20/09/2023
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদায়ন ও ক্ষমতা :
জুডিশিয়াল সার্ভিস সম্পর্কিত ধারনা:
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসটি এখন সাংবিধানিকভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ১লা নভেম্বর ২০০৭ থেকে যা লিডিং কেইস মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মাধ্যমে আপিল বিভাগ কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত । জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য এখন রয়েছে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএসসি) । জুডিশিয়াল সার্ভিসের প্রতিটি সদস্য নিয়োগ পান সহকারী জজ হিসেবে , যা ১০০ মার্কস এর প্রিলি , ১০০০ মার্কস এর রিটেন এবং ১০০ মার্কাস এর ভাইভা পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে উত্তীর্ন হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত
হতে হয় । ১লা নভেম্বর ২০০৭ এর পূর্বে যা বিসিএস (বিচার) পরীক্ষা দিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হতে হতো ।
বিশ্লেষিত আইন : The Code of Criminal Procedure, 1898 (CrPC), The Code of Civil Procedure (CPC)ও The Civil Courts Act, 1881 (CCA)
নিম্নোক্ত আলোচনা এই আইনের কতিপয় ধারার বিশ্লেষন ।
আদালত মূলত ২ ধরণের......
১. দেওয়ানি আদালত(Civil Court)
২. ফৌজদারি আদালত(Criminal Court)
দেওয়ানি(Civil) আদালতের বিচারকদের পদক্রম (ধারা -৩ CCA)
(১) সহকারী জজ(Assistant Judge)
(২) সিনিয়র সহকারী জজ(Senior Assistant Judge)
(৩) যুগ্ম জেলা জজ (Joint District Judge)
(৪) অতিরিক্ত জেলা জজ (Additional District Judge)
(৫) জেলা জজ (District Judge)
@@@ ফৌজদারি(Criminal) আদালত ২ ধরণের (ধারা - ৬, CrPC)
➡️দায়রা আদালত(Court of Sessions) ও
➡️ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ( Court of Magistrates)
দায়রা আদালতের পদক্রম ও প্রকারভেদ
৩ প্রকার --- (ধারা -৯, CrPC)
১. দায়রা জজ
২. অতিরিক্ত দায়রা জজ
৩. যুগ্ম দায়রা জজ
@ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আবার ২ প্রকার
১. জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (Judicial Magistrate) , যারা সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণয়নকৃত বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে নিয়োজিত আছেন এমন সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগের
পান । (ধারা - ৬ ও ১১(১), CrPC)
২. নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (Executive Magistrate) , যারা সরকার কর্তৃক বিসিএস ( প্রশাসন) এ নিয়োজিত আছেন তাদের মধ্য থেকে । ( ধারা- ৬ ও ১০(৫), CrPC)
@জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের পদক্রম ও প্রকারভেদ
- ৪ প্রকার (ধারা -৬ CrPC)
১. চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট >অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (জেলার এখতিয়ারে)
চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট > অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (মহানগর এলাকার এখতিয়ারে)>
২. প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (জেলার এখতিয়ারে মূলত এই পদের নাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (মহানগর এলাকার এখতিয়ারে)>
৩. দ্বিতীয় শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (শুধু জেলার এখতিয়ারে, প্র্যাকটিসে এই পদের নাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট)>
৪. তৃতীয় শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ( শুধু জেলার এখতিয়ারে, প্র্যাকটিসে তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বলে কোন ম্যাজিস্ট্রেশিয়াল পদ নাই)
(চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুধু মহানগর এলাকায় আলাদাভাবে রয়েছে যারা প্রত্যেকেই প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট , যদিও আলাদাভাবে CrPc আইনে ইনারা যে প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তার উল্লেখ নেই কিন্তু CrPC আইন ব্যাখ্যা করলে তা সহজে বোঝা যায়)
উপরোক্ত ১-৪ পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটগণ সবাই জুডিশিয়াল(বিচারিক) ম্যাজিস্ট্রেট ।
@@@ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাথে দায়রা আদালতের ক্ষমতার পার্থক্য:-
➡️ম্যাজিস্ট্রেট আদালত :
ধারা-32 , CrPC অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ব্যতীত উপরোক্ত সকল প্রকারের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক দন্ড দেয়ার ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং নির্জন কারাবাস ।
২য় শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক দন্ড দেয়ার ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ৫,০০০ টাটা অর্থদণ্ড এবং নির্জন কারাবাস।
