21/05/2026
বাংলাদেশের বাস্তবতা হল আপনি উচ্চমধ্যবিত্ত অথবা ধনী ফ্যামিলির সন্তান না হলে আপনার হাই ফ্লায়িং ক্যারিয়ার পাওয়ার সম্ভাবনা একদম শূন্যের কাছাকাছি।
একজন উবারে/নিজেদের এসি গাড়ি চড়ে ইউনিভার্সিটি যাওয়া আসা করা ছেলেমেয়ে লাইফের যেই ধরণের ফ্লেক্সিবিলিটি আর বেনেফিট এনজয় করে, পকেটে ৫০/৬০ টাকা নিয়ে লোকাল বাসে সিদ্ধ হয়ে দিনে ৫/৬ ঘন্টা জ্যামে ট্রাভেল করে ইউনিভার্সিটি যাওয়া আসা করা ছেলেমেয়েরা সেই বেনেফিট এনজয় করে না।
হাইয়ার ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কাছে অনেক সময় থাকে, তারা চাইলে সেইটা স্কিল ডেভেলপ করার কাজে লাগাইতে পারে পার্টটাইম কাজ করে, অথবা সফট স্কিল ডেভেলপ করে। তাদের ভিতরে কনফিডেন্স ছোটবেলা থেকেই ভরে ভরে দেয়া হয়। আর সবচাইতে বড় কনফিডেন্স আসে এই উপলব্ধি থেক যে তাদের ক্যারিয়ারের কিছু হয়ে গেলেও তাদের বাপ মা বুড়ো বয়েসে পথে বসবে না। এইজন্যে দে ক্যা টেক রিস্ক, দে ক্যান এক্সপ্লোর ডিফরেন্ট ওয়েজ। তাদের পোশাকে আশাকে, চলনে বলনে, কথাবার্তায় স্মার্টনেস আর আত্মবিশ্বাস যেইটা আসে, এইগুলা যত না স্ট্রাগল করে ডেভেলপ করা, তার চাইতে বেশি ইনহেরিটেড করা। আপনার পকেটে যখন টাকা থাকবে, পিছে বাপ-মায়ের ব্যাকআপ থাকবে তখন কলিজায় জোর এমনিতেই আসে!
অন্যদিকে গরীব-ছাপোষা ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের কাছে কোয়ালিটি টাইম মানে বিলাসিতা। আমি সকাল ৬ঃ৩০ এ বাইর হইতাম ক্যাম্পাসে যাইতে, সারাদিন ক্লাস করে, দুইটা টিউশান করায়ে বাসায় ফেরত আসতাম রাত ১০টার দিকে। টোটাল ৭-১০ ঘন্টা যেত ট্রাফিকে। বাসায় এসে আর তেল থাকতো না কোন কিছু করার। সপ্তাহের ৬ দিন যদি কেউ এইভাবে জীবন কাটায় তাইলে সে এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাকটিভিটি করবে কখন, আর স্কিল ডেভেলপ করার জন্যে অন্যান্য জিনিস করবে কখন? আমি দুইটা টিউশান করে পাইতাম এরাউন্ড ১০ হাজার, সেইটা দিয়ে নিজের খরচ চালায়ে প্লাস ফ্যামিলিতে কিছু কনট্রিবিউট করার ট্রাই করসি। পার্ট টাইম কাজ পাই নাই এমন না, কিন্তু করতে পারি নাই। দিনে ৫/৬ ঘন্টা জব করে মাসে ৫-৬ হাজার টাকায় আমার পোষাইতো না। অ্যাজ আ রেজাল্ট, এক্সপেরিয়েন্স মিস করলাম, সিভিতে তো আর টিউশান লিখা যায় না সুন্দর করে!
আমার মত হাজার হাজার ছেলেমেয়ের তো একটা টিউশানও কপালে জোটে না! তাদের সোশ্যাল লাইফ বলতে কিছু থাকে না কারণ পকেট খালি! আর যেহেতু সোশ্যাল লাইফ নাই, সেহেতু কনফিডেন্স কমতে থাকে, ডিপ্রেশান বাড়তে থাকে। সেইটার ডাইরেক্ট ইম্প্যাক্ট পড়ে পড়াশুনার উপরে। অপরচুনিটি নাই, ইউটিলাইজেশানও নাই।
লেট মী টেল ইউঃ বাংলাদেশের যত লোয়ার ক্যাটাগরির ফ্যামিলি থেকে আসা ছেলেমেয়ে আছে, তাদের মেজরিটির পড়াশুনা খারাপ হয় ক্লিনিকাল ডিপ্রেশান আর স্ট্রেস থেকে। আর এই ডিপ্রেশানের একটা প্রাইমারি সোর্স হলো চোখের সামনে এই বৈষম্য দেখা!
এখন ফাইনাল ইয়ার শেষে যখন সিভি বানানোর সময় আসে, তখন দেখা যায় লোয়ার ক্যাটাগরির ছেলেমেয়েদের সিভিতে ভাঁড়ে মা ভবানী। অ্যাট বেস্ট, খালি পড়াশুনাই আছে, বাকি আর কিছু নাই। উল্টাদিকে যারা একটু অবস্থাসম্পন্ন ফ্যামিলি থেকে আসছে তারা সিভিতে সব ভরে ভরে রাখতে পারসে। এডুকেশান থেকে নিয়ে, কো কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, সব! তাদের সবকিছু টিপটপ, ফিটফাট। অপরচুনিটি পাইসে, ইউটিলাইজ করসে! সিম্পল!
কাটিং এজ জবগুলাতে কি ভারী সিভিওয়ালাদের নিবে না খালি সিভিওয়ালাদের? তাদেরও তো সিস্টেম আছে।
আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারবঃ যদি কেউ প্রপার রিসার্চ করে তাইলে এই বৈষম্য একদম তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখায়ে দিতে পারবে এই বৈষম্যের এক্সিস্টেন্স, আর কিভাবে জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে এই বৈষম্য বিল্ড আপ করা হয়!
বেশি কিছু না, নিচের দুইটা ওয়েতে ডেটা কালেক্ট করলেই হবেঃ
- দেশের টপ ১০ টা কোম্পানিতে গত ৩/৪ বছর ধরে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনী পজিশানে যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হোক! দেখা হয় কয়জন কোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসছে।
- যাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউণ্ড হাইয়ার মিড-রিচ পর্যায়ের, তাদের ১০০ জনের মত স্যাম্পল দাঁড়া করায়ে তাদের ক্যারিয়ারের স্টার্টিং চেক করা হোক। একই ভাবে যারা একদম লোয়ার এন্ড থেকে আসছে, তাদের ক্যারিয়ার স্টার্টিং চেক করা হোক!
ফ্যাক্টস উইল স্পিক ফর দেমসেল্ভস! এক্সেপশান থাকতেই পারে কিন্তু ওভারঅল সীনারিওতে বৈষম্য যে কিরকম প্রকট, সেইটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে! আমার লিস্টে যতগুলা ছেলেমেয়ে হাই ফ্লাইয়িং ক্যারিয়ার স্টার্টিং পাইসে তাদের মেজরিটি স্বচ্ছল ফ্যামিলি থেকে আসছে। জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে তারা কিছু না কিছু প্রিভিলেজ পেয়ে আসছে। অপরদিকের চিত্র আমরা জানি! চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার নিউজ তো কম আসে না, এক বিসিএস এর জন্যে লক্ষ এপ্লিকেশানের খবরও অজানা না!
না, আমি হাইয়ার ক্লাস ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের দোষ দিব না। তাদের ফল্ট না যে তারা প্রিভিলেজ পায়। সুযোগ পাইলে সবাই প্রিভিলেজ নিবে! আমি দোষ দিব আমাদের দেশের একাডেমিক সিস্টেমের, স্টুডেন্টদের লাইফ এক্সপেরিয়েন্সের, তাদের জন্যে একটা ট্রান্সপারেন্ট লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে ব্যর্থদের।
একটা সভ্য দেশে একটা রিচ ফ্যামিলির সন্তান আর একজন গরীব ফ্যামিলির সন্তান বেসিক সামাজিক/অর্থনৈতিক/একাডেমিক ফ্যাসিলিটিগুলা পায়, সেইটাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করে দেয় ক্যারিয়ারের বিগিনিং এ গিয়ে! কেউ যদি ওই সিস্টেমে সারভাইভ করতে না পারে, তখন তার ব্যর্থতা!
কিন্তু একটা আনফেয়ার সিস্টেমে ফেইল করার জন্যে, পিছায়ে থাকার জন্যে লোয়ার এন্ড থেকে আসা ছেলেমেয়েদের ব্লেম করা কোন যৌক্তিকতা নাই!
একটা মেগাসিটিতে একজন বড়লোকের ছেলেমেয়ে তার গাড়িতে করে ট্রাভেল করে যদি ৮/১০ কনভেনিয়েন্স পায়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ট্রাভেল করে একজন লোয়ার ক্লাস ছেলেমেয়ের ৬/১০ কনভেনিয়েন্স পাওয়া উচিত।
একজন বড়লোকের ছেলেমেয়ে যদি তার বাবা-মায়ের ফিউচারের ব্যাপারে নির্ভার থাকে, একজন লোয়ার ক্লাস থেকে আসা ছেলেমেয়ের তার বাবা-মায়ের ফিউচারের ব্যাপারে নির্ভার থাকা উচিত।
একজন বড়লোকের মেয়ে যেই ধরণের সিকিওরিটি এনজয় করে, একজন নিম্নমধ্যবিত্তের মেয়েরে সেই ধরণের সিকিওরিটি এনজয় করা উচিত। একজন রাত ১০টা বাজেও নির্ভয়ে বাসায় ফিরবে আরেকজনকে ফোর্স করা হবে মাগরিবের আজানের আগে বাসায় ফেরার, তাইলে কেমনে হবে?
একজন ধনীর সন্তান যদি তার বেসিক নীড গুলা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে, একজন গরীবের সন্তানেরও তার বেসিক নীডগুলা নিয়ে নিশ্চিত থাকা উচিত। নিজের মায়েরে যদি কেউ বাড়িভাড়া কেমনে দিয়ে সেইটা নিয়ে চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাইতে দেখে, কোন গরীব ঘর থেকে আসা ছাত্রছাত্রী তার পড়াশোনায়/ক্যারিয়ারে ফোকাস দিতে পারবে না! তার চিন্তা হবে শর্ট টার্ম কেন্দ্রিক, লং টার্ম কেন্দ্রিক না!
বৈষম্য দূর করে যতদিন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আনা না হয়, ততদিন ধরে বেকারত্বের জ্বালায় সুইসাইড করার নিউজ আসতেই থাকবে রে পাগলা! ডিপ্রেশানে যাবে না কেন তরুণসমাজ? খেলায় কে জিতবে এইটা তো খালি চোখেই দেখা যায়, তাইলে খেলা কনটিনিউ করার স্পিরিট রাখতে পারবে কয়জন? এইটাই কমপ্লেক্স সোশিও-ইকোনোমিক বৈষম্যই জীবন!
====================
তুই ক্যারিয়ারে কিছুই করতে পারবি না, কারণ তুই গরীবের পোলা। তুই গরীবের সন্তান, তুই গরীব হয়েই মরবি, যতই উপরে ওঠার স্বপ্ন থাকুক না কেন। বড়লোকের পোলামাইয়ারা ক্রিম খাবে কারণ তারা বড়লোকের পোলামাইয়া। তুই যতই এফোর্ট দেস না কেন, তুই অমুক বড় কোম্পানির এমটি হইতে পারবি না বাংলাদেশে কারণ তুই যে কোয়ালিটি বিল্ড করবি, তোরে সেই চান্স দেয়াই হবে না!
ফাইনাল সেমিস্টারে আইসা স্যুট পড়লেও সারাজীবন যে রাস্তায় রাস্তায় কামলা দিসস, সেই কামলাত্ব তোর চোখেমুখে ফুটে উঠবে! আর কোম্পানিগুলা কি চায় জানস? স্মার্টনেস, লীডারশিপ, কনফিডেন্স! কত জায়গায় শুনসি ইন্টারভিউ বোর্ডে নলেজ/স্কিল দেখার আগে দেখে ঘড়ি কি পড়সে, স্যুট কেমন, শার্ট কেমন! তুই পাবি কই এইগুলা? জীবনে প্র্যাকটিস করার চান্স পাইসস?
এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে কিন্তু পারবি না, করলে তোরেই ব্লেম দেয়া হবে! বলা হবে নেতিবাচকতা করে!
দিজ ইজ দ্য ফ্যাক্ট! ডীল উইথ ইট!
নিয়তি মাইনা নিয়া স্বপ্ন দেখ আর ক্যারিয়ার প্ল্যানিং কর, ডিপ্রেশানে কম যাবি। কপাল ভাল থাকলে, আর আল্লাহর রহমত থাকলে সিস্টেমরে বীট করার চান্সও থাকবে। কিন্তু নিয়তি না মাইনা স্বপ্ন দেখলে আমও যাবে, ছালাও যাবে!
আর পারলে বাংলাদেশের মোটিভেশনাল স্পীকার + ইয়ুথ লীডারদের আনফলো কইরা নিজের মত পথ চল! তারা তেলা মাথায় কেমনে তেল দিতে হয় সেইটা জানে, শুকনা মাথারে তৈলাক্ত করে তোলার জ্ঞান দেয়ার মত জীবন তারা কাটায় নাই!
- রাকিব হোসাইন