Informa Legal Courses

Informa Legal Courses

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Informa Legal Courses, Education, Dhaka.

12/05/2021

জরুরি কিছু তথ্য ঃ

= ''খতিয়ান'' কি?
= ''সি এস খতিয়ান'' কি?
= ''এস এ খতিয়ান'' কি?
= ''আর এস খতিয়ান'' কি?
= ''বি এস খতিয়ান'' কি?
=“দলিল” কাকে বলে?
=“খানাপুরি” কাকে বলে?
= ''নামজারি'' কাকে বলে ?
=“তফসিল” কাকে বলে?
=“দাগ” নাম্বার/''কিত্তা'' কাকে বলে?
= “ছুটা দাগ” কাকে বলে?
= ''পর্চা'' কাকে বলে ?
= ''চিটা'' কাকে বলে ?
= ''দখলনামা'' কাকে বলে ?
= “খাজনা” ককে বলে?
= ''বয়নামা'' কাকে বলে ?
= ''জমাবন্দি'' কাকে বলে ?
= ''দাখিলা'' কাকে বলে ?
= ''DCR'' কাকে বলে ?
=“কবুলিয়ত” কাকে বলে ?
= “ফারায়েজ” কাকে বলে?
= “ওয়ারিশ” কাকে বলে?
= ''হুকুমনামা'' কাকে বলে ?
= ''জমা খারিজ'' কাকে বলে ?
= ''মৌজা'' কি/ কাকে বলে ?
= “আমিন” কাকে বলে?
= “কিস্তোয়ার” কাকে বলে?
= “সিকস্তি” কাকে বলে ?
= “পয়ন্তি” কাকে বলে?
''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''
উপরোক্ত সকল অজানা বিষয় গুলো আলোচনা করা হলঃ

=খতিয়ানঃ
মৌজা ভিত্তিক এক বা একাধিক ভূমি মালিকের ভূ-সম্পত্তির বিবরণ সহ যে ভূমি রেকর্ড জরিপকালে প্রস্ত্তত করা হয় তাকে খতিয়ান বলে। এতে ভূমধ্যাধিকারীর নাম ও প্রজার নাম, জমির দাগ নং, পরিমাণ, প্রকৃতি, খাজনার হার ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের খতিয়ানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তন্মধ্যে সিএস, এসএ এবং আরএস উল্লেখযোগ্য। ভূমি জরিপকালে ভূমি মালিকের মালিকানা নিয়ে যে বিবরণ প্রস্তুত করা হয় তাকে “থতিয়ান” বলে। খতিয়ান প্রস্তত করা হয় মৌজা ভিত্তিক।

= সি এস খতিয়ানঃ
১৯১০-২০ সনের মধ্যে সরকারি আমিনগণ প্রতিটি ভূমিখণ্ড পরিমাপ করে উহার আয়তন, অবস্থান ও ব্যবহারের প্রকৃতি নির্দেশক মৌজা নকশা এবং প্রতিটি ভূমিখন্ডের মালিক দখলকারের বিররণ সংবলিত যে খতিয়ান তৈরি করেন সিএস খতিয়ান নামে পরিচিত।

=এস এ খতিয়ানঃ
১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাসের পর সরকার জমিদারি অধিগ্রহণ করেন। তৎপর সরকারি জরিপ কর্মচারীরা সরেজমিনে মাঠে না গিয়ে সিএস খতিয়ান সংশোধন করে যে খতিয়ান প্রস্তুত করেন তা এসএ খতিয়ান নামে পরিচিত। কোনো অঞ্চলে এ খতিয়ান আর এস খতিয়ান নামেও পরিচিত। বাংলা ১৩৬২ সালে এই খতিয়ান প্রস্তুত হয় বলে বেশির ভাগ মানুষের কাছে এসএ খতিয়ান ৬২র
খতিয়ান নামেও পরিচিত।

= আর এস খতিয়ানঃ
একবার জরিপ হওয়ার পর তাতে উল্লেখিত ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য পরবর্তীতে যে জরিপ করা হয় তা আরএস খতিয়ান নামে পরিচিত। দেখা যায় যে, এসএ জরিপের আলোকে প্রস্তুতকৃত খতিয়ান প্রস্তুতের সময় জরিপ কর্মচারীরা সরেজমিনে তদন্ত করেনি। তাতে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেছে। ওই ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার জন্য সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিনে ভূমি মাপ-ঝোঁক করে পুনরায় খতিয়ান প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই খতিয়ান আরএস খতিয়ান নামে পরিচিত। সারাদেশে এখন পর্যন্ত তা সমাপ্ত না হলেও অনেক জেলাতেই আরএস খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারি আমিনরা মাঠে গিয়ে সরেজমিনে জমি মাপামাপি করে এই খতিয়ান প্রস্তুত করেন বলে তাতে ভুলত্রুটি কম লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এই খতিয়ান বি এস খতিয়ান নামেও পরিচিত।

= বি এস খতিয়ানঃ
সর্ব শেষ এই জরিপ ১৯৯০ সা পরিচালিত হয়। ঢাকা অঞ্চলে মহানগর জরিপ হিসাবেও পরিচিত।

= “দলিল” কাকে বলে?
যে কোন লিখিত বিবরণ আইনগত সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য তাকে দলিল বলা হয়। তবে রেজিস্ট্রেশন আইনের বিধান মোতাবেক জমি ক্রেতা এবং বিক্রেতা সম্পত্তি হস্তান্তর করার জন্য যে চুক্তিপত্র সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করেন সাধারন ভাবেতাকে দলিল বলে।

= “খানাপুরি” কাকে বলে?
জরিপের সময় মৌজা নক্সা প্রস্তুত করার পর খতিয়ান প্রস্তুতকালে খতিয়ান ফর্মের প্রত্যেকটি কলাম জরিপ কর্মচারী কর্তৃক পূরন করার প্রক্রিয়াকে খানাপুরি বলে।

= নামজারি কাকে বলে ?
ক্রয়সূত্রে/উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা যেকোন সূত্রে জমির নতুন মালিক হলে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারী বলা হয়।

= “তফসিল” কাকে বলে?
জমির পরিচয় বহন করে এমন বিস্তারিত বিবরণকে “তফসিল” বলে। তফসিলে, মৌজার নাম, নাম্বার, খতিয়ার নাম্বার, দাগ নাম্বার, জমির চৌহদ্দি, জমির পরিমাণ সহ ইত্যাদি তথ্য সন্নিবেশ থাকে।

= “দাগ” নাম্বার কাকে বলে? / কিত্তা কি ?
দাগ শব্দের অর্থ ভূমিখ-। ভূমির ভাগ বা অংশ বা পরিমাপ করা হয়েছে এবং যে সময়ে পরিমাপ করা হয়েছিল সেই সময়ে ক্রম অনুসারে প্রদত্ত ওই পরিমাপ সম্পর্কিত নম্বর বা চিহ্ন।
যখন জরিপ ম্যাপ প্রস্তুত করা হয় তখন মৌজা নক্সায় ভূমির সীমানা চিহ্নিত বা সনাক্ত করার লক্ষ্যে প্রত্যেকটি ভূমি খন্ডকে আলাদা আলাদ নাম্বার দেয়া হয়। আর এই নাম্বারকে দাগ নাম্বার বলে। একেক দাগ নাম্বারে বিভিন্ন পরিমাণ ভূমি থাকতে পারে। মূলত, দাগ নাম্বার অনুসারে একটি মৌজার অধীনে ভূমি মালিকের সীমানা খূটিঁ বা আইল দিয়ে সরেজমিন প্রর্দশন করা হয়। দাগকে কোথাও কিত্তা বলা হয়।