৩য় শ্রেনীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক দন্ড দেয়ার ক্ষমতা সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা অর্থদণ্ড।
➡️দায়রা আদালত :
∆যুগ্ম দায়রা জজ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও যেকোনো পরিমাণ জরিমানা করতে পারে।
∆অতিরিক্ত দায়রা জজ ও
∆দায়রা জজ মৃত্যুদণ্ডসহ যেকোনো দণ্ড প্রদান করতে পারে।
এখন, অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন সকল মামলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেই দায়ের করতে হয়(থানা যদি মামলা না নেয়)। ম্যাজিস্ট্রেট আসামীদের হাজির করে ক্ষমতা থাকলে নিজেই বিচার করতে পারে, না থাকলে যে আদালত ক্ষমতাসম্পন্ন সেই আদালতে বিচারের জন্য পাঠায়।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বিচারের জন্য নথি দায়রা আদালতে পাঠালেই কেবল সেই সব মামলার বিচার দায়রা আদালত করতে পারবেন এছাড়া সেসব মামলার বিচার করার জন্য আমলে নেওয়ার ক্ষমতা দায়রা আদালতের নেই । ( ধারা- ১৯৩, CrPC)
@@@ দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা:
দেওয়ানি আদালত মূলত জমি-জমা, সম্পত্তি, টাকা, পদ বা অফিস, আইনগত পরিচয় ইত্যাদি বিষয়ের মামলা বিচার করে।
ধারা- ৯, CPC অনুযায়ী পদ/অফিস ও সম্পত্তির অধিকারের সাথে জড়িত প্রশ্নে যে মোকদ্দমা দায়ের করা হয় তাকেই বলে দেওয়ানি মোকদ্দমা।
(১) সহকারী জজ ১৫ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি বিষয়ক মামলা, এবং পারিবারিক মামলার বিচার করেন।
(২) সিনিয়র সহকারী জজ ২৫ লাখ টাকা এবং
২৫ লাখ টাকার অধিক সম্পত্তির মূল্যের মামলা , যুগ্ম জেলা জজ বিচার করতে পারেন। অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজ আপিল ও রিভিশন মামলার বিচার করে থাকেন সাধারণ তবুও যেকোনো মূল্যের মামলার বিচার করার ক্ষমতা অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজের আছে ।
**** উপরের দেওয়ানি আদালতের বিচারকগণের সাথে ফৌজদারী আদালতের বিচারকগণ পদমর্যাদায় কে কার সমমান?
১.সহকারী জজ = জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট
২.সিনিয়র সহকারী জজ = সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট = ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
৩. যুগ্ম জেলা জজ = যুগ্ম দায়রা জজ। =
অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট = অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
৪. অতিরিক্ত জেলা জজ = অতিরিক্ত দায়রা জজ =
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট = চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
৫. জেলা জজ = দায়রা জজ
# # # ডুয়াল ক্ষমতা একসাথে চর্চা করেন :
যুগ্ম, অতিরিক্ত ও জেলা জজেরা একই সাথে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত হিসেবে বিচার করতে পারে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি ক্ষমতার সংমিশ্রণে একই ব্যক্তির পদের নাম তখন হয়-
•••যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ
(Joint District and Sessions Judge)
•••অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ
(Additional District and Sessions Judge)
•••জেলা ও দায়রা জজ
(District and Sessions Judge)
মজার ব্যাপার হলো অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট যথাক্রমে যুগ্ম দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার হলেও তারা কেবল ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাই প্রয়োগ করতে পারে । ( সেই ক্ষেত্রে ৫ বছর জেল দিতে পারে যা ধারা ৩২, CrPC অনুযায়ী সাধারণ দন্ড দেয়ার ক্ষমতা আর সরকার কর্তৃক ২৯গ ধারায় বিশেষ ভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত জেল দিতে পারে। আর অর্থদন্ড as usual ধারা- ৩২ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা করতে পারে ।
জেলার প্রধান বিচারক হচ্ছেন "জেলা ও দায়রা জজ।" একটি জেলায় অবস্থিত সকল ম্যাজিস্ট্রেট ও জজগণ প্রশাসনিকভাবে "জেলা ও দায়রা জজ"-এর অধীনস্থ থাকেন।
@@@ বিশেষ আদালত:
প্রচলিত দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের পাশাপাশি বিশেষ ধরনের মামলা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন বিশেষ আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইবুনাল বা আদালতের বিচারকগণ সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের দ্বারা বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে নিয়োজিত বিচারকগণের মধ্য হতে উক্ত বিশেষ আইনের বিশেষ বিধান অনুযায়ী নিয়োগ প্রাপ্ত হোন ও উক্ত বিশেষ আইনে বর্ণিত ক্ষমতা ব্যবহার করেন ।
লেখক :
এ্যাডভোকেট
সিব্বির আহম্মেদ সীমান্ত
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা ।