Hasbi Academy

Hasbi Academy

Share

Islamic online Academy

Photos from Hasbi Academy's post 25/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (২০)

হিন্দুস্তানের বাহরুল উলুম হিসেবে বিখ্যাত আল্লামা আব্দুল আলী ফেরেঙ্গী-মহল্লী (মৃত: ১৮১০ খ্রি:) তার রাসাইলুল আরকানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত প্রসঙ্গে লিখেছেন,

" পরিচ্ছেদ: হজ্ব সমাপনকারী হাজী সাহেবের জন্য কর্তব্য হলো হজ্ব শেষ করে মদিনা মুনাওয়ারার দিকে সফর করবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। যাতে করে শুধু হজ্ব করে নবীজীর জিয়ারত না করে তাঁর প্রতি জুলুম না করা হয়।
জেনে রেখো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত করা সমস্ত হানাফী উলামায়ে কেরাম, সমস্ত শাফেয়ী, মালেকী ও অধিকাংশ হাম্বলী উলামায়ে কেরামের মতে শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত এবং প্রভূত বরকতের মাধ্যম। শরহুল মুখতারে রয়েছে, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর এ ব্যাপারে অতিরিক্ত দলিল দেয়ারও প্রয়োজন নেই। যে এ বিষয়টিকে অস্বীকার করেছে যেমনটি ইবনে তাইমিয়া ও তার অনুসারীদের থেকে বর্ণিত আছে, তারা মূলত: নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে। ইসলামের একেবারে সুস্পষ্ট বিষয়কে অস্বীকার করেছে। এবং মহান কল্যাণ লাভের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।
মোটকথা, ফরজ ইবাদত সমূহের পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত যে শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদতের একটি, এ বিষয়টি অস্বীকার করা এবং একথা বলা যে, এতে কোন কল্যাণ নেই, এটি মূলত: চরম মূর্খতা বৈ কিছুই নয়। এধরণের কথা মূলত: প্রভূত কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার নামান্তর। যার আক্বল-বুদ্ধি নেই এবং কোন আদব নেই, সেই এধরণের কথা বলতে পারে। এধরণের কথা মুখে আনাই উচিৎ নয়। এগুলো বিশ্বাস করা তো দূরের বিষয়।

আর যারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের বিরুদ্ধে নিচের হাদীস দিয়ে দলিল দিয়েছে, এটি মূলত: এই ব্যক্তির মূর্খতার প্রমাণ। হাদীসে এসেছে, তিনটি মসজিদ ছাড়া অধিক সওয়াবের আশায় সফর করা উচিৎ নয়। আমার মসজিদ, মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আক্বসা।
এই হাদীসে মূলত: নামাজের উদ্দেশ্যে এই তিন মসজিদ ছাড়া অন্য মসজিদে সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই হাদীসকে নবীজীর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ নেই।
এমনকি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারত যে শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদতসমূহের একটি এর উপর পৃথক কোন দলিল দেয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম যে সমগ্র সৃষ্টিজগতের মাঝে শ্রেষ্ঠ, তিনি যে সবচেয়ে মর্যাদাবা সৃষ্টি, তিনি যে নবীকুল শিরোমণি, তিনি যে মহান রবের প্রিয়ভাজন - হাবীব, এগুলো সবই জ্বরুরিয়াতে দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত। আর এটিই প্রমাণ করে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসাল্লামের কবর মোবারক জিয়ারত প্রভূত কল্যাণের মাধ্যম এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদত।"
(রাসাইলুল আরকান, পৃ: ২৭৮)

Photos from Hasbi Academy's post 21/01/2024

নজদী-তাইমীদের কবরপূজা, পীরপূজা ও মাজারপূজা (৩)

ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র হাফেজ আবু হাফস উমর ইবনে আলী আল-বাজ্জার তার আল-আ'লামুল আলিয়্যাহ ফি মানাকিবি শাইখিল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কিতাবে ইবনে তাইমিয়ার ইন্তেকালের অবস্থা বর্ণনা করেছেন।

এই কিতাবের ৭৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন,
" ইবনে তাইমিয়ার গোসলের যেসব পানি তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল সেগুলো নেয়ার জন্য তার গোসলে উপস্থিত বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও সর্ব-সাধারণ সকলেই কাড়াকাড়ি শুরু করে যাতে প্রত্যেকেই তার গোসলের পানি নিতে পারে।"

অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়ার দেহ থেকে যে পানি গোসলের পর ঝরে পড়ছিল, সেটি নেয়ার জন্য গোসল দানে উপস্থিত খাস লোক ও সাধারণ লোক সবাই কাড়াকাড়ি শুরু করে।

এখানেই শেষ নয়, এরপর তিনি লিখিছেন,
"এরপর যখন তার জানাজা বের করা হয়, তার জানাজা দেখার সাথে সাথেই সব দিক থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সবাই তার জানাজা থেকে তাবাররুক বা বরকত হাসিল করতে চায়। এমনকি ভয় হচ্ছিল যে, মানুষের এভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ার কারণে খাটিয়া কবরে পৌঁছার আগে ভেঙ্গে যাবে।"

(আল-আ'লামুল আলিয়্যাহ, পৃ: ৭৩-৭৪)

কী বুঝলেন? ইবনে তাইমিয়ার গোসলের পানি থেকে বরকত নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি করা, তার খাটিয়া ও জানাজা থেকে বরকত নেয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়া এটা নজদী-তাইমীদের কোন স্তরের তাওহীদ? আর ইবনে তাইমিয়া সারাজীবন কাদেরকে কী শিখাালেন? সর্ব-সাধারণের কথা না হয় বাদই দিলাম, খাস লোকেরাও তার গোসলের পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছে। এগুলো যদি পীরপূজা না হয়, তাহলে পীরপূজা আসলে কোন জিনিসের নাম নজদী-তাইমীদের কাছে?

Photos from Hasbi Academy's post 21/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৯)

দারুল উলুম দেওবন্দের ফাজিল মাওলানা হাবীবুল্লাহ কাসেমী যিনি হাবীবুল উম্মত হিসেবে বিখ্যাত। তিনি মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভীর বিশিষ্ট শাগরিদ, মুফতী মাহমুদুল হাসান গাংগুহীর খলিফা। তিনি ৪০ এর অধিক কিতাব লিখেছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসিলা করে দু'য়া করার বৈধতার উপর একটি কিতাব লিখেছেন, এর নাম দিয়েছেন, আত-তাওয়াসসুল বি-সাইয়্যিদিস রুসুল।

এই কিতাবের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন,

" বক্ষমান গ্রন্থটি দু'য়াতে অসিলা সংক্রান্ত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ওলী-বুজুর্গদের মাধ্যমে অসিলা বৈধ কি না এবিষয়ে। প্রাচীন কাল থেকেই সালাফে - সালেহীন দু'য়াতে অসিলার প্রবক্তা ছিলেন এবং তারা একে মুস্তাহাব ও উত্তম মনে করেন। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামাদের কেউ এটি অস্বীকার করেনি। সর্বপ্রথম ইবনে তাইমিয়া অসিলা দিয়ে দু'য়া করার বিষয়টি অস্বীকার করে উম্মতের মাঝে মতবিরোধের নতুন একটি রাস্তা তৈরি করেছেন। এজন্য আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী ইমাম সুবকীর বরাতে লিখেছেন,
"ইমাম সুবকী বলেছেন, আল্লাহর কাছে দু'য়া করার ক্ষেত্রে নবীজীর অসিলা দেয়া উত্তম। ইবনে তাইমিয়া ছাড়া সালাফ ও খালাফ তথা পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের কেউ-ই বিষয়টি অস্বীকার করেননি। এক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়া এমন একটি বিদয়াত চালু করেছে যা পূর্ববর্তী কোন আলিম বলেননি।"

এরপর মাওলানা হাবীবুল্লাহ কাসেমী এই ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণে পরবর্তী কেউ কেউ এই মাসআলায় যে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করেছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

অসিলা বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার খন্ডন করার পর মাওলানা কাসেমী ইবনে তাইমিয়ার অন্যান্য ভ্রান্ত আক্বিদার উপরও সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করেছেন। "ইবনে তাইমিয়ার আক্বিদা" শিরোনামে মাওলানা হাবীবুল্লাহ কাসেমী লিখেছেন,