= “ছুটা দাগ” কাকে বলে?
ভূমি জরিপকালে প্রাথমিক অবস্থায় নকশা প্রস্তুত অথবা সংশোধনের সময় নকশার প্রতিটি ভূমি এককে যে নাম্বার দেওয়া হয় সে সময় যদি কোন নাম্বার ভুলে বাদ পড়ে তাবে ছুটা দাগ বলে। আবার প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দুটি দাগ একত্রিত করে নকশা পুন: সংশোধন করা হয় তখন যে দাগ নাম্বার বাদ যায় তাকেও ছুটা দাগ বলে।

= পর্চা কীঃ / “পর্চা” কাকে বলে?
ভূমি জরিপকালে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রস্তত করার পূর্বে ভূমি মালিকদের নিকট খসড়া খতিয়ানের যে অনুলিপি ভুমি মালিকদের প্রদান করা করা হয় তাকে “মাঠ পর্চা” বলে। এই মাঠ পর্চা রেভিনিউ/রাজস্ব অফিসার কর্তৃক তসদিব বা সত্যায়ন হওয়ার পর যদি কারো কোন আপত্তি থাকে তাহলে তা শোনানির পর খতিয়ান চুড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। আর চুড়ান্ত খতিয়ানের অনুলিপিকে “পর্চা” বলে।

= চিটা কাকে বলে?
একটি ক্ষুদ্র ভূমির পরিমাণ, রকম ইত্যাদির পূর্ণ বিবরণ চিটা নামে পরিচিত। বাটোয়ারা মামলায় প্রাথমিক ডিক্রি দেয়ার পর তাকে ফাইনাল ডিক্রিতে পরিণত করার আগে অ্যাডভোকেট কমিশনার সরেজমিন জমি পরিমাপ করে প্রাথমিক ডিক্রি মতে সম্পত্তি এমনি করে পক্ষদের বুঝায়ে দেন। ওই সময় তিনি যে খসড়া ম্যাপ প্রস্তুত করেন তা চিটা বা চিটাদাগ নামে পরিচিত।

= দখলনামা কাকে বলে?
দখল হস্তান্তরের সনদপত্র। সার্টিফিকেট জারীর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি কোনো সম্পত্তি নিলাম খরিদ করে নিলে সরকার পক্ষ সম্পত্তির ক্রেতাকে দখল বুঝিয়ে দেয়ার পর যে সনদপত্র প্রদান করেন তাকে দখলনামা বলে।
সরকারের লোক সরেজমিনে গিয়ে ঢোল পিটিয়ে, লাল নিশান উড়ায়ে বা বাঁশ গেড়ে দখল প্রদান করেন। কোনো ডিক্রিজারির ক্ষেত্রে কোনো সম্পত্তি নিলাম বিক্রয় হলে আদালত ওই সম্পত্তির ক্রেতাকে দখল বুঝিয়ে দিয়ে যে সার্টিফিকেট প্রদান করেন তাকেও দখলনামা বলা হয়। যিনি সরকার অথবা আদালতের নিকট থেকে কোনো সম্পত্তির দখলনামা প্রাপ্ত হন, ধরে নিতে হবে যে, দখলনামা প্রাপ্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে দখল আছে।

= “খাজনা” ককে বলে?
সরকার বার্ষিক ভিত্তিতে যে প্রজার নিকট থেকে ভূমি ব্যবহারের জন্য যে কর আদায় করে তাকে খাজনা বলে।.

= বয়নামা কাকে বলে?
১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের ৯৪ নিয়ম অনুসারে কোনো স্থাবর সম্পত্তির নিলাম বিক্রয় চূড়ান্ত হলে আদালত নিলাম ক্রেতাকে নিলামকৃত সম্পত্তির বিবরণ সংবলিত যে সনদ দেন তা বায়নামা নামে পরিচিত।
বায়নামায় নিলাম ক্রেতার নামসহ অন্যান্য তথ্যাবলি লিপিবদ্ধ থাকে। কোনো নিলাম বিক্রয় চূড়ান্ত হলে ক্রেতার অনুকূলে অবশ্যই বায়নামা দিতে হবে।
যে তারিখে নিলাম বিক্রয় চূড়ান্ত হয় বায়নামায় সে তারিখ উল্লেখ করতে হয়।

= জমাবন্দিঃ
জমিদারি আমলে জমিদার বা তালুকদারের সেরেস্তায় প্রজার নাম, জমি ও খাজনার বিবরণী লিপিবদ্ধ করার নিয়ম জমাবন্দি নামে পরিচিত। বর্তমানে তহশিল অফিসে অনুরূপ রেকর্ড রাখা হয় এবং তা জমাবন্দি নামে পরিচিত।

= দাখিলা কাকে বলে?
সরকার বা সম্পত্তির মালিককে খাজনা দিলে যে নির্দিষ্ট ফর্ম বা রশিদ ( ফর্ম নং১০৭৭) প্রদান করা হয় তা দাখিলা বা খাজনার রশিদ নামে পরিচিত।
দাখিলা কোনো স্বত্বের দলিল নয়, তবে তা দখল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে।

= DCR কাকে বলে?
ভূমি কর ব্যতিত আন্যান্য সরকারি পাওনা আদায় করার পর যে নির্ধারিত ফর্মে (ফর্ম নং ২২২) রশিদ দেওয়া হয় তাকে DCR বলে।

=“কবুলিয়ত” কাকে বলে?
সরকার কর্তৃক কৃষককে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রস্তাব প্রজা কর্তৃক গ্রহণ করে খাজনা প্রদানের যে অঙ্গিকার পত্র দেওয়া হয় তাকে কবুলিয়ত বলে।

= “ফারায়েজ” কাকে বলে?
ইসলামি বিধান মোতাবেক মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টন করার নিয়ম ও প্রক্রিয়াকে ফারায়েজ বলে।

= “ওয়ারিশ” কাকে বলে?
ওয়ারিশ অর্থ উত্তরাধিকারী । ধর্মীয় বিধানের অনুয়ায়ী কোন ব্যক্তি উইল না করে মৃত্যু বরন করলেতার স্ত্রী, সন্তান বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে যারা তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে মালিক হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে ওয়ারিশ বলে।

= হুকুমনামা কাকে বলে?
আমলনামা বা হুকুমনামা বলতে জমিদারের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত নেয়ার পর প্রজার স্বত্ব দখল প্রমাণের দলিলকে বুঝায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে জমিদার কর্তৃক প্রজার বরাবরে দেয়া জমির বন্দোবস্ত সংক্রান্ত নির্দেশপত্রই আমলনামা।

= জমা খারিজ কিঃ
জমা খারিজ অর্থ যৌথ জমা বিভক্ত করে আলাদা করে নতুন খতিয়ান সৃষ্টি করা। প্রজার কোন জোতের কোন জমি হস্তান্তর বা বন্টনের কারনে মূল খতিয়ান থেকে কিছু জমি নিয়ে নুতন জোত বা খতিয়ান খোলাকে জমা খারিজ বলা হয়। অন্য কথায় মূল খতিয়ান থেকে কিছু জমির অংশ নিয়ে নতুন জোত বা খতিয়ান সৃষ্টি করাকে জমা খারিজ বলে।

