26/11/2025
মোবাইল আর স্ক্রিন আজকের যুগের সবচেয়ে নীরব ফিতনা।
আগে বাচ্চারা উঠোনে খেলত, বই হাতে ঘুরত,
এখন বেশিরভাগ ঘরেই দৃশ্যটা একটাই—
বাচ্চা চুপ থাকা মানে হাতে মোবাইল, সামনে স্ক্রিন।
আপনি হয়তো অনেকবার চেষ্টা করেছেন—
মোবাইল নিয়ে নিতে গেলে কান্না, চিৎকার, রাগ
“আর পাঁচ মিনিট”, “আরেকটা ভিডিও” বলতে বলতে
ঘন্টা পেরিয়ে যায়।
মনে হয়—
আমি কি সন্তানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি?
এই স্ক্রিন–আসক্তি কি তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে?
উলামায়ে কেরাম বলেন—
“শিশুর অন্তর নরম মাটি যেমন,
যেমন বীজ বপন করবেন, তেমনই গাছ উঠবে।”
তাই শুধু বকাঝকা, মুছেই নেওয়া না,
সাথে দরকার আল্লাহর কাছে ফিরে
সন্তানের জন্য কুরআনের দোয়া আর কিছু সহজ আমল।
সন্তানের স্ক্রিন–আসক্তি কমানোর কুরআনিক দোয়া
আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন,
যা শুধু নেক সন্তান চাওয়ার জন্যই না,
বরং তাদের অন্তর, চোখ আর অভ্যাসকে
আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার দোয়া।
আরবিঃ
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণঃ
রাব্বানা হাব্ লানা মিন্ আজওয়াজিনা ওয়া যুররিইয়্যাতিনা কুররাতা আ‘য়ুনিন,
ওাজ‘আলনা লিল্মুত্তাকীনা ইমামা।
অর্থঃ
“হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন
এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।”
— সূরা আল–ফুরকান: ৭৪
এই দোয়াটাই হচ্ছে—
সন্তানের চোখকে স্ক্রিন থেকে সরিয়ে
আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার
একটা শক্ত কুরআনিক দরখাস্ত।
সন্তানের স্ক্রিন–আসক্তি কমানোর আমল (ধাপে ধাপে)
যারা চান—
– বাচ্চা মোবাইল–কার্টুনের জিদ কমাক
– নিজেদের কথা একটু বেশি শুনুক
– ইবাদত, পড়াশোনা, বাস্তব জীবনের প্রতি আগ্রহ বাড়ুক
তারা নিচের আমলগুলো চেষ্টা করতে পারেন ইনশাআল্লাহ।
১। ফজরের পর সন্তানের নাম ধরে দোয়া
ফজরের নামাজ শেষ করে,
একটু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখুন।
১) তিনবার ইস্তেগফার
২) তিনবার দরুদ শরিফ
৩) তারপর উপরের দোয়াটি (সূরা ফুরকান: ৭৪)
কমপক্ষে ১১ বার পড়ুন।
প্রতি বার পড়ার সময়
মনে মনে সন্তানের নাম ধরে নিন
এবং আল্লাহর কাছে বলুন—
“হে আল্লাহ, এই সন্তানের চোখের প্রশান্তি
স্ক্রিনে নয়, আপনাকে মানা আর আপনার পথে চলায় দিন।”
এইভাবে একটানা অন্তত ২১ দিন চলতে দিন।
২। মোবাইল দেওয়ার আগে নরম শর্ত + নরম দোয়া
হঠাৎ করে সব মোবাইল কেটে দিলে
অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া হয়।
তার বদলে ছোট একটা নিয়ম করুন—
১) যখনই তাকে মোবাইল দেবেন,
তার আগে একবার বলুন—
“চলো, একটা ছোট দোয়া পড়ি।”
তার মাথায় হাত রেখে খুব ছোট করে বলুন—
