......كتموها ودفنوها)। স্থানীয় সংস্কৃতি ইক্বাল (গোল যেটা বর্তমানের সৌদীরা মাথায় পড়ে) পড়াকে আলেমরা অবৈধ মনে করছে না। তাদের মতে এই ইক্বালের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ইখওয়ান মনে করতো এই বিদাত বাদ দিয়ে বরং আমামাহ বা পাগড়ী পড়া জরুরী। শুধু তাই নয় বরং যেসব আলেম এখনও ইক্বাল পড়ছে, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরী বলেও তারা মনে করে।

ইখওয়ানের লোকজন অভিযোগ করে যে, ইবনে সাউদ এসময় শুধুমাত্র রাষ্ট্র থেকে নির্ধারিত আলেমদের দিয়ে দাওয়াতী কাজের নির্দেশ প্রদান করেন। যা বেদুইনদের ইসলাম প্রচারে বাধা দেয়। তারা আরো বলে: ইবনে সাউদ শি’আদের কে জাযিরাতুল আরব থেকে বিতাড়িত করছেন না। ইখওয়ানরা এই সকল নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

ইবনে সিহমান ইখওয়ানদের বিরুদ্ধে তার লেখায় যারা বেদুইনদের কাফের বলে মনে করে তাদের জাহেল বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন: মুহাম্মদ বিন আব্দিল ওয়াহহাবের বেদুইনদের উপরে করা তাকফির বর্তমানে প্রযোজ্য হবে না। তাদের সাথে এখন ইবনে আব্দিল ওয়াহাবের মত লড়াইয়ের প্রয়োজন নেই, বরং তাদের গোত্রে শিক্ষক পাঠিয়ে দাওয়াতী কাজ করা উচিত। তিনি আলেম এবং শাসকদের প্রতি ইখওয়ানের আস্থাহীনতার সমালোচনা করেন। তিনি ইখওয়ানের আচরণকে বিদাত এবং পথভ্রষ্টতা বলে অভিহিত করেন। ইবনু সিহমান তাদেরকে উগ্রবাদী চিন্তা ভাবনা বর্জন করে শাসক এবং আলেমদের প্রতি আস্থা রাখার পরামর্শ দেন।

পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে ইবনে সউদ ১৯২৮ সালে ইখওয়ানের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে রিয়াদে এক বৈঠকে বসার ঘোষণা দেন। কিন্তু তারা এই বৈঠক বর্জন করে। একই সময়ে ইখওয়ানরা ইবনে সাউদের চুক্তির বর্ডার পার হয়ে ইরাক এবং কুয়েতে কিছু জায়গায়।আমেরিকান-ব্রিটিশদের হত্যা করে। এভাবেই শুরু হয়ে যায় ইবনে সৌদের বিরুদ্ধে ইখওয়ান বিদ্রোহ। ইবনে সাউদ তাদেরকে সশস্ত্রভাবে দমনের সিদ্ধান্ত নেন।

অবশেষে ১৯২৯ সালে মার্চ মাসের শেষের দিকে সাবিল্লার যুদ্ধে ইবনে সাউদ এবং ইখওয়ান বাহিনী মুখোমুখি হয়। এই যুদ্ধে ইবনে সউদ ইখওয়ানদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে ইখওয়ান বাহিনীর লোকজন উটে চড়ে অংশগ্রহন করে। সাউদী বাহিনী ব্রিটিশ বিমানবাহিনী থেকে সাহায্য গ্রহণ করে ইখওয়ান বাহিনীর উপর বোমা বর্ষন করে। ব্রিটিশদের থেকে নেয়া আধুনিক অস্ত্রপাতিও ছিল সৌদী বাহিনীর হাতে, যেগুলো ইখওয়ানের ছিল না। ইখওয়ান এই যুদ্ধে পুরোপুরি পরাজিত হয়। তাদের নেতাদের বন্দি করা হয়। বাকি জীবিত সৈন্যদের কিছু শর্তানুসারে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নেয়া হয়। আজও সৌদী আরবের ন্যাশনাল গার্ডে সেই ইখওয়ানদের বংশধররা বংশানুক্রমে চাকরী করছেন।

আপনি যদি ধৈর্য্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এ পর্যন্ত পড়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে ধন্যবাদ। তবে আমার কিছু অগুরুত্বপূর্ণ মুলাহাযাতও পড়ে নিতে পারেন।

