22/10/2022
পর্ব-১১৫
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দার কারণঃ
*Derivative product effect...
লেখাটা বড়, সময় থাকলে পুরাটাই মন দিয়ে পড়ুন, অথবা স্কিপ করা যেতে পারে, পুরাটাই ইকোনোমিক টার্ম, অনেকের হয়তো ভালো লাগবে না...
ছোট বেলায় "শয়তানের চিটাগুড়ের" একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্পটা এমন,
একদিন শয়তান ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা কোন এলাকা দিয়ে যাবার সময় দেখে এই এলাকায় কোন সমস্যা নাই, সবাই সুখে শান্তিতে আছে। তখন শয়তান তার সাগরেদদের বললো, দেখ আমি কিভাবে এদের মধ্যে অশান্তি তৈরী করি...
যেই কথা সেই কাজ, শয়তান একটা গাছ তলায় কিছু টিটাগুড় ছিটিয়ে রাখলো, এই চিটাগুড় খেতে পিপড়া হাজির হলো, পিপড়া খেতে টিকটিকি ও হাজার হাজার পাখিরা আসলো, সহজে পাখি ধরতে প্রথমে পাশের এলাকার লোকেরা আসলো, পরে পাশের গ্রামের লোক, তার পরে দূরের গ্রামের লোক সমাবেত হলো। গ্রামের লোকেরা দূরের গ্রামের লোকেদের পাখি ধরতে দিতে সম্মত হলোনা, ফলে শুরু হলো হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি, পরে লাঠিশোঠা, দা কুড়াল নিয়ে মারামারি, খুনাখুনি। পুলিশ এসে দুই গ্রামের প্রায় সব লোককে ধরে নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে রাখলো, মামলা জেলজরিমানা ফাসি হলো।।।
তাহলে, এখানে দেখেন একটা ধারাবাহিক কার্যকারণ আছে। ইবলিস শুধু চিটাগুড় রেখেছে, তার পরে টিকটিকি, পাখি, মানুষ, মারামারি, খুনাখুনি, জেলজরিমানা ফাসি...একটার জন্য আরেকটা... এই কার্যকারণ /Cause and Effect থিওরিটা মাথায় রাখুন, ২০০৮ এর ইকোনোমিক রিসিসান বুঝতে সাহায্য করবে।
এবার ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করি, আপনারাও একটু সময় নিয়ে বুঝে বুঝে একের পরে এক কার্যকরণ নির্ণয় করে এগিয়ে যেতে থাকুন...
১. ১৯৯৬/৯৭ সালের দিকে USA তে টেকনোলজি নির্ভর শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে, ফলে মানুষ শেয়ার কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
২. এসব শেয়ারের ফাকা বাবল ২০০০-২০০২ সালের মধ্যে ফুস হয়ে যায়, ফলে শেয়ার প্রাইস অনেক কমে যায়। মানুষ শেয়ার সেল করে স্টক মার্কেট থেকে ক্যাশ টাকা উঠিয়ে নিয়ে যায়।
৩. ঐ সময় ব্যাংকের ডিপোজিটের ইন্টারেস্ট রেট ছিলো ১% এর কম, তাই ইনভেস্টরগণ ব্যাংকেও টাকা রাখছিলো না। সঙ্গতকারনে লোনের রেট ও ছিলো ১% এর কাছাকাছি।
৪. ২০০২/০৩ সালের দিকে US Govt. সাধারন জনগণকে ঘরবাড়ি/ফ্লাট কিনতে আগ্রহী করে তুলে, ফলে জনগণ রিয়েল স্টেটে ইনভেস্টমেন্ট এ আগ্রহী হয়, ব্যাংক থেকে কম সুদে লোন নিয়ে ফ্লাট বাড়ি কিনতে থাকে, ফলে রিয়েল স্টেটের দাম বাড়তে থাকে, ব্যাংকগুলি ও মর্টগেজ লোন দিয়ে প্রচুর লাভ করতে থাকে।
৫. ব্যাংকের লাভ দেখে Investment Bank গুলো ও লোভ সামলাতে পারে না। যেখাএন সাধারণ ব্যাংকের কাজ হলো ডিপোজিট গ্রহণ ও লোন প্রদান, সেখানে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কাজ হলো মধ্যস্ততা করা (Intermediary), ক্যাপিটাল রেইজ করা, মার্জিং এক্যুইজেসান করতে হেল্প করা, ডিরাইভেটিভ প্রডাক্ট ক্রয়/বিক্রয় করা।
ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক সাধারণ ব্যাংক থেকে লোনগুলি ক্রয় করে ব্যান্ডেল Complex Derivatives Products তৈরি করে, যেটার নাম হলো Collateral Debt Obligation বা চডো। এবং সেগুলো আবার সাধারণত Investors এর নিকট বিক্রি করতে থাকে।
৬. ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি থেকে এই CDO গুলির রেটিং করিয়ে নেয় এবং রেটিং এজেন্সিগুলো ৭০% এর উপর AAA রেটিং করে, যার অর্থ CDO গুলির পেমেন্ট ফেল করার পসিবিলিটি খুবই কম। ফলে CDO এর সেল প্রচুর বেড়ে যায় ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলি প্রচুর লাভ করতে থাকে।
৭. ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলি তখন সাধারণ ব্যাংকগুলির কাছে আরো লোন পার্সেস করার জন্য অর্ডার দেয়৷ ফলে ব্যাংকগুলি আগে যেখানে কাস্টমারের প্রফাইল স্টাটাস,ইনকাম, রিপেমেন্ট ক্যাপাসিটির ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে লোন দিতো (যেহেতু লো ক্যাটাগরির লোন, তাই এই লোনকে Subprime mortgage loan বলে) সেখানে তারা এবার বেশি লাভের আশায়
