18/04/2026
🛑লিখাটা বড় কিন্তু আপনার সন্তানের ফিউচার ভাবনায় একটু সময় নিয়ে পড়বেন।🛑
আমাদের দেশে হিফজের যে পদ্ধতি প্রচলিত, তা বেশ অবৈজ্ঞানিক ও পশ্চাৎপদ।
দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থীদের ব্রেইনের জন্য ক্ষতিকর।
আর এর সাথে মড়ার উপর খড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয় বুনো স্বভাবের অপরিপক্ক শিক্ষক।
তখন হিফজ নিছক শৈশব হন্তারক থাকে না, বরং মস্তিষ্কের স্থায়ী ড্যামেজ করে আজীবনের জন্য তার ব্রেইনকে দুর্বল করে দেয়।
প্রথমেই আসি আমাদের হিফজের রুটিনে।
ভোর ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কোনো মানব মস্তিষ্ক ফোকাস ঠিক রেখে কাজ করতে পারে না। আল্লাহ ব্রেইনকে এভাবে ডিজাইনই করেন নাই।
মানুষের ব্রেইন সাধারণত দৈনিক ৪-৫ ঘণ্টা ডিপ ওয়ার্ক করতে পারে। বয়স ও অভ্যাসভেদে এতে তারতম্য হয়।
আবার এই পুরা সময়টাও একটানা না। এই সময়কে কয়েকটা চাঙ্কে বা টুকরায় ভাগ করতে হয়, প্রতিটা টুকরার মাঝে ব্রেইনকে রিল্যাক্স দিতে হয়। ডোপামিন দিতে হয়।
এভাবে মস্তিষ্কের সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
ফলে আমাদের হিফজখানাগুলোর যে টাইমিং, এটা বাই ডিফল্ট মানুষের ব্রেইনের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের জন্য তো বটেই।
মানুষের মস্তিষ্কে নতুন তথ্য ধারণ এবং সেটাকে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তরিত করার সুনির্দিষ্ট একটা মেকানিজম আছে।
যখন আমরা নতুন কিছু শিখি, তখন সেটা হিপোক্যাম্পাস নামক অংশে স্টোর হয়। তারপর ঘুমের সময় এটা ধীরে ধীরে নিওকর্টেক্স এ চলে যায়।
মানুষ জীবনে যা কিছু দেখে, শিখে, শুনে; এক কথায় মানুষের ব্রেইনে যত সিগন্যাল যায়, তার প্রতিটার মাঝে কিছু নিওরাল সংযোগ তৈরি হয়।
এখন আপনি যদি পরিমাণের বাইরে ব্রেইনকে প্রেশার দিতে থাকেন, তাহলে প্রথমে এর তথ্য ধারণক্ষমতা উপচে পড়বে, দ্বিতীয়ত নিওরাল সংযোগগুলো অতি দুর্বল হবে, যা কিছুক্ষণ পরই আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
অনেকটা ধরুন একটা বালতিতে আপনি পানি রাখেন। তারপর একটা সুনির্দিষ্ট সময়ে সেই বালতি থেকে পাইপ দিয়ে পানিগুলো সুনির্দিষ্ট বয়ামে যায়।
এখন বালতির ধারণ ক্ষমতা ৫ লিটার, আপনি ঢাললেন ২৫ লিটার, কাজ হবে? এগুলো কি বয়ামে যাবে?
