18/07/2025
'তোমরা যারা ডাক্তার হতে চাও'
---------------------------
ডাক্তার হিসেবে আমি মিটফোর্ড, ঝিনাইদহ সদর, ঢাকা মেডিকেল এবং লন্ডনে কাজ করেছি।
সত্যি বলতে আমার কাজ করতে সবচেয়ে আরাম লাগছে লন্ডনে। পরিবেশটা ভালো। শুধু ভালো বললে আসলে ভুল হয়। অসাধারন। সিভিলাইজড৷ ভদ্রতা আছে। নিরাপত্তা আছে। ছুটি আছে। সম্মান আছে। নতুন কিছু ভাববার জায়গা আছে।সবচেয়ে বড় কথা পয়শা খারাপ পাইনা।
সবচেয়ে কষ্ট হতো, ঢাকা মেডিকেলে।
দুনিয়ার পাতি নেতার মামদোবাজি। বাজে সাংবাদিকদের ভুল চিকিৎসা বয়ান। শোয়ার জায়গা নাই, টয়লেট নাই একটা ভালো!
তবু অদ্ভুত কি জানেন?
ঢাকা মেডিকেলের মতন প্রায় ইন হিউম্যান একটা পরিবেশে কাজ করে যে মানসিক আনন্দটা আমি পেয়েছি তা কিন্তু এখানে আমি পাইনা।
এখানে সব আছে, শুধু গাইবান্ধা থেকে আসা পকেটে একশো টাকা নিয়ে অসহায় হয়ে দাড়িয়ে থাকা দরিদ্র লোকটা নাই।
অপারেশন টেবিলে শুয়ে ব্যাথার ঘোরে ফড়িং ধরতে হাত বাড়ানো নয় বছরের সুমন নাই।
মনে পড়ে ক্যাজুয়ালটিতে একবার মানিকগঞ্জের এক রোগী পেলাম। এত দরিদ্র, এত দরিদ্র যে ঠিক ঠাক কাপড় পড়ার মতনও পয়শা নাই। দীর্ঘ দিনের দারিদ্রে মানসিক ভাবে এত মিইয়ে গেছে, এত ভীতু হয়ে গেছে!
আমার রুমে এসে চেয়ারে বসতে বললেও বসার সাহসটা যোগাড় করতে পারছেনা!
জোড় করে বসিয়ে মাথায় হাত রাখলে, বুক ভেঙে আসা চোখের জলে ভেসে গেলো সব!
লন্ডনে তো সেই মুখটা নাই!
ছোট্ট বাচ্চাটা বস্তির ঘর থেকে বের হয়ে দৌড়ে গেছে রাস্তায়। অটো চলে গেছে তার পেটের উপর দিয়ে। সারা রাত জেগে অপারেশন করলাম!
ভোরের আলোয় বাইরে এসে দেখি মা নামাজে বসে আছে।
আমার বাচ্চার জন্য না, আপনের জন্য দোয়া করছি!
এই বাক্য, এই বোধ, এই ভালোবাসা আমি কোথায় পাই!
এই ঝকঝকে ইউরোপে, আমি কোথায় পাই বারান্দায় উবু হয়ে বসা গোবিন্দ চাষিকে!
পুরান ঢাকার কূখ্যাত সন্ত্রাসী, স্যার এইবার ভালো করে দেন, ভালো হয়ে যামু বলা সরল ছেলেটাকে!
কোথায় পাই আমি বাংলাদেশের বুকের ভিতর থেকে উঠে আসা পেটের ব্যথায় কাতর শিমুল, এক্সিডেন্টে পা ছিন্ন হয়ে যাওয়া কলেজ পড়ুয়া মেয়েটা,
মৃত মাকে জড়িয়ে ধরে রাখা চার বছরের হতচকিত শ্যামল শিশুটা!
আমি তোমাদের ভালোবাসি প্রিয় বাংলাদেশ।
একটু সময় দাও আমায়। আর কিছু দিন যাক।
আমি ফিরবো আবার।
✒️ ডা. ইমরান কায়েস