" ইবনে তাইমিয়ার মুকাল্লিদরা তাকে কোন কোন বিষয়ে তাকলীদ করবে? তিনি তো এও লিখেছেন যে, জাহান্নামের আগুন নি:শেষ হয়ে যাবে। নবীগণ গোনাহ থেকে নিষ্পাপ নন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ কোন অবস্থান নেই আল্লাহর কাছে (মায়াজাল্লাহ)। এজন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসিলাও করা যাবে না। আল্লাহর প্রিয় হাবীব, ইমামুল আম্বিয়া, সমগ্র সৃষ্টির গর্ব,, আমার পিতা - মাতা তার উপর কুরবান হোক, সেই সরওয়ারে কায়েনাতের রওজা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা ইবনে তাইমিয়ার কাছে হারাম। তার মতে এটি এত বড় গোনাহের কাজ যে, কেউ যদি নবীজীর রওজা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করে তার জন্য সেই সফরে নামাজ কসর করারও অনুমতি নেই।

আস্তাগফিরুল্লাহ। আপনারা কি লক্ষ করেছেন কোন ধরণের কথাবার্তা তিনি লিখেছেন? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এতটুকু হক্ব নেই যে, একজন মুসলমান নবীজীর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তার রওজায় উপস্থিত হবে? অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইন্তিকালের পরে তার জিয়ারতকে কেমন যেন তিনি জীবিত অবস্থায় তার সাক্ষাতের সাথে তুলনা করেছেন। হাদীস রয়েছে, যে আমার ইন্তেকালের পরে আমার কবর জিয়ারত করবে কেমন যেন সে আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।

আজকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি জীবিত থাকতেন, তাহলে কি ইবনে তাইমিয়ার অনুসারীরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিয়ারত থেকে মানুষকে বাঁধা দিত? যদি জীবিত অবস্থায় বাঁধা না দিত, তাহলে এখন কেন তারা বাঁধা দেয়? আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সিরাতে মুস্তাকীমের হেদায়াত দান করেন। "

(আত-তাওয়াসসুল বি-সাইয়্যিদির রুসুল, পৃ: ৪৮-৪৯)

Photos from Hasbi Academy's post 20/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৮)

দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের মাঝে মাওলানা সারফরাজ খান সফদর ইমাম বা ইমামু আহলিস সুন্নাহ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে বেরলভীদের খণ্ডনে বহু কিতাব লিখেছেন। তিনি ইবনে তাইমিয়ার গুণগ্রাহী হওয়া সত্ত্বেও ইবনে তাইমিয়ার বিচ্ছিন্নতা ও আক্বিদাগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার সিমাউল মাওতা ও তাসকিনুস সুদূর ইত্যাদি কিতাবের বিভিন্ন জায়গায় ইবনে তাইমিয়ার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

মাওলানা সারফরাজ খান সফদর তার সিমাউল মাউতা বইয়ের ১২৯ পৃষ্ঠা থেকে ১৪৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ইবনে তাইমিয়ার নানা বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা হারাম সংক্রান্ত ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্যের বিস্তারিত খন্ডন করেছেন।

মাওলানা সরফরাজ খান সফদর ইবনে তাইমিয়ার বিরুদ্ধে ফয়দ্বুল বারী থেকে কিছু বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যেখানে কাশ্মিরী বলেছেন, "ইবনে তাইমিয়ার মেজাজে কিছুটা ক্ষিপ্রতা ও বাড়াবাড়ি ছিলো। যখন কোন দিকে ঝুঁকে যেতে, সেদিকেই পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ত। আবার কোন কিছুর বিপক্ষে গেলে সেখানেই কায়মনোবাক্যে বিরোধিতা করত। তার মতো ব্যক্তি ইফরাত-তাফরিত (বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি) থেকে নিরাপদ নয়। এজন্য তিনি ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে ঈমান-বাড়া কমার বিষয়ে যে বক্তব্য নকল করেছেন, সেটি নিয়ে সংশয় থেকে যায়। "

এরপর কাশ্মিরীর আরেকটি বক্তব্য এনেছেন, যেখানে কাশ্মিরী হায়েজ অবস্থায় তালাক হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ইবনে তাইমিয়ার পদ্ধতি হলো, তার মতের বিপরীত এমন কোন দলিল যদি তার সামনে আসে যার কোন তা'বীল করার সুযোগ তার নেই, তাহলে সেটাকে থেকে চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যায়।

নিজের ইচ্ছামত হাদীসের সহীহ - জয়ীফ সাব্যস্ত করা, নিজের মতের বিপক্ষের বিষয়গুলোকে চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যাওয়া, ইবনে তাইমিয়ার এজাতীয় স্বভাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মাওলানা সরফরাজ খান সফদর লিখেছেন,

" হাফেজ জাহাবী এধরণের বিষয়ে ইবনে তাইমিয়াকে সতর্ক করে একটি লম্বা চিঠি লিখেছেন। যেখানে তিনি দু:খ করে বলেছেন, হায়, বোখারী-মুসলিমের হাদীস যদি আপনার হাত থেকে বাঁচত! আপনি তো সব-সময় এগুলো জয়ীফ বা বাতিল কিংবা নানা তা'বীল করে এগুলোর উপর হামলা করে থাকেন। বরং আল্লামা জাহাবী তার জাগলুল ইলম ও আন-নাসিহাতুজ জাহাবিয়্যাহ - তে ইবনে তাইমিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এমনকি তিনি লিখেছেন, জ্ঞানীদের একটি জামায়াত তাকে মুহাক্কিক, বরেণ্য আবার বিদয়াতী সাব্যস্ত করেছে।"

এরপর মাওলানা সরফরাজ খান লিখেছেন,

" ইমাম ইবনে হাজার মক্কী তার আল-জাউহারুল মুনাজ্জাম এবং আল্লামা ত্বকিউদ্দীন হুসোনী তার দাফউ শুবাহি মান-শাব্বাহা ও তামাররাদা বইয়ে ইবনে তাইমিয়াকে গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট বলেছেন। (মায়ারিফুস সুনান)। হাফেজ ইবনে তাইমিয়া তার মিনহাজুস সুন্নাহ ( খ: ১, পৃ: ২৪৭) এ আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে এমন আলোচনা পেশ করেছেন যাতে আল্লাহর সম্পর্কে দেহবাদের ধারণা হয়। ইবনে তাইমিয়ার এধরণের দেহবাদী আক্বিদার উপর বিরাগ হয়ে তিনি তার কাসিদায়ে নুনিয়াতে ইবনে তাইমিয়াকে স্পষ্ট গালী পর্যন্ত দিয়েছেন। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন,

" ইবনু ফায়িলা (ব্যাভিচারীর ছেলে), তার অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। সে বলেছে, আল্লাহর দেহ আছে তবে তা অন্যান্য দেহের মতো নয়।"

এরপর মাওলানা সরফরাজ খান লিখেছেন, এগুলো হলো বড়দের নিজেদের মধ্যে সম-সাময়িক বা সমালোচনামূলক আলোচনা। আমাদের জন্য সবাই সম্মানের। এসব উদ্ধৃতি থেকে মায়াজাল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অসম্মান উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু বলা উদ্দেশ্য যে, বেশ কিছু মাসআলায় তিনি বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করেছেন। এসব মাসআলায় তার কিছু ছাত্র এবং পরবর্তী কিছু অনুসারী ছাড়া কেউ তার মত গ্রহণ করেনি। আর তার মেজাজে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতার কারণে তিনি তার গ্রহণ করা মতের উপর অটল থাকেন। এজন্য এসব মাসআলায় জমহুর উলামায়ে কেরামের পথ ছেড়ে তার সঙ্গ দেয়া সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে হক্ব জমহুর উলামায়ে কেরামের সাথে।"
(সিমাউল মাউতা, পৃ: ১৩৬-১৩৮)

এরপর তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য সফর করা হারাম সংক্রান্ত ইবনে তাইমিয়ার বিচ্ছিন্ন ফতোয়ার খন্ডনে লম্বা আলোচনা করেছেন। উলামায়ে কেরাম আলোচনাটি দেখতে পারেন।

Photos from Hasbi Academy's post 17/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৭)

দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের মাঝে গাইরে-মুকাল্লিদীন আহলে হাদীসদের খন্ডনে যারা দীর্ঘ সময় ধরে ইলমী কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন আলিম হলেন মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী। এ বিষয়ে তার অনেকগুলি কিতাব রয়েছে। সেই সাথে মাওলানার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত জমজম ম্যাগাজিনেও প্রচুর ইলমী মাকালা ছাপা হয়েছে।

মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী তার জমজম ম্যাগাজিনের অনেক প্রবন্ধে ইবনে তাইমিয়ার বিভিন্ন বিষয়ের খন্ডন করেছেন। এছাড়া ইবনে তাইমিয়ার বিভিন্ন চিন্তা-ধারা ও আক্বিদা -বিশ্বাসের খন্ডনে স্বতন্ত্র একটি কিতাবও লিখেছেন। এর নাম দিয়েছেন, কিয়া ইবনে তাইমিয়া উলমায়ে আহলে সুন্নত মে সে হে? (ইবনে তাইমিয়া কি উলামায়ে আহলে সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত?)

