21/06/2021
পড়ি কিন্তু পারি না! সমাধান কী?
মুল আলোচনার আগে দুইটা প্রশ্নের উত্তর খুব ভালো করে বুঝি,
ক) পড়াশুনায় ভালো করা জরুরী কেন? আরে পড়াশুনা করে কে কি করছে? ।ফেইলরদের এসব আবর্জনা কথনে কান দেওয়া যাবে না। পড়াশুনা করেই অনেক গরীব ঘরের ছেলে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত। পড়াশুনা করে হবে ইন শা আল্লাহ। হালাল ও সম্মানিত রিযিকের জন্যই কেবল নয়, বিবাহ শাদী, শ্বশুর শাশুরির আদর, বন্ধুবান্ধব আত্নীয় স্বজন তথা সমগ্র জাতি যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করবে কোথায় পড়, বা কি কর তখন তৃপ্তির সাথে একটা ভালো লাগা সম্মানজনক উত্তর দিতে হলে ভালো ইউনিভার্সিটির নাম বা পেশার নাম সাথে থাকতে হবে।
খ) পরিশ্রমই নিয়তি। কখন করলে ভালো?
বন্ধুরা মনে রাখবে শারিরিক পরিশ্রম তোমাকে করতেই হবে। হয় স্টুডেন্ট লাইফে অথবা তার পরে। স্টুডেন্ট লাইফের পরিশ্রমে বেশ দাম পাওয়া যায় আর পরবর্তী লাইফের পরিশ্রমে তা থাকে না। ছাত্র জীবনে রাত জেগে পড়ার মধ্যে যে কষ্ট তা নিশ্চয়ই রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অন্যের হুকুম পালনের চেয়ে কম। সুতরাং পড়শুনা অবস্থায় পরিশ্রম করাই ভালো কি বলো!
এক্ষণে পড়ালেখার কয়েকটি কৌশল দেখি যাতে রেজাল্ট আপগ্রেড করা সহজ হয়।
১। ওযু করে বা হাত পা ধুয়ে পড়তে বসা
ওযু করে বা হাত পা ধুয়ে পড়তে বসা উচিত। ঘামের শরীরে বা বাইরে থেকে এসেই শুরু না করা। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে শুরু করা। এতে মানসিক প্রশান্তি হবে। নরম শান্ত মন পড়া লেখার উপযোগী। মনে রাখবে সব মেশিনেরই একটা ভালো স্টার্ট দরকার। তোমার শরীরও একটা জৈবিক মেশিন।
২। বাজারের মত পড়ার বিষয়ের লিস্ট করা
মহিলারা যেমন যত্ন করে বাজারের লিস্ট করে সেভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী সমসাময়িক চাহিদার উপর ভিত্তি করে লিস্ট করে তা পড়ার টেবিলের সামনে বা বামে সুন্দর করে লাগিয়ে রাখা। যে বিষয় পড়া হয়ে গেছে বা জরুরত শেষ হয়েছে তা কেটে ফেলা। এটা যে যত সুন্দরভাবে করবে তার পড়াশুনা তত সহজ হবে।
৩। পড়ার বিষয় ও সময় নির্বাচন
পড়ার সময় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর বিষয়ের সাথেও এর ভালো সম্পর্ক আছে। মুখস্থ করার বিষয়গুলো পড়তে হবে ঘুম ও খেলাধুলার পর। অর্থাৎ ভোরে আর মাগরিবের পর। রাতে খাওয়ার পর ঘুম ঘুম চোখে আর দুপুরের পর অলস তন্দ্রাচ্ছন্ন সময়ে মুখস্থ করা অনেক সময়ের ব্যাপার। গনিত রিলেটেড বিষয়গুলো দুপুরের পর আর রাতে খাওয়ার পর ভরা পেটে করলে সুবিধা পাওয়া যায়। কোন সময়ে কতটুকু পড়বেন টার্গেট করে নেবেন। নইলে বরকত হারাবেন। ফালতু সময় নষ্ট হবে।
৪। পড়ার টুলসগুলোকে সুন্দর করা
জানালার পাশে টেবিল, টেবিলে সুন্দর কলমদানি, সুন্দর খাতা, লাল নীল কলম ও মার্কার, বাধানো বই, আর টেবিলের পাশে সম্ভব হলে একটা গাছ। লাল আলোতে পড়া ভালো হয়না। তাই সাদা টিউব লাইট বা এনার্জি সেভিং এল ই ডি অবশ্যই। পড়তে গিয়ে খাটে উঠেছেন তো শেষ। দুই ঘন্টায় দুই মিনিটের পড়া হবে না। শুয়ে পড়লে তো পড়লেনই আর উঠতে পারবেন না। খবরদার! ফেসবুক মাস্ট বি অফ ডিউরিং দ্যা রিডিং পিরিয়ড!
