North Bengal Rural Development & Agro-Economic Research Institute

North Bengal Rural Development & Agro-Economic Research Institute

Share

Affiliated with top University and scholars for Research

06/11/2022

বিশ্বের তৃতীয় ধনী আদানি ছাড়ালেন জেফ বেজসকে

২০২২ সালের শুরুতে ফোর্বস ম্যাগাজিন ধনকুবেরের যে তালিকা প্রকাশ করে তাতে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন যথাক্রমে ইলন মাস্ক ও জেফ বেজস। আর দশম ও ১১তম ছিলেন ভারতের দুই ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানি। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একেবারে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন আদানি আর মুকেশ আম্বানি অষ্টমে। বড় অঙ্কের লোকসান গুনে চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছেন বেজস।

তবে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে মেটার সিইও জাকারবার্গের। তিনি ৬০ শতাংশ সম্পদ হারিয়ে তালিকায় ২৯তম স্থানে ছিটকে পড়েছেন। বছরের শুরুতে ছিলেন ১৫তম স্থানে। যদিও প্রথম স্থান ধরে রেখেছেন ইলন মাস্ক। তাঁর সম্পদ আরো বেড়েছে।

ফোর্বস ম্যাগাজিন রিয়াল টাইম বিলিয়নেয়ার র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, যুদ্ধ, মহামারি ও মন্দার প্রভাবে এ বছর বিলিয়নেয়ার ও তাঁদের সম্পদ কমেছে। গত এপ্রিলে ৩৬তম যে তালিকা প্রকাশ করা হয় তাতে বিলিয়নেয়ার ছিলেন দুই হাজার ৬৬৮ জন। কিন্তু এখন তা থেকে ৮৭ জন কমে গেছে। বিলিয়নেয়ারদের মোট সম্পদও কমে হয়েছে ১২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালের চেয়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলার কম।

বিলিয়নেয়ার সবচেয়ে বেশি কমেছে রাশিয়ায়। ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন হামলার জেরে দেশটিতে আগের বছরের চেয়ে বিলিয়নেয়ার কমেছে ৩৪ জন। ধনকুবের কমেছে চীনেও। দেশটিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের অভিযানের জেরে বিলিয়নেয়ার কমেছে ৮৭ জন।

রিয়াল টাইম বিলিয়নেয়ার তালিকায় দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ বিলিয়নেয়ার হিসেবে প্রথম স্থান ধরে রেখেছেন ইলন মাস্ক। বৈদ্যুতিক গাড়ি কম্পানি টেসলার সিইও ইলন মাস্কের নিট সম্পদ বেড়ে হয়েছে ২২৩.৮ বিলিয়ন ডলার। বছরের শুরুতে তাঁর সম্পদ ছিল ২১৯ বিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার কিনে নিয়েছেন।

ধনীর তালিকায় জেফ বেজসকে সরিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছেন ফরাসি ধনকুবের বার্নার্ড আরনল্ট ও তাঁর পরিবার। তাঁদের সম্পদ বেড়ে হয়েছে ১৫৪.৮ বিলিয়ন ডলার। বার্নার্ড আরনল্ট এলভিএমএইচের চেয়ারম্যান ও সিইও।

তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছেন ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানি। আদানি গ্রুপের এই চেয়ারম্যান এখন এশিয়ারও শীর্ষ ধনী। তাঁর নিট সম্পদ বেড়ে হয়েছে ১৩৩.৩ বিলিয়ন ডলার। চতুর্থ অবস্থানে নেমে এসেছেন জেফ বেজস। তাঁর সম্পদ কমে হয়েছে ১২৬.৯ বিলিয়ন ডলার। তিনি আমাজনের সিইও। বছরের শুরুতে বেজসের সম্পদ ছিল ১৭১ বিলিয়ন ডলার। পঞ্চম স্থানে আছেন বার্কশেয়ার হেথাওয়ের সিইও ওয়ারেন বাফেট। তাঁর সম্পদ ১০৪.৫ বিলিয়ন ডলার। ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর সম্পদ ১০২.৯ বিলিয়ন ডলার। সপ্তম স্থানে ওরাকলের চেয়ারম্যান ল্যারি এলিসন। তাঁর সম্পদ কমে হয়েছে ১০২.৫ বিলিয়ন ডলার। অষ্টম স্থানে রয়েছেন ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানি। তাঁর সম্পদ বেড়ে হয়েছে ৯০ বিলিয়ন ডলার। তিনি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। নবম স্থানে গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। তাঁর সম্পদ ৮৩.৫ বিলিয়ন ডলার। দশম স্থানে রয়েছেন কার্লোস স্লিম হেলু ও তাঁর পরিবার। তাঁদের সম্পদ ৮১.৬ বিলিয়ন ডলার। কার্লোস স্লিম হেলু আমেরিকা মোবিলের অনারারি চেয়ারম্যান। সর্বশেষ এই তালিকায় ২৯তম স্থানে ছিটকে পড়েছেন ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। তাঁর নিট সম্পদ কমে হয়েছে ৩৬.৪ বিলিয়ন ডলার। বছরের শুরুতে তাঁর সম্পদ ছিল ৬৭.৩ বিলিয়ন ডলার।

02/12/2021

অর্থনীতির গেম চেঞ্জার–১৭
ফলচাষে পালাবদলের নায়ক
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন অর্থনীতিতে। ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হয়ে উঠেছে চমকে ভরা জাদুর বাক্স। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত। তবে যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। এ সাফল্যের পেছনে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ যেমন ছিলেন, আছেন নীতিনির্ধারকেরাও। মূলত অর্থনীতির এসব অগ্রনায়ক, পথ রচয়িতা ও স্বপ্নদ্রষ্টারাই ৫০ বছরে বিশ্বে বাংলাদেশকে বসিয়েছেন মর্যাদার আসনে।
আমরা বেছে নিয়েছি সেই নায়কদের মধ্যে ৫০ জনকে। আমাদের কাছে তারাই অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’।

মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২১, ১৮: ০০
অ+
অ-
ফলচাষে পালাবদলের নায়ক
দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের কৃষি। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে ফল চাষের ক্ষেত্রে এসেছে অসামান্য সাফল্য। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুসারে ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে বছরপ্রতি ফলের উৎপাদন গড়ে ১১ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশ পারেনি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারায় অষ্টম, পেঁপেতে চতুর্দশতম। গত এক দশকে এ দেশের মানুষের ফল খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বাজারে এখন প্রায় সারা বছর পেয়ারা ও তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল কল্পনার বাইরে। দেশে ফল চাষ ও উৎপাদনের এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফলবিজ্ঞানীদের গবেষণা, জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেসব জাত ও প্রযুক্তিকে কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম।

ফল চাষে যাঁরা এই অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ড. এম এ রহিম। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফলের জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফলের ১২৩টি উন্নত জাত নিবন্ধিত হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে অনেক জাত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। উদ্ভাবিত এসব জাতের কোনো কোনো ফল চাষ করে অনেক কৃষক বছরে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা আয় করেছেন। এসব ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এ দেশের মানুষের ফল খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে, যা পুষ্টি উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ড. এম এ রহিম
ড. এম এ রহিমছবি: মো. আনোয়ার হোসেন
জার্মপ্লাজম হলো কোনো একটি জীবের বংশগত সম্পদ বা কৌলিসম্পদ। একই ফলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এর প্রতিটি জাত বা প্রকরণই একেকটি জার্মপ্লাজম। গাছের বীজ বা জীবন্ত গাছ জার্মপ্লাজম হিসেবে সংগ্রহ করে তার লালন-পালন করা হলো জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ।

শুরুর কথা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম এ রহিম ১৯৯১ সালে মাত্র ১ একর জমি নিয়ে ফল গাছের এই জার্মপ্লাজম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মত হলো, একসময় বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে এতটা সমৃদ্ধ ছিল না। খাদ্য উৎপাদন কম হলেও তা অন্য দেশ থেকে আমদানি করে তা পূরণ করা সম্ভব। তবে বিদেশ থেকে এত মানুষের জন্য পুষ্টি কেনা সম্ভব নয়। দেশের মানুষকে সুস্থ রেখে মেধাবী জাতি গঠনে পুষ্টি উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস বিভিন্ন ফল ও শাকসবজি। তাই তিনি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মো. আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে ফল গাছের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, উন্নয়ন এবং তা সারা দেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেন এই জার্মপ্লাজম সেন্টার।

প্রথমে এম এ রহিম আমের কয়েকটি জাত দিয়ে সেই ছোট জমিতে ফল গাছের জার্মপ্লাজম সেন্টার গড়ে তোলেন। তিন দশকের ব্যবধানে সেই সেন্টার বর্তমানে ৩২ একরে বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ফলের ১১ হাজার ৫২৮টি জার্মপ্লাজম। এসব জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করতে দেশের পাহাড়, উপকূল, বন-জঙ্গল যেমন ঘুরে বেড়িয়েছেন এম এ রহিম, সেই সঙ্গে বিশ্বের ৬০টি দেশেও গেছেন। বললেন, প্রায় ৮০ শতাংশ জার্মপ্লাজম তিনি সংগ্রহ করেছেন এ দেশ থেকে, যেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু ফল বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। যখন যেখানে যে ফলের যে রকম গাছ বা বীজ পেয়েছেন, সেগুলো এনে জার্মপ্লাজম সেন্টারে লাগিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

এম এ রহিম দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেশে চাষের উপযোগী বহু জাত উদ্ভাবন করেছেন। ফলে সেন্টারটি এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের দ্বিতীয় এবং দেশের বৃহত্তম ফল জার্মপ্লাজম সংগ্রহশালায়। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ফলের জার্মপ্লাজম সেন্টারের সঙ্গে এর একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। অনেক দেশেই এ ধরনের সেন্টার আছে যেখানে শুধু জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে লালন ও সংরক্ষণ করা হয় অনেকটা বোটানিক্যাল গার্ডেনের ধাঁচে। কিন্তু এই সেন্টারে শুধু সে কাজ না করে সংগৃহীত জার্মপ্লাজম নিয়ে গবেষণা, জাত ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং তা সম্প্রসারণ করে দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফলচাষিদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখছে।

বিজ্ঞাপন

সেন্টারের জার্মপ্লাজম বা কৌলিসম্পদ
ফল গাছের এই জার্মপ্লাজম সেন্টারে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় ২১০ প্রজাতির ফল গাছের এক সমৃদ্ধ বাগান। দেশি ফল গাছই বেশি। এম এ রহিম বললেন, গ্রামীণ জঙ্গল দিনে দিনে উজাড় হয়ে যাওয়ায় অনেক দেশি ফলের অপ্রচলিত ফল গাছ এখন বিলুপ্তির পথে। অথচ সেগুলো আমাদের মূল্যবান কৌলিসম্পদ। যেকোনো বিদেশি ফলের চেয়ে আমাদের দেশি ফলের পুষ্টি ও স্বাদ অনেক বেশি। তাই এগুলোকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।

সে জন্য এম এ রহিম প্রথমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশি ফলের যত জাতবৈচিত্র্য বা জার্মপ্লাজম পাওয়া যায়, সেগুলোকে সংগ্রহে করতে নজর দিয়েছেন। যখনই যেখান থেকে সংবাদ পান, সেখানে তা সংগ্রহ করতে ছুটে যান। তাঁর সেন্টারটিতে রয়েছে বিভিন্ন ফল গাছের মোট ১১ হাজার ৫২৮টি জার্মপ্লাজম। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আমের ১ হাজার ৮৫৮টি, লিচুর ৬৫টি, পেয়ারার ১ হাজার ১৬০টি, বিভিন্ন লেবুর ৬৬৯টি, কাঁঠালের ১০৫টি ও অপ্রচলিত ফলের ১ হাজার ২১৮টি জার্মপ্লাজম । বিদেশি ফলের জার্মপ্লাজম রয়েছে ১ হাজার ৯২৫টি।