= “মৌজা” কাকে বলে?
CS জরিপ / ক্যাডষ্টাল জরিপ করা হয় তখন থানা ভিত্তিক এক বা একাধিক গ্রাম, ইউনিয়ন, পাড়া, মহল্লা অালাদা করে বিভিন্ন এককে ভাগ করে ক্রমিক নাম্বার দিয়ে চিহ্তি করা হয়েছে। আর বিভক্তকৃত এই প্রত্যেকটি একককে মৌজা বলে।। এক বা একাদিক গ্রাম বা পাড়া নিয়ে একটি মৌজা ঘঠিত হয়।

= “আমিন” কাকে বলে?
ভূমি জরিপের মাধ্যমে নক্সা ও খতিয়ান প্রস্তত ও ভূমি জরিপ কাজে নিজুক্ত কর্মচারীকে আমিন বলে।

= “কিস্তোয়ার” কাকে বলে?
ভূমি জরিপ কালে চতুর্ভুজ ও মোরব্বা প্রস্তত করার পর সিকমি লাইনে চেইন চালিয়ে সঠিকভাবে খন্ড খন্ড ভুমির বাস্তব ভৌগলিক চিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে নকশা প্রস্তুতের পদ্ধতিকে কিস্তোয়ার বলে।

= “সিকস্তি” কাকে বলে?
নদী ভাংঙ্গনের ফলে যে জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যায় তাকে সিকন্তি বলে। সিকন্তি জমি যদি ৩০ বছরের মধ্যে স্বস্থানে পয়ন্তি হয় তাহলে সিকন্তি হওয়ার প্রাক্কালে যিনি ভূমি মালিক ছিলেন তিনি বা তাহার উত্তরাধিকারগন উক্ত জমির মালিকানা শর্ত সাপেক্ষ্যে প্রাপ্য হবেন।

= “পয়ন্তি” কাকে বলে?
নদী গর্ভ থেকে পলি মাটির চর পড়ে জমির সৃষ্টি হওয়াকে পয়ন্তি বলে।

15/01/2021

#জুডিসিয়ারী প্রস্তুতি।

#রীট কি?রীটের উৎপত্তি হয়েছে কোথা থেকে?রীট পিটিশন (Writ Petition) কি?রীট জারীর এখতিয়ার কোন আদালতের?রীটের প্রকারভেদ আলোচনা করুন।হাইকোর্ট বিভাগ স্ব-উদ্যোগে[suo motu] রীট জারি করতে পারে কিনা?রীট সম্পর্কিত বিখ্যাত মামলা সম্পর্কে বলুন।

#রীট[Writ]:
রীট শব্দটির অর্থ হলো আদালত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ঘোষিত আদেশ। সর্বপ্রথম রীট (Writ) শব্দটির উৎপত্তি হয় বৃটেনে। বৃটেনের রাজা বা রানী তাদের কর্মচারী বা অফিসারদেরকে নিজ নিজ কার্যাবলী পালনে বাধ্য করার জন্য বা কোন অবৈধ কাজ করা থেকে বিরত রাখার জন্য রীট জারী করত। পরবর্তীতে রাজা বা রানীর এই বিশেষাধিকার নাগরিকদের অধিকারে চলে আসে। নাগরিকগণ সরকারী কর্মকর্তাদের আচরণে ও কাজে সংক্ষুব্ধ হয়ে রাজার কাছে আসত এবং রাজা বিশেষাধিকারবলে তার অফিসারদের উপর রীট জারি করত। এক কথায় রীট হল এমন এক আদেশ যার মাধ্যমে আদালত কোন ব্যক্তিকে কোন কাজ করতে বা করা হত বিরত থাকতে নির্দেশ প্রদান করে।

#রীট পিটিশন (Writ Petition):
সংক্ষুব্ধ কোন ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিকার প্রাপ্তির জন্য যে পিটিশন দায়ের করে, তা রীট পিটিশন নামে পরিচিত। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পিটিশন (আবেদন) দায়ের করতে পারে। রীট পিটিশন দায়ের করা একটি মৌলিক অধিকার। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অথবা তার পক্ষে কোন ব্যক্তি অধিকারবলে (as of right) রীট পিটিশন দায়ের করতে পারে। মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য আদালত ৫ ধরনের আদেশ দিতে পারেন। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে দেওয়া এই ৫ ধরনের আদেশকে রীট আদেশ বলা হয়ে থাকে।

#রীট জারীর এখতিয়ার:
সংবিধান শুধুমাত্র হাইকোর্ট বিভাগকে একটি ক্ষেত্রে আদি এখতিয়ার দিয়েছে। আদি এখতিয়ার মানে বিচারিক আদালত হিসেবে যে এখতিয়ার প্রয়োগ করা হয়। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ যে এখতিয়ার প্রয়োগ করে তা রীট এখতিয়ার নামে পরিচিত।

#রীটের প্রকারভেদ:

বাংলাদেশ সংবিধানে পাঁচ ধরনের রীটের কথা বলা আছে।যথা:
(১) Writ of Habeas Corpus (হেবিয়াস কর্পাস)
(২) Writ of Mandamus (ম্যান্ডামাস)
(৩) Writ of Prohibition (প্রহিবিসন)
(৪) Writ of Certiorari ( ছারসিওরারি)
(৫) Writ of Quo Warranto (কুয়া ওয়ারেন্টো)

(১) বন্দী প্রদর্শন রীট (Writ of Habeas Corpus): যখন কোন ব্যক্তিকে বেআইনীভাবে আটক করা হয়,তখন বন্দী হাজির রীট পিটিশন দায়ের করা যায়। কোন ব্যক্তিকে সরকার বা অন্য কেউ আটক করলে কি কারণে তাকে আটক করা হয়েছে তা জানার জন্য বন্দীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ আটককারীকে যে আদেশ দিয়ে থাকেন তাকে বন্দী প্রদর্শন রীট বলে। অবৈধভাবে কাউকে যেন আটক করা না হয়, সেজন্য বন্দী প্রদর্শন রীট জারী করা হয়। তাছাড়া নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করার জন্য ও এই রীট জারী করা হয়।

(২) হুকুম জারী রীট (Writ of Mandamus): হুকুম জারী রীটের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ট্রাইব্যুনাল বা আদালতকে আইনগত দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিতে পারে। তার মানে কোন অধস্তন আদালত, ট্রাইব্যুনাল, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তার আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ যে আদেশের মাধ্যমে উক্ত আইনগত দায়িত্ব পালন করতে উক্ত আদালত বা ট্রাইব্যুনালকে বাধ্য করে তাকে হুকুম জারী রীট বলে। হুকুম জারী রীটের আরেক নাম পরমাদেশ রীট।

(৩) নিষেধাজ্ঞামূলক রীট (Writ of Prohibition): এই রীটের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ট্রাইব্যুনাল কিংবা আদালতকে বেআইনী কাজ থেকে বিরত থাকতে আদেশ দিতে পারে। বৃটেনে নিষেধাজ্ঞামূলক রীটকে বিচার বিভাগীয় রীট বলা হয়। কারণ এই রীট শুধু মাত্র কোন বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যায়। যেমন- আইন কমিশনকে আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা বলা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে নিষেধাজ্ঞামূলক রীটকে আর বিচার বিভাগীয় রীট বলা যায় না। কারণ ইহা বর্তমানে বাংলাদেশে যেকোন ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যায়।

