20/03/2026
সময় নিয়ে লেখাটি পড়ুন। কিছু লেখা কেবল পড়ার জন্য না, বরং নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।
এই লেখাটা আমি তাদের জন্যই লিখেছি, যারা বিশ্বাস করে— 'আমিতো ঠিক আছি; সমস্যা তো অন্যদের, কিন্তু তবুও সম্পর্কগুলো কেন যেন টেকে না।'
আমরা সাধারণত নিজেদের ভুল দেখি না, সবসময় ভাবি 'আমি ঠিক আছি'। আমরা কেবল নিজের গল্পটাই দেখি। কিন্তু কখনো কখনো সেই গল্পটাই আমাদের অজান্তে অন্য কারও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজ যে বিষয়ের অবতারণা করছি তা কোনো বিচার না, কোনো দোষারোপ না—
এটা একটা আয়না।
হয়তো কিছুই খুঁজে পাবেন না।
হয়তো এমন কিছু খুঁজে পাবেন, যা আপনার জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
এবার চলুন, বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক।
মানুষ হিসেবে আমরা সবাই নিজের একটা ভালো ছবি দেখতে চাই। আমরা চাই— মানুষ আমাদের সম্মান করুক, গুরুত্ব দিক, আমাদের কথা শুনুক। এই চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো কখনো এই চাওয়াটা আমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়, যেখানে আমরা বুঝতেই পারি না যে—আমাদের আচরণ অন্যদের উপর কেমন প্রভাব ফেলছে।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় Narcism. আর যখন এটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত সমস্যায় রূপ নেয়, তখন একে বলা হয় Narcissistic Personality Disorder.
এখন প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করি।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন—
'মানুষ কি আমাকে ঠিকভাবে বুঝে না'?
অথবা, 'আমি এত কিছু করি, কিন্তু মানুষ আমাকে appreciate করে না কেন?
যদি এই অনুভূতিগুলো আপনার কাছে পরিচিত লাগে, তাহলে একটু থামুন, নিজের ভেতরে তাকান।
আপনি কিভাবে বুঝবেন যে, আপনি নার্সিসমে আক্রান্ত। আসুন, লক্ষণগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই।
নার্সিসম খুব কম সময়েই সরাসরি 'অহংকার' হিসেবে ধরা পড়ে। এটি অনেক subtle ভাবে কাজ করে। আপনি হয়তো খেয়াল করবেন—আপনি নিজের সিদ্ধান্তকেই শেষ কথা মনে করেন। কেউ ভিন্ন মত দিলে আপনার ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। সেটা রাগে প্রকাশ পায়, অথবা আপনি চুপ হয়ে যান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনে করেন—'ও বুঝে না।'
আবার এমনও হতে পারে, আপনি মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি (validation) খুব বেশি প্রত্যাশা করেন। কেউ যদি আপনার কাজের প্রশংসা না করে, সেটি আপনার মনে দাগ কাটে। আপনি হয়তো বাইরে কিছু বলেন না, কিন্তু আপনার ভেতরে একটা ক্ষোভ জমে।
আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো—আপনি সম্পর্কগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চান। সরাসরি না হলেও, এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেন যাতে শেষ পর্যন্ত আপনার মতটাই চলে। আপনি এটাকে
'আমি তো ঠিকটাই বলছি' বলে justify করেন।
সমালোচনাও আপনার কাছে খুব কঠিন লাগে। কেউ যদি আপনার ভুল ধরিয়ে দেয়, আপনি হয় সেটাকে অস্বীকার করেন, নয়তো সেই মানুষটিকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কখনো কখনো আপনি যুক্তি দিয়ে, কখনো আবেগ দিয়ে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানটাই ধরে রাখতে চান।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আপনি হয়তো খেয়াল করেন অথবা করেন না যে, মানুষ ধীরে ধীরে আপনার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কেউ সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু সম্পর্কগুলো আগের মতো আর উষ্ণ থাকে না।
এই জায়গাগুলো যদি আপনার জীবনের সাথে কোথাও মিলে যায়, তাহলে এটাকে দোষ হিসেবে না দেখে একটা সিগন্যাল হিসেবে দেখা ভালো। কারণ, সচেতনতা মানেই পরিবর্তনের প্রথম দরজা।
এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ খুব একটা সহজ না। চাইলেই নিজেকে বদলানো যায়না। এর জন্য একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয় এবং এই প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় নিজের সাথে সৎ হওয়া থেকে।
প্রথমে আপনাকে স্বীকার করতে হবে—'হ্যাঁ, আমার ভেতরে এমন কিছু আছে, যেটা অন্যদের কষ্ট দিচ্ছে।' এই স্বীকারোক্তি দুর্বলতা না, বরং শক্তি। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ এই জায়গায় আসতেই পারে না।
এরপর আস্তে আস্তে অন্যের দৃষ্টিকোণটা বোঝার চেষ্টা করতে হয়। যখন কেউ কিছু বলে, তখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে একটু থামা—'ও কেন এমনটা বলছে?' এই প্রশ্নটা নিজেকে করা।
একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হতে পারে—আপনি প্রতিদিনের কোনো একটি পরিস্থিতি নিয়ে ভাববেন, যেখানে আপনি একটু বেশি রিঅ্যাক্ট করেছেন। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন—'আমি অন্যভাবে কি করতে পারতাম?'