আমি এই কিতাবের সূচীপত্র এখানে দিয়ে রাখছি। সূচী দেখলেই বুঝতে পারবেন, কী কী বিষয়ে তিনি ইবনে তাইমিয়ার উপর আপত্তি করেছেন।

দুএকটি শিরোনাম ও তার অধীনের কিছু আলোচনার সারাংশ নিচে উল্লেখ করছি।

১। ইবনে তাইমিয়ার মতে হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিদয়াতী ছিলেন

এই শিরোনামোর অধীনে তিনি লিখেছেন,
" ইবনে যখন তার (তথাকথিত) তাওহীদের নেশায় বুদ হয়ে যান, তখন সাহাবায়ে কেরামের উপর তার নিশানাবাজি করেন। সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কেও তার জবান ও কলম থেকে এমন সব কথা বের হয় যে, তার ধৃষ্টতা দেখে মানুষ হয়রান হয়ে যায়। একবার যখন তার তাওহীদের নেশায় মাতাল হয়েছে, তখন হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে পর্যন্ত বিদয়াতী বানিয়ে ছেড়েছে। নিজের কিতাব ইকতিদ্বাউস সিরাতিল মুস্তাকিমে লিখেছে,
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব জায়গায় কখনও কখনও নামাজ আদায় করেছেন, সেসব জায়গা অনুসন্ধান করে সেখানে নামাজ আদায় করার বিষয়টি ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কারও থেকে বর্ণিত হয়নি। আর এধরণের খুঁজে খুঁজে নামাজের বিষয়টি খোলাফায়ে রাশিদ্বীনেরও সুন্নত নয়। বরং এটি ইবনে উমরে রা: এর নতুন বিদয়াত"

আর ইবনে উমর রা: এর এই কাজকে বিদয়াত বলার জন্য ইতোপূর্বে ইবনে তাইমিয়া নবীজীর বিদয়াত সংক্রান্ত বিখ্যাত হাদীসটি ব্যবহার করেছে। সেটি হলো, "তোমরা নতুন সৃষ্ট জিনিস থেকে বেঁচো থেকো, কারণ, প্রত্যেক নব্য সৃষ্ট বিষয় বিদয়াত, আর প্রত্যেক বিদয়াতই ভ্রষ্টতা।" আর এভাবে ইবনে তাইমিয়া হযরত ইবনে উমর রা: এর মতো সাহাবীর উপর বিদয়াতী হওয়ার মোহর লাগিয়ে দিয়েছে।

আমি ইবনে তাইমিয়ার অনুসারীদের কাছে জিজ্ঞেস করব, আহলে সুন্নতের কোন আলিম ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু এর এই আমলকে বিদয়াত বলেছেন। আর ইবনে তাইমিয়ার পূর্বে তাঁকে বিদয়াতী বলার মতো গোস্তাখী কে করেছেন? গাইরে মুকাল্লিদীন আর সালাফী ফেরকার লোকেরা বলুক যে, নবীজীর সাহাবীকে বিদয়াত যে বলে সে কি আহলে সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে? তাকে শাইখুল ইসলাম অর্থাৎ মুসলমান বা মুমিনদের শাইখুল ইসলাম বলা তো অনেক দূরের বিষয়? "
(কিয়া ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে আহলে সুন্নত মে সে হে, পৃ: ২৩-২৪)

২। ইবনে তাইমিয়ার আক্বিদা ছিলো নবীগণ গোনাহ থেকে নিস্পাপ নন

এই শিরোনামের অধীনে মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী লিখেছেন,
" সমস্ত আহলে সুন্নতের আক্বিদা হলো নবীগণ নবুওয়াতের পর সগীরা ও কবীরা সব ধরণের গোনাহ থেকে নিষ্পাপ হয়ে থাকেন। এবং নিষ্পাপ হওয়া নবীর নবুওয়াতের সত্ত্বাগত অপরিহার্য্য বিষয়। এটি সকলের ঐকমত্যপূর্ণ ইজমায়ী বিষয়। ইবনে তাইমিয়ার আক্বিদা হলো, নবীগণ থেকে গোনাহ হতে পারে। এমনকি তার মতে নবীগণ কবীরা গোনাহ থেকেও নিষ্পাপ নন। অর্থাৎ তার মতে নবীগণের গোনাহ হয়ে গেলে তওবা ও লজ্জিত হওয়ার সুযোগ পান, গোনাহের উপর অটল-অবিচল থাকেন না, অথবা তাদেরকে বিশেষ কোন বালা-মুসীবতে নিপতিত করা হয় যার দ্বারা তাদের গোনাহ মাফ করা হয়। এধরণের আক্বিদা ইবনে তাইমিয়ার তার ফতোয়ার বিভিন্ন জায়গায় বার বার উল্লেখ করেছে"
এরপর মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী ইবনে তাইমিয়ার কিতাব থেকে বিভিন্ন উদ্ধৃতি উল্লেখ করে উপরের বিষয়টি প্রমাণ করেছেন।
(কিয়া ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে আহলে সুন্নত মে সে হে, পৃ: ৩৬)

৩। ইবনে তাইমিয়ার আক্বিদা ছিলো, আল্লাহর সত্ত্বায় নশ্বর বিষয় সৃষ্টি হয় ( আল্লাহ তায়ালা মাহাল্লুল হাওয়াদিছ)।

বিষয়টি ইবনে তাইমিয়া তার কিতাবে বিভিন্ন জায়গায় বার বার উল্লেখ করেছেন। এবং অধিকাংশ জায়গায় নিজেদের আক্বিদার পক্ষে সালাফে সালেহীন, মুহাদ্দিসীন, সুফিয়া - কেরাম, সমস্ত মুমিন - মুসলমান রয়েছে, ইত্যকার বড় বড় দাবী করে থাকেন। এই জাতীয় দাবী তিনি তার এই কুফরী আক্বিদার পক্ষেও করেছেন।

এই ধরণের অমূলক দাবী উল্লেখ করে মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী লিখেছেন,
" আমি যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করেছি, ইবনে তাইমিয়া তার দাবী প্রমাণের জন্য বিভিন্ন সময় নিজের পক্ষে সালাফ, কুরআন-সুন্নাহ, মুহাদ্দিসীন, ইজমা ইত্যাদির দাবী জায়গা-বে জায়গায় ব্যবহার করে থাকেন। আর এগুলো সাধারণত: ইবনে তাইমিয়ার বকওয়াস। মূলত: সালাফে সালেহীন ও কুরআন - সুন্নাহের নাম নিয়ে সাধারণ মানুষকে মোহবিষ্ট ও বিভ্রান্ত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।"

(কিয়া ইবনে তাইমিয়া উলামায়ে আহলে সুন্নত মে সে হে, পৃ: ৪২)

মাওলানা আবু বকর গাজীপুরী কিতাবটির ইংরেজি অনুবাদও হয়েছে। অনলাইনে সার্চ করলে ইংরেজীও পেয়ে যাবেন।

15/01/2024

ইসলামে আল্লাহর সিফাত কেন্দ্রিক গোন্ডগোলের সূত্রপাতে তিনটি বাইরের শক্তি মৌলিক ভূমিকা রেখেছে।

১। ইয়াহুদীদের থেকে আসা অসংখ্য দেহবাদী বর্ণনা। যেগুলোতে তাদের আক্বিদা-বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালাকে মানবীয় রুপ দেয়া হয়েছে। সেগুলো ইসলামের মধ্যে ঢুকেছে।