(৪) উৎপ্রেষণ রীট(Writ of Certiorari): অধস্তন আদালত ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ করেছে কিনা তা তদারকি করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক এই রীট জারী করা হয়।কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল,ব্যক্তি বা সংস্হা যদি তার আইনগত ক্ষমতাকে লংঘন করে কিংবা principle of natural justice যদি ভঙ্গ করে তবে হাইকোর্ট বিভাগ যে আদেশের মাধ্যমে উক্ত কাজ নাকচ করে দেয় তাকে উৎপ্রেষণ রীট বলে।

নোট: নিষেধাজ্ঞামূলক রীট ও উৎপ্রেষণ রীটের মধ্যে পার্থক্য আছে। যখন কোন কর্তৃপক্ষ বেআইনী কাজ করেনি কিন্তু করতে উদ্যত হচ্ছে তখন নিষেধাজ্ঞামূলক রীট জারী করা হয়। আর যেখানে কোন কর্তৃপক্ষ বেআইনী কাজ করে ফেলেছে সেখানে উৎপ্রেষণ রীট জারী করা হয়। তার মানে নিষেধাজ্ঞামূলক রীট হল প্রতিরোধক (Preventive) আর উৎপ্রেষণ রীট হল সংশোধক (Curative)। নিষেধাজ্ঞামূলক রীট ক্ষমতা বহির্ভূত কাজকে শুরুতেই বাধা প্রদান করে। আর Writ of Certiorari এর উদ্দেশ্য হল ক্ষমতা বহির্ভূত কাজকে বাতিল বা নাকচ করে দেয়া।

(৫) কারণ দর্শাও রীট (Writ of Quo Warranto): কোন ব্যক্তি যদি এমন কোন সরকারী পদ দাবী করে, যে পদের যোগ্যতা তার নেই অথবা অবৈধভাবে যদি কোন সরকারী পদ দখল করে বসে থাকে, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ যে আদেশের মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তিকে তার পদ দখলের বা দাবীর কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়ে থাকে তাকে কারণ দর্শাও রীট বলে। এই রীটের মাধ্যমে উচ্চ আদালত সরকারী পদ দাবীর বৈধতা অনুসন্ধান করে। সরকারী পদের দাবী অবৈধ প্রমাণিত হলে উচ্চ আদালত তাকে পদচ্যুত করার নির্দেশ দিতে পারে। একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন। কারণ দর্শাও রীট যেকোন ব্যক্তি করতে পারে। এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে সংক্ষুব্ধ (aggrieved) হবার প্রয়োজন নেই। দাবীকৃত সরকারী পদটি অবশ্যই সংবিধান বা আইন দ্বারা সৃষ্ট পদ হতে হবে।
নোট: তিন ধরনের রীট একমাত্র সংক্ষুব্ধ(aggrieved) ব্যক্তি করতে পারে। অন্য কোন ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষ হয়ে এই তিন ধরণের রীট করতে পারে না। রীটের নামগুলো হল হুকুমজারী রীট, নিষেধাজ্ঞামূলক রীট এবং উৎপ্রেষণ রীট। এই তিনটি রীট একমাত্র সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিই করতে পারে। অপরদিকে বন্দী প্রদর্শন রীট এবং কারণ দর্শাও রীট যেকোন ব্যক্তির আবেদনক্রমে হতে পারে। এই দুইটি রীট করতে কোন ব্যক্তিকে সংক্ষুব্ধ হবার প্রয়োজন নেই।

#হাইকোর্ট বিভাগের স্ব-উদ্যোগে[suo motu] রীট জারি করার এখতিয়ার:

কোন পত্র বা তথ্যে বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট বিভাগের স্ব-উদ্যোগে[suo motu] রীট জারি করার এখতিয়ার সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে বলা নেই।তবে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ The Supreme Court of Bangladesh(High Court Division) Rules,1973 এর ১০ বিধি অনুযায়ী কোন পত্র বা তথ্যে বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট বিভাগ স্ব-উদ্যোগে[suo motu] রীট জারি করতে পারে।এটাকে হাইকোর্ট বিভাগের Epistolary Jurisdiction বলা হয়।তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই জনগণের মারাত্নক ক্ষতি হতে যাচ্ছে বলে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হতে হবে।Tayeeb vs Bangladesh (২০১৫) মামলায় আপীল বিভাগ মতামত দেন,কারো মৌলিক অধিকার লংঘন হলে হাইকোর্ট বিভাগ স্ব-উদ্যোগে[Suo motu] রীট জারী করতে পারে।তবে এক্ষেত্রে great public importance থাকতে হবে।সংবাদপত্রের রিপোর্ট, কোন তথ্যকে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক এক্ষেত্রে রীট এপ্লিকেশন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

#রীট সম্পর্কিত বিখ্যাত মামলা:

*মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ (১৯৯৬)
এই মামলা ফ্যাপ-২০ (পরিবেশ বিষয়ক) মামলা নামেও পরিচিত। এই মামলার রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনস্বার্থমূলক মামলা (Public Interest Litigation) করার আনুষ্ঠানিক দ্বার খুলে যায়। আপীল বিভাগ এই মামলায় বলেন-“Aggrieved Person” কথাটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বুঝায় না বরং এটা জনসাধারণ পর্যন্ত বিস্তৃত। তার মানে “Aggrieved Person” বলতে জোটবদ্ধ বা সমষ্টিগত ব্যক্তিকে বওভেরাল*মোখলেছুর রহমান বনাম বাংলাদেশ [২৬ DLR ১৯৭৪,(AD)৪৪]

রীটের জন্য আবেদন প্রসঙ্গে “সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি” কথাটি এই মামলায় উদারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আবেদনকারী ব্যক্তি কাজী মুখলেছুর রহমান বাংলাদেশের বেড়ুবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। হাইকোর্ট বিভাগ আবেদনটিকে অসময়োচিত (Pre-mature) বলে খারিজ করে দেন। আপীল বিভাগ আবেদনকারীর আবেদন করার যোগ্যতাকে [লোকাস স্ট্যান্ডি(Locus Standi) বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি] বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বৈধতা দেয়।

চাকুরী থেকে অপসারিত একজন সরকারী কর্মচারী তার অপসারণের বিরুদ্ধে রীট দায়ের করতে পারে কিনা?
আমরা জানি সরকারী চাকুরী সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল নিষ্পত্তি করেন।চাকুরী থেকে অপসারিত একজন সরকারী কর্মচারী ইচ্ছা করলে তার অপসারণের বিরুদ্ধে উৎপ্রেষণ রীট (Writ of Certiorari) দায়ের করতে পারেন। এই রীটের মূল কথা হলো, কোন অধস্তন আদালত, ট্রাইব্যুনাল, কর্তৃপক্ষ, সংস্থা বা ব্যক্তি তার আইনগত ক্ষমতাকে লঙ্ঘন করে কিংবা স্বাভাবিক ন্যায়-নীতি ভঙ্গ করে তবে হাইকোর্ট বিভাগে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন করতে পারেন। এই ধরনের আবেদনের উপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট বিভাগ অপসারণ আদেশ বৈধ কিনা তা যাচাই করে দেখতে পারেন। সরকারী কর্মকর্তাকে যদি অন্যায়ভাবে অপসারণ করা হয়ে থাকে তাহলে উক্ত অপসারণ আদেশকে হাইকোর্ট বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন।

06/10/2020

বিচারক স্বল্পতায় ন্যায়বিচারের আহাজারিঃ
Abdullah Al Mamun স্যার
অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট,
বান্দরবান।

বাংলাদেশে মোট উপজেলার সংখ্যা ৪৯২। তাহলে, এই উপজেলার সংখ্যা হিসেবে বাংলাদেশের মোট সহকারী জজ ৪৯২, সিনিয়র সহকারী জজ ৪৯২, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৪৯২, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৪৯২, উপজেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ৪৯২ হওয়া উচিত। এটা নিয়েইতো স্রেফ সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, লিগ্যাল এইড অফিসার- লেভেলে বিচারকের সংখ্যা ২৪৬০ জন হওয়া উচিত। তাহলে, এই মুহুর্তে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) সর্বমোট বিচারকের সংখ্যা কেন মাত্র ১৭০০/১৮০০? বাকী বিচারকরা কোথায়? যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সংখ্যা কেন এতো কম?