৫। খেয়াল করে পড়া, জোড়ে জোড়ে পড়া
অনেক সময় আমরা পড়ি এক, চিন্তা করি আরেক। এতে গর্জন হলেও অর্জন কিছু হয় না। সুতরাং খেয়াল করে করে পড়তে হবে। পড়া যদি কান দিয়ে ঢোকে তালে তা ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত সাপোর্ট পাওয়া যায়। মস্তিস্ক বেশ আন্দোলিত হয়। ফলে স্মৃতিতে তাড়াতাড়ি স্থান নেয়। পড়া ঢুকাতে হবে চোখ, মুখ, কান, অন্তর সব দিক দিয়ে। তবে খেয়াল করে।
৬। লিখে পড়া, অন্তত নোট রাখা কিংবা কালারিং করা
পড়ার বিষয় লিখে রাখলে ভালো। তবে অনেক সময় সব লেখা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে মুল পয়েন্টগুলো সুন্দর করে লিস্ট করে তার পাশে কি-ওয়ার্ডগুলো লিখে রাখা। বইয়ের সাধারণ পয়েন্টগুলো হলুদ আর একটু কঠিন পয়েন্টগুলো লাল মার্কার দিয়ে দাগিয়ে রাখা। কি ওয়ার্ডগুলো লাল কালি দিয়ে সার্কেল দিয়ে রাখা। এতে পড়া মনে রাখতে ও মুখস্থ করতে সহজ হবে ইন শা আল্লাহ।
৭। কৌশল করে পড়া
টেবিল, ছক, ছবি, ছড়া, ট্যাবলেট ইত্যাদি ব্যবহার করা। ট্যাবলেট কি? ধরেন, সাইন থিটা মনে রাখতে আমরা "সালতি" অর্থাৎ লম্ব/অতিভুজ আর কস থিটা মনে রাখতে "কভুতি" অর্থাৎ ভুমি/অতিভুজ দুইটি ট্যাবলেট মনে রাখতে পারি। এভাবে বিভিন্ন পয়েন্টের প্রথম অক্ষর দিয়ে মনের মত ট্যাবলেট বানানো যায়। এছাড়া বিভিন্ন ফ্লো চার্ট, সালের ক্রোনলজি দিয়ে ধারাবাহিকতা মনে রাখা সহজ হয়। আরেকটা বিষয় হল গল্প দিয়ে ছবি করা। বিজ্ঞান বিষয়ের ছবিগুলো ভালো করে বুঝে বুঝে আকা। এসব কৌশল পড়া শিখতে সহজ করে।
৮। পড়ার মাঝে ব্রেক
এক টানা না পড়া। প্রতি আধা ঘন্টা পর পারলে ব্রেক নেওয়া। তবে পড়ার তুমুল অবস্থায় না। স্বাভাবিক অবস্থায়। এই বিরতিতে একটু মধু বা খেজুর জাতীয় খাবার। অথবা চা কফিও ভালো। সামান্য ব্যায়ামও উপকারী। এই ব্রেক মস্তিস্ককে সামান্য রেস্ট দেয়। আমরা যে কম্পিউটার রিফ্রেশ করি তেমন।
৯। গনিতের বিশেষ কৌশল
গনিতের মূল সাফল্য মুখস্থ করা। অবাক হবেন না। আমার কথা না। নটরডেম কলেজের বিখ্যাত গণিত স্যার বিদ্যুৎ কুমার ভদ্রের বিশেষ বানী। কি মুখস্থ করবেন? কোন অঙ্ক কোন তরিকায় শুরু করতে হয়, কোনটার পর কোনটা বের করতে হয়, কোন ফলটা সাধারণত কোন পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় এগুলো। অর্থাৎ গণিতের কৌশল মুখস্থ রাখা। যদি মনে করেন যে পরীক্ষার খাতায় পদ্ধতি আবিস্কার করে লিখবেন তাহলে লিখতে পারেন। ২৮ এর বেশি পাবেন না। আর হ্যা কখনও অঙ্ক দেখে অঙ্ক বুঝবেন না। এই বোঝা পরীক্ষার খাতায় অবুঝ হয়ে যায়। খাতার পর খাতা কাটাকাটি করবেন কিন্তু ঐ বুঝ মনে পড়বে না। সুতরাং খাতায় অঙ্ক করতে হবে মাথায় না।