২। খ্রিষ্টানদের থেকে আসা কালাম - কেন্দ্রিক বিতর্ক। ঈসা আ: যদি আল্লাহর কালাম বা কালিমা হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আল্লাহর সত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য গুণ ও অবিনশ্বর। সুতরাং তিনিও অসৃষ্ট খোদায়ী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আল্লাহর গুণ।

৩। গ্রিকদের থেকে আসা কোন কিছুকে তার বিভিন্ন অংশ দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পদ্ধতি। অর্থাৎ গ্রিকরা কোন কিছুর পরিচয় করানোর জন্য সেই বস্তুর নানা বিভাজন, এবং সেই বিভাজনের বিভিন্ন অংশের পরিচয় - পরিচিতির দিকে ফোকাসড ছিলো। যেমন, যদি গ্রিকদের মেথোডলজিতে বলা হয়, কলম কী জিনিস। তারা বলবে, এটি একটি লম্বা জিনিস, যা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, এর মাথায় একটি নিব থাকে, ভেতরে কালি থাকে ইত্যাদি। এভাবে আরও বিভিন্ন অংশের পরিচয় তারা ঐ বস্তুকে বিভাজন করে দিবে।

উল্টো দিকে কলম কী জিনিস, এর সরল উত্তর হতে পারে, যা দিয়ে আমি লিখি।

একইভাবে যদি জিজ্ঞেস করি, মোবাইল কী জিনিস। গ্রিকদের মেথোডলজিতে এর উত্তর হবে, মোবাইল এমন জিনিস, যার একটি মাদারবোর্ড আছে। সেই মাদারবোর্ডে একটি প্রসেসর আছে। সেই প্রসেসর আবার চাইনিজ টিসিএমসি তৈরি করেছে। সেই প্রসেসের ইন্টারনাল হাইলি কম্লেক্স ডিজাইন নিয়ে আলাপ শুরু হতে পারে। সেটি কোয়ালকম প্রসেসর হলে এর লেটেস্ট আপডেট নিয়ে কথা হবে। সেই কোয়ালকম প্রসেসর তৈরির পিছনে যেই জটিল প্রক্রিয়া ও ইঞ্জিনিয়ারিং, সেটা আবার ৯৯% মানুষের বোধগম্য হবে না। এভাবে জটিলতা বাড়তেই থাকবে।

অথচ মোবাইল কী জিনিস, এর সহজ উত্তর হতে পারত, আমি যা দিয়ে কথা বলি। ভিডিও দেখি। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন চালাই।

মোটকথা, কোন কিছুকে তার কর্ম ও আসার, তার থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে পরিচয় পেতে পারি। আবার সেই জিনিসকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিভিন্ন অংশ দিয়ে পরিচয় পেতে পারি। সেই বিভাজিত অংশগুলোকে আরও ভেঙ্গে অণ-পরমাণু, নিউক্লিয়াস, বিভিন্ন কোয়ার্কস ইত্যাদি আরও গভীরে যেতে পারি। তবে এই পদ্ধতি প্রতিটি স্তরে জটিলতা বাড়িয়ে দেই। আপনি বস্তুকে চেনার জন্য যতো গভীরে যাবেন, ততো বিষয়গুলো জটিল হবে। এবং এই জটিলতার কোন বৈজ্ঞানিক সমাধানও আমাদের জানা নেই। এমনকি বর্তমান বিজ্ঞানও জানে না যে, বস্তুকে সর্বোচ্চ ভাঙার পর আমরা যা পাচ্ছি, সেটি আসলে কী। তার বিভিন্ন ফাংশনালিটি দিয়ে বা তার বিভিন্ন ধর্ম দিয়ে আমরা সেই সব কণিকা বা শক্তির বিভিন্ন রকম সংজ্ঞা তৈরি করলেও তার প্রকৃত বাস্তবতা আসলে আমাদের অজানা। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, বস্তুকে ভাঙতে ভাঙতে একেবারে চূড়ান্ত স্তরে গেলেও আমরা সেই বস্তুর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারছি না, তার বিভিন্ন ধর্ম দিয়ে তাকে সংজ্ঞায়িত করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছি।

উল্টো দিকে বস্তুর কাজ, তার থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রভাব বা ধর্ম, বা তার ফাংশনালিটি দিয়ে পরিচয় দিলে বিষয়গুলো সহজ হয়। এবং সর্ব-সাধারণের জন্য বিষয়গুলো বোধগম্য থাকে। একটা মোবাইলের পরিচয়ের জন্য বর্তমানের কম্প্লেক্স সিপিউ এর ডিজাইন বা ইঞ্জিনিয়ারিং জানাটা সবার কাজ নয়।

এতগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তার পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর সত্ত্বার বাস্তবতা আলোচনার পরিবর্তে তিনি কী করেন, তিনি কতো বড় স্রষ্টা, তিনি তার সৃষ্টির প্রতি কত দয়া করেন, তিনি মহাবিশ্বকে লালন-পালন করেন এজাতীয় অসংখ্য কাজের মাধ্যমে পরিচয় দিয়েছেন।

ফিরআউন যখন হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছেন,
قَالَ فَمَن رَّبُّكُمَا يَا مُوسَىٰ
অর্থাৎ হে মুসা, তোমাদের রব কে?

হযরত মুসা আলাইহিস সালাম উত্তর দিয়েছেন,
قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ
অর্থাৎ আমাদের রব হলেন তিনি যিনি সব কিছুকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে চলার পথ-নির্দেশ দিয়েছেন।

রবের পরিচয় দানের ক্ষেত্রে এটা হলো কুরআনিক অ্যাপ্রোচ। উল্টো দিকে মুসা আ: যদি বর্তমানের সালাফীদের মতো হতেন অথবা গ্রিকদের মেথোডলজিতে উত্তর দিতেন, তাহলে উত্তর হয়ত এরকম হতো,
" আমাদের রব হলেন যার দুই হাত আছে, চোখ আছে, পায়ের পিন্ডলী আছে, যিনি আদম আ: এর আকৃতির। দেহের এক পাশ আছে। ইত্যাদি ইত্যাদি "

আরও গালি মুজাসসিমা হলে হয়ত বলতেন, যিনি আরশে বসে আছেন। কুরসী হলো তার পা রাখার স্থান। তার পায়ের নিচে স্বর্ণের বিছানা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

মোটকথা, মুসলমানরা ইয়াহুদীদের দেহবাদ, খ্রিষ্টানদের ফিলোসফিক্যাল নির্বুদ্ধিতা আর গ্রিকদের বস্তুকে তার বিভিন্ন অংশে বিভাজ্য করে তার পচিয় নেয়ার মেথোডলজিতে আটকে পড়ে হাজার বছর ধরে নিজেদের মধ্যে ফাইট করে যাচ্ছে। যেই বিতর্কের কোন শেষ নেই। হবেও না।

অথচ বিষয়গুলো খুব সহজ ছিলো। আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছেন, হে মুসা, তোমার ডান হাতে কী?
হযরত মুসা আলাহিস সালাম আমাদেরকে ডান হাতে কী, এই প্রশ্নের সুন্দর উত্তর শিখিয়েছেন। সেটি হলো, কীভাবে একটি ঠালির সংজ্ঞা দিতে হয় তার পদ্ধতি।

তিনি বললেন, এটি আমার লাঠি। আমি এর উপর ভর দেই। এটি দিয়ে আমার ছাগলদের পাতা ইত্যাদি পেড়ে দেই। এছাড়া এটি দিয়ে আমার আরও অনেক ধরণের উপকার হয়।

কিন্তু এই প্রশ্নকে যদি আপনি জটিল থেকে জটিল করতে চান, তাহলে গ্রিক মেথোডলজিতে এভাবে উত্তর দেয়া যায়।

" আমার হাতে ৩ ফিট লম্বা একটি লাঠি। এর কালার হলো হালকা কালো। এটি অমুক গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। সেই কাঠের পারমাণবিক মৌলগুলির গঠন হলো এই।" এরপর আপনি ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউক্লিয়াস, কোয়ার্কসের জগতে প্রবেশ জিনিসটাকে জটিল থেকে জটিলতর করে কোন সমাধান ছাড়াই বলবেন, এটি হলো আমার লাঠি।