নতুন আইন হয়। নতুন আইনে নতুন আদালত থাকে। কিন্তু, নতুন বিচারক বা নতুন আদালত প্রয়োজন হয় না। তাই, কড়া কড়া ভয়ংকর ভয়ংকর নতুন আইন হয়। লেকচার হয়। আশাবাদ হয়। সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হয়। কিন্তু, নতুন আদালত বা অধিক সংখ্যক বিচারক আর হয় না। পুরোনো সেই আদালত আর বিদ্যমান বিচারকদের উপরই নতুন আইনের নতুন আদালতগুলোর ভার চাপানো করুণভাবে চাপানো হয়।

যেমন ধরুণ- অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনাল, পারিবারিক আদালত, স্মল কজেজ কোর্ট, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক। এগুলো চাপানো হয়েছে সহকারী বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের উপর। এই আদালতে যথাক্রমে ২ লাখ ও ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের দেওয়ানী মামলা দায়ের করা হয়। এই আদালতগুলো আবার গ্রাম আদালতের আপীল শুনেন। আবার, দ্রুত বিচার আদালত, বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত, স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (পরিবেশ) আদালত, বন আদালত এগুলো সব চাপানো হয়েছে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উপর। আলাদা আদালতের ভারগুলো চাপানোর ফলে এই আদালতগুলো মামলার ভারে জর্জরিত।

যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৪ লাখ টাকার উপরে অসীম সংখ্যা পর্যন্ত মূল্যমানের মামলা দায়ের হয়। এই আদালত আবার অর্থ ঋণ আদালত হিসেবে কাজ করে। এই আদালতই আবার সহকারী জজের আপীলও শুনেন। যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত আবার ফৌজিদারী মামলারও বিচার করেন। তিনি আবার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল। অস্ত্র মামলাসহ গুরুতর অপরাধের বিচার করেন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও আপীল শুনেন। দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় মামলা বিচার করেন। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল হিসেবেও তিনি কাজ করেন। এই পদমর্যাদার কর্মকর্তা দ্বারা নতুন হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মাদক ট্রাইব্যুনাল হওয়ার কথা। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এই ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব ফেরত দেয়া হয়েছে। কারণ, আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার্য হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক আইনে মোবাইল কোর্ট করার ক্ষমতা হারাবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ন্যায় বিচারের স্বার্থে মাননীয় হাইকোর্ট তাই এক রায়ের মাধ্যমে মাদকের মামলার বিচার করার জন্য জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব ফৌজদারী আদালতকে নির্দেশনা দিয়েছেন। ৬৪ বা তার বেশি ” মাদক ট্রাইব্যুনাল” আর হয়নি। আর কখনো হবেও না। সুতরাং, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা শুধুমাত্র নতুন আইনের প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে। জিরো টলারেন্স অনুযায়ী জিরোটা (শুন্য) আদালতও গঠিত হয়নি। প্রচলিত ম্যাজিস্ট্রেট এবং দায়রা আদালতের উপরেই ভার চাপানো হয়েছে। আমরা শুনেছি ট্রাইব্যুনাল গঠন সংক্রান্ত বিধান বাদ দিয়ে মাদক আইনই সংশোধন করার প্রস্তুতি চলছে। অচিরেই সেটাও হয়তো হয়ে যাবে।

নতুন শিশু আইন, ২০১৩ প্রনীত হয়েছে। সেটার ভার আগে চাপানো হয়েছিলো অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের উপর। বর্তমানে চাপানো হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের উপরে। অথচ রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে চমৎকার শিশু আইন করার বোধে আত্মতৃপ্ত হয়। কিন্তু, আলাদা শিশু আদালত আর গঠিত হয়নি।

জেলা ও দায়রা জজ আদালত একটি জেলার সর্বোচ্চ আদালত। এই আদালতের বিচারক পদাধিকারবলে সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল। তিনি দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলার আপীল, রিভিশন শুনেন। সকল ম্যাজিস্ট্রেটের তিনি আপীলেট, রিভিশনাল অথরিটি। জেলার সিভিল সার্জন প্রশাসনিক কাজ করেন। নিজেই চিকিৎসা প্রদান করেন এমন শোনা যায়নি। পুলিশ সুপার বা জেলা প্রশাসক তার অধঃস্তন অফিসারদের পরিচালনা করেন।মিটিং করেন।সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। কিন্তু, জেলা ও দায়রা জজকে একাধারে প্রশাসনিক কাজ সহ বিচার কাজও করতে হয়। তিনি আবার পদাধিকারবলে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সভাপতি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল না থাকলে তিনিই আবার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল হিসেবে বিচার কাজ পরিচালনা করেন।

আবার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এর উপর মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের বোঝা চাপানো হয়েছে। আমরা এখনো প্রয়োজনীয় সংখ্যাক মানব পাচার ট্রাইবুনাল, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুন্যাল, সাইবার ট্রাইব্যুনাল, শিশু আদালত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই আদালতগুলোর দায়িত্ব অন্য আদালতের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। জেলা ও দায়রা জজের কাজের পরিধি হিসেব করে দেখা গেছে তিনি বিচারিক ও প্রশাসনিক কাজ মিলে মোট ৪০ ধরনের কাজের সাথে জড়িত। এই মূহুর্তে আমাদের দরকার জেলা ও দায়রা জজের সিভিল ও ক্রিমিনাল জুরিসডিকশন আলাদা করে দিয়ে প্রত্যেক জেলায় পৃথক দুজন জেলা সেসন’স জজ ও জেলা সিভিল জজের নেতৃত্বে দুটি আলাদা বিচারিক কাঠামো তৈরি করা। প্রতিবেশী দেশগুলো করেছে, সুফলও পাচ্ছে। আমাদেরও করা অতি জরুরি। সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজরা সহায়ক কর্মচারী স্টেনো টাইপিস্ট দাবী করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত যে কয়েকটি যুগ্ম জেলা জজের পদ সৃষ্টি হয়েছে তাতে সহায়ক পর্যাপ্ত কর্মচারীর পদ নেই। অন্য আদালত থেকে ধার করা স্টাফ দিয়েছিলেন তালি-জোড়া দিয়ে চলছে।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মাত্র একজন। তাকে একহাতে সব সামলাতে হয়। লিগ্যাল এইড দিতে হয়। আপোষ-মীমাংসা বৈঠক করতে হয়। মিটিং করতে হয়। উপজেলা ভিজিট করতে হয়। উপজেলায় মিটিংও করতে হয়। এখানে জরুরী ভিত্তিতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে আপাতত একজন অতিরিক্ত জেলা জজ, সাথে একজন যুগ্ম জেলা জজ ও সিনিয়র সহকারী জজ পদায়ন করা দরকার। কিন্তু, আশা করা ছাড়া আর কি করার আছে? তাই, প্রশাসনসহ অন্যান্য সকল অফিস সুবিন্যস্ত হলেও আদালত অগোছালো, অবিন্যস্ত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে।