যাবে না। হারিয়ে যাবে। আর এটা রেগুলার চলতে থাকলে মস্তিষ্কের ক্যাপাসিটি স্থায়ীভাবে ড্যামেজ হয়ে যাবে।
তখন সে যা কিছুই পড়ুক, সেটার নিওরাল লিঙ্কগুলো মজবুত হবে না। ফলে দ্রুতই ভুলে যাবে।
দ্বিতীয়ত আমাদের হিফজখানাগুলোর শিক্ষাদানের পদ্ধতি-মাইর না দিলে মানুষ হয় না।
পৃথিবীর প্রায় সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা এখন আনন্দদায়ক শিক্ষাপদ্ধিতে চলে গেছে। সেখানে আমরা এখনো পড়ে আছি ভীতিকর শিক্ষাপদ্ধতিতে।
সহজ ভাষায়–মানুষ যখন আনন্দিত হয়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ হয়। ডোপামিন হল আনন্দের হরমোন।
এটা আগ্রহ এবং ব্রেইনের ক্ষমতা দুই-ই বাড়ায়। যেমনটা আপনি দেখবেন ভিডিও গেইমে, আর আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া তো আছেই ডোপামিন রিলিজের জন্য।
বর্তমানে যা কিছু ডিজাইন করা হচ্ছে মানুষের শেখার জন্য, সেখানে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে মস্তিষ্কের ডোপামিন যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে রিলিজ হয়।
টাচ, স্মেল, ভিজুয়াল, হেয়ারিং–প্রতিটা সেন্সরকে স্টিমুলেট করে ডোপামিন রিলিজ করার চেষ্টা করা হয়।
গেমসের ভিতর একটা লেভেল শেষ হইলে টুংটাং একটু সাউন্ড হয়, একটা পটকা ফুটে, মোবাইলটা ভাইব্রেট করে, এর সবই হল সব সেন্সর থেকে ডোপামিন রিলিজের খেলা।
পক্ষান্তরে মারধর করলে, ভয় দেখালে, ব্রেইনে কর্টিসল রিলিজ হয়। কর্টিসল হল হতাশা ও দুঃখবোধের হরমোন। এই হরমোনই মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়। মন খারাপ করে, মুখ গোমড়া করে বসায়ে রাখে।
পরিমিত মাত্রায় কর্টিসল যদিও হেল্পফুল, কিন্তু ক্রমাগত সেটা বেশি বেশি রিলিজ হতে থাকলে ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাস অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ অইযে, আমাদের প্রাথমিক তথ্য স্টোর হওয়ার বালতি, সেটা ফুটো হয়ে যায় আরকি।
কিন্তু বাস্তবে তো দেখা যায় মাইর দিলে তাৎক্ষনিক কিছু ফলাফল পাওয়া যায়। এটা কেন?
এটা হয় ব্রেইনের ভিন্ন আরেকটা ফাংশনের কারণে।
যেমন ধরেন আপনাকে যদি দৌড়াইতে বলি, আপনি কতক্ষণ এবং কত জোরে দৌড়াইতে পারবেন?
এখন যদি একটা পাগলা কুকুর ছেড়ে দেওয়া হয়, আর কুকুর থেকে বাঁচতে আপনার দৌড়াইতে হবে, তাহলে কত জোরে দৌড়াইতে পারবেন?
অবশ্যই কুকুরের চাইতে জোরে। বিশ্বাস না হইলে ট্রাই করে দেখেন।
এর কারণ হল সাধারণত মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স নামক একটা অংশ আমাদের কার্যক্রমগুলোকে পরিচালিত করে।
কিন্তু যখন আমরা বাঁচামরার সিচুয়েশনে পড়ি, তখন এমিগডালা নামক ব্রেইনের আরেকটা অংশ সক্রিয় হয়।
এটাকে বলাই হয় ফাইট অর ফ্লাইট মোড। মানে ভাগতে হবে নয়তো লড়তে হবে। জীবনমরণ দশা।
একারণেই আমরা দেখি প্রায়ই বাঘের সাথে লড়াই করে মানুষের বেঁচে আসার গল্প। অথচ বাস্তবে মানুষ বাঘের সাথে শক্তিতে কখনোই পারার কথা না।
কিন্তু অইযে ব্রেইনের ফাইট অর ফ্লাইট মোড অন হয়ে যায়। ফলে সে দৌড়ে বাঁচতে পারলে তো পারলই, নয়তো ফাইট মোডে থাকে।
কিন্তু এখন বলেন তো, একজন মানুষ এরকম বাঘের সাথে লড়াই ঠিক কতক্ষণ করতে পারবে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা? দিনের পর দিন? অবশ্যই না।
কারণ ব্রেইনের এই অংশটা সারা শরীর থেকে সমস্ত শক্তি শুষে নিয়ে তখন ফাইট বা ফ্লাইটে নিয়োগ করে। ফলে কিছু সময়ের জন্য অস্বাভাবিক-অকল্পনীয় শক্তি চলে আসে।
