10/08/2026
এসএসসি আর ও লেভেল: একটা পরীক্ষায় হোঁচট খেলেই কি সব শেষ হয়ে যায়?
ধরুন আপনার পাশের বাসার একটা ছেলে আছে, অঙ্কে একদম কাঁচা কিন্তু ইংরেজি আর জীববিজ্ঞানে দুর্দান্ত। আরেকটা মেয়ে আছে, অঙ্কে চ্যাম্পিয়ন কিন্তু ভাষার বিষয়ে হিমশিম খায়। এখন বাংলাদেশের এসএসসি সিস্টেমে এই দুইজনকেই একই বছরে, একসাথে ১১টা বিষয়ে বসতে হবে। একটা বিষয়ে খারাপ করলে সেই দাগ পুরো রেজাল্টে লেগে যাবে, কিছু করার নেই। অথচ ক্যামব্রিজ বা এডেক্সেলের ও লেভেল সিস্টেমে এই দুইজনই চাইলে নিজের শক্তির জায়গা ধরে বিষয় বেছে নিতে পারত, আলাদা আলাদা সেশনে ভাগ করে পরীক্ষা দিতে পারত। এই একটা পার্থক্যই আসলে দুটো সিস্টেমকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করায়।
এসএসসি চলে অনেকটা "সব নয়তো কিছুই না" নীতিতে। একই শিক্ষাবর্ষে ১১টা বিষয়ে বসতে হয় (বাংলা আর ইংরেজির দুটো করে পত্র মিলিয়ে মোট ১৩টা উত্তরপত্র), আর ফলাফল আসে একসাথে, একটাই জিপিএ। একটা বিষয়ে খারাপ করলে বাকি সব বিষয়ে যত ভালোই করুন না কেন, জিপিএ নেমে যাবে। সিস্টেমটা যেন ধরেই নেয় প্রত্যেক শিক্ষার্থী সব বিষয়ে মোটামুটি সমান পারদর্শী হবে। কিন্তু বাস্তবে এমন ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেউ ভাষায় ভালো, কেউ অঙ্কে, কেউবা বিজ্ঞানে। এসএসসি এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের জায়গাটা রাখে না।
এখন একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার। কেউ এক দুই বিষয়ে ফেল করলে তাকে পুরো ১১টা বিষয় আবার দিতে হয় না, শুধু ফেল করা বিষয়টাই পরের বছর দিতে পারে, আর আগের পাস করা বিষয়ের রেজাল্ট থেকেই যায়। কিন্তু আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে এখানেই। সেই সুযোগটা মিলবে পরের বছরের নিয়মিত পরীক্ষার সাথেই, মানে পুরো একটা বছর অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এই এক বছরে সহপাঠীরা কলেজে চলে যায়, আর যে ফেল করেছে সে থেকে যায় ঝুলে, না স্কুলে না কলেজে। আগে তো সব বিষয়ে পাস না করলে কলেজে ভর্তিই হওয়া যেত না। সম্প্রতি একটা সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে দুইটা পর্যন্ত বিষয়ে ফেল করলেও অস্থায়ীভাবে কলেজে ভর্তি হওয়া যাবে, তবে এটা এখনো ব্যতিক্রম, সাধারণ নিয়ম না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা বিষয়ে ফেল মানে একটা পুরো বছর হারানো।
ও লেভেল সিস্টেমটা পুরোপুরি আলাদা চিন্তা থেকে তৈরি। এখানে প্রতিটা বিষয় একটা আলাদা ইউনিটের মতো কাজ করে। শিক্ষার্থী চাইলে একই সেশনে সব বিষয় দিতে পারে, আবার চাইলে দুই তিনটা সেশনে ভাগ করেও দিতে পারে, যেমন মে জুনে কিছু বিষয়, অক্টোবর নভেম্বরে বাকিগুলো। প্রতিটা বিষয়ের রেজাল্ট আলাদা থাকে, একটাতে খারাপ করলে অন্যগুলোতে তার প্রভাব পড়ে না। যে বিষয়ে দুর্বল, সেটা এড়িয়ে গিয়ে বা পরে আলাদাভাবে রিসিট দিয়ে শক্তিশালী বিষয়গুলো দিয়েই একটা ভালো প্রোফাইল বানানো যায়। এই সুবিধা পরের ধাপেও কাজে লাগে, বিশ্ববিদ্যালয় বা পলিটেকনিক ভর্তির সময় অনেক প্রতিষ্ঠান দুই সেশনের ফলাফল একসাথে মিলিয়ে নেয়। যেমন সিঙ্গাপুরে দুইটা আলাদা সেশনের ও লেভেল রেজাল্ট একসাথে জমা দিয়ে জুনিয়র কলেজ বা পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়া যায়। নাইজেরিয়ার মতো দেশেও এই একই দর্শন চলে, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় দুই সেশনের রেজাল্ট মিলিয়ে ভর্তির যোগ্যতা যাচাই করে, যদিও মেডিসিন বা ল এর মতো প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান শুধু এক সেশনের রেজাল্টই চায়।