ধরুন একটি জেলায় উপজেলা ৮টা। তাহলে সহকারী জজ কয়জন থাকার কথা? ৮ জন? ৮ জনের আশা বাদ দিয়ে ধরুন ৪ জন। সিনিয়র সহকারী জজ কয়জন থাকার কথা? আবার ধরে নিন ৪ জন। তাহলে, ঐ জেলায় নিদেন পক্ষে সহকারী ও সিনিয়র সহকারী জজ আদালত অন্তত ৮টি হওয়ার কথা। অতিরিক্ত আশাবাদী হলে ১৬টি আদালত থাকার কথা। আদালত পাড়ায় খবর নিয়ে দেখুন। সর্বসাকুল্যে হয়তো ৪ জন সহকারী বা সিনিয়র সহকারী জজ আছেন। যেমন- বান্দরবানে ১ জন মাত্র সিনিয়র সহকারী জজ আছেন। সহকারী জজ আদালতই নেই। ধরুন, তারা ৪ জন মিলে ৮ উপজেলার মামলা সামলাচ্ছেন। ৮ জন ওসি, ৮জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, ৮ জন ইউ এন ও, ৮ জন এসি ল্যান্ড থাকতে পারলে ৮টি উপজেলার জন্য ৮ জন বিচারক কেন থাকবেন না? ৮ টি উপজেলায় কেন ৮ জন লিগ্যাল এইড অফিসার থাকবে না। ৮ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে না? কেন প্রয়োজনের চেয়ে অতি মাত্রায় কম বিচারক নিয়ে আদালত চালাতে হবে? কেন একজন সহকারী জজকে দিয়ে আটটি উপজেলার দেওয়ানী মামলা বিচার করানো হবে? কেন একজন বিচারককে ৫/১০ হাজার মামলা বিচার করতে হবে?

হাইকোর্ট বলে দিয়েছে মাসে কয়টা মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সব মিলিয়ে হয়তো ১০টা মামলা। কিন্তু, একজন বিচারক মাসে ৩০/৪০/৬০ মামলা নিষ্পত্তি করেন। এমনকি ১০০ এর উপরে মামলা নিষ্পত্তি করেন এমন বিচারকও আছেন। একজন বিচারক যদি হাইকোর্ট নির্ধারিত মামলা নিষ্পত্তি করেন, তবে ১০ হাজার মামলা কে নিষ্পত্তি করবে? তাহলে ১ জনের জায়গায় ১০ জন বিচারক দিলে কি ১০ গুণ নিষ্পত্তি হতো না! অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে একজন বিচারকের কাছে ৫০০ এর বেশি মামলা নেই। তাদের বিচারকরা আমাদের মামলার সংখ্যা শুনে শুধু অবাক হয়। বিস্ময় প্রকাশ করে। হয়তো বাংলাদেশের বিচারকদের তারা এলিয়েন ভাবেন। আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিপুল সংখ্যক বিচারক প্রাপ্তির প্রত্যাশা করতে পারি। কিন্তু, সে জায়গায় আমরা ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ মামলা তৈরি করতে পারে এমন ভূমি আইনের খসড়া দেখতে পাচ্ছি।

পৃথিবীর আর কোন দেশে এত সীমিত বরাদ্দ, সীমিত অবকাঠামো, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, সীমিত বিচারক দিয়ে এত অধিক সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির বা বিচার বিভাগ পরিচালনার নজীর আর দ্বিতীয়টি নেই। পাশের দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান কিংবা ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিচার বিভাগের বিচারকের সংখ্যা আমাদের থেকে অনেক বেশি। একজন বিচারকের কাঁধে এতগুলো অতিরিক্ত আদালতের বিচারের ভার তুলে দিয়ে কেউ যদি বলেন বিচারকগণ কাজ করেন না, তবে আর বলার কিছু নেই। মনে রাখা দরকার বিচারকগণও রক্ত মাংসের মানুষমাত্র। তারা কেউ সুপার কম্পিউটার নন।

বিলম্বিত বিচার বা কথিত বিচারহীনতা নিয়ে সবাই সরব। কিন্তু, বিলম্ব বিচার কেন হয় সেটা নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করে না। বিচারকরা অন্য যে কোন সার্ভিস থেকে আলাদা। অন্য সার্ভিস কলম বিরতি বা কর্ম বিরতিতে যেতে পারে৷কিন্তু বিচারকরা পারেন না। প্রতিবাদও করতে পারেন না। দাবী-দাওয়াও তুলতে পারেন না। কারণ বিচারকরা বা বিচার বিভাগ ট্রেড ইউনিয়ন নয়। তারা কলম বিরতিতে গেলে কি হবে তা সহজেই অনুমেয়। তাই, ডাক্তাররা হাসপাতাল বন্ধ করতে পারলেও বিচারকরা আদালত বন্ধ করতে পারেন না। পুরো বাংলাদেশের সব আদালত একযোগে বোমা হামলার শিকার হলেও সেদিন বা তার পরেরদিন বা তার পরেরদিন বিচারকদের কলম থামেনি। বিচার থামেনি। বিচার সেবা প্রদান অবিরত চলেছে। সুতরাং, অন্য সার্ভিস পারলেও বিচারকরা পারেন না। বিচারকরা শুধু বিচার করবেন। কিন্তু, বিচারকদের পদ সৃষ্টিসহ আদালত ভবন তৈরি করা প্রভৃতি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব।

১৮ কোটি মানুষের জন্য অন্তত ১৮ হাজার বিচারক দরকার। সে জায়গায় বিচারক আছে ১৮০০। সঠিক হিসাবে হয়তো ১৭০০ জনই আছে। তন্মধ্যে ডেপুটেশন, শিক্ষা ছুটি ও অন্যান্য ছুটিতে থাকা বিচারকদের বাদ দিয়ে ১৪০০ এর মত বিচারক ফিল্ডে কাজ করছে। এত কম সংখ্যক বিচারকের কাছে বিশাল মামলার পাহাড় দিয়ে আমরা ন্যায়বিচার খুঁজি! আপনারা হয়তো জানেন না, এক একটি বিচারের রায় একটি উপন্যাস লিখার মত কঠিন এক কর্মযজ্ঞ। অনেক বড় মামলার রায় এক একটি থিসিস লিখার মত কষ্টের। বিচারক তার কাজের ভার অন্য কারো উপর ডেলিগেইট করতে পারেনা। নিজেকেই সব করতে হয়, দায় দায়িত্ব সব তারই। অথচ এর মধ্যেই বিচার বিভাগ অল্প সময়ে অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার নিষ্পত্তি করেছে। আপনারা একবার অন্য অফিসের কথা ভাবুন। পুলিশ বা প্রশাসনের কাজগুলো কি ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে? অন্য অফিস যদি ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে না চলে, তবে, এতগুলো আদালত কিভাবে বছরের পর বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত বিচারকদের দিয়ে চলছে? তাহলে, ভারপ্রাপ্ত বিচারক নিজের কাজ করবে নাকি ভারে ভারাক্রান্ত আদালতের বিচারের কাজ করবে? আদালতের নথিগুলোকে শুনুন। কত বছর ধরে সে আদালত থেকে মুক্তি চাইছে৷কেন তার দ্রুত মুক্তি হবে না!! কে তাকে মুক্তি দেবে?

