18/08/2023
যেভাবে বিসিএস ক্যাডার হলাম ---- Riponarya Kormokar
41th BCS Education Cadre (Recommended)
এক টুকরো সপ্ন নিয়ে এক অজপাড়াগাঁ থেকে বেড়ে ওঠা আমি প্রিয় বিদ্যাপিঠ থেকে সকলের ন্যায় অনার্স শেষ করি। এরপর গুটিকয়েক চাকরির আবেদন করার দারুণ ঢাকা, রাজশাহীতে পরীক্ষা দেওয়ার সূচনা হয়। যে কোন একটা জবের বড়ই প্রয়োজন। কিন্তু আমার আকাশে তিমির কালো মেঘে ভরা। চাকুরির বাজারে আমি মি. জিরো। আসলেই জিরো। এক লাইন ইংরেজি লিখলে ৩-৪ টা বানান ভুল হয়। তবে ম্যাথে মুটামুটি ভাল, এটাই জীবনের আলো। বাকি সবে প্রাণপাখি মোর গেলো গেলো।
যা হোক, টুকটাক চাকুরির পড়াশুনা আর বিকেলে একটু ঘুরাঘুরি করে বেশ যাচ্ছিলো। সময় আত্রাই নদীর চেয়ে দ্রতগতিতে বয়ে গিয়ে মাস্টার্স পরীক্ষার মুখোমুখি নিয়ে আসে। এ দিকে হঠাৎ ভূমি অফিসের একটা পরীক্ষায় টিকে যায়। দুটি ধাপ। লিখিত>ভাইভা। ওদিকে পুলিশের এসআই রিটেন। বাহ সকিনা বাহ!🙄
ওই ভাইভাতে ফেল করি। আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, তবুও একটা ভাইভা=একটা চুড়ান্ত অভিজ্ঞতা। এসআই রিটেনও ফেল। মাস্টার্স শেষ, এবার পুরাই এতিম এতিম লাগে। বিসিএস এর ভূত এর মধ্যে মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে পরিতোষ বন্ধু। আমার মাথায় কিছু ঢুকলে ব্যাস, কাম সারা। আমি রিপন ঘাটের মরা, সারাদিন ওটা নিয়েই পড়ে থাকি।
পাথর বৃষ্টির ন্যায় দিনরাত পড়া শুরু করলাম। ছোট্ট মাটির ঘরটাকে মেসের রুম বানিয়ে ফেললাম। পেপার নিতাম শুধু শুক্রবার করে ইংরেজী। রোজ পেপার নেওয়ার মত সামর্থ আমার ছিল না। আমার রুটিন, সকালে এক ব্যাস প্রইভেট পড়াই, দেন সকালের খাবার খেয়ে ৯ টার দিক আমার পড়া শুরু ১ টার দিকে ওঠে স্নান(গোসল), খাওয়া, রেস্ট। ৩টায় আবার পড়া শুরু। ৪-৫ টা দিক আবার এক ব্যাস পড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়। সন্ধ্যান্তে পড়া শুরু ৯টায় ওঠি, আবার খেয়ে ১০থেকে ১১ অথবা ১২টা পর্যন্ত পড়ি।
আচ্ছা ভাই, সারাদিন প্রাইভেট, আর পড়াশোনা করেন, মোবাইল টিপেন কখন? উ: দুপুর ও রাতে খাওয়ার পর রেস্ট মানেই হাতে মোবাইল 😁😄। তবে হ্যা, দুনিয়ার সব আপডেট ফোনেই নিতাম, পেজে, গ্রুপে এখন যেমন লিখছি, এরম লেখা পড়তাম, গাইড লাইন ফলো করতাম । তখন তো পেজ, গ্রুপ হাতে গুনা যেত।
যা হোক, মাঝে মাঝেই রাতে বাসে উঠে ঘুম দিতাম, সকালে ওঠে দেখি ঢাকায়। পরীক্ষা দিতে আর কি। দিয়েই বাসে চড়ে বসতাম, কারণ পরের দিন সকালে প্রাইভেট পড়াতে হবে। বিকেলে পরীক্ষা হলে, সকালে বাড়ি পৌছে একটু রেস্ট নিতেই স্টুডেন্টের ডাক। খুবই ক্লান্ত আর অসহায় লাগতো। যা টাকা পেতাম বেশীর ভাগই বই কিনতাম। আর বাবা তো আছেই। বাবার যা সঞ্চয় সবই আমাদের দু ভাইকে দিতেন। টাকাগুলিতে বাবার গন্ধ লেগে থাকতো। আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের নাম "বাবা"।😘