এ ছাড়া ভেষজ গুণসম্পন্ন ফল গাছের জার্মপ্লাজম রয়েছে ১ হাজার ১৪টি। আছে আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, পেয়ারা, কুল ইত্যাদি প্রধান বা প্রচলিত ফলের গাছ। পাশাপাশি আছে বৈঁচি, লুকলুকি, দেশি গাব, বিলাতি গাব, অরবরই, আমলকী, আঁশফল, আতা, শরিফা, বেল, কতবেল, কাউফল, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, বুদ্ধনারকেল, কামরাঙা, করমচা, জাম, কাকজাম, বুটিজাম, ঢেপাজাম, বনজাম, খেজুর, গোলাপজাম, জলপাই, জামরুল, ডালিম, ডেফল, ডেউয়া, তেঁতুল, তৈকর, তুঁতফল, আমড়া, ফলসা, বকুল, পিরালু, বেতফল, মনফল, বিলিম্বি, সফেদা, জাম্বুরা, কালামানসি লেবু, জারা লেবু, লটকন ইত্যাদি অপ্রচলিত দেশি ফল। রক্তগোলা, গুটগুইট্টা, চাপালিশ কাঁঠাল ইত্যাদি পাহাড়ি ফলের গাছও আছে সেখানে। বিদেশি ফল গাছ আছে অ্যাভোকাডো, অলিভ, রাম্বুটান, টক আতা, পার্সিমন, আলুবোখারা, জয়তুন, ত্বীন বা মিসরীয় ডুমুর, ম্যাঙ্গোস্টিন, সালাক বা স্নেকফ্রুট, ড্রাগন ফ্রুট, জাবাটিকাবা, শানতোল, মিষ্টি তেঁতুল, আঙুর, কমলা ইত্যাদি।

স্বীকৃত জাত, কাজের স্বীকৃতি
এই জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফলের এ পর্যন্ত মোট ১২৩টি জাত সরকারের স্বীকৃত ও অনুমোদিত জাত হিসেবে এ দেশে চাষের জন্য নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে আমের ২৫টি, কাঁঠালের ১টি, লিচুর ৫টি, পেয়ারার ১০টি জাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে বীজশূন্য পেয়ারা ও বীজশূন্য বিলাতি গাব, মিষ্টি কামরাঙা, তিনফলা আম ইত্যাদি। তাঁর এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এম এ রহিম প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মেডেল, মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেলসহ পেয়েছেন ৬০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদক, পুরস্কার ও স্বীকৃতি। এই সেন্টারে এ পর্যন্ত ফল চাষ নিয়ে গবেষণা করে ৪২ জন ডক্টরেট (পিএইচডি) ও ২৫০ জন স্নাতকোত্তর (এমএস) ডিগ্রি পেয়েছেন।

ফলের আলোয়
এম এ রহিমের জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত অনেক জাতের ফলে আলোকিত হয়েছে বাংলাদেশের বহু ফলের বাগান। আনন্দের সঙ্গে এম এ রহিম বললেন, এই সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত ফলের প্রথম জাতটি ছিল ‘বাউকুল ১’। প্রথম নিবন্ধিত সেই জাতের কুল এ দেশে কুল চাষে এক বিপ্লব নিয়ে আসে। শীতকালে যেখানে এ দেশে ফল নেই, সেখানে শীতকালে বাউকুল ফলচাষিদের কাছে বিরাট স্থান করে নেয়। দেশে প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে বাউকুলের বাগান গড়ে উঠেছে, যেখান থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টন কুল উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি এই জাতের চাষ বিদেশেও সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এই সেন্টার থেকে তাঁর একজন পিএইচডি ছাত্র মনিরুজ্জামান বাউকুল ও আপেল কুলের সংকরায়ণ করে উদ্ভাবন করেছেন হাইব্রিড জাতের ‘বলসুন্দরী কুল’। কুলের এ জাতও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

উদ্ভাবিত ‘বাউ ড্রাগন ফল ১’ ও ‘বাউ ড্রাগন ফল ২’ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে; বিশেষ করে বান্দরবানসহ পার্বত্য অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা ও উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকাতেও এসব জাতের ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। ড্রাগন ফলের আরও দুটি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। সেগুলোরও সম্প্রসারণ চলছে। ইতিমধ্যে ‘বাউ আম ১৪’ বা ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও শহরে চাষ হচ্ছে, যার মাধ্যমে ফলচাষিরা যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন।

ড. এম এ রহিম
ড. এম এ রহিমছবি: মো. আনোয়ার হোসেন
ফলচাষে বিপ্লব
অনেক ফলচাষি এই জার্মপ্লাজম সেন্টারের উদ্ভাবিত ফলের নতুন নতুন উন্নত জাত চাষ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, এর পেছনে রয়েছে এম এ রহিমের অবদান। অনেক গরিব কৃষক ফল চাষ করে ধনী হয়েছেন, আবার অনেক ধনী ব্যক্তিও তাঁদের বিপুল জমি ফেলে না রেখে ফল চাষে আগ্রহী হয়েছেন।

এম এ রহিম বললেন, চুয়াডাঙ্গার হাফেজ আক্তার হোসেন গত বছর ৩০ বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করে প্রায় ১ কোটি টাকার কুল বিক্রি করেছেন। ঈশ্বরদী, পাবনার শাহজাহান আলী বাদশা ওরফে পেঁপে বাদশা বাউকুল চাষ করে পেয়েছেন ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। নাটোরের গোলাম নবী ৫ হাজার পিলারে ড্রাগন ফলের চাষ করে প্রতি বছর দু–তিন কোটি টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করছেন। নাটোরের সেলিম রেজা মাত্র ২ একরে ড্রাগন ফলের চাষ করে গত বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেছেন। এ রকম উদাহরণের যেন শেষ নেই।

