15/03/2024
❁❁ সিয়ামের সাথে সংশ্লিষ্ট আকীদাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা ❁❁
মূল: শাইখ ড. সালেহ বিন আব্দুল আযীয বিন উসমান সিন্ধী (হাফিযাহুল্লাহ)
উস্তাযুল আকীদা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা মুনাওয়ারা
অনুবাদ: রোকনুজ্জামান বিন সোলায়মান
(সংক্ষেপিত)
সিয়াম ও আকীদার মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এটাকে আমি নয়টি মাসআলায় উল্লেখ করেছি:
❑ প্রথম মাসআলা: সিয়ামের তাওফীক পেয়ে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ অবলোকন করা। তিনি ব্যতীত সৎকাজ করার এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার শক্তি-সামর্থ্য কারোরই নেই:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অনুগ্রহের মধ্যে রয়েছে:
✪ তিনি এই মাস পাওয়ার তাওফীক দিয়েছেন।
✪ তিনি আমাদের জন্য এই ইবাদাতকে সহজসাধ্য করেছেন।
✪ তিনি আমাদেরকে এই ইবাদাত আদায়ের পদ্ধতি জানার তাওফীক দিয়েছেন।
✪ তিনি আপনাকে এই ইবাদাত পালন করার সহযোগিতা করে থাকেন।
✪ আল্লাহর বড় অনুগ্রহ যে এ রামাযানের আগমনের সময় আমরা দ্বীন ইসলামের উপরে রয়েছি (সম্ভবত এটা সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ)।
✪ আমাদেরকে রিযিক দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন।
✪ শয়তানদের শৃঙ্খলিত করেন।
✪ এর জন্য বড় প্রতিদানের ব্যবস্থা করেছেন।
❑ দ্বিতীয় মাসআলা: ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি অনুধাবন করা:
ত্রুটি-বিচ্যুতি অবলোকনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবশ্যক হয়ে পড়ে:
✪ দুর্বলতা ও মুখাপেক্ষিতা
✪ তওবা করা
একটি মূলনীতি জেনে রাখুন:
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁকে মর্যাদা দেওয়া ও তাঁর প্রতি ইলম যত বৃদ্ধি পাবে, তত বেশি আপনার ঘাটতি উপলব্ধি হবে। যত নিজের ঘাটতি উপলব্ধি করতে পারবেন, প্রতিটা মুহূর্তে তত বেশি আল্লাহর নিকট তওবা করার গুরুত্ব বেড়ে যাবে।
❑ তৃতীয় মাসআলা: স্মরণ করুন, সিয়াম আল্লাহর জন্য। সুতরাং তাঁর জন্যই সিয়াম পালন করুন!
আল্লাহ তাআলা বলেন: “সিয়াম আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমিই দেবো। বান্দা কেবল আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা ও পানাহার বর্জন করে।”
ইবনু আব্দুল বার্র রহিমাহুল্লাহ বলেন, অন্যান্য ইবাদাতের তুলনায় সিয়ামের মর্যাদার জন্য আল্লাহ তাআলার এ বাণীটুকুই যথেষ্ট– “সিয়াম একমাত্র আমার জন্য।”
বলা হয়ে থাকে, সিয়াম কখনো গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে রাখা হয় না। মুশরিকরা একমাত্র সিয়াম ব্যতীত অন্যান্য ইবাদাত; যেমন: দোআ, রুকূ, সেজদা, সালাত ইত্যাদি ইবাদাত গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে করে থাকে।
এজন্য কতিপয় আলেম বলেছেন, সিয়ামে কোনো রিয়া (লৌকিকতা) নেই। কেননা সিয়াম এমন এক গোপন ইবাদাত, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
❑ চতুর্থ মাসআলা: সিয়াম পালনের প্রতিদান পাওয়ার আশা করুন। আর স্মরণ করুন, যিনি এই সিয়ামের প্রতিদান দিবেন– তিনি একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা:
“সিয়াম আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমি প্রদান করবো”– বাক্যটি কতইনা মূল্যবান!
কোনো দানশীল ব্যক্তি কোনোকিছু দানের দায়িত্ব নিলে তা বড় ধরনের কিছু হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে সকল দাতাদের মহান দাতা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আপনার ধারণা কীরূপ, যিনি বলেছেন: “সিয়ামের প্রতিদান আমি নিজেই দেবো”?! সুতরাং, কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করুন! আপনার রব মহান দাতা, তাঁর দানও অঢেল, অফুরন্ত!
প্রিয় ভাই! আপনার প্রতি আমার উপদেশ, আপনি সিয়ামের ব্যাপারে বর্ণিত বিভিন্ন প্রকার নেকীর আশা করুন। যেমন, স্মরণ করুন:
✪ সিয়াম পালনকারীর জন্য জান্নাতে “বাবুর রাইয়ান” এর কথা।
✪ পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়ার কথা।
✪ সিয়াম দুই রামাযানের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারাস্বরূপ।
✪ আপনার সিয়াম আপনাকেই পালন করতে হবে; এর সমকক্ষ (বিকল্প) কিছুই নেই।
❑ পঞ্চম মাসআলা: আল্লাহর উবূদিয়াত বা দাসত্বের মাধ্যমে ফায়েদা হাসিল করুন:
আপনার সিয়ামে, কিয়ামে (সালাতে) আল্লাহর জন্য দাসত্ব করাকে স্মরণ করুন!