আরবিঃ
اللّٰهُمَّ أَصْلِحْ قَلْبَهُ، وَاصْرِفْهُ إِلَى مَا تُحِبُّ وَتَرْضَى
উচ্চারণঃ
আল্লাহুম্মা আস্লিহ্ ক্বালবাহু, ওয়াস্রিফ্হু ইলা মা তুহিব্বু ওয়া তারদ্বা।
অর্থঃ
“হে আল্লাহ, তার অন্তরকে ঠিক করে দিন,
আর তাকে সেই দিকে ফিরিয়ে দিন যেটি আপনি পছন্দ করেন ও সন্তুষ্ট হন।”
দুই–তিন লাইন এভাবে বলেই
শুরুতে কাজ হবে না মনে হতে পারে,
কিন্তু বাচ্চার রুটিনে যদি
প্রতিবার স্ক্রিনের আগে
“দোয়া–মুহূর্ত” জুড়ে দেন—
তবে ধীরে ধীরে তার ছোট্ট মগজে
একটা অন্যরকম সংযোগ তৈরি হবে।
৩। রাতে ঘুমানোর আগে মাথায় হাত রেখে দোয়া
রাতে সে যখন ঘুমিয়ে পড়ে
অথবা ঘুমানোর আগ মুহূর্ত—
১) তার মাথায় হাত রেখে
উপরে দেওয়া দোয়াটি
(সূরা ফুরকান: ৭৪)
কমপক্ষে ৭ বার পড়ুন।
২) তারপর ধীরে ধীরে বলুন—
“হে আল্লাহ, এই সন্তানের সময়, চোখ আর হৃদয়
স্ক্রিনের পেছনে নষ্ট হয়ে যাক, এটা আমি চাই না।
আপনি তাকে নেক বানিয়ে দিন, উপকারী কাজে ব্যস্ত রাখুন।”
এই আমল বাবা–মা দুজনই করতে পারেন।
৪। কিছু ছোট বাস্তব পদক্ষেপ (দোয়ার সাথে সাথে)
দোয়া বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া
পূর্ণ হয় না।
তাই চেষ্টা করুন—
১) ঘরে অন্তত দিনে কিছু সময়
“নো মোবাইল–টাইম” নির্ধারণ করুন
(যেমন: খাবার সময়, মাগরিবের পরে ইত্যাদি)।
২) ওই সময়ে
নিজে কুরআন খুলে বসুন,
বাচ্চাকে ছোট–ছোট কিস্সা শোনান,
হনদানি, খেলা, গল্প—
যতটুকু পারেন, স্ক্রিনের বিকল্প তৈরি করুন।
৩) যখনই সে মোবাইল থেকে নিজে উঠে আসে,
সাথে সাথে বলে দিন—
“আজ তুমি খুব ভালো কাজ করেছো।”
বাচ্চা এই প্রশংসাকে ধরে রাখে।
এই আমল থেকে কী আশা করা যায় (ইনশাআল্লাহ)
যদি আপনি—
– ধৈর্য হারিয়ে চিৎকারের বদলে
দোয়া আর নরম পদক্ষেপ নেন
– নিজের রাগ কন্ট্রোল করে
আল্লাহর কাছে সন্তানের হৃদয় সোপর্দ করেন
তবে ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে—
✔ সন্তানের স্ক্রিন–জিদ কমবে
✔ মোবাইল ছাড়া সময় কাটানোর ক্ষমতা বাড়বে
✔ আপনার কথা শুনতে সহজ লাগবে
✔ ইবাদত, পড়াশোনা, বাস্তব খেলাধুলা—এসবের প্রতি আগ্রহ বাড়বে
✔ বাবা–মা–সন্তানের সম্পর্কের ভিতরেও নরম ভালোবাসা ফিরে আসবে
সন্তানের অন্তর, অভ্যাস আর ভবিষ্যৎ
শেষ পর্যন্ত আল্লাহর হাতেই—
আমরা শুধু চেষ্টা করি, আর তাঁর কাছে কান্না করি।
শেষ কথা:
মোবাইল আপনি হাতে দেন,
কিন্তু সন্তানের অন্তর কে কীতে ব্যস্ত রাখবেন—
সেটা আল্লাহ লিখে দেন।
তাই স্ক্রিন বন্ধ করার চেষ্টা যেমন দরকার,
তেমনই দরকার আল্লাহর কাছে কাঁদা—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানের চোখ
আপনার হালাল, উপকারী জিনিসের দিকে লাগিয়ে দিন।
হারামের দিকে নয়।”
আপনি কি আজ থেকেই
এই দোয়া আর ছোট ছোট আমলগুলো শুরু করবেন?
কমেন্টে লিখুন:
“ইনশাআল্লাহ সন্তানদের জন্য করবো”।