এম এ রহিম আরও বলেন, ‘বাউ আম ২৩’ ও ‘বাউ আম ২৪’ নামে আমের দুটি নতুন জাত সম্প্রতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাত দুটির আম অনেক বড়, প্রতিটি আমের গড় ওজন দেড় থেকে দুই কেজি, নাবি জাত বিধান। তাঁরা প্রত্যাশা করছেন, এই জাত দুটিও জনপ্রিয় হবে।

30/05/2021

দুই বছরে রিজার্ভ পৌঁছবে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে

বদরুল আলম

মে ২৮, ২০২১

মহামারীতে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রয়াস চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২০ সাল শেষে অর্থনীতির প্রতিটি খাতে করোনার অভিঘাত নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব ও এর সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি নিয়ে বণিক বার্তার ধারাবাহিক আয়োজন দ্বিতীয় পর্ব

কভিডের মধ্যেও রেমিট্যান্সে ভর করে রিজার্ভের আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫ বিলিয়ন (সাড়ে ৪ হাজার কোটি) ডলারের কাছাকাছি। এতে ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়ের বড় উল্লম্ফন। দেশের রিজার্ভ তহবিলের এ ঊর্ধ্বমুখী গতি বজায় থাকবে সামনের দিনগুলোয়ও। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ বলছে, আগামী দুই বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যে রিজার্ভের আকার বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৭০ বিলিয়ন (৭ হাজার কোটি) ডলারের কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দেশের বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধের সক্ষমতা বিচারের অন্যতম নির্দেশক হলো তার রিজার্ভ তহবিলের আকার। বাংলাদেশে বিদেশী মুদ্রার ভাণ্ডার বা রিজার্ভের প্রধান উৎস দুটি—রফতানি ও প্রবাসী আয়। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ, ঋণ ও দান-অনুদানও রিজার্ভের আকার নিরূপণে ভূমিকা রাখছে। রিজার্ভ তহবিলের অর্থকে মনে করা হয় যেকোনো দেশের নিরাপত্তাবলয়। যে দেশের মুদ্রা ও রিজার্ভ যত শক্তিশালী, ওই দেশের প্রতি বিদেশী বিনিয়োগকারী ও দাতা সংস্থাগুলোর আস্থাও তত বেশি। বর্তমান কভিড প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অনেক দেশের রিজার্ভ বেশ নাজুক পরিস্থিতিতে নেমে এসেছে। বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের রিজার্ভ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গত বছর কভিডের মধ্যেও রিজার্ভের আকার ব্যাপক হারে বেড়েছে। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় ও বিদেশী ঋণের উচ্চপ্রবাহ। আবার আমদানিতে অর্থ পরিশোধ হ্রাস ও ধীরগতির বিপরীতে রফতানি পুনরুদ্ধারের কারণেও রিজার্ভের আকার বেড়েছে।

ঐতিহাসিক প্রবণতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রিজার্ভ নিয়ে চলতি ও আগামী দুই বছরের পূর্বাভাস তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে দীর্ঘদিন ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ঘুরপাক খেয়েছে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ। ২০১৯ সাল শেষে দেশে রিজার্ভের আকার ছিল ৩ হাজার ২৬৯ কোটি (৩২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন) ডলার। এরপর গত বছরের এপ্রিলে তা গতি পেতে শুরু করে। ডিসেম্বরের মধ্যেই তা ৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। বছর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৯৭ কোটি ডলারে। চলতিটিসহ আগামী দুই বছরেও রিজার্ভের এ ঊর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে এবার রিজার্ভের আকার দাঁড়াতে পারে ৪ হাজার ৯৫৯ কোটি ডলারে। আগামী বছর এ তহবিলে যুক্ত হবে আরো প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। সে অনুযায়ী ২০২২ সাল শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়াতে পারে ৫ হাজার ৯৪২ কোটি ডলারে। এ ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকলে ২০২৩ সাল শেষে রিজার্ভের সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৯১৫ কোটি বা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার কারণেই কভিডকালেও রিজার্ভের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। এ সময়ে প্রবাসীরা দেশে বিপুল পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এ রেমিট্যান্সের প্রভাবেই আগামী দিনগুলোতেও ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে আগামীতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। আবার রফতানি পুনরুদ্ধারেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত না হয়ে ঘাটতির দিকেও যেতে পারে। এজন্য রিজার্ভ বৃদ্ধি নিয়ে প্রত্যাশার পাশাপাশি শঙ্কাও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্র, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের (ইন্টারমিডিয়েট গুডস) বেশির ভাগেরই আমদানি এখন নেতিবাচক ধারায় আছে। অন্যদিকে তেমন গতিশীল নয় রফতানি প্রবৃদ্ধিও। এ ধরনের পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করছেন রিজার্ভ বেড়ে যাওয়া মানেই যে সুখবর, বিষয়টি তা নয়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমার হাতে টাকা আছে, আমি বালিশের নিচে রেখে শুয়ে থাকলাম। শুনতে ভালো হতে পারে, কিন্তু টাকা যদি ভোগে বা বিনিয়োগে কাজে না আসে তাহলে সে টাকার উপকারিতা থাকে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী রিজার্ভ বাড়তে পারে, কিন্তু সেটা অর্থনীতির উন্নতির ক্ষেত্রে খুব সুখদায়ক না। কারণ রিজার্ভের উৎসগুলোতে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক, রেমিট্যান্স এলেও তার ব্যবহার হচ্ছে না। আবার বিদেশী অনুদানের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। এগুলো অর্থনীতির জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৮ ডলার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের যাত্রা হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বের শক্তিশালী ১১টি মুদ্রায় রিজার্ভের অর্থ সংরক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি আছে ইউএস ডলারে। প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার এ ভাণ্ডার থেকে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বর্তমানে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ভারতের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৫৩৬ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছিল বাংলাদেশের রিজার্ভ। আর পাকিস্তানের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে নেপালের রিজার্ভ উন্নীত হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রিজার্ভ রয়েছে চীনের। দেশটির রিজার্ভের আকার ৩ হাজার ১৯৮ বিলিয়ন ডলার।