এরপর ধীরে ধীরে empathy তৈরি করবেন। এটা একদিনে আসবে না, কিন্তু সচেতনভাবে চর্চা করলে সময়ের ব্যবধানে এটা আসতে বাধ্য। আপনি যখন কারও সাথে কথা বলবেন, তখন নিজের কথা বলার চেয়ে শোনার দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিবেন।
তবে নিজের Realization-এ এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে কালবিলম্ব না করে একজন পেশাদার কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিন। এটা খুব কার্যকর হয়। কারণ, তারা এমন কিছু প্যাটার্ন দেখান, যেগুলো আপনি নিজে থেকে ধরতে পারেন নাই।
সবচেয়ে বড় বিষয়—নিজেকে প্রমাণ করার চেয়ে নিজেকে উন্নত করার দিকে ফোকাস করা মঙ্গলজনক। এই ছোট শিফট-টাই আপনার জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন এনে দিবে।
যদি পরিবর্তন না আসে—তাহলে কি হতে পারে? এই অংশে আপনাকে আমি একটু কঠিন, কিন্তু খুব বাস্তব কথা বলবো।
এই পর্যায়ে প্রথমে আসে সম্পর্কের ভাঙন। আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন না, কিন্তু একসময় দেখবেন—আপনার খুব কাছের মানুষগুলো emotionally দূরে চলে গেছে। তারা আপনার সাথে থাকে, কিন্তু আপনাকে connect করে না। আপনার কথা শোনে, কিন্তু মনে নেয় না।
পারিবারিক জীবনে এর প্রভাব আরও গভীর হয়। আপনার আচরণের কারণে সঙ্গী বা সন্তানের মধ্যে ভয়, অস্বস্তি বা মানসিক চাপ তৈরি হয়। তারা হয়তো আপনার সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিন্তু সম্পর্কটা ধীরে ধীরে formal হয়ে যায়—ভিতরে কোনো উষ্ণতা থাকে না।
সামাজিকভাবেও আপনি লোকেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। মানুষ আপনাকে সম্মান দেখাবে ঠিকই কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখবে। আপনি হয়তো জনপ্রিয় থাকবেন, কিন্তু যখন আপনি সত্যিকারের support চাইবেন, প্রকৃত অর্থে কেউ আপনার পাশে থাকবে না। আপনার ব্যক্তিজীবনে একসময় একটা শূন্যতা তৈরি হবে। আপনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবেন—আপনার চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু সংযোগ নেই। এই একাকিত্ব খুব নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, রাগ, অস্থিরতা—আপনার শরীরের উপরও প্রভাব ফেলবে। ধীরে ধীরে আপনার ঘুমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ক্লান্তি—এসব দেখা দিবে।
পরিশেষে, আপনাকে এইটুকুই বলবো—আপনি যদি এই লেখার কোথাও নিজেকে খুঁজে পান, তাহলে এটাকে সমস্যা হিসেবে না দেখে একটা সুযোগ হিসেবে দেখুন। সবাই নিজের দিকে তাকাতে পারে না। কিন্তু আপনি যদি তা পারেন— তাহলেই পরিবর্তনের পথটা আপনার জন্য খুলে যাবে। সিদ্ধান্ত আপনার।
Syndromes of Narcism