১০। নিজেকে নিজে যাচাই
পড়া শেষে মনে করার চেষ্টা করুন যে কি পড়েছেন। প্রয়োজনে কাউকে পড়াটা ধরতে বলুন। এতে কোথায় আপনার সমস্যা তা ডিটেক্ট হবে। পরীক্ষামূলক লেখার সময় বই পাশে নিয়ে লিখবেন না। তাহলে লেখার চেয়ে দেখা বেশি হবে। ফলাফল হবে নকল করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব।
১১। কোন কিছুই কঠিন নয়
প্রথম দেখায় কিছু কিছু জিনিস কঠিন লাগতে পারে। কিন্তু সত্যি কথা হলো কোন জিনিসই বেশি কঠিন নয়। হলে তা কেউ পারতো না। কিছু যদি কঠিন লাগেই সেটা সুন্দর করে মার্ক করে রাখো। কয়েকটা সেগমেন্ট করে দেখ যে বেশিরভাগ সেগমেন্টই তুমি বোঝ। একটা কিছু তাকে কঠিন করেছে। পরে একসময় বন্ধুর সাথে সেটা আলোচনা করে নাও। দেখবে পুরো বিষয়টা সহজ লাগবে। আমরা যে ভুলটা করি কঠিন কিছু মনে হলে আর তার কাছে যাই না। ফলত ওর সম্পর্কে ধীরে ধীরে একটা ভয় অন্তরে গেথে যায়। অথচ সামান্য একটা লাইন আনলক করতে পারলেই পুরো পাতা বোঝা যেত।
১২। শেখা ও শেখানো
শেখার সাথে শেখানোর অভ্যাস করা উচিত। মাস্টারি করার আগ্রহে মানুষ অনেক সময় কষ্ট হলেও শিখতে বাধ্য হয়। আমার আরবী শেখা মনে হয় এই কারনেই সম্ভব হয়েছে!
১৩। ভালো ছাত্রকে শিক্ষক করা
অনেক সময় শিক্ষকের ভাষা হিব্রু মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে বন্ধুকে কিছু খাওয়ানোর পর তাকে জিজ্ঞেস কর। ফেলতে পারবে না। তুমিও ভালো শিখতে পারবে। তোমার সমস্যা শিক্ষকের চেয়ে বন্ধু বেশি বোঝে কারন সেও মাত্র তা সলভ করেছে।
১৪। প্রেম ভালোবাসা ভালো ফলের শত্রু
কোন মেয়ের সাথে চিট চ্যাট করেছোতো শেষ। বহুত ভালো ছাত্রকে দেখেছি কালের গহবরে হারিয়ে গেছে। মনে রাখবা শেষ ভালোতো সব ভালো। তমার ভালো রেজাল্ট দেখে সে আসবে আর খারাপ রেজাল্ট দেখে সুযোগ বুঝে মায়ের দোষ দিয়ে পালাবে। এই হল হাল, দেখা হবে কাল। অপ্রয়োজনীয় সালামেরও উত্তর দিও না।
আল্লাহ আমাদের হালাল পরাশুনায় বরকত দিক। আসসালামু আলাইকুম ও রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।
---(এলার্জি জনিত কারণে নাম গোপন রাখা হলো।)