মহামারীর কারণে বাংলাদেশীদের বিদেশযাত্রা ছিল প্রায় বন্ধ। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় কমেছে ব্যাপক হারে। এ অবস্থায় রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন ও রফতানি আয়ের ইতিবাচক ধারা বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়িয়েছে। এজন্য বাজার থেকে প্রতিনিয়ত ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি না হলে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা কম। দেশের রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আসছে না। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের কারো কারো আশঙ্কা, রিজার্ভ-সংক্রান্ত পূর্বাভাস বাস্তবে ধরা না-ও দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বিভিন্ন কারণে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। তবে বিদেশে নতুন কর্মী না গেলে এ প্রবৃদ্ধি টিকবে না। করোনা শুরুর পর বিদেশ থেকে শুধু কর্মী ফেরত আসার গল্পই শুনছি। এভাবে ফিরতে থাকলে রেমিট্যান্স না বেড়ে উল্টো কমে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি না হলে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা কম। দেশের রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আসছে না। তবে ভারত ও মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এক্ষেত্রেও আমাদের ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। সব মিলিয়ে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। এ অবস্থায় দুই বছর পর দেশের রিজার্ভ ৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে, এমন সম্ভাবনা আপাতত দেখছি না।
>>প্রথম পর্ব : ২০২৩ সালের মধ্যে রফতানি স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে

25/05/2021

ডেল্টা প্ল্যান-২১০০
বাস্তবায়ন না হলে ক্ষতির মুখে পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতি
banglatribune

সরকারের এক শ’ বছরের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তাবিয়ত না হলে দেশের সামষ্টিক এবং খাতভিত্তিক অর্থনীতি যথেষ্ট ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সহনীয় অবস্থায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভৌত সম্পদ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রতিবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এ ছাড়াও বাড়বে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম পর্যায়ে এ সকল ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয় সমানুপাতিক হারে বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা কমিশন ডেল্টা প্ল্যানে বলা হয়েছে, শতবর্ষী এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পানি, পরিবেশ, ভূমি, কৃষি (বন, প্রাণিসম্পদ, এবং মৎস্য) ইত্যাদি খাতের কৌশল প্রণয়ন এবং যথাযথ বিনিয়োগ, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন, ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন হবে।

পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নে প্রতিবছর মোট দেশজ আয়ের প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। এখন এ ব্যয় জিডিপির শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।

বর্তমান বিনিয়োগ এবং বিদ্যমান দেশজ আয় ব্যবহার করে পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রকল্পের জন্য প্রাক ব্যায়ের মাত্রা ২০১৬ অর্থবছরের ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ২৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।


বিনিয়োগ অগ্রাধিকার

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর ধারণা অনুযায়ী মোট জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অর্থায়ন বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় বেসরকারি খাত থেকে এবং ২ শতাংশ সরকারি খাত থেকে নির্বাহ করতে হবে। সরকারি খাত থেকে পাওয়া ২ শতাংশ থেকে দশমিক ৫ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট দেড় শতাংশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় ব্যয় করা হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে রক্ষাণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খাত বেশ অবহেলিত এবং এ ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণও মোট দেশজ আয়ের দশমিক ১ শতাংশের বেশি নয়। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না করা হলে পানিসম্পদ খাতে বিদ্যমান অবকাঠামোর স্থায়িত্বের দ্রুত অবনতি ঘটবে এবং পরে এ সকল অবকাঠামো আরও বেশি ব্যয়ে পুনর্নিমাণ করতে হবে বলে মনে করে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ডেল্টা প্ল্যানে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রকল্প গ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, ব-দ্বীপ পরিকল্পনার প্রকল্পগুলো শুধু ভৌত বিনিয়োগ নয়, বরং অধিকতর গবেষণা, জ্ঞান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা উত্তরণেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর বেশিরভাগ সরকারি অর্থায়ন বন্যা থেকে রক্ষা, নদী ভাঙন, নিয়ন্ত্রণ, নদীশাসন, এবং নাব্যতা রক্ষাসহ সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন হবে। এগুলো এখন বাংলাদেশের অগ্রাধিকার পাওয়া বিনিয়োগ খাত। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ মোট ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বিনিয়োগের প্রায় ৩৫ শতাংশ।

এগুলো অত্যন্ত পুঁজিঘন বিনিয়োগ বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন। যা শতবর্ষী পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা ও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্বলিত প্রধান নগরগুলোতে পানি সরবরাহ, পয়ঃনিস্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি খাতে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বিনিয়োগ থেকে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হবে।

অধিকন্ত, ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকার পানি ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে ২০৩০ সাল নাগাদ ডেল্টা প্ল্যানের মোট বিনিয়োগের প্রায় ২০ শতাংশ প্রয়োজন হবে।


বিনিয়োগ পরিকল্পনা

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ব-দ্বীপ বিনিয়োগ পরিকল্পনায় যাচাই-বাছাই শেষে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ভৌত অবকাঠামোগত প্রকল্প ৬৫টি এবং ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা বিষয়ক প্রকল্প।

এ সকল প্রকল্পে মোট মূলধন বিনিয়োগ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পরবর্তী ৮ বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শুরু করা যেতে পারে। যদিও বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসূচির প্রকৃতি অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন পরবর্তী কয়েক দশকেও সম্প্রসারিত হবে।

উন্নয়ন অভিযোজি ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা (এডাপটিভ ডেলটা ম্যানেজমেন্ট- এডিএম) নীতি অবলম্বনে সমন্বিত ও ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণে বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় ব-দ্বীপ বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) কর্তৃক পানিসম্পদ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা থেকে অগ্রাধিকার পাওয়া মোট ১৩৩টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর জন্য প্রাক্কলিত মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৩ বিলিয়ন টাকা।