ঢাকায় যেতে যেতে আমি বড্ড অবসাদগ্রস্ত রাত জাগা পাখি। পড়তে পড়তে চোখদুটি ক্ষয়ে যেতে চায়। আশার প্রদীব নিভু নিভু। পরীক্ষার ডেট দিলেই আমার রুটিন আরও বাড়িয়ে দিই। ঘুমের জন্য ৫/৬বা ৪ ঘন্টা রাখি। সফলতার সূর্যটা হয়তো অন্য কারো আকাশে উকি দিচ্ছে, তাই আমার আকাশ খালি। বাবা-মা আমার দিকে নিঃপলক চেয়ে রয়। আমি কিছু বলতে পারিনা, খেতে বসে কানে বাবার গলা, তুই এরকম রাত জেগে পড়লে পাগল হয়ে যাবি। আসলে সহজ সরল মানুষ, ভয় পেতেন, যদি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাই।
২০১৮ সালের দিকে রেজাল্ট হলো NTRCA এর বেসরকারি স্কুলের নিবন্ধন। আমি ফাইনালি ভাইভা পাশ। কৃষিতে মেরিট ছিল ১৭৮। আশা জাগলো জব হবে। আসলে নিবন্ধনের জন্য আলাদা ভাবে কিছুই পড়িনি। নিবন্ধন রিটেনে একাডেমিক লেখার হাতটাই কাজে দিয়েছে আর প্রিলি BCS প্রিপারেশন নিলে সহজে পাশ করা যায়। ওই যে বিসিএস ভূত মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে, সারাদিন বিসিএস ১০ টা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকতাম। ফলাফল ৩৮ তম, ৪০ তম প্রিলিতেই ফেল। বিসিএস সারকুলার বছরে একটা, বাট আমার জব একটা খুব খুব প্রয়োজন। তাই ব্যাংক এর দিকে ঝুকলাম। তখন ব্যাংক সারকুলার দ্রত হতো। আর আগেও একটু পড়েছি, এবার পুরোদমে। পড়ি আর ফেল করি, পড়ি আর ফেল করি। আর নীল ক্ষেত থেকে বই কিনি। কোন এক রাতে ঢাকা যাচ্ছি পরীক্ষা দিতে রাত ১২ টার দিক ফোন, রেজাল্ট দিয়েছে স্কুলের গণবিজ্ঞতির। সার্ভার ডাউন। ১ টার দিকে দেখি আমি পাশের গ্রামের হাই স্কুলে(MPO) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। জীবনে প্রথম চাকুরি, মনে গান বাজে, চাকরি টা আমি পেয়ে,,,,,।
২০১৯ এর ২০ জানুয়ারি জয়েন করলাম স্কুলে। এক বছর পর ব্যাক্তিগত কারণে ২০২০ জব ছেড়ে দিলাম। আবার বেকার। ততদিনে আমি নিজ বাড়ি ছেড়ে উপজেলা লেবেলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি।
শুরু হলো আমার মা'র সংগ্রাম। গ্রাম থেকে ৪-৫ কিলো দুরে উপজেলা শহরে বাসে চড়ে মা রোজ সকালে খাবার রান্না করে নিয়ে আসতো। আমাদের দু ভাইকে খাইয়ে রান্না করে দিয়ে আবার বাড়ি চলে যেত। প্রায় ৩ বছর রোজ একই রুটিন। মাঝে মাঝে ভাবি, এতো কেন মায়া। নাড়ীর টান একেই বোধ হয় বলে। পৃথীবিতে স্বার্থহীন, শর্তহীন ও অফুরন্ত মমতার খনি "মা"। মাঝে করোনার দিনগুলি আর যেতে চায়না। প্রাইভেট বন্ধ, বাবার ব্যবসাও নাজেহাল দশা। বাড়ি ভাড়া দিব কি, খাব কি। একদিন দেখি, আমার পকেটে ১০ টাকার একটি পুরনো নোট। না! এভাবে চলা অসম্ভব। স্টুডেন্টের বাসায় গিয়ে পড়াতে শুরু করলাম। খুবই ভেঙ্গে পড়লাম।
হায়, পভু এ কোন পরীক্ষা তুমি নিচ্ছো!😞😥
সন্ধার পর অন্ধকরে হাটতে বের হতাম, যেন কেউ দেখতে না পায়। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে কি করি। কি উত্তর দিব।😔। রাত গুলি শেষ হতে চায় না। পরিবারের মুখগুলো সামনে আসে। মনে হয় হাউমাউ করে কাঁদি, কান্না সেও আজ আমাকে ছেড়ে যেতে চায়। বেকাররা এ হাইব্রিড সমাজে বড়ই একা। সমাজ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। 😢
ব্যাংক নিয়ে হার্ড এন্ড সুল চেষ্টা চালালাম। রুটিন ১২-১৪ ঘন্টা। আগারওয়ালকে ভাজতে শুরু করলাম। আর আমার অবস্তা বাসি পান্তা ভাতের মত। জীবনের ওপর দিয়ে মই দিলাম আর কি। জাতীয় থেকে ব্যাংক প্রিপারেশন নিতে গেলে বুঝবেন। দেশী বিদেশী লেখকের বই আর বাদ দিলাম না। দুপুরের বিরতি কম, রাতের বিরতিও কম, ঘুম কম। নয়তো রুটিন ফিলাপ হয়না।