এক: উদ্দীপনা, যুদ্ধাংদেহী মনোভাব এবং আবেগ এগুলো রাষ্ট্র গড়ার কাজে কোন কাজে আসেনা। বরং এগুলো ক্ষতিকারক। আফগান জিহাদ পরবর্তী সময়েও এই অতি উৎসাহী তরুণদের হাতে বিভক্তি তৈরী হয়েছিল। একই ভাবে ইখওয়ান মান আতা’আল্লাহ গ্রুপের মাঝেও আমরা এই প্রবণতা দেখতে পায়। আব্দুল্লাহ আযযাম দয়াপরবশ হয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তাকে তারা জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। পক্ষান্তের ইবনে সাউদ রাজনৈতিক ভাবে ঐ ভুল করেননাই। তিনি উগ্রবাদীদের শুরুতেই নিশ্চিহ্ন করে দেন।

দুই: ইতিহাস পড়লে অনেক সময় আপনি কনফিউজড হয়ে যান এবং রাজনীতির খেলায় ঐতিহাসিক কোন পক্ষকে সমর্থন করবে তা সহজে বুঝে উঠতে পারেননা। আমার ধারণা বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক অনেক বিতর্কই আমরা বর্তমানে দাড়ায়ে চট করে যেমন গরম হয়ে পক্ষ নিয়ে ফেলি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর দূরে দাড়ায়ে আমরা যদি আজকের এই বিতর্ক দেখতাম, তাহলে হয়তো এতটা সহজে এই পক্ষ নিয়ে ফেলতে পারতাম না।

তিন: যে কোন ফতোয়া একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষাপট না বুঝে ফতোয়ার যত্র তত্র প্রয়োগ থেকে চরমপন্থা এবং সীমালঙ্ঘনের উৎপত্তি হতে পারে। এটা শুধুমাত্র সমস্যাজনক ফতোয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বরং যে কোন ফতোয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। এখানেই আরেকটা উদাহরণ দেখুন: মক্কা আক্রমনের ফতোয়া বা কাফেরদের সাহায্য নিয়ে ঈমান চলে যাওয়ার ফতোয়া ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করে দেখেন। উসমানীয়রাও কাফেরদের সাহায্য নিয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমন করেছে।

চার: সাধারণত দ্বীনে ফেরা লোকজন বেশী উত্তেজিত থাকে। তারা যে পক্ষেই থাকুক না কেন সাধারণত আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। দ্বীনের গভীর জ্ঞানও তাদের থাকে না। দীর্ঘ দিন ধরে ইলমের সংস্পর্শ থেকে যে বুঝ তৈরী হয়, তাকে দ্বীনে ফেরা ব্যক্তিদের দ্বীন নিয়ে কম্প্রোমাইজ মনে করে ছোট করে না দেখাই ভাল।

............
১) ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব, মাজমু’আ রাসাঈলি ফি আত-তাওহীদ ওয়াল-ঈমান, ইসমাইল বিন মুহাম্মদ আনসারী আলে ইমাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, ৩৫৩-৩৬০ পৃ.

২) ফুয়াদ হামজার ক্বলবু জাযিরাতিল আরব এবং হাফিজ ওয়াহাবার জাযিরাতুল আরব ফিল ক্বরনিল ইশরিন এ সৌদী আরব প্রতিষ্ঠাতে প্রধান ভূমিকার জন্য ইখওয়ানকে তেমন কোন ক্রেডিট দেয়া হয়নি।

৩) আমিন রিহানীকে (মৃ. ১৯৪০ খ্রি) ইবনে সাউদ নিজেই তার বায়োগ্রাফি লেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। তার মতামত হলো ইখওয়ান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইবনে সাউদ। বেশীর ভাগ বইয়ের লেখকেরা এই মতামতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে বিংশ শতাব্দির শেষের দিকে এসে সৌদী আরবের ইতিহাস লেখার দায়িত্ব জন্য সরকার থেকে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারা ইখওয়ানের সাথে ইবনে সৌদের এই সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন। যেমন: দেখুন আব্দুল্লাহ আল উছাইমীনের মা’আরিক মালিক আব্দিল আযিয আল-মাশহুরা লি-তাওহীদিল বিলাদ। তাদের সুত্র ফুয়াদ হামজার উপরে উল্লেখিত বই।

৪) কোন কোন লেখক ইখওয়ানদের ভিতরের গোত্র নয়, বরং বাইরের গোত্র এগুলো করে ইখওয়ানদের উপর দোষ চাপিয়েছে বলে আমার চোখে পড়েছে।

৫) ইবনে সিহমানের জীবনি এবং কবিতার উপর লেখা বই ইবনু সিহমান তারিখ হায়াতিহি ওয়া ইলমিহি, আবু আব্দুর রহমান বিন আক্বীল সংকলিত। ২০০৬ সালে রিয়াদ থেকে ৪ খন্ডে প্রকাশিত। ৩:৮৮-৯২।

৬) দুইটি রিসালাতে এ ক্ষেত্রে আমি নজর বুলিয়েছি। ইরশাদুত তালিব ইলা আহাম্মিল মাতালিব এবং মিনহাজু আহলিল হাক্ক।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Dhaka