প্রাপ্ত প্রকল্প প্রস্তাবগুলো অভিযোজি ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণে যাচাই শেষে শ্রেণিভুক্ত করে ৮০টি প্রকল্প বিনিয়োগ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প অভিযোজি ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা এবং তা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এর এক বা একাধিক অভিষ্ট অর্জনে সহায়ক কিনা তার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী ও ডেলটা গভর্ন্যান্স কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ মান্নান জানিয়েছেন, ডেলটা প্লানের প্রথম ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ প্রস্তাবও রয়েছে। এসব বিনিয়োগ কার্যকর হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। তবে বাস্তবায়নটা চ্যালেঞ্জিং। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতেই সরকার কাজ করছে।

উল্লেখ্য, ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের আদলে গ্রহণ করা শতবর্ষী ডেলটা প্ল্যান তথা ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’কে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে দেখছে সরকার। বন্যা, নদী ভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে আলোচিত ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় ছয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- বন্যা, নদী ভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পনি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্য নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন। এরইমধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ‘ডেলটা গভর্ন্যান্স কাউন্সিল’। ২০২০ সালের ১ জুলাই ১২ সদস্যের এই কাউন্সিল গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রীকে ডেলটা গভর্ণ্যান্স কাউন্সিলের ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয়েছে।

ডেলটা গভর্ন্যান্স কাউন্সিলে সদস্য হিসেবে রয়েছেন কৃষিমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, নৌ পরিবহন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, পানি সম্পদমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্যকে এই কাউন্সিলের সদস্য সচিব করা হয়েছে।

02/05/2021





নদীর অর্থনীতি: চিলমারীকে তুলনা করছেন ইউরোপের গ্লাসগো ও লিভারপুল শহরের সঙ্গে!
-শেখ রোকন

আজ যা বিপুল বাস্তব, আগামীকাল তা অবিশ্বাস্যও মনে হতে পারে। আর এই অঞ্চলে যুগে যুগে বড় পরিবর্তনগুলো ঘটিয়েছে নদীই।
যেমন, এখন কে বিশ্বাস করতে চাইবে যে, মাত্র দুই শতাব্দি আগেও চিলমারী ছিল বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর! ১৮৩৮ সালে প্রকাশিত 'দ্য হিস্ট্রি, এন্টিকটিস, টপোগ্রাফি, অ্যান্ড স্ট্যাটিসিটকস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া' বইতে ইংরেজ সার্ভেয়ার রবার্ট এম. মার্টিন দেখাচ্ছেন, চিলমারী 'শহরের' তুলনায় উলিপুর ও 'কুড়িগঞ্জ' গ্রাম মাত্র। তিনি হিসাব দিচ্ছেন, চিলমারীতে যখন ৪০০ বাড়ি, তখন উলিপুরে ১০০ ও কুড়িগ্রামে ২০০ বাড়ি। চিলমারীর বেশিরভাগ বাড়িই বাগানশোভিত।
তখনকার 'বারুনী মেলা' বা এখনকার অষ্টমী স্নানে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে, উত্তরপ্রদেশের বেনারশ থেকে উড়িষ্যার পুরী, পুন্যার্থী আসতো চিলমারীতে। মার্টিন লিখছেন, চিলমারীর 'বারুনীচরে' প্রতিবছর ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ দর্শনার্থী মিলিত হতো। আর চিলমারী থেকে বাংলা ও আসামের যে কোনও জায়গায় নৌপথে যাতায়াত করা যেতো। বাংলার সঙ্গে আসাম, ভুটান, নেপাল, কোচবিহার রাজ্যের বাণিজ্যপথের প্রবেশমুখ ছিল এই চিলমারী। অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় তৎকালীন চিলমারীকে তিনি তুলনা করছেন ইউরোপের গ্লাসগো ও লিভারপুল শহরের সঙ্গে!
তিস্তা গতিপথ পরিবর্তন করে গঙ্গার বদলে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হওয়ার পর থেকে ভাঙতে থাকে চিলমারীর ভূগোল ও কপাল। যতই পড়ছি ততই বিস্মিত হচ্ছি..

29/04/2021

সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে বাজার চড়া তরমুজের

বরগুনাসহ দেশের সর্বত্রই বেড়েছে তরমুজের দাম। ক্রেতারা বলছেন, কৃষকের ক্ষেতের চেয়ে বাজারে কয়েকগুণ বেশি তরমুজের দাম। তবে বেড়ে যাওয়া এই দামের সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। কৃষকরা বলছেন, বাজারে চাহিদার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগীরা ইচ্ছেমতো দামে তরমুজ বিক্রি করছেন। এতে একদিকে যেমন ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত কৃষক, অপরদিকে চড়া দামে তরমুজ কিনতে হয় ক্রেতাদের। রাজধানী শহর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। অথচ মাঠে পাইকাররা কিনে নিচ্ছেন তরমুজের ক্ষেত।
তরমুজ ক্ষেত
তরমুজ ক্ষেত
৫ এপ্রিল দেশব্যাপী প্রথম লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। এর আগেই কিছু পাইকার কৃষকদের কাছ থেকে কমমূল্যে তরমুজ কিনে রাখে। এরপর প্রচণ্ড দাবদাহ, রমজানের কারণে বাজারে তরমুজের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। আর এ সুযোগে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্র দাম বাড়িয়ে বাজারে তরমুজ বিক্রি করছে। রমজানের আগে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া তরমুজের এখন বাজারে দাম ৪০০-৫০০ টাকা। অর্থাৎ, রমজানের আগে থেকে এ পর্যন্ত বাজারে চারগুণেরও বেশি দামে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে।

বরগুনার স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রচুর পরিমাণ তরমুজের সমারোহ। বাজারের বেশ কয়েকটি আড়তে তরমুজ বোঝাই। আড়তের সামনেই বরগুনার তরমুজের মূল বাজার। এখানের খুচরা বিক্রেতা মিলন চন্দ্র রায় বলেন, রোজার শুরুতেই চাহিদা বেড়েছে তরমুজের, বেড়েছে দামও। লকডাউনের শুরুর তিনদিন তরমুজের চাহিদাও যেমন কম ছিল, দামও ছিল অর্ধেক। অর্থাৎ, এখন যে তরমুজটি ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়, সেটি ওই সময়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হতো।