ইসলামের নববী যুগের সাথে পববর্তী যুগে তৈরি হওয়া বিতর্কগুলোর বাস্তবতাও অনেকটা উপরের লাঠির পরিচয় দেয়ার মতো। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং গ্রিকদের মেথোডলজিতে গিয়ে এক ধরণের নো এন্ডিং বিতর্কের মধ্যে আমরা হাবু-ডুবু খাচ্ছি, যার আসলে কোন দরকারই ছিলো না। রবকে বিভাজ্য বানিয়ে তার হাত, পা, চোখ ইত্যাদি দিয়ে পরিচয় পাওয়ার পরিবর্তে রবের কাজ ও রব থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন আ'সারের মাধ্যমে রবের পরিচয় নিলে এই বিতর্ক সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো।

Photos from Hasbi Academy's post 14/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৬)

বেরলভী মাসলাকের বরেণ্য আলিম মাওলানা নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদীকে ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ইবনে তাইমিয়ার ভ্রষ্টতাগুলি তুলে ধরে একটি বিস্তারিত ফতোয়া দেন। নিচে আমরা তার মাজমুউ ফাতাওয়া থেকে উক্ত ফতোয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি তুলে ধরছি।

শিরোনাম: ওয়াহাবীদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ইবনে তাইমিয়ার বাস্তবতা

প্রশ্ন: উলামায়ে দ্বীন এ বিষয়ে কী বলেন যে, ইবনে তাইমিয়া কে ছিলো? তার পরিচয় বা বাস্তবতা কী ছিলো? মাজহাবের দিক থেকে তার অবস্থান কী? হিন্দুস্তানের কিছু কিছু সাংবাদিক য়েমন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ অধিকাংশ সময় তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে থাকে। বর্তমানে ইয়াজীদের মতো নাপাক-নোংরা ব্যক্তির প্রশংসা করার জন্য ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ব্যক্তি কি গ্রহণযোগ্য ছিলেন?

উত্তর: ইবনে তাইমিয়াকে নজদী-ওয়াহাবীরা নিজেদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব মনে করে। এবং কখনও তার নাম উল্লেখ করে আবার কখনও নাম উল্লেখ করা ছাড়াই তার বক্তব্য ও মতামত তারা অনুসরণ করে থাকে। ইবনে সউদ ওয়াহাবীদের ম্যাগাজিন হিসেবে মাজমুয়াতুত তাওহীদ নামে যে সংকলন ছেপেছে, সেখানে তার কয়েকটি পুস্তিকা রয়েছে। তার সম্পর্কে খাতামুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী তার ফতোয়ায়ে হাদীসিয়াতে বিস্তারিত লিখেছেন।

এরপর মাওলানা নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী ফতোয়ায়ে হাদীসিয়া থেকে ইবনে হাজার মক্কীর বেশ কিছু আলোচনা উদ্ধৃত করেছেন। সেই সাথে ইবনে তাইমিয়া সাহাবায়ে কেরামের যেসব সমালোচনা করেছে, সেগুলো উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে হযরত উমর ও হযরত আলীর ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়ার খুব জঘন্য সমালচোনা রয়েছে। হযরত আলী রাদ্বিয়াহুল্লাহ এর ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়ার নাসেবিয়াত ও বিদ্বেষ একেবারে স্পষ্ট। মাওলানা নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী লিখেছেন,

" ইবনে তাইমিয়া হযরত আলী রা: সম্পর্কে বলেছে, তিনি তিনশ'র অধিক মাসআলায় ভুল করেছেন। নাউজুবিল্লাহ। লা-হাউলা ওলা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ। আল্লামা ইবনে হাজার বলেন, হে ইবনে তাইমিয়া, তোমার ধারণা অনুযায়ী হযরত আলী ও উমর যদি এভাবে ভুল করে থাকেন, তাহলে সঠিক জিনিস তুমি তাদের ছেড়ে কোথায় পাবে?
এই বদদ্বীন অসংখ্য মাসআলায় নানা রকম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। মুসলিম উম্মাহের বহু ইজমার বিরোধিতা করেছে। শরীয়াতের অনেক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। "

এরপর তিনি ফিকহী বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার অনেকগুলি বিচ্ছিন্ন মতামত ও ইজমা বিরোধী সিদ্ধান্তের তালিকা উল্লেখ করেছেন।

আক্বিদার বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার ভ্রষ্টতা উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন,
"
১। সে আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বায় ধ্বংসশীল বিষয় সৃষ্টি হওয়ার আক্বিদা রাখত। (অর্থাৎ আল্লাহর এমন কিছু গুণ সাব্যস্ত করে যেগুলো আল্লাহর সত্ত্বায় সৃষ্টি হয় আবার সেটি ধ্বংসও হয়)।
২। মহান আল্লাহ এর থেকে মুক্ত ও পবিত্র। সে আল্লাহ তায়ালাকে যৌগিক বা মুরাক্কাব বিশ্বাস করে। আল্লাহর সত্ত্বার অংশগুলো একে-অপরের মুখাপেক্ষী যেমন সামগ্রিক বিষয় তার বিভিন্ন অংশের।

৩। তার মতে, পবিত্র কুরআন আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে সৃষ্টি হয়। মহান আল্লাহ এধরণের আক্বিদা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
৪। তার মতে মহাবিশ্ব সামগ্রিকভাবে অনাদি। সদা-সর্বদাই আল্লাহর সাথে কিছু সৃষ্টি ছিলো। এভাবে সে আল্লাহ তায়ালার জন্য সত্ত্বাগতভাবে সর্বদা সৃষ্টি করাকে আবশ্যক বানিয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা হলেন, তার ইচ্ছা ও ইরাদায় স্বাধীন স্রষ্টা। আল্লাহর জন্য সদা-সর্বদা সৃস্টি করা আবশ্যক নয়।

৫। আল্লাহর দেহ, দিক ও স্থানান্তরের আক্বিদা সাব্যস্ত করেছে।

৬। তার আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা পরিমাপের দিক থেকে আরশের মতই। আরশ থেকে বড়ও না আবার ছোটও না। (নাউজুবিল্লাহ)।

৭। তার মতে নবীগণ মা'সুম বা নিষ্পাপ নন।
৮। তার মতে বর্তমানে নবীজীর কোন বিশেষত্ত্ব নেই। ফলে তার ইন্তেকালের পরে তার ওয়াসিলা করা যাবে না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা গোনাহ। (বর্তমানের ওয়াহাবীরাও তার এই মত নিয়ে বেশ হৈ-চৈ করে)।

এরকম আরও অসংখ্য নাপাক ও নোংরা আক্বিদা - বিশ্বাস ছিলো তার। এজাতীয় অনেকগুলো বিষয় ইবনে হাজার মক্কী তার ফতোয়াতে উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি ইবনে তাইমিয়ার ব্যাপারে ইবনে হাজার মক্কীর আরেকটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

সর্বশেষ তিনি লিখেছেন,
"এই হলো ইবনে তাইমিয়ার অবস্থা। আর বিভিন্ন উলামায়ে কেরাম তার সম্পর্কে এধরণের ন্যাক্কারজনক বক্তব্য দিয়েছেন। সুতরাং মুসলমানদের উচিৎ এধরণের বদ-দ্বীন থেকে দূরে থাকা। তার ভ্রষ্ট চিন্তা-চেতনা থেকে বেঁচে থাকবে। যে ইয়াজীদের প্রশংসা করতে পারে, তার জন্য আলী রাজিয়াল্লাহুর ছিদ্রান্বেষণ করা অস্বাভাবিক কী? হিন্দুস্তানের লাগামহীন কিছু লোক যারা দ্বীন থেকে আজাদ হয়ে নাস্তিকদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে, তারা যদি এই ধরণের ভ্রষ্ট আক্বিদার লোকদের অনুসরণ করে, তাহলে এটি তাদের লা-মাজহাবী হওয়ার আরেকটি বিশেষ প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ও সমস্ত মুসলমানকে এধরণের বাতিল চিন্তা-ধারার লোকদের ফেতনা থেকে হেফাজত করুন"

(মাজমু ফাতাওয়া, পৃ: ৩০-৩৪)

Photos from Hasbi Academy's post 14/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৫)
(২য় অংশ)
পবিত্র কুরআনের ৫৭টি আয়াত উল্লেখ করে মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী লিখেছেন,

