18/06/2023
আজ বাবা দিবস—
বিশ্বের সকল বাবাকে জানাই শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও অভিনন্দন। আমার বাবা মরহুম মোহম্মদ শেহাবউল্লাহ গত হয়েছেন সেই ২০০২ সালের শুরুর দিকে, ৯২বছর বয়সে।পৃথিবীর সব বাবাই তার সন্তানের কাছে অমূল্যধন।
আমার বাবা ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এন্ড গাইড।বাবা আমাকে এত বেশী নিজের মত করে বেড়ে উঠতে দিয়েছেন, এতটা স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলেছেন যে কারণে আজ আমি এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।
আমার বাবা কোনদিন পড় পড় করতেন না, বরং বলতেন, অনেকক্ষন পড়া হয়েছে, এবার ছাদে গিয়ে হেঁটে আসো কিছুক্ষন।আমি আমাদের পাঁচভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। সবার বড় বোন, মধ্যিখানে পর পর তিনভাই। শেষমেষ যখন আবার মেয়ে হলো, আমার বাবা যেন চাঁদ হাতে পেলেন। এত আদর এত ভালবাসা পেয়েছি যে বলে শেষ করা যাবেনা।বাবা সবার কাছে বলতেন, ছোটটি হচ্ছে বেস্ট চাইল্ড। পড়াশুনায় সেরা থাকার চেস্টা করতাম। আমার বাবা বলতেন, সারাদিন লেখাপড়া করে যদি তোমাকে ফার্স্ট হতে হয়, সেটা আমার দরকার নেই। তারচেয়ে বরং তুমি সেকেন্ড, থার্ড হলেও হবে, তোমাকে খেলাধুলা করতে হবে, বিতর্ক-বক্তৃতা শিখতে হবে। রচনা প্রতিযোগীতায় নাম দিতে হবে। আমাকে সবরকম এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিজে নাম দিতে হতো। বাবা শিখিয়েছেন, ক্লাসে কোন কিছুর জন্য নাম চাইলে তুমি নাম দিয়ে দিবা, আমিও ঠিকই নাম দিয়ে আসতাম। বাসায় ফিরে ভয় পেতাম, নাম তো দিয়েছি এখন কি হবে। বাবা বলতেন বক্তৃতাটা লিখে আয়নার সামনে দাড়িয়ে প্র্যাকটিস করো। ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন, এভাবে শিখে শিখে একদিন সেরা বক্তা হয়ে গেলাম !বিতর্ক কিংবা রচনা প্রতিযোগীতায় প্রথম হওয়াটাও বাবার কারণেই। স্টেজের ভয়, মাইক হাতে কাঁপুনি সেই ছোটবেলাতেই কেটে গেছে।
অল্প বয়স থেকেই আমি ছিলাম বাবার মতই ধার্মিক, নীতিবান, অসহায় ও সুবিধাবন্চিতের জন্য দয়ালু।এত মিল আমার আর আমার বাবার স্বভাব-চরিত্র, পছন্দ-অপছন্দ, খাবার-দাবার যে আমার সন্তানেরাও অবাক হয়ে যায়। আমার ভাই-বোনেরাও বলে আমি নাকি বাবা মত দেখতে এবং অবিকল বাবার স্বভাবের ডুপ্লিকেট কপি !
বাবাকে সারাদিন বন্ধুদের সব গল্প না বল্লে আমার ঘুম হতোনা, মাঝেমাঝে বাবা বলতেন, আমি কি এতকিছু চিনি ! ডাক্তারী পড়ার সময় আমার সহপাঠী ছেলেমেয়ে সবাই আমাদের বাসায় এলে বাবার সাথে গল্প করতে ভালবাসতেন।আমার বাবার গল্প বলে শেষ হবেনা। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় ৪৬৫টাকা দিয়ে সিঙ্গার সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন, অবসর সময় কাটানোর জন্য, কারণ বোন বিয়ে হয়ে চিটাগং চলে গেলে আমি বাড়ী তখন একা, ভাইদের সাথে ফুটবল, ক্রিকেট খেলার সম্ভব ছিলনা।আমাদের বাসায় ছোট একজন কাজের মেয়ে রাখা হতো শুধু আমার সাথে খেলাধুলার জন্য। এতছোট বয়সে নিজের ফ্রক সেলওয়ার সেলাই করতে পারতাম, বুয়াদেরগুলিও স্কুল বন্ধের সময় করে দিতাম ফ্রি।
জাপানে পাঁচবছর থাকার সময় কতবার যে আমার বাবা জিপিও থেকে দশকেজি করে পার্সেল পাঠিয়েছেন। পোলাওর চাল, মুশুর ও মুগ ডাল, শুটকি, নোনা ইলিশ, করলা শুখিয়ে প্যাকেট করা, চানাচুর ইত্যাদি ইত্যাদি। ডাক্তারী বই জাপানে কয়েকগুন দাম বলে বাবা বই কিনেও পাঠাতেন।
আই মিস ইউ বাবা।
আমি আমার সন্তানদের বলে রেখেছি আমি মরে গেলে যেন গোপীবাগে আমার বাবার কবরে আমার বাবার বুকের মধ্যে আমাকে দাফন করা হয়।