আনিসুর রহমান ও আবদুল মন্নানও একই বাজারের খুচরা বিক্রেতা। এরা আড়ত থেকে তরমুজ কিনে বাজারে বিক্রি করেন। তারা জানান, সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দামে তিনি তরমুজ বিক্রি করেছেন। মাঝারির সাইজের এক একটি তরমুজ ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া মোটামুটি ছোট সাইজের ১০০ ও ৫/৬ কেজি ওজনের এক একটি তরমুজ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় তরমুজ বিক্রি হয়।
তরমুজ ক্ষেত
তরমুজ ক্ষেত
যেভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছায় তরমুজ

চাষি থেকে ক্রেতা এর মাঝখানে তিন হাত ঘুরে বাজারের ক্রেতাদের কাছে তরমুজ পৌঁছায়। প্রথমে ক্ষেত থেকে পাইকাররা স্থানীয় সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে তরমুজ ক্রয় করেন। এরপর পাইকাররা এসব তরমুজ জেলা ও জেলার বাইরের আড়তে সুবিধাজনক দামে বিক্রি করেন। আড়ত থেকে আবার খুচরা বিক্রেতা কিনে নিয়ে হাটে বাজারে তরমুজ বিক্রি করেন। এদের প্রত্যেকেই লাভে তরমুজ বিক্রি করে থাকেন। আবদুল হক নামের একজন পাইকার বলেন, এ বছর বরগুনার বালিয়াতলী থেকে ১২ লাখ টাকার তরমুজ ক্রয় করেছেন। এসব তরমুজের একাংশ যশোরের রূপসী বাজারের আড়তে বিক্রি করেছেন, বাকিগুলো বরগুনা বাজারে। তিনি বলেন, ক্ষেত থেকে ক্রেতা এর মাঝখানে প্রতিটি তরমুজের দামের ব্যবধান হয় গড়পরতা ৫০-১০০ টাকার মতো।

কৃষকের তরমুজে প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বেশ কিছু তরমুজ চাষির সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ওই কৃষকরা জানান, তরমুজ বিক্রির মৌসুমে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি সিন্ডিকেট করেন। এদের বাইরে গিয়ে কোনও কৃষক যেমন তরমুজ বিক্রি করতে পারেন না, তেমনি কোনো পাইকার কিনতেও পারবেন না। সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই পাইকার ও চাষিদের তরমুজ বিকিকিনি করতে হয়। এই চক্রটি কৃষকের ক্ষেত পর্যবেক্ষণে রাখে। এদের বাইরে কোনও চাষি যেমন ক্ষেত বিক্রি করতে পারেন না, তেমনি কোনও পাইকারও ক্ষেত ক্রয় করতে পারবেন না।
তরমুজ
তরমুজ
কৃষকদের বক্তব্য

পাইকাররা তরমুজ কিনতে আসার পর এরা পাইকারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেরা প্রভাব খাটিয়ে বাজারের চেয়ে কম দামে তরমুজ কিনে নেন। এরপর পাইকারদের কাছে লাভে ওই তরমুজ বিক্রিও করে দেন। অর্থাৎ, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কোনও পাইকার তরমুজ কিনতে পারেন না, আবার কৃষক সরাসরি পাইকারের কাছে তরমুজ বিক্রি করতে চাইলে এরা মাঝখানে বাঁধ সাধেন। ভয়-ভীতি দেখান। হুমকি দেন। কোনও পাইকার বা কৃষক সরাসরি তরমুজ ক্রয়-বিক্রয় করলেও রেহাই নেই, এদের টাকা দিতেই হয়।

তরমুজ চাষী মোহাম্মদ রিপন মিয়া, ইব্রাহীম মিয়া, আবদুর রশিদ, কামাল মুন্সি, বাবুল মুন্সিসহ বেশ কয়েকজন চাষি জানান, তারা সপ্তাহখানেক আগে পাইকারদের কাছে তরমুজ বিক্রি করে দিয়েছেন। তখন তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, লকডাউনে পরিবহন পাওয়া যাবে না, ক্রেতা নেই, এসব কারণে দাম কম। কিন্তু, এক সপ্তাহের ব্যবধানে এখন যে দাম, তার অর্ধেকেরও কম দামে তরমুজ বিক্রি করতে হয়েছে।

বরগুনা সদরের বালিয়াতলীর তরমুজ সিন্ডিকেট

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চালিতাতলী এলাকায় দেলোয়ার গাজীর নেতৃত্বে সবুজ গাজী ও মনির খান, সিরাজ, মিরাজ, মাসুমসহ বেশ কিছু ব্যক্তি এই সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয় তরমুজ চাষিদের অভিযোগ।

একই ইউনিয়নের পরীরখাল, বানাই, লতাকাটা, গর্জনবুনিয়া, আমতলী-নিমতলী এলাকার তরমুজ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই এলাকার তরমুজ বিক্রি করতে হয় স্থানীয় আবদুল হালিম নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে। তিনি পাইকারদের নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কৃষকদেরও তার মাধ্যমেই তরমুজ বিক্রি করতে হয়। কৃষকরা জানান, এ বছরও আবদুল হালিমের মাধ্যমে তারা পাইকারদের কাছে তরমুজ বিক্রি করেছেন। আবদুল হালিম মাঝখান থেকে বিনা পরিশ্রমে তাদের উৎপাদন করা ফসলে ভাগ বসাচ্ছে দেখার কেউ নেই।

মোজাম্মেল হোসেন নামের একজন তরমুজ চাষি জানান, এ বছর লকডাউনে পরিবহন সংকটের কারণে বাজারে তরমুজের চাহিদা নেই এমন কথা বলে সিন্ডিকেট চক্র কম দামে তরমুজ কিনে নিয়েছেন। বাজারে এখন যে দামে তরমুজ বিক্রি হয়, কৃষক তার অর্ধেকের কম দামে তরমুজ বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ তরমুজ চাষি ইতোমধ্যে পাইকারদের কাছে তরমুজ বিক্রি করে ফেলেছেন।