"শায়খ ত্বকীউদ্দীন সুবকী তার আল-ই'তিবার বিবাকাঈল জান্নাতি ওয়ান নার কিতাবে এই আয়াতগুলি উল্লেখ করে লিখেছেন, এজাতীয় অসংখ্য আয়াত রয়েছে। যা এটি প্রমাণ করে যে, কাফের সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। আর এসব আয়াত এতটাই সুস্পষ্ট যে এগুলোর ক্ষেত্রে কোন ধরণের তা'বীলও সম্ভব নয়। পরকালীন শারিরিক পুনরুত্থান বিষয়ক আয়াতের যেমন তা'বীল করা অসম্ভব, একইভাবে এই আয়াতগুলোরও তা'বীল করার কোন সুযোগ নেই।
শায়খ ত্বকিউদ্দীন সুবকী উক্ত আয়াতসমূহ উল্লেখের পর লিখেছেন, একইভাবে কাফেরদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার বিষয়ে অসংখ্য হাদীসও রয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে, যখন জান্নাতীরা জান্নাতে, জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে, তখন মৃত্যুকে ভেড়ার আকৃতিতে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে জবাই করা হবে। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসী, এখন খুলুদ বা অনন্তকাল তোমাদের গন্তব্য। কখনও আর মৃত্যু আসবে না। একইভাবে জাহান্নামীদেরকে বলবে, হে জাহান্নামীরা, এখন সদা-সর্বদা চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থানই তোমাদের গন্তব্য। এরপর আর কোন মৃত্যু নেই। একথা শুনে জান্নাবাসী সীমাহীন আনন্দিত হবে আর কাফেররা চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে যাবে।

একইভাবে অন্য হাদীসে এসেছে, সমস্ত কবিরা গোনাহকারী জাহান্নাম থেকে এক সময় বের হয়ে যাবে। শুধু তারাই জাহান্নামে থাকবে যাদেরকে কুরআন বাঁধা দিয়েছে। অর্থাৎ কাফেররাই জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে। একইভাবে হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীতে (খ:১১, পৃ: ৩৬৩) কাফেরদের উপর চিরস্থায়ী শাস্তি সংক্রান্ত হাদীস উল্লেখ করে লিখেছেন, ইমাম কুরতুবী লিখেছেন, এসমস্ত হাদীসে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে রয়েছে যে, কাফেরদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার কোন সীমা বা অন্ত নেই। কাফেররা সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। তাদের কোন মৃত্যু আসবে না। স্বস্তি বা শান্তির কোন জীবন কখনও তারা পাবে না। যেমনটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, জাহান্নামীদের উপর কখনও মৃত্যু আসবে না এবং তাদের শাস্তিও লঘু করা হবে না। আর যখনই তারা জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবে, তাদেরকে পুনরায় জাহান্নামে পাঠান হবে। এরপর ইমাম কুরতুবী বলেন, যে ব্যক্তি এই আক্বিদা রাখে যে, কাফেরদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নেয়া হবে এবং জাহান্নাম শূন্য পড়ে থাকবে কিংবা এই আক্বিদা রাখে যে, মূল জাহান্নামই ধ্বংস বা নি:শেষ হয়ে যাবে, সে ব্যক্তি দ্বীন - ইসলাম যা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে এনেছেন, সেই দ্বীন - ইসলাম থেকেই বের হয়ে যাবে (কাফের হয়ে যাবে)। এই ব্যক্তি সমস্ত আহলে সুন্নতের ঐকমত্য থেকে বের হয়ে যাবে। (ইমাম কুরতুবীর বক্তব্য শেষ হলো)।

এরপর ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, জাহমিয়াদের আক্বিদা হলো জাহান্নাম কিছুকাল পরে ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ, জাহান্নাম হলো একটি নশ্বর সৃষ্টি। আর প্রত্যেক নশ্বর সৃষ্টিই ধ্বংসশীল। কেউ কেউ এই আক্বিদা গ্রহণ করেছে যে, জাহান্নাম তো ধ্বংস হবে না, তবে কিছুকাল পরে এর শাস্তি বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর জাহান্নামীরা সেখান থেকে বের হয়ে যাবে। পববর্তীদের কেউ কেউ (অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়া) এই মত গ্রহণ করেছে। এটি একটি জঘন্য বাতিল আক্বিদা - বিশ্বাস। এই আক্বিদা তার প্রবক্তার দিকে প্রত্যাখ্যাত। ইমাম ত্বকিউদ্দীন সুবকী এই আক্বিদার একটি চমৎকার নাতি-দীর্ঘ খন্ডন লিখেছেন। (ফাতহুল বারী, খ:১১, পৃ:৩৬৩, জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচয় সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ)।

একইভাবে ইবনে হাজাম জাহেরী জান্নাত ও জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার উপর পুরো উম্মতের ইজমার কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রায় সমস্ত ফেরকা এ বিষয়ে একমত যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এবং এর পুরষ্কার ও শাস্তি কখনও শেষ হবে না। বিস্তারিত দেখুন তার আল-মিলালু ওয়ান নিহাল (খ:৪, পৃ: ৮৩)।

(মায়ারিফুল কুরআন, খ:৩, পৃ: ২৩-২৪)।

মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী মায়ারিফুল কুরআনের ২৩ পৃষ্ঠায় ত্বকিউদ্দীন সুবকীর পরিচয় দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি টীকা লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন,

"শায়খ ত্বকিউদ্দীন সুবকী হাদীস ও ফিকহের গ্রহণযোগ্য হাফিজে হাদীস ও ফকীহ। তিনি হাফেজ ইবনে তাইমিয়ার সম-সাময়িক ছিলেন। ৭৫৬ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন। ইবনে তাইমিয়া যেসকল মাসআলায় উম্মতের জমহুর থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করেছে এবং উম্মতের ইজমার বিপরীতে গিয়েছে সেসকল মাসআলায় ত্বকিউদ্দীন সুবকী ইবনে তাইমিয়ার খন্ডন করেছেন। আর তার খন্ডনগুলো সুন্দর ও প্রশংসনীয়। ত্বকিউদ্দীন সুবকীর এসব খন্ডনের মধ্যে একটি রিসালা হলো, জাহান্নামের আগুন নি:শেষ হওয়া সংক্রান্ত আক্বিদার খন্ডন। যেখানে তিনি ইবনে তাইমিয়ার জাহান্নামের আজাব নি:শেষ হওয়ার আক্বিদার খন্ডন করেছেন। উলামায়ে কেরাম তার এই রিসালাটি মোতালায়া করতে পারেন। এছাড়া ইবনে তাইমিয়া তিন তালাককে এক তালাক ফতোয়া দিয়ে ইজমায়ে সাহাবা ও তাবেয়ীনের বিরোধিতা করেছেন, তাওয়াসসুল বা ওসিলার বিরোধিতা, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মোবারক জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করাকে হারাম বলা সহ এজাতীয় অধিকাংশ বিষয়ে ত্বকিউদ্দীন সুবকী স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন। আহলে ইলমগণ সেগুলো মোতালায়া করতে পারেন"
(মায়ারিফুল কুরআন, খ:৩, পৃ: ২৩ এর টীকা)।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, ইবনে তাইমিয়ার জাহান্নামের আজাব নি:শেষ হওয়ার আক্বিদাটি বড় ধরণের কুফরী। ইমাম কুরতুবীর ভাষায় যা একজন মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দিবে। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী এবং মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী উভয়ে এই বক্তব্য সমর্থন করে সেটি উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী এই মতবাদকে রদী বা নিকৃষ্ট-জঘন্য মতবাদ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। আহলে সুন্নতের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে ইবনে তাইমিয়ার জাহান্নামের আজাব নি:শেষ হওয়ার আক্বিদাটি বড় ধরণের কুফরী আক্বিদা হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এজন্য আলাউদ্দীন বোখারী ইবনে তাইমিয়াকে কাফের বলেছেন এবং ইবনে তাইমিয়ার এসব জঘন্য আক্বিদা-বিশ্বাস জানার পরও যে তাকে শাইখুল ইসলাম (ইসলামের শায়খ) বলবে, সেও কাফের।

