13/09/2026
লা' থি মেরে বের করে দেওয়া একটা ব্যর্থ দ্বীপ মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে আজ পৃথিবীর ধনী দেশ!🖤
১৯৬৫ সাল। সিঙ্গাপুর যখন মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হতে বাধ্য হয়, তখন এটি কোনো দেশই ছিলো না ছিলো এক টুকরো কাদামাটি আর বস্তিতে ভরা দ্বীপ। না ছিলো প্রাকৃতিক সম্পদ, না ছিলো খাবার পানি। তখনমালয়েশিয়া থেকে পানি কিনে আনতে হতো। চারদিকে ছিল সীমাহীন দুর্নীতি, গ্যাং কালচার, দারিদ্র্য আর চরম বেকারত্ব।
ঐদিন জাতীয় টেলিভিশনে সংবাদ সম্মেলনের সময় লি কুয়ান ইউ কেঁদে ফেলেন। তিনি সেদিন বলেছিলেন,
"আমার সমগ্র প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আমি দুটি ভূখণ্ডের একীকরণে বিশ্বাস করেছি... কিন্তু এখন আমি, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি যে আজ থেকে সিঙ্গাপুর একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন জাতি।"
তিনি কান্নাকে দুর্বলতায় রূপ নিতে দেননি। সংবাদ সম্মেলনের পরদিনই তিনি নিশ্চিত করেন যে সিঙ্গাপুর কারও অনুদান বা দয়ার ওপর বাঁচবে না, বরং নিজেদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে।
সিঙ্গাপুরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে লি কুয়ান ইউ 'Anti-Corruption Bureau' (CPIB)-কে সীমাহীন ক্ষমতা দেন। তৎকালীন সিঙ্গাপুরের জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রী তেন চিয়াং ওয়ান ছিলেন লি কুয়ান ইউয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহযোদ্ধা। ১৯৮৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মাত্র দুটি ঘু- ষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
লি কুয়ান ইউ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কোনো সহানুভূতি দেখাননি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেন। বন্ধুকে বাঁচাতে তিনি একটি কলমও তুলেননি। তদন্ত শুরু হতেই সেই মন্ত্রী অপমানে ও অনুশোচনায় আত্মহ** করেন। আত্মহ***র আগে তিনি লি কুয়ান ইউকে একটি চিঠিতে লিখে যান, "স্বচ্ছ সমাজ গড়ে তোলার জন্য আপনার যে লড়াই, সেখানে আমার এই ভুলের ক্ষমা নেই।"
লি কুয়ান ইউ প্রমাণ করেছিলেন, দেশ ও সততার প্রশ্নে নিজের ছায়াকেও ছাড় দেওয়া হবে না।
কোনো সরকারি অফিসারের যদি আয়ের চেয়ে বেশি গাড়ি-বাড়ি বা সম্পদ দেখা যেত, লি কুয়ান ইউ-এর আইন বলত, "তুমি দুর্নীতিবাজ, এখন কোর্টে এসে প্রমাণ করো তুমি সৎ। অর্থাৎ, সরকার কিছু প্রমাণ করবে না, অফিসার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে সোজা জেল!
কিছু ঘটনা বলি.......!
উই টুন বু তিনি ছিলেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী এবং লি কুয়ান ইউ-এর পিপলস অ্যাকশন পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা। ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় একজন ব্যবসায়ী তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে বিনামূল্যে এয়ার টিকিট দেন এবং একটি বাংলো উপহার দেন। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে লি কুয়ান ইউ তাকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেন।
তান কিয়াং চিয়োং তৎকালীন সংসদ সদস্য ও শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা এনটিইউসি-র তহবিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। লি কুয়ান ইউ ইন্টারন্যাশনাল ওয়ারেন্ট জারি রাখেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০১৫ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়।
দেশ চালাতে গিয়ে নিজের রক্তের ভাই বা প্রাণের বন্ধুকেও ছাড় দেননি লি কুয়ান। তার মেসেজ ছিলো ক্লিয়ার, দুর্নীতি করলে ছাড় নাই, সে মন্ত্রী হোক আর রাজাই হোক।
প্রেসিডেন্ট লি কুয়ান জানতে, দেশ চালাতে গিয়ে শুধু নীতিবাক্য দিয়ে পেট ভরে না। তাই তিনি সরকারি অফিসার ও মন্ত্রীদের বেতন একলাফে করপোরেট সিইও-দের লেভেলে বাড়িয়ে দিলেন!
তাঁর বিখ্যাত একটা উক্তি ছিল, "আপনি যদি কম বেতন দিয়ে ভাবেন সৎ লোক পাবেন, তবে ভুল ভাবছেন। কম বেতন দিলে সিস্টেমে বানর আসবে, যোগ্য মানুষ আসবে না।"
ফলাফল, বিশ্বের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ব্রেনগুলো সরকারি চাকরিতে যোগ দিলো, ঘুষ নেওয়ার চিন্তাই কেউ করলো না!
মালয়েশিয়া যখন-তখন পানি বন্ধের হুমকি দিতো। লি কুয়ান ইউ ড্রেন ও বর্জ্যের পানিকে হাই-টেক প্রযুক্তিতে রিফাইন করে ১০০% মিনারেল ওয়াটারের চেয়েও বিশুদ্ধ বানিয়ে ফেললেন। প্রতিবেশীদের ব্ল্যাকমেইল করার অপশন এক ঝটকায় শেষ।
গ্যাং কালচার বন্ধের জন্য তিনি সবাইকে সরকারি ফ্ল্যাট দিলেন, কিন্তু নিয়ম করে দিলেন একই বিল্ডিংয়ে চীনা, মালয়ী আর ভারতীয়দের একসাথে থাকতে হবে। আলাদা কোনো বস্তি বা গ্যাং বানাতে দেওয়া হয়নি। সবাই এক ছাদের নিচে বড় হলো, জাতপাত আর দাঙ্গা চিরতরে গায়েব!
এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। দুর্নীতি দমন শুরু করতে হয় ওপরের লেভেল থেকে, সাধারণ জনগণকে হেনস্থা করে নয়।পেটে ক্ষুধা রেখে আর কম বেতন দিয়ে কারও থেকে ১০০% সততা আশা করা বোকামি।
আজ ১৯৬৫ সালের সেই মশার কামড় খাওয়া, বস্তিতে ভরা সিঙ্গাপুর পৃথিবীর অন্যতম ধনী, নিরাপদ আর ১০০% দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র!
ইচ্ছা আর লিডারশিপ কঠোর হলে একটা কাদামাটির টুকরাকেও যে স্বর্ণে রূপান্তর করা যায়, লি কুয়ান ইউ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। 🖤
লেখা ~ Diary of She