বাবুল মুন্সি বলেন, ‘আমরা ক্ষেত থেকে যে তরমুজটি ১০০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন বাজারে সেই তরমুজের দাম ৪০০ টাকা। যদিও আমাদের লস হয়নি, কিন্তু, ওরা অনেক বেশি দরে বিক্রি করছে দেখে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের কাছ থেকে তারা ছোট-বড় সাইজ দেখে দাম ঠিক করেছে। এখন বাজারে নাকি বিক্রি করছে কেজি দরে। আমরাও চাই মানুষ পিস হিসেবে তরমুজ কিনে খাক। এত দামে যেহেতু বেচি নাই, তাই ক্রেতার ওপর এত চাপ পড়ুক তা চাই না।’
খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে তরমুজ
খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে তরমুজ
তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেট চক্র পাইকারদের সঙ্গে আঁতাত করে তাদের টাকা দিয়েই কৃষকদের কাছ থেকে তরমুজ কিনে নেয়। এরপর সেই তরমুজ তারা আবার পাইকারদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে। এদের কারণে পাইকাররা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে তরমুজ কিনতে পারেনা।

সিন্ডিকেটের হোতাদের বক্তব্য

বরগুনা সদরের তরমুজ সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা আবদুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বালিয়াতলী তরমুজ চাষি কল্যাণ সমবায় সমিতি রয়েছে। কৃষকদের সুবিধার্থে সমিতির মাধ্যমে তরমুজ বিক্রি হয়। তবে বাধ্যবাধকতা নেই, কৃষক চাইলে সমিতির বাইরে গিয়েও তরমুজ বিক্রি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আমি পাইকার ও ক্রেতাদের সহযোগিতা করি। এখানে কোনও সিন্ডিকেট নেই।

দেলোয়ার গাজী বলেন, আমরা কোনও সিন্ডিকেট করি না। দূরের পাইকাররা এসে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে, আমি তাদের তরমুজ ক্রয়ে সহযোগিতা করি। এর বিনিময়ে তিনি খুশি হয়ে যদি কিছু টাকা দেন তাই নিয়ে থাকি। আমাদের এলাকার কৃষকদের ঠকিয়ে পাইকারদের জিতিয়ে লাভ করার মতো মানসিকতা আমাদের নেই।

আমতলী উপজেলায় তরমুজের অবস্থা

আমতলী উপজেলার বাঁধঘাট চৌরাস্তা, একে স্কুল ও গাজীপুর বন্দরের তরমুজ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বেশ ক্রেতা রয়েছেন। মাঝারি ধরনের একটি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বড় ধরনের তরমুজ ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; যা গত বছরের তুলনায় চারগুণ।

কুকুয়া ইউনিয়নের চুনাখালী গ্রামের ওহাব মৃধা, বাহাউদ্দিন হাওলাদার ও রাজ্জাক মৃধা বলেন, ‘তিনজনে যৌথভাবে ৩৬ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা। ক্ষেত থেকে ৩১ লাখ টাকা বিক্রি করেছি। কিন্তু, বাজারে এর দাম এখন ৭০ লাখ টাকারও বেশি।

আমতলীতেও সক্রিয় সিন্ডিকেট

আমতলীর গাজিরপুর, সোনাখালী, কুকুয়া, চুনাখালীসহ তরমুজ চাষ হয় এমন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুর বন্দরের সোহেল রানা নামের এক ব্যক্তি পাইকারদের নিয়ন্ত্রণ করেন। এলাকার কিছু সহযোগীদের নিয়ে তিনি সিন্ডিকেট করেছেন। তাদের মাধ্যমেই ক্ষেত থেকে পাইকাররা তরমুজ কিনেন, চাষিদেরও বিক্রি করতে হয়। এ কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্যে তরমুজ বিক্রি করতে পারছেন না। এ বছরও সোহেলের মাধ্যমেই অধিকাংশ কৃষকের তরমুজ বিক্রি করতে হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে সোহেল গাজী বলেন, সিন্ডিকেট কথাটি সত্য নয়, আমি সহযোগিতা করি যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্যে তরমুজ বিক্রি করতে পারেন। পাইকারদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখি, যাতে সময়মতো তারা তরমুজ ক্রয় করতে পারে।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয়ের বাজার অনুসন্ধানকারী টি. এম. মাহবুবুল হাসানের যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে তরমুজের দাম বেশি। তরমুজ চাষীরা কৃষি বিভাগের সহায়তা নিয়ে বিক্রি করতে চাইলে আমরা তাদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনও প্রকার বাধার সৃষ্টি যাতে না হয় সে ব্যাপারে আমরা কৃষি বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের সহযোগিতায় সহায়তা করতে প্রস্তুত।
Barguna Tormuj News Pic 26-04-21 (3)
তরমুজ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ আবদুল ওয়াদুদ বলেন, কৃষি বিভাগের সহায়তায় এ বছর বরগুনায় তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। ন্যায্যমূল্যে উৎপাদিত কৃষিপণ্য তরমুজ বিক্রিতে কৃষক সহায়তা চাইলে কৃষি বিভাগ তাদের সম্ভব সব সহায়তা দিতে প্রস্তত রয়েছে।

বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বরগুনা কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি রবি মৌসুমে বরগুনা জেলায় চার হাজার ৪৩ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। জেলার বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলায় মূলত তরমুজের আবাদ হয়। এর মধ্যে বরগুনা সদরে দু’হাজার ২০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। এবারও সবচেয়ে বেশি তরমুজ চাষ হয়েছে বরগুনা সদর উপজেলার এম,বালিয়াতলী ইউনিয়নে। আমতলী কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ বছর আমতলীতে তরমুজের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯৯০ হেক্টর। ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। আমতলি উপজেলার চাওড়া ও হলদিয়া এই দুই ইউনিয়নে মোট এক হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Dhanmondi 32, Sukrabad
Dhaka