মোটকথা, আহলে সুন্নতের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ইবনে তাইমিয়ার এধরণের জঘন্য কুফরী আক্বিদার বিষয়ে কোন ধরণের রাখ-ঢাক ছাড়াই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে খন্ডন করেছেন। মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী একে ইয়াহুদীদের আক্বিদা - বিশ্বাসের অনুরুপ বলার পাশাপাশি ইমাম কুরতুবীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বড় ধরণের কুফরী হিসেবেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

Photos from Hasbi Academy's post 13/01/2024

নজদী-তাইমী ফেতনা মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম (১৫)
(১ম অংশ)

ইবনে তাইমিয়ার বড় বড় কুফরী আক্বিদার মধ্যে জঘন্য পর্যায়ের একটি কুফরী আক্বিদা হলো জাহান্নাম নি:শেষ হওয়ার আক্বিদা। এ বিষয়ে মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী তার বিখ্যাত তাফসীর মায়ারিফুল কুরআনে বিস্তারিত খন্ডন করেছেন। মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভীর আলোচনাটি লম্বা হলেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিচে তুলে ধরছি।

মূল আলোচনাটি সূরা আনআ'মের ১২৮ নং আয়াতকে কেন্দ্র করে। যেখানে আল্লাহ তায়ালা কাফের জিন ও ইনসানের চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থানকে নিজ ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এই আয়াত থেকে কি কখনও এই অর্থ নেয়া সম্ভব যে, আল্লাহর ইচ্ছায় এক সময় জাহান্নাম নি:শেষ হয়ে যাবে? মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে সূরা আন'আমের ১২৮ নং আয়াত ও তার অনুবাদ দেখে নেয়া যাক।

وَيَوْمَ يِحْشُرُهُمْ جَمِيعًا يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُم مِّنَ الإِنسِ وَقَالَ أَوْلِيَآؤُهُم مِّنَ الإِنسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِيَ أَجَّلْتَ لَنَا قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلاَّ مَا شَاء اللّهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَليمٌ
যেদিন আল্লাহ সবাইকে একত্রিত করবেন, হে জিন সম্প্রদায়, তোমরা মানুষদের মধ্যে অনেককে অনুগামী করে নিয়েছ। তাদের মানব বন্ধুরা বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা পরস্পরে পরস্পরের মাধ্যমে ফল লাভ করেছি। আপনি আমাদের জন্যে যে সময় নির্ধারণ করেছিলেন, আমরা তাতে উপনীত হয়েছি। আল্লাহ বলবেনঃ আগুন হল তোমাদের বাসস্থান। তথায় তোমরা চিরকাল অবস্থান করবে; কিন্তু যখন চাইবেন আল্লাহ। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। [সুরা আন’য়াম - ৬:১২৮]

মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী সূরা আন-আ'মের ১২৮-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন,

" পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও কাফেরের উদারহণ দিয়েছেন। সেখানে বলেছেন, যেসব কাফেররা মুসলমানদের সাথে বাক-বিতণ্ডা করে, তাদের সাথে ঝগড়া - ফাসাদ করে, তারা মূলত: শয়তানের প্ররোচনায় এগুলো করে। এরপর এই আয়াতগুলিতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন শয়তান ও মানুষকে একত্র করবেন। শয়তানদেরকে বলবেন, তোমরা অনেক মানুষকে বিভ্রান্ত করেছো। এরপর যারা শয়তানের অনুসরণ করেছে, তারা শয়তানদের কথার জবাব দিবে। এরপর শয়তান, জিন ও ইনসান সবার জন্য চূড়ান্ত শাস্তির ফয়সালা করা হবে।
সুতরাং আল্লাহ তায়ালা বলেন, (যেদিন আল্লাহ তায়ালা জিন ও ইনসান সবাইকে একত্র করবেন), যাতে একজন আরেকজনের প্রশ্নোত্তর ও কথোপকথন শুনতে পারে। সেদিন আল্লাহ তায়ালা সবাইকে একত্র করে বলবেন, হে জিন জাতী, (শয়তানের দল), তোমরা মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করার ক্ষেত্রে কোন সীমা-পরিসীমা অবশিষ্ট রাখোনি। অসংখ্য মানুষকে ধোঁকা ও প্রবঞ্চনার মাধ্যমে নিজেদের অনুসারী বানিয়েছো। আর এভাবে নিজেদের অনুসারীদের বড় একটি দল তৈরি করেছো। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা জিনদেরকে সরাসরি সম্বোধন করবেন এজন্য যে, ধোঁকা ও প্রতারণার ক্ষেত্রে তারা মূল। মানুষের মধ্যে যারা শয়তানের অনুসরী হয়েছে, তাদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিবে। তারা বলবে, হে পরওয়ার দিগার, নি:সন্দেহে আমরা অপরাধী। দুনিয়াতে আমরা একে-অপরের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছি। অর্থাৎ জ্বিন ও মানুষ একে-অপরের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছি। জ্বিন মানুষকে উপকৃত হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষ জ্বিনদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে, তাদের আনুগত্য স্বীকার করেছে। মানুষ জ্বিন থেকে এভাবে উপকৃত হয়েছে যে, জ্বিনেরা মানুষের প্রবৃত্তি পূজা ও কামনা-বাসনা পূরণের আশ্চর্যজনক নানা ফন্দি-ফিকির শিখিয়েছে। তাদের প্রবৃত্তিপূজা ও কামনা-বাসনাকে সৌন্দর্য্যমন্ডিত ও সুসজ্জিত করে তাদের সামনে উপস্থাপন করে তাদেরকে মুগ্ধ করেছে। এভাবে আমরা তাদের মাধ্যমে খুব মৌজ-মাস্তি করেছি। দুনিয়ার সাময়িক কাম-বাসনাকে পরকালের চিরস্থায়ী শান্তি-সুখের উপর প্রাধান্য দিয়েছি। এমনকি আমরা নিজেদের প্রবৃত্তিপূজা ও কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য বহু কষ্ট-ক্লেশ করেছি। এভাবে আমরা জ্বিন-শয়তানের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছি।
উল্টো দিকে আমাদের মাধ্যমে জ্বিন-শয়তানরা এভাবে উপকৃত হয়েছে যে, জ্বিন-শয়তানরা যখন দেখল যে, মানুষ আমাদেরকে তাদের নেতা বানিয়েছে। তারা সবাই আমাদের হুকুম ও ইশারার দাসে পরিণত হয়েছে। আমাদের নির্দেশনা তাদের মধ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এবং আম্বিয়া ও নবী-রাসূলগণ ও তাদের উত্তরসূরীদের হিদায়াত ও দিক-নির্দেশনার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপও করছে না। এভাবে আমরা উভয়ই দুনিয়ার জীবন আনন্দ - আহ্লাদে কাটিয়ে আজকের দিনে উপস্থিত হয়েছি। যা আপনি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবং একে প্রতিশ্রুতি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।
অর্থাৎ ক্বিয়ামতের দিন চলে এসেছে। যাকে আমরা অস্বীকার করতাম। মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম। আজ সেই দিন আমাদের সামনে চলে এসেছে। আমাদের চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছে। এখন যেই ফয়সালা দিবেন, সেটি আপনার মর্জি।
তখন আল্লাহ তায়ালা কাফের জিন ও মানুষকে বলবেন, তোমরা যখন তওবা ছাড়াই দুনিয়ার জীবন সমাপ্ত করে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছো, এখন তোমাদের সকলের ঠিকানা জাহান্নাম। অনুসরণকারী, অনুসরণীয়, খাদেম, মাখদুম সকলেই একই সাথে জাহান্নামে একত্রিত হবে। দুনিয়াতে তারা যেমন একত্রে ছিলো, একইভাবে দোজখেও এক সাথে থাকবে। দুনিয়াতে তাদের একত্রে অবস্থান ও একে-অপরের সাথে ওঠা-বসা যেমন তাদের আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যম ছিলো, একইভাবে দোজখে তাদের একত্রে অবস্থান তাদের লাঞ্চনা ও অপদস্তের মাধ্যম হবে। আর এই উত্তপ্ত আগুনের দোজখে তোমরা চিরস্থায়ী অবস্থান করবে। যেখান থেকে মুক্তি ও নাজাতের কোন পথ নেই। তবে আল্লাহ তায়ালা যদি কাউকে বের করতে চান। তবে সেটি ভিন্ন কথা।