তবে এখানে একটু সাবধান থাকা ভালো। "কোনো পেনাল্টি নেই" কথাটা সব জায়গায় সমানভাবে সত্যি না। প্রতিষ্ঠানভেদে, দেশভেদে নিয়ম বদলায়, আর কিছু প্রতিযোগিতামূলক কোর্স শুধু এক সেশনের রেজাল্টই মানে। তাই সুবিধাটা বাস্তব, কিন্তু নিঃশর্ত না। কেউ যদি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে চায়, তাকে আগে থেকেই সেই প্রতিষ্ঠানের নীতি যাচাই করে নিতে হবে।
যে শিক্ষার্থী একটা দুইটা বিষয়ে দুর্বল কিন্তু বাকি সবকিছুতে ভালো, তার জন্য এসএসসির এই একসাথে সব বিষয়ের চাপটা মানসিকভাবে খুব ভারী হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটা বিষয়ে ফেলের ভয় পুরো পরীক্ষাটাকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, আর বছরের পর বছর এই একই চাপ একজনের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে। ও লেভেলের মডিউলার কাঠামোয় এই ঝুঁকিটা ভাগ হয়ে যায়। দুর্বল বিষয়ে বাড়তি সময় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, দরকার হলে আবার বসা যায়, আর ততক্ষণে ভালো বিষয়গুলোর রেজাল্ট নিয়ে একটা শক্তিশালী প্রোফাইল ধরে রাখা যায়। একটা দুর্বলতা এখানে কাউকে "ফেল করা ছাত্র" বানিয়ে দেয় না।
এই "সব বিষয় একসাথে, একটাই সুযোগ" মডেলের সবচেয়ে ভারী দাম দিতে হয় গ্রামের মেয়েদের। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশগুলোর একটা, আর গ্রামের সমাজে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে পরিবারের ধৈর্য প্রায়ই একটামাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এসএসসিতে ফেল করা একটা মেয়ের জন্য এটা শুধু পড়াশোনার একটা ধাক্কা না, এটাই প্রায়ই তার পুরো শিক্ষাজীবনের শেষ বিন্দু হয়ে যায়। ঢাকা বোর্ডের একটা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রায় চল্লিশ শতাংশই ইতিমধ্যে বিবাহিত, আর এই সংখ্যায় মেয়েদের অংশটাই বড়। "ম্যাট্রিক ফেল" শব্দটা এখনো বাংলাদেশের সমাজে একটা ভারী কলঙ্কের মতো কাজ করে। একবার ফেল করলেই পরিবার ধরে নেয় মেয়েটার আর পড়াশোনায় "ভবিষ্যৎ নেই", আর তখনই বিয়ের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার চাপ শুরু হয়।
এই পুরো ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে যায় যখন মনে রাখি একটা মাত্র বিষয়ে দুর্বলতাও একটা গোটা বছর কেড়ে নেয়। একটা মেয়ে হয়তো শুধু গণিত বা ইংরেজির একটা পত্রে দুর্বল, বাকি সব বিষয়ে ভালো, তবু তাকে গোটা এক বছর ঘরে বসে থাকতে হয় পরের সুযোগের জন্য। গ্রামের পরিবারে এই অপেক্ষার বছরটাতেই বিয়ের প্রস্তাব চলে আসে, আর্থিক চাপ বাড়ে, বা "মেয়ে এমনিতেই অনেক পড়েছে" গোছের মনোভাব মাথাচাড়া দেয়। তারপর সেই ফেল করা বিষয়ের পরীক্ষায় সে আর কখনো বসেই না। গবেষণা বলছে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝরে পড়া আর বাল্যবিবাহ একে অপরকে টেনে নিয়ে যায়, পরীক্ষায় খারাপ ফল বিয়ের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে, আর বিয়ে হয়ে গেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই জায়গাতেই ও লেভেলের মতো মডিউলার সিস্টেমের গুরুত্বটা চোখে পড়ে, যদিও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এর খরচ আর প্রাপ্যতা এখনো বাস্তবসম্মত না, সেটা একটু পরেই বলছি। কিন্তু ভাবুন তো, একটা মেয়ে যদি তার দুর্বল বিষয়টা আলাদাভাবে, পরে সুবিধামতো সময়ে দেওয়ার সুযোগ পেত, আর সেই সময়টায় ভালো বিষয়গুলোর রেজাল্ট নিয়ে এগিয়ে যেতে পারত, তাহলে পরিবারের কাছে তাকে "ব্যর্থ" প্রমাণ করার সুযোগটাই অনেক কমে যেত। একটামাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ওপর একটা মেয়ের গোটা ভবিষ্যৎ ঝুলিয়ে রাখাটা কোনোভাবেই ঠিক না, আর এই বাস্তবতা বদলানো দরকার, চাই সেটা হোক সিস্টেম সংস্কার দিয়ে বা কোনো বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি দিয়ে।