স্মরণে আনুন, আপনি তাঁর বান্দা, আর তিনি আপনার উপাস্য, আপনার মনিব। মনিব যেভাবে চলতে বলবে সেভাবেই আপনাকে চলতে হবে। “শুনলাম এবং মেনে নিলাম” বলা ছাড়া আপনার কোনো কর্তৃত্ব নেই।
স্মরণ করুন, “হে আল্লাহ তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার বান্দা”।
রামাযান মাস মানেই আপনাকে সিয়াম পালন করতে হবে। এ মাসে আপনার জন্য পানাহার বৈধ নয়। আবার
কিছুদিন পরেই আসবে ঈদের দিন; যে দিনে সিয়াম পালন করা আপনার জন্য বৈধ নয়। সুতরাং বান্দা হিসেবে আপনার কর্তৃত্ব এতোটুকুই: “শুনলাম এবং মেনে নিলাম।”
❑ ষষ্ঠ মাসআলা: আল্লাহ তাআলা যেটাকে মর্যাদা দিয়েছেন আপনিও সেটার মর্যাদা দিন:
প্রিয় ভাই! স্মরণ করুন, সিয়ামকে আল্লাহ তাআলা কত মর্যাদা দিয়েছেন! এ ব্যাপারে তাঁর এ বাণীটুকুই যথেষ্ট– “সিয়াম আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমিই প্রদান করবো।”
তিনি এই ইবাদাতকে, এর সময়কে মর্যাদা দিয়েছেন। সুতরাং, আপনারও উচিত এর মর্যাদা প্রদান করা। ওই সকল হতভাগ্যদের মতো হবেন না, যারা এই ইবাদাতকে ভারী মনে করে এবং এই মাস দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কোনো সন্দেহ নেই এটা এই মহিমান্বিত মাসকে মর্যাদা প্রদানের বিপরীত।
এই মাসকে মর্যাদা দেওয়ার অর্থ হলো:
✪ এই সম্মানিত মাসে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে বেঁচে থাকা।
✪ আপনার যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখা।
✪ অমনোযোগিতা ও গাফিলতি থেকে বেঁচে থাকা; বরং পুরো মাসকে আল্লাহর আনুগত্যে কাজে লাগানো।
❑ সপ্তম মাসআলা: সিয়ামের ঈমানী প্রভাব অন্বেষণ করুন:
অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত– সিয়ামের প্রভাব রয়েছে; সুতরাং সেই প্রভাব অন্বেষণে ব্রতী হোন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং সে অনুসারে কাজ করা আর মূর্খতা পরিহার করলো না, আল্লাহর নিকট তার পানাহার বর্জনের কোনো প্রয়োজন নেই।” (বুখারী ১৯০৩)
অর্থাৎ, শুধু পানাহার বর্জনই নয়; বরং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যাবতীয় অন্যায় থেকে বিরত রাখাও সিয়ামের অন্যতম উদ্দেশ্য। আর এটাই হলো তাক্বওয়া (অর্থাৎ, আনুগত্যের পাশাপাশি পাপাচার থেকে বিরত থাকা)– যা সিয়ামের মৌলিক উদ্দেশ্য: “যাতে তোমরা তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।” (বাকারা ১৮৩)
কাজেই প্রিয় ভাই! রামাযান হলো পরীক্ষাস্বরূপ। যেখানে কেউ সফল হয়, আবার কেউ অকৃতকার্য হয়। সুতরাং আপনি নিজের জন্য যেকোনো একটিকে নির্বাচন করুন!
❑ অষ্টম মাসআলা: আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়:
এই মাসে মুসলিমদের জীবন-যাপন খেয়াল করলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা: “আনুগত্যে ঈমান বৃদ্ধি পায়”–এর বাস্তবতা প্রমাণিত হয়।
লক্ষ করুন, এই মহিমান্বিত মাসে ধারাবাহিক কত সৎ আমলের ছড়াছড়ি: সিয়াম, সালাত, কিয়াম (তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ), কুরআন তেলাওয়াত, যিকির, দান-সাদকা, ই‘তিকাফ, উমরা পালন ইত্যাদি ইত্যাদি।
সুতরাং, ঈমান বাস্তবায়ন করতে আল্লাহর আনুগত্যে সচেষ্ট হৌন। ঈমানই আপনার নাজাতের উপায়।
❑ নবম মাসআলা: মাহরূম (বঞ্চিত) হওয়া থেকে সতর্ক থাকুন:
এই মাসে কোনো সৎ আমলের তাওফীক পেলে তা মূলধনস্বরূপ। তার মূলধনকে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা কর্তব্য। আর সেটা দুইভাবে হতে পারে:
✪ রামাযানের পরে নিয়মিত সৎ আমল করার দৃঢ় সংকল্প করা।
✪ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সওয়াবকে নষ্ট করা থেকে সংরক্ষণ করা।
এর সওয়াব বিনষ্ট হয় পরবর্তীতে পাপে জড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। সুতরাং পাপ পরিত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প করুন। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো: পরবর্তী পা পূর্ববর্তী নেকীকে ধ্বংস করে দেয়।
এই হলো কতিপয় সিয়ামের ফায়েদা, যা আমি আমার নিজের জন্য এবং আমার মুসলিম ভাইদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা কল্যাণকর মনে করলাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এগুলো জানা এবং তার প্রতি আমল করার তাওফীক দান করুন।
••┈•┈••✦✿✦••┈•┈••