উদ্দেশ্য হলো, কাফেরদের জন্য দোজখের চিরস্থায়ী ও সদা-সর্বদা আজাব চলমান থাকবে। তবে এটি আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তায়ালা চাইলে তিনি কাফেরদের আজাবকে মওকুফ করা সম্ভব, তবে তিনি কাফেরদের জন্য চিরস্থায়ী ও সদা-সর্বদা আজাবের ইচ্ছা পূর্বেই করেছেন। যার সংবাদ তিনি পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে উল্লেখ করেছেন। এবং প্রত্যেক যুগের নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে এই সংবাদ পৌঁছে দেয়া হয়েছে যে, কাফেররা সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। তারা কখনই জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।

মোটকথা, "তথায় তোমরা চিরকাল অবস্থান করবে; কিন্তু যখন চাইবেন আল্লাহ।" এখানে কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যখন চাইবেন, এই কিন্তু যোগ করার দ্বারা কাফেরদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার বিষয়টিকে আরও শক্তিশালী ও জোরালাভাবে উপস্থাপন করা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তোমরা সদা-সর্বদা জাহান্নামে পড়ে থাকবে। তোমাদের জাহান্নামের শাস্তির কোন অন্ত নেই। বাঁচার কোন রাস্তা নেই। তবে যদি আল্লাহ চান তাহলে এর অন্ত হতে পারে। ( কিন্তু সেই পথটিও তোমাদের জন্য রুদ্ধ, ফলে চিরস্থায়ী জাহান্নামে তোমাদের সদা-সর্বদা চরম লাঞ্চনা আর আজাবই তোমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য)। আয়াতের উদ্দেশ্যের সার-মর্ম হলো, যাও তোমাদের সবার ঠিকানা সদা-সর্বদা জাহান্নাম। তোমরা অনন্তকাল সেখানেই থাকবে। তবে আল্লাহ তায়ালা যদি কখনও চান তোমরা বের হতে পারতে। তবে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মতো আল্লাহ ও তার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করবেন? বরং তোমাদের মতো কাফেরদের জন্য অকাট্য বিধান পূর্বেই ফয়সালা হিসেবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় আপনার প্রভূ মহা-প্রজ্ঞাময়। তার কোন কাজই ইলম ও হিকমত শূন্য নয়। সুতরাং. কাফেরদের চিরস্থায়ী শাস্তির মধ্যেও হিকমত ও প্রজ্ঞা রয়েছে। তাদের সমস্ত পাপাচার ও অন্যায়ের পুংখানুপুংখ জ্ঞান রাখেন তিনি। যেই পর্যায়ের অপরাধ সেই পর্যায়ের শাস্তির বিধানও তিনি দিয়েছেন। সুতরাং কাফেরদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের যেই শাস্তির বিধান আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন, এটিই তাদের জন্য সবচেয়ে প্রজ্ঞা, হিকমত ও যথার্থ বিধান।

সমস্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, মুমিনদের পুরষ্কার তথা জান্নাত এবং কাফেরদের আজাব তথা জাহান্নাম চিরস্থায়ী ও অনন্তকাল থাকবে। মুমিনগণ সদা-সর্বদা জান্নাতে থাকবে এবং কাফেররা সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। মুমিনদের পুরষ্কার এবং কাফেরদের শাস্তি কখনও শেষ হবে না।

তবে পথভ্রষ্ট ফেরকা জাহমিয়াদের আক্বিদা হলো, কিছুকাল পরে জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যাবে। ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী ও তার খাস ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিমের মাজহাব হলো, জান্নাতের পুরষ্কার তো চিরস্থায়ী হবে, মুমিনগণ সদা-সর্বদা জান্নাতে থাকবেন (যেমনটি আহলে সুন্নতের মাজহাব), তবে তাদের মতে দোজখের শাস্তি চিরস্থায়ী নয়। তাদের মতে, একটি লম্বা সময় পর্যন্ত কাফেরদের উপর শাস্তি হবে যাকে আল্লাহ তায়ালা খুলুদ বা চিরস্থায়ী শব্দ দ্বারা বুঝিয়েছেন। তবে একসময় আল্লাহর রহমত ও দয়ায় কাফেরদের উপর শাস্তি শেষ হয়ে যাবে। (যেমনটি জাহমিয়াদের মাজহাব)।
ইবনে তাইমিয়ার এ মতটি সম্পূর্ণভাবে একটি বিচ্ছিন্ন মত। সমস্ত আহলে সুন্নতের ইজমার সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং পবিত্র কুরআনের অসংখ্য দ্ব্যর্থহীন - সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত। যা আমরা শীঘ্রই আলোচনা করব। মোটকথা, জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার এই মতবাদ অর্ধেক আহলে সুন্নত এবং অর্ধেক জাহমী। যা সুস্পষ্ট অকাট্য কুরআনের বিপরীত। শরীয়তের এই সকল অকাট্য বক্তব্য এমন পর্যায়ের যে এখানে কোন ধরণের তা'বীলেরও সুযোগ নেই। আর ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম যেসব দুর্বল ও জাল হাদীস পেশ করেছে এবং পূর্ববর্তীদের কিছু সম্ভাবনাময় বক্তব্যকে দলিল বানাবার চেষ্টা করেছে, এগুলো কুরআন - সুন্নাহের দ্ব্যর্থহীন অকাট্য বক্তব্যের বিপরীতে কোন মূল্যই রাখে না। সুতরাং তাদের এসব অসার দলিলের জওয়াব দেয়ার কোন প্রয়োজনও নেই।

পবিত্র কুরআনের আয়াত
প্রথম পারায় এই আয়াতের আলোচনা হয়েছে যে, "যারা অন্যায় করে এবং তাদের অন্যায়ের সীমা পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তারা জাহান্নামী। সেখানে তারা চিরস্থায়ী থাকবে।"
এছাড়া পূর্বে বেহুদা ইয়াহুদীদের এই বক্তব্যও আলোচনা করা হয়েছে যেখানে তারা বলবে, আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন সামান্য কয়েক দিনই স্পর্শ করবে।

সুতরাং যে ব্যক্তি একথা বলে যে, কিছু কাল পরে জাহান্নাম নি:শেষ হয়ে যাবে কিংবা জাহান্নামের শাস্তি শেষ হয়ে যাবে, তার এই বক্তব্য ইয়াহুদীদের ঐ বক্তব্যের মতো যেখানে তারা বলেছে, আমাদের শুধু অল্প কিছু দিন জাহান্নামের আগুনে থাকতে হবে। যতদিন বনী ইসরাইল গো-বৎস পূজা করেছিল শুধু ততোদিন আজাব ভোগ করতে হবে। এরপর নাজাত পেয়ে যাব। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের উক্ত আয়াতের ইয়াহুদীদের এই বক্তব্য খন্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াহুদীদের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। ইয়াহুদীরা বরং সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। এবং এই মূলনীতিও বলে দিয়েছেন যে, কাফের সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে। কখনও সেখান থেকে বের হতে পারবে না। ইয়াহুদীদের সাথেও এই মূলনীতির আলোকেই বিচার করা হবে। আর ইয়াহুদীদের সাথে আল্লাহ তায়ালা কোন প্রতিশ্রুনি দেননি যে, তারা শুধু কিছুকালের জন্য জাহান্নামে থাকবে। সুতরাং জাহান্নামের নি:শেষ হওয়ার বিষয়ে ইবনে তাইমিয়ার মতবাদটি ইয়াহুদীদের মত।"
(মায়ারিফুল কুরআন, খ: ৩, পৃ: ১৮-২১)

এরপর মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী পবিত্র কুরআনের ৫৭টি আয়াত উল্লেখ করেছেন কাফেরদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার বিষয়ে। এরপর তিনি পরবর্তী কয়েক পৃষ্ঠা ইবনে তাইমিয়ার আরও স্পষ্ট খন্ডন করেছেন। আগামী পোস্টে বাকী অংশ উল্লেখ করব ইনশা আল্লাহ।

মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী খুব স্পষ্ট ভাষায় ইবনে তাইমিয়ার ইয়াহুদীবাদী এজেন্ডা তুলে ধরেছেন। কীভাবে মুসলমানদের মাঝে ইবনে তাইমিয়া ইয়াহুদীদের জঘন্য কুফরী আক্বিদা প্রতিষ্ঠার চেস্টা করেছেন সেটি তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Address


Block-D, Road-3, House-35, Banasree, Rampura
Dhaka
1219