23/08/2026
ইলম অর্জন করলেই কি একটি মেয়ে দ্বীনদার হয়ে যায়?
অনেক বাবা-মা মনে করেন মেয়ে স্কুলে বা কলেজে পড়ছে, ভালো রেজাল্ট করছে, শালীন পোশাক পরছে, সময়মতো বাসায় ফিরছে, নামাজ পড়ছে, কুরআন পড়ছে—আলহামদুলিল্লাহ, আমার মেয়েকে নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই।
আবার কেউ কেউ মনে করেন—মেয়েকে বাসায় রেখেছি, মাদরাসায় পড়াচ্ছি, কুরআন হিফজ করাচ্ছি, দ্বীনি ইলম শেখাচ্ছি—ব্যস, আমার মেয়ের তরবিয়ত হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু
আপনার সন্তান কী পড়ছে—এটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে যা শিখছে, তা জীবনে কতটুকু আমল করছে।
একজন মেয়ে স্কুল-কলেজে গিয়ে কী করছে, বাবা-মা সবসময় তার শতভাগ জানেন না। বাইরে সে কেমন, কার সঙ্গে মিশছে, মোবাইলে কী দেখছে, কী ধরনের চিন্তা-ভাবনা তৈরি হচ্ছে—এসবও খেয়াল রাখা দরকার। খেয়াল রাখলেও জেন জি, জেন আলফা দের ফাকি আপনারা ধরতে পারবেন না হয়ত।
অন্যদিকে, একজন মেয়ে মাদরাসায় যাচ্ছে, কুরআন মুখস্থ করছে, হাদিস পড়ছে, দ্বীনি কিতাব পড়ছে—এগুলো নিঃসন্দেহে অনেক বড় নিয়ামত।
কিন্তু শুধু মুখস্থ করা আর সার্টিফিকেট অর্জন করাই দ্বীনদার হওয়ার শেষ কথা নয়।
হিফজ করেছে—কিন্তু কুরআন তার চরিত্রে নেই।
হাদিস পড়েছে—কিন্তু সুন্নাহ তার জীবনে নেই।
ফিকহ পড়েছে—কিন্তু আল্লাহর হুকুম মানার চেষ্টা নেই।
অনেক কিছু জানে—কিন্তু সেই জানা তাকে আল্লাহভীরু বানাচ্ছে না।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই ইলম তার জীবনে কতটুকু আলো তৈরি করল?
আমাদের সালাফ ও সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম ইলম অর্জন করতেন আমল করার জন্য। তাঁরা একটি বিষয় শিখতেন, তারপর সেটাকে জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতেন।
ইলম ছিল তাঁদের কাছে দায়িত্ব।
ইলম ছিল আমলের পথনির্দেশ।
ইলম ছিল চরিত্র পরিবর্তনের মাধ্যম।
আজ আমরা অনেক সময় ইলমকে শুধু অর্জনের বিষয় বানিয়ে ফেলেছি—
কত পারা মুখস্থ হলো, কত কিতাব পড়ল, কোন সার্টিফিকেট পেল, কোথায় পড়ল—এসব নিয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
সে কি সত্যবাদী হচ্ছে?
সে কি গীবত থেকে বাঁচছে?
সে কি পর্দা ও শালীনতা বুঝে মানছে?
সে কি বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ করছে?
সে কি নামাজকে জীবনের অংশ বানিয়েছে?
সে কি হারাম-হালালের ব্যাপারে সচেতন?
সে কি একা থাকলেও আল্লাহকে ভয় করে?
সে কি কুরআনের শিক্ষা তার চরিত্রে ধারণ করছে?
সে দৈনিক কি কি আমল করছে?
তার ইয়াকিনের কি খবর?
তার নফসের কি খবর?
এটাই তো তরবিয়ত।
মেয়েকে শুধু ঘরে রাখা তরবিয়ত নয়।
শুধু মাদরাসায় দেওয়া তরবিয়ত নয়।
শুধু হিফজ করানোও তরবিয়ত নয়।
শুধু নামাজ পড়তে বলা, কুরআন পড়তে বলা—এগুলোও তরবিয়তের অংশ, কিন্তু পুরো তরবিয়ত নয়।
তরবিয়ত হলো—
ইলম + আমল + আখলাক + আল্লাহর ভয় + আত্মশুদ্ধি।
আর এই কাজটা বিয়ের পর শুরু করার বিষয় নয়।
অনেকে ভাবেন,
“এখন ছোট, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”
“বিয়ের পর স্বামী বুঝিয়ে দেবে।”
“সংসারে গেলে নিজে থেকেই দায়িত্বশীল হয়ে যাবে।”
না।
বিয়ের পর নতুন করে তরবিয়ত তৈরি হয় না; বরং শৈশব-কৈশোরে যে তরবিয়ত দেওয়া হয়েছে, বিয়ের পর তারই অনেকটা প্রকাশ ঘটে।
আজ যে মেয়ের হাতে বাবা-মায়ের সময় আছে, আজ যে মেয়েকে ভালোবাসা দিয়ে বোঝানো যায়, আজ যে বয়সে অভ্যাস তৈরি করা যায়—তরবিয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় সেটাই।
তাই মেয়েকে শুধু জিজ্ঞেস করবেন না—
“কত পৃষ্ঠা পড়েছ?”
