31/05/2026
অভিনন্দন ড. সজীব ত্রিপুরা 🎊
দীর্ঘ গবেষণা ও কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিপুরা পরিবার - Dhaka University Tripura Family এর পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আপনার এই অসাধারণ সাফল্য আমাদের গর্বিত করেছে। আপনার এই মেধা ও গবেষণা আগামী দিনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আপনার জ্ঞান ও গবেষণার যাত্রা আরও সমৃদ্ধ হোক।
“এটা আমার তৃতীয় স্বপ্ন ছিল। প্রথম ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, যেটা চারটা বাঁশের বেড়া, দুইটা গাছের খুটির উপর তক্তা দিয়ে তৈরি হাই ও লো বেঞ্চ সম্বলিত ক্লাসরুম, উপরে টিনের ছাদ দ্বারা সদ্য নির্মিত " সিন্দুকছড়ি মুখ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় দেখেছিলাম, পূর্ন হয়েছিল ২০১০ সালে, চট্টগ্রাম বিশ্বিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীর সার্টিফিকেট পাওয়ার পর। দ্বিতীয় স্বপ্নটি ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া, যে স্বপ্নটি দেখেছিলাম ২০০৪ সালে গাজীপুর এডভ্যান্টিস্ট সেমিনারি স্কুল এন্ড কলেজে ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় রাঙামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবে বলে দৈনিক পত্রিকায় খবর দেখার পর, যা পূর্ন হয়েছিল ২০১৬ সালে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করার মাধ্যমে। আর তৃতীয়টি ছিল পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ড. সজীব ত্রিপুরা হওয়া, যেটা চট্টগ্রাম বিশ্বিদ্যালয়ের নুর ভবন কটেজে পড়ার টেবিলে বসে পড়ার সময় আমার এডভ্যান্স ইংলিশ ডিকশনারির কভার পেইজে ভুলবশত নিজের নাম ড. সজীব ত্রিপুরা লিখে ফেলার পর (১ম বর্ষ, ২০০৭ সাল), যা আজ ৩০ মে ২০২৬ সালে পূরণ করতে পারলাম সকলের সহযোগিতা ও আশীর্বাদে। অন্য দশজনের এইরকম যাত্রা তুলনামূলক ভাল হলেও আমার ক্ষেত্রে ছিল চরম।
শুরু থেকে এই পর্যন্ত চরম সংগ্রাম করতে হয়েছে আমার - প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে, আর্থিক দুরাবস্থার সাথে, শারীরিক দুরাবস্থার সাথে.....| কারণ ২০০৬/২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের এলাকা ছিল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত একটি প্রত্যন্ত, অন্ধকার ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন এলাকা, গ্রামীণ জনপদ, নিদির্ষ্ট কোন রাস্তা ছিলনা, যে যে পথে ভাল মনে করেন সে পথে হাঁটে, বর্ষায় বেশির ভাগ পথ থাকত হাঁটু অবধি গরু-মহিষ চলাচলের কাদামাক্ত, নোংরা-পিছলা, বই-সেন্ডেল-ও- ফুলপ্যান্ট পলিথিনের ভিতরে করে নিয়ে হেঁটে যেতাম "সিন্দুকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে" ও "সিন্দুকছড়ি নিম্ন মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে"। স্কুলের নিচের খালে ও পুকুরে গিয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদা মাটিকে ধুয়ে, তারপর ফুলপ্যান্ট, সেন্দেল পড়তাম। কোনদিন দুপুরের টিফিন/লাঞ্চ খেয়েছি মনে পড়েনা: প্রথমত ঘর তিন কিলো দূরে+ গ্রামীণ কৃষক পরিবার টিফিন কি জিনিস জানেই না+ তখন সিন্দুকছড়ি বাজারে গুটিকয়েক চা, চানাচুর ও বেলা বিস্কুট বিক্রেতা ছাড়া অন্য কোন দোকান ছিল না। গুইমারা-সিন্দুকছড়ি-মহালছড়ি সংযোগ সড়কটি ছিল ভাঙ্গা কাঁচা রাস্তা, দিনে মাত্র একটা চাঁদের গাড়ি আসত- যেত। তাই সকাল ৭-৮ টায় এক মুঠো পানি-ভাত যা খেয়ে যেতাম তা দিয়েই বিকাল ৪/৫টা পর্যন্ত স্কুলে কাটিয়েই ঘরে ফিরতাম। এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মংমং মারমা স্যার মাত্র মাসিক ১৫০ টাকায়, একদম কাঁচা বাংলাও বলতে পারেনা ছেলে ( তখনকার আমার নাম খুবেন্দ্র ত্রিপুরা) কে ইংলিশ গ্রামার সম্পূর্ণ ও সফলভাবে শিখিয়েছিলেন, তাও আবার আমি একলা ছাত্র, কারণ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা সবাই শুধু অংকই প্রাইভেট পড়ত নোভেল চাকমা স্যারের কাছে। মংমং স্যারের আগে-পড়ে আমি মনে হয় খুব বেশি ইংলিশ শিখিনাই। স্যারের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞতা, প্রণাম ও ঋনী থাকবো আজীবন।
মাঝখানের অনেক উঠনপতন, দুর্যোগ মোকাবিলা, সংগ্রাম, সাহস, ধৈর্য ও যন্ত্রণা সহ্যের কথা আরেকদিন বলব। আজ শুধুই আজকের কথাই বলি।