ফলাফল দুটো ভাইভার সুযোগ। একটা SO (সিনিয়র অফিসার) আর একটা O (অফিসার)। SO টাই বেশী ভালো হলো। অনেক আশাবাদী ছিলাম, বাট জব হল না। অফিসার টা মোটামুটি দিলাম, বাট জব হলো। রোল খুঁজে পাওযার অনুভূতি আজও মনে পড়ে।
জনতা ব্যাংক অফিসার (জেনারেল)। ভালোই ২য় শ্রেনী জব। খেয়ে পড়ে সুন্দর দিন চলে যাচ্ছে আপনাদের আশীর্বাদে/দোয়ায়।
#বিসিএস পর্ব:
এদিকে ৩৮,৪০তম বিসিএসে খালি হস্তে ফিরলেও, মহান সৃষ্টিকর্তা ৪১ প্রিলি(২০২১ সালের ১ আগস্ট) নিরাশ করেননি। প্রিলি পাশ করবো জেনে আগেই পড়া গুছাতে শুরু করি। রিটেন আমার স্ট্রং জোন। প্রিলিতে আমি সামান্য পেয়েই পাশ করতাম। রিটেনে আমি ভালো তা বুঝলাম MSC তে। আমার জীবনের কোন কালেই আমি এতো ভালো রেজাল্ট ছিলো না। MSC তে আমি ৩.৭৫ পাই। এটা ডিপার্টমেন্টের সর্বোচ্চ ছিল। আবার ব্যাংকেও রিটেন পর পর দুটতেই পাশ করি। তার মানে এই নয় যে, আমি ফেল করিনি। ফেলের লিস্ট কিন্তু ডাইনোসরের লেজের চেয়েও লম্বা।
যা হোক, বিসিএস রিটেনে আমি নতুন পাবলিক। ব্যাংকের ময়দানে না হয় একটু মাস্তানি মেরেছি। এটা বাবা বিসিএস। এখানে বুয়েটিয়ান, রুয়েটিয়ান, বিশ্ববিদ্যালিয়ান, মেডিকেলিয়ানদের চলে রেস। তা বেশ, আমারও ব্যাপক ইন্টারেস্ট।
কচুরিপানা মাথায় দিলে যেমন শীতল হয়, তেমন শীতল মস্তিষ্কে এগুতে থাকি। পড়ি, নোট করি, পরীক্ষা দিই। এভাবে কয়েকটা বিষয় নোট করি। পরীক্ষা খাতা নিজেই মার্কিং করি। রিপণ কৃপনের মত মার্ক দেয়। অর্ধেকের বেশী মার্কই দিতাম না, খুব ভালো না হলে। বিসিএস রিটের সিলেবাস মারিয়ানা ট্রেন্সের মতই গভীর।
রিটেনের আগে বাসায় টানা ৮ ঘন্টা দুটা পরীক্ষা দিতাম স্টামিনা বাড়াতে। ৮ ঘন্টা লেখা, আমার বাপ, দাদা, তার চৌদ্দগুষ্ঠীও কোনদিন লিখেনি রে বাহ!😊😄
বিশ্বাস ছিল রিটেন পাশ করবো, ভয়ও ছিল, কারণ আমার নিজেকে যাচাই করার কেউ ছিলনা। এ পথ মাঝে একমাত্র আমিই আমার শিক্ষক।
এই তো, রিটেন পাশ করলাম। ভাইভা দিলাম গুলগুলা হয়ে। ভাইভা বোর্ডে ৩ খানা যম, মধ্যে আমি বেজা বিড়াল টম। বাহিরে বাঘের মত গর্জন ছাড়ি, ভেতরে ভেতরে বাঘের মাসি। মিউ।😸😺😻
রেজালের দিন অফিসে প্রচুর ভীর, সারাটা দিন কিভাবে গিয়েছে টের পাইনি। সন্ধার ৭টার দিক অফিস থেকে বের হয়ে প্রিয় কলিগকে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে বাসার দিক রওনা দিয়েছি। ফোনটা টনাস করে বেজে ওঠলো, ধরলাম, আর এক ফ্রেন্ড বললো তোমার রোল এতো না? হ্যা, কন্গ্রেচুলেশন ক্যাডার। শুনে খুশিতে, দম যেন মোর যায় রে, আহা দম,,,,,,,। সে এক প্রবল অনুভূতি যা ৫০ টি বাংলা বর্ন দ্বারা প্রকাশ করা যায় না।
প্রিয় পাঠক/শিক্ষার্থী/চাকুরীপার্থী, এতটা সময় নিয়ে উপরের পথের পাঁচালী পড়ার জন্য আপনার ধৈর্যের প্রশংসা করছি। আর যাই করুন, সিরিয়াসনেস এর সাথে সাথে আনন্দময় করে তুলুন আপনার সংগ্রামী জীবন।
সকলের আগামী দিন সুন্দর, সফল ও মসৃণ হোক।
💙💚🧡
কপি: Riponarya Kormokar