এখন আসল প্রশ্নটা হলো, দুটো সিস্টেম আসলে কোথায় গিয়ে একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়? প্রথম ধাক্কাটা লাগে "ন্যায্যতা" শব্দটাকে ঘিরে। এসএসসি ন্যায্যতা মানে বোঝে সমতা, সবাই একই দিনে একই কাঠামোয় একই শর্তে পরীক্ষা দেয়, তুলনা করা সহজ, পরিচালনা করাও সহজ। এই অভিন্নতার কারণেই সরকারি বৃত্তি, কোটা আর ভর্তি প্রক্রিয়ার সাথে এসএসসির দীর্ঘদিনের সংগতি আছে, আর খরচও এত কম যে প্রায় সব পরিবারের নাগালে থাকে। ও লেভেল একদম উল্টো পথে হাঁটে, এখানে ন্যায্যতা মানে নমনীয়তা, প্রত্যেকের শক্তি দুর্বলতা অনুযায়ী আলাদা সুযোগ তৈরি করা। মজার ব্যাপার হলো, এসএসসি যেটাকে "সবার জন্য সমান সুযোগ" বলে দাবি করে, ও লেভেলের চোখে সেটাই আসলে মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা। কারণ বাস্তবে কেউই সব বিষয়ে সমান দক্ষ না, আর একটামাত্র মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার চাপ সৃজনশীলতা বা প্রায়োগিক দক্ষতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না বলেও সমালোচনা আছে।
দ্বিতীয় ধাক্কাটা লাগে ঝুঁকি আর সময়ের হিসাবে। এসএসসিতে একটা বিষয়ের দুর্বলতা পুরো জিপিএ আর ভবিষ্যৎ সুযোগকে টেনে নামিয়ে দেয়, আর ফেল করলে কার্যত একটা গোটা বছর নতুন করে শুরু করতে হয়, মানসিক চাপ আর সময়ের বিশাল ক্ষতি নিয়ে। ও লেভেল ঠিক এই ঝুঁকিটাকেই ভেঙে ছড়িয়ে দেয়, একটা বিষয়ে খারাপ ফল অন্য বিষয়ের ফলাফলকে ছোঁয় না, সেশন ভাগ করে দেওয়া যায় বলে চাপ কমে আর প্রস্তুতির সময় বাড়ে। কিন্তু এই সুবিধার একটা উল্টো পিঠও আছে। সেশন ভাগ করলে পুরো প্রক্রিয়া লম্বা হয়ে যায়, ফলাফলের জন্য বেশি অপেক্ষা করতে হয়, আর এই নমনীয়তার দাম দিতে হয় নগদ টাকায়, পরীক্ষার ফি, বই, কোচিং সব মিলিয়ে খরচ এত বেড়ে যায় যে সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যায়। এসএসসি যেখানে প্রায় সবার জন্য সুলভ, ও লেভেলের নমনীয়তা সেখানে মূলত সামর্থ্যবানদের জন্যই বাস্তবসম্মত থেকে যায়।
তৃতীয় ধাক্কাটা স্বীকৃতি আর সমতুল্যতা নিয়ে। এসএসসি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে এতটাই মিশে আছে যে জাতীয় পর্যায়ে এর মান নিয়ন্ত্রণ আর তুলনা করা সহজ। ও লেভেল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, বিদেশে পড়তে যাওয়ার সময় সুবিধা দেয়, কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি চাকরি, কোটা বা কিছু ভর্তি প্রক্রিয়ায় এর সমতুল্যতা নির্ধারণ নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হয়। আর ও লেভেলের নিজের ভেতরেই "কোনো পেনাল্টি নেই" প্রতিশ্রুতিটা সবজায়গায় খাটে না, সব প্রতিষ্ঠান বা দেশ দুই সেশনের রেজাল্ট সমানভাবে নেয় না, প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে প্রায়ই এক সেশনের শর্ত থাকে। মোটকথা, একটা যা দেয় (সাশ্রয় আর স্বীকৃতির স্থিরতা), অন্যটা ঠিক সেখানেই খামতি রাখে (নমনীয়তা আর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বিনিময়ে), আর কোনোটাই একা পূর্ণাঙ্গ সমাধান না।
শেষ পর্যন্ত দুটো সিস্টেমই একই জায়গায় পৌঁছাতে চায়, শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাই করা। শুধু পথ দুটো আলাদা। এসএসসি ধরে নেয় সবাই সমান, ও লেভেল ধরে নেয় সবাই আলাদা। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে লাখো লাখো শিক্ষার্থী একই কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায়, ও লেভেলের নমনীয়তা সবার জন্য বাস্তবসম্মত না, খরচ আর প্রাপ্যতার কারণে। কিন্তু এসএসসি সিস্টেমেও যদি বিষয়ভিত্তিক নমনীয়তা বা মডিউলার মূল্যায়নের কিছুটা অংশ আনা যায়, তাহলে হয়তো একটা বিষয়ে হোঁচট খাওয়া লাখো মেধাবী ছেলেমেয়ের স্বপ্ন এত সহজে ভেঙে পড়বে না।
Article was written by me, data research was done using Claude. grammer and language checked checked by Claude. Image generated by ChatGPT