নতুন আইন হয়। আইনের প্রয়োজনে অনেক পদ, পদবী, প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়। নতুন উপজেলা হয়, আবার অনেক পদ, পদবী, প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিচারক বাড়েনা, পুরানো বিচারকের উপর নতুন আইনের মামলা কিংবা নতুন উপজেলার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়। এই অতিরিক্ত (ভারপ্রাপ্ত) কাজ করার জন্য আইনে থাকলেও দায়িত্বভাতা থাকেনা। বরাদ্দও নাই। বিচারকেরা মামলার সাগরে ভাসতে ভাসতে এক একটি বিরোধের সুরাহা করে, আত্মতুষ্টি পায়। পিছনে পড়ে থাকে স্বপ্ন, না পাওয়ার বেদনা। এই প্রচার বিমুখ মানুষগুলো এভাবেই দিন গুনে, অবসরের দিকে অগ্রসর হয়…

মামলাতো কমছে না। মামলা বাড়ছে মানে মানুষ আদালতের উপর আস্থা রাখছে- আমরা বিষয়গুলো এভাবে দেখছি। থানা পুলিশ মামলা না নিলেও আদালতের কি সে সুযোগ আছে? কাল থেকে যদি বলা হয় আর মামলা করা যাবে না, তাহলে অবস্থা কি হবে? হাসপাতালে যদি আইসিইউ খালি না থাকে তাহলে কি রোগী ভর্তি করা যায়? হাসপাতালে যদি ৩৫ লক্ষ লোক ভর্তি হয়ে থাকে তাহলে হাসপাতাল কি সেবা দিতে পারবে? হাসপাতাল নতুন রোগী নিতে পারবে? অথচ আদালতে ৩৫ লাখ মামলা থাকলেও প্রতিদিন আরো কয়েক হাজার মামলা দায়ের হচ্ছে। কারণ, আদালত কখনোই মামলা করা যাবে না বলতে পারবে না। বিচার পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। নাগরিকের সেই সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে আদালত মামলা নিতে এবং বিচার করতে বাধ্য।

এই বাস্তবতায় আমরা আনন্দের সাথে লক্ষ্য করছি, প্রস্তাবিত খসড়া ভূমি আইন, ২০২০-এ আদালতকেই বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আদালতকে একটু ঝামেলামুক্ত করে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কই? ঐ আইনে যে ৬৪টা ট্রাইব্যুনাল বানানো হচ্ছে তার দায়িত্বতো বিচারকদের দেওয়া হয়নি! আদালতের ভৌত সুবিধা না বাড়িয়ে, নতুন বিচারক নিয়োগ না করে আদালতের বিচারের ক্ষমতাই কেড়ে নেওয়ার খসড়া করা হলো! আমরা বলতে পারছি না যে, মামলা তৈরির সূতিকাগার এসি ল্যান্ড অফিসে একজন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হোক। আমরা বলতে পারছিনা এক একটি ভূমি জরীপ হাজার হাজার মামলার জন্ম দেয়। সেখানে বিচারক পদায়ন করা হোক। অপ্রয়োজনীয় কারনে বা অন্যকে ঘায়েল করার মানসিকতায় হাজার হাজার মিথ্যা মামলার জন্ম হচ্ছে। এজন্য মামলার উৎসমুখ বন্ধের উদ্যোগ কোথায়?

প্রতি উপজেলায় উপজেলা লিগ্যাল এইড অফিসার, ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হোক। প্রতি উপজেলার জন্য তৈরি করা সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে সমান সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেয়া হোক। ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে আর যাই হোক দ্রুত ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। গ্রাম আদালত নামক প্রহসন সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক। প্রতিটি উপজেলায় দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালত নিয়ে যাওয়া হোক। তাহলে মানুষ বিচার পাবে। থানা, গ্রাম আদালত কেন্দ্রিক অবৈধ সালিশ-মীমাংসা বন্ধ হবে।

আমরা আশংকার সাথে গ্রাম আদালতকে দেখছি লাল সালু দিয়ে ঘেরা এজলাসে বসছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বানানো হয়েছে বিচারক। অথচ এই কথিত আদালতের শাস্তি দেওয়ার কোন ক্ষমতা নেই। আপোষ-মীমাংসার একটি ফোরামকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আদালত বানানো হয়েছে। সুপ্রাচীন কাল থেকে লাল সালু, এজলাস আদালতের ঐতিহ্য। এই লাল লালু, এজলাস বানিয়ে গ্রাম আদালত বসানো কাদের টাকায়, বুদ্ধিতে হয়েছে? কেন হয়েছে? এটা আমরা বলতে পারছি না। কারণ, সবাই বিচার করতে চায়। বিচার করার ক্ষমতাকে বন্টন মামলার মতো ভাগ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ট্যাক্সির পেছনে যেমন লেখা থাকে – সব চেয়ে বড় আদালত মানুষের বিবেক। আসলেই তো! সবাই যার যার জায়গায় বিচারক। বাস্তবতা হলো একটি জেলায় অন্য যে কোন বিভাগের চেয়ে কম সংখ্যক বিচারক নিয়ে আদালতগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অনেক জেলায় এখনো অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের সংখ্যা একজন করে। প্রয়োজন হয়তো ৪/৫ জন। এই আদালত ফাঁসি, যাবজ্জীবন দন্ডে দন্ডনীয় অপরাধের বিচার করেন। তাহলে কিভাবে দ্রুত বিচার হবে? আবার, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি জেলায় সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ কোনটাই নেই। সেখানে একজন জেলা ও দায়রা জজ এবং একজন যুগ্ম জেলা জজ আদালত পাহাড় সমান মামলার বিচার করছেন। তাহলে, ন্যায়বিচার কিভাবে হবে?

অতএব, সবার আগে প্রয়োজন অধিক বিচারক নিয়োগ এবং আইন ও মানসিকতার পরিবর্তন। এত অধিক মামলা নিষ্পত্তি বর্তমান বিচারকরা চাইলেও করতে পারবে না। বিচারক দরকার ৬০০০, পদায়ন আছে প্রায় ১৭০০। ডেপুটেশন ও ক্রিমিনাল কোর্ট ছাড়া দেওয়ানী আদালতে মাত্র ৫০০ এর মত বিচারক কাজ করে। পাহাড় পরিমাণ কাজ। রাষ্ট্রের প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে ধীরে ধীরে লোকবল ৩/৪ গুণ হয়ে গেছে। কিন্তু বিচার বিভাগ চলছে মাত্রাতিরিক্ত বিচারক, স্টাফ স্বল্পতা নিয়ে। বিগত ৩০/৪০ বছর ধরে চেষ্টা করেও সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের স্টেনো টাইপিস্ট পদ সৃজন করা যায়নি। সুতরাং, বিচারকের নিজের হাত এবং কলমই ভরসা।