তেম্ন বাছবিচার না করে রিয়েল স্টেটে লোন দিয়ে আবার সেই লোন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কাছে সেল করতে লাগলো। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও লোন পার্সেস করে CDO করে সাধারণ ইনভেস্টরদের নিকট সেল করতে থাকলো।
৮. ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের এই লাভ দেখে ইন্সুইরেন্স কোম্পানিগুলোও লোভ সামলাতে পারলো না। তারা COD এর বিপরীতে ইন্সুইরেন্স প্রিমিয়াম নিয়ে ইন্সুইরেন্স ফ্যাসিলিটি অফার করতে লাগলো, অর্থাৎ যদি COD এর মেইন ব্রোয়ার রিপেমেন্ট ফেইল করে, তাহলে ইন্সুইরেন্স কোম্পানিই ইনভেস্টরদের টাকা পেমেন্ট করে দিবে। যেহেতু ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জানে যে, COD ফেল করতে পারে, তাই তারা ইন্স্যুরেন্স নিয়ে রাখলো।
৯. দেখেন, ২০০০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সাধারণ ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, পরে ইন্সুইরেন্স কোম্পানি সবাই ধুমছে প্রফিট করতে লাগলো, যারে বলে হানিমুন পিরিয়ড।
১০. যেখানে প্রথম প্রথম লোনের ইন্টারেস্ট রেট ছিলো ১% (এডজাস্টবল রেট), সেটা আস্তে আস্তে বেড়ে ২০০৭/০৮ এর দিকে ৫% এ উঠে যায়, ফলে যেসব ব্রোয়ারদের বাছবিচার করে লোন দেয়া হয়নি বা যাদের ইনকাম কম ছিলো, তারা লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলো।
১১. ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণে মর্টগেজ সম্পত্তি সেল করে তাদের বকেয়া টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকলো। একসাথে অনেক রিয়েলস্টেট সম্পত্তি বিক্রি করার কারনে রিয়েলস্টেট সম্পত্তির মূল্য ব্যাপকহারে কমে গেলো। ফলে যে সম্পত্তি কেনার জন্য ১০০ টাকা লোন দেয়া হয়েছিলো, সেটার বকেয়া যখন ৭০ টাকা, ও সেটার বিক্রি মূল্য যখন ৫০ টাকায় নেমে এলো, তখন ব্রোয়াররা ভাবলো, আমার ৫০ টাকা সম্পত্তির জন্য কেন ব্যাংককে ৭০ টাকা পরিশোধ করবো। তার চেয়ে ব্যাংক আমার সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের লোনের বকেয়া নিয়ে নিক।
১২. ফলে, যারা কিস্তি অল্প করে চালাচ্ছিলো, তারাও কিস্তি দেয়া বন্ধ করে দিলো।
১৩. যেহেতু লোনের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না, তাই COD এর তেমন কোন ভ্যালু থাকলো না। তাই ব্যাংক ক্ষতিপূরণ পাবার জন্য ইন্সুইরেন্স কোম্পানির কাছে দাবি করলো। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি AIG এর ইন্সুইরেন্স দায় ছিলো প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু AIG এর প্রচুর কর্মচারী ছিলো, তাই তাদের দেউলিয়া থেকে বাচানোর জন্য ওবামা সরকার ৮৫ বিলিয়ন ডলার বেইল আউট প্যাকেজ দেয়। ফলে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলো ইন্সুরেন্সের টাকা পেয়ে প্রাথমিকভাবে কিছুটা লাভবান হয়।
১৪. যেহেতু, আগের COD ফেল করেছে, তাই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের হাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অবিক্রিত COD আর কোন ইনভেস্টর কিনতে চাইলো না। ফলে আমারিকার প্রথম সারির ৫ টি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলো। তাদের মধ্যে Lehman Brothers (যাদের প্রায় ২৫০০০ ইম্পোয়ির চাকুরি চলে যায়) কে জেমি মরগান ব্যাংক কিনে নেয়।
১৫. এই চক্রে পড়ে ব্যাংক, ইন্সুইরেন্স কোম্পানি, ইনভেস্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার গচ্চা যায়।
১৬. ফলশ্রুতিতে সাধারণ ব্যাংকগুলির কাছে ব্যবসায়ীক লোন দেয়ার টাকা থাকে না, ফলে শুরু নতুন "Credit Crunch"। Credit Crunch হলো সেই অবস্থা, যেখানে লোন নেয়ার লোক আছে, কিছু লোন দেয়ার লোক নাই।
১৭. ফলে লোনের অভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন বন্ধ হবার উপক্রম হয়ে গেলো, কর্মী ছাটাই হতে থাকলো। যেহেতু আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে "বড় ইকোনোমি", তাই তাদের সাথে জড়িত বা নির্ভরশীল পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অনেক ব্যাংক ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান এর প্রভাবে দেউলিয়া হয়ে গেলো।
১৮. ফলে বিশ্ব ব্যাপী দেখা দিলো অর্থনৈতিক মহামন্দা....
আশাকরি কিছুটা ধারণা দিতে পেরেছি...
জি, এম, কামরুল ইসলাম
উত্তরা, ঢাকা
২৩.১০.২০২২