“কত পারা মুখস্থ হয়েছে?”
“পরীক্ষায় কত পেয়েছ?”
কখনো জিজ্ঞেস করুন—
“আজ তুমি আল্লাহর জন্য কী আমল করেছ?”
“আজ কাউকে কষ্ট দিয়েছ কি?”
“আজ কোনো গুনাহ থেকে নিজেকে আটকেছ কি?”
“তুমি যা শিখছ, তার কোনটা আজ জীবনে প্রয়োগ করেছ?”
কারণ আমাদের লক্ষ্য শুধু একজন ডিগ্রিধারী মেয়ে বানানো নয়।
শুধু একজন হাফেজা বানানো নয়।
শুধু একজন আলেমা বানানো নয়।
আমাদের লক্ষ্য—
একজন আল্লাহওয়ালা, আমলওয়ালা, উত্তম চরিত্রের, দায়িত্বশীল মুসলিম নারী তৈরি করা।
যে একা থাকলেও আল্লাহকে ভয় করবে।
মানুষ না দেখলেও হারাম থেকে বাঁচবে।
কুরআন শুধু মুখে নয়—চরিত্রে ধারণ করবে।
ইলম শুধু খাতায় নয়—জীবনে প্রকাশ করবে।
সেদিন আমাদের তাবলিগের এক সাথীর মেয়ের কথা জানলাম হাফেজা নয়, কিন্তু ৩০ দিনে রমজানে ৩০ বার খতম দিয়েছে, খুব আমলদার মেয়ে মাশা আল্লহ...
সন্তান কতটুকু পড়েছে—তার হিসাবের পাশাপাশি, সে কতটুকু বদলেছে—সেই হিসাবটাও আমাদের নিতে হবে।
আমরা এক সময় পাশে থাকব না, দুনিয়াতেই থাকব না হয়ত, তাই আমার সন্তান যেন আমার অনুপস্থিতিতেও আমল করে এমন বানিয়ে যেতে হবে ইন শা আল্লহ। কলিজার টুকরো সন্তান ইমান হারা হয়ে দুনিয়া ছাড়ুক কেউ চাইনা... তাইনা?
কারণ ইলমের সৌন্দর্য তার আমলে।
আর আমলের সৌন্দর্য তার ইখলাসে।
আর আমল করার জজবা তৈরী হয় দাওয়াতের মেহনত এ, তালিমের মজলিশে...
বাবা মা বাসায় আমল না করলে, সন্তান ও করবে না।
বাবা মা দাওয়াতের মেহনত না করলে সন্তান ও ইমানের মেহনত বুঝবে না...
নবী রাসুল গণ কেউ ই তাদের সন্তান দের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে যান নি, বানিয়ে গিয়েছেন মুত্তাকী, আমলদার, ইমানদার...
আমি আমার সন্তান কে বলি তোমার কোনো সার্টিফিকেট দরকার নেই আমার, তোমাকে কারো আগে হিফজ করতেও হবে না... দুনিয়াতে কে কি বলল জাজ করল তাও তোমার শুনতে হবে না...
আমি চাই তুমি আশেক হও মাহবুবের, তুমি আবেদা হও, তুমি দাঈ ইলাল্লাহ হও.. তুমি মুত্তাকী হও...
তোমার আমাকে ইনকাম করে খাওয়াতে হবে না, তোমার আমার রিজিক এর মালিক রব্বে মুস্তাফা
সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
হ্যা বাবা মা হেদায়েত দিতে পারে না, কারন হেদায়েত এর মালিক আল্লহ..
কিন্তু মেহনত করতে পারে...
কারন "মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে" - সুরা নাজম
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের শুধু শিক্ষিত নয়, মুত্তাকী, আমলওয়ালা ও উত্তম চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন। 🖤
#সন্তান