বিদেশে কাঙ্ক্ষিত প্রফেসরদের ম্যানেজ করে স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। এরপর এখানে এসে প্রফেসরের চিন্তা চেতনা বুঝতে পারা+ চাইনিজ ইউনিভার্সিটির পোর্টাল বুঝাটা আরও কষ্টের ছিল। কথা ও এম্যাপ না বুঝার কারণে কোথাও একলা বের হতেই পারি নাই পথ হারানোর ভয়ে। কেবল আমার ইয়ানটা ডরমিটরির বিল্ডিং ৩ এর ২১২ নং কক্ষ এবং বেম্বু ক্যাম্পাসের ইন্টেলিজেন্স ট্রান্সপোর্টেশন্স বিল্ডিং এর J1305 নং ল্যাব রুমই ছিল আমার জগৎ। কত অগণিত রাত জেগে জেগে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছিল, শুধু সাদা চুনের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো, চোখ প্রচণ্ড জ্বলে, পানি বেরিয়ে আসে, কিন্তু ঘুমাতে পারিনা এক ফোঁটাও। কারণ সাপ্তাহিক রিসার্চ মিটিংয়ে প্রগ্রেস অবশ্যই দেখাতে হবে সবার সামনে, ডেইলি কি কি করেছে সেটা প্রফেসরের ইমেইলে পাঠাতে হবে দিনশেষে। আর আমি এদিকে ChatGPT, GitHub... ঘেঁটে মেতে প্রজেক্ট, সোর্স কোড কম্পাইল, এক্সকিউট করতে করতে ক্লান্ত তবুও কাঙ্ক্ষিত টার্গেট ফলাফল আনতে পারি না, এর উপর Nvidia সংযুক্ত ভালো কনফিগারেশনের কম্পিউটার না থাকায় Pytorch সহ অনেক লাইব্রেরি ও প্রয়োজনীয় প্রোগ্রামিং কোড রান করতে পারিনা। আমার প্রফেসরের ডিকশনারিতে আবার না বলে কোন শব্দ নাই। শিডিউলে যার প্রেজেন্টেশন তাকে অবশ্যই ওইদিন মিটিংয়ে প্রেজেন্টেশন দিতেই হবে। কোন অজুহাত চলবে না। না হলে ওই মাসের স্কলারশিপ এভালুয়েশন নাম্বার দিবে না। সুতরাং ওই মাসের স্টাইপেন পাবেনা। কিভাবে চলবে সেটা তোমার ব্যাপার। সুতরাং অজুহাত দেখানোর বা পিছনে ফিরে আসার আর কোন সুযোগ নাই। অতঃপর কয়েকটা জার্নাল থেকে বারবার রিজেক্টশন খাওয়া! চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে বাবাকে ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ তে হারানো। কি অমানবিক অতীত!
তবে Nvidia, SSD card o Ram সহ সিস্টেম রিকোয়ারম্যান, রিসার্চ মেটেরিয়েলস ও টুলস কিনতে সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে এসেছেন আমার প্ররম শ্রদ্ধাভাজন আত্মীয় এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা মামু, কুমৈ এসপি ত্রিপুরা, জয় প্রকাশ ত্রিপুরা, এখানে ভর্তি হওয়ার সময় (২০২২ সাল জুন মাস) মোবাইল নেটওয়ার্ক বিহীন মহালছড়ি-রাঙ্গামাটি রোডে লোকাল বাসে ছিলাম -কুতুকছড়ি এলাকায় পৌঁছে একটু নেট পেয়েই মোবাইলে তাকিয়ে দেখি হঠাত ভর্তির টাকা পাঠাতে মেইল দিয়েছে ২ ঘন্টার মধ্যে - তখন আমার পরম বন্ধু জসিম ত্রিপুরাকে কল দিলে সে পাশে দাঁড়িয়েছে আমার, করোনার তান্ডব শেষে ২০২৩ সালের মে মাসে চায়নায় আসার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম - তখন আমার আর্থিক অবস্থার নাজুক অবস্থা দেখে নিজের প্রবিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিয়ে ফ্লাইট টিকেট কেটে দিয়েছিলেন অমল বিকাশ ত্রিপুরা দাদা - আগে এক ঘরে থাকার সময় থেকে ওনিই মূলত সবচেয়ে বেশিই পেরা দিয়ে আসছি্লেন আমাকে পিএইচডি করাতে, ওনার টেন্টেনে অবস্থা দেখলে বুঝার বাকি নাই ওনি যে কোন উপায়ে আমাকে পিএইচডি করিয়ে ছাড়বেই ছাড়বে, তাইতো কোন অজুহাতে আমি যেন পিএইচডির এই যাত্রা বাতিল না করি, সেজন্য ফ্লাইট টিকেট কেটে রেখে দিয়েছেন। এছাড়াও আমার পরিবারের সবাই বিশেষ করে জৈষ্ঠ ভ্রাতা প্রতিরঞ্জন অন্যতম, সঙ্গীনী কোয়েল ও অবুঝ মেয়ে তৈকথা, শ্বশুর বাড়ীর সবাই, নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা স্যার, অনামিকা আন্টি, আন্টি সাগরিকা রোয়াজা, প্রীতি কান্তি আংকেল, প্রশান্ত স্যার, আমা নিরুপমা, আন্টি খুকিবালা, প্রেম, উসান, সুমন এবং আমার প্রিয় রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলরসহ সকল সম্মানিত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি ও প্রানপ্রিয় শিক্ষার্থীরা, দেশের ও এখানকার আরো অনেক সিনিয়র (বিশেষ করে মুকুট সিকদার দাদা), বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাংখীবৃন্দ বিভিন্নভাবে আর্থিক, মানসিক সহযোগিতা দিয়েছিলেন। আমি তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে আমার এই অর্জনকে উতসর্গ করছি আর সবার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।”
📣 ড. সজীব ত্রিপুরা
Sajib Tripura Khuben
সহকারী অধ্যাপক
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়