একটা উদাহরণ দিই, চট্টগ্রামে যুগ্ম জেলা জজ দরকার ১০ জন। ৩০/৪০ বছর ধরে তিন জনে চলছে। ০৬টি থানার জন্য ০৬ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে চট্টগ্রাম সিএমএম কোর্টের যাত্রা, এখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় থানা সম্ভবত ১৬টি। কিন্তু, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেই ০৬ জন। ১৬ থানার কাজ করার জন্য ১৬ জন ওসি, ১৬ জন ওসি (তদন্ত) এবং অসংখ্য এসআই রয়েছেন। তাও প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো অপ্রতুল। কিন্তু, ১৬ থানার কাজ করার জন্য মাত্র হাতেগোনা ম্যাজিস্ট্রেট! সেখানেতো অন্তত ১৬ জন ম্যাজিস্ট্রেট দরকার। এই চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। এখন শেষ ভরসা উপজেলা আদালত। এর উছিলায় যদি বিচারক বাড়ে, লজিস্টিক পাওয়া যায়। যেখানে স্বাক্ষর করা, মামলা শুনা, অর্ডার লিখা ও মামলার কায়েমী পক্ষের মামলা বিলম্বিত করা ঠেকাতে ঠেকাতে কর্মঘণ্টা চলে যায়, সেখানে কিভাবে নিষ্পত্তিতে মনোযোগ দেয়া যাবে?

দেশে খিচুড়ি, পুকুর খনন, পর্দা, বালিশসহ আরো কত কত দূর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় হওয়ার খবর শোনা যায়। অথচ দেশে যে গত ৩৫ বছরে মাত্র ২টি নতুন সহকারী জজ আদালত সৃষ্টির বিপরীতে ১০০টি আদালত বিলুপ্ত হয়েছে সেটা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই কারো।।

আশা করছি জনগণ অবশ্যই বিচার পাবে। অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিচারকদের মামলা নিষ্পত্তির হার অনেক বেশি। এটি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন আরো বছর কয়েক আগে। সাথে তিনি ৫০০০ বিচারকও নিয়োগ করতে বলেছেন। তিনি হিসেব করে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে ৩৬ কোটি মানুষের জন্য ৮৬ হাজার বিচারক রয়েছে। তাহলে, বাংলাদেশের ১৮কোটি মানুষের জন্য ৪৩ হাজার বিচারক দরকার। আমরা আশাবাদী। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন নিষ্পত্তি বেশি হলে মামলা জমছে কেন? যে বিচারপ্রার্থীর মামলায় ৬/৭/৮ মাস পরে মামলার তারিখ পড়ে তাকে জিজ্ঞাসা করুন। একজন বিচারক ১০ হাজার মামলার বিচার কিভাবে করবেন সে প্রশ্ন করুন। ইচ্ছে হলে আদালত পাড়ায় ঘুরতে আসুন। বিচার বিভাগের বাজেট বাড়ানো হোক। নতুন আদালত তৈরি, বিচারক নিয়োগ দেয়া হোক। বাজেট এবং অবকাঠামো যতগুণ বাড়ানো হবে, ততগুণ নিষ্পত্তি বাড়বে। প্রতিবছর ধরুন ২০ লাখ মামলা রুজু হয়। ১৬-১৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তি হয়। বাকী ২/৩ লাখ মামলা জমতে জমতে কথিত এই মামলা জট। আজ হয়তো ২ হাজারের কাছাকাছি বিচারক রয়েছে। কিন্তু এই বিচারক সংখ্যা যদি ৬ হাজার, ১২ হাজার হতো, তাহলে! রাষ্ট্রের লক্ষাধিক পুলিশ আছে, ২৭টা ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে আছে। অগণিত অফিসার, স্টাফ আছে। কিন্তু, ১৭০০ বিচারক কেন? কেন নতুন সব আইনে পুরনো আদালতগুলোর উপরেই দায়িত্ব দিয়ে দায় সারা হয়? নতুন আইনে পুরোনো আদালতকেই যদি দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে নতুন আইনের উদ্দেশ্য কিভাবে পূরণ হবে?

অধঃস্তন আদালতের বিচারক স্বল্পতা সমস্যার সমাধানের সাথে সাথে মাননীয় সুপ্রীম কোর্টের উভয় বিভাগে মাননীয় বিচারপতিগণের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় শতাধিক মাননীয় বিচারপতি মহোদয় কর্মরত রয়েছেন। মহামান্য আপীল বিভাগে মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ ০৭ জন বিচারপতি কর্মরত হয়েছেন। কিন্তু, মামলার সংখ্যা এবং বিচারিক কাজ বিবেচনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়া উচিত। সাংবিধানিক আদালত হিসেবে সুপ্রীম কোর্ট অধঃস্তন আদালতের আপীল, রিভিশন, রীট, কোম্পানী ম্যাটার, এডমিরালটিসহ সকল ধরণের মামলা নিষ্পত্তি করে থাকেন। বিচারিক কাজের পরিমাণ অনুযায়ী নিঃসন্দেহে কম বিচারপতি নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বিচার কাজ পরিচালনা করছেন এবং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে অবকাঠামো তৈরি করে আদালতের সংখ্যা এবং মাননীয় বিচারপতি মহোদয়গণের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে বিচার ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। মানুষ দ্রুত সুবিচার পাবে। বছরের পর বছর শুনানীর জন্য অপেক্ষায় থাকা হত্যা, ধর্ষণ মামলাসহ সকল ধরণের মামলাসমূহ নিষ্পত্তি হবে। মানুষের কষ্ট, কর্মঘন্টা এবং অর্থের সাশ্রয় হবে।

আমাদের সকলকে এই প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো ভাবতে হবে। দ্রুত বিচার চাইলে বিচার ব্যবস্থাকেও সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এটা সকলের সাধারণ অবগতির বিষয় যে, বিচারক,বিচারালয় যত বাড়বে,দ্রুত ন্যায়বিচার ততো তরান্বিত হবে- যা আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখবে। এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। একটি স্মার্ট, পর্যাপ্ত সুবিধা সম্পন্ন বিচার বিভাগ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে। নতুবা আদালতের ভবনে ভবনে মানুষের হাহাকার ঘুরপাক খাবে। অসহায় গরীব, মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য আহাজারী করতে থাকবে। অসহায় মানুষগুলোর অশ্রুবিন্দু আদালতের আঙিনায় পড়ে যুগের পর যুগ অভিশাপ হয়ে ঘুরতে থাকবে এবং এক সময় সবচেয়ে বড় বিচারক মহান সৃষ্টিকর্তার আরশে আর্জি জানাবে।

নতুন আদালতের সাথে সাথে পর্যাপ্ত বিচারক বৃদ্ধি করে আদালতকে উন্নত এবং ডিজিটালাইজড করা না হলে এই মামলার সংখ্যা ৭০ লাখ হতে সময় লাগবে না। কারণ, ১৮ কোটি মানুষের দেশে আর যাই হোক মামলা কমবে না। বরং, মানুষ যতবেশি তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে তত বেশি মামলা আদালতে দায়ের হবে। বিচার বিভাগকে দক্ষ হাতে সুশাসনের জন্য সেই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই উদাহরণ বিচার বিভাগ অসংখ্যবার দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেখাবে। রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ এবং বিচার বিভাগকে মামলার প্রবল ভার বহনের জন্য, মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। মোট বাজেটের ০.৩১ অংশ দিয়ে কেমন বিচার বিভাগ চাওয়া যায়- এই প্রশ্ন ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Dhaka