বাট অই যে, যে চার্জে ২৪ ঘণ্টা চলার কথা ছিল, সেটা যদি ১০ মিনিটে শুষে নেয়, তাহলে বাকি দিন তো অবসন্ন লাগবেই।
এজন্যই আমরা এরকম সিচুয়েশনের পর প্রচন্ড দুর্বল হয়ে পড়ি। শরীর অবসন্ন হয়ে যায়।
তো এখন এটাকে হিফজের সাথে মিলান।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, পিটিয়ে, এমিগডালার মাধ্যমে ফাইট অর ফ্লাইট মোডে তার ব্রেইনকে ফাংশন করানো হচ্ছে, কর্টিসলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
এই ব্রেইন অতি অল্প সময়ে গোবরের আখড়ায় পরিণত হবে। এটাই ব্রেইনের ডিজাইন। এটাই মানব প্রকৃতি। সিম্পল।
তৃতীয়ত আমাদের দেশে যে প্যাটার্নে হিফজ করানো হয়, সেটাও বিভিন্ন দেশে প্রচলিত অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় কম ইফেক্টিভ ও কম বিজ্ঞানসম্মত।
এখানে আমরা এক পারা এক পারা করে পড়ি। কিন্তু তুরস্ক ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোতে ভিন্ন আরেকটা ধারাবাহিকতায় হিফজ করানো হয়।
প্রথমে এক পারার ২০ নাম্বার পেইজ, তারপর পরের পারার ২০ নাম্বার পেইজ, এভাবে পুরা ৩০ পারার ২০ নাম্বার পেইজ প্রথমে পড়ে।
এরপর ১৯ নাম্বার পেইজ। কিন্তু এই ১৯ নাম্বার পেইজ পড়ার সময় সে সেই পারার ২০ নাম্বার পেইজও শুনাতে হয়।
ফলে প্রতি মাসে তার পুরা ৩০ পারাই রিভাইজ দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের হিফজের ভাষায় যদি বলি–আমাদের হিফজে থাকে সবক, তারপর সাথ সবক, এরপর আমুখতা। কিন্তু টার্কিশ পদ্ধতিতে আমুখতা নেই। কারণ তার সবকটাই সাথ সবক এবং আমুখতা!
আধুনিক নিওরোসায়েন্স বলে এই পদ্ধতিটাই বিজ্ঞানসম্মত।
কারণ এখানে থাকে স্পেসড রিভিশন, এক্টিভ রিকলিং এর মত বিষয়। এই পদ্ধতিটা সাইক্লিক্যাল অর্থাৎ চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে আসে।
পক্ষান্তরে উপমহাদেশীয় পদ্ধতিতে এগুলো অনুপস্থিত। এবং এটা লিনিয়ার পদ্ধতি।
এছাড়াও আছে ঘুম এবং খাবার ইস্যু। আপনি ব্রেইনকে তুলোধুনা করতেছেন, কিন্তু তার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুই আহার্য–খাবার এবং ঘুমই পর্যাপ্ত দিচ্ছেন না! কী ভয়াবহ অবস্থা!!
একারণেই একমাত্র উপমহাদেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সবগুলো অঞ্চলের হিফজের মূল মেথড ফুল টাইম না। আরব অঞ্চলে আসরের পর মসজিদে হিফজের মজলিস বসতে শুরু করে।
ওয়েস্ট, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ বহু দেশে সকাল বা বিকালের শিফটে হিফজ হয়।
আমরা শুনে উহ-আহ করি যে বাপ্রে! আধবেলা পড়ে কীভাবে হিফজ সম্ভব??
আদতে এটাই হিফজের কার্যকর পদ্ধতি।
এজন্য বাংলাদেশেও দেখা যায় আফটার স্কুল হিফজে ফুলটাইম হিফজ বিভাগের চাইতে অল্প সময়ে হিফজ করে ফেলে অনেকে।
যাইহোক, Most Importantly ,
আল হেরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় আমাদের বাচ্চারা কিন্তু ২৪ ঘন্টাই হিফয নিয়ে পরে থাকেনা, আমরা হিফয পড়াই সায়েন্টিফিক মেথডে যার ফলে বাচ্চার ব্রেইন এর উপর কোন প্রেশার ছাড়াই হিফয সম্পন্ন করার সক্ষমতা লাভ করে। তাছাড়া, আমাদের বাচ্চাদের আমরা নিশ্চিত করি সঠিক স্লিপ ম্যানেজমেন্ট ও ১০০% হাইজেনিক খাবার ও আবাসন ব্যাবস্থা।
তাছাড়া, আমাদের বাচ্চাদের গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থায়, যার ফলে তারা হিফয এর পাশাপাশি ইংরেজি, গনিত, বিজ্ঞান, কম্পিউটার, টেকনোলজি ইত্যাদি সমসাময়িক বিষয়েও সমান পারদর্শী হয়ে উঠছে।
দোয়া রাখবেন আমাদের এ প্রচেষ্টা যেন আমরা চিরকাল অব্যাহত রাখতে পারি 🤲